Showing posts with label অনুবাদ. Show all posts
Showing posts with label অনুবাদ. Show all posts

Sunday, January 28, 2024

কৃষ্ণমোহন ঝা-র কবিতা | অনুবাদ: দেবলীনা চক্রবর্তী

কৃষ্ণমোহন ঝা-র জন্ম ১৯৬৮ সালে বিহারের মধুপুরায়। হিন্দি এবং মৈথিলী ভাষায় কবিতা লেখেন। তাঁর হিন্দি কবিতা সংগ্রহ 'সময় কো চিরকর' ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত এবং মৈথিলী ভাষায় 'একটা হেরায়েল দুনিয়া' ২০০৮ প্রকাশিত হয়। বিদ্যাপতির পদের একটি সংকলন 'ভনই বিদ্যাপতি'র সম্পাদনা করেন তিনি এবং হিন্দি কবিতার ইংরেজি সংকলন 'হোম ফ্রম এ ডিসটেন্স'-এর একজন সহযোগী সম্পাদক কৃষ্ণমোহন ঝা। এছাড়া বহু পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর কবিতা ইংরেজি, অসমিয়া, বাংলা, মারাঠি, তেলেগু, উর্দু এবং নেপালি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৯৮ সালে তিনি 'কানাইহা স্মৃতি সম্মান' এবং 'হেমন্ত স্মৃতি কবিতা পুরস্কার' পান। ২০০৩ সালে এবং ২০১৩ সালে 'কীর্তি নারায়ণ মিশ্র সাহিত্য' পুরস্কার পান। বর্তমানে অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান। 

মূল হিন্দি থেকে বাংলায় অনুবাদ দেবলীনা চক্রবর্তী


মৃৎ পাত্র

(শক্তি চট্টোপাধ্যায় স্মরণে)


আবার আসবো ফিরে এমন কথা বলব না

কারণ আমি যে কোথাও যাব না


কুয়াশার ওই পারে

হয়ত ভাষার কোনও জীবন হতেও পারে 

তবু আমার উচ্চারিত শব্দ

এইখানেই 

কার্তিকের ভোরে

ধানের শীষ থেকে ঝরে পড়বে

টুপটাপ 


আমার সমস্ত আকাঙ্ক্ষা

আমার ঝরে যাওয়া অশ্রু ও স্বেদজলের সঙ্গে 

এই বেদনা তটের উপরে ভাপ হয়ে উঠবে

আর যেখানে আমার জন্ম 

সেই বিদগ্ধ আকাশে মেঘ হয়ে ভেসে বেড়াবে


আমার আত্মা ও মজ্জাস্থিত সমস্ত দৃশ্যপট

এই ধুলোমাটি, এই ক্ষেতখামার 

এই ঘরদুয়ারে আপন সত্তা খুঁজতে 

বারবার আসবে 

এখানে ছাড়া আমার আমিকে

আর কোথায় পাবে খুঁজে 

আদৌ কোথায় যাবে!


আর যদি একান্তই যেতে হয়

স্বপ্ন-দৃষ্টি ও বাসনা ছাড়া 

কী করে আর কতটুকু বাঁচা সম্ভব 

তাহলে তাকে কি বলা যায় 'চলে যাওয়া'?


এসেছি যখন থাকব এখানেই....


আষাঢ়ের ঘনঘোর বৃষ্টিতে

ধরণীর উচ্ছ্বসিত অবিরাম গন্ধ বিধুরতায়


সোঁদা মাটির অন্ধকার ঘরে

প্রতিদিন দুপুর ছেয়ে থাকা

সূর্য কিরণে


চিড় ধরা আয়নার গায়ে 

বারেবারে নিশ্চুপে ছুঁয়ে যাওয়া

ধুলোর এক একটি কণা'তে 


এসেছি যখন, এখানেই রয়ে যাব 

আমি যাব না কোথাও


---------------------------------------------------------


জীবনানন্দ দ্বিতীয়


আমি ছাড়া আর কেই বা জানে

যে তোমার ভাগ্যে 

না তো কার্তিকের ভোরে শিশির নিমজ্জিত 

বৈজয়ন্তী ফুলের মতো দুর্লভ প্রেমী এসেছে

না অখণ্ড লালিমায় গড়া কাব্য সৌন্দর্য্য নিয়ে প্রেম এসেছে 


আর তুমি ছাড়া আর কে বা জানে

যে আমার ভাগ্যে 

না তো বিদ্যুৎ লতার মতো ঝলমলে রাত এসেছে

না তো এই মৃৎ পাত্র পেয়েছে 

গাঢ় অমৃতের ও শিউলি ফুলের মতো আশ্রয়


আমি জানি যে

তুমি নাটরের বাসিন্দা নও

না আমার জন্ম বরিশালে


মাঝরাস্তায় 

ট্রামের ঘড়ঘড় শব্দ দেখে শুনে 

কাছে যাওয়া তো দূরের কথা

রূপসী বাংলার সজল ভূমি স্পর্শ করার সুযোগ হয়নি এখনও 


কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যায়

আমার বুকের ওপর ভয়ঙ্করভাবে 

পিষে দিয়ে যায় কিছু 

সে ট্রাম নয় তো আর কি!

