Thursday, November 11, 2021

দি গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর | ফিওদর দস্তয়েভস্কি

অনুবাদ | মলয় রায়চৌধুরী

"একেবারে অসম্ভব", আইভান হেসে বলল, "ভূমিকাসহ আরম্ভ করি তাহলে, আমি ষোড়শ শতাব্দীর কবিতায় বর্ণিত ঘটনা উল্লেখ করছি, সে একটা যুগ ছিল বটে-- যেমনটা তোমাদের স্কুলে বলা হয়েছিল-- যখন কবিদের মধ্যে উচ্চতর  ব্রহ্মাণ্ডের অধিবাসীদের ও ক্ষমতাধরদের মর্ত্যে নামিয়ে আনার আর মরজগতের প্রাণীদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করাবার দুর্দান্ত ফ্যাশন ছিল... ফ্রান্সে  নোটারিদের কেরানিরা, আর পাঁচিল-ঘেরা মঠের যাজকরাও দুর্দান্ত অনুষ্ঠান, নাটকীয় অভিনয় করতেন, যাতে ম্যাডোনা, দেবদূতরা, সন্তরা, যিশুখ্রিস্ট, দীর্ঘ দৃশ্য গড়ে তুলতেন, এমনকি স্বয়ং ঈশ্বর আসতেন, তখন সবকিছুই ছিল শিল্পহীন আর আদিম। তার একটা উদাহরণ হতে পারে ভিক্টর হুগোর নাটক, 'নতরে দেম দে প্যারিসে যাতে', মিউনিসিপ্যাল হলে, ‘লে বোন জাজমেন্ট দে লা ট্রেস-সান্তে এত গ্রাসিউজ ভিয়ার্জ মারি’ নামে একখানা নাটক লুই একাদশের সম্মানে অভিনীত হয়েছিল, সেখানে ভার্জিন মেরি নিজে উপস্থিত হয়ে তাঁর 'শুভ আশীর্বাদ' দিয়েছিলেন। মস্কোতে, প্রিপেট্রিয়ান কালখণ্ডে, প্রায় একই চরিত্রদের অভিনয়, বিশেষ করে ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে নির্বাচিত, সকলের বেশ পছন্দ ছিল। এই ধরনের নাটকগুলো ছাড়াও, পৃথিবী ছেয়ে গিয়েছিল রহস্যময় রচনায়, 'ছন্দ-কবিতায়'-- যার নায়করা সর্বদা নির্বাচিত হত দেবদূত, সন্ত আর অন্যান্য স্বর্গীয় নাগরিকদের মধ্যে থেকে, যারা সেই কালখণ্ডের ভক্তিমূলক উদ্দেশ্যে সাড়া দিতে পারত। রোমান ক্যাথলিক যাজকদের মতন আমাদের সমাজ-বিচ্ছিন্ন মঠগুলো, নিজেদের সময় কাটাতো অনুবাদ, অনুলিপি এমনকি এই ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে মূল রচনা লেখায়, আর এটা মনে রেখো, ছিল তার্তারদের সময়কালে! ..এই প্রসঙ্গে, আমি কনভেন্টে সংকলিত একটা কবিতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি-- নিঃসন্দেহে গ্রীক থেকে অনুবাদ, যাকে বলা হয়, 'অভিশপ্তদের মাঝে ঈশ্বরের মায়ের পরিভ্রমণ', যার মধ্যে রয়েছে প্রসঙ্গ অনুযায়ী ছবি আর দান্তের চেয়ে নিকৃষ্ট চিন্তাভাবনা করার সাহস। 'ঈশ্বরের মা' নরক দেখতে যান, প্রধান দেবদূত মাইকেলকে সঙ্গে করে, যে ওনার পথপ্রদর্শক হিসাবে 'অভিশপ্তবাহিনী'কে দেখায়। মা তাদের সবাইকে প্রত্যক্ষ করেন এবং তাদের নানারকম নির্যাতনের সাক্ষী হন। নির্যাতনের অন্য অনেক অসাধারণ উল্লেখযোগ্য যন্ত্রণার মধ্যে— প্রত্যেক শ্রেণীর পাপীদের নির্ধারিত বিশেষ যন্ত্রণা—  লক্ষ্য করার যোগ্য, যেমন 'অভিশপ্ত' শ্রেণীর একটা দলকে ধীরে ধীরে গন্ধক ও আগুনের জ্বলন্ত হ্রদে চুবিয়ে দেওয়া হয়। যারা পাপ করে তাদের এত নীচে ডুবিয়ে দেয়া হয় যে তারা আর ওপরে উঠতে পারে না, আর ঈশ্বর তাদের চিরকালের জন্য ভুলে যান, অর্থাৎ তারা সর্বজ্ঞের স্মৃতি থেকে মুছে যায়, লেখা হয়েছে কবিতাটায়-- এক অসাধারণ চিন্তার গভীর অভিব্যক্তি, যদি তার নীবিড় বিশ্লেষণ করা হয়। ভার্জিন মেরি ভয়ঙ্করভাবে হতবাক, এবং ঈশ্বরের সিংহাসনের সামনে কান্নায় হাঁটু গেড়ে বসেন, এবং অনুনয় করেন যে নরকে তিনি যা দেখেছেন-- সবই, সমস্ত কিছু, ওদের শাস্তি মুকুব করে দেয়া উচিত। ঈশ্বরের সাথে তাঁর কথোপকথনটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ভার্জিন মেরি বলেন, তিনি কখনও ঈশ্বরকে ছেড়ে যাবেন না। ঈশ্বর তখন ভার্জিন মেরির ছেলের বিদ্ধ হাত ও পায়ের দিকে ইঙ্গিত করে চেঁচিয়ে ওঠেন, 'আমি কীভাবে ওনার জল্লাদদের ক্ষমা করতে পারি?' তিনি তখন আদেশ দেন যে সমস্ত সন্ত, শহিদ, দেবদূত এবং প্রধান দেবদূত, তাঁকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করবে যিনি একমেব ও অপরিবর্তনীয় এবং তাঁর ক্রোধকে দয়ায় পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ করবে-- ওদের সবাইকে ক্ষমা করুন। ঈশ্বরের সঙ্গে সমঝোতার পর কবিতাটি শেষ হয়, অনেকটা গুড ফ্রাইডে আর ট্রিনিটির মাঝের সময়টায় অত্যাচারের বার্ষিক অবকাশ, 'অতল গহ্বর' থেকে অভিশপ্তদের কন্ঠে ঈশ্বরের উচ্চ প্রশংসায় সমবেত গান, তাঁকে ধন্যবাদ দেওয়া আর এই কথা বলা:

আপনিই ঠিক, হে প্রভু, খুব সঠিক, 

ন্যায় বিচার করে আপনি আমাদের অভিশপ্ত করেছেন।

"আমার কবিতা একই চরিত্রের।" 

"এই দৃশ্যে, যিশুখ্রিষ্ট নিজে আবির্ভূত হন। সত্য, তিনি কিছুই বলেন না, কেবল উপস্থিত হন এবং দৃষ্টির বাইরে চলে যান। ক্ষমতা এবং মহান গৌরব নিয়ে আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার পর পনেরোটা শতক কেটে গেছে; তাঁর ভবিষ্যবক্তা চিৎকার করে একথা বলার পর, যে, 'প্রভুর পথ প্রস্তুত করো', পনেরোটা দীর্ঘ শতক কেটে গেছে!" যেহেতু তিনি  পৃথিবীতে থাকাকালীনই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, 'সেই দিন ও সময় কেউ জানে না, না, স্বর্গের দেবদূতরা নয়, জানেন কেবল আমার পিতা।' কিন্তু খ্রিস্টিয়জগৎ এখনও তাঁর আগমনের আশায় অপেক্ষা করে আছে। 

"একই পুরোনো বিশ্বাস আঁকড়ে আর একই আবেগে জগত তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে; হ্যাঁ, আরও বেশি বিশ্বাসের সাথে, স্বর্গ থেকে মানুষের কাছে শেষ ইশারা আসার পর পনেরো শতক কেটে গেছে,

আর অন্ধ বিশ্বাস একা থেকে গেল 

আস্থাশীল হৃদয়কে শান্ত করার জন্য, 

যেহেতু স্বর্গ আর কোনও ইশারা পাঠাবে না। 

"একথা সত্যি, আবার, আমরা সকলেই অলৌকিক ঘটনা ঘটার কথা শুনেছি, যদিও 'অলৌকিক যুগ' চলে যাবার পর আর ফিরে আসে না। আমাদের ছিল আর এখনও আছে, আমদের সন্তরা, যাঁরা অলৌকিকভাবে নিরাময় করতে পারতেন; এবং যদি আমরা  তাঁদের জীবনী লেখকদের বিশ্বাস করতে পারি, তাঁদের মধ্যে এমন লোকও ছিল যাঁদের কাছে স্বর্গের রানী নিজে এসেছিলেন। কিন্তু শয়তান তো ঘুমোয় না, আর সন্দেহের প্রথম বীজ, আর সেই সমস্ত বিস্ময়কর ব্যাপারের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস, ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে খ্রিষ্টিয়জগতে উঁকি দিতে আরম্ভ করেছিল। ঠিক সেই সময়েই জার্মানির উত্তরে এক নতুন এবং ভয়ঙ্কর ধর্মদ্রোহী প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল। [লুথারের সংস্কার] ...একটি বিশাল নক্ষত্র 'যেন তা প্রদীপের আলোর মতন ঝিকমিকে... ঝর্ণার জলে পড়ল'... এবং 'তা  তেতো হয়ে গেল।' সেই ‘ধর্মদ্রোহী’ নিন্দার সাথে 'অলৌকিক ঘটনা' অস্বীকার করল। কিন্তু যারা বিশ্বস্ত ছিল তারা আরও বেশি উৎসাহভরে বিশ্বাস করতে লাগল, মানবজাতির অশ্রুজল ঈশ্বরের কাছে আগের মতোই পৌঁছোচ্ছিল, এবং খ্রিস্টানবিশ্ব আগের মতোই আত্মবিশ্বাসের সাথে তাঁর আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিল; লোকেরা তাঁকে ভালবাসতো এবং তাঁর উপর তাদের আস্থা ছিল, আগে যেমন লোকেরা তাঁর জন্য নিজেদের নিরম্বু ও ক্ষুধার্ত উপবাসী রেখে, দুঃখ আর যন্ত্রণাভোগ করত, ঠিক তেমনই করতো এই সময়ে... কত শতাব্দী যাবত দুর্বল আর বিশ্বাসী মানুষেরা তাঁর কাছে অনুনয়-বিনয় করেছে, বিশ্বাসভরে কেঁদেছে, বলেছে: ‘আর কতোকাল হে প্রভু, পবিত্র ও সত্য, তুমি কি আর আসবে না?’ কত দীর্ঘ শতাব্দী তাঁর কাছে নিরর্থক আবেদন করেছে যে, অবশেষে, তাঁর অপার করুণায়, তিনি প্রার্থনায় সাড়া দিতে সম্মত হলেন ...উনি নির্ণয় নিলেন যে আরেকবার, তা যদি এক ঘণ্টার জন্যেও হয়, জনগণের জন্য-- তাঁর যন্ত্রণাক্ত, অত্যাচারিত, মারাত্মক পাপী, তাঁর আদরের শিশুসন্তানের মতো, বিশ্বাসী মানুষেরা-- তাঁকে আবার দেখতে পাবে। এই ঘটনার দৃশ্যটি আমি স্পেনে নিয়ে গেছি, সেভাইলেতে, ইনকুইজিশনের ভয়ঙ্কর সময়ে, যখন, ঈশ্বরের মহিমাময় গৌরবের জন্য, সারা দেশ জুড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। 

দুষ্ট অবিশ্বাসীদের খুঁটিতে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হচ্ছিল, 

যাজকদের বিচারের জাঁকজমকের পর। 

"এই বিশেষ সফরের, অবশ্যই, প্রতিশ্রুত আগমনের সাথে কোনও সম্পর্ক নেই, যখন, নির্ধারিত দিনক্ষণ অনুযায়ী, 'সেই দিনগুলির দুর্দশার পরে,' তিনি আবিভূত হবেন 'স্বর্গের মেঘের ভেতর দিয়ে'। কারণ, 'ঈশ্বরপুত্রের আগমন', যেমনটি আমাদের জানানো হয়েছে, হঠাৎ করেই ঘটবে, 'যেমন বিদ্যুৎ পূর্ব দিক থেকে চকিতে আসে এবং পশ্চিম দিকে ঝলকানি দেয়।' না; এই একবার, তিনি অপরিচিত হয়ে আসতে চেয়েছিলেন, এবং তাঁর সন্তানদের মধ্যে উপস্থিত হতে চেয়েছিলেন। ঠিক তখনই, যখন বিধর্মীদের হাড়গুলো, যাদের জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার দণ্ড দেওয়া হয়েছিল, আগুনে ফাটার আওয়াজ শুরু করেছিল। তাঁর অপার করুণার দরুণ, তিনি আরেকবার সেই ভাবেই দেখা দিতে চেয়েছিলেন যে-রূপে পনেরো শতাব্দী আগে মর্ত্যলোকে এসেছিলেন। তিনি ঠিক সেই সময়েই নেমে আসেন যখন রাজা, দরবারের সদস্যরা, সেনানীরা, যাজকরা, আর রাজদরবারের সুন্দরীরা, সেভাইলের সমস্ত মানুষের সামনে, একশোর বেশি বিধর্মী বজ্জাতকে ভয়াবহ ‘অটো-দা-ফে অ্যাড মেজরমে দেই গ্লোরিয়ামে’ জ্যান্ত পোড়ানো হচ্ছে, কার্ডিনাল গ্র্যান্ড ইনকুইজিটরের আদেশে। তিনি চুপচাপ এবং অঘোষিত এসেছেন; তবুও সবাই-- কত অদ্ভুত-- হ্যাঁ, সবাই তাঁকে তক্ষুনি চিনতে পারে! জনগণ তাঁর দিকে ছুটে যায়, যেন তারা কোনও অপ্রতিরোধ্য শক্তি দ্বারা আকর্ষিত; তারা তাঁকে ঘিরে ধরে, তাঁর চারপাশে ঠেলাঠেলি ভিড় করে, তারা তাঁকে অনুসরণ করে... নিঃশব্দে, তাঁর ঠোঁটে অসীম মমতার মৃদু হাসি, তিনি ঘন ভিড় অতিক্রম করেন, এবং হালকা পায়ে এগিয়ে যান। প্রেমের সূর্য তার হৃদয়ে উদ্ভাসিত, এবং তাঁর চোখ থেকে আলো, প্রজ্ঞা ও শক্তির উজ্জ্বল রশ্মি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, এবং তাঁকে ঘিরে জড়ো হওয়া জনগণের ওপর ঝরে পড়ছিল, তাদের হৃদয়কে ভালোবাসায় স্পন্দিত করে তুলছিল। তিনি তাঁর হাত তাদের মাথায় বুলিয়ে দিলেন, আশীর্বাদ করলেন, আর তাঁর সামান্য ছোঁয়ায়, এমনকি তাঁর পোশাক থেকে, একটি নিরাময়কারী শক্তিপ্রবাহ বইতে থাকে। একজন বৃদ্ধ, জন্ম থেকে অন্ধ, কাকিয়ে ওঠে, 'প্রভু, আমাকে সুস্থ করুন, যাতে আমি আপনাকে দেখতে পারি!' আর তার অন্ধ চোখ থেকে আবরণ খসে পড়ে, এবং অন্ধ লোকটি তাঁকে দেখতে পায়... জনগণ আনন্দে কাঁদতে আরম্ভ করে, এবং যে মাটিতে তিনি পা রাখছিলেন সেখানটায় সবাই চুমু খেতে থাকে। শিশুরা তাঁর চলার পথে ফুল ছিটিয়ে আশীর্বাদ পাওয়ার গান গায়! এ তো তিনিই, তিনি নিজেই, তারা একে অপরকে বলে, ইনি অবশ্যই ঈশ্বরপুত্র স্বয়ং, তিনি ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না! পুরানো গির্জার প্রবেশপথে তিনি থামেন, ঠিক তখনই একটি সাদা রঙের কফিন ভেতরে নিয়ে আসা হচ্ছিল, বহনকারীরা বিলাপ করে জোরে-জোরে কাঁদছিল। কফিনের ঢাকনা খোলা, আর তাতে শয়ানো একটি ফর্সা শিশু, সাত বছর বয়সী, শহরের একজন বিশিষ্ট নাগরিকের একমাত্র সন্তান। ছোট্ট শবটি ফুলের তলায় চাপা পড়ে আছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত যাজক, যিনি শবযাত্রীদের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন, তাকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল এবং যাজক ভ্রূকুটি করলেন। হঠাৎ একটি ক্রন্দনরত চিৎকার শোনা যায়, এবং শোকাহত মা ঈশ্বরপুত্রের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে থাকে। 'যদি তুমিই সেই হও, তাহলে আমার সন্তানকে জীবিত করে তোলো!' শবযাত্রীদের মিছিল থেমে যায়, এবং ছোট্ট কফিনটি আলতো করে তাঁর পায়ের কাছে নামানো হয়। ঐশ্বরিক করুণা তাঁর দৃষ্টি থেকে প্রবাহিত হয়, এবং যখন তিনি শিশুটির দিকে তাকান, ঈশ্বরপুত্রের ঠোঁট দু'টিকে ফিসফিস করতে শোনা যায়, 'তালিথা কুমি' (ছোট্ট খুকি, আমি তোমাকে বলছি, উঠে পড়ো) এবং শিশুর মা শুনে থমকে যায়।' শিশুটি তার কফিনে উঠে দাঁড়ায়। তার ছোট্ট হাতদুটিতে তখনও সাদা গোলাপের গোছা, যা তার মৃত্যুর পর রাখা হয়েছিল এবং বড়-বড় বিস্মিত চোখে চারদিকে তাকিয়ে সে মিষ্টি হাসতে লাগলো... জনতা অত্যন্ত উত্তেজিত। তাদের মধ্যে ভয়ানক হইচই আরম্ভ হয়ে গেল, জনসাধারণ চিৎকার করে জোরে জোরে কাঁদতে লাগল, তখনই হঠাৎ, গির্জার দরজার সামনে, কার্ডিনাল গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর নিজেই হাজির হলেন... তিনি দীর্ঘদেহী, প্রায় নব্বুই বছর বয়সের শুকনো-মুখ বুড়ো, ভেতরে ঢোকা চোখ, যার গহ্বর থেকে দুটি জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ চমকাচ্ছিল। রোমান ক্যাথলিক চার্চের শত্রুদের ‘অটো দা-ফে’ অনুষ্ঠানে যোগ দেবার সময়ে জনগণের সামনে যে আড়ম্বরপূর্ণ কার্ডিনালের পোশাক পরেছিলেন, তা খুলে রেখে এসেছেন, আর এখন পরে আছেন পুরানো, রুক্ষ, যাজকদের ঢোলা আলখাল্লা। তাঁর নিষ্ঠুর সহকারী আর 'পবিত্র রক্ষীদলের' ক্রীতদাসরা দূর থেকে ইনকুইজিটরকে অনুসরণ করছিল। তিনি ভিড়ের সামনে থামলেন এবং এদিক-ওদিক তাকালেন। তিনি সবই দেখেছেন। তিনি ঈশ্বরের পায়ের কাছে ছোট্ট কফিন রাখার দৃশ্য দেখেছেন, জীবন ফিরে পাওয়ার সাক্ষী হয়েছেন। আর এখন, তাঁর কালো হয়ে-যাওয়া, বিষণ্ণ মুখ আরও কালো হয়ে গেছে; তাঁর লোমশ ধূসর ভ্রু একের সঙ্গে আরেক মিশে আছে, এবং তাঁর গর্তে-ঢোকা চোখে ভয়াবহ আলোয় জ্বলজ্বল করছিল। আস্তে আস্তে আঙুল তুলে, তিনি তাঁর চাকরদের নির্দেশ দেন ঈশ্বরপুত্রকে গ্রেপ্তার করতে... "সুশৃঙ্খল, বশীভূত আর এখন হাড়হিম মানুষের উপর ইনকুইজিটরের ক্ষমতা এমন, যে বিশাল ভিড় তাড়াতাড়ি পথ ছেড়ে দেয়, এবং প্রহরীদের সামনে থেকে এদিক-ওদিক পালিয়ে যায়, শীতল নীরবতার মধ্যে প্রতিবাদের টুঁ শব্দটুকুও না করে, ঈশ্বরপুত্রের গায়ে তাদের অপবিত্র হাত রাখার অনুমতি পায় এবং অপরিচিত ঈশ্বরপুত্রকে দূরে নিয়ে যায়... সেই একই লোকজন, যেন তারা একটি-মাত্র মানুষ, বৃদ্ধ ইনকুইজিটর তাদের আশীর্বাদ করার পর, সামনের মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে, ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। প্রহরীরা তাদের বন্দিকে পবিত্র বিচারের বেশ পুরোনো অট্টালিকায় নিয়ে যায়; ঈশ্বরপুত্রকে  সংকীর্ণ, অন্ধকারাচ্ছন্ন, দমবন্ধকরা কারাগারের ঘরে ঠেলে দিয়ে, তালাবন্ধ করে এবং বিদায় নেয়... "দিন শেষ হয়, এবং রাত নামে-- একটি অন্ধকার, গরম, দমবন্ধ স্প্যানিশ রাত-- সেভিল শহরে চুপি-চুপি ঢুকে পড়ে গ্যাঁট হয়ে বসে। বাতাসে চাঁপা আর কমলা ফুলের গন্ধ ভেসে আসে। বিচারসভার পুরোনো হলঘরের আদিম অন্ধকারে লোহার দরজা হঠাৎ খুলে দেওয়া হয়, এবং গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর, একটা টিমটিমে লণ্ঠন হাতে ঝুলিয়ে, আস্তে আস্তে অন্ধকূপের মধ্যে প্রবেশ করে। লোকটা একা, এবং, তার পেছনে ভারী দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে সে চৌকাঠে থেমে যায়, আর এক বা দুই মিনিটের জন্য গোমড়ামুখে আর চুপচাপ  তার সামনে ঈশ্বরপুত্রের মুখমণ্ডল খুঁটিয়ে দ্যাখে। গুনে-গুনে কয়েক পা এগিয়ে, শেষ পর্যন্ত, বুড়ো ইনকুইজিটর তার লণ্ঠন টেবিলে রেখে দেয় আর এইভাবে ঈশ্বরপুত্রকে সম্বোধন করে:

"তাহলে তুমিই!... তুমি !" ... কোনও উত্তর না পেয়ে, ইনকুইজিটর দ্রুত কথা চালিয়ে যায়: "না, উত্তর দিতে হবে না; চুপ করেই থাকো!... আর তুমি কীই বা বলতে পারো?.. আমি ভালোভাবেই তোমার উত্তর জানি... তাছাড়া, তুমি এর আগে যে উক্তি করেছিলে তার সাথে একটি অক্ষরও যোগ করার অধিকার নেই তোমার... কেন তুমি এখন ফিরে এলে, আমাদের কাজে বাধা দেওয়ার জন্য? তুমি নির্ঘাৎ সেই কাজের জন্যই এসেছ, আর তুমি তা ভালো করে জানো। কিন্তু তুমি কি জানো, আগামীকাল  সকালে তোমার জন্য কী অপেক্ষা করছে? আমি জানি না, আর জানতেও চাই না যে তুমি কে: তুমি নিজেই এসেছ নাকি নিজের প্রতিকৃতি পাঠিয়েছ, আগামীকাল আমি তোমাকে দণ্ডদান করে খুঁটিতে বেঁধে পোড়াব, যেন তুমি সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাসী; আর সেই একই লোকেরা, যারা আজকে তোমার পায়ে চুমু খাচ্ছিল, কালকে আমার একটা আঙুলের ইশারায়, তারা তোমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার চিতায় আগুন দিতে ছুটে আসবে... তুমি কি এই বিষয়ে সচেতন? "লোকটা বলতে থাকে, যেন একান্ত চিন্তায় কথা বলছে, এবং একবারের জন্যও তার সামনেকার নম্র মুখ থেকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সরিয়ে নেয়নি।"

“যা বর্ণনা করা হল আমি অমন পরিস্থিতি বিশেষ উপলব্ধি করতে পারছি না-- এসব কী, আইভান?" হঠাৎ বাধা দিল অ্যালিয়োশা, যে  এতক্ষণ তার ভাইয়ের কথা চুপচাপ শুনছিল, বলে উঠল। "এটা কি এক অভিনব কল্পনা, নাকি বুড়ো লোকটার কিছু ভুল, একটা অসম্ভব লেনদেন?"  "তুমি যদি চাও তাহলে পরেরটাই হোক", আইভান হেসে বলল, "তাহলে আধুনিক বাস্তববাদ তোমার রুচিকে এতটাই বিকৃত করে দিয়েছে যে, তুমি অভিনব জগতের কোনও কিছু উপলব্ধি করতে অক্ষম বোধ করছ... তাহলে লেনদেনই মনে করা হোক, যদি তুমি তাই মনে করো। তাছাড়া, ইনকুইজিটরের বয়স নব্বুই বছর, আর ক্ষমতার আদর্শ নিরূপণ করতে-করতে পাগল হয়ে গিয়ে থাকবে; কিংবা, এটা তার দৃষ্টির বিভ্রম হতে পারে, মৃত্যুর কল্পনায় জারিত, দুপুরের শতাধিক অবিশ্বাসীকে পুড়িয়ে মারার তাপে মাথা গরম... কিন্তু কবিতাটির জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হল এই যে, এটা কি লেনদেন নাকি অনিয়ন্ত্রিত কল্পনা? প্রশ্ন হল, ইনকুইজিটরকে নিজের হৃদয়কে মুক্ত করতে হবে; শেষ পর্যন্ত তাকে তার ভাবনা প্রকাশ করতে হবে; আর নব্বুই বছর যাবত যে রহস্য মনের মধ্যে গোপন করে রেখেছে, তা জোরে-জোরে বলতে শুরু করে।” 

"এবং তার বন্দি, তিনি কি কখনও উত্তর দেন না? তিনি কি কোনও কথা না বলে, তার দিকে তাকিয়ে, চুপ করে থাকেন?" 

"অবশ্যই; আর তাছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না," আইভান উত্তরে বলে। "গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর যে কথাগুলো বলেছিল সেগুলোই আবার বলে, যে, ঈশ্বরপুত্রের বলা আগের কথার সাথে একটি অক্ষরও যোগ করার অধিকার নেই। পরিস্থিতি তক্ষুনি স্পষ্ট করার জন্য, ওপরের প্রাথমিক স্বগতসংলাপ ছিল রোমান ক্যাথলিক ধর্মের অন্তর্নিহিত মর্মার্থ বোঝানোর খাতিরে-- যেমন আমি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে পারি, লোকটার কথার মানে, সংক্ষেপে: 'তুমি পোপের কাছে সবকিছু দিয়েছিলে, এবং সবকিছুই এখন তার একার উপর নির্ভর করে; আমাদের কাজে বাধা দিতে তোমার ফিরে আসার কোনও কারণই থাকতে পারে না।' এই বিষয়ে জেসুইটরা শুধু কথাই বলে না, লেখেও একইভাবে। "তুমি কি আমাদের কাছে সেই পৃথিবীর অন্তত একটি রহস্যের কথা ফাঁস করতে পারো, যেখান থেকে তুমি এসেছ?' বুড়ো ইনকুইজিটর জিগ্যেস করে ঈশ্বরপুত্রকে, আর নিজেই তাড়াতাড়ি তার উত্তর দেয়। “না, তোমার কোনও অধিকার নেই তা বলার, কেননা তা হবে সেই একই কথা যা তুমি এর আগে বলেছিলে, যখন তুমি পৃথিবীতে ছিলে, তখন সাধারণ মানুষের জন্য যে-উদ্দেশে লড়াই করেছিলে, তাদের তা থেকে বঞ্চিত করছ... তুমি এখন নতুন যা-কিছু ঘোষণা করবে তা  পছন্দের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হবে, কারণ এটি একটি নতুন এবং অলৌকিক ব্যাপার হিসাবে প্রকাশিত হবে, যা পনেরোশো বছরের পুরানো ঘোষণাকে অতিক্রম করে যাবে, যখন তুমি বারবার জনগণকে বলেছিলে: "সত্য তোমাদের মুক্ত করবে।" তাহলে তাকিয়ে দেখো, তোমার এখনকার 'মুক্ত' মানুষদের দিকে! 'বুড়ো লোকটা টিটকিরি মেরে বলে। ‘হ্যাঁ…! তাতে আমাদের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে।’ নিজের শিকারের দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে থাকে সে। 'কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত আমাদের কাজ সম্পন্ন করেছি, এবং তা  তোমার নাম করে... কেননা দীর্ঘ পনেরো শতাব্দী ধরে সেই 'স্বাধীনতার' জন্য আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে এবং দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছে: কিন্তু এখন আমরা জয়ী হয়েছি আর আমাদের কাজ মিটে গেছে, আর তা বেশ ভালো এবং দৃঢ়ভাবে সম্পন্ন হয়েছে।... বিশ্বাস কোরো না যে তুমি এত শক্তিশালী!... এবং কেনই বা তুমি আমার দিকে ভিরু চোখে তাকাচ্ছ, যেন আমি তোমার ধিক্কারেরও যোগ্য নই?... তাহলে জেনে রাখো, লোকেরা তাদের মুক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত এবং সন্তুষ্ট বোধ করে; এবং সেকারণেই তারা নিজেদের এবং তাদের নিজস্ব ইচ্ছায়, সেই স্বাধীনতাকে, আমাদের পায়ের কাছে ঝুঁকে পড়ে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। যাই হোক, সেটাই আমরা করেছি। তুমি কি সেই জন্যই কষ্ট করেছিলে? এটা কি সেই ধরনের 'মুক্তি' যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাদের দিয়েছ?” 

"এখন, আরেকবার, তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি না," অ্যালিয়োশা বাধা দিয়ে বলল। "বুড়ো কি উপহাস করছিল এবং হাসছিল?"

"একেবারেই নয়। উনি এটাকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছিলেন, উনি মনে করেন যেন নিজে অনন্য সাধারণ মানবসেবা করেছেন, ওনার যাজকভাইরা এবং জেসুইটরা, লোকেদের স্বাধীনতাকে জয় করে এবং নিজেদের কর্তৃত্বের অধীনে নিয়ে এসে, একটি মহান কাজ করেছেন, এবং গর্বভরে মনে করেন যে তা করা হয়েছে বিশ্বের মঙ্গলের জন্য।... ‘এবার এখন’, উনি বলেন (ইনকুইজিশন সম্পর্কে), ‘আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে, প্রথমবার, মানবজাতিকে খুশি করার বিষয়ে ঐকান্তিক চিন্তা করার। মানুষ জন্মায় দ্রোহী হয়ে, আর দ্রোহীরা কি কখনও সুখী হতে পারে?... তোমাকে এ ব্যাপারে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু দেখা যাচ্ছে তা কোনও কাজে লাগেনি, কেননা তুমি মানবজাতিকে খুশি করতে পারে এমন একটিমাত্র উপায়কে প্রত্যাখ্যান করেছ; সৌভাগ্যবশত তোমার যাবার সময়ে তুমি আমাদের দায়িত্বে কাজটি দিয়ে গেছ... তুমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে, নিজের উক্তির অঙ্গীকারের মাধ্যমে, আমাদের বন্ধন ও মোচনের অধিকার দিচ্ছো... এবং নিঃসন্দেহে, এখন তুমি  আমাদের তা থেকে বঞ্চিত করার কথা ভাবতে পারো না!"

"কিন্তু 'তোমাকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছিল" কথাগুলো বলতে উনি কী বোঝাতে চাইছেন?" জানতে চাইল অ্যালেক্সিস।

