বিভাগ

Showing posts with label বই দুনিয়া. Show all posts
Showing posts with label বই দুনিয়া. Show all posts

Sunday, October 9, 2022

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | পর্ব ৬ | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য


গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

২০

দিনের বেলার নার্স ও সহকারিণী বাবাকে পরিষ্কার করে সাজিয়ে দিচ্ছিলেন শেষযাত্রার জন্য। নার্স মাকে জিজ্ঞাসা করলেন বাবাকে কোনো বিশেষ পোশাক পরিয়ে দিতে চান কিনা। মা বললেন, না। তখন নার্স একটি সাধারণ কাফন দেওয়ার কথা বললেন। মা নিয়ে এলেন এমব্রয়ডারি করা একটা পাতলা সাদা বিছানার চাদর আর সেটা নার্সের হাতে এমনভাবে দিলেন যেন সাধারণ একটা কিছু দিচ্ছেন।

একদিকে বাবাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে, অন্যদিকে একজন ডাক্তার মৃত্যুর শংসাপত্রের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র তৈরি করছেন। আমরা বুঝতে পারছিলাম যে গণমাধ্যমকে খবর দেওয়ার আগে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কারণ ঠিক সেই সময় বাবার খুব কাছের এক বন্ধু বিমানের মধ্যে রয়েছেন, কলোম্বিয়া থেকে আসছেন শেষ বিদায় জানাতে। মেহিকোর একজন বান্ধবী পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে ফিরতি বিমানে আসছেন, তিনিও রয়েছেন পথে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছিল আমার কিশোরী মেয়েদের নিয়ে। তারাও মাঝপথে। আমার স্ত্রীর সঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলস থেকে আসছে। আমি চাইছিলাম না যে বিমান থেকে নেমেই তারা ফোন খুলে জানতে পারুক তাদের দাদু চলে গেছেন। তাই যতক্ষণ না তাঁরা সবাই ধীরে সুস্থে বিমানবন্দরে পৌঁছন ও প্রথমে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে ফোন করছিলাম না। এই অবস্থা দেখলে বাবা নিশ্চয়ই খুব হাসতেন – ‘সবাই সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কোথাও যাওয়ার নেই’। 

ঘরের মধ্যে ফিরে তাকালাম। বাবার দেহ আপাদমস্তক ঢাকা। খাট নামিয়ে সোজা করে দেওয়া হয়েছে আর তিনি টানটান হয়ে শুয়ে আছেন, শুধুমাত্র মাথাটা একটু তোলা, সেখানে একটা পাতলা বালিশ দেওয়া। তাঁর মুখ একদম পরিষ্কার আর যে তোয়ালে দিয়ে চোয়ালটা বেঁধে রাখা হয়েছিল সেটাও খুলে নেওয়া হয়েছে। এখন চোয়াল ঠিকঠাক আছে, নকল দাঁতও রয়েছে স্বস্থানে। কিন্তু তাঁকে বিবর্ণ আর গম্ভীর লাগছে। তবে শান্তিতে শুয়ে আছেন। যে কটি পাকা চুল আছে তা তাঁর মাথায় অলস ভাবে লেগে রয়েছে। এই চুল আমায় মনে করিয়ে দিল এক অভিজাতের আবক্ষ মূর্তি। আমার ভাগ্নী তাঁর পেটের উপর কয়েকটা হলুদ গোলাপ রেখে দিল। এই হলুদ গোলাপ ছিল বাবার সবচেয়ে প্রিয় আর তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই ফুল সৌভাগ্য বয়ে আনে।

এরপর কয়েক ঘন্টা আমরা বসে রইলাম মায়ের সঙ্গে। প্রতিদিনের মতোই মা দূরদর্শনে বিভিন্ন খবর দেখছেন অন্যমনষ্ক থাকার জন্য। একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে ওক্তাবিয়ো পাসের জীবনের উপর। তিনি বাবা-মায়ের দূরের বন্ধু ছিলেন এবং কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। মা অনুষ্ঠানটি খানিকক্ষণ দেখলেন, কিন্তু তাঁর মুখের ভাব থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে তিনি সেই সব তথ্যচিত্রের কথা ভাবছেন যেগুলো আগত দিনগুলোয় দেখবেন।

হঠাৎ মা বললেন, কাউকে উদ্দেশ্য না করে, বাবা বোধহয় আলবারোর সঙ্গে আছেন, ‘মদ খাচ্ছে আর বাজে বকছে’। বাবার বন্ধু আলবারো কয়েক মাস আগে মারা গেছেন।

এই সময় বাড়ির ফোন বেজে উঠল আর সচরাচর যা ঘটে না ঠিক সেটাই হল, মা ফোন তুললেন। বাবার এক বন্ধু ফোন করেছেন, তবে তাঁর সঙ্গে খুব ঘনঘন দেখা হয় না। তাই তিনি বাবার খবর নিতে ফোন করেছেন আর বললেন যে কিছু প্রয়োজন হলেই তিনি সর্বতোভাবে আমাদের সাহায্য করবেন। মা ধৈর্যের সঙ্গে তাঁর প্রতিটি কথা শুনলেন, তাঁকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানালেন আর তারপরেই বললেন যে বাবা নেই। ফোনের অপর প্রান্তে কী প্রতিক্রিয়া হল তা বোঝাই যায়, বিশেষ করে মায়ের ওই কাটা কাটা গলায় খবরটা শোনার পরে। মা একই রকম গলার স্বরে তাঁকে জানালেন এই কিছুক্ষণ আগে ঘটনাটা ঘটেছে, যেন মনে হল বাড়িতে খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে কথা বলছেন। আমার ভাগ্নে-ভাগ্নিরা খুবই শোকাচ্ছন্ন। কিন্তু তারা আমার মাকে ভালো করে চেনে আর তাই হাসি চাপার চেষ্টা করছে। শেষে যখন তাদের দিকে তাকিয়ে আমি চোখের ইশারা করলাম তারা আর হাসি চাপতে পারল না, দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

২১

বাবার কলোম্বিয়ার বন্ধু মেহিকো পৌঁছে গেছেন। সেকথা আমি জানতে পারলাম যখন দরজায় বেল বাজল। আমায় বলল যে তিনি একতলায় অপেক্ষা করছেন। নিচে নেমে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দিকে যেতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রায় ধাক্কা লেগে গেল আমার। কোনো সম্ভাষণ না করেই প্রথম যে কথাটা তাঁকে বললাম তা হল বাবা আর নেই। তিনি বাবার সবচেয়ে পুরোন বন্ধুদের একজন। তাঁকে আমি বাস্তবিক হতচকিত করে দিলাম। তিনি স্তম্ভিত হয়ে চুপ করে রইলেন। কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। চোখদুটোয় ছায়া ঘনিয়ে এল, বুঝি বা তাঁদের বন্ধুত্বের আদি থেকে অন্ত সমস্ত স্মৃতি এক মুহূর্তের মধ্যে তাঁর স্মৃতির সোপান ধরে ছুটে গেল। বুঝতে পারলাম এতটাই ক্লান্ত আর উদ্বিগ্ন হয়ে আছি যে এরকম বাজে ভাবে তাঁকে খবরটা দিয়ে ফেললাম। তখন জোর করে পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার চেষ্টা করতে লাগলাম।

যে বান্ধবী ছুটি কাটিয়ে ফিরছিলেন তিনিও যোগাযোগ করলেন। এবং তারপর যোগাযোগ করল আমার স্ত্রী। তাদের বিমান সবেমাত্র মাটি ছুঁয়েছে। বিমানের ভেতর থেকেই আমায় ফোন করল। তাঁকে সব বললাম। তাঁর দুঃখে আমার মন এতই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল যে মেয়েদের সঙ্গে আর কথা বলতে পারলাম না। অপেক্ষায় রইলাম দেখা হওয়া পর্যন্ত।

বেশ কিছু বন্ধুবান্ধবকে ফোন করলাম। প্রতিটি ফোনই ছিল আগেরটার চেয়ে বেশি কষ্টদায়ক। এঁরা প্রত্যেকেই যেহেতু ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন, তাই কেউই অবাক হলেন না। কিন্তু সকলেই চুপ করে গেলেন, কারুর মুখ দিয়ে কোনো শব্দ নির্গত হল না। এ যেন নিস্তব্ধতার চেয়েও বেশি শূণ্যতা। তাঁদের অধিকাংশই কোনো মন্তব্য না করে অন্যকে খবরটা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালনে রত হলেন। আর যিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে আমার বাবার সাহিত্যিক এজেন্ট ছিলেন, তিনি শুধু বললেন, ‘কী ভয়ংকর!’ আর কথাটা বললেন এমন করে যেন যে ঘটনাটা এতদিন অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছে সেটাই শেষ পর্যন্ত ঘটে গেল। আমি মনে মনে তাঁর মুখটা দেখতে পাচ্ছিলাম। চোখ বন্ধ করে গভীর চিন্তায় মগ্ন। নিজের মধ্যে আরো বেশি ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, যাতে অচিন্ত্যনীয় এই ঘটনা ধীরে ধীরে বাস্তবের রূপ পেতে থাকে। ‘কী ভয়ংকর!’ কথাটা আবার বললেন আর ফোন রেখে দিলেন। একই ধরণের প্রতিক্রিয়া পেলাম বাবার আজীবনের বন্ধুদের অনেকের কাছ থেকে। দুঃখের চেয়েও বেশি অবিশ্বাস। এমন একজন জীবনসাধক, চিরজায়মান, জীবনরসের রসিক, যাঁর অস্তিত্বের কত রঙ, কত রূপ, তিনি আজ নির্বাপিত, এ যেন অবিশ্বাস্য। 

এবার মনে হল সংবাদমাধ্যমের যাকে যাকে খবর দেওয়ার কথা তাদের ফোন করতে হবে। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে, কেননা সেটা ছিল সেমানা সান্তার [১] বৃহষ্পতিবার। একটি ক্যাথলিক দেশে সংবাদমাধ্যমের কর্তাদের পাওয়া তখন কার্যত অসম্ভব। বড়দিনের আগের দিনের মতো সেমানা সান্তার সময়েও বিশেষ কোনো খবর থাকে না। তাই তাঁরা সবাই বাইরে চলে গেছেন, সোমবারের আগে তাঁদের পাওয়া যাবে না। প্রায় দু’ ঘন্টা ধরে আমরা হাত জড়ো করে বসে রইলাম সেই খবরের মধ্যে বন্দী হয়ে যার জন্য সারা বিশ্ব অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু এখন আর তা শোনার কেউ নেই। শেষ পর্যন্ত বাবার সেই বান্ধবী, যিনি সবেমাত্র ছুটি কাটিয়ে ফিরেছেন, তাঁর শরণাপন্ন হলাম। তিনি রেডিয়োর একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তাঁর অনেক অনুগামীও আছে। তাঁকেই অনুরোধ করলাম খবরটা গণমাধ্যমে ঘোষণা করার জন্য। কয়েক মিনিটের মধ্যে সমস্ত জায়গায় ফোন ও মোবাইল বাজতে আরম্ভ করল আর সদর দরজার বাইরে শুরু হয়ে গেল সংবাদমাধ্যম, গুণগ্রাহী ও পুলিশের ক্রমবর্দ্ধমান ভিড়।

২২

বাবার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পরে বাবার সেক্রেটারি একটি ই-মেইল পেলেন। সেটি লিখেছেন বাবার এক বান্ধবী যাঁর সঙ্গে বহুদিন বাবার কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি জানতে চেয়েছেন আমাদের মনে আছে কিনা যে বাবার সৃষ্ট অন্যতম বিখ্যাত চরিত্র উরসুলা ইগুয়ারানও এমনই এক পবিত্র বৃহষ্পতিবারে মারা গিয়েছিল। চিঠিতে তিনি উপন্যাসের সেই অংশটি তুলে দিয়েছেন। সেটি পড়ে সেক্রেটারি আবিষ্কার করলেন যে উরসুলার মৃত্যুর ঠিক পরে কয়েকটি পাখি দিগভ্রান্ত হয়ে দেয়ালে ধাক্কা খায় ও মরে গিয়ে মেঝের উপর পড়ে থাকে। তিনি অংশটি জোরে জোরে পড়লেন ও ভাবতে লাগলেন সেই পাখিটার কথা যেটি সেদিনই একটু আগে মরে পড়েছিল। তারপর আমার দিকে তাকালেন। হয়তো আশা করছিলেন যে আমি বোকার মতো এই কাকতালীয় ঘটনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করার সাহস রাখব। আমি তখন শুধুই ভাবছি কতক্ষণে ঘটনাটা সবাইকে বলব।  

২৩

আমার স্ত্রী-সন্তান বাড়ি এসে পৌঁছল। আমাকে গভীর স্নেহে আলিঙ্গন করার পরই আমার মেয়েরা গেল তাদের ঠাকুমার কাছে। আমার মায়ের পাঁচ নাতি-নাতনি-ই তাঁকে খুব ভালোবাসে। মাকে দেখে মনে হচ্ছে শান্তই আছেন। সবার সঙ্গে কথা বলছেন। আমার মেয়েদের দেখেও ঠিক যেমন সব সময় করেন, তেমনই তাদের খোঁজ খবর নিলেন। ওরাও পরিস্থিতিকে বেশ সহজভাবে গ্রহণ করল। আসলে ঠাকুমার কাছ থেকে অভাবনীয় প্রতিক্রিয়া পেতে তারা অভ্যস্ত। ওরা মনে করে ওদের ঠাকুমা পৃথিবীতে অদ্বিতীয়াঃ মাটির কাছাকাছি থাকা এক অন্য গোত্রের মানুষ। আবার খুবই নিয়মনিষ্ঠ ও রাগী। তথাকথিত সামাজিক নিয়মকে প্রায়শই চ্যালেঞ্জ করেন। তাই ওরা মাকে খুব শ্রদ্ধা করে। আবার মা ওদের খুব হাসায়। নাতি-নাতনিদের কাছে ভালোবাসা পাওয়ার সেটাও একটা কারণ।

কলোম্বিয়া থেকে আগত বন্ধু মায়ের কাছে অনুমতি চাইলেন বাবাকে একবার দেখার জন্য। অবশ্যই মা রাজি হলেন। আমি তখন আমার মেয়েদের একই কথা বললাম। এক মেয়ে যেতে চাইল না। কিন্তু অন্যটি দূর থেকে দাদুকে একবার দেখল। কিছুই বলল না মুখে কিন্তু তার অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছিল কৌতূহল ও দুঃখের ভিতরের এক টানাপোড়েন। ঠিক তখনি দূরদর্শনে খবরটা সম্প্রসারিত হল। বিভিন্ন চ্যানেলে দেখানো হতে লাগল বাবার জীবনী, সংক্ষিপ্ত ও দীর্ঘ, বা তাঁর জীবনের টুকরো টুকরো অংশ। মা একবার এই চ্যানেল দেখছেন, তারপর অন্য চ্যানেল, তবে কোনো মন্তব্য করছেন না। মগ্ন হয়ে আছেন নিজের মধ্যে। আমরা তাঁর চারপাশে ঘিরে বসে আছি আর সেই মানুষটার জীবন ও সাফল্যের ধারাবিবরণী দেখছি যিনি শুয়ে আছেন, ঠিক পাশের ঘরে, মৃত।


টীকা

সেমানা সান্তাঃ বা পবিত্র সপ্তাহ। ইস্টারের আগের সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ক্যাথলিক ধর্মের একটি অনুষ্ঠান। সারা সপ্তাহ ধরে এটি পালন করা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে যীশু খ্রীস্টের জীবনী ও বাণী পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে মধ্যযুগে স্পেনে এই উৎসবের সূচনা হয়।  




আগের পর্ব

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | ৫ম পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

Thursday, September 22, 2022

ভারতে মহাভারতে: আগামী দিনের বিদ্যাচর্চার পথ প্রদর্শক একটি গ্রন্থ

বিজলীরাজ পাত্র

মাঝে মাঝে ইতিহাসে এমন কিছু গ্রন্থ লেখা হয় যা বিদ্যাচর্চার ধারাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ভিন্ন ধারার, ভিন্ন পথের, এমনই একটি পুস্তক হল, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘ভারতে মহাভারতে’।এই বইকে আলাদা ভাবে সাহিত্য সমালোচনা, সংস্কৃতিবিদ্যা, ইতিহাস বা দর্শনের বই ভাবলে মস্ত ভুল করব আমরা। বরং এই বই আমাদের চেতনার সেই জিজ্ঞাসু কোনে প্রশ্ন তোলে, যেখানে অভিষ্ট প্রতর্কটি ঠিক খুঁজে পাবেন আপনি। এই গ্রন্থের কেন্দ্রবস্তু হিসেবে শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা এবং মহাভারত বারেবারে ঘুরে ফিরে এসেছে। কেন্দ্রের শক্তিকথায় পরে আসছি। কিন্তু পরিধি অঞ্চলেও শিবাজীবাবু যে সব অতি দরকারি এবং নতুন জ্ঞানচর্চার সংকেত দিয়েছেন, তার জন্য শত প্রশংসাও কম পড়বে। এমনই একটি পরিধিকথা দিয়ে এই লেখার সূচনা করা যাক।

‘আধুনিক’ কথাটি শুনলেই আমাদের মনে সাহেব মুলুকের কথা আসবেই আসবে। কেউ হয়ত স্মরণ করবেন, উনিশ শতকের দুঁদে ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারের কথা। আবার কেউ ভাবতে পারেন বরেণ্য কবি টি এস এলিয়ট এবং তার পথপ্রদর্শক কাব্যগ্রন্থ ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর (১৯২২) কথা। আর বাঙালি জীবনের প্রেক্ষিতে ‘আধুনিক’-এর কথা উঠলে যার নাম এবং কথা এক বাক্যে উচ্চারিতহয়, তিনি হলেনবুদ্ধদেব বসু। ‘রবীন্দ্রনাথ ও উত্তর সাধক’ (১৯৫২) প্রবন্ধটি লিখে বুদ্ধদেব বাঙালিকে, আধুনিক, আধুনিকতা ইত্যাদি বিষয়ে বেশ চৌখোশ করে তুলেছিলেন। আমাদের বিদ্যাচর্চামহল ‘আধুনিক’ বিষয়ে  মোটের ওপর এই বিশ্বাসে স্থির যে, এর সমস্ত কৃতিত্ব এবং জ্ঞান বিলেত থেকেই আগত। 

আসলে সাহেবদের ‘Modern’-এর অনুবাদ বাংলাতে ‘আধুনিক’ করতে গিয়েই আমরা যত ওলট পালট কাণ্ড বাধিয়ে বসে আছি। খুব সম্ভবত আমরা, বাঙালি সংস্কৃতির নানান অলি গলিতে কেমন ভাবে বা কী কারণে ‘আধুনিক’ শব্দটির ব্যবহার হত, সেই নিয়ে খুব বেশি কিছু ভেবে দেখিনি। আরও সহজ করে বললে, ‘Modern’ এবং ‘আধুনিক’-কে গুলিয়ে আমরা এই পোড়া বঙ্গদেশে, ভাবতেই পারিনি যে, ‘আধুনিক’ শব্দটির একটি ‘দেশীয়’ উত্তরাধিকার থাকলেও থাকতে পারে। আর আমাদের সেই না ভাবার কাজটাই করেছেন, জ্ঞানচর্চার অন্যতম কাণ্ডারি শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়।