Tuesday, September 5, 2023

অধরা গালিব ও তাঁর গজল | মহিউদ্দিন সাইফ

উর্দু শায়েরি আর গালিব যেন সমার্থক। গালিবের মনন, চিন্তন আর কল্পনা বিশ্বসাহিত্যে বিস্ময়কর। বড় কবিদের শায়েরির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হল 'মানি আফ্রিনিশি' অর্থাৎ নতুন নতুন অর্থের জন্ম দেওয়া। গালিবের শায়েরি হল তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

আমি চিরকালই গালিবের কবিতার ন্যাওটা। আর আমার উর্দু কাব্যচর্চাও শুরু হয় তাঁকে দিয়েই। যেমন ফারসি শুরু হয় মওলা রুমিকে দিয়ে। গালিবের কবিতা আমার নিজের কাব্যবোধ ও কাব্যভুবন গড়ে তুলতে এক অতুলন ভূমিকা রেখেছে। গালিব অনুবাদের কোনও ইচ্ছে আমার ছিল না প্রথমে। কারণ অনুবাদে গালিব আনা পৃথিবীর কঠিনতম কাজের একটি। কিন্তু তাঁর শের বা গজলের বাংলা অনুবাদ দেখে আমার আক্ষেপ হয়েছে বারবার। তখন থেকে স্বপ্ন দেখেছি যোগ্যতা অর্জন করলে, বুকের পাটা তৈরি হলে আমি নিশ্চয় একদিন গালিব অনুবাদে হাত দেব। বেশ কয়েকদিন ধরে গালিবের অনুবাদ বিষয়ে বিভিন্ন ভাবনা ভাবতে ভাবতে বিপ্লবদার (কবি বিপ্লব চৌধুরী) ফোন থেকে একদিন কল এল। অরুণাভদার সঙ্গে আলাপ হতেই তিনি গালিবের অনুবাদের কথা তুললেন। আমি যেন মনে আরেকটু জোর পেলাম। তারই ফলস্বরূপ কাজে নেমে পড়া।

আমি আগেই বলেছি অনুবাদে গালিব নামানো পৃথিবীর কঠিনতম কাজের একটি। এটা জেনেই আমি তাতে হাত দিয়েছি। প্রাণপণ দিয়ে চেষ্টা করেছি মূলের ভাবটিকে অবিকৃত রাখার। চেষ্টা করেছি 'মানি আফ্রিনিশি'র আশ্চর্য বৈশিষ্টকে ঠিক রাখার। মূল গজলের ভঙ্গি মোতাবেক বাংলা অনুবাদে বিভিন্ন ছন্দ ব্যবহার করতে হয়েছে আমাকে। আমার প্রচেষ্টা কতটুকু কৃতকার্য হয়েছে সেকথা রসিকজন ঠিক বলতে পারবেন। ত্রুটি দেখে করুণাবশে ক্ষমাও করবেন জানি। এখন তাহলে গালিব পড়ি!

১. 

(নক্শ ফরিয়াদি হ্যা কিস্ কি)


চিত্রগরীর খেয়ালিপনার অভিযোগ করে ছবি যে কার!

সামান্য এক কাগজ-লেবাস পরানো রয়েছে গায়ে সবার।


শুধিও না একাকীত্বের কথা, জীবনের এই দুর্বিপাক,

সন্ধে পেরিয়ে সকালকে আনা, গিরি কেটে আনা শীরের ধার।


বে-কাবু এই প্রেমের আবেগ বেড়ে গেছে দেখো এইভাবে,

তলোয়ার থেকে তীক্ষ্ণতা তার বেরিয়ে এসেছে বে-কারার।


যেভাবে পারুক বিছাক চেতনা শ্রবণের জাল, বুঝতে চাক,

আমার বাচনভঙ্গি পুরাণপাখির তুল্য, এই তো সার।


বন্দিত্বেও পায়ের তলায় আগুন রেখেই রই 'গালিব',

অগ্নিদগ্ধ লোমরাজিই তো শিকলের কড়া হল আমার।


২.

