Sunday, January 3, 2021

ফের্নান্দো চেইয়ে-র কবিতা

 


অনুবাদ: জয়া চৌধুরী


সাদা রয়ে যাওয়া পাতার গাথা


সাদা রয়ে যাওয়া পাতারা সাধারণত শুভ্র হয়

এবং সাদা রং তার শূন্যতার ইঙ্গিত দেয়

এক এমন শূন্যের কথা বলে যেখানে

অক্ষর, এবং শব্দের অনুপস্থিতিতে থাকে

আলাপচারিতার এক অনন্ত সম্ভাবনা।


সাদা থেকে যাওয়া পাতা

ভাষার প্রতি এক ধরনের আমন্ত্রণ

সে চায় ওরা যেন তাকে অধিকার করে

মহাবিশ্বের ওই অনন্ত শূন্যতা

হৃদয়শূন্য ছিদ্রময় ওই ধাতু

ওই শূন্যের হতভাগ্য অংশটুকুর নিশ্চিতভাবে হয়ে ওঠাকে

ছেড়ে যেতে গিয়ে যে তাকে


অসম্মান করে সাদা পাতা চায় তাকে যেন

অতিক্রম করে যায় ওরা।


অনুতাপ


স্বীকার করছি,

প্রজাপতিদের আমি হত্যা করেছি।

সাধারণত ভাইয়ের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম

সূর্য যখন গাছের শাখা ঝলসে

দিতে দিতে দুপুরের ঘুম সারতেন,

সে ঘুম যত ঘন ততই ভাল।

দিন, নিচের দিকে

নদীর বুকে ঢলে

পড়তে পড়তে কষ্ট পায়

টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায় প্রজাপতিতে

ওদের বেশির ভাগই

ছিল হলদে

কমলা ও আরো আরো রঙের

দেখে মনে হত যেন ডানায় আঁকা আছে ঘড়িমুখ ।

অদেখাকে পাশ কাটাতে কাটাতে

উড়ে আসত স্পষ্ট হয়ে

যেন তারা জানত

ওদের জন্যই অপেক্ষমান

দানবাকারের অস্তিত্ব।

তাদের সর্পিল ঋতু জুড়ে

ভঙ্গুর রূপ উপহার দিতে দিতে

আঁকাবাঁকা পথে বেয়ে আসত ওরা

আগাম না দেখেই

ফুঁসে ওঠা প্রকৃতির কারণে

শাখাদের টুপটাপ ঝরে পড়া।


ওরা আসত সৌরতাপের ফুলকি বয়ে

ছন্দহীন নৃত্যে এবং নীরবে

প্রখর আলোয় এক হাস্যকর

হত্যায় ঘটা মৃত্যু হয়ে।

একথা স্বীকার করায় কী দারুণ যন্ত্রণা!

আমি প্রজাপতিদের হত্যা করেছি

এক ঘৃণ্য সৈনিক হয়েছি

রূপের বিরুদ্ধে

যে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র।


জীবন্ত দেহ যা গান গেয়ে চলে


এই অপ্রমাণিত ও প্রাচীন সঙ্গীতই হল

একটি একলা ছোট ছেলের অস্তিত্ব

ফলবান বৃক্ষ ও ফুলভরা গাছময় রোদমাখা উঠোন

যেখানে ধ্বনিত হয় বিশ্বপ্রকৃতির আনন্দময় স্বরকম্প

দূরাগত হালকা বৃষ্টির ছাঁটে নেচে ওঠে ফুল।

কত উদ্বেগের ভেতর কতখানি নিস্তব্ধতা,

বস্তুর সামনে এই অ্যারিস্টটলীয় বিস্ময়,

যেখানে বৃক্ষের আশ্রয়ে হ্রস্ব হয় প্রেম

এবং চলে যেতে যেতে শামুক ফেলে যায় হীরেকুচি।

আমি সেই ছোট ছেলেটি যে জীবিত এবং গান গায়

পূর্বপুরুষের দেয়া এই ভালবাসামাখা ভাষায়

ওঁরা এই স্তবকের স্বপ্নের শেকড় ছিলেন না,

হ্যাঁ তবুও তাঁরা সেই উপযুক্ত মৃত্তিকা জীবনের ঝাপটা আসে যেখানে।

কালো নদীর এক কবি, মৃত্যু অবধি উড়বার জন্য

যেখানে জন্মায় পাখি

কখনো কখনো, থেমে যায়, শব্দের ঘাটে,

এক অনন্ত আঙিনায় ঋতুস্নাত ফুলেদের ওপর।

খুঁজে ফেরা একাকীত্ব, প্রয়োজন, পরিপূর্ণ আলোয় শিশু থেকে

মহাবৈশ্বিক ভাষা থেকে কবি যেখানে পড়েন

বাস করেন আমার সাথে, এমনকি, মাঝরাতে

এবং পৃথিবীর বুকে নিয়ে আসে দুপুরের ঘুমের সুগন্ধ

যখন কেউ ঘুমোয় না, এবং নক্ষত্ররা যায় কেঁপে।

অটুট স্বপ্ন ও নিশ্চিত ভাবনার এক কবি

আমি যার অপ্রমাণিত ও প্রাচীন সঙ্গীতই হল


একটি একলা ছোট ছেলের অস্তিত্ব।


----------------------------

ফেরনান্দো চেইয়ে: কবি, গদ্যকার, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য-সমালোচক এবং স্টাইল-সংশোধক ফেরনান্দো চেইয়ের জন্ম ১৯৭৬

সালে উরুগুয়ের মেরসেদেস শহরে। “আঁকা পাখিদের কবিতা”, “লিখনভাষ্য ও স্টাইল সংশোধন-এর জেনারেল

কোর্স” “রিও দে প্লাতার ভূতের গল্প” “শব্দের দেয়াল” ইত্যাদি প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১০ টি।

কলম্বিয়ার গোল্ডেন বুক অফ দ্য ইয়ার(২০১৯), সাহিত্য সম্বন্ধীয় প্রবন্ধের জন্য জাতীয় পুরষ্কার

(২০১৭ এবং ২০১৯) ইত্যাদি অসংখ্য পুরষ্কারে সম্মানিত।

---------------------

জয়া চৌধুরী মূলতঃ অনুবাদক। মূল স্প্যানিশ ভাষা থেকে বাংলায় প্রকাশিত উপন্যাস, নাটক, ছোট গল্প,

কবিতার এতাবৎ ১০টি অনূদিত বই ও বাংলায় মৌলিক উপন্যাস একটি ও কবিতার বই দুটি প্রকাশিত।

ভারত বাংলাদেশ আমেরিকা প্যারাগুয়ে কিউবা আর্জেন্টিনা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ব্লগে

নিয়মিত অনুবাদ ও মৌলিক লেখা প্রকাশ করে থাকেন। প্রিয় শখ সেতার বাজান। স্প্যানিশ ভাষা শেখান

রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল অফ ল্যাঙ্গুয়েজ এবং সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ।

Wednesday, December 16, 2020

কালীঘাটের মেয়ে পরিণীতা

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায়: তখনও বেশি রাত হয়নি। দুর্গাপুর হাইওয়ে দিয়ে ফিরছি। আমরা জনা চারেক। একটা ধাবা দেখে গাড়ি দাঁড় করালাম। এখানে বেশ ভিড়। তবে বাইরে খোলা আকাশের নীচে চেয়ার-টেবিল পেতে বেশ গুছিয়ে রেখেছে ধাবা মালিক। চারটে চায়ের অর্ডার দিয়ে আমরা গল্পগুজব করছি। আমাদের লাগোয়া টেবিলে এক দম্পতি বসে। সঙ্গে আট-দশ বছরের একটি কন্যা। সে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে লক্ষ করি কন্যাটির মা আমার দিকে তাকাচ্ছে– যেন কিছু বলতে চায়! আমারও চোখটা ক্ষণে ক্ষণেই সেই মহিলার দিকে অজান্তে চলে যাচ্ছে। বলতে গেলে একটু অস্বস্তিই হচ্ছে। এইভাবে চলে কিছুকাল। তারপর ওই ভদ্রলোক ধাবার ভিতরে ঢোকে, হয়তো কিছু নতুন অর্ডার করতে, তখন হঠাৎই সেই মহিলা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছু বোঝার আগেই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলে, ‘স্যার ভালো আছেন?’ আমি তো যাকে বলে হতভম্ব! কে এই মেয়ে, কীভাবেই বা আমি তার স্যার হলাম তা কোনও অনুমানেই বুঝতে পারছি না। কোনও ভাবেই মেলাতে পারছি না। একবার মনে হল, কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডিজের ছাত্রী ছিল কিনা। তা-ও হতে পারে না। কেননা গত দশ বছর যে সব ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়েছি তাদের প্রত্যেকের মনে আছে– যাদের আমি নামে চিনি। এখনও আমি স্মৃতিভ্রষ্ট হইনি। তবে কে এই ছাত্রী?

এরপর আমার অবস্থা মালুম পেয়ে মেয়েটি বলে, ‘চিনতে পারছেন না স্যার? আমার নাম নীতা। আপনি আমাকে পরিণীতা বলে ডাকতেন– কালীঘাট। এই ‘কালীঘাট’ শব্দটির সঙ্গে যেন কয়েক কোটি ক্যালেন্ডারের পাতা আমার চোখের সামনে ঝরে পড়ল। আমি যেন ফিরে গেলাম সাতাশ-আঠাশ বছর পিছনে। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতার উপান্তে। বস্তি সংগঠনের এক নেতা সেই সময় আমাকে পটিয়ে ফেলেন যে, সরাসরি মানুষের জন্য কিছু করতে হবে, যারা সমাজে পিছিয়ে আছে। শুধু তাই নয়, তাদের জন্য কাজ করার লোক নেই। তো কী সেই কাজ? ঠিক হল কালীঘাটের নিষিদ্ধ পল্লিতে যে শিশু-কিশোররা আছে তাদের পড়ানোর দায়িত্ব নিতে হবে। এদের মধ্যে কিছু ছেলে মেয়ে স্কুলে যায় বটে কিন্তু পড়াশোনায় মন নেই। এদের উৎসাহিত করতে হবে। আমার সেই বয়সে এমন ধরনের কাজে নিযুক্ত হওয়াকে বেশ গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করলাম। সপ্তাহে দুদিন পড়াতে হবে। ফলে তেমন কোনও চাপ নেই ভেবে শুরু করে দিলাম।

চাপ কি আর ছিল না? টালিনালার ধারে যাকে বলা যায় আদি গঙ্গা, তার দূষিত জলে, পচা গন্ধে জায়গাটা ম ম করছে, একটা চালাঘরের মাটির দাওয়ায় প্রাথমিক ভাবে প্রায় জনা আটেক বাচ্চাকে নিয়ে আমার ক্লাস শুরু হল। চারদিকে মাছি ভন ভন করছে। দুর্গন্ধে প্রথম প্রথম বমি পেত। চারদিকের আবহ যাকে বলে মদোমাতাল আর কাঁচা খিস্তির বন্যায় রচিত হয়েছে। এখানে কেউ সোজা বা যাকে বলে সাধারণ ভাষায় কথা বলে না। সবাই উদমার্গের খিস্তি সম্বলিত ভাষাতেই অভ্যস্ত। এমনকী বাচ্চা-কাচ্চাদের সঙ্গে সেই একই ভাষায় কথা বলছে বড়োরা। প্রথম দিকে মনে হত এসব বন্ধ করতে হবে। মাথা গরম হয়ে যেত। কিন্তু ক্রমে অভ্যস্ত হয়ে যাই। সেই দাদা নেতাটি আমায় বুঝিয়েছিলেন, ‘আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। এখানকার তাবৎ পরিবেশ পালটানো তোমার কাজ নয়। আর তা পারবেও না। আমরা যদি এই বাচ্চাগুলোকে একটু লেখাপড়া শেখতে পারি তো জানবে বিরাট কাজ করা গেল।’ কথাটার যৌক্তিকতা আমার মনে ধরেছিল। ফলে বছর খানেক টানা টালিনালার পাশে এইসব বাচ্চাকাচ্চাদের পড়িয়ে গেছি। এদের লোক না হয়েও। কোথাও পুলিশ ঝামেলা করছে, কোনও খদ্দের মদ খেয়ে এসে হুজ্জুতি করছে, কার পালিয়ে যাওয়া বর এসে হুজ্জুতি করছে তার গতর খাটিয়ে বউ-এর কাছে, কে কাকে মারল ধরল, সব কিছুর মধ্যে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়তে থাকলাম। কিন্তু আমার মূল কাজ ছিল সপ্তাহে দুদিন এই তথাকথিত বাপহারা ছেলে মেয়েদের পড়ানো। ‘বাপহারা’ কথাটা লিখলাম এই কারণে যে, প্রায় প্রত্যেকটি ছেলে মেয়ে জানে না বা তাদের জানানো হয় না যে কে তার বাবা, কী তার নাম। কখনও কখনও মায়েরা মিথ্যে নাম বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হয়েছে যখন এরা স্কুলে ভরতি হতে গেছে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সব সময়েই বাপের নামটাই প্রধানত গ্রাহ্য করা হয়, ফলে তৈরি হয়েছে নানা জটিলতা। আর তখন তো আইন-কানুনও এখনকার মতো হয়নি।