‘আধুনিক’-এর পথ ঘাট খুঁজতে শিবাজী পাড়ি দিয়েছেন প্রাগাধুনিক বাংলা কাব্যের জগতে। সুখময় মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষ্য মানলে, ১৬১২ সাধারণাব্দে রচনা সমাপ্ত হয়, কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখিত, ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ গ্রন্থের। আর গ্রন্থের আদি লীলা, সপ্তদশ পরিচ্ছেদে শিবাজীবাবু পেয়েছেন তার জিজ্ঞাসার খোঁজ। চৈতন্য এবং কাজির মধ্যে চলছে তর্কাতর্কি, আর সেই হুলিস্থুলে, চৈতন্য কাজির থেকে জানতে চান, ‘পিতা মাতা মারি খাও এই কোন ধর্ম’। এই ‘পিতা মাতা মেরে খাওয়া’ অর্থে চৈতন্য গোবধের কথা বলছেন। অবশ্য কাজিও কম যান না। তিনিও রীতিমত আট ঘাঁট বেঁধে পথে নেমেছেন। কাজি চৈতন্যকে বলেন, ‘তোমার বেদেতে আছে গোবধের বাণী’। কাজির এমন বার্তায় চৈতন্য বলেন, “জীয়াইতে পারে যদি তবে মারে প্রাণী।/ বেদ পুরাণে আছে হেন আজ্ঞা বাণী।।”

অগত্যা কাজির নরক থেকে আর নিস্তার নেই। চৈতন্যের অমোঘ বাণী, “গো অঙ্গে যত লোম তত সহস্র বৎসর।/গোবধী রৌরব মধ্যে পচে নিরন্তর।।’’। এরপর কাজি আর খুব বেশি উত্তর প্রত্যুত্তর চালাতে পারেননি। বরং চৈতন্যের উদ্দেশ্যে কাজি বলেন-‘আধুনিক শাস্ত্র মোর বিচারস্থ নয়’। কৃষ্ণদাস কবিরাজের লেখনী অনুযায়ী, কাজির শাস্ত্র ‘আধুনিক’। এই ‘আধুনিক’ অর্থে কাজির শাস্ত্রকে শুধুমাত্র নবীন বলা হচ্ছে না। এর মধ্যে একটা উচ্চ নীচের গল্পও আছে। আছে একটা জয় পরাজয়ের আখ্যান। বাংলা প্রাগাধুনিক কালে, ‘আধুনিক’ শব্দটির সঙ্গে তাই একটা রাজনৈতিক ইতিহাস জুড়ে আছে। ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ গ্রন্থিটিতে আমরা যেমন ‘হিন্দু’ শব্দের ব্যবহার পাই, তেমনই মুসলমান অর্থে, ‘যবন’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। চৈতন্য এবং কাজির বিরোধ, নিপাট ‘হিন্দু’ এবং ‘যবন’-এর বিরোধ নয়। এর মধ্যে একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক গ্রহণ বর্জনের ইতিহাসও আছে। যে জ্ঞানতত্ত্ব, ‘যবন’-এর জ্ঞানকে গ্রহণ করতে চায়নি। স্পষ্টস্বরে চৈতন্য বলেছেন, “তোমার যে শাস্ত্র কর্তা সেহো ভ্রান্ত হৈল।/ না জানি শাস্ত্রের মর্ম হেন আজ্ঞা দিল।।”

শিবাজীবাবু তাঁর বইতে ‘আধুনিক’ বিষয়ে পথপ্রদর্শক একটি উদাহরণই পেশ করেছেন। কিন্তু কেউ যদি শিবাজীবাবুর পথে হেঁটে ‘আধুনিক’- প্রতর্কের আরও গভীরে প্রবেশ করতে চান তাহলে নানান চমকদার গল্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটবে আমাদের। ত্রিবেণীর জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের কথাই বলা যাক না হয়। জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের মৃত্যুহয়েছিল ১৮০৭ সাধারণাব্দে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বেশ ভালোরকম যোগাযোগ ছিল তর্কপঞ্চাননের। সেই জগন্নাথ বিষয়ে, পরিষদে রক্ষিত রামগোপাল মুখোপাধ্যায়ের কুলগ্রন্থের পুঁথিতে লেখা হয়েছে-‘ত্রিবেণী জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননস্য কন্যাবিবাহঃ, স তু আধুনিক পালধি’। প্রথিতযশা গবেষক দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্যের সংগ্রহে থাকা একটি ‘কারিকা’-তে আরও  লেখা হয়েছে-“ ‘আধুনিক’ জগন্নাথতর্কপঞ্চানন।/ তার সুতা লইয়াছিলেন গোপাল ভাজন।।”

স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, পণ্ডিত তর্কপঞ্চাননের কন্যার বিবাহ নিয়ে বড় সমস্যার কারনে, নিন্দা অর্থে জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের পরিচিতির সঙ্গে ‘আধুনিক’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ‘দেশীয়’ পরিসরে আধুনিকের গতিবিধি খোঁজার আশু প্রয়োজন রয়েছে, নাহলে ‘আধুনিক’ নিয়ে কোনও প্রতর্কের বিচারেই  বিলাতের বাইরে পা ফেলতে পারবনা আমরা। ‘ভারতে মহাভারতে’-র পরিধি খুঁজলে এমন আরও অনেক প্রতর্কের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটবে আমাদের। সেই পরিধির খোঁজ না হয়, পাঠকের জন্য তুলে রেখে বইটির গভীরে প্রবেশ করা যাক খানিক।

মোট চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত শিবাজীবাবুর এই মহাগ্রন্থ। প্রথম অধ্যায়ের নাম, ‘অথ মা ফলেষু কদাচন’। দ্বিতীয়- ‘পিতাপুত্রদ্বৈরথ’। তৃতীয়টি হল, ‘মহাভারতঃ রণ, রক্ত, বিফলতা’। আর সর্বশেষ অধ্যায়-‘ধর্ম, আছ তুমি কোথায়?’। আর এই অধ্যায়ের পূর্বে পাঠক স্বাদ নিতে পারেন, রণবীর চক্রবর্তী লিখিত সুস্বাদু ‘কথামুখ’ অংশটির। ঐতিহাসিক মহাশয়, আরও নানা কিছুর সঙ্গে শিবাজীবাবুর মেধাজীবী হয়ে ওঠার আখ্যানও বর্ণনা করেছেন এই অংশে।

আজকাল বিদ্যাচর্চার পরিসরে জ্ঞানের বিভাজন অত্যন্ত তীব্র গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। যারা উনিশ শতক চর্চা করেন, তারা প্রাগাধুনিক যুগকে বাদ রাখতে চান। যারা মুদ্রণ সংস্কৃতি এবং ছাপা বই-এর ইতিহাস চর্চা করেন তারা আবার পুঁথির জগতকে ছুঁয়ে দেখতে চাননা। এই ধরণের জ্ঞানকাণ্ডের নিশ্চয়ই প্রয়োজন আছে। কিন্তু পাশাপাশি এমন বিদ্যাপরিক্রমার দরকার আছে যেখানে, প্রাগাধুনিক যুগ এবং উনিশ শতকের সংযোগরেখা তৈরি হবে। এই সংযোগের একটি বড় ইতিহাস রয়েছে, ‘অথ মা ফলেষু কদাচন’ অংশটির মধ্যে। মুখ্যত গীতার ২/৪৭ কে ঘিরেই এই অংশের তর্কাতর্কি। আর এই তর্কের পথে শংকর (৭৮৮-৮২০) থেকে শুরু করে অভিনবগুপ্ত (৯৪০-১০১৪), জ্ঞানদেব (১২৭৫-১২৯৬), জয়তীর্থ (১৪শতক), মধুসূদন সরস্বতী (১৬ শতক) হয়ে বিশ শতক পর্যন্ত প্রসারিত। আর এই বিশ শতকের পথপরিক্রমায়, দুঁদে রাজনৈতিক নেতা মোরারজি দেশাই-এর মতো দুঁদে রাজনৈতিক নেতার  গীতা চিন্তাও বিশ্লেষণ করেছেন শিবাজী বাবু। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গীতার প্রভাব প্রতিপত্তির ইতিহাসকে আমরা যেমন ভাবে দেখে থাকে, সেখানে শিবাজীবাবু এক নতুন প্রতর্কের আগমন ঘটিয়েছেন। তবে সেই নতুন প্রতর্কটি কী তা জানতে হলে, বইটি পড়ে দেখতে হবে পাঠককে। 

গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘পিতাপুত্রদ্বৈরথ’ আমাদের চেনা পৃথিবীর অনুভূতির ইতিহাসে কিছু নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়ে যায়। কাকে সম্পর্ক বলে? সেই সম্পর্কের পরিণতি কোন কোন পথে যেতে পারে, তার নানান টীকা ভাষ্য রয়েছে এই প্রবন্ধের মধ্যে। বেদ, উপনিষদ্‌, স্মৃতি, বৌদ্ধগ্রন্থ আরও নানান সূত্রের ভেতর দিয়ে লেখক পৌঁছে যান কখনও ব্রাহ্মণ-শ্রমণের ‘শাশ্বত বিরোধ’ থেকে ‘হিন্দু’-র ঠিকুজি নির্মাণে। তবে পিতাপুত্রের লড়াইতে নতুন মাত্রা যোগ করে, ব্রহ্মচারী, গৃহস্থ, বানপ্রস্থী বা সন্ন্যাসী-র ইতিহাস। 

খুব অল্পতে শেষ হওয়া সম্ভব নয়, এমন মহাগ্রন্থের গতিধারা। পরবর্তী দুটি অধ্যায়, ‘মহাভারত: রণ, রক্ত, বিফলতা’ এবং ‘ধর্ম, আছ তুমি কোথায়?’অধ্যায় দুটিতে যেমন মহাভরতের মান্য সংস্করণ গড়ে ওঠার গল্প পাই, তেমনি ধৃতরাষ্ট্রের সহচর, সঞ্জয়কে ঘিরে রহস্যের অন্ত নেই। আর এই সব কিছুর সঙ্গে মিলে যায়, বাংলা উপন্যাসের অন্যতমা কথাকার, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা। আর ‘ধর্ম’-র ঘাত প্রতিঘাত বুঝতে চণ্ডাল-বিশ্বামিত্র সংবাদের জুড়ি মেলা ভার। যে অখ্যানের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ‘নতুন বামুন’ বিশ্বামিত্রের এক ‘চণ্ডাল’-এর ডেরায়, ক্ষিদের জ্বালায় কুকুরের মাংস খেতে চাওয়ার অদম্য তাগিদ। 

‘ভারতে মহাভারতে’ গ্রন্থের আলোচনা এর ভাষার প্রসঙ্গ বাদ রেখে করা চলে না। ভুলে গেলে চলবে না, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার বা গল্পকার পরিচয়ের কথা। আজকের নগর পরিসরের, অভিজাত বা অনভিজাত মহলের, বাংলা ভাষা ভুলে যাওয়ার লীলাখেলায় নিশ্চিত ভাবেই পাঠক এক দণ্ডের শান্তি পাবেন এই বই পড়লে। বাংলা ভাষার ‘শান্ত’, ‘বাৎসল্য’ ‘সখ্য’ এবং ‘মধুর’রূপটি ফুটে উঠেছে শিবাজীবাবুর লেখনীর মধ্যে। হয়ত কবি বলেই তিনি, ভাষাকে নিজের মতো ভেঙে গড়ে নিতে পারেন। শিবাজীবাবুর এই বই কার্যত পাঠককে গোয়েন্দা আখ্যান পাঠের আনন্দ দেবে। আমাদের ভারতীয় দর্শন, ইতিহাস এবং সাহিত্যের একের পর এক রহস্য পরত ছাড়িয়েছেন শিবাজীবাবু ‘ভারতে মহাভারতে’ গ্রন্থের মধ্যে। এই বই-র ‘গ্রন্থনির্মাণশিল্পী’ সোমনাথ ঘোষ, চার্বাক প্রকাশনা এবং হরপ্পার সৈকত মুখার্জি অসংখ্য ধন্যবাদের প্রপাপক এতও সুন্দর এবং নান্দনিক একটি পুস্তক নির্মাণের জন্য। এই গ্রন্থ অবশ্যপাঠ্য।

Sunday, February 6, 2022

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | চতুর্থ পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

১৪

আবার আমি কয়েক দিনের জন্য লস এঞ্জেলসে ফিরে গেলাম এডিটিংয়ের কাজে। দ্বিতীয় দিনে একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আলো নিভিয়ে দিতেই একটা প্রচণ্ড ভয় আমায় চেপে ধরল, এই বুঝি মাঝরাতে ফোন বেজে উঠবে। আর ঠিক সেটাই ঘটল। ফোনের অপর প্রান্তে ভায়ের গলা শুনতে পেলাম, সচেতনভাবে শান্ত থাকার চেষ্টা রয়েছে সেই স্বরে।

-হ্যালো, বাবার খুব জ্বর। ডাক্তার বলছেন তোমার এখুনি ফিরে আসাই ভালো।

ফোন রেখে ফোনেই পরের দিন ভোরের একটা টিকিট বুক করলাম। তারপর সেই অন্ধকারের মধ্যে সারারাত জেগে শুয়ে আছি। বুকের মধ্যে এক প্রবল কষ্টের অনুভূতি, ভায়ের জন্য, মায়ের জন্য এবং নিজের জন্যও। আমরা মানে আমি আর আমার ভাই যখন ছোট ছিলাম, মেহিকো আর স্পেনে বড় হয়ে উঠছি আর বাবা-মা দুজনের পরিবারের অন্যান্য সবাই থাকতেন কলোম্বিয়ায়, তখন আমরা যেন ছিলাম একটা ছোট্ট দল, একটা ক্লাবের মতো। সেই ক্লাবের প্রথম সদস্য এখন চলে যাওয়ার পথে। সেটা মেনে নিতে পারছিলাম না।

পরের দিন প্লেনের মধ্যে বসে মুহূর্তের জন্য আমি মনে করতে পারছিলাম না আমি ঠিক কোথায় যাচ্ছি, মেহিকোর দিকে যাচ্ছি নাকি মেহিকো থেকে ফিরছি। এমনই ছিল শেষের সেই দিনগুলোর বিভ্রান্তি। বিমানবন্দরে নেমে ইমিগ্রেশনের কাজ ও মালপত্র সংগ্রহের মধ্যে এক ফাঁকে ভাইকে ফোন করলাম।

-আমাদের হাতে আর ২৪ ঘণ্টা সময়ও নেই, সে বলল।

“আর মাস দুয়েক” থেকে “বড় জোর কয়েক সপ্তাহ”, সেখান থেকে “মাত্র ২৪ ঘণ্টা”-য় কিভাবে চলে এলাম আমরা? অসংখ্য নার্স, শল্যচিকিৎসক, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, ফুসফুস বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের প্রধান ও বার্ধক্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অগণিত কথোপকথনের পর, যাঁরা এতদিন কোনও কিছুই লুকিয়ে যাননি, তাঁদের এই নতুন ঘোষণার দৃঢ়তা যে কী নিষ্ঠুর! বাবার হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অবশ্য সমস্ত কিছু নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে দিয়েছিলেন, কি কি করা সম্ভব আর সম্ভাবনাই বা কী। এবার আমরা একটা নিশ্চিত জায়গায় এসে পৌঁছলাম। তবুও, যে নিশ্চয়তার সঙ্গে তাঁরা বলছেন যে আর একটা মাত্র দিন মাত্র বাকি, তা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল, কিন্তু এ ছাড়া আর কোনও হিসাবও তো সামনে নেই। দুটো কিডনিই কাজ করছে না, রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে, তা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া একসময় বন্ধ করে দেবে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাপ্তি যেভাবে ঘটেছে, বাবা তাদেরই অনুসরণ করছেন। এই যে জীবন, সেই কোন প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বয়ে চলেছে, আজও তা একই রকমভাবে অনিশ্চিত রয়ে গেছে। শুধু মৃত্যু যখন শিয়রে এসে দাঁড়ায়, সে কাউকে নিরাশ করে না। 

মালপত্রের বেল্টের দিকে যেতে যেতে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, নিজেকে মনে হল ছ’ ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা ও ১০৯ কেজি ওজনের স্কুলে পড়া ছোট্ট একটি লাজুক বালক। 

১৫

দিনের বেলার নার্সকে বললাম, বাবার মধ্যে সামান্যতম কোনও পরিবর্তন বা সেরকম কোনও লক্ষণ দেখলে, যা শেষের সেই ক্ষণের ইঙ্গিত বলে মনে হবে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে যেন আমাকে ডাকেন। তার সঙ্গে অবশ্য এও বললাম যে এটা কোনও নির্দেশ নয়, যদি কিছু লক্ষ্য করেন, তাহলে আমাকে জানালে আমি বাধিত হব। আমার ভায়ের স্ত্রী ও তার ছেলেমেয়েরা প্যারিস থেকে রওনা দিয়েছে আর আমার স্ত্রী ও মেয়েরা পরের দিন সকালের প্লেনে আসবে।

সেদিন দুপুরে, মা খাবার খেয়ে একটু ঘুমচ্ছেন, আমি বাবার পড়ার ঘরে বসে খুটখাট কাজ করছিলাম, বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি, মনে হল সব কিছু কী অদ্ভুত শান্ত! বাগানে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। অবাক হয়ে দেখলাম এই বাড়িরই উপরের একটা ঘরে একজন মানুষের জীবন নিভে আসছে, কিন্তু তার জন্য কোথাও বিন্দুমাত্র কোনও বিচলন নেই।

এই বাড়িটি যে লোকালয়ে অবস্থিত তা তৈরি করেছিলেন স্থপতি লুইস বারাগান, চার-পাঁচের দশকে। প্রাথমিকভাবে বাড়িগুলো ছিল মর্ডানিস্ট স্টাইলের, কিন্তু পরবর্তীতে, সাত-আটের দশকে, যে বিরাট বড় বড় বাড়ি তৈরি হয় তার স্থাপত্যশৈলীর যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে। বাবা কোনোদিনই এই জায়গাটার ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন না। কিন্তু একটা বাড়ি খুঁজে পেলেন, ব্যতিক্রমী স্থপতি মানুয়েল পাররার তৈরি। তিনি নিজস্ব একটা স্টাইল উদ্ভাবন করেছিলেন: ঔপনিবেশিক মেহিকো, স্পেনীয় এবং মূর স্টাইলের একটি সংমিশ্রণ। পুরোন বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে দরজা, জানলার ফ্রেম ও পাথরের কাজ সংগ্রহ করে নতুন বাড়ির অঙ্গীভূত করতেন। ফলে অন্যান্য যা উপাদানই ব্যবহার করা হোক না কেন বাড়ির একটা নিজস্বতা তৈরি হত, তাতে সঞ্চারিত হত মানবিক উত্তাপ। বাবা সবসময় তাঁর প্রশংসা করতেন এবং প্রতিবেশী আধুনিকমনস্ক বুদ্ধিজীবী ও শ্বেত পাথরের বিরাট বিরাট সব প্রাসাদের মাঝখানে এই বাড়িতে বাস করাটা বেশ উপভোগ করতেন।

মনে আছে ছোটবেলায় বাগানে ঘাসের উপর চিত হয়ে শুয়ে আকাশ দেখতাম। এই বাগানটাকে তখন কী ভালোই না লাগত! (এমনকি সেই বয়সেও বুঝতে পারতাম যে বাচ্চাদের ভালো লাগার জায়গাগুলো সবসময় যে বাস্তবে খুব আকর্ষণীয় হবে এমনটা নয়।) এই জায়গাটা থেকে সন্ধ্যা নেমে আসা দেখার অনুভূতিটা ছিল অসাধারণ। মেহিকোর রাজধানীতে যাঁরা বাস করেন তাঁরা জানেন যে প্রায়শই এখানে অভূতপূর্ব সন্ধ্যা নামে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কখনো কখনো, বৃষ্টির পর, বাতাস হয়ে ওঠে সজীবস্বচ্ছ আর তাতে থাকে অপূর্ব এক সুবাস। দূরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে আহুস্কো আগ্নেয়গিরি আর হঠাৎই গোটা শহরের উপর নেমে আসে শান্তির আস্তরণ। তখন আর মনে হবে না যে একটা দূষণে ভরা, হট্টগোলে আকীর্ণ এক বৃহৎ নগরে আমরা বাস করছি, বরং অনেক আগে যেমন ছিল, সেই মায়াময় এক সুন্দরী উপত্যকায় থাকার অনুভূতি ঘন হয়ে আসবে মনে এবং মুহূর্তের জন্য নস্টালজিয়ার পাশাপাশি এক গভীর আশার সঞ্চার ঘটবে। আমার ভাইয়ের বিয়ে হয়েছিল এই বাগানে, এক সূর্যকরোজ্জ্বল দিনে। অনুষ্ঠান শুরুর ঘণ্টা খানেক পরে প্রচণ্ড ঝড় ও শিলাবৃষ্টি আছড়ে পড়ে। কিন্তু আমার বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। কারণ তাঁর বিশ্বাস, সেটা ছিল শুভ লক্ষণ। এটাও ঠিক যে ওরা তিরিশ বছর ধরে সুখী বিবাহিত জীবন যাপন করে আসছে।