"এই কথাগুলো বুড়োটাকে তার কথার ন্যায্যতার চাবিকাঠি ধরিয়ে দেয়... কিন্তু শোনো--

"ভয়ঙ্কর এবং জ্ঞানী আত্মা, আত্ম-বিনাশকারী এবং অ-সত্তার আত্মা," বলা বজায় রাখে ইনকুইজিটর, "অস্বীকৃতির মহান আত্মা তোমার সাথে বিজনপ্রদেশে কথাবার্তা বলেছিল, এবং আমাদের বলা হয়েছে যে সে তোমাকে" প্রলুব্ধ করেছিল "...এটা কি সত্যি ঘটনা? আর যদি সত্যিই তাই হয়ে থাকে, তাহলে সেই তিনটি প্রলোভনে যা ছিল, যেগুলো তুমি প্রত্যাখ্যান করেছিলে, এবং যেগুলোকে বলা হয় 'প্রলোভন', তার চেয়ে আলাদা একটিও উক্তি করা চলে না। হ্যাঁ; পৃথিবীতে যদি কোনও সত্যিকার অবাককরা অলৌকিক ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তা সেই দিনকার তোমার তিনটি প্রলোভন আর মূলতঃ এই তিনটি ছোট বাক্যে রয়েছে অনন্যসাধারণ অলৌকিকতা। যদি সম্ভব হতো যে ওগুলো চিরকালের জন্য উবে গিয়ে লোপাট হয়ে যাক, কোনও রেশ না রেখে, রেকর্ড থেকে এবং মানুষের স্মৃতি থেকে, এবং তা তোমার ইতিহাসে আরেকবার জরুরি হয়ে উঠত উদ্ভাবন করার, আবিষ্কারের,  তুমি কি মনে করো যে বিশ্বের সমস্ত ঋষি, বিধায়ক, দীক্ষাদাতা, দার্শনিক এবং চিন্তাবিদ প্রমুখদের ডেকে যদি বলা হত এইরকম তিনটি প্রশ্ন তৈরি করতে, ঘটনার বিশালত্বের পরিপ্রেক্ষিতে, যেগুলো তিনটি ছোটো বাক্যে আমাদের জগতের ভবিষ্যতের সমগ্র ইতিহাস ও মানবতাকে-- তুমি কি বিশ্বাস করো, আমি জিগ্যেস করছি তোমাকে, শক্তিশালী এবং সর্বজ্ঞ বুদ্ধির আত্মার দ্বারা বিজনপ্রদেশে তোমাকে দেওয়া তিনটি প্রস্তাবের শক্তি এবং চিন্তার গভীরতা তাঁদের সমস্ত সম্মিলিত প্রচেষ্টা কখনও অমন কিছু তৈরি করতে পারতো? শুধুমাত্র তাদের বিস্ময়কর যোগ্যতার মাপকাঠিতে বিচার করে, যে কেউ  বুঝতে পারে যে তারা একটি সসীম, পার্থিব বুদ্ধি থেকে উদ্ভূত হয়নি, বরং প্রকৃতপক্ষে, চিরন্তন এবং পরম-শাশ্বত থেকে হয়েছে। এই তিনটি প্রস্তাবে আমরা যা  খুঁজে পাই, তারা একটিমাত্র হয়ে গিয়ে আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী শুনিয়েছে, মানুষের সম্পূর্ণ পরবর্তী ইতিহাস; বলতে গেলে, আমাদের তিনটি চিত্রকল্প দেখানো হয়েছে, তাদের মধ্যে ভবিষ্যতের সমস্ত স্বতঃস্ফূর্ত, অদ্রবণীয় সমস্যা এবং বিশ্বজুড়ে মানবপ্রকৃতির পরস্পরবিরোধিতা তুলে ধরা হয়েছে। সেই কালখণ্ডে, তাদের অন্তর্গত বিস্ময়কর প্রজ্ঞা এতটা সহজবোধ্য ছিল না, যা এখন মনে হয়, কেননা ভবিষ্যত ব্যাপারটা তখন ছিল আবরণের আড়ালে ঢাকা; কিন্তু এখন, যখন পনেরো শতাব্দী পেরিয়ে গেছে, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এই তিনটি প্রশ্নে সব কিছুরই এত বিস্ময়করভাবে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, যে তাতে বাড়তি কিছু যোগ করা বা তা থেকে বাদ দেওয়া একেবারে অসম্ভব! "তাহলে নিজেই সিদ্ধান্ত নাও," ইনকুইজিটর কঠোরভাবে এগিয়ে গেল, 'দুজনের মধ্যে কোনজন সঠিক ছিলেন: যিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, নাকি যিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন? প্রথম প্রশ্নটির সূক্ষ্ম অর্থটি মনে রেখো, যা এইকথা বলে: তুমি কি খালি হাতে পৃথিবীতে যাবে? তুমি কি সেখানে মুক্তি সম্পর্কিত তোমার অস্পষ্ট এবং অনির্ধারিত প্রতিশ্রুতিসহ যেতে চাও, যা মানুষেরা, যারা প্রকৃতিগতভাবে নিস্তেজ এবং বেয়াড়া, যারা বুঝতে এতোই অক্ষম, যে তারা ভয়ে এড়িয়ে যায়? কেননা মানবজাতির কাছে ব্যক্তি-স্বাধীনতার চেয়ে অসহ্য আর কিছু ছিল না। তুমি কি এই পাথরগুলোকে নির্জন এবং উজ্জ্বল বিজনপ্রদেশে দেখেছ? এই পাথরগুলোকে রুটি বানানোর নির্দেশ দাও-- মানবজাতি তাহলে তোমার পেছনে ছুটবে, এক পাল গবাদি পশুর মতন বিনয়ী ও কৃতজ্ঞ হয়ে। কিন্তু এতোকিছু সত্ত্বেও তা হবে সর্বদা ভিন্ন আর কাঁপুনি দেবে, পাছে তুমি নিজের হাত সরিয়ে নাও এবং তারা তাদের রুটি হারায়! মানুষকে তাদের স্বাধীন ইচ্ছের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ভয়ে তুমি প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলে; কেননা বেছে নেবার স্বাধীনতা কোথায়ই বা থাকে যদি মানুষকে রুটির ঘুষ দেওয়া হয়? মানুষের জীবন শুধু রুটি খেয়ে বেঁচে থাকার নয়— তুমিই তা বলেছিলে। তুমি জানো না, সম্ভবত, ঠিক সেই পার্থিব রুটির নামেই একদিন জাগতিক আত্মা জেগে উঠবে, সংগ্রাম করবে এবং অবশেষে তোমাকে বশীভূত করবে, তার পরে ক্ষুধার্ত জনতা চিৎকার করে বলবে: "কে সেই পশু, যে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আগুন নামিয়ে এনেছিল!" তুমি কি তা জানো না, কিন্তু কয়েক শতাব্দী পরে, এবং সমগ্র মানবজাতি তার প্রজ্ঞার জোরে এবং তার মুখপত্র ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে ঘোষণা করবে, যে, জগতে আর কোনও অপরাধ ঘটে না, তাই পৃথিবীতে আর কোনও পাপ নেই, তাহলে কেবল ক্ষুধার্ত মানুষ থাকবে? "আগে আমাদের খেতে দাও আর তারপর আমাদের সৎ হতে বল!" তোমার বিরুদ্ধে তোলা পতাকায় এই কথাগুলো লেখা থাকবে -- এমন একটি পতাকা যা তোমার গির্জাকে তার ভিত্তি পর্যন্ত ধ্বংস করে দেবে এবং তোমার বিগ্রহের জায়গায় আরও একবার বাবেলের ভয়ঙ্কর মিনার উঠে দাঁড়াবে; আর যদিও ভবনটি অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়া হবে, প্রথমটির মতন, তবুও এই তথ্য খোদাই করা থাকবে যে তুমি প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে পারতে, কিন্তু করোনি, তা হল এই যে সেই নতুন মিনার নির্মাণের প্রচেষ্টা রোধ তুমি করোনি এবং এইভাবে মানবজাতিকে হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে অনর্থক কষ্ট থেকে রক্ষা করোনি। এবং জনগণ আবার আমাদের কাছেই ফিরে আসবে। তারা আমাদের খুঁজে বেড়াবে ভূগর্ভস্হ সমাধিতে, কারণ আমরা আরও একবার নির্যাতিত ও শহিদ হব— এবং তারা আমাদের কাছে এসে কাঁদতে থাকবে: "আমাদের খেতে দিন, কারণ যারা আমাদের স্বর্গ থেকে আগুন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা আমাদের ঠকিয়েছে!" তখনই আমরা তাদের জন্য তাদের মিনার নির্মাণ শেষ করব। কারণ যারা একা তাদের খাওয়াবে তারাই মিনারটা সম্পূর্ণ করবে, আর আমরা তাদের তোমার নামে খাবার খাওয়াব এবং তাদের কাছে মিথ্যা বলব যে এটি তোমার নামে করা হচ্ছে। ওহ, আমাদের সাহায্য ছাড়া তারা কখনই, কখনই, নিজেদের খাওয়াতে শিখবে না! যতক্ষণ তারা মুক্ত থাকবে ততক্ষণ কোনও বিজ্ঞান তাদের রুটি দেবে না, যতদিন তারা মুক্ত থাকবে, যতদিন না তারা সেই মুক্তিবোধকে আমাদের পায়ের কাছে রেখে বলবে: "আমাদের দাস করে তুলুন, কিন্তু আমাদের খেতে দিন!" সেই দিনটি অবশ্যই আসবে যখন মানুষ বুঝতে পারবে যে মানবমুক্তি এবং সকলের সন্তুষ্টির জন্য দৈনন্দিন রুটির যোগান দেওয়া একই সঙ্গে অচিন্তনীয়, কেননা মানুষ কখনওই নিজেদের মধ্যে ওই দুটো ব্যাপারকে সমানভাবে ভাগ করতে পারবে না। এবং তারা এটাও বুঝতে পারবে যে তারা কখনই মুক্ত হতে পারে না, কারণ তারা দুর্বল, দুষ্ট, দুঃখভোগী এবং জন্মগতভাবে বজ্জাত এবং দ্রোহী। তুমি তাদের জীবনের রুটি দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছ , স্বর্গের রুটি; কিন্তু আমি তোমাকে আবার জিজ্ঞাসা করছি, সেই রুটি কি কখনও দুর্বল ও দুষ্ট, চির-অকৃতজ্ঞ মানবজাতির কাছে, পৃথিবীতে তাদের প্রতিদিনের রুটির সমান হতে পারে? এবং এমনকি ধরে নিচ্ছি যে হাজার হাজার এবং লক্ষ-লক্ষ মানুষ তোমাকে অনুসরণ করে, তোমার স্বর্গীয় রুটি পাবার জন্য, তাহলে কোটি কোটি মানুষের কী হবে যারা জাগতিক রুটিকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য দুর্বলচিত্ত, তারা তোমার  স্বর্গীয় রুটি নিয়ে কী করবে? অথবা এটা কি তবে হাজার হাজার বীর এবং পরাক্রমশালীদের মধ্যে নির্বাচিত লোকজন, যারা তোমার কাছে খুব প্রিয়, যখন কি না বাকি লক্ষ লক্ষ, সমুদ্রের বালির দানার মতন অসংখ্য, দুর্বল এবং স্নেহময়, তাদের মাল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে ওই লোকদের জন্য? না না! আমাদের দৃষ্টিতে এবং আমাদের কাজের উদ্দেশ্যে দুর্বল এবং নিম্নবর্গের মানুষ আমাদের কাছে বেশি প্রিয়। একথা সত্য যে তারা দুষ্ট এবং দ্রোহী, কিন্তু আমরা তাদের অনুগত হতে বাধ্য করব, এবং তারাই আমাদের সবচেয়ে বেশি গুণগান করবে। তারা আমাদের দেবতা হিসেবে গণ্য করবে এবং সেই সব লোকেদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে যারা শাসনের মাধ্যমে জনসাধারণকে নেতৃত্ব দিতে সম্মত হয়েছে আর তাদের স্বাধীনতার বোঝা বইছে-- শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে সেই মুক্তি কি ভয়ঙ্করই না হবে! তারপর আমরা তাদের বলব যে এটা তোমার ইচ্ছার প্রতি আনুগত্য এবং তোমার নামে আমরা তাদের উপর শাসন করছি। আমরা তাদের আরও একবার ঠকাব এবং তাদের মিথ্যাকথা বলব-- কেননা আর কখনও, আমরা তোমাকে আর আমাদের মাঝে আসতে দেব না। এই প্রতারণার মধ্যে আমরা নিজেদের যন্ত্রণা খুঁজে পাব, কারণ আমাদের অনন্তকাল মিথ্যাকথা বলতে হবে, এবং কখনও মিথ্যাকথা বলা বন্ধ করা চলবে না! 'প্রথম' প্রলোভন "এর গোপন মর্ম এটাই, এবং তুমি  স্বাধীনতার স্বার্থে বিজনপ্রান্তরে সেটিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলে যেটিকে তুমি সর্বোত্তম মনে করেছিলে। এদিকে তোমাকে যিনি লোভ দেখাচ্ছিলেন, তাঁর প্রস্তাবটিতে আরও একটি ঘোর বিশ্ব-রহস্য আছে। 'রুটিকে' গ্রহণ করলে, তুমি সন্তুষ্ট করতে পারতে এবং একটি সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষার উত্তর দিতে পারতে, যা রয়েছে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে নিরন্তর আকাঙ্ক্ষা হিসেবে, ঘাপটি মেরে আছে মানব-সমষ্টির বুকে লুকিয়ে, সেই সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর সমস্যা-- "কাকে বা কী আমরা  পুজো করব?" পুজো করার জন্য তাড়াতাড়ি একটা নতুন বস্তু বা ধারণা খুঁজে পাবার তুলনায় যে ব্যক্তি সব ধর্মীয় পক্ষপাত থেকে নিজেকে মুক্ত করেছে তার জন্য এর চেয়ে বড় বা বেশি বেদনাদায়ক উদ্বেগ আর নেই। কিন্তু মানুষ তাঁরই সামনে নতজানু হতে চায়, যে কেবলমাত্র বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠের দ্বারা স্বীকৃত, তার সমস্ত সহগামীদের দ্বারা যদি নাও হয়, পূজিত হবার অধিকার তার আছে; তার অধিকার এতই প্রশ্নাতীত যে, মানুষ সর্বসম্মতভাবে তার কাছে মাথা নোয়াতে রাজি হয়। এই দুঃখী প্রাণীদের প্রধান উদ্বেগের কারণ তাদের নিজের পছন্দের মূর্তি খুঁজে তাকে পুজো করা নয়, বরং অন্যরা যাতে বিশ্বাস করবে তা আবিষ্কার করা, আর সমবেত হয়ে মাথা নত করার সম্মতি দেওয়া। এটা প্রতিটি মানুষের এমন এক প্রবৃত্তি যা সবাই মিলে একসঙ্গে করে, আর সেটাই প্রত্যেক মানুষের প্রধান যন্ত্রণা, যা সময়ের আরম্ভ থেকে মানবজাতির প্রধান উদ্বেগ হয়ে রয়েছে। ধর্মীয় উপাসনার সেই সর্বজনীনতার জন্যই মানুষ একে অপরকে তলোয়ার দিয়ে ধ্বংস করেছে। নিজেদের জন্য দেবতা গড়ে নিয়ে, তারা একে অপরের কাছে আবেদন করতে শুরু করেছিল: "আপনার দেবতাদের পরিত্যাগ করুন, আসুন এবং আমাদের দেবতাকে প্রণাম করুন, নয়তো আপনাদের সবায়ের এবং আপনাদের মূর্তির মৃত্যু অবধারিত!" এবং  এই পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত  তারা তা করে যাবে; যখন সমস্ত দেবতা নিজেরাই অদৃশ্য হয়ে যাবে, তখনও তারা তা চালিয়ে যাবে, তারপর মানুষ কোনও ধারণার সামনে নতজানু হয়ে তার পুজো করবে। তুমি তো জানতে, তুমি মানব প্রকৃতির সেই রহস্যময় মৌলিক গুণ সম্পর্কে মোটেই অজ্ঞ নও, এবং তবুও তুমি তোমাকে দেওয়া  পরম পতাকাটি প্রত্যাখ্যান করলে, যার প্রতি সমস্ত জাতি সমর্পিত থাকবে এবং যার সামনে সকলেই মাথা নোয়াবে-- পার্থিব রুটির পতাকা, মুক্তির নামে প্রত্যাখ্যাত এবং 'ঈশ্বরের রাজ্যে রুটি' পাবার প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন! তাহলে দেখো, সেই 'মুক্তির' জন্য তুমি আরও কী করেছ! আমি তোমাকে আবার বলছি, মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় কোনও উদ্বেগ নেই যে সে এমন কাউকে খুঁজে পাক যাকে সে নিজের স্বাধীনতা উপহার দিয়ে দেবে, যা নিয়ে ওই দুর্ভাগা প্রাণীদের জন্ম হয়। কিন্তু সেই একজন লোকই তাদের মুখ বন্ধ করে দিতে পারে আর তাদের বিবেককে নীরব ও শান্ত করার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে, যে বাদবাকি সমস্ত মানুষের স্বাধীনতার মালিক হবে। 'দৈনন্দিন রুটি' দিয়ে তোমাকে একটি অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা উপহার দেওয়া হয়েছিল: একজন মানুষকে 'রুটি' দেখাও আর সে তোমাকে অনুসরণ করবে, কেননা রুটির আকর্ষণের চেয়ে আর কীই বা চাহিদা তার থাকতে পারে? কিন্তু যদি, একই সাথে, অন্য একজন তার বিবেকের মালিক হতে সফল হয়-- ওহ! তাহলে তোমার রুটির কথাও ভুলে যাবে, আর মানুষ সেই লোকটাকে অনুসরণ করবে যে তার বিবেককে প্রলুব্ধ করেছে। এ-পর্যন্ত তুমি ঠিকই ছিলে। কেননা মানুষের রহস্য কেবল তার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই সীমিত নয়, বরং সমস্যায়-- কীসের জন্য আদৌ বেঁচে থাকা উচিত, এই বোধে? তার বেঁচে থাকার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে, মানুষ কখনও বেঁচে থাকতে রাজি হবে না, এবং পৃথিবীতে টিকে থাকার বদলে বরং নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে, যদিও তাকে চারিপাশে রুটি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। এটাই সত্য। কিন্তু কী ঘটেছে? মানুষের স্বাধীনতাকে কব্জা করার বদলে, তুমি তাকে আরও বিশাল করে তুলেছ! তুমি কি আবার ভুলে গেছো যে, মানুষের কাছে শুভ এবং অশুভ সম্পর্কে জ্ঞানের তুলনায় আরাম, এমনকি মৃত্যুও, গ্রহণযোগ্য? বিবেকের স্বাধীনতার চেয়ে কিছুই তার চোখে বেশি প্রলোভনযুক্ত বলে মনে হয় না, এবং তার চেয়ে কিছুই বেশি বেদনাদায়ক নয়। আর দেখো! সমস্ত মানুষের বিবেকের চিরকালীন দৃঢ় বনেদ গড়ার বদলে, তুমি তাদের আলোড়িত করতে বেছে নিয়েছ তাদের ভেতরকার অস্বাভাবিক, রহস্যময় এবং অনির্দিষ্ট, যা-কিছু মানুষের ক্ষমতার বাইরে, আর এমনভাবে তা করেছ যেন কোনও কালে তোমার প্রতি তাদের ভক্তি ছিল না, এবং তবুও তুমি নাকি "ঈশ্বরপুত্র যিনি তার বন্ধুদের জন্য তাঁর জীবন দিতে!" আবির্ভূত হয়েছ। মানুষের কাছে যে উদ্বেগ অজানা ছিল তাই দিয়ে তাদের আত্মাকে বোঝাই করে দিয়েছ। অবাধে দেওয়া মানুষের ভালবাসার জন্য তৃষ্ণার্ত, মানুষকে প্রলুব্ধ করে এবং তোমার দ্বারা মোহিত ও বশীভূত করে, যাতে তারা তোমার দেখানো পথ অনুসরণ করে, সেই পুরানো এবং দূরদর্শী নিয়মের বদলে, তাদের হৃদয়ে তোমার প্রতিচ্ছবির পথনির্দেশে, তুমি তাদের স্বেচ্ছায় শুভ ও অশুভ বেছে নেবার অধিকার দিয়েছ। কিন্তু তুমি কখনও স্বপ্নেও তেমন সম্ভাবনার কথা ভাবোনি, না, সেই নিশ্চয়তার, যে, সেই একই মানুষেরা একদিন তোমার মূর্তি আর তোমার সত্যকেও পালটে দেবে, একথা জানার পর যে, তাদের ওপর স্বাধীনতা বেছে নেবার মতো ভয়ঙ্কর বোঝা চাপিয়ে ভারাক্রান্ত করা হয়েছে? একটা সময় নিশ্চয় আসবে যখন মানুষ বলে উঠবে যে সত্য এবং আলো তোমার মধ্যে থাকতে পারে না, কেননা  কর্মকাণ্ড এবং অসাধ্য সমস্যার বোঝা চাপিয়ে তোমার চেয়ে তাদের অমন বিভ্রান্তি আর মানসিক যন্ত্রণায় আর কেউ  ফেলে যেতে পারত না। সুতরাং, তুমি নিজের রাজ্যের ধ্বংসের ভিত্তি স্থাপন করেছ এবং এর জন্য তুমি ছাড়া আর কেউ দায়ী নয়। "ইতিমধ্যে, সাফল্যের সমস্ত সুযোগ তোমাকে দেয়া হয়েছিল।" পৃথিবীতে তিনটি ক্ষমতাশক্তি আছে, এই দুর্বল বিদ্রোহীদের বিবেককে ফুসলিয়ে চিরকালের জন্য বিজয় পাবার-- মানুষকে-- তাদের নিজেদের ভালোর জন্য; এবং এই ক্ষমতাশক্তি হল: অলৌকিকতা, রহস্য এবং কর্তৃত্ব। তুমি তিনটিকেই প্রত্যাখ্যান করেছ। আর তুমিই প্রথম উদাহরণ স্থাপন করলে। যখন মহান ও জ্ঞানী আত্মা তোমাকে মন্দিরের চূড়ায় বসিয়েছিল এবং তোমাকে বলেছিল, "আপনি যদি ঈশ্বরের পুত্র হন, তাহলে নিজেকে নামিয়ে আনুন, কারণ এটি ইতিমধ্যে লিখিত যে, ঈশ্বর আপনার দেবদূতদের আপনার দায়িত্ব দেবেন: এবং  তারা হাতে করে তুলে ধরে আপনাকে বয়ে নিয়ে যাবে, যাতে না আপনি পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে যান।” এইভাবে তোমার পিতার প্রতি বিশ্বাস স্পষ্ট হত, কিন্তু তুমি তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে এবং তাকে মান্যতা দিলে না। ওহ, নিঃসন্দেহে, তুমি এই সমস্ত অভাবনীয় ব্যাপার সম্পর্কে গর্বের সাথে একজন ভগবানের মতন আচরণ করেছিলে, কিন্তু তারপর মানুষর-- সেই দুর্বল আর দ্রোহী জাতি-- তারাও কি ভগবান, যে তোমার প্রত্যাখ্যান বুঝতে পারেনি? অবশ্যই, তুমি ভালভাবেই জানতে যে, এক ধাপ এগিয়ে গেলে, নিজেকে নামিয়ে আনার সামান্যতম প্রয়াস করলে, তুমি "নিজের প্রভু নিজের ঈশ্বরকে" প্রলুব্ধ করতে, হঠাৎ তার প্রতি অবাধ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে, এবং নিজেকে পৃথিবীর ধুলোর পরমাণুতে পালটে ফেলতে, সেই একই পৃথিবী, যাকে তুমি বাঁচাতে এসেছিলে, এবং এইভাবে সেই জ্ঞানী আত্মাকে অনুমতি দিতে যে তোমাকে জয়ী ও আনন্দিত করতে প্রলুব্ধ করেছিল। যাই হোক, তাহলে, এই পৃথিবীতে তোমার মতো কতজনকে পাওয়া যাবে, আমি তোমার কাছে জানতে চাইছি? তুমি কি কখনও এক মুহূর্তের জন্যও ভেবে দেখেছ যে মানুষেরও অমন প্রলোভন প্রতিরোধ করার শক্তি আছে? জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুহূর্তে, যখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বেদনাদায়ক এবং বিভ্রান্তিকর সমস্যাগুলি মানুষের আত্মার মধ্যে লড়াই করে, সত্যিকারের সমাধানের জন্য তার হৃদয়ের মুক্ত সিদ্ধান্তের জন্য অলৌকিকতা এবং বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করার মতন মানুষের প্রকৃতি কি গড়া হয়েছে? ওহ, তুমি ভাল করেই জানো যে তোমার সেই কর্মকাণ্ড যুগ যুগ ধরে বইতে লিখে রাখা থাকবে, পৃথিবীর শেষ সীমায় তা পৌঁছে যাবে, আর তোমার আশা ছিল যে, তোমার পদাঙ্ক অনুসরণ করে, মানুষ তার ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে, কোনও রকম অলৌকিকতা ছাড়াই তার বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখবে! কিন্তু তুমি জানতে না, মনে হয়, মানুষ যত তাড়াতাড়ি অলৌকিকতাকে প্রত্যাখ্যান করবে ঠিক ততো তাড়াতাড়িই ঈশ্বরকে প্রত্যাখ্যান করবে, কেননা মানুষ ঈশ্বরকে ততোটা চায় না, যতটা তাঁর কাছে তাঁরই 'একটি প্রতীক' মানুষ চায়। এবং এইভাবে, যেমন অলৌকিক ঘটনা ছাড়া মানুষ থাকতে পারে না, তাই, অলৌকিকতা ছাড়া বেঁচে থাকার বদলে, সে নিজের জন্য নিজেই নতুন বিস্ময় তৈরি করবে; এবং সে একজন দ্রোহী, একজন বিদ্বেষী, এবং একশো বার নাস্তিক হয়ে, গণৎকারের হাতসাফাই, বুড়ি ডাইনির জাদুর কাছে মাথা নত করবে এবং পুজো করবে। যখন মানুষ ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে এবং মাথা নাড়িয়ে তোমাকে বলছিল-- "তুমি যদি নিজেকে ঈশ্বরের পুত্র মনে করো, তাহলে নিজেকে বাঁচাও, আর আমরা তাহলে তোমাকে বিশ্বাস করব," তখন ক্রুশকাঠ থেকে নামতে তোমার অস্বীকৃতি, সেই একই দৃঢ় সঙ্কল্পের কারণে-- অলৌকিকতার মাধ্যমে মানুষকে দাসানুদাস করতে অস্বীকার করেছিলে, অথচ তোমার প্রতি বিশ্বাস অর্জন করেছ কোনও রকম জাদুকরি প্রভাব ছাড়াই। তুমি মুক্তমনা এবং অপ্রভাবিত প্রেমের জন্য আকুল ছিলে, এবং দাসদের আবেগপ্রবণ শ্রদ্ধা প্রত্যাখ্যান করেছিলে যাতে তাদের ইচ্ছাবোধ একটি ক্ষমতাশক্তির কাছে চিরকালের জন্য অধীন হয়ে যায়। তুমি মানুষকে উঁচুতে বসিয়ে বিচার করো, অথচ, তারা দ্রোহীও, তারা জন্মগত দাস এবং তার বেশি কিছু নয়। ভাবো, আরেকবার তাদের বিচার করো, আজ যখন সেই মুহূর্ত থেকে পনেরো শতক কেটে গেছে। তাদের দিকে তাকাও, যাদের তুমি নিজের স্তরে উন্নীত করার চেষ্টা করেছিলে! আমি শপথ করে বলতে পারি যে মানুষ তোমার চেয়ে দুর্বল আর নিচুস্তরের যা তুমি কখনও কল্পনা করোনো। তুমি যা আশা করেছিলে তা কি পেয়েছ? তাকে এত দামি করে তুলে এমন আচরণ করেছো যেন তোমার হৃদয়ে তাদের জন্য কোনও ভালবাসা নেই, কারণ মানুষ তা দিতে না পারলেও তুমি তার কাছ থেকে বেশি কিছু চেয়েছো— হ্যাঁ তুমি, যে কিনা মানুষকে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসে! তুমি যদি মানুষকে কম সম্মান করতে, তাহলে তুমি তার কাছে কম দাবি করতে, এবং এটি ভালবাসার মতোই হত, কারণ তার বোঝা হালকা করা হত। মানুষ দুর্বল এবং কাপুরুষ।  