Thursday, May 20, 2021

দুটি কবিতা :: রবিন মাইয়ার্স

অনুবাদ: অরিত্র সান্যাল

নিউ ইয়র্ক সিটি


বাচ্চা মেয়েটা নিজে থেকেই

ওর গোলাপ-পাপড়ির মতো ব্যাগটা

পুলিশকে দিতে গেল।

সেই জায়গায় আর তার বাইরেও

তখন তুষার পড়ছে, আকাশ 

ভাঙাচোরা, নাপিতের দোকান থেকে 

গান, চোদ্দ ডলারের 

ওয়াইন গ্লাস, 

ধুসর পায়রাগুলো, রাইকার আইল্যাণ্ড,

আইস স্কেটাররা আলিঙ্গন করছে

পরস্পরকে, কারও

উত্থান আর পতন কিন্তু

সে সব এই গল্পে

বলার মতো নয়। মেয়েটার মা

মিটমিট করে জ্বলছে 

মেয়েটার পিছনে। পুলিশটি

খামখেয়ালি বাবার মতো

বাঁকা হাসি দেয়। কেউ একটা

স্টিল ড্রাম

বাজাল এই সমস্তকিছুর তলায়। সুড়ঙ্গের 

ধাতু মজ্জায় তার মন্ত্র একটা

চকিত ঝলক উচ্চারণ করে, আমাদের

নত হতে বলে। যদি কিছু দেখে থাকো,

বলো তবে, যদি এখানে আছ,

তার মূল্য চোকাও 

                    (৯ মার্চ, ২০১৯)


ভারমন্ট


ওই ছায়াচ্ছন্ন তুষার এতই নীল অদ্ভুত যে

দেখে মনে হয় সে কখনও নিজেকে নিয়ে বাঁধা গান শোনেনি


আর তার বেশিটাই ছাই হয়ে

উঠে যাচ্ছে পাহাড়চূড়োয়

দেখতে পাচ্ছি।


খুব অল্প সময়ের জন্যই এখানে আলো আসে

আর তা এতই ঠাণ্ডা যে জীবন বেরিয়ে যায়


যদি যেতে দাও।

দেবদারু জেগে ওঠে হত পশুপাখির মধ্যে


উজ্জ্বল।

এত রকমের জৈব দশা


বসন্তে বেড়ে ওঠে।

রাখে কোথায় নিজেকে, কীভাবে


জোগায় বিশ্বাস যে

বেঁচে থাকবে?


অন্য জীবনে আমি,

আরিজোনায় পরিচারিকা হয়ে থাকি 


আমার লিউকেমিয়া আছে,

আমি পাড়া-প্রতিবেশীদের প্রতি নিষ্ঠুর,


আমি এক মহিলার প্রেমে পড়েছি,

আমি রোজ এক ল্যাপ সাঁতরাই।


অন্য অন্যতর এক জীবনে আমি রুগী,

আমি তুষারপাত করি।

                       (১১এপ্রিল, ২০১৯)




-------------------------------------------------------------------------

কবি পরিচিতি: রবিন মাইয়ার্স (Robin Myers, B. 1986) আক্ষরিক অর্থেই শূন্য দশকের কবি। আশা করা যায়, বাংলা সাহিত্যের জগতে সে থাকলে কবিতে কবিতে দ্রুত আলাপ জমে উঠত। কিন্তু থাকে সে মেক্সিকোয়, সুদূর মেক্সিকোয়। এ সত্ত্বেও অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ যে ঘটে গেল তা কেবল অরুণাভ রাহারায়ের উদ্যোগেই। কাছ থেকে দেখতে পেলাম পাকেচক্রে আমরা যে অন্তহীন দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে চলেছি, রবিন তাতে স্পষ্ট জেগে আছে; সাধ্যমতো রুখে দাঁড়াচ্ছে, যতটা বিদ্রোহ এক কবিকে মানায়-– করছে। এই লেখাদুটি সেই সক্রিয়তার সাক্ষ্য বহন করে। লেখাদুটির মধ্যে বয়ে চলা চাপা রাজনৈতিক আঁচটি নিয়ে একদিন জিজ্ঞেস করায় রবিন সরাসরি জানাল, আলাদা করে রাজনৈতিক কবিতা লেখার দায় তার নেই। কিন্তু একটা সময়-– যে সময়ে আমরা বেঁচে আছি, তার থেকে তো আর অন্ধ হয়ে নিস্তার লাভ করা যায় না! এই ইঙ্গিতেই পরিষ্কার বোঝা যায় রবিন নিজের ভাষাগত, ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে শিকড়ের মতো গেঁথে দিয়েছে তার অস্তিত্বের শিরা উপশিরা। কবিতায় তো বটেই, অনুবাদকর্মেও রবিনের সিদ্ধি আকাশছোঁওয়া। একজন অনুবাদক হিসেবেই রবিন প্রথমত আমাদের কাছে পৌঁছয়। Kenyon Review, the Harvard Review, Two Lines, The Offing, Waxwing, Beloit Poetry Journal, Asymptote, the Los Angeles Review of Books, Granta , Tupelo Quarterly আর Inventory প্রভৃতি শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যপত্রে তার বিভিন্ন অনুবাদ প্রকাশিত। ২০০৯ সালে American Literary Translators Association (ALTA)-এর ফেলোশিপ; ২০১৪-তে, Banff Literary Translation Centre (BILTC)-এ রেসিডেন্সি; আর ২০১৭ সালে রবিন feminist translation colloquium A-Fest- অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করে।

Sunday, April 18, 2021

সেই নীল ঘর :: লেইরে বিয়াতে গার্সিয়া


অনুবাদ: শ্যামশ্রী রায় কর্মকার 

ঘরটা খাপছাড়া, অসমান। বছর তিনেকের বাচ্চার হাতে আঁকা টেরাবাঁকা ড্রইংয়ের মতো। সিলিংটা জানলার দিকে ঢালু হয়ে আসায় ঘরের মধ্যে একটা আমন্ত্রণ ফুটে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল একটা নিজস্ব চরিত্র আছে। 

গৃহসজ্জা সাদামাটা। ঘর দেখলে বাসিন্দার সম্বন্ধে মোটামুটি একটা অনুমান করে নেওয়া যায়। দেওয়ালগুলিতে নীল রঙের প্লাস্টার। তার মধ্যে একটি আবার বাহারি পেন্সিল ও জলরঙে আঁকা ছবিতে, নানা দেশের মানচিত্রে আর অসমাপ্ত বাক্যে ভরা। জানলার দুপাশে যে পর্দাটা লেপ্টে আছে, তার রং নিশাচর নীল। জানালার নিচে বিছানা ও ডেস্ক। ডেস্কের উপর এক তাড়া কাগজ ও কয়েকটা কলম ইচ্ছামত ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। 

ঘরের মধ্যে একটা ছোট চেয়ার। আমি তাতেই বসেছিলাম। বিছানায় বসা উচিৎ কি উচিৎ না – এই এক দ্বিধা ছিল। বিছানাটা চেয়ারের চাইতে অনেক বেশি আরামদায়ক বলে মনে হচ্ছিল। চেয়ারের পিঠটা বেশ উঁচু। কাপড়ের পুর দেওয়া সিট। চেয়ারের হাতলদুটো আমার পক্ষে একটু নিচুই বলা যায়। আমার পা দুটো আবার চেয়ারের তুলনায় লম্বা। অবাক কান্ড! তবুও চেয়ারটায় বসে আরাম পাচ্ছিলাম। আরেকটু জমিয়ে বসবো বলে একটু নড়েচড়ে বসার ভঙ্গিটা ঠিক করে নিতেই চেয়ারের পিঠের সঙ্গে আমার পিঠ খাপে খাপে মিলে গেলো। আমি আরামে হেলান দিলাম। 

ঘরটা একেবারে নিঃশব্দ। আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। ঘরে ঢোকার আগে এত শব্দ ছিল। করিডরে মানুষের গলা, লোহার দরজাওয়ালা পুরনো লিফটের ঘড়ঘড়, রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যালে মানুষ আর গাড়ির গাদাগাদি ভিড়ের আওয়াজ। সোমবারের অফিস টাইমে সারা পৃথিবীর তাড়া থাকে, কারণ সবারই দেরি হয়ে যায়। কিন্তু, যখন থেকে আমি ওই ঘরটার ভেতর ঢুকে পড়লাম, একটা নিঃশ্বাসের শব্দও পাচ্ছিলাম না। কেউ ফিসফিসও করছিল না। শুধুই গভীর স্তব্ধতা। ওই পর্দার নীল রঙের মতই, বোবা। 

বিছানার চাদরটাও নীল বলে মনে হচ্ছিল। মহিলার চোখ দুটোও, সম্ভবত। আমার ঠিক মনে পড়ছে না এখন। আমার জিভ থেকে রঙের কোরকগুলো মুছে গেছে। শুধু মনে পড়ছে যে আমি ওই নীল নৈঃশব্দ্যের কথা আর ভাবতে পারছিলাম না। 

তারপর, আমি এলাম।




-------------------------------------------------------------------------

লেখক পরিচিতি: লেইরে বিয়াতে গার্সিয়ার জন্ম স্পেনের বিগোতে। বহু ভাষায় পারদর্শী এই লেখিকা একজন ভাষা শিক্ষিকা। বিগত দশকের প্রথম দিকে কয়েক বছর কলকাতায় ছিলেন। মূলত গদ্য লেখেন ইংরাজি ও স্প্যানিশ ভাষায়। সংবাদ প্রতিদিন, দুকূল, পরম্পরা, দ্য ড্রিমিং মেসিন প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর নানা লেখা প্রকাশিত হয়েছে। নিজের লেখার পাশাপাশি অনুবাদও করে চলেছেন।