এই বাগানেই বাবার ৭০ বছরের জন্মদিনের উৎসব হয়েছিল। তিনি ঠিক করেছিলেন শুধু তাঁর সমবয়সী মানুষদের নিমন্ত্রণ করবেন। তাঁর চেয়ে ছোট কিছু বন্ধু-বান্ধব খুবই ক্ষুব্ধ হন এতে, সেকথা তাঁর গোচরেও আনেন। কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইলেন; তাঁর মতে এই দীর্ঘ জীবনের সমস্ত পরিচিত বা কাছের মানুষদের এই বাড়িতে ধরানো সম্ভব নয়, তাই শুধুমাত্র তাঁর বয়সী মানুষদেরই ডাকা হবে। তবে মনে মনে দুঃখ পেয়েছিলেন, অন্যদের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার জন্য।

বাড়ির একতলাতে ছিলাম আমি। দুপুরের খাওয়ার পর রান্নাঘর পরিষ্কার করলাম। বসার ঘরটা ঠিক যেমন ছিল তেমনই আছে। তবে একেবারে নিশ্চিত করে সেকথা বলা যায় না, কারণ ঘরের আসবাবপত্র, সংগৃহীত প্রতিটি শিল্পকর্ম ও অগণিত ছোটখাটো জিনিষ সেখানে জড়ো হয়েছে দশকের পর দশক ধরে আর সেগুলো একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে এক অনির্দিষ্ট নতুনত্ব, আবার তার সঙ্গে রয়েছে প্রাচীনত্বের আভাসও। ওদের মধ্যে কিছু জিনিষ কবে যে আনা হয়েছিল তা সঠিকভাবে বলা অসম্ভব। বেশ পুরোন ছোট্ট একটা পাথরের তৈরি জিনিষ আছে, অনেকটা ফুলের মতো দেখতে, যার পাপড়িগুলো ছুরির মতো ধারালো। এটা আছে আটের দশকের গোড়া থেকে। রাফায়েল আলবের্তির হাতে লেখা একটা কবিতা আছে সাতের দশক থেকে - ৪০ বছর নির্বাসনে থাকার পর যখন তিনি মাদ্রিদে ফিরে যান তার পর। আরও আছে আলেখান্দ্রো ওব্রেগোনের একটি আত্মপ্রতিকৃতি, যার মধ্যে গুলির গর্ত হয়ে আছে (এক রাতে মদ্যপ অবস্থায় প্রচণ্ড রেগে গিয়ে শিল্পী রিভলভার দিয়ে নিজের ছবির চোখে গুলি করেন, কারণ তাঁর পরিণত বয়স্ক ছেলেরা ওই ছবির দখলদারি নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছিল) এবং লার্তিগের একটি ফটোগ্রাফির বই, যেটা সেই বারো বছর বয়স থেকে দেখে আসছি।

প্রায় ২৫ বছর যাবত বাড়িতে একটা টিয়াপাখি ছিল। বিকেলবেলায়, যখন কোনও একটা দরজা বন্ধ করা হত বা টেলিফোন বাজত, কখনো কখনো সে অদৃশ্য এক সুন্দরী তরুণীর উদ্দেশ্যে শিস দিত। তারপর, এই কাজটা করতে গিয়ে এত পরিশ্রম হয়ে যেত যে বাকি দিনটা নিঃশব্দে বিশ্রাম করত। আমরা সবাই যে তার প্রতি খুব মনোযোগী ছিলাম, এমনটা নয়; কিন্তু তার মৃত্যুর পর সকলেই খুব কাতর হয়ে পড়েছিলাম।

১৬

সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাবার ঘরের কাছে গেলাম। ভেতরে দেখলাম দিনের বেলার নার্সটি কিছু লিখছেন আর তাঁর সাহায্যকারিণী একটা পত্রিকা পড়ছেন। বাবা একদম শান্ত হয়ে শুয়ে আছেন, দেখে মনে হবে বুঝি ঘুমচ্ছেন। কিন্তু বাড়ির মধ্যে এই ঘরটাকে মনে হচ্ছে যেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আশপাশের সবকিছু ধীর, অচঞ্চল হলেও সময় সেখানে ঘোড়ায় জিন দিয়ে ছুটে চলেছে, এই মুহূর্ত থেকে পরের মুহূর্তে পৌঁছতে তার সে কী ভীষণ ব্যস্ততা! সে যেন আর নিয়মের অধীন নয়।

খাটের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বাবাকে দেখছিলাম। কী চেহারা হয়ে গেছে! মনে হল আমি শুধু তাঁর ছেলে নই, সেই ছোট্ট খোকাটি শুধু নই আর, একই সঙ্গে তাঁর পিতাও। বেশ ভালো করেই জানি যে তাঁর দীর্ঘ সাতাশি বছরের বিস্তৃত জীবনের কথা আমি বলছি। তার সূচনা, মধ্যগতি এবং সমাপ্তি – এখন আমার সামনে এবং তা থেকে বাচ্চাদের অ্যাকর্ডিয়ান বইয়ের মতো একটার পর একটা পাতা খুলে যাচ্ছে।

একজন মানুষের অন্তিম পরিণতি জেনে গেলে উৎকণ্ঠায় ভরে ওঠে মন। আমার জন্মের আগের যেসব কাহিনী, তা অবশ্যই ছিল বাবা, মা, কাকাদের বলা গল্প বা আত্মীয়, বন্ধু, সাংবাদিক, জীবনীকারদের পুনরাবৃত্তির এক মিশ্রণ এবং আমার কল্পনাশক্তি তাকে আরও নানা রঙে রঙিন করে তুলেছিল। বাবার বয়স যখন মেরেকেটে ছয়, একটা ফুটবল দলে গোলরক্ষক হিসেবে খেলতেন। তাঁর ধারণা ছিল যে তিনি বেশ ভালোই খেলতেন, সাধারণের চেয়েও ভালো এবং খুব গর্ববোধ করতেন তাই নিয়ে। এর দু’-এক বছর পরে উপযুক্ত চশমা ছাড়া সূর্যগ্রহণ দেখেছিলেন বলে তাঁর বাঁ চোখের মাঝখানের দৃষ্টি চলে যায়। একদিন তাঁর দাদুর বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন কয়েকজন মানুষ একটা লোকের মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর ওই মৃত ব্যক্তির স্ত্রী পেছন পেছন হাঁটছে, সে একহাতে একটা বাচ্চাকে ধরে আছে ও অন্য হাতে মৃত স্বামীর ঝুলে থাকা মাথাটা। তিনি নিজের ভাগের জেলির মধ্যে থুতু ফেলে এবং জুতোর মধ্যে কলাভাজা রেখে খেতেন যাতে ছোট ছোট অসংখ্য ভাইবোন তাঁর সেই খাবার কেড়ে খেতে না পারে। কৈশোরকালে মাগদালেনা নদী দিয়ে যাওয়ার সময় একবার প্রবল একাকীত্ব অনুভব করেছিলেন। প্যারিসে থাকার সময় একদিন দুপুরে এক মহিলার সঙ্গে দেখা করতে যান এবং কথা বলতে বলতে অকারণ দেরি করতে থাকেন যাতে ওই মহিলা তাঁকে খেয়ে যেতে বলেন, কারণ ওনার কাছে তখন একটা পয়সাও ছিল না আর কয়েকদিন ধরে খেতে পাননি কিছুই। কিন্তু এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সেখান থেকে বেরিয়ে ওই মহিলার বাড়িরই রাখা জঞ্জাল ঘেঁটে যা পেয়েছিলেন, তাই খেয়েছিলেন। (আমার যখন পনের বছর বয়স বাবা এই গল্পটা আমার সামনেই অন্যদের বলছিলেন আর কী লজ্জা যে করছিল আমার।) প্যারিসে সেই সময় ছিলেন চিলের এক নিঃসঙ্গ তরুণী বিয়োলেতা পাররা। সেখানে থাকা দেশছাড়া লাতিন আমেরিকার মানুষদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝেই তাঁর সঙ্গে দেখা হত বাবার। তিনি লেখালেখি করতেন এবং অসাধারণ হৃদয়স্পর্শী গান গাইতেন। অনেক বছর পরে তিনি আত্মহত্যা করেন। ১৯৬৬ সালের এক বিকেলে, মেহিকোর এই রাজধানী শহরে, বাড়ির দোতলায় উঠে মা যেখানে খাটের উপর শুয়ে ছিলেন, সেখানে গিয়ে বললেন, কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মৃত্যুর কথা লেখা শেষ হল।

-কর্নেলকে মেরে ফেললাম, তিনি বললেন, তিনি তখন সান্ত্বনার অতীত।

মা বুঝতেন বাবার কাছে এর অর্থ কতখানি। দুজনে দীর্ঘক্ষণ, একসঙ্গে, নিঃশব্দে বসে রইলেন।

একথা ঠিক যে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সাহিত্যিক জনপ্রিয়তার শিখরে অবস্থান করেছিলেন, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও সামাজিক প্রতিপত্তিও অর্জন করেছিলেন যথেষ্ট, কিন্তু তারই পাশাপাশি কিছু দিন গেছে বড় বেদনার। একদিকে যেমন ৪৬ বছর বয়সে আলবারো সেপেদার মৃত্যু, ড্রাগ-মাফিয়াদের দ্বারা ৬১ বছরের সাংবাদিক গিয়েরমো কানোর হত্যা ও তাঁর সবচেয়ে ছোট দুই ভাইয়ের মৃত্যু, অন্যদিকে তেমন খ্যাতির একাকীত্ব, স্মৃতিভ্রংশ ও তার ফলে লিখতে না পারা। একেবারে শেষের দিকে, তাঁর নিজের লেখা বই প্রকাশিত হওয়ার পর সেই প্রথম পড়তে শুরু করলেন এবং যেন প্রথমবার গল্পটা পড়ছেন এমনভাবে আমাকে একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, “কোন চুলো থেকে এসব বেরিয়েছে?” বইগুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে গেলেন, এক একবার মনে হচ্ছিল প্রচ্ছদটা যেন তাঁর চেনা, কিন্তু বিষয়বস্তু বিশেষ বুঝতে পারছিলেন না। কখনো কখনো বইটা বন্ধ করার পর পিছনের পাতায় নিজের ছবি দেখে এমন চমকে উঠতেন যে আবার বইটা ফিরে পড়ার চেষ্টা করতেন।

সেখানে দাঁড়িয়ে আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হল যে ডিমেন্সিয়া সত্ত্বেও (এবং সম্ভবত মরফিনের প্রভাব সত্ত্বেও) এখনো পর্যন্ত তাঁর মস্তিষ্ক ঠিক তেমনই সৃজনশীলতায় পরিপূর্ণ, যেমনটা ছিল সারাজীবন। হয়তো খানিক ক্ষত তৈরি হয়েছে, তাই পুরোন চিন্তাভাবনায় ফিরতে পারছেন না বা যুক্তির শৃঙ্খলা বজায় থাকছে না, কিন্তু এখনো সক্রিয় আছে। সর্বদাই তাঁর কল্পনাশক্তিতে ছিল প্রতিভার অভূতপূর্ব স্ফুরণ। বুয়েন্দিয়া পরিবারের ছয় প্রজন্ম নিয়ে তৈরি হয়েছিল ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’। অবশ্য আরও দুই প্রজন্মের সমস্ত উপাদান তাঁর কাছে সঞ্চিত ছিল। কিন্তু উপন্যাসটি অনেক বেশি বড় ও ক্লান্তিকর হয়ে যাবে এই ভয়ে তা বাদ দেন। বাবা মনে করতেন কঠোর নিয়মানুবর্তিতা হল একটি উপন্যাস লেখার প্রধান স্তম্ভগুলির একটি, বিশেষ করে গল্পের কাঠামো ও তার সীমানা প্রস্তুত করার জন্য। যাঁরা মনে করতেন যে উপন্যাসের গঠনশৈলী নির্মাণের ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীনতা পাওয়া যায় এবং সেই কারণে সিনেমার চিত্রনাট্য বা একটি গল্প লেখার থেকে উপন্যাস লেখা অনেক বেশি সহজ, তিনি তাঁদের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তিনি বলতেন যে একজন ঔপন্যাসিককে অবশ্যই তার যাত্রাপথ নির্দিষ্ট করে নিতে হবে, যাতে ‘উপন্যাসের চোরাবালিতে’ হারিয়ে না যান।

১৯২৭ সালে আরাকাতাকা থেকে ২০১৪ সালে মেহিকো শহরে আজকের এই দিন – এক দীর্ঘ ও ব্যতিক্রমী যাত্রা, সমাধি প্রস্তরের উপর শুধু ওই তারিখদুটো দিয়ে যাকে আয়ত্ত করার চেষ্টা নিতান্তই বৃথা। আমার মতে, লাতিন আমেরিকার প্রায় কোনও মানুষই এরকম বিশেষত্ব ও সৌভাগ্যপূর্ণ জীবন যাপন করেননি। যাঁরা একথা মেনে নিতে পারেন বলে আমার মনে হয়, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে যিনি থাকতেন, তিনি আমার বাবা। 


আগের পর্ব


গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | তৃতীয় পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

Tuesday, November 16, 2021

প্রহরশেষের অলোকরঞ্জন | রজতকান্তি সিংহচৌধুরী

১

'সভামিছিল এবং শায়াশেমিজের পিছনে ছোটাই সকল কালের সব যুবকের স্বধর্ম হতে পারে না।' পঞ্চাশের সেই শুরুর দিনগুলোতে লিখেছিলেন নানা অর্থেই অগ্রজ কবি অরুণকুমার সরকার। সেদিন পঞ্চাশের তরুণ কবিদের মুখপত্র 'শতভিষা'র (অষ্টাদশ সংকলন, ১৩৬৩) পাতায় 'বাংলা কবিতার একটি স্বতন্ত্র ধারা' নামের এক নির্ণায়ক নিবন্ধে। কী ছিল এ লেখার পটভূমি? পঞ্চাশের সূচনার দিনে একদিকে ছিল 'জনগণের কবিতা চাই', 'বিপ্লবী কবিতা লেখো' ধরনের ফতোয়া। অন্যদিকে ছিল যৌন কবিতার দাবি, 'সকল কবি এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কামুক হয়ে উঠতে পারেননি' ধরনের আক্ষেপ। তার মধ্যেই 'শতভিষা'র (১৯৫১) অঙ্গীকার ছিল, আমরা কবিতাকে আবার কবিতার কাছে ফিরিয়ে আনব।' অনেকটা ডব্লিউ বি ইয়েটসের ধরনে উচ্চারণ, 'যা-কিছু কবিতা নয়, তাকে কবিতা থেকে বাদ দিতে হবে একেবারে।' কবিতার অন্তর্মুখীনতা এবং শুদ্ধতার কাছে ফিরে আসাটাই ছিল 'শতভিষা'র শপথ। বছর দুয়েকের ভেতরে বেরুল ‘কৃত্তিবাস' (১৯৫৩)। 'শতভিষা'র ঝোঁক যদি ছিল 'ব্যক্তিত্বচিহ্নিত' কবিতার দিকে, ‘কৃত্তিবাস’-এর প্রবণতা 'স্বীকারোক্তিমূলক' কবিতায়। 

বাংলা কবিতার মৌলিক লিরিক্যাল স্বর, যা পঞ্চাশের অব্যবহিত আগে কিছুটা হলেও ব্যাহত হয়েছিল, তা ফিরে এল ‘শতভিষা’য়, ‘কৃত্তিবাস’-এ, পঞ্চাশের নতুন কবিতায়। গত শতকের পাঁচের দশকটি ছিল পুনরধিকারের, পুনরাবিষ্কারের, পুনর্জন্মের, পুনরুজ্জীবনের প্রাচুর্যে, প্রত্যয়ে, সামর্থ্যে স্পন্দমান। পঞ্চাশের কবিদের মেধায়, অনায়াস শব্দছন্দদক্ষতায়। এঁদের জন্ম বিশ্বব্যাপী মন্দার ভেতরে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদ্যোগপর্বে, বয়ঃসন্ধি স্বাধীনতালগ্ন দেশদ্বিখণ্ডনের ছিন্নভিন্নতার মধ্যে। তবু এঁদের লেখালেখিতে টি এস এলিয়ট-কথিত 'পোড়ো জমি' পেরিয়ে দিকপ্রান্তে ক্ষীণ নীলাঞ্জনরেখার অনুসন্ধান দুর্নিরীক্ষ্য নয়। রবীন্দ্রকবিতা থেকে স্বরের স্বাতন্ত্র্য খুঁজে পেতে তিরিশের কবিতা যেমন মনীষিতা আর শিল্পিতাকে আশ্রয় করেছিল, চল্লিশের কবিতার একটি অংশ আশ্রয় নিয়েছিল জনসংহতির লড়াকুপনায়, পঞ্চাশের কবিদের ফিরে যাওয়া ছিল কবিতার বিশুদ্ধতায়, সহজ শুশ্রূষায়। আলোক সরকারের কবিতায় বাংলা কবিতার বিশুদ্ধতম রূপ আমরা খুঁজে পাই। (সেই শুদ্ধস্বরের উত্তরাধিকার এই শতকে গত দুই দশকে যেসব তরুণ লিখতে এসেছেন, তাঁদের কবিতায় প্রগাঢ় আর এটাই হয়তো তাঁদের ভেতরে আলোক সরকারের কবিতার প্রতি ভালোবাসার কারণ।) অলোকরঞ্জনও বিশুদ্ধতারই কবি, তবে অসংখ্য বাঁকবদল আর স্পন্দিত আঙ্গিকে ওঠানামা তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য। ছেচল্লিশটি কবিতার বই নিয়ে তাঁর কাব্যপ্রবাহে শাশ্বত হতে চাওয়া কবিতার পাশাপাশি সমকালের রক্তক্লেদে লগ্ন কবিতাও দেখতে পাব। পঞ্চাশের সেই সূচনার দিনগুলি শঙ্খ ঘোষ, আলোক সরকার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, বিনয় মজুমদার, উৎপলকুমার বসু সহ অতজন প্রধান প্রধান কবির ভেতরেও তিনি ছিলেন নিজভূমে স্বরাট। ১৯৫৪ সালের জানুয়ারি মাসের ২৮ ও ২৯ তারিখে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হলের সেই ঐতিহাসিক কবিসম্মেলনে জীবনানন্দ থেকে তরুণতম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অবধি বাহাত্তর জন কবির ভেতরেও কুড়ি বছরের তরুণ অলোকরঞ্জনের 'আমার ঠাকুমা' কবিতাটি কীভাবে সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, তা লিখেছেন কবিবন্ধু শঙ্খ ঘোষ, 'একটি নতুন আবিষ্কার ওই সন্ধ্যার যাবতীয় যাদুস্পর্শ ছাপিয়ে গিয়েছিল: অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সে সময়ে যাঁর বয়স মাত্র কুড়ি বছর, একটি কবিতাপাঠের মাধ্যমে শ্রোতাদের মন আপ্লুত করে দিয়েছিলেন, কবিতাটি ছিল “আমার ঠাকুমা”।' ('আধুনিক কলকাতার সাহিত্যলোক : ১৯৪১ থেকে ১৯৮০', শঙ্খ ঘোষ)। এই কবিতাটি দিয়েই 'শতভিষা'য় অলোকরঞ্জনের আত্মপ্রকাশ, পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশের আগে অন্যতম সম্পাদক দীপঙ্কর দাশগুপ্ত কবিতা চেয়ে চিঠি দেন অলোকরঞ্জনকে। পরে ‘যৌবনবাউল’-এ অন্তর্ভুক্ত এ কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন অরুণকুমার সরকার, এ লেখার গোড়ায় উদ্ধৃত সেই নিবন্ধটিতে। আর তাঁর কবিতা সম্পর্কে অনেক পরে  কবিবন্ধু আলোক সরকারের নিরীক্ষা, 'রূপদক্ষ, ভাষাভূষণপ্রিয় কবি অলোকরঞ্জন। শব্দ তাঁর হাতে পালিত সারমেয়ের মতো ওঠে বসে।' 

অলোকরঞ্জন তাঁর কবিতাযাত্রায় প্রসন্নতার সম্বুদ্ধ স্বরূপ থেকে সরে এসেছেন রক্তক্ষরণের মরপৃথিবীতে। তাঁর চলতে থাকার চালচিত্তিরে 'যুদ্ধ' তাঁর কাছে দুই সিলেবলের অশ্লীলতম শব্দ হয়ে উঠেছে। তাঁর দেশজ দোতারাতে বেজেছে ভুবনতল্লাটের সুর। বাংলা ভাষাই হয়ে উঠেছে দীর্ঘ  প্রবাসে তাঁর অনন্য আবাসন। তাঁর কবিতায় বারেবারেই এসেছে বাঁকবদল। বারেবারে হারানোর মধ্যে ফুটেছে নতুন করে পাবার আকুতি। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতাযাত্রায় তত-আলোচিত-নয় যে-শেষ দশকটি সেখানে আমরা দেখব, তাঁর কবিতা নব নব উন্মেষশালিনী কল্পনামনীষার দৌলতে নতুন নতুন দিগন্তের অভিসারী। বাংলা কবিতার প্রথানুগ সীমান্তরেখাকে অতিক্রম করে গেছে অনায়াস শৈলীতেই। 

আমাদের এই মিতকথনে, আমরা তাঁর শেষ পাঁচ বছরের অসামান্য কবিকৃতি থেকে কয়েকটি কণিকা মাত্র দেখবার চেষ্টা করি?