ব্যাপারটা কেমন হবে, যদি সে এখন আমাদের ইচ্ছা ও শক্তির বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে দাঙ্গা এবং দ্রোহ বাধায়, এবং সেই দ্রোহের কারণে গর্ববোধ করে? এটি একটি স্কুল-বালকের ক্ষুদ্র অহংকার এবং অসার। এটা ছোট বাচ্চাদের তাণ্ডব, যেন ক্লাসে বিদ্রোহ করা আর শিক্ষককে বাইরে বের করে দেওয়া। কিন্তু এটা দীর্ঘস্থায়ী হবে না, এবং যখন তাদের বিজয়ের দিন শেষ হবে, তখন তাদের এর জন্য বড়ো দাম চোকাতে হবে। তারা মন্দির ধ্বংস করবে এবং গুঁড়িয়ে দেবে, পৃথিবীকে রক্তে প্লাবিত করবে। কিন্তু নির্বোধ শিশুদের মতন একদিন শিখতে পারবে যে, তারা দ্রোহী আর প্রবৃত্তিগত কারণে বিদ্রোহী হলেও, তারা দীর্ঘ সময় বিদ্রোহের মনোভাব বজায় রাখার পক্ষে খুব দুর্বল। মূর্খের কান্নায় ভুগে তারা স্বীকার করবে যে, যিনি তাদের বিদ্রোহী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিঃসন্দেহে তাদের ব্যঙ্গ করার জন্য তা করেছেন। তারা হতাশ হয়ে কথাগুলো ঘোষণা করবে, এবং এই ধরনের নিন্দনীয় উক্তি তাদের দুঃখ-কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেবে— কারণ মানুষের স্বভাব নিন্দা সহ্য করতে পারে না, এবং শেষ পর্যন্ত  প্রতিশোধ নেয়। "আর এইভাবে, মানবজাতি এবং তার মুক্তির জন্য তোমার ভোগান্তির পরেও, মানুষের বর্তমান অবস্থাকে তিনটি সারশব্দে বলা যেতে পারে: অশান্তি, বিভ্রান্তি, দুর্দশা! তোমার মহান ভবিষ্যবক্তা সন্তজন তার দিব্যদৃষ্টি নথিভূক্ত করে গেছে যে সে দেখেছিল—ঈশ্বরের নির্বাচিত সেবকদের প্রথম পুনরুত্থানের সময়ে-- তাদের কপালে "তাদের যে সংখ্যাচিহ্ণ খোদাই করা ছিল", তা প্রতিটি গোত্রের 'বারো হাজার' লোকের । কিন্তু সত্যিই কি তারা এতোজন? সেক্ষেত্রে তারা মানুষ নয়, তারা দেবতা। সুদীর্ঘ বছর তারা তোমার ক্রুশকাঠ বয়েছিল, বছরের পর বছর ধরে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত দেহে, ভয়াবহ বিজনপ্রান্তর এবং মরুভূমিতে, পঙ্গপাল এবং শেকড় খেয়ে-- এবং তোমার প্রতি অবাধ ভালোবাসার এই শিশুর দল, এবং তোমার নামে আত্মত্যাগকারী, তুমি তো নিশ্চয়ই গর্ব  অনুভব করেছিলে, না কি? কিন্তু মনে রেখো, এরা মাত্র কয়েক হাজার-- দেবতাই, মানুষ নয়; এবং বাদবাকিরা? আর শক্তিমানরা যা সহ্য করতে পেরেছে তা দুর্বলরা সহ্য করতে পারছে না বলে কেন তার জন্য দুর্বলকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে? কেন এমন ভয়ঙ্কর ক্ষমতা ধারণ করতে অক্ষম এক আত্মাকে তার দুর্বলতার জন্য শাস্তি দেওয়া হবে? তুমি কি সত্যিই  একা এসেছিলে, যারা 'নির্বাচিত', তাদের জন্য? যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের সীমাবদ্ধ মনে রহস্যখানা চির-রহস্যময় থেকে যাবে। এবং যদি তা রহস্যই হয়, তাহলে কি আমরা একে সেই হিসাবে ঘোষণা এবং প্রচার করে ঠিক কাজ করেছিলুম, তাদের শিক্ষা দিয়েছিলুম যে, তোমাকে দেওয়া তাদের অপরিসীম ভালোবাসা বা বিবেকের স্বাধীনতা যা-ই হোক, তা মোটেই জরুরি নয়, বরং কেবল সেই অজ্ঞাত রহস্য, যা তাদের অন্ধভাবে মেনে চলতে হবে, এমনকি তা  তাদের বিবেকের বিরুদ্ধে হলেও তাকে মেনে চলতে হবে। আমরা সেটাই শিখিয়েছি। আমরা তোমার শিক্ষাকে সংশোধন করে উন্নত করেছি এবং তাকে "অলৌকিকতা, রহস্য এবং কর্তৃত্ব"-র উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছি। আর মানুষ আরেকবার গোরুর পালের মতন নিজেদের জন্য হুকুম পেয়ে তা তামিল করতে উল্লসিত বোধ করেছে, এবং শেষ পর্যন্ত তোমার চাপানো ভয়াবহ বোঝা থেকে নিজেদের হৃদয়কে মুক্ত করতে পেরেছে, যা তাদের কষ্টের কারণ হয়ে গিয়েছিল। আমাকে বলো তো, আমরা কি ঠিক কাজ করিনি? আমরা কি মানবতার প্রতি আমাদের মহৎ ভালোবাসা দেখাইনি, তাদের নম্র চেতনার  অসহায়তাকে অনুধাবন করে, দয়াশীলতায় তাদের ভারি বোঝা হালকা করে, এবং তার দুর্বল স্বভাবের জন্য প্রতিটি পাপের অনুমতি প্রদান করে এবং ক্ষমাশীল হয়ে আমরা কি তাদের মঙ্গল করিনি, যদি তারা তা আমাদের অনুমোদন অনুযায়ী করে থাকে? তাহলে, কেন তুমি আবার আমাদের কাজে বাগড়া দিতে এসেছ? আর  কেনই বা তুমি আমার দিকে এত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নম্র চোখে তাকিয়ে আছ, আর এমন চুপচাপ? বরং তোমার তো ক্রুদ্ধ হওয়া  উচিত, কারণ আমি তোমার ভালোবাসা চাই না, আমি তা প্রত্যাখ্যান করছি, আর আমি তোমাকে নয়, নিজেকে ভালোবাসি। আমি কেন তোমার কাছে সত্য গোপন করব? আমি বেশ ভালোভাবেই জানি কার সাথে আমি এখন কথা বলছি! আমার যা বলবার ছিল তা তুমি আগে থেকে জানতে, আমি তা তোমার চোখের ভাষা থেকে বুঝতে পেরেছি। আমি কেনই বা তোমার কাছ থেকে আমাদের রহস্য গোপন করব? তুমি যদি আমার মুখ থেকে শুনতে চাও, তাহলে শোনো: তুমি ঈশ্বরপুত্র হলেও তোমার  সঙ্গে আমরা নেই, বরং ওনার সঙ্গে আছি, আর সেটাই আমাদের গোপন রহস্য! বহু শতাব্দী ধরে আমরা তোমাকে পরিত্যাগ করে ওনাকে অনুসরণ করেছি, হ্যাঁ-- আট শতক। আজ থেকে আটশো বছর হল যখন আমরা তাঁর কাছ থেকে তোমার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত উপহারটি ধিক্কার দিয়ে গ্রহণ করেছি; সেই শেষ উপহার যা উনি তোমাকে পাহাড়ের চূড়ায় উপহার দিয়েছিলেন, যখন পৃথিবীর সমস্ত রাজ্য এবং তাদের গৌরব দেখিয়ে তিনি তোমাকে বলেছিলেন: "যদি তুমি নিচে নেমে আমার পুজো করো তবে এই সবকিছু আমি তোমাকে দিয়ে দেব!" আমরা তাঁর কাছ থেকে নিয়েছিলাম রোম সাম্রাজ্য, আর সম্রাট সিজারের তরোয়াল, আর  নিজেদের এই পৃথিবীর একমাত্র রাজা হিসেবে ঘোষণা করেছিলাম, যদিও আমাদের কাজ এখনও পুরো সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু এর জন্য কাকে দোষী করা হবে? আমাদের কাজ এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, কিন্তু  শুরু তো করা গেছে। এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হয়ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, এবং ততদিন মানবজাতিকে অনেক কষ্ট পেতে হবে, কিন্তু আমরা একদিন নিশ্চিত লক্ষ্যে পৌঁছব, এবং জগতের একমাত্র কর্তা হবো, এবং তারপর মানুষের সার্বজনীন সুখের কথা ভাববার সময় পাওয়া যাবে। "তুমি নিজে সম্রাট সিজারের তরোয়াল তুলে নিতে পারতে; কেন তুমি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলে? শক্তিশালী আত্মার দেয়া তৃতীয় প্রস্তাবটা গ্রহণ করলে তুমি জগতের প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারতে, যা মানুষ নিজের জন্য চায়; মানুষ পুজো করার জন্য একটা অটল বস্তু খুঁজে পেত; যা তার বিবেককে উপস্থাপিত করতে পারত, এবং অপরটি সবাইকে একত্রিত করে  সর্বজনীন এবং সমন্বয়পূর্ণ পিঁপড়ে-পাহাড়ে পরিণত করতে পারত; কেননা ভূবনব্যাপী মিলনের জন্য একটি সহজাত প্রয়োজন হল মানবজাতির জন্য তৃতীয় এবং চূড়ান্ত দুর্বিপাক; যা সমগ্রভাবে মানুষ নিজেদের একত্রিত করার জন্য করেনি। অনেক তো ছিল, মহান ইতিহাসের মহান জাতি, কিন্তু তারা যতো বড়ো ছিল, তারা ততো অসন্তুষ্ট বোধ করেছে, কেননা তারা মানুষের  একটি সার্বজনীন একীকরণের প্রবল প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। তৈমুর আর চেঙ্গিজ খানের মতো মহান বিজেতারা, জয় করার প্রচেষ্টায় পৃথিবীর মুখে ঘূর্ণিঝড়ের মতন আছড়ে পড়েছে, কিন্তু তারাও, হয়তো অসচেতনভাবে, সর্বজনীন এবং সাধারণ একীকরণের জন্য একই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। জগতের রাজত্ব এবং সিজারের রাজসিক বেগুনি পোশাক গ্রহণ করে, যে-কেউ সার্বজনীন রাজ্য খুঁজে পেত, এবং মানবজাতির কাছে অনন্ত শান্তি আনতে পারত। আর যিনি মানবজাতির বিবেকের অধিকারী হয়েছেন এবং তাদের হাতে মানুষের দৈনন্দিন রুটি দিতে পেরেছেন তাঁর চেয়ে ভালো আর কে-ই বা মানবজাতিকে শাসন করতে পারেন? সিজারের তরোয়াল এবং বেগুনি পোশাক গ্রহণ করে, আমরা নিঃসন্দেহে, তোমাকে বঞ্চিত করেছি, এখন থেকে তাঁকে একাই তুমি অনুসরণ করবে। ওহ, বহু শতাব্দীর বুদ্ধিবৃত্তিক হাতাহাতি এবং বিদ্রোহের মুক্ত চিন্তাধারা এখনও আমাদের সামনে রয়েছে, এবং তাদের বিজ্ঞান ফুরিয়ে যাবে নরমাংসভক্ষণে, কেননা আমাদের সাহায্য ছাড়াই ব্যাবিলনের মিনার গড়া শুরু করার পর, ওদের তা শেষ করতে হবে নরমাংসভক্ষণে। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই নৈরাজ্যবাদী দৈত্যটা আমাদের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করবে, আর আমাদের পায়ের তলা চাটবে, এবং তাতে রক্তের অশ্রু ছিটিয়ে দেবে আর আমরা রক্তবর্ণ দৈত্যটার ওপর বসে থাকব, আর 'জঘন্য ও নোংরামিতে পরিপূর্ণ' সোনার পেয়ালাটা উঁচুতে তুলে ধরে দেখাবো যে তার উপরে  'রহস্য' শব্দটি লেখা রয়েছে! কিন্তু কেবল তারপরই মানুষ শান্তি ও সুখের রাজ্যের সূচনা দেখতে পাবে। তুমি তোমার নিজের নির্বাচিতদের নিয়ে গর্বিত, কিন্তু এই নির্বাচিতরা ছাড়া তোমার আর কেউ নেই, এবং আমরা-- আমরা বাদবাকি সবাইকে বিশ্রাম দেব। কিন্তু সেটাই শেষ নয়। তোমার নির্বাচিতরা এবং তোমার আঙুর ক্ষেতের শ্রমিকদের মধ্যে অনেকেই, যারা তোমার আরেকবার আসার অপেক্ষায় ক্লান্ত, তারা তাদের হৃদয়ের দুর্দান্ত উদ্দীপনা এবং তাদের আধ্যাত্মিক শক্তিকে ইতিমধ্যে অন্য ব্যাপারে নিয়ে গেছে, আর আজও নিয়ে যাচ্ছে, এবং শেষ পর্যন্ত তোমার বিরুদ্ধে তোমারই মুক্তির পতাকা তুলবে। কিন্তু তার জন্য তোমাকে নিজেকেই ধন্যবাদ দিতে হবে। আমাদের শাসনের অধীনে এবং দাপটে সকলেই আনন্দে থাকবে, এবং তোমার মুক্ত পতাকার অধীনে তারা যেমন বিদ্রোহ করত, বা একে অপরকে ধ্বংস করত, তা আর করবে না। ওহ, আমরা যত্ন নিয়ে তাদের কাছে প্রমাণ করব যে তারা যদি সম্পূর্ণ মুক্তি পেতে চায়, তাহলে তাদের  আমাদের খাতিরে নিজেদের স্বাধীনতাকে বাতিল করতে হবে আর পুরোপুরি আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। তুমি কী ভাবছ যে আমরা ধ্রুব কথাবর্তা বলছি নাকি মিথ্যা আওড়াচ্ছি? ওরা সবাই নিজেদের কাছে আমাদের ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে, কেননা ওরা দেখবে যে, তোমার দেওয়া মুক্তি ওদের কতটা অবমাননাকর দাসত্ব এবং সংঘাতের দিকে নিয়ে গেছে। মুক্তি, চিন্তার স্বাধীনতা এবং বিবেকের স্বাধীনতা এবং বিজ্ঞান তাদের এমন দুর্গম বাধাবিপত্তির মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলবে, এমন সমস্ত বিস্ময় ও সমাধানের অতীত রহস্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে, যে তাদের মধ্যে কেউ কেউ-- যারা বাকিদের চেয়ে বেশি বিদ্রোহী এবং বেপরোয়া-- নিজেদের ধ্বংস করে ফেলবে; অন্যরা-- বিদ্রোহী হলেও দুর্বল-- একে অপরকে ধ্বংস করবে; বাদবাকিরা, দুর্বল, অসহায় এবং দুঃখী, ফিরে এসে আমাদের পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে পড়বে আর কেঁদেকেঁদে বলবে: "হ্যাঁ, যিশুর পিতা, আপনিই যথার্থ ছিলেন; আপনি একা ঈশ্বরের রহস্যের অধিকারী, এবং আমরা আপনার কাছে ফিরে এসেছি, প্রার্থনা করছি যে আমাদের নিজের কাছ থেকে আপনি আমাদের রক্ষা করুন!" আমাদের কাছ থেকে খাবার রুটি পেয়ে,  তারা স্পষ্টভাবে টের পাবে যে আমরা তাদের কাছ থেকেই রুটি নিই, যে রুটি তাদের নিজের হাতে তৈরি, কিন্তু সমানভাবে কোন অলৌকিকতা  ছাড়াই তাদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়; আর তা উপলব্ধি করার পর, যদিও আমরা পাথরকে রুটিতে রূপান্তরিত করিনি, তবুও রুটি তারা পেয়েছে, যখন কিনা অন্য প্রতিটি রুটি সত্যই তাদের নিজের হাতে পাথরে পরিণত হয়েছে, তারা তা পেয়ে বরং অত্যন্ত আনন্দিত হবে। ততদিন পর্যন্ত, তারা কখনও সুখী হবে না। আর কে তাদের অন্ধ করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে, বলো তুমি? তুমি ছাড়া আর কে-ই বা জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে  অজানা পথে পরিচালিত করেছে? কিন্তু আমরা আরও একবার ভেড়াগুলোকে খেদিয়ে আনবো আর চিরকালের জন্য আমাদের হুকুমের অধীনে রাখব। আমরা তাদের নিজস্ব দুর্বলতা প্রমাণ করে দেবো, এবং তাদের আবার হৃতমান করে রাখব, যদিও তারা তোমার কাছে শুধুমাত্র গর্ব করতে শিখেছে, কেননা তাদের যোগ্যতার চেয়ে বেশি তুমি তাদের গুরুত্ব দিয়েছ। আমরা তাদের সেই শান্ত, নিরহঙ্কার সুখ দেব, যা অমন দুর্বল, মূর্খ প্রাণীদের উপকার করে, এবং একবার তাদের দৃষ্টিতে তাদেরই দুর্বলতা প্রমাণ করার পর, তারা হয়ে উঠবে ভীরু এবং অনুগত, এবং মুরগির বাচ্চারা যেমন মুরগির চারপাশে জড়ো হয়, তেমন আমাদের চারপাশে ঘুরঘুর করবে। তারা অবাক হয়ে আমাদের কুসংস্কারের প্রশংসা করবে আর এত গৌরবময় ও জ্ঞানী মানুষের নেতৃত্ব দেখে তাদের মুষ্টিমেয় কয়েকজন মিলে লক্ষ-কোটি মানুষের দলকে বশীভূত করতে পারবে। মানুষ ক্রমে আমাদের ভয় পেতে শুরু করবে। আমাদের সামান্যতম ক্রোধে তারা ঘাবড়ে যাবে, তাদের বুদ্ধি দুর্বল হয়ে যাবে, তাদের চোখ শিশু এবং মহিলাদের মতো সহজেই কান্নায় ভেসে যাবে; কিন্তু আমরা তাদের দুঃখ এবং কান্না থেকে হাসি, শিশুসুলভ আনন্দ এবং আনন্দময় গানের সহজ অবস্থান্তর শেখাব। হ্যাঁ; আমরা তাদের ক্রীতদাসের মতো কাজ করতে বাধ্য করব, কিন্তু তাদের বিনোদনের সময় তাদের একটি নিষ্পাপ শিশুর মতো জীবন থাকবে, খেলাধুলা এবং আনন্দময় উল্লাসে ভরপুর। এমনকি আমরা তাদের পাপ করার অনুমতি দেব, কেননা দুর্বল এবং অসহায়, তার দরুণ তারা আমাদের  প্রতি আরও বেশি ভালবাসা অনুভব করবে, যাতে তারা এতে লিপ্ত হতে পারে। আমরা তাদের বলব যে, সব ধরনের পাপ থেকে তারা পরিত্রাণ পাবে, যদি সেগুলো আমাদের অনুমতি নিয়ে করা হয়; যাতে এই সমস্ত পাপের দায় আমরা নিজেদের উপর নিয়ে নিই, কারণ আমরা জগতকে এতই ভালবাসি যে, আমরা তার সন্তুষ্টির জন্য আমাদের আত্মাকে উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত। আর, তাদের সামনে বলির পাঁঠা এবং উদ্ধারকারীর আলোয় হাজির হলে, আমদের আরও বেশি শ্রদ্ধা করা হবে। আমাদের কাছে তাদের কোনও গোপনীয়তা থাকবে না। তাদের স্ত্রী আর রক্ষিতাদের সঙ্গে বসবাসের অনুমতি দেওয়া, অথবা তা নিষিদ্ধ করা, সন্তান বিয়োনো বা নিঃসন্তান থাকা, নির্ভর করবে আমাদের প্রতি তাদের আনুগত্যের মাত্রার ওপর; এবং তারা তাদের আত্মার সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক রহস্য আমাদের কাছে আনন্দের সাথে খোলাখুলি বলবে— সবাই, তারা সবাই আমাদের পায়ের কাছে লুটিয়ে থাকবে, এবং আমরা তাদের কাণ্ড-কারখানা তোমার নাম নিয়ে অনুমোদন করব, এবং মাফ করে দেব, আর তারা আমাদের বিশ্বাস করবে এবং উল্লসিত হয়ে আমাদের মধ্যস্থতা স্বীকার করবে, কেননা এটি তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এবং নির্যাতন থেকে মুক্তি দেবে— নিজেদের জন্য স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সিদ্ধান্তের বোঝা থেকে বাঁচবে। এবং সকলেই খুশি হবে, সবাই, তাদের দু-এক দল শাসক ছাড়া বাকি সবাই। কারণ আমরা, আমরা যারা  মহান রহস্যের রক্ষক তারাই হব দুর্দশাগ্রস্ত। সেখানে থাকবে লক্ষ লক্ষ সুখী খোকাখুকু, এবং এক লক্ষ শহীদ যারা নিজেদের উপর শুভ ও অশুভ জ্ঞানের অভিশাপ চাপিয়ে নিয়েছে। শান্তিপূর্ণ হবে তাদের অন্তিমযাত্রা, এবং শান্তিপূর্ণভাবে তারা মারা যাবে, তোমার নামে, কবরের চবুতরাগুলোর পেছনে-- সেখানে মরে পড়ে থাকবে। কিন্তু আমরা গোপনীয়তাকে পবিত্র রাখব, এবং তাদের ভালোর জন্য তোমার রাজ্যে অনন্তকালীন জীবনের মরীচিকা দেখিয়ে ঠকাব। কেননা, কবরের ওপারে সত্যিই কি জীবনের মতো কিছু আছে, নিঃসন্দেহে তাদের মতন বোকাদের মগজে তা ঢুকবে না! লোকেরা আমাদের বলে আর তোমার পুনরাগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করি, যে, পৃথিবীতে আরও একবার তুমি বিজয় লাভ করবে; সঙ্গে থাকবে তোমার  নির্বাচিত সেনাবাহিনী, গর্বিত এবং শক্তিশালী; কিন্তু আমরা তোমাকে বোঝাবো যে, তারা নিজেদের বাঁচিয়েছে বটে কিন্তু আমরা সবাইকে রক্ষা করেছি। আমাদের সেই বড় অসম্মানেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে যে, সেই বেশ্যারমণী অপেক্ষা করছে, "মহান ব্যাবিলন, যে কিনা বেশ্যাদের মাতা-ঠাকরুন"-- যিনি বাইবেল-কথিত দানবের ওপর বসে আছেন, তার হাতে রয়েছে ‘রহস্য’, শব্দটা খোদাই করা তার কপালে; এবং আমাদের বলা হয়েছে যে দুর্বলরা, মেষশাবকগুলো তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে এবং তাঁকে নিঃসঙ্গ ও নগ্ন করবে। কিন্তু তারপর আমি উঠে দাঁড়াব, এবং আঙুল তুলে তোমাকে দেখাব পাপমুক্ত সেই লক্ষ লক্ষ সুখী শিশু। এবং আমরা যারা নিজেদের পাপ নিজেদের উপর নিয়েছি, নিজেদের ভালোর জন্য, তোমার সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করব: "আপনি যদি পারেন এবং সাহস থাকে, তবে আমাদের বিচার করে দেখান!" তাহলে জেনে রাখো যে আমি তোমাকে মোটেই ভয় পাই না। জেনে রেখো যে আমিও ভয়াবহ বিজনভূমিতে বাস করেছি, যেখানে আমি পঙ্গপাল এবং শেকড় খেয়ে বেঁচেছিলুম, আমারও আছে পূতস্বাধীনতা, যা দিয়ে তুমি মানুষকে আশীর্বাদ করেছ এবং আমিও একবার তোমার নির্বাচিত, গর্বিতদের দলে যোগ দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিলুম। কিন্তু আমি আমার বিভ্রান্তি কাটিয়ে উঠেছিলুম আর তখন থেকে উন্মাদনার সেবা করতে অস্বীকার করেছি। যারা তোমার ভুল সংশোধন করেছে তাদের সৈন্যদলে যোগ দিতে আমি ফিরে এসেছি। আমি গর্বিতদের ছেড়ে সত্যকার নম্রদের কাছে ফিরে এসেছি, আর তা স্রেফ তাদের নিজেদের সুখের জন্য। এখন আমি তোমাকে যা বলছি তা মুছে যাবে, এবং আমাদের রাজ্য ঠিকই গড়ে উঠবে, আমি তোমাকে বলছি, আগামীকালের পরই তুমি সেই অনুগত মানুষের দল দেখতে পাবে, যারা আমার হাতের একটি ইশারায় ছুটে গিয়ে তোমার খুঁটিতে জ্বলন্ত কয়লা ফেলবে, যার ওপর দাঁড় করিয়ে আমি তোমাকে আগুনে পুড়িয়ে মারব, আমাদের কাজে গোলমাল বাধাবার সাহস করার জন্য। কারণ, যদি কখনও কেউ থেকে থাকে যে আমাদের ইনকুইজিশনের অগ্নিকুণ্ডে পুড়ে মরার যোগ্য-- তাহলে সে তুমি! আগামীকাল আমি তোমাকে পুড়িয়ে মারব। যা বলার ছিল তা বলে দিলুম।" 