(শওক হর রঙ্গ্)


বাসনা শত্রু হল প্রতিপলে বাঁচবার উপায় গুলির,

ছবির পর্দা, তবু দেখা যায় মজনুর নগ্ন শরীর।


ক্ষতও তো বুঝল না হৃদয়ের ব্যাকুলতা, মর্ম গভীর

যখ্মি হৃদয় থেকে ডানা মেলে উড়ে গেল বেদনার তীর।


দীপের ধোঁয়াটি আর ফুলের সুবাস আর কান্না বুকের

তোমার আসর থেকে যে-ই বেরোল, হয়ে ব্যাকুল অধীর।


বাসনাদগ্ধ এই মন আমার বেদনার থালা সুস্বাদু,

বন্ধুরা তুলে নিল, যে যেমন নিতে পারে বেদনার ক্ষীর।


বাসনার পথে জেনো নিজেকে ত্যাজ্য করা কঠিন মোকাম

তাও পার হওয়া গেল, বাকি থাকে বল আর কোন কোন তীর?


হৃদয়ে আবার এক কান্নার হাহাকার উঠল 'গালিব'

বৃষ্টি হল না বলে ঝড় হয়ে বেরল যে তারই নজির।


৩.

(দহর মেঁ নক্শে-ওয়াফা)


অনুরক্তির ছবি এ জগতে প্রবোধের হল না কারণ,

নিজের অর্থে লাজ পেল না পেল না এই শব্দ এমন।


মৃত্যু কামনা করি ছাড়া পেতে অনুরক্তির গ্লানি হতে,

কিন্তু সে অবকাশটুকুও তো দিল না সে নিদয় এমন।


হৃদয় পথিক হয়ে থেকে যাক মদিরা ও পেয়ালার পথে,

খোদাভক্তির পথে প্রাণ আমার কিছুতেই গেল না যখন।


মিলনের কথা তুমি দাওনিকো, তবু রাজি হয়ে আছি আমি

সুসম্ভাষণ চেয়ে হল না এ কান আমার আতুর যেমন।


ভাগ্যবিড়ম্বিত হয়ে আছি, কার কাছে করি অভিযোগ?

চাইছি মরণ হোক, হায়! তবু কিছুতেই আসে না মরণ।


মরে যাই ক্ষীণতনু গালিবের এমন নাজুক হাল দেখে,

জীবন ফিরিয়ে আনা ঈশার ও ফুঁ-টুকুও হল না সহন!


৪.

(ইশ্ক মুঝকো নহি)


প্রেম নয় এ উন্মাদনা, উন্মাদনাই হল

আমার উন্মাদনা তোমার খ্যাতির উপায় হল।


সম্পর্ক ছিন্ন তুমি কোরো না এইভাবে

কিছু না থাক না-হয় এবার শত্রুতাটাই রইল।


সঙ্গে আমি থাকলে তোমার কিসের অপমান?

লোকসমাজের ভয় থাকে তো নির্জনতায় চল।


আমি তোমার শত্রু তো নই, দ্বিধা কেন হায়!

না-হয় তোমার পরের সাথে ভালবাসাই হল।


যেটুক আছ, আছ নিজের অস্তিত্বের জোরে

চেতনা যদি না থাকে তো অচেতনাই হল।


প্রেমের থেকে বাফার থেকে ছাড়িয়ে নিলাম হাত

প্রেমে থাকা না থাকে তো দুঃখে থাকাই হল।


অবিচারের আকাশ তুমি কিছু তো দাও হাতে

বিদায়বেলার তোফা না-হয় হা-হুতাশই হল।


আমিও সব মেনে নেওয়ার স্বভাব করে নেব

তোমার নাহয় স্বভাব হয়ে উপেক্ষাটাই রইল।


বঁধুর সাথে নেহার বাঁধন কেটে গেলে 'আসাদ'

মিলন তো আর থাকে না, তাই আকাঙ্ক্ষাটাই রইল।


(ভণিতায় কোথাও তিনি 'গালিব' কোথাও বা 'আসাদ' ব্যবহার করেছেন)


৫.