২

দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি

প্রথম বই ‘যৌবনবাউল’ (১৯৫৯) থেকে দ্বিতীয় বই 'নিষিদ্ধ কোজাগরী'র (১৯৬৭) আট বছরের ব্যবধান ছিল। পরে পরপর প্রকাশিত দুটি বইয়ের ভেতরে ব্যবধান কমে আসে। আর ২০১৬ থেকে ২০২০ তাঁর জীবনের এই শেষ পাঁচ বছরে প্রতি বছর একটি করে কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে অলোকরঞ্জনের। অশীতিপর বয়সে এই সৃষ্টিশীলতা বিস্ময়কর। 

২০১৩ সালে কবি আশি বছর পেরিয়েছেন। চলে গেছেন জীবনসঙ্গিনী শ্রীমতী ট্রুডবার্টা দাশগুপ্ত (২০০৫)। বিধ্বংসী শোক পেরিয়ে কবি উপনীত হলেন উত্তরপর্বে। রবীন্দ্রনাথ এক অর্থে তাঁর জীবনদেবতা। তাঁর অন্ত্য পর্বের সৃজনশীলতা শেষ দশকের রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ায়।

দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি'। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের উত্তরপর্বের কবিতায় এক উজ্জ্বল মাইলফলক। সদ্যপ্রয়াত কবির ছ'দশক জোড়া  দীর্ঘ কবিতাযাত্রার শিখরে 'দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি'(২০১৬), 'তোমরা কি চাও, শিউলি না টিউলিপ' (২০১৭), 'শুকতারার আলোয় পড়ি বিপর্যয়ের চিঠি' (২০১৮), 'ঝাউ-শিরীষের শীর্ষসম্মেলনে (২০১৯), 'বাস্তুহারার পাহাড়তলি' (২০২০) নিয়ে শেষ পঞ্চকের সূচনা এই অন্তময়তার রেশ মাখানো কবিতার বইটি দিয়েই। লক্ষ করবেন, তাঁর অধিকাংশ কবিতার বইয়ের নামও ছন্দোময়, তাঁর কবিতার মতোই। মালার্মের মতো তিনি বিশ্বাস করেন, সরকার আসবে যাবে, কিন্তু ছন্দ থেকে যাবে। এ বইটির নামে এসে গেছে একেবারে লোকায়ত, প্রায়  সবার জানা এক ছেলেভুলানো ছড়ার চরণ এবং ছন্দ, শ্বাসাঘাতপ্রধান স্বরবৃত্তে। বইয়ের নামকরণে এবং অনেক কবিতায় বেলাশেষের বা বিদায়ের ছবি, কিন্তু সে বিদায়সুর কোনো নিরাশায় তলিয়ে যায় না। সে-সুর মধুর, কৃতজ্ঞতার,মুগ্ধতার। এই আলো এই সৌন্দর্যে ভরা পৃথিবীর মাঝখানে তিনি  হয়ত থাকবেন না, কিন্তু কীই বা আসে যায় তাতে!  এইখানে তাঁর জীবনদেবতা রবীন্দ্রনাথের সুরে সুরে গেয়ে উঠতেই পারেন সুধাকণ্ঠ  অলোকরঞ্জন 'নাই যদি রোস নাই রবি'। 'অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে সকল অঙ্গ' ভরিয়ে তোলবার নেশায়, হলই বা সেটা সায়ন্তনের 'ক্লান্ত' ফুলের গন্ধ।

মূলত 'যৌবনবাউল' এবং অংশত তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের কবিতা নিয়েই তাঁর কবিতার অনেক আলোচনা শেষ হয়, 'মরমী করাত' (১৯৯০) বা 'রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ'(১৯৯৩) অবধি যার শেষ সীমা। এর একটা কারণ হয়তো, ছোট ছোট প্রকাশন থেকে বের হওয়া তাঁর অনেক বইয়ের অলভ্যতা, দে'জ-কৃত কবিতা সংগ্রহের এ তাবৎ তিনটি খণ্ডই প্রকাশিত। 

'শ্রেষ্ঠ কবিতা' নিঃশেষিত। এইসব কারণে এরপর থেকেই বুঝি শুরু হয়ে যায় পূর্বজ আর এক দাশগুপ্ত কবির মতো পাঠক হারানোর বৃত্তান্ত। উত্তরপর্বের জীবনানন্দ বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর অনাগ্রহ কি একই ধাঁচের নয়? 

এক নদীতে দুবার স্নান করা যায় না। ছোটোবেলায় ঠাকুর্দার মুখে শোনা  গ্রিক দার্শনিক হিরাক্লিটাসের এই বীক্ষা মেনে  কবিতা থেকে কবিতার সঞ্চারপথে পুনরুক্তিপ্রবণতা খারিজ করে চলা অলোকরঞ্জনের নানা পর্যায়ের কবিতার ধরতাই এখনও অনেক কবিতাপ্রেমী পাঠকের অধরা।

এ শতকে তাঁর  লেখালেখি নিয়ে আলোচনা নজরে পড়ে কম। শুধুমাত্র শেষ পাঁচটি কবিতার বইয়ের ঋদ্ধিঋণ বাংলাভাষাভাষী হিসেবে  বর্তমান বিনীত প্রতিবেদককে কৃতজ্ঞ করে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গাল্ফ যুদ্ধ ‘যৌবনবাউল’ -এর এই প্রতীতির জায়গাটাকে আরোই দীর্ণ করে দিল, লেখা হল 'আয়না যখন নিঃশ্বাস নেয়' (১৯৯২), 'রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ' (১৯৯৩)-এর মতো বই, যুধ্যমান বিশ্বে কবির বিমূঢ়তা, বিবমিষা। 'যুদ্ধ' হয়ে ওঠে তাঁর কাছে দুই সিলেবলের অশ্লীলতম শব্দ। মানুষের মুখ উৎকীর্ণ হয়, এমন কবিতার প্রতি অকুণ্ঠ আসক্তি প্রকাশ করছেন তাঁর বয়ানে। অবশ্য সেই  মানুষের মাঝখানে 'আলোকতোয়া' নদী আর 'জ্যোতিগৃহ সম্পন্ন' করবার স্বপ্ন ও প্রস্তুতি তাঁকে ছেড়ে যায়নি।  

নতুন শতকে  দ্বিতীয় যন্ত্রবিপ্লব সাধিত হল। মোবাইল, কম্প্যুটার, ইন্টারনেট, আই ফোন, সোশ্যাল  মিডিয়া -শাসিত বিশ্বে কবি অনুসন্ধান করতে লাগলেন প্রাথমিক মানবিক সম্পর্কগুলোকে। পারস্যের কবি হাফিজের অনুরণনে লেখা জার্মান মহাকবি গ্যোয়েটের 'ডিভান' কাব্যের বঙ্গানুবাদ করতে গিয়ে বাউল-সুফি-মরমিয়া-দরবেশদের ভাবলোককে পুনরাবিষ্কার করলেন ‘যৌবনবাউল’। মোবাইলে মুখ-গোঁজা, শপিং মলে কথাহারা ইঙ্গিতে বাজার-করা ভাষাহীনতার যান্ত্রিক পৃথিবীতে আমরা দেখব ‘যৌবনবাউল’ ক্রমশ তাঁর অনাহত প্রতীতির বিদীর্ণ জায়গাটার শুশ্রূষায় নিবিষ্ট। ভোগবাদের মহামারীর বিপরীতে বহিরঙ্গ ছেড়ে চিদঘন অন্তর্লোকের অনুসন্ধানী অলোকরঞ্জন। ‘দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি' (২০১৬) তাঁর এই পর্বের উল্লেখ্য ফসল।

পার্থপ্রতিম দাসের অসামান্য প্রচ্ছদে শোভিত পাঁচ ফর্মা-ছাপানো এই 'দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি' বইয়ের বিভাব কবিতায় কবি লিখছেন,

মনের ভেতর গুমরে ওঠে 

ধাই-মার সেই দাবি

'মাছের কাঁটা পায়ে বিঁধলে

দোলায় চেপে যাবি


দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি 

    গুনতে গুনতে যাবি'... 

প্রথম কবিতার নাম '২০২'।  বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিবিজড়িত ২০২ রাসবিহারী এভিনিউ ঘিরে  "আমাদের তারুণ্যের শেষ তীর্থ 'কবিতা ভবন'।" শ্মশানের অন্য নাম 'পিতৃবন'। এ বইয়ের 'পিতৃবন' কবিতায় তাই পেয়ে যাই তাঁর স্নেহাপ্লুত বাবা বিভূতিরঞ্জন দাশগুপ্তকে, শ্রীমান অলোকরঞ্জনকেই যেন  তিনি চেয়ে চেয়ে দেখছেন তাঁর 'ক্ষমাহীন দুর্বলতায়'। দূরান্বয়ে স্মরণে আসে, কবি শ্রীমধুসূদনের 'মেঘনাদবধকাব্যে'র 'প্রেতপুরী' নামধেয় অষ্টম সর্গে লক্ষ্মণের শক্তিশেলের প্রতিকারকামনায় সশরীরে স্বর্গলোকগামী রামের দর্শন পেয়ে ঊর্ধ্বলোকবাসী পুত্রশোকে লোকান্তরিত দশরথের স্নেহাকুল মুখচ্ছবি, যিনি রামকে দেখে বলে উঠছেন, 'আইলি কি রে এ দুর্গম দেশে / এতদিনে, প্রাণাধিক, দেবের প্রসাদে,/ জুড়াতে এ চক্ষুর্দ্বয়?'।  'পিতৃবন' কবিতায় অলোকরঞ্জন দেখেন, তাঁর পিতার পিছনেই দাঁড়িয়ে পিতামহ দক্ষিণারঞ্জন, 'যৌবনবাউল'-এর সুখ্যাত 'আমার ঠাকুমা' কবিতার সেই 'শহরবিদ্বেষী' মানুষটি,  যিনি সাঁওতাল পরগনার রিখিয়ায় ভিটেপত্তন করে  তাঁর বড়ো নাতি অলোকরঞ্জনের বয়স যখন 'বড়োজোর পনেরো', তখনই সেই জ্যেষ্ঠ পৌত্রের হাতে 'তবু আমায় পারিবারিক দুর্গাপূজার ভার তুলে দিয়েছিলেন'। এভাবেই পরিজনেরা ঘুরে ঘুরে আসেন অলোকরঞ্জনের কবিতায়, যেমন অনুধাবন করেছেন  শঙ্খ ঘোষ ('আমার বন্ধু অলোকরঞ্জন')। আর সেই পরিজনদের সীমা বিস্তারিত হতে হতে চলে দুনিয়াভর, রক্তসম্পর্কহীন  দীনতম বৃদ্ধ মানুষটিও কবির আত্মীয়। 

আর, এ বইতেই টানা গদ্যে লেখা 'অনাবাসী যদি অনুবাদ করে' কবিতায় লিখলেন, 'তুলসীতলার আজলকাজল মায়ামদির নিরাপত্তার ঘেরাটোপ থেকে একবার বেরিয়ে পড়লে ইহমানুষের কপাল থেকে বাস্তুদেবতার আশীর্বাদ চিরতরে অবলুপ্ত হয়ে যায়, তার বরাতে তখন চলতে থাকার চালচিত্তির ছাড়া অন্যতর কোনো বিধিলিপি অবশিষ্ট থাকে না। তখন থেকেই সম্ভবত ভাষাই হয়ে ওঠে মানুষের একমাত্র আবাসন।' হাইডেগার-অনুরণিত এই আভাষণ অলোকরঞ্জনেরই সিলমোহর হয়ে ওঠে আজকের  ভুবনজোড়া শরণার্থীর মেলায়।

অলোকরঞ্জনের কবিতা-বইয়ে শতেক যুগের কবিদলের আনাগোনা, শতেক যুগের গীতিকা হাতে। এ বইয়ের 'স্বরশয্যায়' কবিতায় স্বভাবসম্মিত সৌজন্যেই উপস্থিত শিল্পাচার্য শিলার ও শিষ্য নোভালিস।

'দাহ' কবিতার শেষ দুই চরণ এক মুগ্ধ বিস্ময়ের সামনে আমাদের উপনীত করে: 

      অর্থাৎ কিনা আমার মৃত্যু হয়নি সুচারুভাবে, 

      অর্থাৎ কিনা আমাকে নিয়েই তোমরা দিন কাটাবে..


তাই হোক, তবে তাই হোক, অলোকদা!

'দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি' বইয়ের উপান্ত্য কবিতা 'পালকি করে যারা আমায় নিয়ে চলেছে'তে পাই, তাঁর পালকির বাহকেরাই কখন নিজেদের অজান্তেই তাঁর শববাহক হয়ে উঠেছে। 'আমার হাতে অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি', একটি বাহক, যার নাম হয়ত নিখিল, সে চায়, শেষ বইটির 'অপূর্ণতা পূরণ' করে ছাপতে দিতে, পুঁথি বিষয়ে গবেষণায় যার নাকি ডি. ফিল.'..

আহা, সত্যিই আজ যদি আমরা এমন 'অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি' খুঁজে পেতাম। 'কবিসম্মেলন', 'কবিতা আশ্রম'-সমেত নানা পত্রপত্রিকায় তাঁর  সাম্প্রত শারদ অঞ্জলি এখনও তো গ্রন্থভুক্ত হতে বাকি। দৈববাণীর মতো দূরভাষে ভেসে আসা কিছু কবিতার শ্রুতিলিপিকর তো এই প্রতিবেদকও। 

এ বইয়ের উপান্ত্য কবিতা 'পালকি করে যারা আমায় নিয়ে চলেছে' পড়ে যেই না পাঠক সজলচক্ষু হতে যাবেন, অমনি আসে অলৌকিক শৈলীতে অমোঘ আশ্বাস, বইটির সবশেষ কবিতায়:

আমার জন্য  হা-হুতাশন কোরো না, অরুণাভ,

উত্তরাধিকার সূত্রে পুণ্য পারমিতার 

ছ'পণ কড়ি সঞ্চয়িত আছে আমার দোলায়, 

বাকিটা পথ গুনতে গুনতে যাব!

এ বই কবি উৎসর্গ করেছেন কবি নাসের হোসেন আর বর্তমান প্রতিবেদককে। এ তাঁর উদার কবিচারিত্র‍্যেরই এক মুদ্রা।

৩      

'তোমরা কী চাও, শিউলি না টিউলিপ?' (২০১৭) পরবর্তী বই। উৎসর্গ করা হয়েছে অমিয় দেব এবং সৌরীন ভট্টাচার্যকে। কবির প্রথম পর্বের কবিতা ছিল দেশজ নিসর্গকে নিয়ে, লোকজীবন, আস্তিক্যবোধকে জড়িয়ে। তাকে তিনি শিউলি বলে অভিহিত করছেন। আর উত্তরপর্বের আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া লাগা কবিতা তাঁর টিউলিপ ফুল। পাঠকের কাছে প্রশ্নময় শিরোনাম তাই, 'তোমরা কী চাও, শিউলি না টিউলিপ?' আমরা অবশ্য দুটোই চ্চাই। এক সভায় এমন কথাই জানিয়েছিল এই প্রতিবেদক।

কবির ঠাকুর্দা দিনাজপুরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রধান শিক্ষক দক্ষিণারঞ্জন দাশগুপ্ত অবসর গ্রহণের পর সাঁওতাল পরগনার রিখিয়া গ্রামে নতুন করে ভিটে পত্তন করে  বাস করতে শুরু করেন। পশ্চিমের নিসর্গনন্দিত রিখিয়ায় তিনি যৌথ পরিবারের বসবাসোপযোগী একটি মনোরম পরিসরও নির্মাণ করেন। বড়ো নাতি অলোকের জন্মের পর তিনি সেখানে দুর্গাপূজার প্রচলন করেন, অলোকরঞ্জনের ওপর এই পুজোর ভারও দিয়ে যান তিনি। পুজো উপলক্ষ্যে বৃহৎ যৌথ পরিবারের সবাই সেখানে জড়ো হত। অলোকরঞ্জনের শৈশব-কৈশোরের অনেক স্মৃতি রিখিয়ার সঙ্গে যুক্ত, ‘যৌবনবাউল’-এর বহু কবিতায় রিখিয়া, বাবুডি, আমরুয়া, চানন নদী,  হিরনা টিলা, ত্রিকূট পাহাড় সহ এখানকার নিসর্গ ও লোকজীবনের ছবি। প্রায় চল্লিশ বছর চলেছিল এই বসতবাড়ির পুজো। বইটির বিভাব কবিতাতেই আমরা তাই দেখব,  'বসত বাড়ির শেষ বারকার পুজোয়/ শেফালিকার শুভ্র আগুনটাকে/ চয়ন করে বেরিয়ে পড়লাম/ প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে'। এই বেরিয়ে পড়া থামল এক ভিনদেশের গাঁয়ে, 'সেখানে দেখি অজস্র টিউলিপ/ যা শুধু লাগে নশ্বরের কাজে'। শিউলি পূজার উপচার, অন্যদিকে টিউলিপের তেমন কোনো আধ্যাত্মিক গরিমা নেই, নশ্বরের কাজেই তার ব্যবহার। মরমী কবির প্রথম পর্বের কবিতা যদি অতীন্দ্রিয়তায় লগ্ন, পরবর্তীতে তাঁর কবিতায় নৈমিত্তিকের নশ্বর সৌন্দর্য ও কদর্যতার অভিক্ষেপ। 