এখানে এইসব শিশুকিশোরদের পড়াতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি, বিশেষ করে এই স্কুলে ভরতি করার সময়। আজকে প্রচুর না হলেও অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকলেও বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এদের জন্য লাগাতার কাজ করে যাচ্ছে। সে-সময় এই ধরনের কিছু সংগঠন থাকলেও তা যে খুব উচ্চকিত ছিল তা নয়। হয়তো সম্ভবও ছিল না। সে যাই হোক, এই ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার মধ্যে ধরে রাখাই ছিল একটা বিরাট কষ্টসাধ্য কাজ। কেননা মায়ের খদ্দের এলে তার মদটা, সিগারেটটা, খাবার-দারারটা নিয়ে এলেই কাঁচা পয়সা পাওয়া যায়। আর ওদের পড়াশোনা করার সময় ছিল সন্ধেবেলা। সে সময় তো এই অঞ্চল গমগম করছে।তখন কি আর পড়াশোনায় মন বসে! এদের মধ্যে অনেকেই ছিল লেখাপড়ায় বেশ ভালো, চটপট বুঝতে পারতো। কেউ কেউ একটু পিছিয়ে থাকা। তার করণটাও সহজেই বুঝে ফেলি। যে অবহেলায় ও মানসিক নিপীড়নের মধ্যে এরা জন্মায়, বড়ো হয়ে ওঠে– তাতে এই ধরণের সমস্যা খুব স্বাভাবিক। যেমন, আগেই বলেছি যে, একমাত্র মা-ই এদের ভরসা। তথাপি সেই মা যে তার ছেলে কিংবা মেয়ের জন্য খুব একটা কিছু করতে পারে তা নয়। নিদেন দুবেলা খাওয়াও অনেকের জোটে না। তারপর আছে রোগভোগ। আপাতত ফিরে যাই সেই কালীঘাট থেকে উঠে আসা নীতার সঙ্গে দেখা হওয়া প্রসঙ্গে।

কালীঘাট শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার পর যথারীতি আমি নীতাকে চিনতে পারি। বলি, ‘কেমন আছিস মা?’ বেশ গর্বের সঙ্গে সে বলে, ‘খুব ভালো আছি স্যার।’ মেয়েকে দেখিয়ে বলে, ‘এই আমার মেয়ে, আর ওই উনি হলেন আমার স্বামী।’ ইতিমধ্যে নীতার স্বামী ধাবা থেকে বেরিয়ে আসে। নীতা বলে, ‘ইনি, সেই স্যার, আমাদের কালীঘাটে পাড়াতেন।’ বুঝলাম, ছেলেটি আমার নাম পর্যন্ত জানে। স্বামী হাত মুখ ধুতে গেলে নীতাকে জিজ্ঞেস করি, ‘হ্যাঁ রে, পড়াশোনা কতটা করতে পড়েছিলি?’ নীতা এক গাল হেসে বলে ‘হায়ার সেকেন্ডারি অব্দি কিন্তু তারপর আর হল না। সংসার, মেয়ে সব সামলে আর পড়া হয়নি।’ ক্রমে সে চাপা গলায় শুরু করল তার জীবনবৃন্তান্ত। এই ছেলেটি নাকি ছিল তার মায়ের খদ্দের, প্রায়ই আসত। বয়সে প্রায় পনের বছরের বড়। সে-ই নাকি তার মাকে বুঝিয়ে নীতাকে বিয়ে করে। পাইপের ব্যবসা করে। আজ তার ব্যবসা বেশ জমে উঠেছে; বোঝা গেল সঙ্গের গাড়িটা দেখে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোর মা-র খবর কী?’ নীতা ছলছলে চোখে জানায়,’কঠিন ব্যাধিতে মারা গেছে।’ শেষ বয়সে আমার কাছেই থাকত। আর কটা দিন আগে মাকে নিজের কাছে নিয়ে এলে হয়তো বাঁচাতে পারতাম।’ এ তো প্রায় হিন্দি ছবির মিলানন্তক কাহিনি। তা হোক, আমায় কেন জানি একটা তৃপ্তির হাওয়া ছুঁয়ে গেল। ওরা পয়সা মিটিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমি খনিকক্ষণ স্মৃতির মেঘের মধ্যে যেন ডুবে গেলাম। এই রকম তো আরও ছাত্রছাত্রীরা ছিল। তাদের কী হল? তাদের সঙ্গে কখনও কি দেখা হয়ে যাবে! আজও তার অপেক্ষায়ই আছি।

Sunday, December 6, 2020

ল্যান্ডরে, রাস্কিন বন্ডের আইভি কটেজে


শিবু মণ্ডল: একটা শৈলশহর থেকে পর্যটক যখন অন্য শৈলশহরে যায় তখন তার কাছে দুটো অপশন থাকে– হয়তো সে কিছুটা উষ্ণতা রেখে যাবে নয়তো কিছুটা বাড়তি উষ্ণতা নিয়ে যাবে। এর আগে মুসৌরি তিনবার গিয়েছি কিন্তু ভালো লাগেনি। কেন যে শুধু শুধু দার্জিলিঙের তুলনা চলে আসত। ঘরের শহর বলেই কিনা, কে জানে! মাঝে ঋতুর ব্যবধান না থাকলেও, স্মৃতির ব্যবধান থেকে যায়। এই পার্থক্য একটা দূরত্ব তৈরি করেছিল আমাদের মধ্যে। কিন্তু এবার মুসৌরি এলাম নিজে ড্রাইভ করে। মনে হল যেন স্বপ্নে দেখা এক নৌকো চালিয়ে স্মৃতির স্রোতে ভেসে ভেসে চলে এলাম। গাড়িটি কেনার পর থেকে তাকে নৌকো ভাবতেই বেশি ভালো লাগে। আর যে কোনো ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনার স্মৃতিকে স্বপ্ন বলে ভ্রম হয়। কেনো যে এমন মনে হয় জানি না! তবে আমার ঠাকুরদার একটা ছোটো ডিঙি নৌকা ছিল দেশের বাড়িতে- ঠাকুরমার মুখে শুনি। ঠাকুরদাকে আমি দেখিনি। তবে মাঝে মাঝে কল্পনায় আসে একটি নদীঘেরা গ্রাম। বর্ষাকালে উঠানে হাঁটুজল। দাদু নৌকোয় বসে মাছ ধরে। ‘ইচ্ছা হইলে ঢাকা শহরে কামে যাইত। ইচ্ছা হইলে যাইত না- নাও নিয়া বাইরইয়া পড়ত।’- কথাগুলো বলার সুরে বিরক্তি ঝরে পড়লেও দীর্ঘশ্বাস লুকোতে পারে না আমার ঠাকুমা। আচ্ছা দাদু কি মৃত্যুর পরেও নৌকো চালান? যদি তাই হয় তবে তো সে নৌকো নিয়ে সব জায়গায় যেতে পারবেন। পাহাড়েও! আমিও মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি নৌকো নিয়ে হিমালয়ে চলে গেছি ঈশ্বরের খোঁজে।

রাস্কিন বন্ডের সঙ্গে দেখা হতে পারে এই ভেবেই হোটেল নিয়েছিলাম ল্যান্ডরের কাছাকাছি। যে পাহাড়ে আমাদের হোটেল তার উল্টোদিকের পাহাড়ের শিরদাঁড়ার একপ্রান্তে দেখা যাচ্ছে সেই আইভি কটেজ। নেট ঘেঁটে আগেই সেই ঠিকানা জেনে নিয়েছিলাম। এত জনপ্রিয় ও ভালবাসার সৃষ্টিকর্তা যে আমার ঘরের কোণেই চুপটি করে বসে আছেন ভাবতে অবাকই লাগে। হরিদ্বার থেকে মুসৌরির দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিমি। আর মুসৌরি থেকে ৮ কিমি পুব দিকে গেলেই তার যমজ শহর ল্যান্ডোর। সেদিন পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে গিয়েছিল। পরদিন সকাল নটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম হোটেল থেকে সবাই। দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছেও গেলাম আইভি কটেজের সামনে। নৌকার গলুইয়ের মতো বাড়িটির দুপাশে দুটি রাস্তা উঠে গেছে লালটিব্বা ভিউ পয়েন্টে। কিন্তু বাড়ি কোথায়? এ তো একটি তিব্বতি সরাইখানা। নাম ডোমা’স ইন! দেয়ালে তিব্বতি সংস্কৃতি ও বৌদ্ধধর্মের নানা রংবেরঙের চিত্রকলা অঙ্কিত বাড়িটি অনেক দূর থেকেই নজর কাড়ে। ডোমাস ইনের পিছনেই সাদা চুনকাম করা ছিমছাম একটি তিনতলা বাড়ি। জানালার বর্ডার ও টিনেরছাদ মেরুন রঙে রাঙানো। বাড়িটির অন্য পাশ দিয়ে রাস্তা থেকে পাহাড়ের গা ঘেঁষে সরু একটি সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়।

জানা ছিল মুসৌরির ম্যাল রোডের কেমব্রিজ বইয়ের দোকানে প্রতি শনিবার বিকেল ৪ টে থেকে ৬ টা পর্যন্ত রাস্কিন বন্ড পাঠক ও টুরিস্টদের সঙ্গে সময় কাটান। উৎসুক ও মুগ্ধ পাঠকেরা তাঁর অটোগ্রাফ নেয়, তাঁর সাঙ্গে ছবি তুলে ঈশ্বর দেখার মতো আনন্দ পায়। শৈশব ও কৈশোর থেকেই যার গল্প পড়ার পর চারপাশের চেনাজানা জীবন ও চরিত্রগুলিও যেন সেই গল্পের মতো লাগতে শুরু করে। চারপাশের অকিঞ্চিৎকর মানুষের জীবনও কত সুন্দর, কত মায়াময় হয়ে ওঠে তাঁর বই পড়ার পরে। মুসৌরি ও দেরাদুন হয়ে ওঠে পাঠকের স্বর্গ ও স্বর্গের দ্বার। এমনই সুন্দর ও সহজ অথচ কত গভীর শব্দ দিয়ে গড়া তাঁর সাহিত্যের জগৎ! এমন এক ধ্রুপদী লেখকের সান্নিধ্য পেয়ে পাঠকেরা আত্মহারা হবেন এটাই স্বাভাবিক। মনে পড়ে যেদিন পৌঁছলাম দিনটি ছিল রবিবার। সন্ধেবেলা ম্যাল রোডে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পেলাম দোকানটি। সামনে বড় একটি ব্যানারে রাস্কিন বন্ডের ছবি। দোকানটির যে র‍্যাকে তাকাই শুধু রাস্কিন বন্ডের বই। সর্বাগ্রে জ্বলজ্বল করছে রাস্কিন বন্ডের আত্মজীবনী ‘Lone Fox Dancing’! এক বছর আগেই বেরিয়েছে। এদিকে শিখা আগামীকাল আমার জন্মদিনের জন্য একটি পছন্দসই গিফট খুঁজছিল। বইটি দেখেই বললাম এটি আমায় গিফট দেবে? দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম লেখকের অটোগ্রাফ পেতে পারি কিনা। দোকানদারের বই বিক্রি দিয়ে কথা। অটোগ্রাফ তো উনি বিক্রি করেন না। তবু সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন কাল একবার ওনার বাড়ি চলে যান বইটি নিয়ে অটোগ্রাফ পেয়ে যাবেন। মনে মনে ভাবছি, ওনার মতো লেখক কি বিনা অ্যাপেয়ন্টমেন্টে দেখা করবেন? তাও আবার আমার সঙ্গে? আচ্ছা ওনার ফোন নম্বরটা দিন না! দোকান মালিক ফোন নম্বর দিতে চাইছেন না। বলল ফোন করার দরকার নেই উনি এমনিই দেখা করেন। সকালের দিকে চলে যাবেন। শেষে জোরাজুরি করাতে একটি ল্যান্ডফোনের নম্বর দিলেন।

সিঁড়ির বাইশটি ধাপ উত্তরণের পর যে ঘরটির সামনে এসে দাঁড়ালাম তার দরজায় কাঠের ফলকে লেখা রাস্কিন বন্ড, নিচে রাকেশ, বীণা। বিগত চল্লিশ বছর ধরে এই বাড়িতেই থাকেন রাস্কিন বন্ড তাঁর পরিবারের সঙ্গে! রাস্কিনের জন্ম হিমাচলের কসৌলিতে হলেও প্রায় ৬৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেরাদুন ও মুসৌরিতেই কাটিয়েছেন। যদিও যৌবনের প্রথমদিকে ভাগ্যসন্ধানে বছর তিনেক ইংল্যান্ডে ও পড়ে ফিরে এসে চাকুরিসূত্রে দিল্লীতে চার বছর কাটান। শেষে চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে সমস্তরকম উচ্চাশা ত্যাগ করে শুধু লেখালেখিকেই আঁকড়ে ধরতে চাইলেন। সব ছেড়ে পালিয়ে গেলেন হিমালয়ের নির্জনতায়। ১৯৬৩ থেকে পাকাপাকি ভাবে থেকে গেলেন মুসৌরিতে। সঙ্গী শুধু এক বালক, প্রকৃতির নির্জনতা আর সেই নির্জনতা ভঙ্গকারী টাইপরাইটারের শব্দ! সবুজ দরজাটির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবছি ডোরবেল বাজাবো কিনা। ৮৫ বছরের রাস্টি হয়তো তার ছাদের ঘরে বসে কোনও গল্পের প্লট ভাবছেন। অথবা অতীতের স্মৃতিচারণায় মগ্ন। আবার ডোরবেলের কর্কশ শব্দে তার মগ্নতা ভেঙে না-যায়! যদি বিরক্ত বোধ করেন? 