Thursday, April 15, 2021

রবার্ট অ্যাডামসনের কবিতা


অনুবাদ: অরিত্র সান্যাল

শীতে, হাসপাতালের বিছানায়


ব্যথা বেদনার বড়িগুলোর ধাক্কায় লম্বা করিডোর দিয়ে

আমি যেখানে এলাম, স্মৃতি সেই ঘর

সবুজ ঢেউয়ের স্বচ্ছ বাষ্পে চড়ে যন্ত্রণা দূরে সরে যাচ্ছিল

কিছু কিছু ছবির ঝলক আসে, চলে যায়


সে বয়সে আমি কবিতা ছাপাবো বলে লিখিনি

তবে, আমার আশেপাশে জীবন যুদ্ধে পিষ্ট হয়ে যাওয়া কিছু পাঠক ছিল  

আমি তাদের মনোযোগ পেতে চেয়েছি

আমার উঠোনে দুশ্চিন্তার মতো ওরা ভেসে বেড়াত


কখনও সিগারেটে টান দিচ্ছি কখনও ইতিউতি দেখছি

কী ভাঙার জন্য আর কী শাস্তি বাকি বা চিত্তবিক্ষেপ

স্মৃতির সূক্ষ্ম ধাতব পাত ভেসে উঠতে থাকে 

মনের উপরিতলে আবার কামড় দেবে বলে


আমার কোনও ধারণা নেই কেন কবিতা আমায় ধরে ফেলল স্কুইডের মতো

মগজ থেকে ঝুলে থাকল দুর্গত আবহাওয়ায়

ভিন পরিবেশে একটা প্রাণী

তার শতাব্দী প্রাচীন জীবন নিয়ে জেগে উঠছে


ভাবনা-চিন্তাকে কালির মতো হতে হবে এবং

হতে হবে এমন যাতে ঝটতি শিকারে টোপের কাজ করতে পারে

কালো চঞ্চুতে আর গভীর থেকে বোধ জেগে উঠবে

সে এক দিন ছিল যখন কবিতা ছিল বুনো জন্তু বশ করার ছল


তখন না ছিল মাছ, না ছিল পাখি তাই

আমি পংক্তি রচনা করেছি তাদের জন্য, জীবন যাদের তিক্ততায় ভরা

চোখ তাদের রোষে লাল চঞ্চল

যখন আগামী কবিতাগুলি আমার জন্য অপেক্ষায় রত



-------------------------------------------------------------------------

কবি পরিচিতি: অস্ট্রেলিয়ার সমসাময়িক কবিতার মানচিত্রে রবার্ট অ্যাডামসন সে ভাষাসংস্কৃতির প্রধানতম কবিদের একজন। জন্ম ১৯৪৩ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ১৯৭০ এ প্রকাশ পায়, ক্যান্টিকলস অন দ্য স্কিন। রবার্টের কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১৬-র বেশি। বিবিধ সম্মানে ভূষিত রবার্ট অস্ট্রেলিয়ার সম্ভ্রান্ত প্রকাশনা সংস্থা পেপার বার্ক প্রেসের কর্ণধার। 

-------------------------------------------------------------------------

অনুবাদকের পরিচয়: কবি এবং অনুবাদক অরিত্র সান্যালের জন্ম ১৯৮৩ সালে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ-- নাবিক বিন্দু থেকে (২০১০), আজ কারও জন্মদিন নয় (২০১৩), নিজের আয়ুর মতো শ্যামবর্ণ (২০১৫) এবং একটা বহু পুরোনো নেই (২০১৮)। সমসাময়িক আমেরিকান কবিদের লেখা অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন – ‘ব্রিজেবল লাইনস’ (২০১৯) গ্রন্থে। এ বছর প্রকাশ পেয়েছে পৌলমী সেনগুপ্তর সঙ্গে যৌথ অনুবাদে কানাডিয়ান কবি আদিনা কারাসিকের কবিতা 'সালোমে বীরাঙ্গণা'।

Tuesday, April 13, 2021

অতিথি বীক্ষণ :: কমলেশ রাহারায়


আমি তার কেমন উত্তরসুরি, একদিন মেপে দেখি

দৈর্ঘ্যপ্রস্থ,মনের ভিতরে ঝিলিক দিচ্ছে রংবেরং মনস্তাপ

আর কোনও অঙ্কিত শব্দ নেই, শূন্য ভাঁড়ার  যেমন

থাকার কথা, প্রারম্ভিক বিষাদে তেমন রক্তমেঘ জমে যায় 

চেনা-অচেনা, দেখা অদেখায় তবু গ্রীবা তুলি 

সবুজ সংকেত পাঠাই, দহনের এই এক পরিণাম


অথচ যে কোনও মানুষ চায় অনুযোগ বাদ দিয়ে জোৎস্নার ভিতর

তার নিজস্ব প্রতিধ্বনি আকাশমাটি জলে স্বপ্নময় হোক

সারাদিন অসম সাহসী এক মেষপালক বধ্যভূমিতে

অন্তত একবার ভাঙাচোরা মুখ আর মাথাটা তুলুক

নিসর্গ শরীরে মানুষের শিরস্ত্রাণ একবার ঝলমল করে উঠুক 

কে না চায় ঝিনুকের ভিতর থেকে উঠে আসুক ব্রতকথা 


মূলত সব যেন অর্গ্যানের সুর, অস্ত্রবিহীন পথ

গোধূলির মাঠ ভেবে দেবদারু অতিথিবীক্ষণ

এতদূর এসে গেছি আমন্ত্রণ ছাড়া ,ভ্রুক্ষেপ করিনি


---------------------------------------------------------

Guest Vision

Kamalesh Raha Roy


How I am his successor, I try to measure;

An absent-minded flower flickers in my mind,

And there are no words drawn, the way an empty storage

Is expected, the way bloody cloud, known unknown,

Overcast, I lift my face to send the greenlight,

This is the consequence of combustion


Still a man wishes his own echo

Reflected everywhere, an intrepid shepherd

Raise his head in the slaughterhouse, his crown

Shimmer in the nature, who does not want 

Folklores from oyster shell!


Chiefly everything sounds like the music from the organ,

A path to walk unarmed, looking at the Deodar guest vision 

and thinking it the field of dusk, I have made so far

Without caring for a call.



Translated by Jagannath Biswas

Painter: Paul Klee

না-পাঠানো চিঠি :: উত্তমকুমার মোদক


ভারতবর্ষের নামে চিঠি পাঠাই এক বিশ্বগ্রাম থেকে

জানি, পরম্পরার ভেতর সব, গ্রিল বসানো ফাঁক

তবু, দেখো, আহ্নিক-একাদশী সারছে কামার্তরা।


একটি অন্ধরাস্তা ধ'রে খুনীরা আসে রক্তমাংস চেয়ে

লালফিতের ফাঁসে কাঁদছে অধিকারের পাখি!

সব প্রবাহের মুখগুলি পরিকল্পিত ঘোরানো!


উৎসের দিকে উল্টো, নামানো থাকছে,পতাকা!

মগজের ভেতর দিয়ে উড়ন্ত ফোরলেন

চাষের ক্ষেতে কর্পোরেটের গুদামঘরের তালা


সংবিধানের ধারায় জমছে পদার্থের রেচন

শাসকের মুখ ঝামলায় নয়া-খনার বচন!





চিত্রকলা: হিরণ মিত্র

Sunday, April 11, 2021

হৃদয় হোম চৌধুরী-র কবিতা


খেলা

আবেগ তোমায় আত্মীয় করেছি

হৃৎপিন্ডে সহস্র শব্দের হাহাকার না হলে দেখতাম

কী করে?

সহস্র সমুদ্রের অমৃতধারা নিয়ে

                   আমার মায়েরা 

হেঁটে গেছে দিগন্তের সূর্যে লাগাম ধরতে 

আর তোমাকে মৌচাকের ঘর গুনে 

জারুল পাতার মাঝে ঘুমোতে দেখেছি রাতে-

বিছানায় নিয়ে এসে

ভালোবাসায় গল্প করার ইচ্ছেটুকু উবে গেছে-

শবের এই শহরে লাশ কম পড়েছিল একবার

বিচ্ছেদী সুরের মতো ভজন বেজেছিল

কফিনের কত সপ্তম পেরেক ফেলে দিয়েছি-- সে সব জানেনি হয়তো কেউ-

শ্মশানে চুল্লি জ্বলে; লাশ সাজিয়ে দিন

আঠারোর জীবনে শেষ খেলা,  দেশ ও জীবনের মিলন


কবি

নদীর কিনারে ফেলা নোঙর-অন্ধ আতুড়ঘরের চিৎকার- 

                      শুনতে চাই না আর।

ভাঙা আকাশের নতমুখ শোকের অবাধ পাথরে

                              প্রেমের খাটিয়া পেতে বিশ্রাম নেয়।

এসবের মাঝেও মনে রেখো

   

ধূসর স্টেশনে আমার পার্থিব দাম্পত্য শেষ হবে আগামীকাল


ফাঁসীগামী আত্মার ক্রন্দনে আয়নার কফিন দেখব--

অন্ধ কালো বিড়াল দু'টি পেছনে ফুঁপিয়ে ওঠে 

পৃথিবীর কখন অসুখ হবে আমি কখন ওষুধ দেব

কখন আমার পায়ের ছাপে পৃথিবীর অঙ্ক কষব 

ওদের পদপিষ্টে ভাঙা ভাতের থালা

কোন বসন্তবিলাপের সঙ্গী হবে!

কবিতা সঙ্গমের জন্য অপেক্ষায় আছি

শেষ সীমান্তে পৌঁছে যাব বলে এসেছি

এখানে কবিরা কি মরুভূমিতে চেরী খায়?


নগ্নপায়ে পলাশের বেড়ি জড়িয়ে পান্ডুলিপির পর পান্ডুলিপিতে কী অক্ষর ছাপেনি ওরা!

Sunday, January 3, 2021

ফের্নান্দো চেইয়ে-র কবিতা

 


অনুবাদ: জয়া চৌধুরী


সাদা রয়ে যাওয়া পাতার গাথা


সাদা রয়ে যাওয়া পাতারা সাধারণত শুভ্র হয়

এবং সাদা রং তার শূন্যতার ইঙ্গিত দেয়

এক এমন শূন্যের কথা বলে যেখানে

অক্ষর, এবং শব্দের অনুপস্থিতিতে থাকে

আলাপচারিতার এক অনন্ত সম্ভাবনা।


সাদা থেকে যাওয়া পাতা

ভাষার প্রতি এক ধরনের আমন্ত্রণ

সে চায় ওরা যেন তাকে অধিকার করে

মহাবিশ্বের ওই অনন্ত শূন্যতা

হৃদয়শূন্য ছিদ্রময় ওই ধাতু

ওই শূন্যের হতভাগ্য অংশটুকুর নিশ্চিতভাবে হয়ে ওঠাকে

ছেড়ে যেতে গিয়ে যে তাকে


অসম্মান করে সাদা পাতা চায় তাকে যেন

অতিক্রম করে যায় ওরা।


অনুতাপ


স্বীকার করছি,

প্রজাপতিদের আমি হত্যা করেছি।

সাধারণত ভাইয়ের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম

সূর্য যখন গাছের শাখা ঝলসে

দিতে দিতে দুপুরের ঘুম সারতেন,

সে ঘুম যত ঘন ততই ভাল।

দিন, নিচের দিকে

নদীর বুকে ঢলে

পড়তে পড়তে কষ্ট পায়

টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায় প্রজাপতিতে

ওদের বেশির ভাগই

ছিল হলদে

কমলা ও আরো আরো রঙের

দেখে মনে হত যেন ডানায় আঁকা আছে ঘড়িমুখ ।

অদেখাকে পাশ কাটাতে কাটাতে

উড়ে আসত স্পষ্ট হয়ে

যেন তারা জানত

ওদের জন্যই অপেক্ষমান

দানবাকারের অস্তিত্ব।

তাদের সর্পিল ঋতু জুড়ে

ভঙ্গুর রূপ উপহার দিতে দিতে

আঁকাবাঁকা পথে বেয়ে আসত ওরা

আগাম না দেখেই

ফুঁসে ওঠা প্রকৃতির কারণে

শাখাদের টুপটাপ ঝরে পড়া।


ওরা আসত সৌরতাপের ফুলকি বয়ে

ছন্দহীন নৃত্যে এবং নীরবে

প্রখর আলোয় এক হাস্যকর

হত্যায় ঘটা মৃত্যু হয়ে।

একথা স্বীকার করায় কী দারুণ যন্ত্রণা!