উত্তরপর্বে তাঁর কবিতায় আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া লাগলেও কবি স্বদেশের সঙ্গে নিরন্তর সংলাপরত। বাংলা ভাষাই হয়ে ওঠে তাঁর আবাসন। দেশজ আচার, পার্বণ আরো নতুন তাৎপর্য পায় তাঁর কবিতায়। 

'ভাইফোঁটার দেয়ালটা' কবিতায় বিচ্ছিন্ন পৃথিবীতে প্রয়াত মেজদির জন্য প্রবাসী ভাইদের বেদনা এক চিত্রপ্রদর্শনী হয়ে ওঠে কবির অননুকরণীয় শৈলীতে: 'মেজদি মারা গেলে আমরা ছ-ভাই যথারীতি প্রথানুগত সম্ভ্রমে টালিগঞ্জের/ পোড়ো সেই বাড়িটায় জড়ো হয়েছিলাম। বাপুয়া এসেছিল ব্রেজিল থেকে/ বিবদমান দুই শিবিরের মধ্যে সাময়িক মোকাবিলা/ স্থগিত রেখে ৷ লিবিয়ায় ভ্রাতযুদ্ধে শামিল হয়ে ডানচক্ষু/ জখম হওয়া সত্ত্বেও স্বয়ং পিন্টু এসে হাজির, তাকে আগলিয়ে/ ধরে ধরে এনেছিল বাদল আর বুলবুল ৷ গোরা আজকাল কানে/ শুনতেই পায় না, তবু একে-ওকে জিগ্‌গেস করে শেষ মুহূর্তে কী করে জানি হাজিরা দিল।/ পাশের বাড়ির মালি তালা খুলে আমাদের নিয়ে গেল চোরাগোপ্তা/ একটি কুঠুরিতে যার একটাই মাত্র দেয়াল । যে সব ভাই ভাইফোঁটার দিন/ আসতে পারেনি সেই দেয়াল জুড়ে তাদের জন্য মেজদির দেওয়া চন্দনের ফোঁটা থরে থরে বিকীর্ণ রয়েছে!/প্রথমে অনপনেয় যুদ্ধাপরাধীর মতো নিজেকে মনে হলেও পরক্ষণে মনে হল/এ আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্রপ্রদর্শনী'। 

লিটল ম্যাগাজিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বরাবরই আশাবাদী অলোকরঞ্জন। শেষ দিকে মূলত লিটল ম্যাগাজিনেই লিখেছেন। 'অমৃতলোক' পত্রিকার প্রয়াত সম্পাদক সমীরণ মজুমদারকে নিয়ে একটি কবিতা আছে এ বইতে।  শেষ দু-লাইন, 

'পরবর্তী বিশেষ সংখ্যার জন্য অভিমন্যুতার     অভিমানে

সে যেন আমৃত্যু লেখে লিটল ম্যাগাজিনের      টানে।'

                                                             ('সমীরণ মজুমদার')

অভিমন্যুর পুরাণপ্রতিমা শেষ দশকে তাঁর খুব প্রিয় হয়ে উঠেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, জয়-পরাজয় বলে কিছু হয় না, নিজের সত্যের কাছে সত্যবান থাকাটাই জয়। অভিমন্যুর মতো তিনি নিজেকে দ্বিতীয় বিজয়ী বলে দেখতে চান। শেষ দিকে তাঁর ভয়, কলকাতায় এলে আমি বাংলা ভুলে যাব।…আমি যদি কলকাতা থেকে দূরে কোথাও প্রয়াত হই, আমার স্মৃতির কলকাতা বুকে নিয়ে সানন্দে মরে যাব।' ('সন্ধিক্ষণের সাক্ষাৎকার', নাচের আড়ালে লুকিয়ে কে ছায়ানট?, ২০১৬)

এ বইয়ের শেষ কবিতা সদ্যপ্রয়াত কবিবন্ধু আলোক সরকারের স্মৃতিতে অনুস্যূত:

না-দেখা সে-ও আরেক দেখা

আসন্ন বই মেলার মুখে 

শরৎমেঘের সিংহদুয়ার 

তীর্ণ হয়ে চলে গেলেন আলোক সরকার;


লিটল ম্যাগাজিনের মুখে 

আজ নিদারুণ উত্তেজনা: 

এই তো সময় বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করবার


বস্টনের দিক থেকে 

যেই নায়েগ্রা দেখছিল আলোক 

কানাডা থেকে একই প্রপাত দেখতে গিয়ে পুষ্পস্তবক


বন্ধুকে দিই কৃতাঞ্জলি-

ক্ষীণ সাহসে তাই তো বলি:

না-দেখা সে-ও আরেক দেখা, আমার এ শোক হোক-না শোলোক!

এ কবিতা আমাদের অনিবার্যত মনে পড়ায় অনেক আগে লেখা ‘আলোক সরকার' নামের কবিতাকে। নায়েগ্রা জলপ্রপাতের  নিসর্গ দেখে উচ্ছ্বসিত আলোক সরকার বন্ধু অলোকরঞ্জনকে ফোন করেন, তারই পটভূমিতে লেখা হয়েছিল কবিতাটি।

৪

'শুকতারার আলোয় পড়ি বিপর্যয়ের চিঠি' (২০১৮) তাঁর পরবর্তী বই। 'গিলোটিনে আলপনা' বা 'মরমী করাতে'র মতো এ বইয়ের নামকরণেও বিরোধাভাস ।  আত্মপ্রতিবাদের ঐক্যই যার মূলসূত্র। এই বিপর্যাসের টানে আশাবাদও ধূসরিম হয়ে ওঠে তাঁর কবিতায় :

কারুক্কে বলিনি তা:

আমার ভিতরে

এক ধরনের ধূসরিম আশাবাদ 

তৈরি হতে চলেছে


ধূর্ত অতনু আকাশে-বাতাসে 

এই খবরটা রটিয়ে দেওয়ার আগে 

স্বর্ণিল আশাবাদের ওপর লিখে চলি আমি 

কবিতা কবিতা কবিতা              ('বিপর্যাস')

তাঁর শিকড়চেতনা সংলগ্ন হয় বিশ্বজোড়া শরণার্থীচেতনার সঙ্গে।  সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা শরণার্থী-সংকটে তিনি স্মরণ করেন  আরাকান রাজসভায় মধ্যযুগের বাঙালি কবি সৈয়দ আলাওলের কথা, 'যেমন কিনা সৈয়দ আলাওল/ পেরিয়েছিলেন পথের ডামাডোল' ('রোহিঙ্গা! রোহিঙ্গা!')

তবু বিশ্বসংকট ও বিপর্যয়েও তিনি শুদ্ধ কবিতার শুকতারার আলোকে ভুলতে পারেন না। প্রাচীন গ্রিসের মাউন্ট হেলিকনের আবহমান ধারায় অভিস্নাত হোমার, স্যাফো, সোফোক্লেসের অনুগামী কবি :

    আবহমান

    কোথায় কবে শুনেছিলাম মাউন্ট হেলিকন

     রয়েছে গ্রিসে, তারি হৃদয় থেকে 

     ঝরনা হয়ে কবিতা নামে যার শ্রুতিলিখন


            করে গেছেন হোমার, স্যাফো, সোফোক্লেস; 

            আরও আমার অনেক শতেক পূর্বসূরি,

             আমার যতেক পদ্য লেখা তাঁদের কাছেই চুরি।


              হেলিকনের মুক্তধারা একটু আগেই আমায় 

               বিসর্পিল বলল এঁকেবেঁকে :

           ‘একটি নতুন কবিতা চাই তোমার হাত থেকে।'

গ্রিসের মিথসঞ্জাত হেলিকন অনায়াসেই মিশে যায় কবির নিজস্ব রাবীন্দ্রিক মুক্তধারার মুক্তিস্রোতে।

'নিজেকে খুঁজতে গিয়ে' কবিতায় পাচ্ছি পূর্বসূরি গ্যোয়েটেকে, মিকেলেঞ্জেলো বা রাফায়েল নয়, 'নিছক রক্তের টানে'ই তাঁর গ্যোয়েটের সন্ধান রোমে। প্রসঙ্গত, হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল 'গ্যোয়েটে ও রবীন্দ্রনাথ', জার্মানির সর্বোচ্চ গ্যোয়েটে পুরস্কারেও তিনি বৃত। হাইনে, রিলকে, হ্যোল্ডারলিনের মতো গ্যোয়েটের কবিকৃতির তিনি মূল জার্মান থেকে বঙ্গানুবাদ করেছেন।

৫

ঝাউ-শিরীষের শীর্ষ সম্মেলনে (২০১৯) অলোকরঞ্জনের উপান্ত্য বই। অনুজ কবি হিন্দোল ভট্টাচার্য এবং পার্থপ্রিয় বসুকে উৎসর্গ করা। 'বিভাব কবিতা' বিষয়টি বাংলা কবিতায় তাঁরই সংযোজন। অনুজ অনেক প্রধান কবি তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তাঁদের বইয়ে বিভাব কবিতা যোগ করেছেন। এ বইয়ের বিভাব কবিতায় আমরা দেখব, পরিবেশ-সচেতন অলোকরঞ্জনকে, যিনি ঝাউ-শিরীষের শীর্ষ সম্মেলনে গিয়ে দেখছেন একটিও গাছ নেই!  আমরা জানি, ইতিমধ্যেই তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছেন পরিবেশবাদী জার্মান কবি সারা কীর্শের কবিতা।  আর ‘যৌবনবাউল’-এর দিন থেকেই তাঁর দর্শনে, 'বৃক্ষের বিষাদনেত্রে আয়ত পত্রের অশ্রু ঝরে।' উল্লিখিত এই বিভাব কবিতার শেষে দেখছি অবশ্য, 

             এক হাজার কবিতার স্পন্দনে 

             আচম্বিতে লক্ষ করা গেল 

             চোখের সামনে অমূর্ত গোলাপ

              আত্মসমালোচনার ঢঙে কবিদের নার্সিসাসবৃত্তিকেও দায়বিদ্ধ হতে হয়,

                     আর নার্সিসাস আমরা এখনও পদ্যের চর্চা করি, 

                     তবে কিনা প্রত্যেকেই পড়ি শুধু নিজের কবিতা!

এ বইয়ের শেষে অনুস্যূত হয়েছে রাজেশ্বরী দত্তের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে একটি অসামান্য দীর্ঘ কবিতা 'রাজেশ্বরী : একটি শোকগাথা'। কবি উপনীত এমন এক দুনিয়ায়, যেখানে হোয়াটসঅ্যাপ, ইউ-টিউব, স্মার্ট ফোনের তড়িঘড়ি সংযোগময়তার দৌলতে বসুন্ধরা থেকে 'নির্বাসিত নিভৃত পৃথিবী' :

            তখন তো হোয়াট্স-অ্যাপ ইউ-টিউব কিংবা স্মার্ট ফোন 

            ইত্যাদি ছিল না, আজ ঘরে ঘরে এসেছে ডিভিডি, 

           কারুরই দরকার নেই, ধরিত্রীর সঙ্গে সরাসরি 

           বনিবনা ঘটে যায় মুহূর্তেই আর যার ফলে 

           বসুন্ধরা থেকে আজ নির্বাসিত নিভৃত পৃথিবী।       


     এ কবিতা শেষ হচ্ছে, 

              আমার গহন কুলুঙ্গিতে রাত্রিদিন কয়েকটি মোম জ্বলে 


উদযাপনের উল্লাসে নয়, নিছক বেঁচে থাকার কৌতূহলে।

দ্বিতীয় পাঠে এই শেষ দু লাইনের প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্যও চোখে পড়তে বাধ্য। দুটি চরণেই ১০+১২ বাইশ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দ । উদ্ধৃত প্রথম লাইনে ৩+৩+৪ এবং ৪+৪+২+২ এর সরল, প্রথানুগত বিন্যাস। কিন্তু দ্বিতীয় লাইনে তা ভেঙে যাচ্ছে ৫+৩+২ আর ৩+২+৩+৪ এর বিপ্লবে।

সেই কারণেই হয়তো অপ্রেম আর সংকটের পৃথিবীতে বসেও এ বইয়ে বলেন, 'অপ্রেমে ধরণী/ ক্লিন্ন হয়ে যাবে, তবু ছন্দ লিখতে হবে।' অবশ্য এই অন্ত্য পর্বে গদ্যে লেখা কবিতাও তাঁর কম নয়। কবির কাজ গোষ্ঠীর ভাষাকে অমলিন রাখা। গত ষাট-সত্তর বছরে যে-স্বল্পসংখ্যক গুণিজন বাংলাভাষার শ্রীবৃদ্ধি সাধনে ব্রতী, অলোকরঞ্জন তাঁদের অন্যতম। নতুন নতুন সমাসবদ্ধ পদ বা প্রতিশব্দ নির্মাণই শুধু নয়, কবি ব্যবহার করেন মান্য বাংলায় অধুনা-অপ্রচলিত মধ্যযুগীয় শব্দ অথবা লোকভাষার শব্দ। এ বইতে যেমন এসেছে মাস্তুল শব্দের প্রতিশব্দ 'মালুমকাঠ' ( 'প্রতিশব্দেরা')। বাংলাভাষার মালুমকাঠগুলিকে এইভাবে চিনে নেন কবি। 'ভিসা ও ভবিষ্যৎ' কবিতায় এক অবিস্মরণীয় চিত্রকল্পে দেখি, তাঁর লুপ্ত ভিটের লাইব্রেরিতে রেখে যাওয়া দ্বিজ মাধবের পুঁথি এক কামিনী ফুলের ঝাড় হয়ে ফুটে আছে। 

৬

বাস্তুহারার পাহাড়তলি (২০২০) আপাতত তাঁর শেষ বই। ইতিমধ্যে অভূতপূর্ব এক অতিমারির কবলে পৃথিবী কম্পমান। সংবেদনশীল কবির অনুভূতিকে তা স্পর্শ করে স্বভাবতই। তার ছাপ এ বইয়ে।

আজীবন ভারতীয় নাগরিকতা এবং পাশপোর্ট বজায় রাখা কবি শেষ ক’বছরে দেশে ফিরতেন বছরের শেষে ডিসেম্বরে, আর জার্মানির হির্শবার্গে তাঁর আবাসনে ফিরে যেতেন পরের বছরের শুরুতে, কলকাতা বইমেলার পরে। শেষ ফিরে যাওয়া ২০১৯ এর গোড়ায়। ২০১৯ এর শেষে মেরুদণ্ডের অপারেশনের কারণে তাঁর আসা নিষেধ ছিল। ২০২০ তে তো বিশ্ব পড়ল অতিমারির কবলে। তার মাঝখানেই ১৭ নভেম্বর, ২০২০ তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ। মাসখানিক আগে ৬ অক্টোবর তিনি অষ্টআশি বছরে পা দিয়েছিলেন। যদিও লেখালেখি বা চল্যাবলায় তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ  সৃজনশীল ও সুস্থ। জন্মদিনের ঠিক আগে চলে গেলেন তাঁর আদরের ছোট বোন ছন্দা ( ৫ অক্টোবর, ২০২০ )।  একটি বৃহৎ পরিবারের 'বড়দা' অলোকরঞ্জন হয়তো তাঁর সবচেয়ে ছোটো বোন ছন্দার মৃত্যুশোক সামলাতে পারেননি। শেষবার ফোন করেছিলেন বোনের চলে যাওয়ার সংবাদ দিয়েই।

এই বই উৎসর্গ করা হয়েছে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে নব্য ভারততত্ত্ব বিভাগে তাঁর উত্তরসুরি এবং প্রিয়শিষ্য হান্স হার্ডার এবং তাঁর স্ত্রী আন্দ্রেয়াকে। 

অলোকরঞ্জনের পারিবারিক শিকড় ঢাকা বিক্রমপুরের তেলিরবাগে। আমরা আগেই দেখেছি, তাঁর ঠাকুর্দা দক্ষিণারঞ্জন দাশগুপ্ত পশ্চিমের সাঁওতাল পরগনার রিখিয়ায় নতুন করে ভিটেপত্তন করেন। অলোকরঞ্জনের জন্ম অবশ্য কলকাতায়, যদিও রিখিয়া-শান্তিনিকেতনে তাঁর শৈশব-কৈশোরের অনেকটা কেটেছে। তাঁর শিকড়চেতনা ক্রমশ মিশেছে বিশ্বজোড়া বাস্তুহারা মানুষের শরণার্থীচেতনায়।

গদ্যে লেখা এ বইয়ের বিভাব কবিতায় দেখব, 'এতদিন ধরে অন্তরঙ্গ যে সমস্ত আশ্রয়প্রার্থীদের নিয়ে পথ চলছিলাম একে একে তাদের নিজস্ব জন্মভিটেয় নামিয়ে দিয়ে ভ্যানুইবের সৈকত ঘেঁষে বাসটা আমায় পৌছিয়ে দিল অস্তাচলে বাভারিয়া জঙ্গলের মনঃপূত একটি পরিসরে। পাহাড়তলির পর পাহাড়তলি দিয়ে গাঁথা এই জায়গাটা যেন আমার জন্যেই নির্বাচিত হয়েছিল।' প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রগবেষক অলোকরঞ্জন আগে দেখিয়েছেন, এই বাভারিয়ার জঙ্গলেই ১৯২৬ সালে 'ছোটো কথার ঝাঁকে' আক্রান্ত জার্মানপ্রবাসী রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন আত্ম-উদ্বোধনের সেই আলোকিত গানটি, 'আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে'। 

বিভাব কবিতায় আমরা আরো দেখব, তাঁর যত্ন-আত্তির একবিন্দু বিরাম নেই। ক্ষণে ক্ষণে শরীরের তাপমাত্রা মেপে দেখা হচ্ছে । দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আগত এক নার্স বৌদ্ধ হবে বলে কবির কাছে  শিখছে পালি ভাষা। কবি বলছেন, 'না, এখন থেকে প্রকাশ্য কোনো আলোচনাচক্রে যোগ দিতে আমি যাব না আর। মাত্র ন-দশটি পুথি-পত্তরসুদ্ধু একটিমাত্র নৌকো নোঙরে বেঁধে রেখে দিয়েছি, এইমাত্র। ধরিত্রী আমার ভঙ্গুর ভ্রূযুগ সন্ধিক্ষণে তার বরণডালা ছুইয়ে দিয়ে এক লহমা তাকাতেই আমার শিরা-উপশিরায় বেজে উঠল আমার সমগ্র বাঁচার সজল পিছুটান।' এমনতরো প্রসন্ন বিশ্রাম বা বিদায়ের প্রস্তাবনা দিয়েই সূচিত হয় বইটি। 

সংগীতের মতো শিল্পস্থাপত্যকলারও তিনি ভিতরমহলের বাসিন্দা কবি। তাঁর কাব্যপ্রবাহে যেমন সংগীতের নানা রাগরাগিণী, বিভিন্ন রবীন্দ্রগানের অজস্র উল্লেখ, তেমনি আছে রোমের ধ্রুপদী স্থাপত্য, সিস্টিন চ্যাপেল বা মিকেলেঞ্জেলোর নানা শিল্পসুকৃতির কথা। রবীন্দ্রনাথ এবং অমিয় চক্রবর্তীর পরে তাঁকেই আমাদের সর্বশেষ আন্তর্জাতিক কবি হিসেবে বর্ণনা করেছেন কেউ কেউ। তাঁর কবিতায় হিন্দু মিথোলজির পাশাপাশি ইসলামীয় বা খ্রিস্টীয় মিথ এসেছে অনায়াসে। 

২০১৯ এর ১৫ এপ্রিল এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপকভাবে  ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্যারিসের শিল্পসুষমামণ্ডিত নতরে দাম (Notre Dam) গির্জা। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের উদ্যোগে জোরকদমে চলছে সংস্কারের প্রকল্প। এ বইয়ের প্রথম কবিতা ‘ধ্বংস ও প্রজাপতি'তে দেখছি আমাদের আশাবাদী কবিকে। তিনি প্যারিসে এসে দেখছেন ঝলসে যাওয়া নতরে দাম চার্চ। তার সামনে অবশ্য কিশোর চারণ কবির দল গান গাইছে ধ্বংস থেকে পুনরুজ্জীবনের আশায়। ধ্বস্ত চার্চের মতো প্রবীণ কবির নিজেকেও মনে হচ্ছে এক ধ্বংসাবশেষ। তবু কিশোরদের যৌথ সংগীতের লহরীতে কবি আত্মশক্তিতে ভর দিয়ে দাঁড়ান,

           'তবুও যদি শেষ কবিতা প্রলয়কালের মেঘে 

           লিখে উঠতে না পারি তবে কী হবে বেঁচে থেকে?'