সেই ভেবেই স্ত্রী শিখা ও আমাদের দুই সন্তানকে সঙ্গে আনিনি। ওদের নীচের রেস্টুরেন্টে অপেক্ষায় রেখে এসেছি। ডোরবেল না বাজিয়ে দরজায় কান পাতি যদি তাঁর টাইপরাইটারের খটাখট শব্দে কোনও গল্পকথা ভেসে আসে। না তাও আসছে না। নার্ভাস আঙুলে আলতো করে দরজায় টোকা দিলাম। কেউ শুনতে পেল কি? না। মৃদু আওয়াজে ডাকলাম মিঃ বন্ড বাড়ি আছেন? মিঃ বন্ড শুনতে পাচ্ছেন! আমি একবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই! না কেউ শুনতে পেল না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বাইশটি ধাপ গুনে গুনে আবার নিচে নেমে এলাম। এবার হয়তো আর সাক্ষাৎ হল না। মোবাইল বের করে রাস্তা থেকে বাড়িটির কয়েকটি ছবি তুলে রেস্টুরেন্টের দিকে ফিরছি এমন সময় দেখি একজন বাড়িটির দিকে আসছে। লোকটি কি এই বাড়ির কেউ? নাকি কোনও কাজে এসেছে? জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলাম তিনি স্থানীয় পৌরসভার সাফাই কর্মচারী। বাড়ি বাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করা ও সাফাই করা তার কাজ। রাস্কিনের বাড়িতেই যাছে সাফাইয়ের কাজে। এই তো সুযোগ। লোকটিকে অনুরোধ করে যদি বাড়ির কারোর সঙ্গে কথা বলা যায়। কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারলাম লোকটি মদের নেশায় একটু মাতাল হয়ে আছে। গুরুত্ব দিয়ে তার নামধাম সাকিন ঠিকানা জানতে চাইতেই রাস্তার ধারে নিয়ে আমার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলো। নাম মুকেশ। আদতে বিহারের বাসিন্দা। তবে ছোটবেলাতেই কাকার সঙ্গে মুকেশ চলে আসে মুসৌরি রোজগারের উদ্যেশ্যে। তারপর এখানেই সংসার পেতে ছোটো একটি ভাড়াবাড়িতে বাস করছে। ছোটখাটো কালো দেখতে মুকেশের চেহারায় বেশ একটা পরিপাটির ছাপ আছে। ব্যাকব্রাশ করা চুলে তেলের গাঢ়তা চিকচিক করছে। তবে পরনের সবুজ টিশার্টটি ওদের ইউনিফর্ম। শেষে ওর কাজের কথা ভুলে আমাকে রাস্কিনের সঙ্গে দেখা করানোর জন্য যেন পণ করে বসল। 

আমাকে নিয়ে গেল বাড়িটির নিচের তলায় একটি অপ্রচলিত ছোটো দরজার কাছে। সেখানে ডোরবেল টিপতেই যে লম্বা মতন তরুণ বেরিয়ে এলেন দেখে তাঁকে রাকেশ বলেই মনে হল। আমার আসার কারণটি জানতে চাইল। তারপর স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বলল‘রাস্কিন তো এখন বাড়ি নেই।’ আমি বুঝতে পারলাম একজন সাধারণ দর্শন প্রার্থীকে এড়িয়ে যাবার সবচেয়ে সহজ পন্থাটিই আমার উপরে প্রয়োগ করেছেন তিনি। তাঁকে অনুরোধ করে বললাম যে ওঁনার একটি অটোগ্রাফ নিয়েই চলে যাবো। সে বলল ঠিক আছে আমাকে বইটি দিন আমি অটোগ্রাফ নিয়ে আসছি। ‘মিঃ রাকেশ বহুদূর থেকে এসেছি আমি শুধু ঈশ্বরতুল্য প্রিয় লেখকটিকে একবার নিজের চোখে দেখব বলে। বাংলা থেকে এসেছি কাল। আগামীকাল চলে যাবো হরিদ্বার। বাড়ির দোরগোড়ায় এসেও যদি দেখা না করে ফিরে যাই খুবই মনখারাপ হয়ে যাবে।’ অগত্যা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে একটি ইমোশনাল পরিবেশ সৃষ্টি করতেই হল। মুহূর্তক্ষণ চেয়ে থেকে সে বলল আচ্ছা দাঁড়ান, আমি একবার জিজ্ঞেস করে আসছি। কিছুক্ষণ বাদেই রাকেশ এসে বলল ‘বাইরের সিঁড়িটি দিয়েই দোতলার ঘরে চলে আসুন। তবে পাঁচ মিনিটের বেশি সময় নেবেন না।’ আহ্‌! কি স্বস্তি যে পেলাম।

অতি সাধারণ অপরিসর এক ড্রয়িং রুম থেকে একটি কাঠের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে তিনতলায়। সিঁড়ির নিচে একপাশে একটি ছোটো আলমারি ভর্তি বই। দুয়েকটি ছোটো টেবিলেও বই ও পত্রপত্রিকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আলমারিটির উপরে একপাশে বাগ্‌দেবীর ছবি, পাথরের একটি বুদ্ধমূর্তি, তারপর ভগবান বালাজির ছবি, আর পিছনের দেওয়ালে পূর্ণিমা রাতে নৃত্যরত একটি লাল রঙের পাহাড়ি শিয়ালের অপূর্ব ছবি। আর আলমারির সামনে একটি সোফায় যিনি বসে আছেন তিনি ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের সম্রাট রাস্কিন বন্ড। অনেক পাঠকের কাছেই তিনি দেবতা স্বরূপ। তবে আমার মনে হল দেবতা নন যেন একটি দেবশিশু বসে আছেন। জামনগর এস্টেটের গৃহশিক্ষকের সেই চার-পাঁচ বছরের দুষ্টু, গোঁয়ার শিশু সন্তানটি যার মনে চারপাশের সম্বন্ধে শুধু প্রশ্ন আর প্রশ্ন ছিল সেই শিশুটিই বিগত ৭০ বছর ধরে একের পর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি করে গেছেন। বিস্ময় তাঁর গল্পের মধ্যে নয়, কাহিনির মধ্যে নয়, বিস্ময় তাঁর গল্প বলার ভাষায়, তার সহজতায়। আজ তাঁর মনে আর সেই জিজ্ঞাসা নেই তার মানে এই নয় যে ফুরিয়ে গেছে। ছোটো চঞ্চল একটি পাহাড়ি ঝরনা ৮৫ বছর ধরে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বইতে বইতে যেন এক সাগরে এসে নিজেই সাগরে পরিণত হয়ে গেছে। সেই গভীরতা সেই তরঙ্গের ঘাত আমরা বাইরে থেকে বুঝতে পারব না। তাঁর সাহিত্যপাঠের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আমরা সেই ঘাত প্রতিঘাত অনুভব করি। একটি অতি তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর জীবনেরও যে সব মানবিক অনুভূতি- বেদনা, বাসনা, দ্বিধা,দ্বন্দ্ব,কিছু হারিয়ে ফেলবার ভয়, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা সব, সব এই মহাজীবনের হৃদয়ে, তাঁর দেখার মধ্যে, তাঁর লেখার মধ্যে সমাহিত হয়ে আছে। শুধু অনুভবি পাঠকই নন, অতি সাধারণ পাঠকও সেই অনুভূতির তরঙ্গকে তার গভীরতাকে ছুঁয়ে ফেলতে পারে। 

-ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

-আসলে সে সম্পর্কে আমি ভাবিনি কখনও। 

যে সারাজীবন ধরে ছোটো, বড়, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে শুধু মানুষের জীবনকে দেখে গেছে, তাদের হৃদয়ের কথাগুলি ভেবেছেন তাঁর আর ঈশ্বরের কথা ভাববার প্রয়োজন কী!

লেখা প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা বলি। সেদিন আমার সাত বছরের কন্যা সৃজা পাশের আবাসনের তার সমবয়সি একটি বাচ্চার সঙ্গে ক্লে দিয়ে মূর্তি বানিয়ে খেলছিল। বাচ্চাটি একটি চারহাতওয়ালা গণেশের মূর্তি বানাতেই সৃজা প্রশ্ন করল চার হাত কেন ওঁর? বালিকাটি বলল গনেণেশজি ভগবান, তাই ওঁর চারটি হাত। উত্তরে সৃজা সন্তুষ্ট হতে পারল না। সে তার খেলার সঙ্গীটিকে বোঝানোর চেষ্টা করল। বলল যে-- ভেবে দেখ ভগবান নিজে যেমন হবে সে মানুষকেও তো ঠিক তেমনই বানাবে। তাহলে মানুষের দুটি হাত হলে ভগবানের চারটি হাত কেমন করে হতে পারে?

কথাটি ভীষণভাবে আমাকে ছুঁয়ে গেল। আর এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আজ রাস্কিনের সেই মতামতটির সারমর্ম আমি টের পাচ্ছি।

খুব সাধারণ কথাবার্তাও হয়েছিল আমাদের মধ্যে সেদিন। সাহিত্য নিয়ে। আমি যে বাঙালি ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে একটু আধটু চর্চা করি সেটা জানতেই রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ এলো। নিজেই জানালেন তাঁর প্রিয় লেখকদের মধ্যে রবিঠাকুর অন্যতম। ইংরেজি অনুবাদে তিনি পড়েছেন রবীন্দ্র সাহিত্য। চাকুরীসূত্রে হরিদ্বারে থাকি জেনে হরিদ্বারের প্রসঙ্গও এলো। বিশেষ করে এখানকার ফরেস্ট ও লেপার্ডের কথা। তবে তিনি যে লেপার্ডের কথা বলেছিল সেগুলি নিশ্চয়ই একপ্রকার নিরীহ ও মানুষের প্রতি অহিংস ভাব পোষণ করতো। অনেকটা তাঁর গল্পের মতো। কিন্তু আমাদের এই সাক্ষাৎকারের ছয়মাস পরেই আমার সেই ভুল ভেঙে যাবে। আমাদের ভেলের আবাসিক এলাকার মধ্যেই যখন দু’দুটি মানুষ লেপার্ডের আক্রমণে শুধু ক্ষতবিক্ষতই হবে না, অভাবনীয় ভাবে তারা সেই লেপার্ডটির শিকারে পরিণত হবে। আর আবাসিকদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টিকারী সেই চিতাটি (একটি না হয়ে দুটি ঘটনায় দুটি ভিন্ন ভিন্ন চিতাও হতে পারে) উত্তরাখণ্ড সরকার দ্বারা মানুষখেকো উপাধিতে ভূষিত হবে এবং মাস চারেকের মধ্যেই বনবিভাগের দ্বারা ভাড়া করা শিকারির গুলিতে সেটির মৃত্যু হবে। যাইহোক এই বন ও বন্যজন্তুদের প্রতি তাঁর অকৃত্তিম সনহানুভুতির কথাও আমরা পড়েছি। 