আইভান থামল। ও ঘটনার মধ্যে সেঁদিয়ে গিয়েছিল আর প্রবল উত্তেজনায় কথা বলছিল, কিন্তু  হঠাৎ ফেটে পড়ল হাসতে হাসতে। 

"কিন্তু এ-সবকিছুই অযৌক্তিক!" অ্যালিয়োশা আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, যে ততক্ষণ পর্যন্ত বিভ্রান্ত এবং উত্তেজিত হয়ে চুপচাপ শুনছিল। "তোমার কবিতাটা খ্রিষ্টের মহিমা, মোটেই অভিযোগ নয়, যেমনটা তুমি, সম্ভবত, বোঝাতে চাইছিলে। আর কে-ই বা তোমাকে বিশ্বাস করবে যখন তুমি ‘মুক্তির’ কথা বলছ? ব্যাপারটা তাহলে কি আমাদের খ্রিস্টানদের বোঝা উচিত? তাহলে কি রোম (সমস্ত রোম নয়, সেকথা বলা অন্যায় হবে), কিন্তু রোমান ক্যাথলিকদের মধ্যে যারা সবচেয়ে খারাপ, ইনকুইজিটর আর জেসুইটরা, তাদের তুমি ফাঁস করতে চাইছিলে! তোমার ইনকুইজিটর তো একখানা বিদকুটে চরিত্র। কোন পাপগুলোর দায় তারা নিজেদের উপর নিচ্ছে? ওই সমস্ত রহস্যের রক্ষক কারা, যারা মানবজাতির কল্যাণের জন্য নিজেদের উপর অভিশাপ চাপিয়ে নিয়েছিল? তাদের সাথে কারোর কখনও দেখা হয়েছে? আমরা সবাই জেসুইটদের জানি, এবং তাদের পক্ষে ভালো কথা বলার কেউ নেই; কিন্তু তুমি তাদের যেমনভাবে তুলে ধরলে, তেমনটা কবে ছিল তারা? কক্ষনো ছিল না, কক্ষনো নয়! জেসুইটরা কেবল রোমান ক্যাথলিকদের একটা সেনাবাহিনী, যারা নিজেদের পার্থিব ভবিষ্যতের সাম্রাজ্যের জন্য তৈরি করছে, চাইছে একজন মুকুটপরা সম্রাট-- তাদের মাথার ওপর একজন রোমান প্রধান যাজক। সেটাই তাদের আদর্শ আর উদ্দেশ্য, যার মধ্যে কোনও রকম রহস্য বা অসহ্য যন্ত্রণা নেই। ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে প্ররোচিত চাহিদা, জীবনের মামুলি আর পার্থিব সুখের জন্য, নিজেদের লোকেদের দাস বানিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা, অনেকটা আমাদের দেশের কেনা গোলামের ব্যবস্থার মতন কিছু, নিজেদের ভূমি মালিক হিসাবে বজায় রাখা-- তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করা যেতে পারে। তারা হয়তো ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, এমনটাও সম্ভব, কিন্তু তোমার ওই যন্ত্রণাভোগী ইনকুইজিটর একেবারে ফালতু-- নিছক কষ্টকল্পনা!" 

"থামো! থামো!" আইভান বাধা দিয়ে হাসতে থাকে। "এত উত্তেজিত হয়ো না। তুমি বলছ এটা কষ্টকল্পনা, না-হয় তাই হোক! কিন্তু দাঁড়াও। অবশ্যই, এটা অভিনব। নিছক 'আনন্দ' কি এর উদ্দেশ্য? এটা কি যাজক প্যাসি তোমাকে শিখিয়েছেন?"

"না, না, একদম উল্টো, কারণ ফাদার প্যাসি একবার আমাকে নিজে যা বলেছিলেন, তার মতন কথাই তুমি বলছ, যদিও, হুবহু তা নয়-- একেবারে অন্যরকম কিছু" বলল আলেক্সিস, বেশ লজ্জায় পড়ে। 

"একটা দামি তথ্য, যদিও তোমার 'তা নয়' বলার পরও। আচ্ছা, আমাকে তুমি বল, তোমার কল্পনার ইনকুইজিটর আর জেসুইটরা 'মামুলি বস্তুগত সুখ' অর্জনের কারণ ছাড়া আর কেনই বা বেঁচে থাকতে চাইবে? কেন তাদের মধ্যে একজন সত্যিকারের শহিদকে পাওয়া যাবে না, যে একটা মহান এবং পবিত্র ধারণার নিয়ে যন্ত্রণা ভোগ করছে এবং হৃদয় দিয়ে মানবতাকে ভালোবেসেছে? এখন ধরে নিই যে এই 'মামুলি বস্তুগত সুখ' এর জন্যে হাঘরের মতন পড়ে থাকা সত্ত্বেও এই জেসুইটদের মধ্যে অন্তত একজন থাকতে পারে, আমার বুড়ো ইনকুইজিটরের মতন একজন, যিনি নিজে বিজনপ্রদেশে শেকড় খেয়ে বেঁচেছিলেন, মুক্ত ও নিখুঁত হওয়ার প্রয়াসে দেহের কষ্টকে সহ্য করতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু যিনি মানবতাকে ভালবাসায় ঢিলে দেননি কখনও, এবং যিনি একদিন ভবিষ্যদ্বাণীর  সত্য’র সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন; যিনি যতোটা পারেন বুঝতে পেরেছিলেন যে পুরোনো ব্যবস্থায় মানবতার বড় অংশ কখনওই সুখী হতে পারবে না, ব্যাপারটা সেই লোকগুলোর জন্য নয় যারা ভাবে যে একজন মহান আদর্শবাদী এসেছিলেন এবং মৃত্যু স্বীকার করেছিলেন আর ঈশ্বরপুত্রের সর্বজনীন সম্প্রীতির স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই সত্য উপলব্ধি করে, তিনি পৃথিবীতে ফিরে এসেছিলেন আর যোগ দিয়েছিলেন-- বুদ্ধিমান এবং ব্যবহারিক মানুষদের সাথে। এটা কি অত অসম্ভব মনে হয়?" 

"কার সাথে যোগ দিয়েছেন? কোন বুদ্ধিমান আর ব্যবহারিক মানুষ?" অ্যালিয়োশা বেশ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল। "তারা কেনই বা অন্য লোকেদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হবে, আর  তাদের কাছে কোন রহস্য এবং গোপনীয়তা থাকতে পারে? তাদের কোনওটাই নেই। তাদের যা আছে তা হলো নাস্তিকতা এবং অবিশ্বাস। তোমার ইনকুইজিটর ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, এবং এটাতেই যা কিছু রহস্য থাকতে পারে তা আছে!" 

"হয়তো তাই। তুমি ব্যাপারটা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছ। আর সত্যিই এটা তাই, এবং সেটাই লোকটার পুরো রহস্য; কিন্তু এটা কি তাঁর মতো একজন মানুষের কাছে তীব্র যন্ত্রণা নয়, যিনি মরুভূমিতে তপস্যা করে নিজের সমস্ত জীবনযৌবন নষ্ট করেছিলেন, এবং তা সত্ত্বেও সহকর্মীদের প্রতি তাঁর ভালবাসা থেকে নিজেকে নিরাময় করতে পারেননি? তাঁর জীবনের শেষ দিকে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে আরম্ভ করেন যে মহান এবং ভয়ানক আত্মার পরামর্শ মেনে নিলে তবেই এই লক্ষ লক্ষ দুর্বল বিদ্রোহীদের ভাগ্য, 'বিদ্রূপে গড়া অর্ধ-সমাপ্ত মানুষের নমুনাগুলোকে', সহনীয় করে তোলা যায়। আর, একবার ব্যাপারটা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গেলে, তিনি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন যে সেই উদ্দেশ্যকে অর্জন করার জন্য, একজনকে জ্ঞানী আত্মার নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে, যিনি মৃত্যু এবং ধ্বংসের সেই ভয়ঙ্কর আত্মা, অতএব মিথ্যা এবং প্রতারণার একটি পদ্ধতি গ্রহণ করে মানবতাকে সচেতনভাবে মৃত্যু এবং ধ্বংসের দিকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে যেতে হবে, আর তাছাড়া, সব সময় তাদের ঠকাতে হবে, যাতে তারা বুঝতে না পারে যে তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এবং তাই দুঃখী অন্ধ লোকগুলোকে, অন্তত এই পৃথিবীতে তারা যতদিন আছে, আনন্দের বোধে ফুসলিয়ে রাখতে হবে। এবং এটা লিখে নিতে পারো: ঈশ্বরপুত্রের নামে একটি পাইকারি প্রতারণা, যাঁর আদর্শ নিয়ে বুড়োটা এত আবেগপ্রবণ ছিল, এত উদার, তার প্রায় সারা জীবন ধরে বিশ্বাস করেছিল! এটা কি কষ্ট নয়? 

আর এমন একটা একক ব্যতিক্রম যদি পাওয়া যেত, সেই সেনাবাহিনীর মধ্যে এবং শীর্ষে, 'যে কিনা ক্ষমতা ভোগ করার জন্য অথচ জীবনের নীচ সুখের জন্য লালায়িত, 'তুমি কি মনে করো যে অমন একজন মানুষ একটি ট্র্যাজেডি ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট? তাছাড়া, প্রধান নেতা হিসেবে আমার ইনকুইজিটর মশায়ের মতো একজন একক ব্যক্তি, সমগ্র রোমান ক্যাথলিক ব্যবস্থার বাস্তব ধারণাটি জেসুইট লোকজনদের দিকনির্দেশ করার জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হবে, আমার কবিতায় বর্ণিত একাকীত্বের সবচেয়ে বড় এবং প্রধানতম বিশ্বাস কোনও সময়েও আন্দোলনের মূল পরিচালকদের মাথা থেকে উবে যায়নি। কে জানে, সেই ভয়ঙ্কর বুড়ো ছাড়া, মানবতাকে এত দৃঢ়ভাবে, আর আদি উপায়ে ভালবেসেছে, এমনকি আমাদের দিনকালেও তিনি একাকী ব্যতিক্রমের আকারে বজায় রয়েছেন, যার অস্তিত্ব কেবল আকস্মিকতার কারণে নয়, বরং একটি স্পষ্ট পরস্পরনির্ভর সমঝোতা থেকে উঠে এসেছে, এক গোপন সঙ্গঠনের আকারে, যার উন্মেষ হয়েছিল বহু শতক আগে, যাতে রহস্যটিকে দুর্বল ও দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের  হঠকারী দৃষ্টি থেকে রক্ষা করা যায়, এবং তা কেবল কি তাদের নিজেদের আনন্দের জন্য? সুতরাং ব্যাপারটা তেমনই দাঁড়াল; এর অন্যথা হতে পারে না। আমার সন্দেহ হয় যে খ্রিস্টধর্মীর গোপন সংস্হা ফ্রিম্যাসনদের সংগঠনের ভিত্তিতে এ রকমই কোনও না কোনও রহস্য আছে, এবং রোমান ক্যাথলিক পাদ্রিরা যে তাদের ঘৃণা করে, তার কারণ এটাই, তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রতিযোগী, বিশ্বাসের  বিভেদ খুঁজে পাবার ভয়, যা উপলব্ধি করার জন্য গরুর পাল আর একজন রাখাল প্রয়োজন। যাই হোক, আমার ধারণা সমর্থনের উদ্দেশ্যে, আমাকে এমন একজন লেখকের মতন দেখতে লাগছে যে তার লেখালিখির সমালোচনা সহ্য করতে অক্ষম। এটাই যথেষ্ট।"

"তুমি সম্ভবত নিজেই একজন ফ্রিম্যাসন!" বলে উঠল অ্যালিয়োশা। "তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো না," ও যোগ করল, কণ্ঠস্বরে গভীর দুঃখ নিয়ে। কিন্তু হঠাৎ করে মন্তব্য করার দরুণ দেখল যে তার ভাই তার দিকে ঠাট্টার চোখে তাকিয়ে আছে, "তাহলে তুমি কীভাবে তোমার কবিতা শেষ করতে চাও?" ও অপ্রত্যাশিতভাবে জানতে চাইল, চোখ নামিয়ে, "নাকি, এটি এখানেই খতম?"