আমি প্রজাপতিদের হত্যা করেছি

এক ঘৃণ্য সৈনিক হয়েছি

রূপের বিরুদ্ধে

যে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র।


জীবন্ত দেহ যা গান গেয়ে চলে


এই অপ্রমাণিত ও প্রাচীন সঙ্গীতই হল

একটি একলা ছোট ছেলের অস্তিত্ব

ফলবান বৃক্ষ ও ফুলভরা গাছময় রোদমাখা উঠোন

যেখানে ধ্বনিত হয় বিশ্বপ্রকৃতির আনন্দময় স্বরকম্প

দূরাগত হালকা বৃষ্টির ছাঁটে নেচে ওঠে ফুল।

কত উদ্বেগের ভেতর কতখানি নিস্তব্ধতা,

বস্তুর সামনে এই অ্যারিস্টটলীয় বিস্ময়,

যেখানে বৃক্ষের আশ্রয়ে হ্রস্ব হয় প্রেম

এবং চলে যেতে যেতে শামুক ফেলে যায় হীরেকুচি।

আমি সেই ছোট ছেলেটি যে জীবিত এবং গান গায়

পূর্বপুরুষের দেয়া এই ভালবাসামাখা ভাষায়

ওঁরা এই স্তবকের স্বপ্নের শেকড় ছিলেন না,

হ্যাঁ তবুও তাঁরা সেই উপযুক্ত মৃত্তিকা জীবনের ঝাপটা আসে যেখানে।

কালো নদীর এক কবি, মৃত্যু অবধি উড়বার জন্য

যেখানে জন্মায় পাখি

কখনো কখনো, থেমে যায়, শব্দের ঘাটে,

এক অনন্ত আঙিনায় ঋতুস্নাত ফুলেদের ওপর।

খুঁজে ফেরা একাকীত্ব, প্রয়োজন, পরিপূর্ণ আলোয় শিশু থেকে

মহাবৈশ্বিক ভাষা থেকে কবি যেখানে পড়েন

বাস করেন আমার সাথে, এমনকি, মাঝরাতে

এবং পৃথিবীর বুকে নিয়ে আসে দুপুরের ঘুমের সুগন্ধ

যখন কেউ ঘুমোয় না, এবং নক্ষত্ররা যায় কেঁপে।

অটুট স্বপ্ন ও নিশ্চিত ভাবনার এক কবি

আমি যার অপ্রমাণিত ও প্রাচীন সঙ্গীতই হল


একটি একলা ছোট ছেলের অস্তিত্ব।


----------------------------

ফেরনান্দো চেইয়ে: কবি, গদ্যকার, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য-সমালোচক এবং স্টাইল-সংশোধক ফেরনান্দো চেইয়ের জন্ম ১৯৭৬

সালে উরুগুয়ের মেরসেদেস শহরে। “আঁকা পাখিদের কবিতা”, “লিখনভাষ্য ও স্টাইল সংশোধন-এর জেনারেল

কোর্স” “রিও দে প্লাতার ভূতের গল্প” “শব্দের দেয়াল” ইত্যাদি প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১০ টি।

কলম্বিয়ার গোল্ডেন বুক অফ দ্য ইয়ার(২০১৯), সাহিত্য সম্বন্ধীয় প্রবন্ধের জন্য জাতীয় পুরষ্কার

(২০১৭ এবং ২০১৯) ইত্যাদি অসংখ্য পুরষ্কারে সম্মানিত।

---------------------

জয়া চৌধুরী মূলতঃ অনুবাদক। মূল স্প্যানিশ ভাষা থেকে বাংলায় প্রকাশিত উপন্যাস, নাটক, ছোট গল্প,

কবিতার এতাবৎ ১০টি অনূদিত বই ও বাংলায় মৌলিক উপন্যাস একটি ও কবিতার বই দুটি প্রকাশিত।

ভারত বাংলাদেশ আমেরিকা প্যারাগুয়ে কিউবা আর্জেন্টিনা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ব্লগে

নিয়মিত অনুবাদ ও মৌলিক লেখা প্রকাশ করে থাকেন। প্রিয় শখ সেতার বাজান। স্প্যানিশ ভাষা শেখান

রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল অফ ল্যাঙ্গুয়েজ এবং সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ।

Wednesday, December 16, 2020

কালীঘাটের মেয়ে পরিণীতা

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায়: তখনও বেশি রাত হয়নি। দুর্গাপুর হাইওয়ে দিয়ে ফিরছি। আমরা জনা চারেক। একটা ধাবা দেখে গাড়ি দাঁড় করালাম। এখানে বেশ ভিড়। তবে বাইরে খোলা আকাশের নীচে চেয়ার-টেবিল পেতে বেশ গুছিয়ে রেখেছে ধাবা মালিক। চারটে চায়ের অর্ডার দিয়ে আমরা গল্পগুজব করছি। আমাদের লাগোয়া টেবিলে এক দম্পতি বসে। সঙ্গে আট-দশ বছরের একটি কন্যা। সে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে লক্ষ করি কন্যাটির মা আমার দিকে তাকাচ্ছে– যেন কিছু বলতে চায়! আমারও চোখটা ক্ষণে ক্ষণেই সেই মহিলার দিকে অজান্তে চলে যাচ্ছে। বলতে গেলে একটু অস্বস্তিই হচ্ছে। এইভাবে চলে কিছুকাল। তারপর ওই ভদ্রলোক ধাবার ভিতরে ঢোকে, হয়তো কিছু নতুন অর্ডার করতে, তখন হঠাৎই সেই মহিলা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছু বোঝার আগেই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলে, ‘স্যার ভালো আছেন?’ আমি তো যাকে বলে হতভম্ব! কে এই মেয়ে, কীভাবেই বা আমি তার স্যার হলাম তা কোনও অনুমানেই বুঝতে পারছি না। কোনও ভাবেই মেলাতে পারছি না। একবার মনে হল, কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডিজের ছাত্রী ছিল কিনা। তা-ও হতে পারে না। কেননা গত দশ বছর যে সব ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়েছি তাদের প্রত্যেকের মনে আছে– যাদের আমি নামে চিনি। এখনও আমি স্মৃতিভ্রষ্ট হইনি। তবে কে এই ছাত্রী?

এরপর আমার অবস্থা মালুম পেয়ে মেয়েটি বলে, ‘চিনতে পারছেন না স্যার? আমার নাম নীতা। আপনি আমাকে পরিণীতা বলে ডাকতেন– কালীঘাট। এই ‘কালীঘাট’ শব্দটির সঙ্গে যেন কয়েক কোটি ক্যালেন্ডারের পাতা আমার চোখের সামনে ঝরে পড়ল। আমি যেন ফিরে গেলাম সাতাশ-আঠাশ বছর পিছনে। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতার উপান্তে। বস্তি সংগঠনের এক নেতা সেই সময় আমাকে পটিয়ে ফেলেন যে, সরাসরি মানুষের জন্য কিছু করতে হবে, যারা সমাজে পিছিয়ে আছে। শুধু তাই নয়, তাদের জন্য কাজ করার লোক নেই। তো কী সেই কাজ? ঠিক হল কালীঘাটের নিষিদ্ধ পল্লিতে যে শিশু-কিশোররা আছে তাদের পড়ানোর দায়িত্ব নিতে হবে। এদের মধ্যে কিছু ছেলে মেয়ে স্কুলে যায় বটে কিন্তু পড়াশোনায় মন নেই। এদের উৎসাহিত করতে হবে। আমার সেই বয়সে এমন ধরনের কাজে নিযুক্ত হওয়াকে বেশ গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করলাম। সপ্তাহে দুদিন পড়াতে হবে। ফলে তেমন কোনও চাপ নেই ভেবে শুরু করে দিলাম।

চাপ কি আর ছিল না? টালিনালার ধারে যাকে বলা যায় আদি গঙ্গা, তার দূষিত জলে, পচা গন্ধে জায়গাটা ম ম করছে, একটা চালাঘরের মাটির দাওয়ায় প্রাথমিক ভাবে প্রায় জনা আটেক বাচ্চাকে নিয়ে আমার ক্লাস শুরু হল। চারদিকে মাছি ভন ভন করছে। দুর্গন্ধে প্রথম প্রথম বমি পেত। চারদিকের আবহ যাকে বলে মদোমাতাল আর কাঁচা খিস্তির বন্যায় রচিত হয়েছে। এখানে কেউ সোজা বা যাকে বলে সাধারণ ভাষায় কথা বলে না। সবাই উদমার্গের খিস্তি সম্বলিত ভাষাতেই অভ্যস্ত। এমনকী বাচ্চা-কাচ্চাদের সঙ্গে সেই একই ভাষায় কথা বলছে বড়োরা। প্রথম দিকে মনে হত এসব বন্ধ করতে হবে। মাথা গরম হয়ে যেত। কিন্তু ক্রমে অভ্যস্ত হয়ে যাই। সেই দাদা নেতাটি আমায় বুঝিয়েছিলেন, ‘আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। এখানকার তাবৎ পরিবেশ পালটানো তোমার কাজ নয়। আর তা পারবেও না। আমরা যদি এই বাচ্চাগুলোকে একটু লেখাপড়া শেখতে পারি তো জানবে বিরাট কাজ করা গেল।’ কথাটার যৌক্তিকতা আমার মনে ধরেছিল। ফলে বছর খানেক টানা টালিনালার পাশে এইসব বাচ্চাকাচ্চাদের পড়িয়ে গেছি। এদের লোক না হয়েও। কোথাও পুলিশ ঝামেলা করছে, কোনও খদ্দের মদ খেয়ে এসে হুজ্জুতি করছে, কার পালিয়ে যাওয়া বর এসে হুজ্জুতি করছে তার গতর খাটিয়ে বউ-এর কাছে, কে কাকে মারল ধরল, সব কিছুর মধ্যে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়তে থাকলাম। কিন্তু আমার মূল কাজ ছিল সপ্তাহে দুদিন এই তথাকথিত বাপহারা ছেলে মেয়েদের পড়ানো। ‘বাপহারা’ কথাটা লিখলাম এই কারণে যে, প্রায় প্রত্যেকটি ছেলে মেয়ে জানে না বা তাদের জানানো হয় না যে কে তার বাবা, কী তার নাম। কখনও কখনও মায়েরা মিথ্যে নাম বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হয়েছে যখন এরা স্কুলে ভরতি হতে গেছে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সব সময়েই বাপের নামটাই প্রধানত গ্রাহ্য করা হয়, ফলে তৈরি হয়েছে নানা জটিলতা। আর তখন তো আইন-কানুনও এখনকার মতো হয়নি।