আধুনিক উন্নয়নের ফাঁদে পড়ে হরিদ্বার-দেরাদুন-মুসৌরির কত কত বনাঞ্চল পাকাপাকি ভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে আমরা জানি। রাস্কিন কিন্তু সেই উন্নয়ন মেনে নিতে পারেননি। নতুন নতুন রাস্তাঘাট ও নানা পরিযোজনার জন্য যে লক্ষ লক্ষ গাছ কাটা গেছে, যেসব হাজার হাজার পাখি ও বন্যজন্তুরা গৃহহারা হয়েছে তাদের কান্না, হাহাকার রাস্কিনের লেখায় ফিরে ফিরে এসেছে। আজও তাঁর নিশ্চল (নাকি ছলছল) চোখদুটি মনে করে বুঝতে পারছি সে কতটা বেদনার্ত হয়ে পড়েছিল সেই হারিয়ে যাওয়া দৃশ্যগুলি মনে করে। যতই সে বলুক যে এই দীর্ঘ জীবনের প্রতি তাঁর কোনও অভিযোগ নেই তবুও আমার বারবার মনে হয় এই বন, এই পাহাড়, তার ঝরনা, এখানকার পশুপাখি, সঞ্চরণশীলমেঘ-বৃষ্টি-কুয়াশা-ছায়া-রোদ প্রকৃতির এইসব কিছুই এখানকার মানুষের মতই তাঁর জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আর এই অংশে যখন যখন লোভী সমাজ তার করাল হাত বাড়িয়েছে তখনই সে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কাটা পড়া গাছেদের কান্না, বাসাহীন পাখিদের ছটফটানি, গৃহহীন পশুদের ভয়ার্ত চাহনি, কুয়াশার চলমানহীনতা, রোদের পাগলামি, ছায়ার অন্ধকার আর বৃষ্টির প্রতিশোধ তার লেখার চরিত্র হয়ে উঠেছে। গোঁয়ার রাস্টিও যেন প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে এই নোংরা ও বদ উপায়ে প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী সমাজের প্রতি। 

সেই জন্যই কি ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ও বেস্টসেলার লেখক হয়েও টাইপরাইটার থেকে কম্পিউটারে, ল্যান্ডফোন থেকে মোবাইলে (স্মার্ট ফোনের তো কথাই নেই) আর হাত বাড়াননি তিনি? মাত্র সতেরো বছর বয়সে যে ছেলেটি ভাগ্য সন্ধানে বিলেতে গেল, উন্নত ভবিষ্যতের হাতছানি উপেক্ষা করে তিন বছর পরে সে একপ্রকার পালিয়ে এল নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসার টানে। তারপরে আবার মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সেই দিল্লির সম্পন্ন চাকরি ছেড়ে দিলেন পাকাপাকিভাবে। আশ্রয় নিলেন পাইন, ওক, স্প্রুস, ম্যাপল বনে ঘেরা মুসৌরির একটি নির্জন কটেজে (১৯৬৩ সাল নাগাদ যখন রাস্কিন পাকাপাকিভাবে মুসৌরিতে থাকতে এনেল তখন ম্যাপলউড কটেজের একটি রুমেই প্রথম ভাড়া থাকতেন)। এহেন রাস্কিন বন্ডকে ভারতের ভূমিপুত্র বলতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা কিংবা সংকোচ নেই। অথচ তাঁকেই ভিন্ন ধর্মের ও বিদেশি বিচার করে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, কোণার্কে বিদেশিদের জন্য ধার্য অতিরিক্ত প্রবেশ শুল্ক আদায় করে তবেই দর্শন করতে দেওয়া হয়। হায় রে আমার ভারতবর্ষ!

সেই জন্মদিনটিতে যে আবেশ নিয়ে ফিরেছিলাম তার সুগন্ধ সারাজীবন আমাকে সুবাসিত করে রাখবে। একটা স্বপ্ন থেকে ছবি,সেই ছবি থেকে বৃষ্টি! ঘর ভেসে যায়। ভেসে যাচ্ছে কাগজের নৌকা। আমি কি তুলে নেব? আমি কি ভেসে যাবো এতে আরোহণ করে আরও উপরের দিকে? নাকি এখান থেকেই নামতে শুরু করবো ঘরের দিকে! একটা সংক্ষিপ্ত অথচ মহাবিস্ফোরণকারী আলাপ থেকে আমি হাঁটা শুরু করি একলা নিঃসঙ্গ পথে। এর আগে তিন তিনটি সফরেও যে শহর আমার কাছে রুক্ষ হয়ে ছিল। আমার অতীত গল্পের কাছে ধূসর প্রতীতি হয়ে ছিলো সে শহরের এক গোপন সুড়ঙ্গ আমি খুঁজে পেয়েছি। যার মাধ্যমে সেই অতীতের সাথে যোগসূত্র গড়ে তুলতে পারি। এদিকে ঝরনার পাগলামি এসে ধুয়ে মুছে দিচ্ছে এর নাগরিক কোলাহল। আমি ট্রাফিক জ্যাম থেকে মুক্ত হয়ে প্রাচীন ঘণ্টাঘরের ধ্বনির কাছে ঋণী হতে যাব এবার। ফেলে আসা প্রিয়তমা আমায় বাঁধা দিও না। এক সূর্যোদয় থেকে আরেক উদয়ের দিকে যাচ্ছি আমি। আকাশ কি খানিকটা মেঘম্লান! হোক না। ভালোবাসার মেঘ জমলে তো ভালোই। ভালোবাসায় দূরত্বও অনির্বচনীয়। শৈশব থেকে আমার মণিমাণিক্য তুলে এনে তারুণ্যকে সাজিয়ে তুলতে পারবো। রাস্কিন বন্ড নামের এক নক্ষত্র থেকে যে কিরণ আমাকে স্পর্শ করে গেল তার শিহরণ আজীবন থেকে যাবে। আর যে পাহাড় এই নক্ষত্রের আলোতে উদ্ভাসিত সেই পাহাড় যেন নতুন বর্ণে, গন্ধে খুলে যাচ্ছে তার অগুনতি ভাঁজ নিয়ে। এইতো একটা ভাঁজ খুলতেই একটি পাইন বনের টিলা। নাম পরি টিব্বা! ওটাই কি এ অঞ্চলের খাণ্ডব বন? পরিত্যক্ত পোড়া একটি গৃহের অবয়ব দেখা যায়। ভিন্ন ভিন্ন জাতের একটি কিশর-কিশোরী সমাজে তাদের ভালোবাসার স্বীকৃতি না পেয়ে চলে গেছে অভিমানে সেই নির্জন টিলার দিকে নতুন সমাজ গড়বে বলে। ওইতো শোনা যাচ্ছে ওদের গোঙানি! এটা কি ওদের মিলনের শীৎকার নাকি দহনের চিৎকার ধ্বনি!

ওই তো আরেকটা ভাঁজ খুলতে খুলতে পথের দাবিতে কাটা পড়ে যাওয়া এপ্রিলের ওক সেজে উঠছে তার নতুন পাতা নিয়ে, ম্যাপলের পাতাগুলিতে সবুজ রং ধরেছে, মধুলোভী ভ্রমরেরা আবার গান গাইছে- রডোডেনড্রন, রডোডেনড্রন...! এ মুসৌরির ছবিতো আগে কখনও দেখিনি আমি। ঘন বন তার ফাঁকফোকরে ধরে রেখেছে ফালি ফালি পূর্ণিমা আলো। ম্যাজিক, ম্যাজিক বলতে একটি একলা হয়ে যাওয়া শেয়াল নেচে উঠল! নাচছে এখনও। আমি আড়াল থেকে দেখছি আর গাছেদের ছায়া হয়ে তাকে অনুকরণ করতে করতে নিচের রাস্তা ধরে একটি বাংলো মতন বাড়ির সামনে এসে পড়লাম। এটাই কি ম্যাপলউড কটেজ! তার একটি রুমের ভিতরে টাইপরাইটারটি কি আগে থেকেই সাজানো ছিল?

খটাখট খটাখট শব্দে এ শহরের যানবাহনের কর্কশ শব্দ, নাগরিক কোলাহল, সব মিলিয়ে যাচ্ছে শীতল বাতাসে। 

এবার ঠিক আমি সেই নিঃসঙ্গ শেয়ালের নাচের একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে পারব। 


গতরাতে ঘরের পথে হেঁটে যেতে যেতে 

দেখলাম, একটি শেয়াল একা 

নৃত্য করছে চাঁদের আলোয়।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, বুঝলাম

এই রাত্রিটি একান্তই তার, তারপর  

চেনা নিচু রাস্তা ধরে নেমে গেলাম।

সকালের শিশিরের সঙ্গে যদি কখনো 

সঠিক তালে শব্দ বেজে ওঠে 

আমিও নেচে উঠি নিঃসঙ্গ শেয়ালের মতো!


(লেখকের অনুবাদে রাস্কিন বন্ডের কবিতা)

---------------------------------------------------------

রাস্কিন বন্ডের ছবি এঁকেছেন অতনু দেব

Monday, November 23, 2020

নির্মল হালদারের গদ্য


পানিপাথর

ওষুধত লাগবেকেই--

পকা লাগে। ওষুধ দিতেই হবেক।


পীযুষের কথা শুনে চেয়ে আছি লকলকে বাঁধা কপি ফুল কপির দিকে।

পালং শাকের জমিতে ফড়িং

উড়ছে। 

আকাশেও মেঘ। এই হেমন্ত দিনে বৃষ্টি হলে পাকা ধানের ক্ষতি। 

প্রকৃতির সঙ্গে কে কবে আর পেরে উঠেছে! বৃষ্টি এলে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা মানব জগতের নেই।


পীযূষরা প্রকৃতির সঙ্গে থেকেও প্রকৃতিকে সব সময় বুঝে উঠতে পারে না। মাটিকেও বোঝে না। যে মাটিতে লাগিয়েছিল বেগুন

দেখা গেল গাছগুলো বেড়ে উঠতে উঠতে মরে যাচ্ছে। কি কারণ?

পরীক্ষা করাতে হবে মাটি। প্রভাস জানালো আমাদের।

ব্লকে কৃষি বিভাগের একটি শাখা আছে। সেইখানে মাটি নিয়ে গেলে, পরীক্ষা করে দেবে। তারপর বলেও দেবে,

এই মাটিতে কি হবে কি হবে না।


মুশকিল হল, এই তথ্য অনেক চাষি জানে না। অনেক সময় তো তাই, চাষ করে ও নষ্ট হয় বীজ। শ্রম ও টাকা জলে চলে যায়।


আমি এসেছি। চাষী ঘরে এসেছি। আমি যদিও এখানে খুব বেমানান পোশাকে আশাকে। কথাবার্তায়। আচরণে। তবুও এসেছি। কেননা, এইসব চাষীদের ঘরে

প্রাণের সম্ভার। সতেজ সজীব

প্রাণ।

কি পরিশ্রমটা করে এরা, না দেখলে না জানলে বোঝা যাবে না।

পীযূষ বিএসসি পাশ করে চাকরির পড়াশোনার ফাঁকে

বাপ ঠাকুরদার চাষবাসেও 

তার মন।


সাধারণত আজকাল দেখা যাচ্ছে, মাহাতদের অনেক তরুণ পড়াশোনা করে চাষের দিকে আর যায় না। ফলে, বাপ ঠাকুদ্দার চিন্তা হয়, তাদের অবর্তমানে চাষবাস আর হবেনা। আকাল দেখা যাবে।

ক্রমশ সংখ্যাটা বাড়লে, ভবিষ্যতে চাষবাস আর হবেই না, এই উদ্বেগ কাজ করে।


পীযূষ চাকরির পরীক্ষার জন্য অংক যেমন জানে তেমনি পালং পাতায় পোকা লাগলে 

দেখতে পায়। প্রতিকার করেও থাকে।


আমাকে ঘরের শাকসবজি দেবে বলে, নিয়ে এলো হাঁসুয়া।

একটার পর একটা ফুলকপি

বাঁধা কপি কাটতে থাকে।


আমার চোখে পড়ে টমেটো ক্ষেত। নীল লাল রঙে নিজেদের সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


কাছে যাবার সাহস মানে, জোর করে কাছে যাবো। কিন্তু গেলাম না। পীযূষকেই বললাম, কয়েকটা টমেটো দিস।


আমাদের ঘরে টমেটো পোড়ানা হয়ে থাকে। সঙ্গে নুন

কাঁচা লঙ্কা পেঁয়াজ। ভাতের সঙ্গে খুব সুস্বাদু।


রাঁধনাশাল থেকে মাছ ভাজার গন্ধ আসছে। তুষারের ন মাসের গর্ভবতী বউ ভাজছে।

 মাছ ভাজার গন্ধে খিদে চাগিয়ে উঠলেও মনে মনে স্থির করেছি, খাব না। ভাত খেয়ে আবার যাওয়া, বেশ ক্লান্তিকর। অন্যান্য সমস্যাও দেখা দিতে পারে।