"আমার উদ্দেশ্য এরকম একটা দৃশ্য দিয়ে শেষ করা: নিজের হৃদয়কে হালকা করে, ইনকুইজিটর মশায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন ঈশ্বরপুত্রের মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য, নৈঃশব্দের বদলে তিক্ত ও তীক্ষ্ণ কথা শুনতে চাইছিলেন। ঈশ্বরপুত্রের স্তব্ধতা ইনকুইজিটরের ওপর বোঝার ভার হয়ে দাঁড়ায়। ইনকুইজিটর এতক্ষণ লক্ষ্য করছিলেন যে তাঁর ঈশ্বরপুত্র মহাআগ্রহে চুপচাপ তাঁর কথা শুনছেন, ইনকুইজিটরের মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে এবং বন্দির চোখ দু'টি মৃদুভাবে স্থির, এবং তা থেকে বোঝা যায় যে বন্দির উত্তর দেবার আগ্রহ নেই। ঈশ্বরপুত্র হঠাৎ উঠে দাঁড়ান; আস্তে আস্তে এবং নীরবে প্রশ্নকর্তার কাছে আসেন, তিনি তাঁর দিকে ঝুঁকে আলতোভাবে রক্তহীন, নব্বুই বছরের ঠোঁটজোড়ায় চুমু খান। এটাই ছিল যাবতীয় উত্তর। থরথর করে কাঁপতে থাকে গ্র্যাণ্ড ইনকুইজিটর; তার মুখের কোনায় দেখা দেয় আক্ষেপ-পীড়িত খিঁচুনি। ইনকুইজিটর দরজার কাছে গিয়ে কপাট খুলে দেয়, এবং ঈশ্বরপুত্রকে উদ্দেশ্য করে বলে, 'যান,' বলে ইনকুইজিটর, 'চলে যান, আর কখনও ফিরে আসবেন না ...আবার আসবেন না ...কখনও না, কখনও না!' এবং ঈশ্বরপুত্রকে অন্ধকার রাতে বেরিয়ে যেতে দেয়। বন্দি অদৃশ্য হয়ে যায়।"

"আর বুড়ো ইনকুইজিটর?"

"চুম্বন তার হৃদয়কে জ্বলিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু বুড়ো তার নিজের ধারণা এবং অবিশ্বাসে অটল ছিল।"

"আর তুমি, তার সাথে? তুমিও!" হতাশ হয়ে অ্যালিয়োশা বলে ওঠে। শুনে, অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে আইভান।

Wednesday, November 10, 2021

সিলভিয়া এউখেনিয়া কাস্তিয়েরোর কবিতা | সেই সামান্য বিরহে

মূল স্প্যানিশ থেকে বাংলায় অনুবাদ | জয়া চৌধুরী


পঞ্চম বসবাস: মোহভঙ্গ 

প্রতিবার যখন ভুট্টার কাণ্ড আরও লাল হতে থাকে

ভুট্টা গাছের পাতা থেকে ঝোলে একটা ফারের পুতুল

বালিকারা লুকোচুরি খেলে

এবং কাকতাড়ুয়াদের অনাবৃত করে ফেলতে থাকে।

সে রয়ে যায় মুখহীন, পরে এক চোখ কানাও,

কান দুটো ওকে হিঁচড়ে টানতে থাকে যতক্ষণে না সে স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।

ফুটো ফুটো জালিকায় ভরা আমার বাবাকে ওরা 

যখন অপহরণ করেছিল ঠিক তেমনটি। 

সেই সমতল বিকেলে 

মনে হচ্ছিল ভুট্টার শীষ বেয়ে বয়ে যাচ্ছে রক্ত;

পুতুলের তখন আর নাক নেই, দেখতে পায় না গন্ধও নয়,

চিৎকার করতেও পারে না, বহু মানুষের মাঝখানে ও মারা গিয়েছে,

যেখানে সব শবদেহ রয়েছে বালিকারা সেখানে ওকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল

তখন সবে ওরা ক’জন ভদ্রলোককে বড় বড় পিস্তল দিয়ে গুলি করে উঠেছিল।


বাহুল্যবর্জিত শূন্য

বিকেলের তীব্র আবেগ

সেই কালিমা যা আমার পিছনে ধেয়ে আসে

সেই শুভ্রতা যা আমার স্কার্টকে রঙিন করে তোলে

পৃথিবীর এই খণ্ডে এ হল গোধূলি

আমাকে দংশায় আগুন

ফুলে ওঠে পেট

মুখ জ্বলতে থাকে

মনে হয় বুক থেকে বের হয়ে আসছে পা দুটো

এ হল ভয় যা কর্কশ আওয়াজে আমার শিরদাঁড়া খায়

সমস্ত ভুট্টা ক্ষেত পুড়তে থাকে

জ্বলতে থাকে সমগ্র জনপদ

বাহুল্যবর্জিত শূন্যরা

দুলতে থাকা বৃক্ষদের দিকে

আমার লাল স্কার্ট ছড়িয়ে পড়ে

বিদ্ধকারী সাঁড়াশিদের মতো

ভাঙা জানলারা পড়ে যায়

আমার পোড়া হাতদুটো জল খোঁজে

এক শ্বাসরোধী আগুন খড়ের উপর চিৎকার করে

ডুবে যাওয়া আমার সে চিৎকার, একটা কাঁপুনি

আগুনে গোটা পাহাড় দুমড়ে যায় 

তোমার ভেদকারী চোখেরা আমাকে পলকহীন রেখে দেয়

শস্যাগারে বাড়তে থাকে আগুন

পাশে পাহাড়ে তখন কেবল বাহুল্যবর্জিত শূন্য।


একটি ক্রিসেন্থিমাম পরিধান করি

এবং চুলের উপর সাদা মুকুট;

মা পরেন সাদা জুঁইফুল

এবং গোলাপের মুকুট, কাঁটাগুলি একটি আঙুলে ফোটে।

কাঠের ড্রয়ারে 

ও তার খুলির ভিতরকার বিরাট গর্তে

বাবার গভীর চাহনিতে মা কেঁদে ওঠেন।

ঠাকুমা বাবাকে গুছিয়ে দিয়েছিল যাতে ওরা তাঁকে দেখতে না পায়

কিন্তু আমার মনে তো ওঁরা থাকবেনই। 

মা জানু ঢাকা মোজা পরেছেন, কুঁজো হয়ে হাঁটেন,

চোখে পাথুরে চাহনি, ওঁর আঙুলের রক্ত

বাবার মুখের ওপরে পড়ে টপ টপ, সঙ্গী থাকা কুমারী 

মেরীর ছবিটিতেও। বাবা হাসতে থাকেন,

হয়ত তখনও পালিয়ে না গিয়ে মেঘের ভিতরে থাকেন,

বাবা ভুট্টাক্ষেত বুনতেন এবং মিথ্যে বলতেন,

তারপর লুকিয়ে পড়তেন 

যতক্ষণ না ফের বেরিয়ে পড়েন এবং পাহাড়ে হারিয়ে যান,

ওঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় ওরা পায়, কথা বলছিলেন না, কেবল মিথ্যে বলছেন।

ক্রিসেনথিমাম ফুলেদের পাপড়ি ঝরে পড়ে,

মৃত্যু গন্ধ ছড়িয়ে ঢলে পড়তে থাকে জুঁই, তবে ঠাম্মার

গ্লাডিওলাসের শাখারা ঢের বেশি সিরিয়াস, সুগন্ধ ছড়ায় না, কাঁটাও ফোটায় না।

তারা দুঃখী হয় না কক্ষনও।


যেদিন থেকে বহুবার ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়া শরীর পড়েছে

ঝোপঝাড় দেখলে মনে হয় কাকতাড়ুয়াদের জন্ম দেবার পক্ষে ওরা যথেষ্ট উর্বর 

এবং বিছানার চাদরের মত ওরা ঝুলতে থাকে

দেখায় যেন তীর বিঁধে আছে কাণ্ডে,

আকাশ অন্ধকার করে দিয়ে পাখিরা চিৎকার করতে থাকে

এবং পালায়।

এককোণে ভীষণ লালচুলো এক ডাইনির উদয় হয়

তার মুখে ঘাস আটকে রয়েছে।

নিরলঙ্কার যন্ত্রণার ভেতরে স্তব্ধ, এ এক গর্ভপাত হওয়া চিৎকার।

ডাইনিটা বেগনি। ট্রেন থেকে ছেঁচড়ে নামিয়ে আনার আগে

ওকে নিশ্চয় ওদের শ্বাসরোধ করে রাখতে হয়েছিল। দুলছিল

ঝড়ের সামনে দোল খাচ্ছে বলে, পাশে থাকা ভুট্টার পাতাদের

দেখে মনে হয় দুর্ভাগ্য দেখে মুখ ভ্যাংচাচ্ছে।

চোখ খুবলে নিতে পাতিকাকেরা এগিয়ে আসে,

দুটি গভীর গর্তের

ভেতরকার গোলকধাঁধা দেখতে রেখে যায়;

পরে শকুনেরা তা খেয়ে ফেলে

ভাঙা হাড়গোড়গুলো ফেলে যায়।

সে নারী প্রতিরাতে লাঙল হাতে

গ্রামবাসীর জানলায় উঁকি দেয়।


আগ্নেয়গিরির মতো, কলঙ্কময় সূর্যের আলোয়

ভরাভর্তি চারমাথার মোড়ে ছোটরা দৌড়াদৌড়ি করে;

দেয়ালে বিষুবরৈখিক স্বরভঙ্গি,

কুটিরশিল্প, ইন্ডিয়ান জনজাতির মানুষ, মদ;

ধীরস্থির বুড়োদের জাল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট 

এবং মেঝে ঢেকে দেয়া পাতারা।

তিনজন পুরুষ কাছে এগিয়ে আসে, হাঁটার সময় তারা একেবেঁকে চলে,

দেখলে মনে হয় চোখ নেই, চারমাথার মোড়ের আধখানা গিয়ে

পালানোর পথ খোঁজে, একটা ডাকের জন্য অপেক্ষা করে, নগ্ন আকাশে

লুকোতে চাইবার এক চিহ্ন,

চারমাথার উপরে ছুরি দিয়ে ফালাফালা করার মতো একটা শতপদী কেঁচো 

পবিত্র নৈবেদ্য-গিঁট,

গলা, হৃৎপিণ্ড। এবং ওরা শুকিয়ে যায়।


আধঘুমন্ত মানুষ।

দ্রুত হাতদা-র ধার দিয়ে স্তন দুটো ছোঁয়।

ট্রেনের ছাদে

মুরগিপালকেরা তাদের হ্যাচারি বয়।

ডানা ক্ষইতে থাকা মোটাসোটা মুরগিরা 

নড়াচড়া করতে পারে না।

পাতা জুড়ে একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ে,

ঘাড়ের প্রধান শিরা প্রতি মুহূর্তে আরও পুরু হয়ে চলে--

এটা ভয়-- ছুরি ও ছেদ চওড়া হতে থাকে,

বাড়তে থাকে-- রক্ত বুদবুদ করে ফুটতে থাকে

বাতাসের সংস্পর্শে কালো হয়ে যায়। 

মাথা চোখ বোজাতে সে অস্বীকার করে

যেন তাদের খুঁজছে।

ভেতর থেকে থকথকে কাদার গন্ধ ফুটতে থাকে।


যেদিন অপহরণ ঘটেছিল

আমার পুতুলটা লাল পুকুরে পড়ে গিয়েছিল,

মাথায় ফুটো ছিল ওটার 

আমরা তখন দৌড়চ্ছিলাম আর মা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

আমার পুতুলটা ভাঙা চোখে আকাশের দিকে 

মুখ করে পড়েছিল 

এবং একটা গর্তের ভেতরে

প্লাস্টিকের মতো দুটো গুলি আটকে ছিল।

আমার ত্বকে ঠাণ্ডা লাগছে 

নখেরা আমায় চিরে ফেলতে আসছে,

আঙুল দিয়ে কেটেও ফেলল।

আমার ক্ষতি করল ওরা। 

শূন্য থেকে নীল চোখে আমার পুতুল

আমার দিকে চেয়ে রইল,

নোংরা রক্তটাকে আমি দেখেই যাচ্ছি।



---------------------------------------------------------

কবি সিলভিয়া এউখেনিয়া কাস্তিয়েরো মানসানো (Silvia Eugenia Castillero Manzano) জন্মেছেন মেক্সিকো শহরে। গুয়াদালাখারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য পত্রিকা ‘লুভিনা’ সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। ২০১২ সালে বাইসেন্টিনিয়াল লেটার্স পুরষ্কার পেয়েছেন। সপরিবারে কলকাতায় এসেছিলেন ২০১৯ সালে। আইসিসিআরে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি।

Saturday, November 6, 2021

মেহুল দেবকলার কবিতা


দুই শহর

আমার সর্বকনিষ্ঠ বন্ধুর জন্য তাঁর ৮০তম জন্মদিনে 


বাংলা অনুবাদ: শ্যামশ্রী রায় কর্মকার 

গুজরাটি থেকে ইংরেজি অনুবাদ: অন্তরা দেবসেন


তুমি কি বিশ্বাস করবে 

শীতের সকালে যে হাসির উষ্ণতা দেয়

সেই শহরের প্রত্যন্ত এক কোণে আমরা ছোট্ট কলকাতা গড়েছি

তোমার হাসির মতো উচ্ছল, প্রাণখোলা সে 


গুরুদেব 

হয়তো কোমল মমতায় 

শিশুটিকে তুলে 

বসিয়েছিলেন তাঁর কোলে

মৃদুস্বরে উচ্চারণ করেছিলেন ন ব নী তা 

তুমি তখনও নিশ্চিত হেসেছিলে


আমি জানি 

এই তীব্র শীতের রাতে 

ভালবাসার কোন ঘরে 

এখন লিখছ তুমি, কিংবা পড়ছ 

পরম শান্তিতে 


মধ্যরাত্রিতে 

তোমার ফোন 

হোয়াটসঅ্যাপ বার্তারা

ভিডিয়ো কলের জন্য 

তুমি অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিলে

ওমনি তোমার চোখ বলে উঠলো অজস্র কথা 


কাঁটা বিছিয়ে রাখা রাস্তায় যখন আমি পথ হারিয়ে ফেলি 

কবিতা ও ক্ষমতার টানাপোড়েনের মাঝখানে 

তুমি এসো হাত ধরো, পথ দেখিয়ে যাও প্রতিবার 

বলে ওঠো, 'মেহুল, তুমি আমার ছেলের মতো'


নিয়তি আর আমি 

সুদূর ভাদোদরায় 

ছোট্ট একটা কলকাতা গড়েছি

এবং আমি জানি 

ওখানেও ছোট্ট ভাদোদারা গড়ে উঠছে 

আর তোমার কবিতার মতো আমাদের বন্ধুত্বও অক্ষয়, শাশ্বত। 


এই তো 

ক'দিন আগে 

তুমি বললে, 'আমার গলা বুঁজে  আসছে' 

আমার বুক কেঁপে উঠল 

কিন্তু জানি 

আমার আগেও ছিলে 

আমার পরেও থাকবে তুমি 

যতদিন এই দুই শহর 

বেঁচে থাকবে


১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

ভাদোদরা



---------------------------------------------------------

মেহুল দেবকলা (Mehul Devkala) সাম্প্রতিক গুজরাটি কবিতার অন্যতম নাম। সমাজকর্মী হিসেবে সুপরিচিত। পাশাপাশি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি নির্মাতা। বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়। যোগ দিয়েছেন সাহিত্য আকাদেমির অল ইন্ডিয়া ইয়ং রাইটার্স মিটে। নবনীতা দেবসেনের স্নেহধন্য।

Thursday, October 21, 2021

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায়


গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

আমি আর আমার ভাই যখন ছোট ছিলাম, বাবা আমাদেরকে একটা কথা দিতে বলেছিলেন: আমরা যেন ২০০০ সালের নববর্ষের আগের দিনটি তাঁর সঙ্গে উদযাপন করি। আমাদের কৈশোরেও তিনি বহুবার এই প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এমন কি তাঁর জোরাজুরিতে আমার একটু অস্বস্তিই হত। কিন্তু বড় হওয়ার পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে এ ছিল তাঁর সেই সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। বিংশ শতাব্দী শেষ লগ্নে যখন পৌঁছবে, তখন তাঁর বয়স হবে বাহাত্তর আর আমার চল্লিশ। ছোটবেলায় কিন্তু ওই সময়টাকে খুব দূরে বলে মনে হত না। পরবর্তীকালে আমরা মানে আমি আর আমার ভাই বড় হয়ে যাওয়ার পর অবশ্য এই প্রতিজ্ঞার কথা আর বিশেষ বলা হত না। তবে ওই দিন আমরা সবাই একসঙ্গে ছিলাম বাবার সবচেয়ে পছন্দের শহরে, কার্তাহেনা দে ইন্দিয়াসে। সেদিন বাবা একটু লাজুক স্বরে আমায় বলেছিলেন, ‘তোমার সঙ্গে আমার একটা চুক্তি ছিল, মনে আছে?।’ সম্ভবত আমাকে জোরাজুরি করার জন্য একটু অস্বস্তিতে ছিলেন। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, মনে আছে।’ সেই দিনের পর থেকে আর কখনও আমরা এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করিনি। তারপর তিনি আরও পনের বছর বেঁচে ছিলেন।

তাঁর বয়স যখন সত্তরের কাছাকাছি, তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘রাতে আলো নিভে যাওয়ার পর কি ভাব?’ ‘ভাবি যে প্রায় শেষ হয়ে এল।’ তারপর একটু হেসে বললেন, ‘তবে আরও কিছু সময় বাকি আছে, এখনই দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই।’ শুধু আমাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যই যে সেকথা বলেছিলেন তা নয়, বাস্তবিক তিনি আশাবাদী ছিলেন। ‘একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখবে যে তুমি বুড়ো হয়ে গেছ। ব্যাপারটা এতটাই আকস্মিক, আগে থেকে কিছুই জানা যায় না, নাটকের মতো আবির্ভূত হয়।’ বাবা বলে চললেন, ‘অনেক বছর আগে একবার শুনেছিলাম যে লেখকের জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন আর দীর্ঘ কাহিনি লিখতে পারা যায় না। মস্তিষ্ক আর তখন উপন্যাসের বিস্তৃত আঙ্গিক বা তার জটিল বুননকে ধারণ করতে পারে না। সেটা যে ঠিক তা এখন বুঝতে পারি। তাই এখন থেকে ছোট ছোট লেখা লিখতে হবে।’

তারপর তাঁর বয়স যখন আশি, তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেমন লাগছে এখন?

-আশির কোঠায় এসে পুরো চিত্রটা বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়। আর শেষের সেই ক্ষণ এগিয়ে আসছে।

-তোমার কি ভয় লাগছে?

-না, গভীর বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হচ্ছি।

এই সব কথাগুলো মনে পড়ে আর তাঁর কথার সারল্য আমায় ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। তবে তার থেকেও বেশি কষ্ট দেয় আমার প্রশ্নের নিষ্ঠুরতা।

২০১৪ সালের মার্চ মাস। একটা সপ্তাহের মাঝামাঝি এক দিন সকালবেলা মাকে ফোন করেছিলাম। মা বললেন যে দুদিন হল ঠাণ্ডা লেগে বাবা বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। বাবার ক্ষেত্রে এটা নতুন কিছু নয়, কিন্তু এবারের অসুখটা যেন একটু আলাদা। মা বললেন, ‘খাচ্ছে না আর উঠেও বসতে চাইছে না। এটা ঠিক আগের মতো নয়, একেবারে কিছুই করতে পারছে না। আলবারোর ঠিক এই রকমভাবেই শুরু হয়েছিল।’ বাবার এক বন্ধুর কথা বললেন মা, তিনি আগের বছর মারা গিয়েছেন। তারপর বললেন, ‘এবার আর ভালো হবে না।’ এ ছিল মায়ের ভবিষ্যৎবাণী। তবুও আমি উদ্বিগ্ন হইনি, ভেবেছিলাম দুশ্চিন্তা থেকেই মা এসব বলছেন। কিছুদিন আগে অল্প সময়ের ব্যবধানে বেশ কয়েকজন কাছের মানুষ চলে গিয়েছেন। তার মধ্যে মাকে সবথেকে কষ্ট দিয়েছিল ছোট দুই ভায়ের মৃত্যু। তাঁরা মায়ের খুব স্নেহের মানুষ ছিলেন। যাই হোক, ফোনটা করার পর থেকে আমি ভাবতে শুরু করলাম, এই কি তবে শেষের শুরু?