এখানে এইসব শিশুকিশোরদের পড়াতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি, বিশেষ করে এই স্কুলে ভরতি করার সময়। আজকে প্রচুর না হলেও অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকলেও বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এদের জন্য লাগাতার কাজ করে যাচ্ছে। সে-সময় এই ধরনের কিছু সংগঠন থাকলেও তা যে খুব উচ্চকিত ছিল তা নয়। হয়তো সম্ভবও ছিল না। সে যাই হোক, এই ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার মধ্যে ধরে রাখাই ছিল একটা বিরাট কষ্টসাধ্য কাজ। কেননা মায়ের খদ্দের এলে তার মদটা, সিগারেটটা, খাবার-দারারটা নিয়ে এলেই কাঁচা পয়সা পাওয়া যায়। আর ওদের পড়াশোনা করার সময় ছিল সন্ধেবেলা। সে সময় তো এই অঞ্চল গমগম করছে।তখন কি আর পড়াশোনায় মন বসে! এদের মধ্যে অনেকেই ছিল লেখাপড়ায় বেশ ভালো, চটপট বুঝতে পারতো। কেউ কেউ একটু পিছিয়ে থাকা। তার করণটাও সহজেই বুঝে ফেলি। যে অবহেলায় ও মানসিক নিপীড়নের মধ্যে এরা জন্মায়, বড়ো হয়ে ওঠে– তাতে এই ধরণের সমস্যা খুব স্বাভাবিক। যেমন, আগেই বলেছি যে, একমাত্র মা-ই এদের ভরসা। তথাপি সেই মা যে তার ছেলে কিংবা মেয়ের জন্য খুব একটা কিছু করতে পারে তা নয়। নিদেন দুবেলা খাওয়াও অনেকের জোটে না। তারপর আছে রোগভোগ। আপাতত ফিরে যাই সেই কালীঘাট থেকে উঠে আসা নীতার সঙ্গে দেখা হওয়া প্রসঙ্গে।

কালীঘাট শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার পর যথারীতি আমি নীতাকে চিনতে পারি। বলি, ‘কেমন আছিস মা?’ বেশ গর্বের সঙ্গে সে বলে, ‘খুব ভালো আছি স্যার।’ মেয়েকে দেখিয়ে বলে, ‘এই আমার মেয়ে, আর ওই উনি হলেন আমার স্বামী।’ ইতিমধ্যে নীতার স্বামী ধাবা থেকে বেরিয়ে আসে। নীতা বলে, ‘ইনি, সেই স্যার, আমাদের কালীঘাটে পাড়াতেন।’ বুঝলাম, ছেলেটি আমার নাম পর্যন্ত জানে। স্বামী হাত মুখ ধুতে গেলে নীতাকে জিজ্ঞেস করি, ‘হ্যাঁ রে, পড়াশোনা কতটা করতে পড়েছিলি?’ নীতা এক গাল হেসে বলে ‘হায়ার সেকেন্ডারি অব্দি কিন্তু তারপর আর হল না। সংসার, মেয়ে সব সামলে আর পড়া হয়নি।’ ক্রমে সে চাপা গলায় শুরু করল তার জীবনবৃন্তান্ত। এই ছেলেটি নাকি ছিল তার মায়ের খদ্দের, প্রায়ই আসত। বয়সে প্রায় পনের বছরের বড়। সে-ই নাকি তার মাকে বুঝিয়ে নীতাকে বিয়ে করে। পাইপের ব্যবসা করে। আজ তার ব্যবসা বেশ জমে উঠেছে; বোঝা গেল সঙ্গের গাড়িটা দেখে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোর মা-র খবর কী?’ নীতা ছলছলে চোখে জানায়,’কঠিন ব্যাধিতে মারা গেছে।’ শেষ বয়সে আমার কাছেই থাকত। আর কটা দিন আগে মাকে নিজের কাছে নিয়ে এলে হয়তো বাঁচাতে পারতাম।’ এ তো প্রায় হিন্দি ছবির মিলানন্তক কাহিনি। তা হোক, আমায় কেন জানি একটা তৃপ্তির হাওয়া ছুঁয়ে গেল। ওরা পয়সা মিটিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমি খনিকক্ষণ স্মৃতির মেঘের মধ্যে যেন ডুবে গেলাম। এই রকম তো আরও ছাত্রছাত্রীরা ছিল। তাদের কী হল? তাদের সঙ্গে কখনও কি দেখা হয়ে যাবে! আজও তার অপেক্ষায়ই আছি।

Sunday, December 6, 2020

ল্যান্ডরে, রাস্কিন বন্ডের আইভি কটেজে


শিবু মণ্ডল: একটা শৈলশহর থেকে পর্যটক যখন অন্য শৈলশহরে যায় তখন তার কাছে দুটো অপশন থাকে– হয়তো সে কিছুটা উষ্ণতা রেখে যাবে নয়তো কিছুটা বাড়তি উষ্ণতা নিয়ে যাবে। এর আগে মুসৌরি তিনবার গিয়েছি কিন্তু ভালো লাগেনি। কেন যে শুধু শুধু দার্জিলিঙের তুলনা চলে আসত। ঘরের শহর বলেই কিনা, কে জানে! মাঝে ঋতুর ব্যবধান না থাকলেও, স্মৃতির ব্যবধান থেকে যায়। এই পার্থক্য একটা দূরত্ব তৈরি করেছিল আমাদের মধ্যে। কিন্তু এবার মুসৌরি এলাম নিজে ড্রাইভ করে। মনে হল যেন স্বপ্নে দেখা এক নৌকো চালিয়ে স্মৃতির স্রোতে ভেসে ভেসে চলে এলাম। গাড়িটি কেনার পর থেকে তাকে নৌকো ভাবতেই বেশি ভালো লাগে। আর যে কোনো ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনার স্মৃতিকে স্বপ্ন বলে ভ্রম হয়। কেনো যে এমন মনে হয় জানি না! তবে আমার ঠাকুরদার একটা ছোটো ডিঙি নৌকা ছিল দেশের বাড়িতে- ঠাকুরমার মুখে শুনি। ঠাকুরদাকে আমি দেখিনি। তবে মাঝে মাঝে কল্পনায় আসে একটি নদীঘেরা গ্রাম। বর্ষাকালে উঠানে হাঁটুজল। দাদু নৌকোয় বসে মাছ ধরে। ‘ইচ্ছা হইলে ঢাকা শহরে কামে যাইত। ইচ্ছা হইলে যাইত না- নাও নিয়া বাইরইয়া পড়ত।’- কথাগুলো বলার সুরে বিরক্তি ঝরে পড়লেও দীর্ঘশ্বাস লুকোতে পারে না আমার ঠাকুমা। আচ্ছা দাদু কি মৃত্যুর পরেও নৌকো চালান? যদি তাই হয় তবে তো সে নৌকো নিয়ে সব জায়গায় যেতে পারবেন। পাহাড়েও! আমিও মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি নৌকো নিয়ে হিমালয়ে চলে গেছি ঈশ্বরের খোঁজে।

রাস্কিন বন্ডের সঙ্গে দেখা হতে পারে এই ভেবেই হোটেল নিয়েছিলাম ল্যান্ডরের কাছাকাছি। যে পাহাড়ে আমাদের হোটেল তার উল্টোদিকের পাহাড়ের শিরদাঁড়ার একপ্রান্তে দেখা যাচ্ছে সেই আইভি কটেজ। নেট ঘেঁটে আগেই সেই ঠিকানা জেনে নিয়েছিলাম। এত জনপ্রিয় ও ভালবাসার সৃষ্টিকর্তা যে আমার ঘরের কোণেই চুপটি করে বসে আছেন ভাবতে অবাকই লাগে। হরিদ্বার থেকে মুসৌরির দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিমি। আর মুসৌরি থেকে ৮ কিমি পুব দিকে গেলেই তার যমজ শহর ল্যান্ডোর। সেদিন পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে গিয়েছিল। পরদিন সকাল নটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম হোটেল থেকে সবাই। দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছেও গেলাম আইভি কটেজের সামনে। নৌকার গলুইয়ের মতো বাড়িটির দুপাশে দুটি রাস্তা উঠে গেছে লালটিব্বা ভিউ পয়েন্টে। কিন্তু বাড়ি কোথায়? এ তো একটি তিব্বতি সরাইখানা। নাম ডোমা’স ইন! দেয়ালে তিব্বতি সংস্কৃতি ও বৌদ্ধধর্মের নানা রংবেরঙের চিত্রকলা অঙ্কিত বাড়িটি অনেক দূর থেকেই নজর কাড়ে। ডোমাস ইনের পিছনেই সাদা চুনকাম করা ছিমছাম একটি তিনতলা বাড়ি। জানালার বর্ডার ও টিনেরছাদ মেরুন রঙে রাঙানো। বাড়িটির অন্য পাশ দিয়ে রাস্তা থেকে পাহাড়ের গা ঘেঁষে সরু একটি সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়।

জানা ছিল মুসৌরির ম্যাল রোডের কেমব্রিজ বইয়ের দোকানে প্রতি শনিবার বিকেল ৪ টে থেকে ৬ টা পর্যন্ত রাস্কিন বন্ড পাঠক ও টুরিস্টদের সঙ্গে সময় কাটান। উৎসুক ও মুগ্ধ পাঠকেরা তাঁর অটোগ্রাফ নেয়, তাঁর সাঙ্গে ছবি তুলে ঈশ্বর দেখার মতো আনন্দ পায়। শৈশব ও কৈশোর থেকেই যার গল্প পড়ার পর চারপাশের চেনাজানা জীবন ও চরিত্রগুলিও যেন সেই গল্পের মতো লাগতে শুরু করে। চারপাশের অকিঞ্চিৎকর মানুষের জীবনও কত সুন্দর, কত মায়াময় হয়ে ওঠে তাঁর বই পড়ার পরে। মুসৌরি ও দেরাদুন হয়ে ওঠে পাঠকের স্বর্গ ও স্বর্গের দ্বার। এমনই সুন্দর ও সহজ অথচ কত গভীর শব্দ দিয়ে গড়া তাঁর সাহিত্যের জগৎ! এমন এক ধ্রুপদী লেখকের সান্নিধ্য পেয়ে পাঠকেরা আত্মহারা হবেন এটাই স্বাভাবিক। মনে পড়ে যেদিন পৌঁছলাম দিনটি ছিল রবিবার। সন্ধেবেলা ম্যাল রোডে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পেলাম দোকানটি। সামনে বড় একটি ব্যানারে রাস্কিন বন্ডের ছবি। দোকানটির যে র‍্যাকে তাকাই শুধু রাস্কিন বন্ডের বই। সর্বাগ্রে জ্বলজ্বল করছে রাস্কিন বন্ডের আত্মজীবনী ‘Lone Fox Dancing’! এক বছর আগেই বেরিয়েছে। এদিকে শিখা আগামীকাল আমার জন্মদিনের জন্য একটি পছন্দসই গিফট খুঁজছিল। বইটি দেখেই বললাম এটি আমায় গিফট দেবে? দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম লেখকের অটোগ্রাফ পেতে পারি কিনা। দোকানদারের বই বিক্রি দিয়ে কথা। অটোগ্রাফ তো উনি বিক্রি করেন না। তবু সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন কাল একবার ওনার বাড়ি চলে যান বইটি নিয়ে অটোগ্রাফ পেয়ে যাবেন। মনে মনে ভাবছি, ওনার মতো লেখক কি বিনা অ্যাপেয়ন্টমেন্টে দেখা করবেন? তাও আবার আমার সঙ্গে? আচ্ছা ওনার ফোন নম্বরটা দিন না! দোকান মালিক ফোন নম্বর দিতে চাইছেন না। বলল ফোন করার দরকার নেই উনি এমনিই দেখা করেন। সকালের দিকে চলে যাবেন। শেষে জোরাজুরি করাতে একটি ল্যান্ডফোনের নম্বর দিলেন।