(সাতাঈশগর হ্যা যাহিদ)


আল্লার ভক্ত যে-স্বর্গের বাগিচার গুণগানে চুর হয়ে আছে,

অমন ফুলের তোড়া আমাদের বেখুদের ভুলে যাওয়া তাকে পড়ে আছে।


ফুরসত দেয় যদি সামান্য এ-জগত তবে আমি দেখাব জরুর,

হৃদয়ের দাগগুলি ঝাড়বাতি-প্রদীপের একেকটি বীজ হয়ে আছে।


তোমার রূপের বিভা এ আরশিনগরের কী হালত করে গেছে দেখো,

প্রতিদিন বাগানের শিশিরের ভুবনের রৌদ্র যে-হাল করে গেছে।


সৃষ্টিরই খাঁজে খাঁজে লুকায়িত আছে জেনো ধ্বংসের সমূহ কারণ,

ফসলবিনাশী বাজে যে তত্ত্ব আছে তা কৃষাণের ক্রোধেও তো আছে।


লাখে লাখ বাসনা সে নিহত লুকানো আছে এ নীরবতার অন্তরে,

অস্তি আমার যেন পথিকের কবরের নিভু নিভু দীপ হয়ে আছে।


এখন কেবল সেই প্রেমাষ্পদের স্মৃতি আর তার ছবিটি সহায়

বিধুর হৃদয় যেন ইসুফের কারাগারে কুঠুরি নিজন হয়ে আছে।


আমি তো দেখছি শুধু 'ফানা'র পথটি আছে দৃষ্টিতে আমার 'গালিব'

এ সেই সূত্র যাতে অস্তির কণাগুলি মালার মতন গাঁথা আছে।

Saturday, March 4, 2023

দীপ্তি নাভালের কবিতা | অনুবাদ: দেবলীনা চক্রবর্তী

১৯৫৭ সালে পঞ্জাবের অমৃতসরে জন্মেছেন দীপ্তি নাভাল। পালামপুরে (হিমাচল) পড়াশোনা। পরে নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটি এবং ম্যানহাটনের কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জন। হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রতিভাবান অভিনেত্রী। বড়পর্দায় অনেক সফল চরিত্র উপহার দিয়েছেন। শ্যাম বেনেগালের ছবি 'জুনুন' দিয়ে বলিউডে পা রেখেছিলেন। এই যাত্রার আসল সূচনা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে 'এক বার ফির' ছবির মাধ্যমে। এই ছবির জন্য তিনি সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারও পান। তিনি একজন বহুমুখী ব্যক্তিত্ব। সংবেদনশীল কবি। তাঁর কবিতার বই 'লামহা-লামহা' খুবই জনপ্রিয়।

তিনি একজন প্রশংসনীয় অভিনেত্রীর পাশাপাশি একজন চিত্রকর এবং ফটোগ্রাফার। দীপ্তি নাভালের বাবা তাঁকে চিত্রশিল্পী বানাতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার মন চলে গিয়েছিল অভিনয় ও কবিতায়। যদিও, তিনি ছবি আঁকতেন এবং তাঁর শিল্পকলা প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি মাঝে মধ্যেই হিমাচল থেকে লাদাখের বিভিন্ন পাহাড় পর্বতে ট্রেকিং করতে ভালবাসেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজান। গানের প্রতিও রয়েছে তার গভীর অনুরাগ। মহিলা ও শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়ানোর উদ্দেশ্যে একটি চ্যারিটেবিল ট্রাস্ট গঠন করেছেন। 

গুলজার সাহেব দীপ্তি সম্বন্ধে বলেছেন 'দীপ্তি সেই পথ অনুসরণ করে যেখানে তাঁর সৌন্দর্য চেতনা তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং সে বাঁচে তাঁর আপন শর্তে। তাঁকে দেখে মনে হয় ভীষণ বাস্তবধর্মী, ভীষণ ব্যবহারিক কিন্তু সে একদমই তাঁর বিপরীত। তাঁর স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত হওয়ার লক্ষ্যে দৌড়চ্ছে আর তাঁর বাস্তব সেই স্বপ্নের পিছনে ধাওয়া করে চলেছে।'  

 

অজানা পথ 


অজানা পথে 

চলো আরও কিছুদূর হেঁটে যাই

কোন কথা না বলে 


নিজের নিজের নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গে নিয়ে

প্রশ্ন উত্তরের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে

রীতিনীতির কাঁটাতার পেরিয়ে

এসো আমরা পাশাপাশি চলি

কিছুই না বলে

হেঁটে যাই অনেকটা দূর


তুমি বিগত দিনের 

কোনও প্রসঙ্গ উত্থাপন করো না 

আমিও ভুলে যাওয়া 

কবিতার ছত্র না উচ্চারণ করে

কে তুমি

কে বা আমি 

এই সমস্ত কথা 

আর কিছুই না বলে ...