আর তক্ষুনি উঠে আসছে অমোঘ এই মৃত্যুঞ্জয়ী উচ্চারণ, কবিতার শেষ দুই চরণে :

           'আমার ডান কনুই ঘেষে মৃত্যুপরোয়ানা

           খারিজ করে কাঁপতে থাকে প্রজাপতির ডানা…'

তাঁর প্রিয় জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের কথা এ বইতেও স্বভাবতই উঠে এসেছে, “কবিদের সর্বাগ্রণী দার্শনিক তুমি, তুমিই তো/ শিখিয়েছ 'মানুষের অস্তিত্বের আবাসন ভাষা'--। প্রসঙ্গত 'মার্টিন হাইডেগার' শীর্ষক এ কবিতার প্রথম পাঠক এই প্রতিবেদক, যাঁর কাছে দূরভাষে এ কবিতাটি ভেসে এসেছিল। বস্তুত হাইডেগারের এই সদুক্তি আমাদের কবির কাছে প্রায় বীজমন্ত্রের মতো। ‘দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি' (২০২৬) বইয়ের টানা গদ্যে লেখা 'অনাবাসী যদি অনুবাদ করে' কবিতাতেও এই কথাটি উঠে এসেছে। অলোকরঞ্জনের দীর্ঘ প্রবাসজীবনে মাতৃভাষার সাধনাই তাঁর আশ্রয়স্থল। বাংলাভাষায় নতুন পরিভাষা বা শব্দনির্মাণ, নতুন ধরনের বাক্যগঠন তাঁর সারাজীবনের ব্রত। 'টেলি-অপারেটর' কবিতায় অপারেটরের যান্ত্রিক হিন্দিঘেঁষা বাংলা শুনে তিনি লেখেন, 'তাঁকে বললাম আমি কিন্তু/ নতুন রকম এই বাংলায়/ অনভ্যস্ত। বিভিন্ন কবিতায় এসেছে শিলার, কাফকা থেকে দীর্ঘজীবী জার্মান কবি এনৎসেনবার্গারের কথা। এসেছে মেহগনির টেবিলে যোজনজোড়া প্রাতরাশের মধ্যেও কবির 'মহামারীর থিমটা' নিয়েই লিখে চলার কথাও। এভাবেই শাশ্বত আর নৈমিত্তিক একাকার হয়ে আসে অলোকরঞ্জনের উত্তরপর্বের কবিতায়। 

তাই বুঝি 'ধ্রুব সংশয়', 'বিষণ্ণ কৌতুক' বা 'সুভদ্র প্রতিশোধ'-এর মতো অক্সিমোরনগুলো এ বইতেও উঠে আসে আমাদের এই ক্ষুভিত সময়কে ঘিরে উদ্যত বিরোধাভাসের দ্যোতনা নিয়ে। 

এ বইয়ের উপান্ত্য কবিতার নাম তাৎপর্যপূর্ণভাবে 'বয়েসের নিকুচি'। শ্রীমতী ট্রুডবার্টা দাশগুপ্তের প্রয়াণের পর অশীতিপর অলোকরঞ্জন হির্শবার্গে তাঁর বাড়িতে একাই থাকতেন। বিদ্যাচর্চা, ছাত্রদের পঠনপাঠন আর গোটা ইয়োরোপ জুড়ে নানা সেমিনারে যোগ দিয়ে।  দোতলায় তাঁর লাইব্রেরি। সিঁড়ি ভেঙে এই লাইব্রেরিতে উঠতে গিয়ে মেরুদণ্ডে চোট পান কবি, ২০১৯ এর ডিসেম্বরে তাঁর কলকাতায় ফেরা স্থগিত হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গটি এ কবিতায় এসেছে, 'সিঁড়ি আমায় ভাঙতে পারে এই ভেবে আর সিঁড়ি ভাঙি না--'।  

কবি 'feedback’ কথাটার এক মজাদার প্রতিশব্দ করেছিলে, 'প্রত্যাহার' (প্রতি+আহার)। তাঁর নিজস্ব বাকশৈলীতে। আজীবন পাঠকদের এই ফিডব্যাক বা পাঠ-প্রতিক্রিয়ার জন্যে উন্মুখ থাকতেন প্রবাসী  অলোকরঞ্জন। এ কবিতার শেষে তাই দেখতে পাচ্ছি, 

'লিখছি হাজার সংলাপিকা, তোরা যখন বোবা রইলি/… জিইয়ে রেখে দিয়েছি আমি নিজস্ব এক বাকশৈলী।'

এক বছর হল অলোকরঞ্জন লোকান্তরিত। রয়ে গেল তাঁর বাকশৈলী, সোনার তরী ভরা তাঁর মহনীয় কাব্যসম্ভার। আমাদের দৃকপাতের প্রতীক্ষায়। পুলিনবিহারী সেনের প্রয়াণে অলোকরঞ্জন লিখেছিলেন 'সন্ন্যাসীর মৃত্যু হলে কাকে যাব সান্ত্বনা জানাতে?' (বইয়ের নাম 'রিখিয়া থেকে অনেক দূরে') শীর্ষক এক অনবদ্য গদ্য। সেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, পুলিনবিহারীর মৃত্যুশোকে ভেঙে পড়া আরব্ধ কাজগুলোকে এড়িয়ে যাবার খঞ্জ অছিলা ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারে। একইরকম ভাবে, এখন সময় হা-হুতাশের নয়, অলোকরঞ্জনের কবিতাকে নিবিড়ভাবে পাঠের, বাংলা কবিতার এই অর্হণীয় উত্তরাধিকারকে অন্তরের অন্তঃস্থলে অভিষিক্ত করবার।

Monday, November 15, 2021

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | দ্বিতীয় পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”


৫

একান্ত আপনজনের মৃত্যু সম্বন্ধে লিখতে গেলে একটা দূরত্বের প্রয়োজন, সময়ের দূরত্ব। ঘটনাটা যেন অনেক পুরোনো হয়, লেখনি নিজে যতটা প্রাচীন, ততটা। তাই এ লেখার কাজে হাত দিতেই গলার কাছে কি যেন একটা দলা পাকিয়ে উঠল। বিষয়গুলো এক এক করে নির্দিষ্ট করে নেওয়ার কথা ভাবতেই আমি ভয়ে কেঁপে উঠলাম, তারপর সেগুলো লিখতে গিয়ে ভীষণ বিব্রত বোধ করছিলাম আর তাদের ফিরে পড়তে গিয়ে একেবারে হতোদ্যম হয়ে পড়লাম। আসলে, আমার বাবার খ্যাতিই এই লেখার ক্ষেত্রে মানসিক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করছিল। লেখার প্রয়োজনীয়তার চেয়েও তখন বড় হয়ে দাঁড়াল আমার দ্বিধা। মনের মধ্যে বারবার সন্দেহ হচ্ছিল, আজকের মধ্যমেধার বাজারে নিজের খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি না তো। তার চেয়ে বোধহয় খ্যাতির অন্তরালে থেকে না লেখাই ভালো ছিল। আসলে তো আমি আড়ালে থাকাটাই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। কিন্তু লেখনির ক্ষেত্রে যা ঘটে, লেখক বিষয়কে নয় বরং বিষয় লেখককে বেছে নেয় আর তখন সমস্ত বাধাই অকৃতকার্য হয়ে যায়।

মাস কয়েক আগে এক বান্ধবী আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, স্মৃতিশক্তি হারিয়ে আমার বাবা কেমন আছেন? তাকে বললাম, তিনি শুধুমাত্র বর্তমান সময়ে বেঁচে আছেন, অতীতের বোঝা নেই, ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাও নেই। অতীতের অভিজ্ঞতার উপর ভর করে বা গল্পের অন্যতম উৎসের মতো পূর্ব অভিজ্ঞতার বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যে ভবিষ্যতের দর্শন, তাঁর জীবনে তার আর কোনও ভূমিকা নেই। 

-তাহলে তিনি বুঝতে পারছেন না যে মারা যাবেন, বান্ধবীটি বলল, কি সৌভাগ্যবান!

বান্ধবীকে যা বলেছিলাম তা প্রকৃত বাস্তবের একটি সরলিকৃত অংশ মাত্র। বাবার চৈতন্যে তখনও পর্যন্ত অতীতের ছাপ রয়ে গিয়েছিল। যেমন ভাবে আগে অন্যদের সঙ্গে কথা বলতেন, একটার পর একটা প্রশ্ন করে, ‘কেমন আছো?’ ‘এখন কোথায় থাকো?’, ‘বাড়ির সবাই কেমন আছে?’, সেই অভ্যাসের প্রতিধ্বনির মতো তিনি কথা বলে যেতেন। কিন্তু মাঝে মাঝে আরেকটু বেশি কিছু বলতে যেতেন, আর তখনই খেই হারিয়ে ফেলতেন মাঝপথে। ভুলে যেতেন কি নিয়ে কথা বলছিলেন আর চুপ করে যেতেন। তখন তাঁর সেই বিভ্রান্ত অবস্থা (সিগারেটের ধোঁয়ার ক্ষণিক উপস্থিতির মতোই তাঁর মুখে লজ্জার অরুণাভা মুহূর্তের জন্য খেলা করে যেত) দেখে বোঝা যেত এরকমভাবে কথা বলে যাওয়াটা একসময় তাঁর কাছে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার মতোই স্বাভাবিক ছিল। রসিকতা, আনন্দ, স্মৃতিমেদুরতা আর উত্তেজনায় ভরপুর সেই সব কথোপকথন। তাঁর সব বর্ষীয়ান বন্ধুরা বলতেন যে তিনি লেখায় যেমন আলাপেও তেমন সমান প্রতিভাধর। ভবিষ্যতের ভাবনাও যে পুরোপুরি ত্যাগ করেছিলেন এমনটা নয়। সন্ধ্যে হলে মাঝে মাঝেই জিজ্ঞাসা করতেন, ‘আজ রাতে আমরা কোথায় যাব? বেশ আনন্দ হয় তেমন একটা জায়গায় যাওয়া যাক। চলো নাচতে যাই। কেন? কেন নয়?’ প্রসঙ্গটা একটু পালটে দিলেই ভুলে যেতেন কি বলছিলেন এতক্ষণ।  

বাবা মাকে চিনতে পারতেন আর কত নামে যে তাঁকে ডাকতেন: মেচে, মেরসেদেস, জননী, লা মাদ্রে সান্তা। কিন্তু কিছু দিন আগে কয়েক মাসের জন্য পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়েছিল। তখন সারা জীবনের সঙ্গিনী নিজের স্ত্রীর কথা মনে করতে পারলেও সামনে যে মহিলাটি রয়েছেন, তিনি-ই যে তাঁর স্ত্রী, সেকথা হাজারবার বললেও বিশ্বাস করতে পারতেন না। 

-এই মেয়েটি আমার কেউ নয়, তবে কেন সে এখানে রয়েছে আর বাড়ির সব কাজ দেখাশোনা করছে?

মা তখন রেগে উঠতেন। 

-‘কি হয়েছে ওর?’ অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞাসা করতেন। 

-বাবা এটা করছে না মা, করছে ওঁর ডিমেন্সিয়া।

মা আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি তাঁকে ভুল বোঝাচ্ছি। আশ্চর্যজনকভাবে এই পর্যায়টা কেটে গেল এবং বাবার স্মৃতিতে মা আবার তাঁর নিজের জায়গা ফিরে পেলেন, তাঁর সেই আজীবনের সহচরী। সেটাই ছিল তাঁদের শেষ বন্ধন। তাঁর সেক্রেটারি, গাড়ির চালক, রাঁধুনি-- যাঁরা দীর্ঘদিন এ বাড়িতে কাজ করেছেন তাঁদের সবাইকে চিনতে পারতেন। তাঁরা সবাই ছিলেন কাছের মানুষ, পছন্দের মানুষ, যাঁরা তাঁকে আগলে রাখবেন। কিন্তু কারুর নাম মনে রাখতে পারতেন না। আমি আর আমার ভাই যখন তাঁকে দেখতে যেতাম খুব সতর্কভাবে অনেকক্ষণ ধরে আমাদের দেখতেন, যেন একটা প্রবল কৌতূহলের ব্যাপার। আমাদের মুখ দেখে বহুদিন আগের কিছু একটা মনে পড়ত হয়তো, কিন্তু আর আমাদের চিনতে পারতেন না। 

-পাশের ঘরে ওরা কারা? কর্মচারীদের একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন।

-আপনার ছেলেরা।

-সত্যি? ওই লোকগুলো? ধুর ছাই, বিশ্বাসই করা যায় না। 

বছর দুয়েক আগে একটা ভয়ংকর দুঃসময় এসেছিল আমাদের জীবনে। বাবা তখন পরিষ্কার বুঝতে পারছিলেন যে ধীরে ধীরে তাঁর স্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। এই কথাটা বার বার বলতেন আর সমানে আমাদের সাহায্য চাইতেন। একটা মানুষকে ওই চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে দেখা এবং একই কথার বারংবার পুনরাবৃত্তি সহ্য করা যে কি ভয়ানক! বাবা বলতেন, ‘আমার কাজই হল স্মৃতিকে নিয়ে। স্মৃতি হচ্ছে আমার কাজ করার যন্ত্র ও প্রাথমিক উপাদান। সেই স্মৃতি ছাড়া আমি কাজ করতে পারব না, তোমরা আমায় দয়া করে সাহায্য করো।’ তারপর এই কথাটাই বিভিন্ন ভাবে বলে যেতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। খুবই বিধ্বস্ত হয়ে পড়তেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পর্যায়টা চলে গেল। খানিকটা শান্ত হয়েছিলেন আর মাঝে মাঝে বলতেন:

-আমার স্মৃতিভ্রংশ হচ্ছে, কিন্তু তা যে হারিয়ে ফেলছি সৌভাগ্যক্রমে সেটাই আমি ভুলে যাচ্ছি।

অথবা,

-সবাই এমন করে যেন আমি একটা বাচ্চা ছেলে। তবে সেটা আমার মন্দ লাগে না।  

বাবার সেক্রেটারি আমাকে বলেছিলেন, একদিন বিকেলে তাঁকে দেখতে পান বাগানের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে, তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ বহু দূরে, গভীর কোনও ভাবনায় যেন ডুবে আছেন। 

-এখানে কি করছেন, দোন গাব্রিয়েল?

-কাঁদছি।

-কাঁদছেন? কই না তো?

-হ্যাঁ কাঁদছি, তবে চোখ দিয়ে জল পড়ছে না। বুঝতে পারছ না যে আমার মাথায় আর কিছুই নেই?  

 আরেকদিন সেক্রেটারিকে বললেন:

-এটা আমার বাড়ি নয়। আমি আমার বাড়ি যাব। আমার বাবার বাড়িতে। সেখানে বাবার খাটের পাশেই আমার খাট আছে। 

 আমাদের সন্দেহ হচ্ছিল যে উনি বাবার কথা নয়, বলছিলেন দাদামশাই কর্নেলের কথা (কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার চরিত্র যাঁর আদলে গঠিত)। আট বছর বয়স পর্যন্ত তিনি দাদুর সঙ্গে ছিলেন এবং তিনিই তাঁকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁর খাটের পাশে একটা ছোট্ট তোষকের উপর আমার বাবা ঘুমোতেন। ১৯৩৫ সালের পরে আর তাঁদের দেখা হয়নি।

-এরকমই অবস্থা হয়েছিল আপনার বাবার, তাঁর সহকারী আমায় বলেছিলেন, কি সুন্দরভাবে সব কিছু বলতেন, এমনকি ভয়ংকর ব্যাপারও। 

৬

একদিন সকালে চিকিৎসা সঙ্ক্রান্ত জিনিষপত্র ভাড়া দেয় এমন একটি কোম্পানির এক মহিলা কর্মচারী এসে একটা খাট দিয়ে গেলেন। বাবার সেক্রেটারির নির্দেশ অনুসারে তিনি সেটাকে গেস্টরুমে রাখলেন। কিছুক্ষণ পরে, রাতের খবরে সেই মহিলা দেখলেন যে অ্যাম্বুলেন্সে করে আমার বাবাকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তখন তিনি বুঝতে পারলেন কার জন্য ওই খাট তিনি এনেছিলেন। পরের দিন তাঁর মালিকের নাম করে একটি চিঠিতে তিনি আমাদের লেখেন, বাবার জন্য খাটটি দিতে পারায় তাঁরা গর্বিত এবং তার জন্য অবশ্যই কোনও টাকা দিতে হবে না। আমার মা প্রথমে এটা মেনে নিতে চাননি, কারণ তিনি মনে করতেন যে সমস্ত খরচ নিজেদের পকেট থেকেই করা উচিত। তবে পরে তাঁকে আমরা বোঝালাম যে এক্ষেত্রে বিরোধীতা না করাই শ্রেয়।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসার পর বাবার ডিসচার্জ সার্টিফিকেট একটি ট্যাবলয়েডে প্রকাশিত হল। সম্ভবত আমার ভায়ের হাত থেকে সার্টিফিকেটটা পড়ে গিয়েছিল এবং হাসপাতালে দেখা করতে আসা কোনও এক মহিলা সেটা কুড়িয়ে পান। তিনি সেটা দেন তাঁর মেয়েকে, যার তখন একটা অপারেশন হয়েছিল এবং সে বাবার লেখার খুব ভক্ত ছিল। কিন্তু সেখান থেকে কিভাবে যে কাগজটা খবরের কাগজের অফিস অবধি পৌঁছে গিয়েছিল সেটা এখনও একটা রহস্যই রয়ে গেছে।

৭

যে মুহূর্ত থেকে রটে গেল যে আমার বাবা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন গণমাধ্যমের লোকজন এবং তাঁর গুণমুগ্ধরা একে একে বাড়ির বাইরে জড়ো হতে শুরু করলেন। হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসার দিন প্রায় শ’খানেক লোকের ভিড় ছিল বাড়ির সামনে। এমনকি সরকার থেকে পুলিশ পোস্টিং করা হল যাতে বাড়ির মূল ফটকের সামনের নির্দিষ্ট একটা অংশ পর্যন্ত কেউ না আসতে পারে। অ্যাম্বুলেন্সটাকে গ্যারেজের মধ্যে উলটো দিকে মুখ করে ঢোকানো হল। কিন্তু সেটা এত বড় যে দরজা খোলার জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। আমার ভাই, বাড়ির একজন কর্মচারী ও বাবার সেক্রেটারি একটা চাদরকে পর্দার মতো উপরে তুলে ধরলেন যাতে কেউ ছবি তুলতে না পারে আর তখনই বাবাকে অ্যাম্বুলেন্সের পেছন দিক দিয়ে বের করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল। তারপর যখন দেখলাম যে আমাদের সামান্য ব্যক্তিগত পরিসরটুকু রক্ষা করতে আমার ভাই যে চাদর ঝুলিয়ে রেখেছিল সেই ছবিটাও প্রকাশিত হয়ে গেছে, তখন আমি সত্যি সত্যিই রেগে উঠেছিলাম। কিন্তু তারপর নিজেকে বললাম, শান্ত হও, কারণ দরজার বাইরে এই যে এত মানুষ জড়ো হয়েছেন তাঁদের অধিকাংশই বাবার ভক্ত পাঠককুল এবং বাকিরা কোনও ছোটখাটো পত্রিকার নয় বরং গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ মাধ্যমের সব প্রতিনিধি। 