তুষার ও পীযূষ এবং তাদের বাবাকে বললাম, খাওয়াটা বড় কথা নয়। এই যে আমি এসেছি, সবাই কথা বলছি। এইতো ঢের।


সকলের আন্তরিকতা টের পাচ্ছি ভেতরে ভেতরে, এই কথা বললাম না আর। শুধু বলবো, গ্রামের নাম পানিপাথর পরাবাস্তব পরাবাস্তব লাগলেও  পানিপাথর খুবই বাস্তব। খুব জ্যান্ত।


এই জ্যান্তর পাশেই আমিও

জ্যান্ত থাকতে চাই। আসতে চাই সময়ে অসময়ে।


আমার বন্ধু প্রভাস মাহাতর শ্বশুরবাড়ি হলেও আমার আত্মীয় বাড়ি তো বটেই। যেখানে আমি শুনতে পেয়েছি, ন'মাসের গর্ভ থেকে

এক সন্তান আমাকে বলছে,

আবার আসবে-- আসবে।


৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

২১-১১-২০২০


রচনা করেছি শয্যা


আমি বরাবর মেঝেতে শুই। মেঝেতেই আমার লম্বা-চওড়া বিছানা। এবং আমি বিছানার একধারে শুয়ে থাকি।

          বিছানাতে গড়াগড়ি খাওয়া আমার অভ্যেস নেই। আমার বালিশ থেকে অনেকটা তফাতে আরেকটা বালিশ। কোনো মানে নেই। অথচ মানে আছে। মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে যদি দেখি, কেউ শুয়ে আছে।

           আমার মনের বুনন এ রকমই। শুয়ে থাকবে যে তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে তাকে নিয়ে চলে যাব ছাদে। উপর থেকেই তো উপরে ওঠা যায়। কি পূর্ণিমা কি অমাবস্যা

চাঁদ আমাকে ডাকে। 

           চাঁদ না বলে বলা ভালো চাঁদের বুড়ি।অনন্তকালের সম্পর্ক। চাঁদের বুড়ি চরকা চালায়। তার সুতো এত সূক্ষ্ম ও সুন্দর কোনোদিন ছিঁড়বে না।

            সম্পর্ক ছিঁড়বে না।

            কে আসবে বিছানায়? মাঝ রাতে তাকে ডেকে তুলবো? যে কেউ এলে চলবে না। বিশেষ বিশেষ মানুষ আছে আমার তালিকায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এলে, রাতভর বৃষ্টি। বৃষ্টির রঙ কি হবে? এও চিন্তার বিষয়। নীল হলে কেমন হয়? মেরুন রঙটা কেমন লাগে? রঙের দিকে না গিয়ে প্রেমের দিকে যেতে চাই।

প্রেমের গভীরতা মাপামাপি না করে, শুধু দেখবো প্রেমের আকর্ষণ কতদূর। 

             শুধু প্রেমে আমার বিশ্বাস নেই। কুল গাছে উঠবো আর পায়ে কাঁটা বিঁধবে না, তাহলে কুল আর পাড়লাম কই? রক্তাক্ত হতেই হবে।

             যখন কেউ আটা মাখছে তখন তার আঙ্গুলে ভেজা আটা লাগবেই। তবেই তো রুটি হবে সুস্বাদু। গরম গরম।

             না, আমার বিছানায় উষ্ণতা নেই। খড়ের বিছানায় শুতে পারলে উষ্ণতা পেতাম। একা শুলেও উষ্ণতা। কেন না, খড়ের অন্তর্নিহিত অর্থ , মায়ের ফেলে যাওয়া একটা অংশ। কেউ কেউ চুল বলে থাকে। তাই, খড় থেকে মায়ের ওম পাওয়া যায়।

             আমি কোনো ভাবেই চওড়া কপাল করে আসিনি। আমাকে বিছানা পাততেই হয়। বিছানা তুলতে হয়। সকাল হলেই যখন তুলছি তখন লক্ষ্য করি, কারোর কিছু পড়ে আছে নাকি। এই ভাবনা যে কত অবান্তর, নিজের কাছেই নিজে হেসে ফেলি। নীরব।

            বিছানা একাকীর নয়। অথবা বিছানা একাকীর। নিঃশব্দ। অনেকেই আছেন বিশেষ করে গ্রামের দিকে একা একা শুয়েও পাশে রাখেন একটা লাঠি। চোর তাড়ানোর জন্য। আমারও যে চোরের ভয় নেই এমনটা নয়। কিন্তু লাঠি রাখার কথা কোনোদিন ভাবি নাই। ঘুমের ঘোরে লাঠিতে পা পড়লে, যদি ভয় পাই? চেঁচিয়ে উঠি? হেসে উঠবে লাঠিও। মেনে নিতেই হয়েছে, নিজেরই দোষে একা একা বিছানায় আঁকিবুকি করবো।

              আমার লম্বা-চওড়া বিছানা দেখে কেউ কেউ জানতে চেয়েছে, এত বড় বিছানায় আর কে শোয়?আমি নিজেই যে ১ থেকে ১০০ হয়ে যাই, ক'জনকে আর বলবো। কিংবা আমি যে ১ থেকে শূন্য হয়ে যাই, বলতে চাই না কাউকে।

             সন্ধে হয়ে গেছে। আমি প্রতিদিনের মতো বিছানা পেতেছি। চারপাশে অসংখ্য চরিত্র আমার সঙ্গে কথা বলছে। সারাদিন পর ক্লান্ত লাগছে আমার। কিন্তু ক্লান্তিকে গ্রাহ্য করলে কিছুই যে করা যাবে না। আমার অনেক কাজ। অনেক কাজ বাকি আছে এখনো।


৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

২২-১১-২০২০

আলোকচিত্র: সন্দীপ কুমার

Saturday, November 21, 2020

অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়ের কবিতা


গুঁড়িপথ

এখানে সুপ্তিহীন নুড়িবিজড়িত এই ফাঁকা অন্তরীপে
অসত্য নেমপ্লেটে ওরা এসেছিল ভুয়ো জিপে...

দীপদা সন্ধেবেলা নীপাদির রাংতার টিপে
নিজেকেই দেখেছিল চন্দ্রাহত, আর
জ্যোৎস্না এসে জলে পড়ে
ছায়া হয়ে ঘিরে গেল তার,
অন্য ব-দ্বীপে!

কানাকানি বয়ে চলে
পাপড়ির সিড়ি ভেঙে, সারারাত
কালো টিউলিপে...

সঞ্চার

মাছির মতন ঘরে ঢোকে
অনাহুত, ফাঁকা এক বসন্তবাতাস,
আমি তাকে বহুদূর চলে যেতে বলি...

যেখানে চন্দ্রচোর দাগী কানাগলি
কোনও দিন হতে পারে তারার আকাশ...

Wednesday, November 11, 2020

পাপ ও শাস্তি: পুনরাবলোকন


সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়: 
দূরে কাছে, কেবলই ঘর ভাঙে। ঈশ্বরের বিকল্প হয়ে মানুষ পাপ করে আর সেই রক্তধারা বয়ে গেলে সময় সন্দিগ্ধ স্বরে প্রশ্ন করেছি: 'নদী, নির্ঝরের থেকে নেমে এসেছো কি, মানুষের হৃদয়ের থেকে?’ আমি একটি উপন্যাস নিয়ে ভাবছিলাম। অনেকদিন পর সে লেখাটিকে আবার পড়া হল ব্যোমকেশ আর ফেলুদার কোলাহল ও কিচিরমিচিরের মাঝে। কি আশ্চর্য! আজ থেকে দেড়শ বছরেরও আগে প্রকাশিত হয় দস্তয়েভস্কির ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট। ১৮৬৬ সাল জুড়ে বারো কিস্তিতে লেখাটি ছাপা হয় পত্রিকার পাতায়। যে রুশ ছাত্রটি নেপোলিয়নের তরুণ দূত হিসেবে নিজেকে ভেবে একটি খুন করে, সে স্বছন্দে একটি গোয়েন্দা গল্পের জন্ম দিতে পারত। খুনের কাহিনী এত চমৎকার যে চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। কোনও সাক্ষ্য প্রমাণও ছিল না। তবু তরুণ রাসকলনিকভ কোনও সত্যান্বেষীর দ্বারা চিহ্নিত হয়নি বরং বিবেকের বোঝা বয়ে নিজেই সত্যান্বেষণ করে গেছে।

কি রুক্ষ, বন্ধুর, আর করুণ রঙিন পথে যে দস্তয়েভস্কি হেঁটেছিলেন! দ্যূতক্রীড়ায় সর্বস্ব হারিয়ে কুরু রাজসভায় যেমন যুধিষ্ঠির শেষ পর্যন্ত সত্যকেই পণ করেছিলেন, জুয়ার টেবিলে সর্বহারা দস্তয়েভস্কিরও কোনও বিকল্প ছিল না সত্যকে খুঁজে না পাওয়ার। এই উপন্যাস কোনও আখ্যান নয়, মানুষের পাপ-পুণ্য, চরম তীর্থযাত্রার একটি নিশ্চিত দলিল। শুধু গল্প লেখাই যদি দস্তয়েভস্কির উদ্দেশ্য হত তাহলে রচিত হতে পারত এক মনোরম চিত্রনাট্য। যেখানে মতাদর্শের নেশায় এক উন্মাদ যুবক পাপবিদ্ধ একটি কিশোরীকে অবলম্বন করে দুনিয়ার পাঠশালায় পড়তে যেতে চায়। এই চিত্রনাট্য সত্যি অনুনকরনীয়। কাহিনীতে বুদ্ধিজীবী মাতাল, স্নেহাতুর পিতা, নিরাসক্ত পুলিশ অফিসার ও দলিত কুসুমের মতো নারীকে দেখতে পাওয়া যায়। আধুনিক কোনও সিনেমার পক্ষে চূড়ান্ত আকর্ষণীয় এক চিত্রনাট্য। তবু যখন ত্রুফো হলিউডের সম্রাট হিচকককে ক্রাইম সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করেন তখন হিচকক সবিনয়ে মেনে নেন তাঁর অসামর্থ্যের কথা। কেননা হিচকক বুঝেছিলেন যে, এই গল্প আসলে সংস্কৃতির ধর্মশাস্ত্র। রাসকলনিকভকে শাস্তি দেওয়ার জন্য বাইরে থেকে আইনের কোনও প্রতিমূর্তি যেমন ডিটেকটিভ নিয়োগ করতে যায় না। রাসকলনিকভের সমস্যা মূলত নৈতিকতার, সে বিবেককে নির্বাসনে পাঠিয়েছে তা-ই সে একা, পরিত্যক্ত, যন্ত্রণাবিধুর। তাঁর শাস্তি যতটা অন্তরের ততটা আদালত ঘোষিত নয়। লোভ ও ক্ষমতা নিজেই নিজেকে যুগপৎ শিকার ও শিকারি ভাবতে পারে।

দার্শনিক এই মলাটটুকু বাদ দিলে অনেক সময়ই মনে হয় কাহিনীর ছিলা টান টান বুননই তো যথেষ্ট। উপসংহারের কোনও প্রয়োজনই নেই। অথচ আজ কখনও ধর্ম কখনও রাজনীতি বা অন্য কোনও যৌথ মতাদর্শের সামনে ভীত আতঙ্কিত মানুষকে দেখলে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করা যায় প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সে ক্রমাগত বন্দি হয়ে প্রাণহীন সত্তায় পর্যবসিত হয়েছে। মৃত্যুলোক থেকে তাঁর প্রত্যাবর্তিত হওয়া জরুরি।

কি বিধুর সেই অপরাহ্ণ যখন সনিয়া একটি সামান্য দেহ পসারিণী ও রাসকলনিকভ, একজন খুনি, বাইবেল থেকে নবকেস্টামেন্ট থেকে লাজারাসের গল্প পড়ে। যেন প্রতীচ্যের নচিকেতা যমলোক থেকে পুনরায় ইহজগতে নিষ্কলুষ ফিরে আসবে। ওই কিশোরীর শীর্ণ হাতে নিজের রক্তাক্ত হাত রেখে রাসকলনিকভ ভেবেছিল—’ যদি হায় জীবন পূরণ নাই হল মম তব অকৃপণ করে!’ নাহলে আর সে সনিয়ার মতো তুচ্ছ পতিতার পায়ের তলায় আছড়ে পড়ে বলবে কেন I prostrate myself not beofre you, but before all suffering humanity. রাসকলনিকভ তরুণ ছাত্র– সে নেপোলিয়ান হতে চেয়েছিল। তাঁর ধারণা ছিল সম্রাটের কোনও বাধন থাকে না, ক্ষমতা যে কোনও গণহত্যাকেও অনুমোদন দেয়। আর সে তো পাপিষ্ঠা এক সুদখোর মহিলাকে খুন করতে চাইছে সমাজের বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য। আর এই রাস্কলনিকভকে কত দেখা যায় সন্ত্রাসবাদে, জেহাদ, যুদ্ধে, আমরা ছোটবেলার ছাত্র আন্দোলনে এই খতমের রাজনীতি যে কতবার দেখলাম!