সিঁড়ির বাইশটি ধাপ উত্তরণের পর যে ঘরটির সামনে এসে দাঁড়ালাম তার দরজায় কাঠের ফলকে লেখা রাস্কিন বন্ড, নিচে রাকেশ, বীণা। বিগত চল্লিশ বছর ধরে এই বাড়িতেই থাকেন রাস্কিন বন্ড তাঁর পরিবারের সঙ্গে! রাস্কিনের জন্ম হিমাচলের কসৌলিতে হলেও প্রায় ৬৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেরাদুন ও মুসৌরিতেই কাটিয়েছেন। যদিও যৌবনের প্রথমদিকে ভাগ্যসন্ধানে বছর তিনেক ইংল্যান্ডে ও পড়ে ফিরে এসে চাকুরিসূত্রে দিল্লীতে চার বছর কাটান। শেষে চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে সমস্তরকম উচ্চাশা ত্যাগ করে শুধু লেখালেখিকেই আঁকড়ে ধরতে চাইলেন। সব ছেড়ে পালিয়ে গেলেন হিমালয়ের নির্জনতায়। ১৯৬৩ থেকে পাকাপাকি ভাবে থেকে গেলেন মুসৌরিতে। সঙ্গী শুধু এক বালক, প্রকৃতির নির্জনতা আর সেই নির্জনতা ভঙ্গকারী টাইপরাইটারের শব্দ! সবুজ দরজাটির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবছি ডোরবেল বাজাবো কিনা। ৮৫ বছরের রাস্টি হয়তো তার ছাদের ঘরে বসে কোনও গল্পের প্লট ভাবছেন। অথবা অতীতের স্মৃতিচারণায় মগ্ন। আবার ডোরবেলের কর্কশ শব্দে তার মগ্নতা ভেঙে না-যায়! যদি বিরক্ত বোধ করেন? 

সেই ভেবেই স্ত্রী শিখা ও আমাদের দুই সন্তানকে সঙ্গে আনিনি। ওদের নীচের রেস্টুরেন্টে অপেক্ষায় রেখে এসেছি। ডোরবেল না বাজিয়ে দরজায় কান পাতি যদি তাঁর টাইপরাইটারের খটাখট শব্দে কোনও গল্পকথা ভেসে আসে। না তাও আসছে না। নার্ভাস আঙুলে আলতো করে দরজায় টোকা দিলাম। কেউ শুনতে পেল কি? না। মৃদু আওয়াজে ডাকলাম মিঃ বন্ড বাড়ি আছেন? মিঃ বন্ড শুনতে পাচ্ছেন! আমি একবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই! না কেউ শুনতে পেল না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বাইশটি ধাপ গুনে গুনে আবার নিচে নেমে এলাম। এবার হয়তো আর সাক্ষাৎ হল না। মোবাইল বের করে রাস্তা থেকে বাড়িটির কয়েকটি ছবি তুলে রেস্টুরেন্টের দিকে ফিরছি এমন সময় দেখি একজন বাড়িটির দিকে আসছে। লোকটি কি এই বাড়ির কেউ? নাকি কোনও কাজে এসেছে? জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলাম তিনি স্থানীয় পৌরসভার সাফাই কর্মচারী। বাড়ি বাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করা ও সাফাই করা তার কাজ। রাস্কিনের বাড়িতেই যাছে সাফাইয়ের কাজে। এই তো সুযোগ। লোকটিকে অনুরোধ করে যদি বাড়ির কারোর সঙ্গে কথা বলা যায়। কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারলাম লোকটি মদের নেশায় একটু মাতাল হয়ে আছে। গুরুত্ব দিয়ে তার নামধাম সাকিন ঠিকানা জানতে চাইতেই রাস্তার ধারে নিয়ে আমার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলো। নাম মুকেশ। আদতে বিহারের বাসিন্দা। তবে ছোটবেলাতেই কাকার সঙ্গে মুকেশ চলে আসে মুসৌরি রোজগারের উদ্যেশ্যে। তারপর এখানেই সংসার পেতে ছোটো একটি ভাড়াবাড়িতে বাস করছে। ছোটখাটো কালো দেখতে মুকেশের চেহারায় বেশ একটা পরিপাটির ছাপ আছে। ব্যাকব্রাশ করা চুলে তেলের গাঢ়তা চিকচিক করছে। তবে পরনের সবুজ টিশার্টটি ওদের ইউনিফর্ম। শেষে ওর কাজের কথা ভুলে আমাকে রাস্কিনের সঙ্গে দেখা করানোর জন্য যেন পণ করে বসল। 

আমাকে নিয়ে গেল বাড়িটির নিচের তলায় একটি অপ্রচলিত ছোটো দরজার কাছে। সেখানে ডোরবেল টিপতেই যে লম্বা মতন তরুণ বেরিয়ে এলেন দেখে তাঁকে রাকেশ বলেই মনে হল। আমার আসার কারণটি জানতে চাইল। তারপর স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বলল‘রাস্কিন তো এখন বাড়ি নেই।’ আমি বুঝতে পারলাম একজন সাধারণ দর্শন প্রার্থীকে এড়িয়ে যাবার সবচেয়ে সহজ পন্থাটিই আমার উপরে প্রয়োগ করেছেন তিনি। তাঁকে অনুরোধ করে বললাম যে ওঁনার একটি অটোগ্রাফ নিয়েই চলে যাবো। সে বলল ঠিক আছে আমাকে বইটি দিন আমি অটোগ্রাফ নিয়ে আসছি। ‘মিঃ রাকেশ বহুদূর থেকে এসেছি আমি শুধু ঈশ্বরতুল্য প্রিয় লেখকটিকে একবার নিজের চোখে দেখব বলে। বাংলা থেকে এসেছি কাল। আগামীকাল চলে যাবো হরিদ্বার। বাড়ির দোরগোড়ায় এসেও যদি দেখা না করে ফিরে যাই খুবই মনখারাপ হয়ে যাবে।’ অগত্যা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে একটি ইমোশনাল পরিবেশ সৃষ্টি করতেই হল। মুহূর্তক্ষণ চেয়ে থেকে সে বলল আচ্ছা দাঁড়ান, আমি একবার জিজ্ঞেস করে আসছি। কিছুক্ষণ বাদেই রাকেশ এসে বলল ‘বাইরের সিঁড়িটি দিয়েই দোতলার ঘরে চলে আসুন। তবে পাঁচ মিনিটের বেশি সময় নেবেন না।’ আহ্‌! কি স্বস্তি যে পেলাম।

অতি সাধারণ অপরিসর এক ড্রয়িং রুম থেকে একটি কাঠের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে তিনতলায়। সিঁড়ির নিচে একপাশে একটি ছোটো আলমারি ভর্তি বই। দুয়েকটি ছোটো টেবিলেও বই ও পত্রপত্রিকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আলমারিটির উপরে একপাশে বাগ্‌দেবীর ছবি, পাথরের একটি বুদ্ধমূর্তি, তারপর ভগবান বালাজির ছবি, আর পিছনের দেওয়ালে পূর্ণিমা রাতে নৃত্যরত একটি লাল রঙের পাহাড়ি শিয়ালের অপূর্ব ছবি। আর আলমারির সামনে একটি সোফায় যিনি বসে আছেন তিনি ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের সম্রাট রাস্কিন বন্ড। অনেক পাঠকের কাছেই তিনি দেবতা স্বরূপ। তবে আমার মনে হল দেবতা নন যেন একটি দেবশিশু বসে আছেন। জামনগর এস্টেটের গৃহশিক্ষকের সেই চার-পাঁচ বছরের দুষ্টু, গোঁয়ার শিশু সন্তানটি যার মনে চারপাশের সম্বন্ধে শুধু প্রশ্ন আর প্রশ্ন ছিল সেই শিশুটিই বিগত ৭০ বছর ধরে একের পর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি করে গেছেন। বিস্ময় তাঁর গল্পের মধ্যে নয়, কাহিনির মধ্যে নয়, বিস্ময় তাঁর গল্প বলার ভাষায়, তার সহজতায়। আজ তাঁর মনে আর সেই জিজ্ঞাসা নেই তার মানে এই নয় যে ফুরিয়ে গেছে। ছোটো চঞ্চল একটি পাহাড়ি ঝরনা ৮৫ বছর ধরে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বইতে বইতে যেন এক সাগরে এসে নিজেই সাগরে পরিণত হয়ে গেছে। সেই গভীরতা সেই তরঙ্গের ঘাত আমরা বাইরে থেকে বুঝতে পারব না। তাঁর সাহিত্যপাঠের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আমরা সেই ঘাত প্রতিঘাত অনুভব করি। একটি অতি তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর জীবনেরও যে সব মানবিক অনুভূতি- বেদনা, বাসনা, দ্বিধা,দ্বন্দ্ব,কিছু হারিয়ে ফেলবার ভয়, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা সব, সব এই মহাজীবনের হৃদয়ে, তাঁর দেখার মধ্যে, তাঁর লেখার মধ্যে সমাহিত হয়ে আছে। শুধু অনুভবি পাঠকই নন, অতি সাধারণ পাঠকও সেই অনুভূতির তরঙ্গকে তার গভীরতাকে ছুঁয়ে ফেলতে পারে। 

-ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

-আসলে সে সম্পর্কে আমি ভাবিনি কখনও। 

যে সারাজীবন ধরে ছোটো, বড়, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে শুধু মানুষের জীবনকে দেখে গেছে, তাদের হৃদয়ের কথাগুলি ভেবেছেন তাঁর আর ঈশ্বরের কথা ভাববার প্রয়োজন কী!

লেখা প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা বলি। সেদিন আমার সাত বছরের কন্যা সৃজা পাশের আবাসনের তার সমবয়সি একটি বাচ্চার সঙ্গে ক্লে দিয়ে মূর্তি বানিয়ে খেলছিল। বাচ্চাটি একটি চারহাতওয়ালা গণেশের মূর্তি বানাতেই সৃজা প্রশ্ন করল চার হাত কেন ওঁর? বালিকাটি বলল গনেণেশজি ভগবান, তাই ওঁর চারটি হাত। উত্তরে সৃজা সন্তুষ্ট হতে পারল না। সে তার খেলার সঙ্গীটিকে বোঝানোর চেষ্টা করল। বলল যে-- ভেবে দেখ ভগবান নিজে যেমন হবে সে মানুষকেও তো ঠিক তেমনই বানাবে। তাহলে মানুষের দুটি হাত হলে ভগবানের চারটি হাত কেমন করে হতে পারে?