চলো আরও অনেকটা দূর 

অজানা পথে আমরা হেঁটে যাই 


একাকী রাত 


ঠান্ডা! একাকী রাত 

আর সে

হেঁটে যাচ্ছিল অনেকক্ষণ 

স্মৃতির চাদর গায়ে জড়িয়ে!


মিটি মিটি আলো 


কিছু মিটি মিটি আলো 

আর তুষার শৃঙ্গ থেকে গড়িয়ে আসা জোৎস্না 

সমস্ত চরাচরে যেন একটিই সুর প্রতিধ্বনিত


নীরবতার তো এমনি শব্দ 

হয় তাই না...

তুমিই তো বলেছিলে! 


এমনই প্রশান্তি যেন বাকি কোন কিছুই সত্যি নয়


এই রাত চুরি করেছি আমি 

আমার জীবন থেকে আমারই জন্য 


মসৃণ ঢালের ওপর  


মসৃণ ঢালে মেষপালকদের প্রাত্যহিক শোরগোল শেষ হয়েছে ইতিমধ্যে 

দিন যেন নিশ্চুপে পার হয়ে যাচ্ছে খুব পাশ ঘেঁষে

সাদা শিখরে দিগন্ত তার গোধূলি রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে

কোমল হাওয়ার গুনগুনানি ভেসে যাচ্ছে 

সমতলের মেঠো পথে আবার জলের ধারার মতো

সরু পথের আঁকা বাঁকা চলনে

খেলে বেড়ায় পড়ন্ত সূর্যের শেষ কিরণ এখনও পর্যন্ত

দেখে মনে হয় যেন গলানো কাঁচের চাদর বিছানো 


অনুরণিত হচ্ছে শোনো কোনও এক মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি 

আর সামনের ওই টিলা থেকে ভেসে আসছে গির্জার প্রার্থনা স্তব

আরো দূর থেকে কোন এক মসজিদের আজানের স্বর আন্দোলিত হচ্ছে 


এ এক সংযোগের সন্ধ্যা, আগে তো কখনও দেখিনি

হয়ত এমন এক সন্ধ্যার প্রতীক্ষাতেই ছিলাম 

স্থির হয়ে আছি চলতে চলতে 

প্রকৃতি ও ঈশ্বরের ঔদার্য এর আগে 

অবনত হই এই সান্ধ্যকালীন উপাসনার কাছে



আমি দেখেছি দিনকে রাত্রিতে বদলে যেতে  


আমি দেখেছি দূরে কোনও পর্বতের পায়ের কাছে

যখন সাঁঝ চুপিচুপি তার আস্তানা বানিয়ে নেয়

আর ভেড়ার দল তাড়িয়ে নিয়ে 

মেষপালকেরা সুরু কাঁচা পাকদন্ডি বেয়ে পাহাড়

থেকে নিচে নেমে যায়


আমি দেখেছি পাহাড়ের ঢালের ছায়া বাড়তে থাকে

তখন আরও নীচের ঘাঁটিতে 

সে এক একলা ছাতা ও চশমা

ছুঁয়ে নিতে চায় শেষবেলার সূর্যকে


হুঁ, দেখেছি এবং শুনেওছি

এই ঠান্ডা উপত্যকায় কখনও কোথাও 

প্রতিধ্বনিত হয় 

মোহন বাঁশির সুর ....


তখন 

এখানেই কোথাও কোনও না কোনও পাহাড়ের 

গায়ে হেলান দিয়ে থাকা দেবদারু গাছের নীচে

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি 

একটা আস্ত দিনকে দেখেছি রাত্রিতে বদলে যেতে। 


বেচারা মানুষগুলি 

 

সব মানুষ মাত্রই একই নজরে দেখে

নারী আর পুরুষের

সম্পর্ককে

কেননা তাদের যেন কোনও নাম দিতে পারে! 

ওই নামের ঘেরাটোপে আটকে থাকে

বেচারা মানুষগুলি! 


একটি কবিতা 


'এত গুমরে গুমরে থাকো..

সহজ কেন হও না তুমি!'

সহজ হতে গেলে কি জানো 

অনেকগুলি বছর পিছনে যেতে হবে

আর সেখান থেকেই শুরু করতে হবে

যেখানে কাঁধে ঝুলি নিয়ে

স্কুল যেতে শুরু করেছিলাম

এই মুহূর্ত মন বদল করে

যখন নতুন মন মেজাজ তৈরি করব 

আর তারপর যেদিন 

সহজ সরল হয়ে 

খিলখিলিয়ে

দমকে দমকে 

কোনো কথায় হেসে উঠব

তখন আমায় চিনতে পারবে তো?