বন্ধু-বান্ধব বা চিকিৎসক যাঁরাই বাড়ির ভেতরে ঢুকছেন বা বেরোচ্ছেন সাংবাদিকেরা তাঁদেরকে সঙ্গে সঙ্গে ছেঁকে ধরছেন নতুন খবর জানার জন্য। এঁদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তখন আমরা অন্য একটা গ্যারেজ ব্যবহার করতাম এবং গ্যারেজে গাড়ি ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ করে দিতাম। বাবার সেক্রেটারি আমায় একটা ঘটনার কথা বলেছিলেন। সেই সপ্তাহে একদিন আমার মা বাইরে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু ফেরার সময় গ্যারেজের দরজা খুলতে পারেননি। তখন কয়েক পা এগিয়ে মূল দরজা দিয়ে ঢোকা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। কিন্তু যেই তিনি গাড়ি থেকে নামলেন স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা ও আবেগে সঙ্গে সঙ্গে পুরো রাস্তাটা নিঃস্তব্ধ হয়ে গেল। তিনি মাথাটা একটু হেলিয়ে, যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছেন এমনভাবে সেই পথটুকু পার হয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁকে খুব একটা উত্তেজিত বলে মনে হল না, এমনকি চারপাশের সবাই যে চুপ করে গেল সে ব্যাপারেও সম্পূর্ণ উদাসীন, যেন মনে হচ্ছিল নিজের শোবার ঘর থেকে বাথরুমের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। আমার বাবা প্রায়ই বলতেন মায়ের মতো এমন আশ্চর্য মানুষ তিনি আর কখনও দেখেননি।

বাবাকে আমরা তাঁদের শোবার ঘরে রাখলাম না, কেননা তাতে মায়ের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে। তাঁকে রাখলাম বারান্দার প্রান্তের একটা ঘরে যেটা গেস্টরুম হিসেবে ব্যবহৃত হত, আবার মাঝে মাঝে প্রোজেক্টর লাগিয়ে সিনেমাও দেখা হত। কয়েক দশক আগে ওখানে একটা বড় ছাদ ছিল আর কলেজের সব ছেলেমেয়েরা এসে সিগারেট খেত। তবে পরে জায়গাটাকে ঘিরে দেওয়া হয়।

হাসপাতালের মতো খাটে শুইয়ে দেওয়ার পর বাবার প্রথম কথা, ‘বাড়ি যাব’। বেশ বিরক্ত হয়ে ফিসফিস করে প্রায় অবোধ্য স্বরে বললেন। মা তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে তিনি বাড়িতেই আছেন। কিন্তু অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে চারপাশে তাকালেন, মনে হল না যে কিছু চিনতে পারছেন। তিনি ডান হাতটা তুললেন, বেশ কাঁপছে, তারপর তাকে মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে একটা ভঙ্গী করলেন যা একেবারেই তাঁর নিজস্ব। হাতটা প্রথমে কপালে রাখলেন, তারপর চোখের উপর ধীরে ধীরে বুলিয়ে চোখদুটো বন্ধ করলেন। এরপর ভ্রু কুঁচকে ঠোঁটদুটো টিপে বন্ধ করলেন। যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, বা গভীর মনোযোগ দিতেন কিংবা কিছু শুনে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে যেতেন, তখন এই ভঙ্গীটা করতেন। সাধারণত কারুর কোনও কষ্টের কথা শুনেও এরকম করতেন। পরের কয়েক দিন এই ভঙ্গীটা ঘনঘন করতে লাগলেন।

বাবাকে দেখাশোনা করার জন্য সাধারণত দুজন লোক ছিলেন। তার সঙ্গে দু’জন নার্স দিনে ও রাতে পালা করে তাঁর কাছে থাকতেন। দিনের বেলার নার্সটি ছিলেন সত্যিই অসাধারণ। হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়ার সময় ওখান থেকেই তাঁকে সুপারিশ করেছিল। তাঁর বয়স তখন তিরিশের কোঠার শেষের দিকে। বিবাহিতা তবে অপুত্রক, খুবই ভদ্র ও শান্ত, আত্মবিশ্বাসী এবং খুব হাসিখুশি। তিনি সমস্ত কিছু নিখুঁতভাবে, পরিষ্কার হাতের লেখায় লিখে রাখতেন। ওষুধ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিষ নির্ভুলভাবে গুছিয়ে রাখতেন আর ঘরের পর্দাগুলো এমনভাবে খোলা-বন্ধ করতেন যাতে সারা দিন ঘরের মধ্যে একটা শান্ত, স্তিমিত আলো খেলা করে। তাঁর কাজের দক্ষতা ও সুমধুর ব্যক্তিত্ব তাঁকে অপরিহার্য করে তুলেছিল। সর্বোপরি রোগীর প্রতি ছিল তাঁর সস্নেহ ভালোবাসা। বাবাকে ডাকতেন ‘ডার্লিং’ বা ‘ছোট্ট সোনা’ বলে। শুধু একবারই তাঁকে উত্তেজিত হতে দেখেছিলাম। চিকিৎসকের শেষ নির্দেশগুলো দেখতে গিয়ে একটা অসঙ্গতি তাঁর চোখে ধরা পড়ল। বাবার নির্দেশ ছিল সেই রকম সময় উপস্থিত হলে তাঁকে যেন কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা নাহয়। নার্সটির মনে হয়েছিল চিকিৎসকের নির্দেশ যেন বাবার ইচ্ছার সঙ্গে মিলছে না। অন্য সমস্ত কাজ পাশে সরিয়ে রেখে টানা আধ ঘন্টা ধরে সব কাগজপত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন ও ফোনে বিভিন্ন মেসেজ পাঠালেন। শেষ পর্যন্ত কার্ডিয়োলজিস্টের সঙ্গে কথা বলে তবে নিশ্চিন্ত হলেন। তারপর মা যখন তাঁর শেষ স্বাক্ষরটা করলেন এবং আমি বললাম যে সব কিছু আমাদের ইচ্ছানুযায়ী হয়েছে, তবেই তিনি আশ্বস্ত হলেন এবং নিজের কাজে ফিরে গেলেন।

কখনও কখনও বাবা জেগে উঠতেন আর সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে আলোড়ন পড়ে যেত। পরিবারের লোকজন, যাঁরা তাঁর দেখাশোনা করতেন এবং অনেক সময়েই একজন গৃহ চিকিৎসক সবাই সানন্দে তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতাম। তাঁকে কত কি জিজ্ঞাসা করতাম, মন দিয়ে শুনতাম উত্তরে কি বলেন আর এভাবেই জমে উঠত আমাদের গল্প-গুজব। বাবা জাগ্রত অবস্থায় থাকলে আমাদের যে কি আনন্দ হত! আর চিকিৎসক ও নার্সরা এরকম একজন কিংবদন্তিতুল্য মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পেরে খুবই আবেগ প্রবণ হয়ে পড়তেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলায় এতই আনন্দ হত যে আমরা ভুলে যেতাম এই মানুষটা গত কয়েক বছর ধরে স্মৃতিভ্রংশের শিকার। যে মানুষটার সঙ্গে কথা বলছি তিনি আসলে হারিয়ে গেছেন, তিনি আদৌ কিছু বুঝতে পারছেন না। আসলে এই মানুষটা সেই মানুষটাই নয়। 

দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার বিছানায় তাঁর শুয়ে থাকার ভঙ্গি বদল করা হত। গায়ে মালিশ ও অঙ্গসঞ্চালন করে দেওয়া হত। তিনি জেগে থাকলে দেখতে পেতাম আরামে তাঁর চোখ বুজে আসছে। এক যুবক চিকিৎসক, যিনি হাসপাতালের প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের প্রধান এবং তাঁর বাবা ছিলেন কলোম্বিয়ার মানুষ, একদিন বিকেলে বাবাকে দেখতে এলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন আছেন। বাবা উত্তর দিলেন, ‘খোদিদো’১। তখন যে নার্সটি ছিলেন তিনি তাঁর দীর্ঘ বিবৃতির শেষে বললেন যে বাবার যৌনাঙ্গের ত্বকে সমস্যা আছে আর সেখানে ক্রিম লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাবা কথাটা শুনে বেশ ঘাবড়ে গেলেন। কিন্তু পরমুহূর্তেই হেসে ফেললেন আর তাতেই বোঝা গেল যে তিনি মজা করছেন। তারপর ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট করার জন্য বললেনঃ ‘ও আসলে আমার বিচির কথা বলতে চেয়েছে।’ সবাই তখন হো হো করে হাসছে। মনে হত তাঁর রসবোধ তাঁর স্মৃতিভ্রংশতাকেও জয় করতে পেরেছিল। সেটা ছিল তাঁর সত্ত্বারই অংশ। নিজের শরীরের ব্যাপারে বাবা বেশ সতর্ক ছিলেন, প্রায় লাজুকই বলা চলে। তবে যেভাবে সবাই তাঁর সেবা করেছিলেন তাতে কখনই তাঁর সম্ভ্রম এতটুকু ব্যাহত হয়নি। যে সহৃদয় সেবা তিনি পেয়েছিলেন তাতে নিশ্চয়ই খুশি হয়েছিলেন। 

দু’জন নার্স, দু’জন সহকারী এবং ঘরের কাজের একজন বা দুজন মেয়ে তাঁদের পালা বদল করার সময় কয়েক মিনিটের জন্য নিজেদের মধ্যে কথা বলে নিতেন। বাবার সেক্রেটারি বিছানার চাদর বদল করার সময় একবার বলেছিলেন যে তিনি শুনেছিলেন বাবার পা নাকি খুব সুন্দর ছিল। অন্য মহিলারা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দিকে তাকান এবং সায় দেন। আমি জানিনা কোন চুলো থেকে এইসব কথা তাঁরা আমদানি করতেন। তবে এসব ব্যাপারে বেশি প্রশ্ন না করাই শ্রেয়। 

কখনও কখনও মহিলাদের সম্মিলিত কন্ঠস্বরে তিনি জেগে উঠতেন। চোখ খুলতেন আর যেই ওই মহিলারা তাঁর দিকে ফিরে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে তাঁর কুশল জিজ্ঞাসা করতেন সঙ্গে সঙ্গে চোখদুটো জ্বল জ্বল করে উঠত। এরকমই একটি সময়ে আমি তাঁর পাশের ঘরে ছিলাম। শুনতে পেলাম যে মেয়েগুলো খুব হাসছে। ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে। তাঁরা আমাকে বললেন যে বাবা চোখ খুলে খুব মনোযোগ দিয়ে তাঁদের দেখেছেন এবং তারপর শান্ত স্বরে বলেছেন:

-তোমাদের সবার সঙ্গে একসঙ্গে পারব না। 

একটু পরে, মা ঘরে ঢুকতেই, তাঁর গলার স্বর ও উপস্থিতি সবাইকে সম্মোহিত করে চুপ করিয়ে দিল।  


টীকাঃ

খোদিদো– ইংরাজি ভাষায় এর অর্থ ‘fucked’


আগের পর্ব: 

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায়

Thursday, October 21, 2021

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায়


গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

১

আমি আর আমার ভাই যখন ছোট ছিলাম, বাবা আমাদেরকে একটা কথা দিতে বলেছিলেন: আমরা যেন ২০০০ সালের নববর্ষের আগের দিনটি তাঁর সঙ্গে উদযাপন করি। আমাদের কৈশোরেও তিনি বহুবার এই প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এমন কি তাঁর জোরাজুরিতে আমার একটু অস্বস্তিই হত। কিন্তু বড় হওয়ার পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে এ ছিল তাঁর সেই সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। বিংশ শতাব্দী শেষ লগ্নে যখন পৌঁছবে, তখন তাঁর বয়স হবে বাহাত্তর আর আমার চল্লিশ। ছোটবেলায় কিন্তু ওই সময়টাকে খুব দূরে বলে মনে হত না। পরবর্তীকালে আমরা মানে আমি আর আমার ভাই বড় হয়ে যাওয়ার পর অবশ্য এই প্রতিজ্ঞার কথা আর বিশেষ বলা হত না। তবে ওই দিন আমরা সবাই একসঙ্গে ছিলাম বাবার সবচেয়ে পছন্দের শহরে, কার্তাহেনা দে ইন্দিয়াসে। সেদিন বাবা একটু লাজুক স্বরে আমায় বলেছিলেন, ‘তোমার সঙ্গে আমার একটা চুক্তি ছিল, মনে আছে?।’ সম্ভবত আমাকে জোরাজুরি করার জন্য একটু অস্বস্তিতে ছিলেন। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, মনে আছে।’ সেই দিনের পর থেকে আর কখনও আমরা এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করিনি। তারপর তিনি আরও পনের বছর বেঁচে ছিলেন।

তাঁর বয়স যখন সত্তরের কাছাকাছি, তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘রাতে আলো নিভে যাওয়ার পর কি ভাব?’ ‘ভাবি যে প্রায় শেষ হয়ে এল।’ তারপর একটু হেসে বললেন, ‘তবে আরও কিছু সময় বাকি আছে, এখনই দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই।’ শুধু আমাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যই যে সেকথা বলেছিলেন তা নয়, বাস্তবিক তিনি আশাবাদী ছিলেন। ‘একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখবে যে তুমি বুড়ো হয়ে গেছ। ব্যাপারটা এতটাই আকস্মিক, আগে থেকে কিছুই জানা যায় না, নাটকের মতো আবির্ভূত হয়।’ বাবা বলে চললেন, ‘অনেক বছর আগে একবার শুনেছিলাম যে লেখকের জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন আর দীর্ঘ কাহিনি লিখতে পারা যায় না। মস্তিষ্ক আর তখন উপন্যাসের বিস্তৃত আঙ্গিক বা তার জটিল বুননকে ধারণ করতে পারে না। সেটা যে ঠিক তা এখন বুঝতে পারি। তাই এখন থেকে ছোট ছোট লেখা লিখতে হবে।’

তারপর তাঁর বয়স যখন আশি, তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেমন লাগছে এখন?

-আশির কোঠায় এসে পুরো চিত্রটা বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়। আর শেষের সেই ক্ষণ এগিয়ে আসছে।

-তোমার কি ভয় লাগছে?

-না, গভীর বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হচ্ছি।

এই সব কথাগুলো মনে পড়ে আর তাঁর কথার সারল্য আমায় ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। তবে তার থেকেও বেশি কষ্ট দেয় আমার প্রশ্নের নিষ্ঠুরতা।

২

২০১৪ সালের মার্চ মাস। একটা সপ্তাহের মাঝামাঝি এক দিন সকালবেলা মাকে ফোন করেছিলাম। মা বললেন যে দুদিন হল ঠাণ্ডা লেগে বাবা বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। বাবার ক্ষেত্রে এটা নতুন কিছু নয়, কিন্তু এবারের অসুখটা যেন একটু আলাদা। মা বললেন, ‘খাচ্ছে না আর উঠেও বসতে চাইছে না। এটা ঠিক আগের মতো নয়, একেবারে কিছুই করতে পারছে না। আলবারোর ঠিক এই রকমভাবেই শুরু হয়েছিল।’ বাবার এক বন্ধুর কথা বললেন মা, তিনি আগের বছর মারা গিয়েছেন। তারপর বললেন, ‘এবার আর ভালো হবে না।’ এ ছিল মায়ের ভবিষ্যৎবাণী। তবুও আমি উদ্বিগ্ন হইনি, ভেবেছিলাম দুশ্চিন্তা থেকেই মা এসব বলছেন। কিছুদিন আগে অল্প সময়ের ব্যবধানে বেশ কয়েকজন কাছের মানুষ চলে গিয়েছেন। তার মধ্যে মাকে সবথেকে কষ্ট দিয়েছিল ছোট দুই ভায়ের মৃত্যু। তাঁরা মায়ের খুব স্নেহের মানুষ ছিলেন। যাই হোক, ফোনটা করার পর থেকে আমি ভাবতে শুরু করলাম, এই কি তবে শেষের শুরু?

আমার মা দু’-দুবার ক্যান্সারকে পরাস্ত করে ভালো হয়ে উঠেছিলেন। সেই ব্যাপারেই কিছু ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাঁকে তখন লস অ্যাঞ্জেলসে যেতে হবে। সেই জন্য ঠিক হল যে আমার ভাই প্যারিস (যেখানে সে থাকে) থেকে মেহিকো শহরে আসবে বাবার পাশে থাকার জন্য। আর আমি মায়ের সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকব। ভাই এখানে আসতেই বাবার হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য ডাক্তারেরা বললেন যে বাবার নিউমোনিয়া হয়েছে। তাই হাসপাতালে ভর্তি করলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা হবে। মনে হল শেষের দিকে ডাক্তারেরা এ কথাটা মাকে আগেই বলেছিলেন, কিন্তু মা তেমন গা করেননি। হতে পারে ডাক্তারি পরীক্ষায় কি বের হবে তাই নিয়ে মা ভয় পাচ্ছিলেন।

৩

পরের কয়েক দিন ধরে ভায়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে হাসপাতালের ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। হাসপাতালে ভর্তি করতে গিয়ে ভাই যেই বাবার নাম বলেছে সেখানে যে মহিলা অফিসার ছিলেন তিনি রীতিমতো আবেগপ্রবণ হয়ে চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে ভগবান! লেখক গার্সিয়া মার্কেস? আমি কি আমার বৌদিকে (অথবা ননদকে) ফোন করে ওনার কথাটা বলতে পারি? এই খবরটা জানা ওঁর পক্ষে খুব জরুরি।’ ভাই তাঁকে সেটা না করতে বিশেষভাবে অনুরোধ করে। তাতে মহিলার মুখটা বেজার হয়ে যায়। তারপর গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য বারান্দার একেবারে শেষে অপেক্ষাকৃত স্বতন্ত্র একটি ঘরে বাবাকে রাখা হয়। কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল দেখা গেল ডাক্তার, নার্স, স্ট্রেচার নিয়ে যাওয়ার লোক, টেকনিশিয়ান, অন্য রুগী, হাসপাতালের তত্ত্বাবধানের কর্মী, মায় সেই অফিসারের বৌদি পর্যন্ত একে একে দরজার কাছে আসছে শুধু একবার তাঁকে দেখার জন্য। এর ফলে হাসপাতাল থেকে বেশি লোকের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিল। তাছাড়া, সাংবাদিকেরাও ধীরে ধীরে হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে জড়ো হতে শুরু করেছেন এবং ইতিমধ্যে খবরে প্রকাশিত যে তাঁর অবস্থা সংকটজনক। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে তাঁরা প্রকৃত খবরই প্রকাশ করবেন, কারণ আমার বাবার অসুস্থতা তো এক অর্থে অগণিত মানুষেরও বিষয়। সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া তাই সম্ভব নয়। কেননা আমরা জানি যে এই কৌতূহলের একটা বিরাট অংশের উদ্ভব দুর্ভাবনা থেকে, শ্রদ্ধা থেকে, ভালোবাসা থেকে। আমরা যখন ছোট ছিলাম আমাদের বাবা মা সবাইকে বলতেন যে আমরাই হচ্ছি গোটা বিশ্বের মধ্যে সব চাইতে ভালো ছেলে। এর ফলে ভালো ছেলে হওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনও পথ ছিল না। তাই সে ক্ষমতা থাক বা না থাক অত্যন্ত ভদ্রতা ও বিনয়ের সঙ্গে আমরা এই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলাম। আবার সেটা এমনভাবে করতে হল যাতে যে কোনও অবস্থাতেই আমার মা ঠিক যেমন ভাবে চেয়েছেন তেমন ভাবে তাঁর ব্যক্তিজীবন ও বহির্জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা বজায় থাকে। তাঁর কাছে এটা সব সময়েই খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সম্ভবত টেলিভিশনে খোশগল্পের যেসব বাজে প্রোগ্রাম হত সেগুলো দেখার ফল। ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই’, কথাটা আমাদের মনে করিয়ে দিতে পছন্দ করতেন তিনি। তাই এটা আমার অজানা ছিল না যে তাঁর জীবদ্দশায় এই স্মৃতিচারণ প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না।