তবে কি দস্তয়েভস্কি বলতে চাইছিলেন আমরা অন্তিম মূল্য পেতে চাই প্রেমে? জানি না। কিন্তু ভাগ্যিস অপরাধ ও শাস্তির মতো মহাগ্রন্থ লেখা হয়েছিল। তাই দেড়শ বছর বাদেও দেখি হৃদয় অব্দি যায়নি ছুরি, থমকে আছে। সত্যের জ্যোৎস্না পাপের ডালপালার ফোকর দিয়ে মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে এঁকে দিয়েছে পুণ্যের কারুকাজ। অপরাধ ও শাস্তি আবার পড়ে মনে হল মাটির ধুলোবালি অশ্রু আর রক্ত ব্যবহার করে দস্তয়ভস্কি আমাদের বেঁচে থাকার গোঁড়ায় জল ছিটিয়ে দিয়েছেন।

---------------------------------------------------------

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর কয়েকটি বইয়ের নাম: স্থানাঙ্ক নির্ণয়, অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন, নাশকতার দেবদূত, হে চলমান চিত্রমালা, অন্যান্য ও ঋত্বিকতন্ত্র, পাতালের চিরকুট, বুনো স্ট্রবেরি, ইবলিশের আত্মদর্শন সম্পর্কিত, অনভিজাতদের জন্য অপেরা, দিনযাপনের উপাখ্যান। সম্পাদনা করেছেন কবি অনন্য রায়ের কবিতা সমগ্র। তাঁর অনুবাদগ্রন্থ: মাস্কুলা ফেমিনা, অরফি (জঁ ককতো), সাইলেন্স (ইঙ্গমার বার্গম্যান), পিয়েরো ল্যো ফু (জঁ লুক গোদার)। আজ ফিওদোর দস্তয়েভস্কির জন্মদিন উপলক্ষ্যে লেখাটি প্রকাশ করা হল।

Thursday, November 5, 2020

দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা


নিরন্ত হিংস্রতার রক্ত-- পুঞ্জ করা ফুলপত্রালির


নিরন্ত হিংস্রতার রক্ত-- পুঞ্জ করা ফুলপত্রালির 

লাবণ্যে ঘেরা দেয়া, রক্ত ফুটে না বেরোয়। সবুজের

ধক বাড়ছে ক্রমাগত, তেজ হয়ে উঠছে ফুলবাস--

নিরন্ত রক্ত কি চাপা পড়তে চায়? এত সংখ্যাহীন 

হিংস্রতা চারধারে, কত ফুলপাতায় চাপা দেবে তাকে?

শত অস্ত্র বেয়ে রক্ত যুঁজিয়ে পড়ছে সারাক্ষণ

বনোচ্ছেদ উৎসবের তালে তাল দিয়ে মাতোয়ারা।

ছোট একটা এলাকার সবুজ সুবাসের ঘোরে ঘোরে

ভাবছি তার লাবণ্যে বুঝি চাপা পড়তে চলেছে উগ্রতা!

ভাবছি হিংস্রতা ব্যর্থ হয়ে যাবে স্বভাবশান্তির

আলো লেগে! কিন্তু রূঢ় মেশিন বাস্তব দিনে দিনে

যেভাবে বাড়ছে ক্ষীণ সবুজও যে পুড়ে ছাই হয়ে গেল!

তাও সব ভুলে যাই তৃতীয়ার চকিত এককলা

সোনার চাঁদটার দিকে চোখ প'ড়ে গেলে সন্ধ্যাবেলা।


চলতে চলতে রাস্তা যেন লাফিয়ে উঠল ফ্লাইওভারে


চলতে চলতে রাস্তা যেন লাফিয়ে উঠল ফ্লাইওভারে--

পাঁচটা সাতটা কাটাকুটি দ্রুত পথ উপর তলায়

উড়াল দিয়েছে আকাশফুল পেড়ে আনবে ব'লে। দুধারি

বড়ো বড়ো হাসিমুখ হোর্ডিংয়ে বেজে চলছে মিডিয়া

যত দূর পথ যেন স্বচ্ছ আকাশের মধ্য দিয়ে...

মুক্ত পথ-- ভাইরাস উড়ছে না অমঙ্গল ডানা মেলে।

তাও থেকে থেকে আরো উড়াল দিয়ে উঠছে ফ্লাইওভার--

কুছোঁয়া না লাগে যেন তলাকার, যদিও তলাতে গিয়ে ফের

পড়তে হবে শহররাস্তায়, অনুপায়ে চলে যেতে হবে

রুগ্ন জনতার ঘেঁষাঘেঁষি... তবু চলতে চলতে

বারেবারে লাফিয়ে উঠছে পাঁচটা সাতটা উপর তলার

ফ্লাইওভার যেন স্বচ্ছ আকাশের মাঝ দিয়ে তার পথ।

দুধারি হোর্ডিংয়ে বেজে চলেছে মিডিয়া উচ্চগ্রামে--

রঙদার কথার তোড়ে আবছায়া হয়ে গেছে প্যান্ডেমিক..

Thursday, October 15, 2020

কবিতায় স্নিজা, জোড়াসাঁকো এবং অন্যান্য :: অর্ণব সেন

অরুণাভ রাহারায়ের কবিতা লেখার শুরু অল্প বয়স থেকেই। প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় ২০১০-এ 'সবুজ পাতার মেঘ'। পরে 'দিনান্তের ভাষা' (২০১৫), 'খামখেয়ালি পাশবালিশ' (২০১৮)। এ বছর বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে 'স্নিজার সঙ্গে জোড়াসাঁকোয়'।

নাম থেকেই বোঝা যায় বইটির কবিতায় আছে প্রণয়প্রসঙ্গ, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতন ইত্যাদির অনুষঙ্গ। একুশ শতকের নতুন কালের ভাষায় একটু অন্যরকম ভাবে সহজ ভাষায় মনের গভীরে ডুব দেওয়া, আবার ভেসে ওঠা। স্নিজার সঙ্গে থাকাটা একটা উপলক্ষ মাত্র। কিন্তু আসল কথাটা বলার চেষ্টা, নিজের কবিসত্তার এক অভিনব উন্মোচন!

আমরা 'আধুনিক' কবিতা আর বলি না। আসলে রবীন্দ্রনাথের প্রচ্ছন্ন প্রয়াসে এবং প্রশ্রয়ে তিরিশের দশকে (বিশ শতক) যে কবিকুলের একটু অন্যরকম কবিতার সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটে, তাদের মধ্যে আপাত বিচারে ভাষার দিক থেকে বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী কিছুটা সহজ ভাষার পথিক। আবার ভাষার জটিলতায় চিহ্নিত বিষ্ণু দে (পরে অবশ্য সহজপন্থী), কিন্তু সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর রাজকীয় মহিমায় থেকে গেলেন, তৎসম শব্দের খাঁচায় তৈরি কবিতার রহস্যময় প্রাসাদে। সেই যুগের আধুনিকদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল বিরোধ-ঐক্যের। তবে একুশ শতকের কবিদের কাছে রবীন্দ্রনাথ আছেন দূরে, নিজস্ব মহিমায়।

এখন আর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিরোধ নয়, ঐক্যও নয়, তাঁকে অস্বীকারও নয়, বরং কিছুটা উদাসীনতা, আবার রবীন্দ্রসঙ্গীতে অনেকের আগ্রহ প্রতিফলিত অক্ষরবিন্যাসে। এক সময় বাংলা কবিতায় প্রেম ও রোমান্টিকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন কয়েকজন কবি। সমর সেন 'জন্মদিনে' কবিতায় লেখেন: 'রোমান্টিক ব্যাধি আর রূপান্তরিত হয় না কবিতায়'। তবু কাল থেকে কালান্তর রোমান্টিকতা নতুন পোশাকে ফিরে আসে পৃথিবীতে। ব্রায়ান প্যাটেন (জন্ম ১৯৪৬) ইংরেজ কবি, তিনি সচেতনভাবে কবিতায় আবার রোমান্টিকতাকে ফিরিয়ে আনতে চান। 'কবিতা ব্যক্তিগত বিষয়'-- এই তাঁর ধারণা। রোমান্টিকতা বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়-- 'আশাতীতের নিরন্তর প্রত্যাশা'। সেই জন্যই কি এ কালের এক কবি জোড়াসাঁকোয়?

অরুণাভ রাহারায়ের নতুন কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়তে পড়তে মনে হয়েছে কবি একটু অন্যরকম ভাবে ভাষা ও শব্দের তৎসম ও জটিল বিন্যাস পরিহার করেছেন। কবিতার মধ্যে ছন্দকেও ব্যবহার করেছেন খুব সহজ স্বচ্ছ কথ্য ভাষায়। মাঝে মাঝে মনে হবে আপনমনের কথাবলা, স্নিজার সঙ্গে নানা পরিবেশ, পরিস্থিতিতে দেখা হওয়া, তার শরীরী বা অ-শরীরী ভাবগত অস্তিত্বকে অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করে যেন নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা। আপাত সহজ সারল্যের ভেতর দিয়ে কখনও রবীন্দ্রনাথ, কখনও শান্তিনিকেতন, কখনও জোড়াসাঁকো, কখনও প্রেম আবার কখনও-বা ছায়াময় দার্শনিক রহস্যময়তায় প্রস্থান। প্রচ্ছন্ন নাটকীয়তা কোনও কোনও কবিতাকে ছুঁয়ে আছে।

'ডানা' কবিতায় ছ'টি লাইন। শেষ দুটির মিল: 

'চাঁদের শরীরে শুধু গান ভেসে, ভেসে চলে সুর

যেভাবে ছাদের তারে মেলে দাও কবিতা প্রচুর...' 

কবিতার মধ্যে আসে গানের কথা। 'গানে গানে স্বরলিপি'-র আরম্ভ: 'তোমার পিসির গান আমার দিদির খুব প্রিয়', শেষে আছে 'অথচ তোমার গান আমাকে ছুঁয়েছে'। 'স্নিজার সঙ্গে জোড়াসাঁকোয়' কবিতাটি রোমান্টিকতার মধ্যেও বাস্তবতার ছোঁয়া এনে দেয়। 'শ্রাবণে আঘাত আসে আমেরিকা থেকে

বরং তোমার সঙ্গে মনে মনে জোড়াসাঁকো ঘুরি...'

পরের কবিতাটির নাম 'ধন্যবাদ স্নিজা দাশগুপ্ত'। 'ঋণ' কুড়ি লাইনের কবিতা: 

'আমরা থেকে যাব কাব্যে কবিতায় 

আমার বেড়ে যাবে অনেক ঋণ'

পরের কবিতা 'বোধি'-তে লেখা হয় 'বোধিজন্ম লাভ হয় জলের কোলাজে'। ঘুরে ফিরে আসে স্নিজার সঙ্গে কবিতায় কথাবলা। নিজের সঙ্গে সংগোপনে কবিতায় নানা কথাবলা। যেখানে 'বিস্ময়' কবিতায় কবির কথা: 'এতটা প্রেমিকা তুমি। কবিতা এতটা'। কবিতাগুলোয় সর্বত্র স্নিজা নেই, তবু থেকে যায় একটু অদ্ভুত রহস্যময়তার অনুভূতি। তাই সে 'নিঃশব্দ প্রেমিকা'। 'বেড়াল', 'দাশগুপ্ত সন্ধ্যা', 'সাংবাদিকা', 'অ্যাসাইনমেন্ট', 'স্বরলিপি কাব্য', 'হৃদকমলে রাখব', 'বিদুষীবালা', 'একজন্মেই জাতিস্মর', 'বইমেলা' পরপর নানা পরিবেশ-পরিস্থিতি, কিন্তু হঠাৎ অন্যরকম 'টাইম-স্পেসের জার্নাল', 'দুই বাংলা'।

একেবারেই অন্যরকম একটি কবিতা 'কোকোরো কবিতাসন্ধ্যা' শুরু হয় 'শান্তিনিকেতনের ভেতর একটা আশ্চর্য জাপান আছে। সেই জাপানের নাম কোকোরো'। নিছক গদ্যে লেখা একটি আশ্চর্য ছবি, আসলে একটা বাড়ি, যা কবিতা-ছবি-অনুভূতি মিলে তৈরি হয় কবিতার মতন এক বাড়ি। 

খুব সাধারণ ভাষায়, খুব সহজ ছন্দের পয়ার ধাঁচে কবিতা কখন যেন আমাদের নিয়ে যায় চৈতন্যের গভীরে, চেতন থেকে অবচেতনায়, চিত্রকল্পের রহস্যলোকে, বর্তমান থেকে অতীতে। শুনতে পাই কবিতা: 