আমার স্নায়ুর ভিতরে এক সুর আছে


আমার স্নায়ুর ভিতরে এক সুর আছে

এক মহাজাগতিক ছন্দ এখানে প্রবাহিত হচ্ছে


তুমিও শুনতে পাবে, যদি তুমি 

তোমার আঙুলের সুচাগ্র দিয়ে স্পর্শ করো 


তুমি কি তাকিয়েছ ওই তারাদের দিকে 

আর দেখেছো তাদের? দৃষ্টির বাহির হয়ে? 


এখানে যে শব্দ আছে, শুনতে পাও?

যখন স্পর্শ করো নুড়ি-- পাথর,

শুকনো পাতা বা বাতাস!


তুমি কি অনুভব করো এভাবেই

তোমার আত্মার আংশিক স্বচ্ছতাকে?


যখন তুমি হেঁটে যাও 

তখন ছুঁয়ে দেখো পৃথিবীকে?


সেভাবে জীবনকে ছুঁয়ে দেখো, যেভাবে বেচেঁ আছো


ছুঁয়েছ কি?

কখনও তুমি....

Sunday, October 9, 2022

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | পর্ব ৬ | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য


গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

২০

দিনের বেলার নার্স ও সহকারিণী বাবাকে পরিষ্কার করে সাজিয়ে দিচ্ছিলেন শেষযাত্রার জন্য। নার্স মাকে জিজ্ঞাসা করলেন বাবাকে কোনো বিশেষ পোশাক পরিয়ে দিতে চান কিনা। মা বললেন, না। তখন নার্স একটি সাধারণ কাফন দেওয়ার কথা বললেন। মা নিয়ে এলেন এমব্রয়ডারি করা একটা পাতলা সাদা বিছানার চাদর আর সেটা নার্সের হাতে এমনভাবে দিলেন যেন সাধারণ একটা কিছু দিচ্ছেন।

একদিকে বাবাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে, অন্যদিকে একজন ডাক্তার মৃত্যুর শংসাপত্রের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র তৈরি করছেন। আমরা বুঝতে পারছিলাম যে গণমাধ্যমকে খবর দেওয়ার আগে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কারণ ঠিক সেই সময় বাবার খুব কাছের এক বন্ধু বিমানের মধ্যে রয়েছেন, কলোম্বিয়া থেকে আসছেন শেষ বিদায় জানাতে। মেহিকোর একজন বান্ধবী পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে ফিরতি বিমানে আসছেন, তিনিও রয়েছেন পথে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছিল আমার কিশোরী মেয়েদের নিয়ে। তারাও মাঝপথে। আমার স্ত্রীর সঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলস থেকে আসছে। আমি চাইছিলাম না যে বিমান থেকে নেমেই তারা ফোন খুলে জানতে পারুক তাদের দাদু চলে গেছেন। তাই যতক্ষণ না তাঁরা সবাই ধীরে সুস্থে বিমানবন্দরে পৌঁছন ও প্রথমে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে ফোন করছিলাম না। এই অবস্থা দেখলে বাবা নিশ্চয়ই খুব হাসতেন – ‘সবাই সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কোথাও যাওয়ার নেই’। 

ঘরের মধ্যে ফিরে তাকালাম। বাবার দেহ আপাদমস্তক ঢাকা। খাট নামিয়ে সোজা করে দেওয়া হয়েছে আর তিনি টানটান হয়ে শুয়ে আছেন, শুধুমাত্র মাথাটা একটু তোলা, সেখানে একটা পাতলা বালিশ দেওয়া। তাঁর মুখ একদম পরিষ্কার আর যে তোয়ালে দিয়ে চোয়ালটা বেঁধে রাখা হয়েছিল সেটাও খুলে নেওয়া হয়েছে। এখন চোয়াল ঠিকঠাক আছে, নকল দাঁতও রয়েছে স্বস্থানে। কিন্তু তাঁকে বিবর্ণ আর গম্ভীর লাগছে। তবে শান্তিতে শুয়ে আছেন। যে কটি পাকা চুল আছে তা তাঁর মাথায় অলস ভাবে লেগে রয়েছে। এই চুল আমায় মনে করিয়ে দিল এক অভিজাতের আবক্ষ মূর্তি। আমার ভাগ্নী তাঁর পেটের উপর কয়েকটা হলুদ গোলাপ রেখে দিল। এই হলুদ গোলাপ ছিল বাবার সবচেয়ে প্রিয় আর তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই ফুল সৌভাগ্য বয়ে আনে।