আমার ভায়ের সঙ্গে বাবার দেখা হয়নি প্রায় দু'মাস হয়ে গেছে। তাই বাবাকে খুব বিচলিত দেখাচ্ছিল। কারণ ভাইকে চিনতে পারছেন না আর কোথায় আছেন সেটাও বুঝতে পারছেন না। ফলে আরও বেশি নার্ভাস হয়ে পড়ছেন। এরই মধ্যে ড্রাইভার ও সেক্রেটারির উপস্থিতি তাঁকে একটু শান্ত করছিল। ওঁরা পালা করে বাবার কাছে থাকছিলেন। আর ছিলেন বাড়ির রাঁধুনি ও গৃহকর্মে সাহায্যকারী মহিলা। তাঁরাই রাতে বাবার কাছে থাকছিলেন। ভায়ের সেখানে থাকার বিশেষ প্রয়োজন ছিল না, বরং দরকার ছিল একটি পরিচিত মুখ, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে যাকে দেখলে বাবা শান্ত থাকবেন। ডাক্তারেরা আমার ভাইকে জিজ্ঞাসা করলেন কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় এখন বাবাকে সে কেমন দেখছে। কেননা তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না তাঁর মানসিক অবস্থা ডেমেন্সিয়ার কারণে না শারীরিক দুর্বলতার জন্য। তিনি প্রায় কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। অতি সাধারণ কিছু প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারছিলেন না। ভাই ডাক্তারদের বলল যে এখন অবস্থা একটু বেশি খারাপ হয়েছে ঠিকই, তবে বহু মাস যাবৎ বাবা এই রকম অবস্থাতেই আছেন। 

এই হাসপাতালটি দেশের মধ্যে চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষণের অন্যতম একটি কেন্দ্র। তাই সকাল হতে না হতেই একজন চিকিৎসক আবির্ভূত হন একদল ইনটার্ন চিকিৎসক সঙ্গে নিয়ে। তাঁরা রোগীর বিছানার পায়ের কাছে জড়ো হয়ে অধ্যাপক চিকিৎসকের কথা শোনেন আর তিনি রোগীর অবস্থা ও তৎসংক্রান্ত চিকিৎসা নিয়ে কথা বলে যান। আমার ভায়ের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে ওই ইনটার্নদের কোনওই ধারণা ছিল না তাঁরা ঠিক কার চিকিৎসা করছেন। কিন্তু তাঁকে দেখতে দেখতে তাঁদের মুখে যে কৌতূহলের আভাস ফুটে উঠত সেটাই বলে দিত যে তাঁরা কিছুটা আন্দাজ করতে পারছেন। তারপর চিকিৎসক তাঁদের জিজ্ঞাসা করলেন কারুর কোনও প্রশ্ন আছে কিনা, তাঁরা সকলেই মাথা নাড়লেন এবং বাধ্য ছাত্রের মতো অধ্যাপককে অনুসরণ করে বেরিয়ে গেলেন।

দিনে অন্তত পক্ষে দু’বার, যখন হাসপাতালে ঢোকে আর বেরোয়, অগণিত সাংবাদিকের দল আমার ভাইকে চিৎকার করে ডাকে। আর সেও উনিশ শতকের প্রারম্ভের ভদ্রলোকের মতো ভদ্রতা বজায় না রেখে পারে না। তাই কেউ তাকে সরাসরি ডাকলে তাকে অগ্রাহ্যও করতে পারে না। ফলে যখনই তাকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, ‘গোনসালো, আপনার বাবা আজ কেমন আছেন?’, সে বাধ্য হয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে যায় আর অমনি তাকে ঘিরে ধরে গণমাধ্যমের চক্রব্যূহ। দূরদর্শনে সেই ছবি দেখে বুঝতে পারতাম একটু ঘাবড়ে গেলেও সবকিছু নিখুঁত শৃঙ্খলার সঙ্গেই সে নিয়ন্ত্রণ করছে। তবুও এই ধরণের আচরণ পরিহার করতে বলতাম। ওকে বোঝালাম যে যদি একজন চিত্রতারকার একটা ছবিতে দেখা যায় যে তিনি ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে আসছেন মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকে আছে, মুখে বিরক্তির চিহ্ন এবং আশপাশের কোনও কিছুকেই গ্রাহ্য করছেন না, তার মানে এই নয় যে তিনি অমার্জিত বা উদ্ধত। তিনি শুধুমাত্র মর্যাদা বজায় রেখে যত দ্রুত সম্ভব গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমার কথা এমনভাবে শুনল যেন মনে হল ওকে কোনও অপরাধের অংশী হওয়ার জন্য বোঝাবার চেষ্টা করছি। এমনকি শেষ পর্যন্ত আমার কথা মেনে নিলেও নিজেকে দোষী মনে করছিল। তবে স্বীকার করল যে সময়ের সঙ্গে এই খ্যাতির জগতের অদ্ভুত নিয়ম-কানুনগুলো ধীরে ধীরে রপ্ত করতে পারবে।

চিকিৎসার ফলে বাবার নিউমোনিয়ার সমস্যার কিছুটা উন্নতি হচ্ছিল, কিন্তু টমোগ্রাফির ছবিতে দেখা গেল যে প্লুরা অঞ্চলে এবং ফুসফুস ও লিভারের কিছু অংশেও জল জমেছে। তার সঙ্গে রয়েছে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার। তবে বায়োপ্সি না করে চিকিৎসকেরা সে ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হতে পারছেন না। কিন্তু সম্পূর্ণ অজ্ঞান না করে বায়োপ্সির জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। অথচ তাঁর শরীরের যা অবস্থা তাতে অজ্ঞান করার পরে হয়তো স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারবেন না। তখন তাঁকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া ছাড়া আর কোনও পথ থাকবে না। দূরদর্শনের চিকিৎসা সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে এই বিষয়টা দেখায়, তবে ব্যাপারটা খুব সহজে দেখালেও আসলে তা ভয়ংকর। লস অ্যাঞ্জেলসে মাকে পরিস্থিতিটা খুলে বললাম এবং ঠিক যা ভেবেছিলাম, তাই হল, মা ভেন্টিলেটরে দিতে চাইলেন না। সুতরাং অপারেশন ছাড়া বায়োপ্সি করা গেল না, ফলে ক্যান্সার ধরা গেল না আর সেই মতো চিকিৎসাও শুরু হল না।

আমি আর আমার ভাই আলোচনা করে ঠিক করলাম যে সে চিকিৎসকদের মধ্যে একজনকে, জেনারেল ফিজিশিয়ান বা পালমোনোলজিস্টকে রোগনির্ণয়ের জন্য একটু চাপ সৃষ্টি করতে হবে। ভাই জিজ্ঞাসা করল, ‘যদি ধরা নিই ফুসফুসে বা লিভারে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার আছে, সে ক্ষেত্রে কি করতে হবে?’ সম্ভবত কয়েক মাস বা তার একটু বেশি বেঁচে থাকবেন, তবে অবশ্যই কেমোথেরাপি করতে হবে। লস অ্যাঞ্জেলসে বাবার এক ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বন্ধুকে পুরো পরিস্থিতি ও উপসর্গের কথা বললাম। তিনি শান্তভাবে বললেন, ‘সম্ভবত এটি ফুসফুসের ক্যান্সার।’ তারপর বললেন, ‘ওখানকার চিকিৎসকেরাও যদি এটাই সন্দেহ করেন তাহলে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে এসো, যেমন ভাবে রাখলে স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন তেমন ভাবে রাখো আর কোনও ভাবেই হাসপাতালে ফিরিয়ে নিয়ে যেও না। হাসপাতালে রাখলে সকলেরই কষ্ট।’ মেহিকোতে আমার শাশুড়ির সঙ্গে কথা বললাম, তিনি একজন চিকিৎসক। সব শুনে তিনিও একই কথা বললেন – হাসপাতাল থেকে দূরে রাখতে যাতে আমার বাবা এবং আমাদের সকলেরই সুবিধা হয়।  

৪

মাকে আমি সব কথা খুলে বললাম। যেখানে তাঁর সবচেয়ে বেশি ভয়, ঠিক সেটাই আমি নিশ্চিত করলাম: অর্ধ শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে যিনি তাঁর জীবনসঙ্গী তিনি এখন মৃত্যুর সম্মুখীন। সে দিনটা ছিল শনিবার। সকালবেলা অপেক্ষা করছি কতক্ষণে মা আর আমি একটু একা হব। তারপর তাঁকে বিস্তারিত ভাবে বললাম এই কদিন কি কি হয়েছে আর কিই বা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। মা আমার কথা শুনলেন, তারপর আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন বিশেষ আগ্রহ নেই, কেমন একটা অবসন্ন ভাব, যেন বা বহুবার শোনা একটা গল্প তিনি আরেকবার শুনছেন। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে দরকারি প্রসঙ্গে এসে পৌঁছলাম; সংক্ষেপে কিন্তু পরিষ্কার করে বললাম: খুব সম্ভবত ফুসফুস বা লিভার অথবা দু’ জায়গাতেই ক্যান্সার হয়েছে, তাই সময় আর বেশি নেই, বড়জোর কয়েক মাস। মা কিছু বলার আগেই টেলিফোন বেজে উঠল। মা ফোন ধরলেন। আমি অবাক হয়ে গেলাম। তাঁকে হতভম্ব হয়ে দেখছি। স্পেনের কারুর সঙ্গে কথা বলছেন। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকার মতো মনের জোর দেখে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। মানসিক আলোড়ন সত্ত্বেও তাঁর এমন সহজভাবে কথা বলে যাওয়ার ক্ষমতা অতুলনীয়। তবুও, মনের অতখানি জোর থাকা সত্ত্বেও, শেষ পর্যন্ত আর পাঁচজনের মতোই বিচলিত হয়ে উঠলেন। তাই তাড়াতাড়ি কথা শেষ করে ফোন রেখে দিয়ে আমার দিকে ঘুরে শান্ত স্বরে বললেন, ‘এখন কি হবে?’ যেন বা আমাদের স্থির করতে হবে আমরা বড় রাস্তা ধরে যাব না গলির মধ্যে দিয়ে। ‘পরশু গোনসালো বাবাকে বাড়ি নিয়ে আসবে। আমাদের এখন মেহিকোয় ফিরে যেতে হবে।’ মা মাথা নাড়লেন, সবটুকু আত্মস্থ করলেন, তারপর আমায় জিজ্ঞাসা করলেন,

-তার মানে সেই সময় এসে গেছে? তোমার বাবার শেষ সময়?  

-হ্যাঁ, তাই তো মনে হচ্ছে।

-ওঃ মা গো!

বলে ইলেকট্রনিক সিগারেট ধরালেন।


(ক্রমশ)

Wednesday, November 11, 2020

পাপ ও শাস্তি: পুনরাবলোকন


সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়: 
দূরে কাছে, কেবলই ঘর ভাঙে। ঈশ্বরের বিকল্প হয়ে মানুষ পাপ করে আর সেই রক্তধারা বয়ে গেলে সময় সন্দিগ্ধ স্বরে প্রশ্ন করেছি: 'নদী, নির্ঝরের থেকে নেমে এসেছো কি, মানুষের হৃদয়ের থেকে?’ আমি একটি উপন্যাস নিয়ে ভাবছিলাম। অনেকদিন পর সে লেখাটিকে আবার পড়া হল ব্যোমকেশ আর ফেলুদার কোলাহল ও কিচিরমিচিরের মাঝে। কি আশ্চর্য! আজ থেকে দেড়শ বছরেরও আগে প্রকাশিত হয় দস্তয়েভস্কির ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট। ১৮৬৬ সাল জুড়ে বারো কিস্তিতে লেখাটি ছাপা হয় পত্রিকার পাতায়। যে রুশ ছাত্রটি নেপোলিয়নের তরুণ দূত হিসেবে নিজেকে ভেবে একটি খুন করে, সে স্বছন্দে একটি গোয়েন্দা গল্পের জন্ম দিতে পারত। খুনের কাহিনী এত চমৎকার যে চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। কোনও সাক্ষ্য প্রমাণও ছিল না। তবু তরুণ রাসকলনিকভ কোনও সত্যান্বেষীর দ্বারা চিহ্নিত হয়নি বরং বিবেকের বোঝা বয়ে নিজেই সত্যান্বেষণ করে গেছে।

কি রুক্ষ, বন্ধুর, আর করুণ রঙিন পথে যে দস্তয়েভস্কি হেঁটেছিলেন! দ্যূতক্রীড়ায় সর্বস্ব হারিয়ে কুরু রাজসভায় যেমন যুধিষ্ঠির শেষ পর্যন্ত সত্যকেই পণ করেছিলেন, জুয়ার টেবিলে সর্বহারা দস্তয়েভস্কিরও কোনও বিকল্প ছিল না সত্যকে খুঁজে না পাওয়ার। এই উপন্যাস কোনও আখ্যান নয়, মানুষের পাপ-পুণ্য, চরম তীর্থযাত্রার একটি নিশ্চিত দলিল। শুধু গল্প লেখাই যদি দস্তয়েভস্কির উদ্দেশ্য হত তাহলে রচিত হতে পারত এক মনোরম চিত্রনাট্য। যেখানে মতাদর্শের নেশায় এক উন্মাদ যুবক পাপবিদ্ধ একটি কিশোরীকে অবলম্বন করে দুনিয়ার পাঠশালায় পড়তে যেতে চায়। এই চিত্রনাট্য সত্যি অনুনকরনীয়। কাহিনীতে বুদ্ধিজীবী মাতাল, স্নেহাতুর পিতা, নিরাসক্ত পুলিশ অফিসার ও দলিত কুসুমের মতো নারীকে দেখতে পাওয়া যায়। আধুনিক কোনও সিনেমার পক্ষে চূড়ান্ত আকর্ষণীয় এক চিত্রনাট্য। তবু যখন ত্রুফো হলিউডের সম্রাট হিচকককে ক্রাইম সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করেন তখন হিচকক সবিনয়ে মেনে নেন তাঁর অসামর্থ্যের কথা। কেননা হিচকক বুঝেছিলেন যে, এই গল্প আসলে সংস্কৃতির ধর্মশাস্ত্র। রাসকলনিকভকে শাস্তি দেওয়ার জন্য বাইরে থেকে আইনের কোনও প্রতিমূর্তি যেমন ডিটেকটিভ নিয়োগ করতে যায় না। রাসকলনিকভের সমস্যা মূলত নৈতিকতার, সে বিবেককে নির্বাসনে পাঠিয়েছে তা-ই সে একা, পরিত্যক্ত, যন্ত্রণাবিধুর। তাঁর শাস্তি যতটা অন্তরের ততটা আদালত ঘোষিত নয়। লোভ ও ক্ষমতা নিজেই নিজেকে যুগপৎ শিকার ও শিকারি ভাবতে পারে।

দার্শনিক এই মলাটটুকু বাদ দিলে অনেক সময়ই মনে হয় কাহিনীর ছিলা টান টান বুননই তো যথেষ্ট। উপসংহারের কোনও প্রয়োজনই নেই। অথচ আজ কখনও ধর্ম কখনও রাজনীতি বা অন্য কোনও যৌথ মতাদর্শের সামনে ভীত আতঙ্কিত মানুষকে দেখলে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করা যায় প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সে ক্রমাগত বন্দি হয়ে প্রাণহীন সত্তায় পর্যবসিত হয়েছে। মৃত্যুলোক থেকে তাঁর প্রত্যাবর্তিত হওয়া জরুরি।

কি বিধুর সেই অপরাহ্ণ যখন সনিয়া একটি সামান্য দেহ পসারিণী ও রাসকলনিকভ, একজন খুনি, বাইবেল থেকে নবকেস্টামেন্ট থেকে লাজারাসের গল্প পড়ে। যেন প্রতীচ্যের নচিকেতা যমলোক থেকে পুনরায় ইহজগতে নিষ্কলুষ ফিরে আসবে। ওই কিশোরীর শীর্ণ হাতে নিজের রক্তাক্ত হাত রেখে রাসকলনিকভ ভেবেছিল—’ যদি হায় জীবন পূরণ নাই হল মম তব অকৃপণ করে!’ নাহলে আর সে সনিয়ার মতো তুচ্ছ পতিতার পায়ের তলায় আছড়ে পড়ে বলবে কেন I prostrate myself not beofre you, but before all suffering humanity. রাসকলনিকভ তরুণ ছাত্র– সে নেপোলিয়ান হতে চেয়েছিল। তাঁর ধারণা ছিল সম্রাটের কোনও বাধন থাকে না, ক্ষমতা যে কোনও গণহত্যাকেও অনুমোদন দেয়। আর সে তো পাপিষ্ঠা এক সুদখোর মহিলাকে খুন করতে চাইছে সমাজের বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য। আর এই রাস্কলনিকভকে কত দেখা যায় সন্ত্রাসবাদে, জেহাদ, যুদ্ধে, আমরা ছোটবেলার ছাত্র আন্দোলনে এই খতমের রাজনীতি যে কতবার দেখলাম!

তবে কি দস্তয়েভস্কি বলতে চাইছিলেন আমরা অন্তিম মূল্য পেতে চাই প্রেমে? জানি না। কিন্তু ভাগ্যিস অপরাধ ও শাস্তির মতো মহাগ্রন্থ লেখা হয়েছিল। তাই দেড়শ বছর বাদেও দেখি হৃদয় অব্দি যায়নি ছুরি, থমকে আছে। সত্যের জ্যোৎস্না পাপের ডালপালার ফোকর দিয়ে মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে এঁকে দিয়েছে পুণ্যের কারুকাজ। অপরাধ ও শাস্তি আবার পড়ে মনে হল মাটির ধুলোবালি অশ্রু আর রক্ত ব্যবহার করে দস্তয়ভস্কি আমাদের বেঁচে থাকার গোঁড়ায় জল ছিটিয়ে দিয়েছেন।

---------------------------------------------------------

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর কয়েকটি বইয়ের নাম: স্থানাঙ্ক নির্ণয়, অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন, নাশকতার দেবদূত, হে চলমান চিত্রমালা, অন্যান্য ও ঋত্বিকতন্ত্র, পাতালের চিরকুট, বুনো স্ট্রবেরি, ইবলিশের আত্মদর্শন সম্পর্কিত, অনভিজাতদের জন্য অপেরা, দিনযাপনের উপাখ্যান। সম্পাদনা করেছেন কবি অনন্য রায়ের কবিতা সমগ্র। তাঁর অনুবাদগ্রন্থ: মাস্কুলা ফেমিনা, অরফি (জঁ ককতো), সাইলেন্স (ইঙ্গমার বার্গম্যান), পিয়েরো ল্যো ফু (জঁ লুক গোদার)। আজ ফিওদোর দস্তয়েভস্কির জন্মদিন উপলক্ষ্যে লেখাটি প্রকাশ করা হল।