আমার মা দু’-দুবার ক্যান্সারকে পরাস্ত করে ভালো হয়ে উঠেছিলেন। সেই ব্যাপারেই কিছু ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাঁকে তখন লস অ্যাঞ্জেলসে যেতে হবে। সেই জন্য ঠিক হল যে আমার ভাই প্যারিস (যেখানে সে থাকে) থেকে মেহিকো শহরে আসবে বাবার পাশে থাকার জন্য। আর আমি মায়ের সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকব। ভাই এখানে আসতেই বাবার হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য ডাক্তারেরা বললেন যে বাবার নিউমোনিয়া হয়েছে। তাই হাসপাতালে ভর্তি করলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা হবে। মনে হল শেষের দিকে ডাক্তারেরা এ কথাটা মাকে আগেই বলেছিলেন, কিন্তু মা তেমন গা করেননি। হতে পারে ডাক্তারি পরীক্ষায় কি বের হবে তাই নিয়ে মা ভয় পাচ্ছিলেন।

পরের কয়েক দিন ধরে ভায়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে হাসপাতালের ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। হাসপাতালে ভর্তি করতে গিয়ে ভাই যেই বাবার নাম বলেছে সেখানে যে মহিলা অফিসার ছিলেন তিনি রীতিমতো আবেগপ্রবণ হয়ে চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে ভগবান! লেখক গার্সিয়া মার্কেস? আমি কি আমার বৌদিকে (অথবা ননদকে) ফোন করে ওনার কথাটা বলতে পারি? এই খবরটা জানা ওঁর পক্ষে খুব জরুরি।’ ভাই তাঁকে সেটা না করতে বিশেষভাবে অনুরোধ করে। তাতে মহিলার মুখটা বেজার হয়ে যায়। তারপর গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য বারান্দার একেবারে শেষে অপেক্ষাকৃত স্বতন্ত্র একটি ঘরে বাবাকে রাখা হয়। কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল দেখা গেল ডাক্তার, নার্স, স্ট্রেচার নিয়ে যাওয়ার লোক, টেকনিশিয়ান, অন্য রুগী, হাসপাতালের তত্ত্বাবধানের কর্মী, মায় সেই অফিসারের বৌদি পর্যন্ত একে একে দরজার কাছে আসছে শুধু একবার তাঁকে দেখার জন্য। এর ফলে হাসপাতাল থেকে বেশি লোকের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিল। তাছাড়া, সাংবাদিকেরাও ধীরে ধীরে হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে জড়ো হতে শুরু করেছেন এবং ইতিমধ্যে খবরে প্রকাশিত যে তাঁর অবস্থা সংকটজনক। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে তাঁরা প্রকৃত খবরই প্রকাশ করবেন, কারণ আমার বাবার অসুস্থতা তো এক অর্থে অগণিত মানুষেরও বিষয়। সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া তাই সম্ভব নয়। কেননা আমরা জানি যে এই কৌতূহলের একটা বিরাট অংশের উদ্ভব দুর্ভাবনা থেকে, শ্রদ্ধা থেকে, ভালোবাসা থেকে। আমরা যখন ছোট ছিলাম আমাদের বাবা মা সবাইকে বলতেন যে আমরাই হচ্ছি গোটা বিশ্বের মধ্যে সব চাইতে ভালো ছেলে। এর ফলে ভালো ছেলে হওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনও পথ ছিল না। তাই সে ক্ষমতা থাক বা না থাক অত্যন্ত ভদ্রতা ও বিনয়ের সঙ্গে আমরা এই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলাম। আবার সেটা এমনভাবে করতে হল যাতে যে কোনও অবস্থাতেই আমার মা ঠিক যেমন ভাবে চেয়েছেন তেমন ভাবে তাঁর ব্যক্তিজীবন ও বহির্জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা বজায় থাকে। তাঁর কাছে এটা সব সময়েই খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সম্ভবত টেলিভিশনে খোশগল্পের যেসব বাজে প্রোগ্রাম হত সেগুলো দেখার ফল। ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই’, কথাটা আমাদের মনে করিয়ে দিতে পছন্দ করতেন তিনি। তাই এটা আমার অজানা ছিল না যে তাঁর জীবদ্দশায় এই স্মৃতিচারণ প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না।

আমার ভায়ের সঙ্গে বাবার দেখা হয়নি প্রায় দু'মাস হয়ে গেছে। তাই বাবাকে খুব বিচলিত দেখাচ্ছিল। কারণ ভাইকে চিনতে পারছেন না আর কোথায় আছেন সেটাও বুঝতে পারছেন না। ফলে আরও বেশি নার্ভাস হয়ে পড়ছেন। এরই মধ্যে ড্রাইভার ও সেক্রেটারির উপস্থিতি তাঁকে একটু শান্ত করছিল। ওঁরা পালা করে বাবার কাছে থাকছিলেন। আর ছিলেন বাড়ির রাঁধুনি ও গৃহকর্মে সাহায্যকারী মহিলা। তাঁরাই রাতে বাবার কাছে থাকছিলেন। ভায়ের সেখানে থাকার বিশেষ প্রয়োজন ছিল না, বরং দরকার ছিল একটি পরিচিত মুখ, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে যাকে দেখলে বাবা শান্ত থাকবেন। ডাক্তারেরা আমার ভাইকে জিজ্ঞাসা করলেন কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় এখন বাবাকে সে কেমন দেখছে। কেননা তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না তাঁর মানসিক অবস্থা ডেমেন্সিয়ার কারণে না শারীরিক দুর্বলতার জন্য। তিনি প্রায় কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। অতি সাধারণ কিছু প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারছিলেন না। ভাই ডাক্তারদের বলল যে এখন অবস্থা একটু বেশি খারাপ হয়েছে ঠিকই, তবে বহু মাস যাবৎ বাবা এই রকম অবস্থাতেই আছেন। 

এই হাসপাতালটি দেশের মধ্যে চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষণের অন্যতম একটি কেন্দ্র। তাই সকাল হতে না হতেই একজন চিকিৎসক আবির্ভূত হন একদল ইনটার্ন চিকিৎসক সঙ্গে নিয়ে। তাঁরা রোগীর বিছানার পায়ের কাছে জড়ো হয়ে অধ্যাপক চিকিৎসকের কথা শোনেন আর তিনি রোগীর অবস্থা ও তৎসংক্রান্ত চিকিৎসা নিয়ে কথা বলে যান। আমার ভায়ের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে ওই ইনটার্নদের কোনওই ধারণা ছিল না তাঁরা ঠিক কার চিকিৎসা করছেন। কিন্তু তাঁকে দেখতে দেখতে তাঁদের মুখে যে কৌতূহলের আভাস ফুটে উঠত সেটাই বলে দিত যে তাঁরা কিছুটা আন্দাজ করতে পারছেন। তারপর চিকিৎসক তাঁদের জিজ্ঞাসা করলেন কারুর কোনও প্রশ্ন আছে কিনা, তাঁরা সকলেই মাথা নাড়লেন এবং বাধ্য ছাত্রের মতো অধ্যাপককে অনুসরণ করে বেরিয়ে গেলেন।

দিনে অন্তত পক্ষে দু’বার, যখন হাসপাতালে ঢোকে আর বেরোয়, অগণিত সাংবাদিকের দল আমার ভাইকে চিৎকার করে ডাকে। আর সেও উনিশ শতকের প্রারম্ভের ভদ্রলোকের মতো ভদ্রতা বজায় না রেখে পারে না। তাই কেউ তাকে সরাসরি ডাকলে তাকে অগ্রাহ্যও করতে পারে না। ফলে যখনই তাকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, ‘গোনসালো, আপনার বাবা আজ কেমন আছেন?’, সে বাধ্য হয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে যায় আর অমনি তাকে ঘিরে ধরে গণমাধ্যমের চক্রব্যূহ। দূরদর্শনে সেই ছবি দেখে বুঝতে পারতাম একটু ঘাবড়ে গেলেও সবকিছু নিখুঁত শৃঙ্খলার সঙ্গেই সে নিয়ন্ত্রণ করছে। তবুও এই ধরণের আচরণ পরিহার করতে বলতাম। ওকে বোঝালাম যে যদি একজন চিত্রতারকার একটা ছবিতে দেখা যায় যে তিনি ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে আসছেন মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকে আছে, মুখে বিরক্তির চিহ্ন এবং আশপাশের কোনও কিছুকেই গ্রাহ্য করছেন না, তার মানে এই নয় যে তিনি অমার্জিত বা উদ্ধত। তিনি শুধুমাত্র মর্যাদা বজায় রেখে যত দ্রুত সম্ভব গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমার কথা এমনভাবে শুনল যেন মনে হল ওকে কোনও অপরাধের অংশী হওয়ার জন্য বোঝাবার চেষ্টা করছি। এমনকি শেষ পর্যন্ত আমার কথা মেনে নিলেও নিজেকে দোষী মনে করছিল। তবে স্বীকার করল যে সময়ের সঙ্গে এই খ্যাতির জগতের অদ্ভুত নিয়ম-কানুনগুলো ধীরে ধীরে রপ্ত করতে পারবে।

চিকিৎসার ফলে বাবার নিউমোনিয়ার সমস্যার কিছুটা উন্নতি হচ্ছিল, কিন্তু টমোগ্রাফির ছবিতে দেখা গেল যে প্লুরা অঞ্চলে এবং ফুসফুস ও লিভারের কিছু অংশেও জল জমেছে। তার সঙ্গে রয়েছে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার। তবে বায়োপ্সি না করে চিকিৎসকেরা সে ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হতে পারছেন না। কিন্তু সম্পূর্ণ অজ্ঞান না করে বায়োপ্সির জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। অথচ তাঁর শরীরের যা অবস্থা তাতে অজ্ঞান করার পরে হয়তো স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারবেন না। তখন তাঁকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া ছাড়া আর কোনও পথ থাকবে না। দূরদর্শনের চিকিৎসা সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে এই বিষয়টা দেখায়, তবে ব্যাপারটা খুব সহজে দেখালেও আসলে তা ভয়ংকর। লস অ্যাঞ্জেলসে মাকে পরিস্থিতিটা খুলে বললাম এবং ঠিক যা ভেবেছিলাম, তাই হল, মা ভেন্টিলেটরে দিতে চাইলেন না। সুতরাং অপারেশন ছাড়া বায়োপ্সি করা গেল না, ফলে ক্যান্সার ধরা গেল না আর সেই মতো চিকিৎসাও শুরু হল না।

আমি আর আমার ভাই আলোচনা করে ঠিক করলাম যে সে চিকিৎসকদের মধ্যে একজনকে, জেনারেল ফিজিশিয়ান বা পালমোনোলজিস্টকে রোগনির্ণয়ের জন্য একটু চাপ সৃষ্টি করতে হবে। ভাই জিজ্ঞাসা করল, ‘যদি ধরা নিই ফুসফুসে বা লিভারে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার আছে, সে ক্ষেত্রে কি করতে হবে?’ সম্ভবত কয়েক মাস বা তার একটু বেশি বেঁচে থাকবেন, তবে অবশ্যই কেমোথেরাপি করতে হবে। লস অ্যাঞ্জেলসে বাবার এক ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বন্ধুকে পুরো পরিস্থিতি ও উপসর্গের কথা বললাম। তিনি শান্তভাবে বললেন, ‘সম্ভবত এটি ফুসফুসের ক্যান্সার।’ তারপর বললেন, ‘ওখানকার চিকিৎসকেরাও যদি এটাই সন্দেহ করেন তাহলে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে এসো, যেমন ভাবে রাখলে স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন তেমন ভাবে রাখো আর কোনও ভাবেই হাসপাতালে ফিরিয়ে নিয়ে যেও না। হাসপাতালে রাখলে সকলেরই কষ্ট।’ মেহিকোতে আমার শাশুড়ির সঙ্গে কথা বললাম, তিনি একজন চিকিৎসক। সব শুনে তিনিও একই কথা বললেন – হাসপাতাল থেকে দূরে রাখতে যাতে আমার বাবা এবং আমাদের সকলেরই সুবিধা হয়।  

মাকে আমি সব কথা খুলে বললাম। যেখানে তাঁর সবচেয়ে বেশি ভয়, ঠিক সেটাই আমি নিশ্চিত করলাম: অর্ধ শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে যিনি তাঁর জীবনসঙ্গী তিনি এখন মৃত্যুর সম্মুখীন। সে দিনটা ছিল শনিবার। সকালবেলা অপেক্ষা করছি কতক্ষণে মা আর আমি একটু একা হব। তারপর তাঁকে বিস্তারিত ভাবে বললাম এই কদিন কি কি হয়েছে আর কিই বা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। মা আমার কথা শুনলেন, তারপর আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন বিশেষ আগ্রহ নেই, কেমন একটা অবসন্ন ভাব, যেন বা বহুবার শোনা একটা গল্প তিনি আরেকবার শুনছেন। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে দরকারি প্রসঙ্গে এসে পৌঁছলাম; সংক্ষেপে কিন্তু পরিষ্কার করে বললাম: খুব সম্ভবত ফুসফুস বা লিভার অথবা দু’ জায়গাতেই ক্যান্সার হয়েছে, তাই সময় আর বেশি নেই, বড়জোর কয়েক মাস। মা কিছু বলার আগেই টেলিফোন বেজে উঠল। মা ফোন ধরলেন। আমি অবাক হয়ে গেলাম। তাঁকে হতভম্ব হয়ে দেখছি। স্পেনের কারুর সঙ্গে কথা বলছেন। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকার মতো মনের জোর দেখে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। মানসিক আলোড়ন সত্ত্বেও তাঁর এমন সহজভাবে কথা বলে যাওয়ার ক্ষমতা অতুলনীয়। তবুও, মনের অতখানি জোর থাকা সত্ত্বেও, শেষ পর্যন্ত আর পাঁচজনের মতোই বিচলিত হয়ে উঠলেন। তাই তাড়াতাড়ি কথা শেষ করে ফোন রেখে দিয়ে আমার দিকে ঘুরে শান্ত স্বরে বললেন, ‘এখন কি হবে?’ যেন বা আমাদের স্থির করতে হবে আমরা বড় রাস্তা ধরে যাব না গলির মধ্যে দিয়ে। ‘পরশু গোনসালো বাবাকে বাড়ি নিয়ে আসবে। আমাদের এখন মেহিকোয় ফিরে যেতে হবে।’ মা মাথা নাড়লেন, সবটুকু আত্মস্থ করলেন, তারপর আমায় জিজ্ঞাসা করলেন,

-তার মানে সেই সময় এসে গেছে? তোমার বাবার শেষ সময়?  

-হ্যাঁ, তাই তো মনে হচ্ছে।

-ওঃ মা গো!

বলে ইলেকট্রনিক সিগারেট ধরালেন।


(ক্রমশ)

Saturday, October 16, 2021

Poems of Arunava Raha Roy


Rabindra Sadan


Suddenly what happened, that your mobile phone flew away & landed inside my pocket directly from the space! What happened suddenly, that we kept stand still on the Rabindra Sadan back stage and the whole auditorium transferred into a ship! Oh look over there in the second floor, the white bearded captain whistling to command & start the journey. The fun & frolic will be starting right now… the young ladies from Andaman were about to start playing billiard! Where will we be floating away with this ship? Let's go, let us stand united close to the deck railing… let the wind starts floating hitting our sails. This scenario alike to Titanic, let it stand here, now let us flee away leaving the scene, leaving ourselves... to have some beer somewhere else.. Let a world, absolutely owned by us, starts revolving around us. The lord himself is standing just a bit outside the universe, with that world keeping on his palm... No other way to go! Without spoiling each other we won't be able to go anywhere else leaving this orbit, never ever...

(Translated from Bengali: Debanjana Mukherjee Bhowmik)


Bygone


Staying far is good.

Staying far means

we can never meet again.


Is it good, not to meet?

Definitely not!


But, being far can mean

that we can perhaps meet in

some coffee shop around

the city...

(Translated from Bengali: Anindita Bose)


Faraway


You remained silent,

you had a reason too!

I too did not say anything for many days...

So, now, shall we begin to

talk again?


Let alone meeting,

many days you did not even ask me to write and yet

on your words I could have traveled

to Shimla-Manali...

since there were mountains,

there were some more songs


"Hey poet, how are you?"

You can break the

pattern and ask me once.

(Translated from Bengali: Anindita Bose)


Bodhi


If you gift poems,

how long can I keep writing?

Shall I inscribe you into my

visceral intensity?


Deep inside that tree hollow

whose Esraj plays such a

pristine melody?


As your vibrations come

closer to me, an intense

desire to create more engulfs

my existence.

I revive again to attain the

light through the collaged-water...

(Translated from Bengali: Anindita Bose)


Spring Restaurant


Come, let us travel from one

Spring to another...


Let us meet.

Let me listen your

Nightingale voice

When you speak.

Tell me about your

father's well-being!


Come,

let us go from one Spring to

another...


Let us both sink and drink

water...


Let us perch

within the moonspace

and converse...

(Translated from Bengali: Anindita Bose)


At Jorasanko with Snija


I ran out of poems

But a few of the songs of you came flipping their wings all the way to me,

I ask my writings to get drenched in soothing water,

I assure them that there is nothing that can be better


My dearest,I give you the name 'Snija'

I shall call you lovingly by this name from this very moment 

I shall drape your love all over my new born poems


During the rainy season the blow came from far away America...

Forget it, I thought with a sigh;

My dear, come, let's take a stroll at Jorasanko, together you and I

(Translated from Bengali: Pratyush Karmakar)


Goddess


For long I had been walking on a rope 

Albeit it was tough

But I travelled a fruitful distance no doubt 

Where I finally stopped is called earth

Some unknown artist meticulously made you with this very earth

I place poems in your ten palms instead of brutal weapons,

But you fling all the poems unto the unknown;

After some moments of loathsome disgust


The poems will become burning stars

(Translated from Bengali: Pratyush Karmakar)


Myth


If you really hurt me I shall not hesitate to go away

And lean against the dejected sky


Why are you so silent yet unfathomable?


You are like a drop of water on the floor


Today I retrieved this drop of water from the River Jalangi 


While still leaning against the sky I shall certainly make you understand-


That you are water


I shall, one day, like the fabled crow, bring you up from the depth of the earthen pitcher by putting stone chips one after the other until I can touch you. 


You are water

(Translated from Bengali: Pratyush Karmakar)


Silent Belle


The colour of your disregard is like that of the dusk in flight

Which hides itself on the back of the moon


Sleepy eyelids are like weary rivulet which wash away all the light within


You come hurriedly to the office gate,

And lo! There drips down your body a lightning divine

(Translated from Bengali: Pratyush Karmakar)


Wonder


You are such a lover! What a poem!

You didn't come to Manali but through pen.

Bloomed in the tub, on the edge of the current...


Bless me, waking up late night

I am sitting in the hotel room to write you.


Those who have come to travel, no one knows

Here you are every day pick up the sun

from the alloy and burn it on the top of the mountain..

(Translated from Bengali: Mahmud Mitul)


---------------------------------------------------------

Arunava Raha Roy born in 1991 in Alipurduar town of West Bengal, India. He did his higher education in Kolkata. He loves poetry from his early age, had stemmed from his father who was a known poet. Since then, his work has been publishing regularly in leading magazine of Bengal. In the first stage of professional career he worked as a Poetry Editor in a print magazine and worked also as the Literary Editor in a web magazine. He has completed M. Phil from Assam University.