এরপর কয়েক ঘন্টা আমরা বসে রইলাম মায়ের সঙ্গে। প্রতিদিনের মতোই মা দূরদর্শনে বিভিন্ন খবর দেখছেন অন্যমনষ্ক থাকার জন্য। একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে ওক্তাবিয়ো পাসের জীবনের উপর। তিনি বাবা-মায়ের দূরের বন্ধু ছিলেন এবং কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। মা অনুষ্ঠানটি খানিকক্ষণ দেখলেন, কিন্তু তাঁর মুখের ভাব থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে তিনি সেই সব তথ্যচিত্রের কথা ভাবছেন যেগুলো আগত দিনগুলোয় দেখবেন।

হঠাৎ মা বললেন, কাউকে উদ্দেশ্য না করে, বাবা বোধহয় আলবারোর সঙ্গে আছেন, ‘মদ খাচ্ছে আর বাজে বকছে’। বাবার বন্ধু আলবারো কয়েক মাস আগে মারা গেছেন।

এই সময় বাড়ির ফোন বেজে উঠল আর সচরাচর যা ঘটে না ঠিক সেটাই হল, মা ফোন তুললেন। বাবার এক বন্ধু ফোন করেছেন, তবে তাঁর সঙ্গে খুব ঘনঘন দেখা হয় না। তাই তিনি বাবার খবর নিতে ফোন করেছেন আর বললেন যে কিছু প্রয়োজন হলেই তিনি সর্বতোভাবে আমাদের সাহায্য করবেন। মা ধৈর্যের সঙ্গে তাঁর প্রতিটি কথা শুনলেন, তাঁকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানালেন আর তারপরেই বললেন যে বাবা নেই। ফোনের অপর প্রান্তে কী প্রতিক্রিয়া হল তা বোঝাই যায়, বিশেষ করে মায়ের ওই কাটা কাটা গলায় খবরটা শোনার পরে। মা একই রকম গলার স্বরে তাঁকে জানালেন এই কিছুক্ষণ আগে ঘটনাটা ঘটেছে, যেন মনে হল বাড়িতে খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে কথা বলছেন। আমার ভাগ্নে-ভাগ্নিরা খুবই শোকাচ্ছন্ন। কিন্তু তারা আমার মাকে ভালো করে চেনে আর তাই হাসি চাপার চেষ্টা করছে। শেষে যখন তাদের দিকে তাকিয়ে আমি চোখের ইশারা করলাম তারা আর হাসি চাপতে পারল না, দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

২১

বাবার কলোম্বিয়ার বন্ধু মেহিকো পৌঁছে গেছেন। সেকথা আমি জানতে পারলাম যখন দরজায় বেল বাজল। আমায় বলল যে তিনি একতলায় অপেক্ষা করছেন। নিচে নেমে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দিকে যেতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রায় ধাক্কা লেগে গেল আমার। কোনো সম্ভাষণ না করেই প্রথম যে কথাটা তাঁকে বললাম তা হল বাবা আর নেই। তিনি বাবার সবচেয়ে পুরোন বন্ধুদের একজন। তাঁকে আমি বাস্তবিক হতচকিত করে দিলাম। তিনি স্তম্ভিত হয়ে চুপ করে রইলেন। কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। চোখদুটোয় ছায়া ঘনিয়ে এল, বুঝি বা তাঁদের বন্ধুত্বের আদি থেকে অন্ত সমস্ত স্মৃতি এক মুহূর্তের মধ্যে তাঁর স্মৃতির সোপান ধরে ছুটে গেল। বুঝতে পারলাম এতটাই ক্লান্ত আর উদ্বিগ্ন হয়ে আছি যে এরকম বাজে ভাবে তাঁকে খবরটা দিয়ে ফেললাম। তখন জোর করে পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার চেষ্টা করতে লাগলাম।

যে বান্ধবী ছুটি কাটিয়ে ফিরছিলেন তিনিও যোগাযোগ করলেন। এবং তারপর যোগাযোগ করল আমার স্ত্রী। তাদের বিমান সবেমাত্র মাটি ছুঁয়েছে। বিমানের ভেতর থেকেই আমায় ফোন করল। তাঁকে সব বললাম। তাঁর দুঃখে আমার মন এতই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল যে মেয়েদের সঙ্গে আর কথা বলতে পারলাম না। অপেক্ষায় রইলাম দেখা হওয়া পর্যন্ত।