'অরণ্যে দাঁড়িয়ে আছে গাছের শিরদাঁড়া' (গন্তব্য)

'ঝুমুর তালের মতো দুলে 

দুলে গালগুলো ফিরে এল' (ভোর) 

'আমাদের মধ্যখানে ঢুকে গেছে দু'জন মানুষ

আশ্চর্য চাঁদের রাতে অবান্তর তারা' (চিত্রকর)

শেষ কবিতায় থেমে যায় কথোপকথন। এতক্ষণ যা ছিল অনেকটা আত্মকথন, সেখানে পাঠক ছিল নিছক পাঠক ও শ্রোতা। 'আঁচ' কবিতায় শেষ কথা:

'তোমার দাঁড়ানো দেখে ভয় পাই খুব 

হৃদয়ে প্রচুর কথা তবু থাকি চুপ'।

অনেক দিন পরে আন্তরিক কিছু রোমান্টিক প্রেমের কবিতা পড়ে আবার মনে হয়েছে: 

'এভাবে ধাক্কা দিলে কত কি যে হয়

ছায়ারা আগুনে নেভে, কবিতার জয়'

পেপারব্যাক বইটির ছাপা খুব ভাল। প্রচ্ছদ করেছেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী শুভাপ্রসন্ন। প্রচ্ছদের ভেতরেও কবিতার সংকেতভাষণ।

---------------------------------------------------------

স্নিজার সঙ্গে জোড়াসাঁকোয়/ অরুণাভ রাহারায়/ ভাষালিপি/ প্রচ্ছদ: শুভাপ্রসন্ন/ ৮০ টাকা

Tuesday, October 6, 2020

নিষ্ঠ অনুবাদকের মৌলিক কবিতা :: অরুণাভ রাহারায়

অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিনকে তো সবাই চেনেন। তিনি নানা দেশের সাহিত্য নিয়ে নানা ধারার কাজ করে চলেছেন নিয়মিত। মারিও ভার্গাস ইয়োসাকে নিয়ে তাঁর বইটি তো এখন কিংবদন্তি! নোবেল জয়ী ইয়োসা স্বয়ং প্রশংসা করেছেন বইটির! এছাড়াও তিনি অনুবাদ করেছেন গেয়ট ট্রাকেলের কবিতা, টেড হিউজের নির্বাচিত কবিতা, সি পি কাভাফির কবিতা। সম্পাদনা করেছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বই, তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ 'দক্ষিণে সূর্যোদয়' ইস্পানো-আমেরিকার রবীন্দ্র চর্চার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

এতসব কুশলী কাজের ভিড়ে কার্যত কিছুটা আড়ালে চলে গিয়েছে তাঁর একমাত্র কবিতার বই 'আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি'! একটু তলিয়ে দেখলে আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় না-- যে মানুষ এত দেশের এত ভাষার কবিকে দীর্ঘদিন ধরে নিজের ভেতরে বহন করে চলেছেন তাঁর মৌলিক কবিতার মধ্যেও তো কিছু একটা থাকবেই। এই অনুমান আরও পূর্ণতা পাবে তাঁর কবিতার বইটি নিবিড় ভাবে পড়লে। 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজের অনুবাদ কবিতার বই 'অন্য দেশের কবিতা'র ভূমিকায় বলেছেন, কবিতার অনুবাদের জন্য প্রতিভা বা মেধার প্রয়োজন নেই। শব্দের সৌকুমার্য যেহেতু ভাষান্তরিত করা অসম্ভব, তখন মূল ভাষা জানার প্রশ্ন জরুরি নয়। অন্যদিকে চিন্ময় গুহ 'বাংলা অনুবাদের সমস্যা' শিরোনামের একটি লেখায় আমাদের জানাচ্ছেন: "একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ অনুবাদের যে কী যন্ত্রণা সেটা সৎ অনুবাদক মাত্রই জানেন। একটি রচনাকে এক ভাষাপদ্ধতি থেকে অন্য ভাষাপদ্ধতিতে, একটি সাংস্কৃতিক মানচিত্র থেকে অন্য একটি সাংস্কৃতিক মানচিত্রে, একটি semantic network থেকে অন্য একটিতে, যার অন্য একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস আছে, পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে যন্ত্রণাকে স্নায়ুতে বহন করতে হয়, তার প্রস্তুতি সবসময় আমাদের থাকে না। লেখক স্বাধীন (অবশ্য তাত্ত্বিকেরা বলেন, স্বাধীন নয়, কিন্তু সেটা অন্য প্রশ্ন), অনুবাদকের মন শেকল দিয়ে বাঁধা। মনকে বাঁধা কি সহজ কাজ?" এই প্রসঙ্গে তিনি শ্লেগেলের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেন: "অনুবাদকের সঙ্গে লেখকের এ এক রক্তক্ষয়ী খণ্ডযুদ্ধ-- a deadly dule, যেখানে কোনও একজনের মৃত্যু হবে, হয় লেখক বা অনুবাদক। এই হত্যা এড়াতে অনুবাদককে এক ভারসাম্য আনার চেষ্টা করতে হয়।" দীর্ঘদিন ধরে স্প্যানিশ ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার এই ভারসাম্যই নিষ্ঠার সঙ্গে রক্ষা করছেন রাজু আলাউদ্দিন। যেন তারের ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছেন।

তাঁর 'অপেক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি' বইটি প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালের একুশে বইমেলায়। প্রচ্ছদ করেছেন কবি আলফ্রেড খোকনের চিত্রকর্ম অবলম্বনে শাহিনুর রহমান। বইটির পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে আশ্চর্য!

'স্পর্শ' কবিতায় পাই:

এইসব ছোটখাটো নুড়ির মতন দিন আমার রোচে না

আঙুলের ফাঁক দিয়ে প্রতিদিন ঝরে যাচ্ছে 

হ্রস্বায়ু উল্কার মতো 

(অংশ/ ৩৭ পৃষ্ঠা)


'অভিন্ন যাপন' কবিতায় পাই 

তোমাকে যে ভালোবাসি-- এ কথা গড়িয়ে গেছে

সুদূর জাপানে

আমার প্রবাসী দুই বান্ধবের কাছে 

ওরা হাসে আর বলে 

কিভাবে তা হলে কিশোরীর মনোভূমি

ছেড়ে তুমি

আসবে এখানে 

(৮ পৃষ্ঠা)

ন্যানো সাহিত্য তত্ত্বের জনক রাজু আলাউদ্দিনের এ বইয়ে রয়েছে কয়েকটি ন্যানো কবিতাও। উদয়াস্ত কবিতায় তিনি লিখেন:

ওই দূরে দেখা যায় 

দিবসের রক্তিম ভ্রূণ

এইখানে ট্রেনে কাটা 

মানুষের দেহখণ্ড, খুন

(১৮ পৃষ্ঠা)


চুম্বনের আলো কবিতায় পাই:

তোমার চুম্বনগুলো এই রাতে আয়াতের মতো ঝরে পড়ে 

আমার শরীরে 

কী গভীর মাখামাখি আজ এই আলোয় আঁধারে

কবি রাজু আলাউদ্দিনের এই কবিতার বইটি বহুদিন ধরে পড়তে পড়তে আমি বিস্মিত হয়েছি নানা ভাবে। অবাক হয়েছি তাঁর কবিতার মৌলিক স্বরে। একটা হাতে আঁকা মানচিত্রের ওপরে তার কবিতার চলাচল, দেশ থেকে দেশে। এই মৌলিক কণ্ঠস্বরকে আমার কুর্নিশ। এ বই ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেছেন বিনয় বর্মণ।

ভাবতে ভালো লাগে গুণী রাজু আলাউদ্দিনের সঙ্গে আমার নিবিড় সাক্ষাৎ হয়েছিল আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে ২০১৫ সালের মার্চ মাসে। তিনি সেবার ঢাকা থেকে সপরিবারে কলকাতায় এসেছিলেন। পরিচয় করিয়ে দেন কবি রাহুল পুরকায়স্থ। আমরা কফি হাউজে আড্ডা দিয়েছিলাম। সেই সময় তাঁর কাছ থেকে উপহার পাই কবিতার বইটি। আমরা জানি, অনেক ছোট ছোট ঘটনা জীবনে বড় আকার নেয়। রাজু আলাউদ্দিনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ তেমনি এক ঘটনা।

---------------------------------------------------------

অপেক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি/ রাজু আলাউদ্দিন/ শ্রাবণ প্রকাশনী/ ৮০ টাকা

Thursday, September 10, 2020

প্রতিভাসিক :: কমলেশ রাহারায়


মনে হয় তুমি সুখে নেই
সুতরাং
তোমার দুঃখভারী হৃদয়ের সুযোগ নিয়ে
সে চলে যেতেই পারে অনেক দূরে
পরিষ্কার কিছু বোঝা যাচ্ছে না
কিন্তু অকপট সমুদ্রের পড়ন্ত বেলার গান
যারা শুনতে পায় তারা মনে করে
যে দুঃখসমূহ তোমাকে দু'ভাগে চূর্ণ করেছে
বিপুল জলরাশি সেই তপ্ত হৃদয়ের কাছেই 
                             বুঝিবা ছুটছে

---------------------------------------------------------

Reflexive 
Kamalesh Raha Roy

It seems that you are not in happiness
And as such
By the slip of your grief leaden heart
He may surely go a far
Nothing is clear as yet
But those who can listen to the song
Of the falling light on the maskless sea
Do think:
The grief that crushed in two parts
The waves perhaps are rolling
Towards that larsen heart

                         Translated by Jagannath Biswas

Sunday, August 30, 2020

পল মালডুনের কবিতা


অনুবাদ: প্রসূন মজুমদার

ছুঁড়ে ফেলা

অনুমানে বুঝলাম

    এ চিঠি তোমার। আমি চিনেছি

ওই বাদামী কালি,

                   হাইফেনের দাগ

পোস্টমার্ক আর তারিখ পড়েছে কেউ,

              অধৈর্যকে চাপা দিলাম

একটা পেপারওয়েটে।

                তোমার চিঠি নিয়ে ঠিক এগারোটায়

গেলাম বাগানে

                 সঙ্গে চা।

আর হঠাৎ হলুদ গোপন আঠা

            অর্ধ্বেক উঠে এলো

যেন পাকা কুলবন

              ছাড়িয়েছে খোসা।

সৌরভহারানো পাতাগুলো ঝরে যেতে দিই

আবার তুলি

আমার নির্লজ্জ হাতে। চিঠিটা ওল্টাই 

             পিছনে

তোমার মুখ দেখব বলে

       মুখ তুলি। রোগা, সাদা মুঠো

আমার তামাটে হাতের থেকে ঝুলে আছে।


বর্ষজীবীর মৃত্যুমাস


সে শুনেছে আছে এক গাছ

বছরের সবক'টি দিনে

আরও গাছ গজানোর আঁচ

পাওয়া যাবে চাঁদ চিনে চিনে।


তবু রোজ ব্যথা কুরে খায়

গাছেদের স্তন নেই কোনও

হৃদি ঢাকে সবুজ হাতায়

ফেটে পড়ে নাড়িভুঁড়ি, মনও।


দুম করে প্রেমে পড়ে তার

বাসাভাঙা অন্ধ সে পাখি

গোলাপি হাঁ ভাঙা ঘড়িটার

সে পাখির প্রেমে হাত রাখি।


কার পথ চেয়ে সে কী দেখে

শহরের পথে পথে রোজ

সময়ের বিধিবাধা থেকে

যে হারাল তাকে করে খোঁজ।

---------------------------------------------------------

পল মালডুনের জন্ম ১৯৫১ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের আরমাঘে। ১৯৮৭ থেকে আমেরিকার বসবাস। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যানিটি বিভাগের অধ্যাপক। ২০০৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর অফ পোয়েট্রি নিযুক্ত হন। ১৯৯৪ সালে পান টি এস এলিঅট পুরস্কার।

Sunday, August 23, 2020

গাব্রিয়েলা মিস্ত্রালের কবিতা



অনুবাদ: সুজিত মান্না

খুদে পা


এক শিশুর খুদে পা,

নীল, যেন ঈশ্বর প্রেরিত নীল,

কীভাবে তারা দেখেও তোমায় রক্ষা করার কথা ভাববে না?

হে ঈশ্বর!


খুদে আঘাতপ্রাপ্ত পা,

আহত করে গেছে নুড়ি পাথরেরা

ক্ষতির চিহ্ন রেখে গেছে বরফ এবং মাটি!