কথাটি ভীষণভাবে আমাকে ছুঁয়ে গেল। আর এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আজ রাস্কিনের সেই মতামতটির সারমর্ম আমি টের পাচ্ছি।

খুব সাধারণ কথাবার্তাও হয়েছিল আমাদের মধ্যে সেদিন। সাহিত্য নিয়ে। আমি যে বাঙালি ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে একটু আধটু চর্চা করি সেটা জানতেই রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ এলো। নিজেই জানালেন তাঁর প্রিয় লেখকদের মধ্যে রবিঠাকুর অন্যতম। ইংরেজি অনুবাদে তিনি পড়েছেন রবীন্দ্র সাহিত্য। চাকুরীসূত্রে হরিদ্বারে থাকি জেনে হরিদ্বারের প্রসঙ্গও এলো। বিশেষ করে এখানকার ফরেস্ট ও লেপার্ডের কথা। তবে তিনি যে লেপার্ডের কথা বলেছিল সেগুলি নিশ্চয়ই একপ্রকার নিরীহ ও মানুষের প্রতি অহিংস ভাব পোষণ করতো। অনেকটা তাঁর গল্পের মতো। কিন্তু আমাদের এই সাক্ষাৎকারের ছয়মাস পরেই আমার সেই ভুল ভেঙে যাবে। আমাদের ভেলের আবাসিক এলাকার মধ্যেই যখন দু’দুটি মানুষ লেপার্ডের আক্রমণে শুধু ক্ষতবিক্ষতই হবে না, অভাবনীয় ভাবে তারা সেই লেপার্ডটির শিকারে পরিণত হবে। আর আবাসিকদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টিকারী সেই চিতাটি (একটি না হয়ে দুটি ঘটনায় দুটি ভিন্ন ভিন্ন চিতাও হতে পারে) উত্তরাখণ্ড সরকার দ্বারা মানুষখেকো উপাধিতে ভূষিত হবে এবং মাস চারেকের মধ্যেই বনবিভাগের দ্বারা ভাড়া করা শিকারির গুলিতে সেটির মৃত্যু হবে। যাইহোক এই বন ও বন্যজন্তুদের প্রতি তাঁর অকৃত্তিম সনহানুভুতির কথাও আমরা পড়েছি। 

আধুনিক উন্নয়নের ফাঁদে পড়ে হরিদ্বার-দেরাদুন-মুসৌরির কত কত বনাঞ্চল পাকাপাকি ভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে আমরা জানি। রাস্কিন কিন্তু সেই উন্নয়ন মেনে নিতে পারেননি। নতুন নতুন রাস্তাঘাট ও নানা পরিযোজনার জন্য যে লক্ষ লক্ষ গাছ কাটা গেছে, যেসব হাজার হাজার পাখি ও বন্যজন্তুরা গৃহহারা হয়েছে তাদের কান্না, হাহাকার রাস্কিনের লেখায় ফিরে ফিরে এসেছে। আজও তাঁর নিশ্চল (নাকি ছলছল) চোখদুটি মনে করে বুঝতে পারছি সে কতটা বেদনার্ত হয়ে পড়েছিল সেই হারিয়ে যাওয়া দৃশ্যগুলি মনে করে। যতই সে বলুক যে এই দীর্ঘ জীবনের প্রতি তাঁর কোনও অভিযোগ নেই তবুও আমার বারবার মনে হয় এই বন, এই পাহাড়, তার ঝরনা, এখানকার পশুপাখি, সঞ্চরণশীলমেঘ-বৃষ্টি-কুয়াশা-ছায়া-রোদ প্রকৃতির এইসব কিছুই এখানকার মানুষের মতই তাঁর জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আর এই অংশে যখন যখন লোভী সমাজ তার করাল হাত বাড়িয়েছে তখনই সে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কাটা পড়া গাছেদের কান্না, বাসাহীন পাখিদের ছটফটানি, গৃহহীন পশুদের ভয়ার্ত চাহনি, কুয়াশার চলমানহীনতা, রোদের পাগলামি, ছায়ার অন্ধকার আর বৃষ্টির প্রতিশোধ তার লেখার চরিত্র হয়ে উঠেছে। গোঁয়ার রাস্টিও যেন প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে এই নোংরা ও বদ উপায়ে প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী সমাজের প্রতি। 

সেই জন্যই কি ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ও বেস্টসেলার লেখক হয়েও টাইপরাইটার থেকে কম্পিউটারে, ল্যান্ডফোন থেকে মোবাইলে (স্মার্ট ফোনের তো কথাই নেই) আর হাত বাড়াননি তিনি? মাত্র সতেরো বছর বয়সে যে ছেলেটি ভাগ্য সন্ধানে বিলেতে গেল, উন্নত ভবিষ্যতের হাতছানি উপেক্ষা করে তিন বছর পরে সে একপ্রকার পালিয়ে এল নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসার টানে। তারপরে আবার মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সেই দিল্লির সম্পন্ন চাকরি ছেড়ে দিলেন পাকাপাকিভাবে। আশ্রয় নিলেন পাইন, ওক, স্প্রুস, ম্যাপল বনে ঘেরা মুসৌরির একটি নির্জন কটেজে (১৯৬৩ সাল নাগাদ যখন রাস্কিন পাকাপাকিভাবে মুসৌরিতে থাকতে এনেল তখন ম্যাপলউড কটেজের একটি রুমেই প্রথম ভাড়া থাকতেন)। এহেন রাস্কিন বন্ডকে ভারতের ভূমিপুত্র বলতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা কিংবা সংকোচ নেই। অথচ তাঁকেই ভিন্ন ধর্মের ও বিদেশি বিচার করে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, কোণার্কে বিদেশিদের জন্য ধার্য অতিরিক্ত প্রবেশ শুল্ক আদায় করে তবেই দর্শন করতে দেওয়া হয়। হায় রে আমার ভারতবর্ষ!

সেই জন্মদিনটিতে যে আবেশ নিয়ে ফিরেছিলাম তার সুগন্ধ সারাজীবন আমাকে সুবাসিত করে রাখবে। একটা স্বপ্ন থেকে ছবি,সেই ছবি থেকে বৃষ্টি! ঘর ভেসে যায়। ভেসে যাচ্ছে কাগজের নৌকা। আমি কি তুলে নেব? আমি কি ভেসে যাবো এতে আরোহণ করে আরও উপরের দিকে? নাকি এখান থেকেই নামতে শুরু করবো ঘরের দিকে! একটা সংক্ষিপ্ত অথচ মহাবিস্ফোরণকারী আলাপ থেকে আমি হাঁটা শুরু করি একলা নিঃসঙ্গ পথে। এর আগে তিন তিনটি সফরেও যে শহর আমার কাছে রুক্ষ হয়ে ছিল। আমার অতীত গল্পের কাছে ধূসর প্রতীতি হয়ে ছিলো সে শহরের এক গোপন সুড়ঙ্গ আমি খুঁজে পেয়েছি। যার মাধ্যমে সেই অতীতের সাথে যোগসূত্র গড়ে তুলতে পারি। এদিকে ঝরনার পাগলামি এসে ধুয়ে মুছে দিচ্ছে এর নাগরিক কোলাহল। আমি ট্রাফিক জ্যাম থেকে মুক্ত হয়ে প্রাচীন ঘণ্টাঘরের ধ্বনির কাছে ঋণী হতে যাব এবার। ফেলে আসা প্রিয়তমা আমায় বাঁধা দিও না। এক সূর্যোদয় থেকে আরেক উদয়ের দিকে যাচ্ছি আমি। আকাশ কি খানিকটা মেঘম্লান! হোক না। ভালোবাসার মেঘ জমলে তো ভালোই। ভালোবাসায় দূরত্বও অনির্বচনীয়। শৈশব থেকে আমার মণিমাণিক্য তুলে এনে তারুণ্যকে সাজিয়ে তুলতে পারবো। রাস্কিন বন্ড নামের এক নক্ষত্র থেকে যে কিরণ আমাকে স্পর্শ করে গেল তার শিহরণ আজীবন থেকে যাবে। আর যে পাহাড় এই নক্ষত্রের আলোতে উদ্ভাসিত সেই পাহাড় যেন নতুন বর্ণে, গন্ধে খুলে যাচ্ছে তার অগুনতি ভাঁজ নিয়ে। এইতো একটা ভাঁজ খুলতেই একটি পাইন বনের টিলা। নাম পরি টিব্বা! ওটাই কি এ অঞ্চলের খাণ্ডব বন? পরিত্যক্ত পোড়া একটি গৃহের অবয়ব দেখা যায়। ভিন্ন ভিন্ন জাতের একটি কিশর-কিশোরী সমাজে তাদের ভালোবাসার স্বীকৃতি না পেয়ে চলে গেছে অভিমানে সেই নির্জন টিলার দিকে নতুন সমাজ গড়বে বলে। ওইতো শোনা যাচ্ছে ওদের গোঙানি! এটা কি ওদের মিলনের শীৎকার নাকি দহনের চিৎকার ধ্বনি!

ওই তো আরেকটা ভাঁজ খুলতে খুলতে পথের দাবিতে কাটা পড়ে যাওয়া এপ্রিলের ওক সেজে উঠছে তার নতুন পাতা নিয়ে, ম্যাপলের পাতাগুলিতে সবুজ রং ধরেছে, মধুলোভী ভ্রমরেরা আবার গান গাইছে- রডোডেনড্রন, রডোডেনড্রন...! এ মুসৌরির ছবিতো আগে কখনও দেখিনি আমি। ঘন বন তার ফাঁকফোকরে ধরে রেখেছে ফালি ফালি পূর্ণিমা আলো। ম্যাজিক, ম্যাজিক বলতে একটি একলা হয়ে যাওয়া শেয়াল নেচে উঠল! নাচছে এখনও। আমি আড়াল থেকে দেখছি আর গাছেদের ছায়া হয়ে তাকে অনুকরণ করতে করতে নিচের রাস্তা ধরে একটি বাংলো মতন বাড়ির সামনে এসে পড়লাম। এটাই কি ম্যাপলউড কটেজ! তার একটি রুমের ভিতরে টাইপরাইটারটি কি আগে থেকেই সাজানো ছিল?

খটাখট খটাখট শব্দে এ শহরের যানবাহনের কর্কশ শব্দ, নাগরিক কোলাহল, সব মিলিয়ে যাচ্ছে শীতল বাতাসে। 

এবার ঠিক আমি সেই নিঃসঙ্গ শেয়ালের নাচের একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে পারব। 


গতরাতে ঘরের পথে হেঁটে যেতে যেতে 

দেখলাম, একটি শেয়াল একা 

নৃত্য করছে চাঁদের আলোয়।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, বুঝলাম

এই রাত্রিটি একান্তই তার, তারপর  

চেনা নিচু রাস্তা ধরে নেমে গেলাম।

সকালের শিশিরের সঙ্গে যদি কখনো 

সঠিক তালে শব্দ বেজে ওঠে 

আমিও নেচে উঠি নিঃসঙ্গ শেয়ালের মতো!