He has published four books of his own creation of poetry-- Sabuj Patar Megh (2010), Dinanter Bhasha (2015), Khamkheyali Pashbalish (2018) and Snijar Sange Jorasankoy (2020). He is the recipient of Barnali Smriti Puraskar (2015), Uralpool Puraskar (2017) and Soumen Basu puraskar (2017). He has recieved Travel Grant 2018 from Sahitya Akademi. Attend All India Young Writers Meet, May 2021 (Sahitya Akademi, Government of India). Attend Dhaka Lit Fest, Nov 2018. Went to Bangladesh Amar Ekhushe Grantha Mela, Feb 2018. Email: arunavaraharoy@gmail.com

Thursday, May 20, 2021

দুটি কবিতা :: রবিন মাইয়ার্স

অনুবাদ: অরিত্র সান্যাল

নিউ ইয়র্ক সিটি


বাচ্চা মেয়েটা নিজে থেকেই

ওর গোলাপ-পাপড়ির মতো ব্যাগটা

পুলিশকে দিতে গেল।

সেই জায়গায় আর তার বাইরেও

তখন তুষার পড়ছে, আকাশ 

ভাঙাচোরা, নাপিতের দোকান থেকে 

গান, চোদ্দ ডলারের 

ওয়াইন গ্লাস, 

ধুসর পায়রাগুলো, রাইকার আইল্যাণ্ড,

আইস স্কেটাররা আলিঙ্গন করছে

পরস্পরকে, কারও

উত্থান আর পতন কিন্তু

সে সব এই গল্পে

বলার মতো নয়। মেয়েটার মা

মিটমিট করে জ্বলছে 

মেয়েটার পিছনে। পুলিশটি

খামখেয়ালি বাবার মতো

বাঁকা হাসি দেয়। কেউ একটা

স্টিল ড্রাম

বাজাল এই সমস্তকিছুর তলায়। সুড়ঙ্গের 

ধাতু মজ্জায় তার মন্ত্র একটা

চকিত ঝলক উচ্চারণ করে, আমাদের

নত হতে বলে। যদি কিছু দেখে থাকো,

বলো তবে, যদি এখানে আছ,

তার মূল্য চোকাও 

                    (৯ মার্চ, ২০১৯)


ভারমন্ট


ওই ছায়াচ্ছন্ন তুষার এতই নীল অদ্ভুত যে

দেখে মনে হয় সে কখনও নিজেকে নিয়ে বাঁধা গান শোনেনি


আর তার বেশিটাই ছাই হয়ে

উঠে যাচ্ছে পাহাড়চূড়োয়

দেখতে পাচ্ছি।


খুব অল্প সময়ের জন্যই এখানে আলো আসে

আর তা এতই ঠাণ্ডা যে জীবন বেরিয়ে যায়


যদি যেতে দাও।

দেবদারু জেগে ওঠে হত পশুপাখির মধ্যে


উজ্জ্বল।

এত রকমের জৈব দশা


বসন্তে বেড়ে ওঠে।

রাখে কোথায় নিজেকে, কীভাবে


জোগায় বিশ্বাস যে

বেঁচে থাকবে?


অন্য জীবনে আমি,

আরিজোনায় পরিচারিকা হয়ে থাকি 


আমার লিউকেমিয়া আছে,

আমি পাড়া-প্রতিবেশীদের প্রতি নিষ্ঠুর,


আমি এক মহিলার প্রেমে পড়েছি,

আমি রোজ এক ল্যাপ সাঁতরাই।


অন্য অন্যতর এক জীবনে আমি রুগী,

আমি তুষারপাত করি।

                       (১১এপ্রিল, ২০১৯)




-------------------------------------------------------------------------

কবি পরিচিতি: রবিন মাইয়ার্স (Robin Myers, B. 1986) আক্ষরিক অর্থেই শূন্য দশকের কবি। আশা করা যায়, বাংলা সাহিত্যের জগতে সে থাকলে কবিতে কবিতে দ্রুত আলাপ জমে উঠত। কিন্তু থাকে সে মেক্সিকোয়, সুদূর মেক্সিকোয়। এ সত্ত্বেও অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ যে ঘটে গেল তা কেবল অরুণাভ রাহারায়ের উদ্যোগেই। কাছ থেকে দেখতে পেলাম পাকেচক্রে আমরা যে অন্তহীন দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে চলেছি, রবিন তাতে স্পষ্ট জেগে আছে; সাধ্যমতো রুখে দাঁড়াচ্ছে, যতটা বিদ্রোহ এক কবিকে মানায়-– করছে। এই লেখাদুটি সেই সক্রিয়তার সাক্ষ্য বহন করে। লেখাদুটির মধ্যে বয়ে চলা চাপা রাজনৈতিক আঁচটি নিয়ে একদিন জিজ্ঞেস করায় রবিন সরাসরি জানাল, আলাদা করে রাজনৈতিক কবিতা লেখার দায় তার নেই। কিন্তু একটা সময়-– যে সময়ে আমরা বেঁচে আছি, তার থেকে তো আর অন্ধ হয়ে নিস্তার লাভ করা যায় না! এই ইঙ্গিতেই পরিষ্কার বোঝা যায় রবিন নিজের ভাষাগত, ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে শিকড়ের মতো গেঁথে দিয়েছে তার অস্তিত্বের শিরা উপশিরা। কবিতায় তো বটেই, অনুবাদকর্মেও রবিনের সিদ্ধি আকাশছোঁওয়া। একজন অনুবাদক হিসেবেই রবিন প্রথমত আমাদের কাছে পৌঁছয়। Kenyon Review, the Harvard Review, Two Lines, The Offing, Waxwing, Beloit Poetry Journal, Asymptote, the Los Angeles Review of Books, Granta , Tupelo Quarterly আর Inventory প্রভৃতি শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যপত্রে তার বিভিন্ন অনুবাদ প্রকাশিত। ২০০৯ সালে American Literary Translators Association (ALTA)-এর ফেলোশিপ; ২০১৪-তে, Banff Literary Translation Centre (BILTC)-এ রেসিডেন্সি; আর ২০১৭ সালে রবিন feminist translation colloquium A-Fest- অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করে।

Sunday, April 18, 2021

সেই নীল ঘর :: লেইরে বিয়াতে গার্সিয়া


অনুবাদ: শ্যামশ্রী রায় কর্মকার 

ঘরটা খাপছাড়া, অসমান। বছর তিনেকের বাচ্চার হাতে আঁকা টেরাবাঁকা ড্রইংয়ের মতো। সিলিংটা জানলার দিকে ঢালু হয়ে আসায় ঘরের মধ্যে একটা আমন্ত্রণ ফুটে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল একটা নিজস্ব চরিত্র আছে। 

গৃহসজ্জা সাদামাটা। ঘর দেখলে বাসিন্দার সম্বন্ধে মোটামুটি একটা অনুমান করে নেওয়া যায়। দেওয়ালগুলিতে নীল রঙের প্লাস্টার। তার মধ্যে একটি আবার বাহারি পেন্সিল ও জলরঙে আঁকা ছবিতে, নানা দেশের মানচিত্রে আর অসমাপ্ত বাক্যে ভরা। জানলার দুপাশে যে পর্দাটা লেপ্টে আছে, তার রং নিশাচর নীল। জানালার নিচে বিছানা ও ডেস্ক। ডেস্কের উপর এক তাড়া কাগজ ও কয়েকটা কলম ইচ্ছামত ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। 

ঘরের মধ্যে একটা ছোট চেয়ার। আমি তাতেই বসেছিলাম। বিছানায় বসা উচিৎ কি উচিৎ না – এই এক দ্বিধা ছিল। বিছানাটা চেয়ারের চাইতে অনেক বেশি আরামদায়ক বলে মনে হচ্ছিল। চেয়ারের পিঠটা বেশ উঁচু। কাপড়ের পুর দেওয়া সিট। চেয়ারের হাতলদুটো আমার পক্ষে একটু নিচুই বলা যায়। আমার পা দুটো আবার চেয়ারের তুলনায় লম্বা। অবাক কান্ড! তবুও চেয়ারটায় বসে আরাম পাচ্ছিলাম। আরেকটু জমিয়ে বসবো বলে একটু নড়েচড়ে বসার ভঙ্গিটা ঠিক করে নিতেই চেয়ারের পিঠের সঙ্গে আমার পিঠ খাপে খাপে মিলে গেলো। আমি আরামে হেলান দিলাম। 

ঘরটা একেবারে নিঃশব্দ। আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। ঘরে ঢোকার আগে এত শব্দ ছিল। করিডরে মানুষের গলা, লোহার দরজাওয়ালা পুরনো লিফটের ঘড়ঘড়, রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যালে মানুষ আর গাড়ির গাদাগাদি ভিড়ের আওয়াজ। সোমবারের অফিস টাইমে সারা পৃথিবীর তাড়া থাকে, কারণ সবারই দেরি হয়ে যায়। কিন্তু, যখন থেকে আমি ওই ঘরটার ভেতর ঢুকে পড়লাম, একটা নিঃশ্বাসের শব্দও পাচ্ছিলাম না। কেউ ফিসফিসও করছিল না। শুধুই গভীর স্তব্ধতা। ওই পর্দার নীল রঙের মতই, বোবা। 

বিছানার চাদরটাও নীল বলে মনে হচ্ছিল। মহিলার চোখ দুটোও, সম্ভবত। আমার ঠিক মনে পড়ছে না এখন। আমার জিভ থেকে রঙের কোরকগুলো মুছে গেছে। শুধু মনে পড়ছে যে আমি ওই নীল নৈঃশব্দ্যের কথা আর ভাবতে পারছিলাম না। 

তারপর, আমি এলাম।




-------------------------------------------------------------------------

লেখক পরিচিতি: লেইরে বিয়াতে গার্সিয়ার জন্ম স্পেনের বিগোতে। বহু ভাষায় পারদর্শী এই লেখিকা একজন ভাষা শিক্ষিকা। বিগত দশকের প্রথম দিকে কয়েক বছর কলকাতায় ছিলেন। মূলত গদ্য লেখেন ইংরাজি ও স্প্যানিশ ভাষায়। সংবাদ প্রতিদিন, দুকূল, পরম্পরা, দ্য ড্রিমিং মেসিন প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর নানা লেখা প্রকাশিত হয়েছে। নিজের লেখার পাশাপাশি অনুবাদও করে চলেছেন।

Thursday, April 15, 2021

রবার্ট অ্যাডামসনের কবিতা


অনুবাদ: অরিত্র সান্যাল

শীতে, হাসপাতালের বিছানায়


ব্যথা বেদনার বড়িগুলোর ধাক্কায় লম্বা করিডোর দিয়ে

আমি যেখানে এলাম, স্মৃতি সেই ঘর

সবুজ ঢেউয়ের স্বচ্ছ বাষ্পে চড়ে যন্ত্রণা দূরে সরে যাচ্ছিল

কিছু কিছু ছবির ঝলক আসে, চলে যায়


সে বয়সে আমি কবিতা ছাপাবো বলে লিখিনি

তবে, আমার আশেপাশে জীবন যুদ্ধে পিষ্ট হয়ে যাওয়া কিছু পাঠক ছিল  

আমি তাদের মনোযোগ পেতে চেয়েছি

আমার উঠোনে দুশ্চিন্তার মতো ওরা ভেসে বেড়াত


কখনও সিগারেটে টান দিচ্ছি কখনও ইতিউতি দেখছি

কী ভাঙার জন্য আর কী শাস্তি বাকি বা চিত্তবিক্ষেপ

স্মৃতির সূক্ষ্ম ধাতব পাত ভেসে উঠতে থাকে 

মনের উপরিতলে আবার কামড় দেবে বলে


আমার কোনও ধারণা নেই কেন কবিতা আমায় ধরে ফেলল স্কুইডের মতো

মগজ থেকে ঝুলে থাকল দুর্গত আবহাওয়ায়

ভিন পরিবেশে একটা প্রাণী

তার শতাব্দী প্রাচীন জীবন নিয়ে জেগে উঠছে


ভাবনা-চিন্তাকে কালির মতো হতে হবে এবং

হতে হবে এমন যাতে ঝটতি শিকারে টোপের কাজ করতে পারে

কালো চঞ্চুতে আর গভীর থেকে বোধ জেগে উঠবে

সে এক দিন ছিল যখন কবিতা ছিল বুনো জন্তু বশ করার ছল


তখন না ছিল মাছ, না ছিল পাখি তাই

আমি পংক্তি রচনা করেছি তাদের জন্য, জীবন যাদের তিক্ততায় ভরা

চোখ তাদের রোষে লাল চঞ্চল

যখন আগামী কবিতাগুলি আমার জন্য অপেক্ষায় রত



-------------------------------------------------------------------------

কবি পরিচিতি: অস্ট্রেলিয়ার সমসাময়িক কবিতার মানচিত্রে রবার্ট অ্যাডামসন সে ভাষাসংস্কৃতির প্রধানতম কবিদের একজন। জন্ম ১৯৪৩ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ১৯৭০ এ প্রকাশ পায়, ক্যান্টিকলস অন দ্য স্কিন। রবার্টের কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১৬-র বেশি। বিবিধ সম্মানে ভূষিত রবার্ট অস্ট্রেলিয়ার সম্ভ্রান্ত প্রকাশনা সংস্থা পেপার বার্ক প্রেসের কর্ণধার। 

-------------------------------------------------------------------------

অনুবাদকের পরিচয়: কবি এবং অনুবাদক অরিত্র সান্যালের জন্ম ১৯৮৩ সালে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ-- নাবিক বিন্দু থেকে (২০১০), আজ কারও জন্মদিন নয় (২০১৩), নিজের আয়ুর মতো শ্যামবর্ণ (২০১৫) এবং একটা বহু পুরোনো নেই (২০১৮)। সমসাময়িক আমেরিকান কবিদের লেখা অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন – ‘ব্রিজেবল লাইনস’ (২০১৯) গ্রন্থে। এ বছর প্রকাশ পেয়েছে পৌলমী সেনগুপ্তর সঙ্গে যৌথ অনুবাদে কানাডিয়ান কবি আদিনা কারাসিকের কবিতা 'সালোমে বীরাঙ্গণা'।

Tuesday, April 13, 2021

অতিথি বীক্ষণ :: কমলেশ রাহারায়


আমি তার কেমন উত্তরসুরি, একদিন মেপে দেখি

দৈর্ঘ্যপ্রস্থ,মনের ভিতরে ঝিলিক দিচ্ছে রংবেরং মনস্তাপ

আর কোনও অঙ্কিত শব্দ নেই, শূন্য ভাঁড়ার  যেমন

থাকার কথা, প্রারম্ভিক বিষাদে তেমন রক্তমেঘ জমে যায় 

চেনা-অচেনা, দেখা অদেখায় তবু গ্রীবা তুলি 

সবুজ সংকেত পাঠাই, দহনের এই এক পরিণাম


অথচ যে কোনও মানুষ চায় অনুযোগ বাদ দিয়ে জোৎস্নার ভিতর

তার নিজস্ব প্রতিধ্বনি আকাশমাটি জলে স্বপ্নময় হোক

সারাদিন অসম সাহসী এক মেষপালক বধ্যভূমিতে

অন্তত একবার ভাঙাচোরা মুখ আর মাথাটা তুলুক

নিসর্গ শরীরে মানুষের শিরস্ত্রাণ একবার ঝলমল করে উঠুক 

কে না চায় ঝিনুকের ভিতর থেকে উঠে আসুক ব্রতকথা 


মূলত সব যেন অর্গ্যানের সুর, অস্ত্রবিহীন পথ

গোধূলির মাঠ ভেবে দেবদারু অতিথিবীক্ষণ

এতদূর এসে গেছি আমন্ত্রণ ছাড়া ,ভ্রুক্ষেপ করিনি


---------------------------------------------------------

Guest Vision

Kamalesh Raha Roy


How I am his successor, I try to measure;

An absent-minded flower flickers in my mind,

And there are no words drawn, the way an empty storage

Is expected, the way bloody cloud, known unknown,

Overcast, I lift my face to send the greenlight,

This is the consequence of combustion


Still a man wishes his own echo

Reflected everywhere, an intrepid shepherd

Raise his head in the slaughterhouse, his crown

Shimmer in the nature, who does not want 

Folklores from oyster shell!


Chiefly everything sounds like the music from the organ,

A path to walk unarmed, looking at the Deodar guest vision 

and thinking it the field of dusk, I have made so far

Without caring for a call.



Translated by Jagannath Biswas

Painter: Paul Klee

না-পাঠানো চিঠি :: উত্তমকুমার মোদক


ভারতবর্ষের নামে চিঠি পাঠাই এক বিশ্বগ্রাম থেকে

জানি, পরম্পরার ভেতর সব, গ্রিল বসানো ফাঁক

তবু, দেখো, আহ্নিক-একাদশী সারছে কামার্তরা।


একটি অন্ধরাস্তা ধ'রে খুনীরা আসে রক্তমাংস চেয়ে

লালফিতের ফাঁসে কাঁদছে অধিকারের পাখি!

সব প্রবাহের মুখগুলি পরিকল্পিত ঘোরানো!


উৎসের দিকে উল্টো, নামানো থাকছে,পতাকা!

মগজের ভেতর দিয়ে উড়ন্ত ফোরলেন

চাষের ক্ষেতে কর্পোরেটের গুদামঘরের তালা


সংবিধানের ধারায় জমছে পদার্থের রেচন

শাসকের মুখ ঝামলায় নয়া-খনার বচন!





চিত্রকলা: হিরণ মিত্র

Sunday, April 11, 2021

হৃদয় হোম চৌধুরী-র কবিতা


খেলা

আবেগ তোমায় আত্মীয় করেছি

হৃৎপিন্ডে সহস্র শব্দের হাহাকার না হলে দেখতাম

কী করে?

সহস্র সমুদ্রের অমৃতধারা নিয়ে

                   আমার মায়েরা 

হেঁটে গেছে দিগন্তের সূর্যে লাগাম ধরতে 

আর তোমাকে মৌচাকের ঘর গুনে 

জারুল পাতার মাঝে ঘুমোতে দেখেছি রাতে-

বিছানায় নিয়ে এসে

ভালোবাসায় গল্প করার ইচ্ছেটুকু উবে গেছে-

শবের এই শহরে লাশ কম পড়েছিল একবার

বিচ্ছেদী সুরের মতো ভজন বেজেছিল

কফিনের কত সপ্তম পেরেক ফেলে দিয়েছি-- সে সব জানেনি হয়তো কেউ-

শ্মশানে চুল্লি জ্বলে; লাশ সাজিয়ে দিন

আঠারোর জীবনে শেষ খেলা,  দেশ ও জীবনের মিলন


কবি

নদীর কিনারে ফেলা নোঙর-অন্ধ আতুড়ঘরের চিৎকার- 

                      শুনতে চাই না আর।

ভাঙা আকাশের নতমুখ শোকের অবাধ পাথরে

                              প্রেমের খাটিয়া পেতে বিশ্রাম নেয়।

এসবের মাঝেও মনে রেখো

   

ধূসর স্টেশনে আমার পার্থিব দাম্পত্য শেষ হবে আগামীকাল


ফাঁসীগামী আত্মার ক্রন্দনে আয়নার কফিন দেখব--

অন্ধ কালো বিড়াল দু'টি পেছনে ফুঁপিয়ে ওঠে 

পৃথিবীর কখন অসুখ হবে আমি কখন ওষুধ দেব

কখন আমার পায়ের ছাপে পৃথিবীর অঙ্ক কষব 

ওদের পদপিষ্টে ভাঙা ভাতের থালা

কোন বসন্তবিলাপের সঙ্গী হবে!

কবিতা সঙ্গমের জন্য অপেক্ষায় আছি

শেষ সীমান্তে পৌঁছে যাব বলে এসেছি

এখানে কবিরা কি মরুভূমিতে চেরী খায়?


নগ্নপায়ে পলাশের বেড়ি জড়িয়ে পান্ডুলিপির পর পান্ডুলিপিতে কী অক্ষর ছাপেনি ওরা!