মানুষ, অন্ধ হয়ে আছে, উপেক্ষা করছে তোমায়

আর তুমি পা ফেলছো, রেখে যাচ্ছ উজ্জ্বল ফুলেদের,

তুমি যেখানে রেখে যাচ্ছ ক্ষতদাগের পদচিহ্ন

সেখানে বেড়ে উঠছে তীব্র গন্ধের কোন রজনীগন্ধা।


এরপরেও রাস্তা বরাবর একই সরলরেখায়

হেঁটে যাচ্ছ তুমি,

আমি বলিঃ তুমি সাহসী, ভয়ডরহীন


শিশুর খুদে পা,

যন্ত্রণায় কষ্ট পাওয়া দুটো মণি,

কীভাবে মানুষ না দেখার ভান করে শুধু উপেক্ষা করে হেঁটে চলে যায়


ধর্ম


আমি আমার হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করি 

আহত হৃদয় ঈশ্বরের ভেতর ডুবে যেতে যেতে গান গেয়ে ওঠে

জীবিত পুষ্করিণী থেকে ক্রমশ উঠে যায়

ঠিক যেন কোন সদ্যজাত


আমি আমার হ্রদয় দিয়ে বিশ্বাস করি যা আমি নিজের থেকে নিংড়ে নিই

লাল পাণ্ডুবর্ণের রং দিয়ে 

জীবনের ক্যানভাসকে আলোকিত করতে

ঝলমলে পোশাকের ভেতর এটাকে আচ্ছাদন করে নিই


তিনি তো এক জ্যোতির্ময়ী-কর্তা


নিরর্থক তুমি চেষ্টা করছো 

আমার গানকে শ্বাসরুদ্ধ করতে

লক্ষ লক্ষ শিশুরা

একসুরে এই গান গেয়ে যাচ্ছে

সূর্যের নিচে


নিরর্থক তুমি চেষ্টা করছো

আমার দুঃখের কবিতাগুলিকে 

নষ্ট করতে

সেইসব শিশুরা এইসব গানও

গেয়ে যাচ্ছে ঈশ্বরের সামনে


গোলাপ


গোলাপটির হৃদয়ের ভেতর যে সম্পদ লুকিয়ে আছে

তা তো তোমার হৃদয়েও বাস করে।

ছড়িয়ে দাও এইসব সম্পদসামগ্রী যেভাবে গোলাপটি মেলে ধরে

দেখবে তোমার সমস্ত দুঃখ তখনই তার হয়ে গেছে।


কোন এক গানের ভেতর এটিকে ছড়িয়ে দাও

কিংবা কোন তীব্র প্রেমের বাসনার ভেতর।

শুধু গোলাপটিকে আটকে দিও না

দেখো যেন আটকাতে গিয়ে নিজেকেই না পুড়িয়ে ফেলো শেষে।

---------------------------------------------------------

গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল (১৮৮৯–১৯৫৭)। আসল নাম: লুসিলা দে মারিয়া দেল পেরপেতুও সোকোরো গোদোয় আলকায়াগা। তিনি ছিলেন একজন কবি, কূটনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও নারীবাদী কর্মী। ১৯৪৫ সালে প্রথম লাতিন আমেরিকান হিসেবে সাহিত্যে নোবেল। গ্যাব্রিয়েলা ছিলেন বাস্ক ও আমেরিন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত। দক্ষিণ আমেরিকার কবিতায় আধুনিকতার সূচনা যাদের হাতে, তাদের অন্যতম তিনি। ১৯১৪ সালে Sonetos de la Muerte বা মৃত্যুর সনেট বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই খ্যাতিলাভ করেন। কৈশোরে পাবলো নেরুদা অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন এই নারীর কবিতা থেকে।

Saturday, August 15, 2020

ব্রিজের কাছে একজন বয়স্ক :: আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

অনুবাদ: মাহমুদ মিটুল

ময়লা কাপড় এবং চোখে স্টিলফ্রেমের চশমা পড়া এক বৃদ্ধ রাস্তার পাশে বসে ছিল। সেখানে নদীর ওপর একটা দোলনা ব্রিজ এবং মালগাড়ি, ট্রাক ও মহিলা-শিশু-পুরুষ সেই ব্রিজ দিয়ে পার হচ্ছিল। খাঁচা আকৃতির একটা মালগাড়ি ব্রিজের খাঁড়া ঢালে আটকে আছে এবং সৈনিকরা সেই মালগাড়ির চাকা ঠেলে ব্রিজে তোলার চেষ্টা করছে। ট্রাকগুলো সামনে এগিয়ে যাচ্ছে এবং কৃষকরা গোড়ালি পর্যান্ত কাদা ঠেলে এগোচ্ছে। কিন্তু বৃদ্ধ না নড়ে সেখানেই বসে। সে এতটাই ক্লান্ত যে এক পা-ও এগোতে পারছিল না।

আমার দায়িত্ব ছিল ব্রিজ পার হয়ে পরের প্রান্তে গিয়ে লক্ষ্য রাখা যে শত্রুরা কতদূর এগিয়েছে। আমি কাজটি করে ব্রিজ ধরে ফিরছিলাম। এখন আর খুব বেশি মালগাড়ি অবশিষ্ট নেই এবং পায়ে হাঁটা লোকের সংখ্যাও খুব কম। বৃদ্ধটি তখনও সেখানে বসে ছিল।

আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আপনি কোত্থেকে এসেছেন?

সে হেসে জানালো, 'স্যান কার্লোস।'

সেটাই তার বাড়ি এবং নিজের বাসস্থানের কথা বলে আনন্দবোধ করেই সে হেসেছিল।

সে আরও জানাল, 'আমি পশু-পাখি দেখাশোনা করতাম।'

পুরোপুরি না বুঝেই আমি বললাম, 'আচ্ছা।'

সে আবার বলল, 'হ্যাঁ, আপনি জানেন, আমি সেখানে থাকতাম এবং পশুপাখির দেখাশোনা করতাম। আমিই স্যান কার্লোস ছেড়ে আসা শেষ মানুষ।'

তাকে দেখে পশুপালক বা দলনেতা গোছের কিছু মনে হল না। আমি তার ময়লা কাপড়, তার ধূসর মুখ এবং স্টিলের ফ্রেমের চশমার দিকে ভালো করে লক্ষ্য করে জানতে চাইলাম, 'সেগুলো কী ধরনের প্রাণী ছিল?'

সে তার মাথায় হাত দিয়ে বলল, 'বিভিন্ন ধরনের প্রাণী। আমাকে সেগুলো ছেড়ে আসতে হয়েছে।'

আমি ব্রিজের দিকে লক্ষ্য রেখে আফ্রিকান দেশের মতো দেখতে ইব্রো ডেল্টা দেশটা দেখছিলাম এবং ভাবছিলাম শত্রুদের নাগাল পেতে আরও কতক্ষণ লাগতে পারে। একই সঙ্গে সব আওয়াজ শুনছিলাম যদি কোনও অদ্ভুত শব্দ পাই! বৃদ্ধ তখনও সেখানে বসে ছিল।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'সেগুলো কী ধরনের প্রাণী?'

সে বোঝাল, 'সেখানে এক সঙ্গে তিন ধরনের প্রাণী ছিল। দুটো ছাগল, একটা বেড়াল এবং চারজোড়া পায়রা।'

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'আর আপনাকে সেগুলো ছেড়ে আসতে হয়েছে?'

'হ্যাঁ, আর্টিলারির কারণে। ক্যাপটেন এসে আমাকে বলল, এখান থেকে চলে যাও।'

ব্রিজটির শেষ মাথায়, যেখানে অবশিষ্ট কয়েকটি মালগাড়ি তাড়াহুড়ো করে পার হবার চেষ্টা করছে, দেখতে দেখতে আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, 'আর আপনার পরিবার?'

সে জানাল, 'না, কেবল ওই প্রাণীদের সঙ্গে আমি থাকতাম। বেড়ালটা নিশ্চয়ই এখনও ভালো আছে। একটা বেড়াল নিজেকে নিজেই টিকিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু আমি ভাবতে পারছি না যে বাকিদের অবস্থা কী হয়েছে।'

আমি জানতে চাইলাম, 'আপনি কি রাজনীতি করেন? কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক?'

সে বলল, 'আমি রাজনীতি করি না। আমার বয়স ছিয়াত্তর বছর। আমি বারো কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে এসেছি। এখন মনে হচ্ছে আমি আর সামনে এগোতে পারব না।'

আমি জানালাম, 'থামার জন্য এটা মোটেই নিরাপদ জায়গা নয়। আপনি পারলে রাস্তায় গিয়ে একটা গাড়িতে উঠে পড়ুন, যা আপনাকে টরটোসায় পৌঁছে দেবে।'

সে বললো, 'আমি আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তারপর যাব। ট্রাকগুলো কোথায় যাচ্ছে?”

আমি তাকে জানালাম, 'বার্সেলোনা।'

সে বলল, 'সেখানে আমার কোনও পরিচিত লোক নেই। আপনাকে ধন্যবাদ। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।'

সে ক্লান্ত-শূন্য দৃষ্টিতে আমাকে দেখছিল, এরপর এমনভাবে কথা বলল যেন তার দুঃখের কথা কাউকে জানাচ্ছে, 'আমি নিশ্চিত যে বেড়ালটা ঠিকঠাক আছে। বেড়ালের ব্যাপারে দুঃশ্চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু অন্যগুলো। এখন অন্যপ্রাণিগুলোর ব্যাপারে আপনি কী মনে করছেন?'

'কেন? সেগুলোও যে যার মতো বের হয়ে গেছে এবং ঠিক আছে।'

'আপনি তাই মনে করছেন?'

নদীর ওপারে দূরে যেখানে আর কোনও মালগাড়ি নেই সেদিকে দেখতে দেখতে বললাম, 'কেন নয়?'

'কিন্তু আর্টিলারির মধ্যে তারা কিভাবে আছে যেখানে ওই আর্টিলারির কারণে আমাকেই চলে যেতে বলা হল?'

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 'আপনি কি কবুতরের খাঁচা খোলা রেখে এসেছেন?'

'হ্যাঁ।'

'তাহলে সেগুলো উড়ে গেছে।'

'হ্যাঁ, তারা অবশ্যই উড়ে যেতে পারে। কিন্তু বাকিগুলো। বাকিদের কথা আর চিন্তা না করাই ভালো।' সে বলল।

আমি তাকে তাগাদা দিলাম, 'আপনি যদি বিশ্রামে ক্ষান্ত দেন তাহলে আমি যাব। এখন উঠে একটু হাঁটেন।'

সে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার পায়ের পাতায় ভর দিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। টলতে টলতে আবার কাদার মধ্যেই বসে পড়ল।

সে আমাকে লক্ষ্য না করে নিজে নিজেই কাতর ভাবে বলতে লাগল, 'আমি পশুপাখি দেখাশোনা করতাম। আমি কেবল পশুপাখি দেখাশোনাই করতাম।'

তার জন্য আর কিছুই করার ছিল না। এটা ছিল ইস্টার সানডে এবং ফ্যাসিস্টরা ইব্রোর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। সেদিন খুব নিচু ধূসর মেঘ ছিল বলে তাদের যুদ্ধবিমানগুলো উড়তে পারেনি। এটাই হল বিষয় যে বেড়ালগুলো নিজেদেরকে নিজেরাই দেখভাল করতে জানে যা সব সময় বৃদ্ধের নিয়তি জুড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে ছিল।

---------------------------------------------------------------

লেখক পরিচিতি: আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে (১৮৯৯-১৯৬১) একজন আমেরিকান উপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার ও সাংবাদিক। তাঁর আইচবার্গ থিওরি বিংশ শতাব্দির ফিকশন রচনায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে তাঁর চমকপ্রদ জীবনযাপন তৎকালীন তরুণদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে। সাতটি উপন্যাস, ছ'টি গল্পগ্রন্থ ও দু'টি প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচিত বেশিরভাগ ফিকশনই আমেরিকায় ক্লাসিক হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। ১৯৫৩ সালে হেমিংওয়ে ফিকশনের জন্য পুলিৎজার ও ১৯৫৪ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ পান।

---------------------------------------------------------------

অনুবাদকের পরিচয়: মাহমুদ মিটুলের জন্ম ১৪ নভেম্বর ১৯৮৬। বাকেরগঞ্জ, বরিশাল। ইংরেজি সাহিত্যে সম্মানসহ মাস্টার্স। কবি, অনুবাদক, সম্পাদক ও শিক্ষক। প্রকাশিত গ্রন্থ- মুমূর্ষা ও গোঙানি, বিস্ময় মুছে দিও না, অনুবাদ-‌ বব ডিলান: গোল্ডেন কর্ডস, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। সম্পাদনা- বিজন অশ্রুবিন্দু। ইমেল: mahmud_mitul@yahoo.com