(লেখকের অনুবাদে রাস্কিন বন্ডের কবিতা)

---------------------------------------------------------

রাস্কিন বন্ডের ছবি এঁকেছেন অতনু দেব

Monday, November 23, 2020

নির্মল হালদারের গদ্য


পানিপাথর

ওষুধত লাগবেকেই--

পকা লাগে। ওষুধ দিতেই হবেক।


পীযুষের কথা শুনে চেয়ে আছি লকলকে বাঁধা কপি ফুল কপির দিকে।

পালং শাকের জমিতে ফড়িং

উড়ছে। 

আকাশেও মেঘ। এই হেমন্ত দিনে বৃষ্টি হলে পাকা ধানের ক্ষতি। 

প্রকৃতির সঙ্গে কে কবে আর পেরে উঠেছে! বৃষ্টি এলে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা মানব জগতের নেই।


পীযূষরা প্রকৃতির সঙ্গে থেকেও প্রকৃতিকে সব সময় বুঝে উঠতে পারে না। মাটিকেও বোঝে না। যে মাটিতে লাগিয়েছিল বেগুন

দেখা গেল গাছগুলো বেড়ে উঠতে উঠতে মরে যাচ্ছে। কি কারণ?

পরীক্ষা করাতে হবে মাটি। প্রভাস জানালো আমাদের।

ব্লকে কৃষি বিভাগের একটি শাখা আছে। সেইখানে মাটি নিয়ে গেলে, পরীক্ষা করে দেবে। তারপর বলেও দেবে,

এই মাটিতে কি হবে কি হবে না।


মুশকিল হল, এই তথ্য অনেক চাষি জানে না। অনেক সময় তো তাই, চাষ করে ও নষ্ট হয় বীজ। শ্রম ও টাকা জলে চলে যায়।


আমি এসেছি। চাষী ঘরে এসেছি। আমি যদিও এখানে খুব বেমানান পোশাকে আশাকে। কথাবার্তায়। আচরণে। তবুও এসেছি। কেননা, এইসব চাষীদের ঘরে

প্রাণের সম্ভার। সতেজ সজীব

প্রাণ।

কি পরিশ্রমটা করে এরা, না দেখলে না জানলে বোঝা যাবে না।

পীযূষ বিএসসি পাশ করে চাকরির পড়াশোনার ফাঁকে

বাপ ঠাকুরদার চাষবাসেও 

তার মন।


সাধারণত আজকাল দেখা যাচ্ছে, মাহাতদের অনেক তরুণ পড়াশোনা করে চাষের দিকে আর যায় না। ফলে, বাপ ঠাকুদ্দার চিন্তা হয়, তাদের অবর্তমানে চাষবাস আর হবেনা। আকাল দেখা যাবে।

ক্রমশ সংখ্যাটা বাড়লে, ভবিষ্যতে চাষবাস আর হবেই না, এই উদ্বেগ কাজ করে।


পীযূষ চাকরির পরীক্ষার জন্য অংক যেমন জানে তেমনি পালং পাতায় পোকা লাগলে 

দেখতে পায়। প্রতিকার করেও থাকে।


আমাকে ঘরের শাকসবজি দেবে বলে, নিয়ে এলো হাঁসুয়া।

একটার পর একটা ফুলকপি

বাঁধা কপি কাটতে থাকে।


আমার চোখে পড়ে টমেটো ক্ষেত। নীল লাল রঙে নিজেদের সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


কাছে যাবার সাহস মানে, জোর করে কাছে যাবো। কিন্তু গেলাম না। পীযূষকেই বললাম, কয়েকটা টমেটো দিস।


আমাদের ঘরে টমেটো পোড়ানা হয়ে থাকে। সঙ্গে নুন

কাঁচা লঙ্কা পেঁয়াজ। ভাতের সঙ্গে খুব সুস্বাদু।


রাঁধনাশাল থেকে মাছ ভাজার গন্ধ আসছে। তুষারের ন মাসের গর্ভবতী বউ ভাজছে।

 মাছ ভাজার গন্ধে খিদে চাগিয়ে উঠলেও মনে মনে স্থির করেছি, খাব না। ভাত খেয়ে আবার যাওয়া, বেশ ক্লান্তিকর। অন্যান্য সমস্যাও দেখা দিতে পারে।


তুষার ও পীযূষ এবং তাদের বাবাকে বললাম, খাওয়াটা বড় কথা নয়। এই যে আমি এসেছি, সবাই কথা বলছি। এইতো ঢের।


সকলের আন্তরিকতা টের পাচ্ছি ভেতরে ভেতরে, এই কথা বললাম না আর। শুধু বলবো, গ্রামের নাম পানিপাথর পরাবাস্তব পরাবাস্তব লাগলেও  পানিপাথর খুবই বাস্তব। খুব জ্যান্ত।


এই জ্যান্তর পাশেই আমিও

জ্যান্ত থাকতে চাই। আসতে চাই সময়ে অসময়ে।


আমার বন্ধু প্রভাস মাহাতর শ্বশুরবাড়ি হলেও আমার আত্মীয় বাড়ি তো বটেই। যেখানে আমি শুনতে পেয়েছি, ন'মাসের গর্ভ থেকে

এক সন্তান আমাকে বলছে,

আবার আসবে-- আসবে।


৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

২১-১১-২০২০


রচনা করেছি শয্যা


আমি বরাবর মেঝেতে শুই। মেঝেতেই আমার লম্বা-চওড়া বিছানা। এবং আমি বিছানার একধারে শুয়ে থাকি।

          বিছানাতে গড়াগড়ি খাওয়া আমার অভ্যেস নেই। আমার বালিশ থেকে অনেকটা তফাতে আরেকটা বালিশ। কোনো মানে নেই। অথচ মানে আছে। মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে যদি দেখি, কেউ শুয়ে আছে।

           আমার মনের বুনন এ রকমই। শুয়ে থাকবে যে তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে তাকে নিয়ে চলে যাব ছাদে। উপর থেকেই তো উপরে ওঠা যায়। কি পূর্ণিমা কি অমাবস্যা

চাঁদ আমাকে ডাকে। 

           চাঁদ না বলে বলা ভালো চাঁদের বুড়ি।অনন্তকালের সম্পর্ক। চাঁদের বুড়ি চরকা চালায়। তার সুতো এত সূক্ষ্ম ও সুন্দর কোনোদিন ছিঁড়বে না।

            সম্পর্ক ছিঁড়বে না।

            কে আসবে বিছানায়? মাঝ রাতে তাকে ডেকে তুলবো? যে কেউ এলে চলবে না। বিশেষ বিশেষ মানুষ আছে আমার তালিকায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এলে, রাতভর বৃষ্টি। বৃষ্টির রঙ কি হবে? এও চিন্তার বিষয়। নীল হলে কেমন হয়? মেরুন রঙটা কেমন লাগে? রঙের দিকে না গিয়ে প্রেমের দিকে যেতে চাই।

প্রেমের গভীরতা মাপামাপি না করে, শুধু দেখবো প্রেমের আকর্ষণ কতদূর। 

             শুধু প্রেমে আমার বিশ্বাস নেই। কুল গাছে উঠবো আর পায়ে কাঁটা বিঁধবে না, তাহলে কুল আর পাড়লাম কই? রক্তাক্ত হতেই হবে।

             যখন কেউ আটা মাখছে তখন তার আঙ্গুলে ভেজা আটা লাগবেই। তবেই তো রুটি হবে সুস্বাদু। গরম গরম।

             না, আমার বিছানায় উষ্ণতা নেই। খড়ের বিছানায় শুতে পারলে উষ্ণতা পেতাম। একা শুলেও উষ্ণতা। কেন না, খড়ের অন্তর্নিহিত অর্থ , মায়ের ফেলে যাওয়া একটা অংশ। কেউ কেউ চুল বলে থাকে। তাই, খড় থেকে মায়ের ওম পাওয়া যায়।

             আমি কোনো ভাবেই চওড়া কপাল করে আসিনি। আমাকে বিছানা পাততেই হয়। বিছানা তুলতে হয়। সকাল হলেই যখন তুলছি তখন লক্ষ্য করি, কারোর কিছু পড়ে আছে নাকি। এই ভাবনা যে কত অবান্তর, নিজের কাছেই নিজে হেসে ফেলি। নীরব।

            বিছানা একাকীর নয়। অথবা বিছানা একাকীর। নিঃশব্দ। অনেকেই আছেন বিশেষ করে গ্রামের দিকে একা একা শুয়েও পাশে রাখেন একটা লাঠি। চোর তাড়ানোর জন্য। আমারও যে চোরের ভয় নেই এমনটা নয়। কিন্তু লাঠি রাখার কথা কোনোদিন ভাবি নাই। ঘুমের ঘোরে লাঠিতে পা পড়লে, যদি ভয় পাই? চেঁচিয়ে উঠি? হেসে উঠবে লাঠিও। মেনে নিতেই হয়েছে, নিজেরই দোষে একা একা বিছানায় আঁকিবুকি করবো।

              আমার লম্বা-চওড়া বিছানা দেখে কেউ কেউ জানতে চেয়েছে, এত বড় বিছানায় আর কে শোয়?আমি নিজেই যে ১ থেকে ১০০ হয়ে যাই, ক'জনকে আর বলবো। কিংবা আমি যে ১ থেকে শূন্য হয়ে যাই, বলতে চাই না কাউকে।

             সন্ধে হয়ে গেছে। আমি প্রতিদিনের মতো বিছানা পেতেছি। চারপাশে অসংখ্য চরিত্র আমার সঙ্গে কথা বলছে। সারাদিন পর ক্লান্ত লাগছে আমার। কিন্তু ক্লান্তিকে গ্রাহ্য করলে কিছুই যে করা যাবে না। আমার অনেক কাজ। অনেক কাজ বাকি আছে এখনো।


৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

২২-১১-২০২০

আলোকচিত্র: সন্দীপ কুমার

Saturday, November 21, 2020

অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়ের কবিতা


গুঁড়িপথ

এখানে সুপ্তিহীন নুড়িবিজড়িত এই ফাঁকা অন্তরীপে
অসত্য নেমপ্লেটে ওরা এসেছিল ভুয়ো জিপে...

দীপদা সন্ধেবেলা নীপাদির রাংতার টিপে
নিজেকেই দেখেছিল চন্দ্রাহত, আর
জ্যোৎস্না এসে জলে পড়ে
ছায়া হয়ে ঘিরে গেল তার,
অন্য ব-দ্বীপে!

কানাকানি বয়ে চলে
পাপড়ির সিড়ি ভেঙে, সারারাত
কালো টিউলিপে...

সঞ্চার

মাছির মতন ঘরে ঢোকে
অনাহুত, ফাঁকা এক বসন্তবাতাস,
আমি তাকে বহুদূর চলে যেতে বলি...

যেখানে চন্দ্রচোর দাগী কানাগলি
কোনও দিন হতে পারে তারার আকাশ...

Wednesday, November 11, 2020

পাপ ও শাস্তি: পুনরাবলোকন


সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়: 
দূরে কাছে, কেবলই ঘর ভাঙে। ঈশ্বরের বিকল্প হয়ে মানুষ পাপ করে আর সেই রক্তধারা বয়ে গেলে সময় সন্দিগ্ধ স্বরে প্রশ্ন করেছি: 'নদী, নির্ঝরের থেকে নেমে এসেছো কি, মানুষের হৃদয়ের থেকে?’ আমি একটি উপন্যাস নিয়ে ভাবছিলাম। অনেকদিন পর সে লেখাটিকে আবার পড়া হল ব্যোমকেশ আর ফেলুদার কোলাহল ও কিচিরমিচিরের মাঝে। কি আশ্চর্য! আজ থেকে দেড়শ বছরেরও আগে প্রকাশিত হয় দস্তয়েভস্কির ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট। ১৮৬৬ সাল জুড়ে বারো কিস্তিতে লেখাটি ছাপা হয় পত্রিকার পাতায়। যে রুশ ছাত্রটি নেপোলিয়নের তরুণ দূত হিসেবে নিজেকে ভেবে একটি খুন করে, সে স্বছন্দে একটি গোয়েন্দা গল্পের জন্ম দিতে পারত। খুনের কাহিনী এত চমৎকার যে চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। কোনও সাক্ষ্য প্রমাণও ছিল না। তবু তরুণ রাসকলনিকভ কোনও সত্যান্বেষীর দ্বারা চিহ্নিত হয়নি বরং বিবেকের বোঝা বয়ে নিজেই সত্যান্বেষণ করে গেছে।

কি রুক্ষ, বন্ধুর, আর করুণ রঙিন পথে যে দস্তয়েভস্কি হেঁটেছিলেন! দ্যূতক্রীড়ায় সর্বস্ব হারিয়ে কুরু রাজসভায় যেমন যুধিষ্ঠির শেষ পর্যন্ত সত্যকেই পণ করেছিলেন, জুয়ার টেবিলে সর্বহারা দস্তয়েভস্কিরও কোনও বিকল্প ছিল না সত্যকে খুঁজে না পাওয়ার। এই উপন্যাস কোনও আখ্যান নয়, মানুষের পাপ-পুণ্য, চরম তীর্থযাত্রার একটি নিশ্চিত দলিল। শুধু গল্প লেখাই যদি দস্তয়েভস্কির উদ্দেশ্য হত তাহলে রচিত হতে পারত এক মনোরম চিত্রনাট্য। যেখানে মতাদর্শের নেশায় এক উন্মাদ যুবক পাপবিদ্ধ একটি কিশোরীকে অবলম্বন করে দুনিয়ার পাঠশালায় পড়তে যেতে চায়। এই চিত্রনাট্য সত্যি অনুনকরনীয়। কাহিনীতে বুদ্ধিজীবী মাতাল, স্নেহাতুর পিতা, নিরাসক্ত পুলিশ অফিসার ও দলিত কুসুমের মতো নারীকে দেখতে পাওয়া যায়। আধুনিক কোনও সিনেমার পক্ষে চূড়ান্ত আকর্ষণীয় এক চিত্রনাট্য। তবু যখন ত্রুফো হলিউডের সম্রাট হিচকককে ক্রাইম সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করেন তখন হিচকক সবিনয়ে মেনে নেন তাঁর অসামর্থ্যের কথা। কেননা হিচকক বুঝেছিলেন যে, এই গল্প আসলে সংস্কৃতির ধর্মশাস্ত্র। রাসকলনিকভকে শাস্তি দেওয়ার জন্য বাইরে থেকে আইনের কোনও প্রতিমূর্তি যেমন ডিটেকটিভ নিয়োগ করতে যায় না। রাসকলনিকভের সমস্যা মূলত নৈতিকতার, সে বিবেককে নির্বাসনে পাঠিয়েছে তা-ই সে একা, পরিত্যক্ত, যন্ত্রণাবিধুর। তাঁর শাস্তি যতটা অন্তরের ততটা আদালত ঘোষিত নয়। লোভ ও ক্ষমতা নিজেই নিজেকে যুগপৎ শিকার ও শিকারি ভাবতে পারে।

দার্শনিক এই মলাটটুকু বাদ দিলে অনেক সময়ই মনে হয় কাহিনীর ছিলা টান টান বুননই তো যথেষ্ট। উপসংহারের কোনও প্রয়োজনই নেই। অথচ আজ কখনও ধর্ম কখনও রাজনীতি বা অন্য কোনও যৌথ মতাদর্শের সামনে ভীত আতঙ্কিত মানুষকে দেখলে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করা যায় প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সে ক্রমাগত বন্দি হয়ে প্রাণহীন সত্তায় পর্যবসিত হয়েছে। মৃত্যুলোক থেকে তাঁর প্রত্যাবর্তিত হওয়া জরুরি।

কি বিধুর সেই অপরাহ্ণ যখন সনিয়া একটি সামান্য দেহ পসারিণী ও রাসকলনিকভ, একজন খুনি, বাইবেল থেকে নবকেস্টামেন্ট থেকে লাজারাসের গল্প পড়ে। যেন প্রতীচ্যের নচিকেতা যমলোক থেকে পুনরায় ইহজগতে নিষ্কলুষ ফিরে আসবে। ওই কিশোরীর শীর্ণ হাতে নিজের রক্তাক্ত হাত রেখে রাসকলনিকভ ভেবেছিল—’ যদি হায় জীবন পূরণ নাই হল মম তব অকৃপণ করে!’ নাহলে আর সে সনিয়ার মতো তুচ্ছ পতিতার পায়ের তলায় আছড়ে পড়ে বলবে কেন I prostrate myself not beofre you, but before all suffering humanity. রাসকলনিকভ তরুণ ছাত্র– সে নেপোলিয়ান হতে চেয়েছিল। তাঁর ধারণা ছিল সম্রাটের কোনও বাধন থাকে না, ক্ষমতা যে কোনও গণহত্যাকেও অনুমোদন দেয়। আর সে তো পাপিষ্ঠা এক সুদখোর মহিলাকে খুন করতে চাইছে সমাজের বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য। আর এই রাস্কলনিকভকে কত দেখা যায় সন্ত্রাসবাদে, জেহাদ, যুদ্ধে, আমরা ছোটবেলার ছাত্র আন্দোলনে এই খতমের রাজনীতি যে কতবার দেখলাম!

তবে কি দস্তয়েভস্কি বলতে চাইছিলেন আমরা অন্তিম মূল্য পেতে চাই প্রেমে? জানি না। কিন্তু ভাগ্যিস অপরাধ ও শাস্তির মতো মহাগ্রন্থ লেখা হয়েছিল। তাই দেড়শ বছর বাদেও দেখি হৃদয় অব্দি যায়নি ছুরি, থমকে আছে। সত্যের জ্যোৎস্না পাপের ডালপালার ফোকর দিয়ে মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে এঁকে দিয়েছে পুণ্যের কারুকাজ। অপরাধ ও শাস্তি আবার পড়ে মনে হল মাটির ধুলোবালি অশ্রু আর রক্ত ব্যবহার করে দস্তয়ভস্কি আমাদের বেঁচে থাকার গোঁড়ায় জল ছিটিয়ে দিয়েছেন।

---------------------------------------------------------

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর কয়েকটি বইয়ের নাম: স্থানাঙ্ক নির্ণয়, অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন, নাশকতার দেবদূত, হে চলমান চিত্রমালা, অন্যান্য ও ঋত্বিকতন্ত্র, পাতালের চিরকুট, বুনো স্ট্রবেরি, ইবলিশের আত্মদর্শন সম্পর্কিত, অনভিজাতদের জন্য অপেরা, দিনযাপনের উপাখ্যান। সম্পাদনা করেছেন কবি অনন্য রায়ের কবিতা সমগ্র। তাঁর অনুবাদগ্রন্থ: মাস্কুলা ফেমিনা, অরফি (জঁ ককতো), সাইলেন্স (ইঙ্গমার বার্গম্যান), পিয়েরো ল্যো ফু (জঁ লুক গোদার)। আজ ফিওদোর দস্তয়েভস্কির জন্মদিন উপলক্ষ্যে লেখাটি প্রকাশ করা হল।

Thursday, November 5, 2020

দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা


নিরন্ত হিংস্রতার রক্ত-- পুঞ্জ করা ফুলপত্রালির


নিরন্ত হিংস্রতার রক্ত-- পুঞ্জ করা ফুলপত্রালির 

লাবণ্যে ঘেরা দেয়া, রক্ত ফুটে না বেরোয়। সবুজের

ধক বাড়ছে ক্রমাগত, তেজ হয়ে উঠছে ফুলবাস--

নিরন্ত রক্ত কি চাপা পড়তে চায়? এত সংখ্যাহীন 

হিংস্রতা চারধারে, কত ফুলপাতায় চাপা দেবে তাকে?

শত অস্ত্র বেয়ে রক্ত যুঁজিয়ে পড়ছে সারাক্ষণ

বনোচ্ছেদ উৎসবের তালে তাল দিয়ে মাতোয়ারা।

ছোট একটা এলাকার সবুজ সুবাসের ঘোরে ঘোরে

ভাবছি তার লাবণ্যে বুঝি চাপা পড়তে চলেছে উগ্রতা!

ভাবছি হিংস্রতা ব্যর্থ হয়ে যাবে স্বভাবশান্তির

আলো লেগে! কিন্তু রূঢ় মেশিন বাস্তব দিনে দিনে

যেভাবে বাড়ছে ক্ষীণ সবুজও যে পুড়ে ছাই হয়ে গেল!

তাও সব ভুলে যাই তৃতীয়ার চকিত এককলা

সোনার চাঁদটার দিকে চোখ প'ড়ে গেলে সন্ধ্যাবেলা।


চলতে চলতে রাস্তা যেন লাফিয়ে উঠল ফ্লাইওভারে


চলতে চলতে রাস্তা যেন লাফিয়ে উঠল ফ্লাইওভারে--

পাঁচটা সাতটা কাটাকুটি দ্রুত পথ উপর তলায়

উড়াল দিয়েছে আকাশফুল পেড়ে আনবে ব'লে। দুধারি

বড়ো বড়ো হাসিমুখ হোর্ডিংয়ে বেজে চলছে মিডিয়া

যত দূর পথ যেন স্বচ্ছ আকাশের মধ্য দিয়ে...

মুক্ত পথ-- ভাইরাস উড়ছে না অমঙ্গল ডানা মেলে।

তাও থেকে থেকে আরো উড়াল দিয়ে উঠছে ফ্লাইওভার--

কুছোঁয়া না লাগে যেন তলাকার, যদিও তলাতে গিয়ে ফের

পড়তে হবে শহররাস্তায়, অনুপায়ে চলে যেতে হবে

রুগ্ন জনতার ঘেঁষাঘেঁষি... তবু চলতে চলতে

বারেবারে লাফিয়ে উঠছে পাঁচটা সাতটা উপর তলার

ফ্লাইওভার যেন স্বচ্ছ আকাশের মাঝ দিয়ে তার পথ।

দুধারি হোর্ডিংয়ে বেজে চলেছে মিডিয়া উচ্চগ্রামে--

রঙদার কথার তোড়ে আবছায়া হয়ে গেছে প্যান্ডেমিক..