বেশ কিছু বন্ধুবান্ধবকে ফোন করলাম। প্রতিটি ফোনই ছিল আগেরটার চেয়ে বেশি কষ্টদায়ক। এঁরা প্রত্যেকেই যেহেতু ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন, তাই কেউই অবাক হলেন না। কিন্তু সকলেই চুপ করে গেলেন, কারুর মুখ দিয়ে কোনো শব্দ নির্গত হল না। এ যেন নিস্তব্ধতার চেয়েও বেশি শূণ্যতা। তাঁদের অধিকাংশই কোনো মন্তব্য না করে অন্যকে খবরটা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালনে রত হলেন। আর যিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে আমার বাবার সাহিত্যিক এজেন্ট ছিলেন, তিনি শুধু বললেন, ‘কী ভয়ংকর!’ আর কথাটা বললেন এমন করে যেন যে ঘটনাটা এতদিন অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছে সেটাই শেষ পর্যন্ত ঘটে গেল। আমি মনে মনে তাঁর মুখটা দেখতে পাচ্ছিলাম। চোখ বন্ধ করে গভীর চিন্তায় মগ্ন। নিজের মধ্যে আরো বেশি ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, যাতে অচিন্ত্যনীয় এই ঘটনা ধীরে ধীরে বাস্তবের রূপ পেতে থাকে। ‘কী ভয়ংকর!’ কথাটা আবার বললেন আর ফোন রেখে দিলেন। একই ধরণের প্রতিক্রিয়া পেলাম বাবার আজীবনের বন্ধুদের অনেকের কাছ থেকে। দুঃখের চেয়েও বেশি অবিশ্বাস। এমন একজন জীবনসাধক, চিরজায়মান, জীবনরসের রসিক, যাঁর অস্তিত্বের কত রঙ, কত রূপ, তিনি আজ নির্বাপিত, এ যেন অবিশ্বাস্য। 

এবার মনে হল সংবাদমাধ্যমের যাকে যাকে খবর দেওয়ার কথা তাদের ফোন করতে হবে। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে, কেননা সেটা ছিল সেমানা সান্তার [১] বৃহষ্পতিবার। একটি ক্যাথলিক দেশে সংবাদমাধ্যমের কর্তাদের পাওয়া তখন কার্যত অসম্ভব। বড়দিনের আগের দিনের মতো সেমানা সান্তার সময়েও বিশেষ কোনো খবর থাকে না। তাই তাঁরা সবাই বাইরে চলে গেছেন, সোমবারের আগে তাঁদের পাওয়া যাবে না। প্রায় দু’ ঘন্টা ধরে আমরা হাত জড়ো করে বসে রইলাম সেই খবরের মধ্যে বন্দী হয়ে যার জন্য সারা বিশ্ব অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু এখন আর তা শোনার কেউ নেই। শেষ পর্যন্ত বাবার সেই বান্ধবী, যিনি সবেমাত্র ছুটি কাটিয়ে ফিরেছেন, তাঁর শরণাপন্ন হলাম। তিনি রেডিয়োর একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তাঁর অনেক অনুগামীও আছে। তাঁকেই অনুরোধ করলাম খবরটা গণমাধ্যমে ঘোষণা করার জন্য। কয়েক মিনিটের মধ্যে সমস্ত জায়গায় ফোন ও মোবাইল বাজতে আরম্ভ করল আর সদর দরজার বাইরে শুরু হয়ে গেল সংবাদমাধ্যম, গুণগ্রাহী ও পুলিশের ক্রমবর্দ্ধমান ভিড়।

২২

বাবার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পরে বাবার সেক্রেটারি একটি ই-মেইল পেলেন। সেটি লিখেছেন বাবার এক বান্ধবী যাঁর সঙ্গে বহুদিন বাবার কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি জানতে চেয়েছেন আমাদের মনে আছে কিনা যে বাবার সৃষ্ট অন্যতম বিখ্যাত চরিত্র উরসুলা ইগুয়ারানও এমনই এক পবিত্র বৃহষ্পতিবারে মারা গিয়েছিল। চিঠিতে তিনি উপন্যাসের সেই অংশটি তুলে দিয়েছেন। সেটি পড়ে সেক্রেটারি আবিষ্কার করলেন যে উরসুলার মৃত্যুর ঠিক পরে কয়েকটি পাখি দিগভ্রান্ত হয়ে দেয়ালে ধাক্কা খায় ও মরে গিয়ে মেঝের উপর পড়ে থাকে। তিনি অংশটি জোরে জোরে পড়লেন ও ভাবতে লাগলেন সেই পাখিটার কথা যেটি সেদিনই একটু আগে মরে পড়েছিল। তারপর আমার দিকে তাকালেন। হয়তো আশা করছিলেন যে আমি বোকার মতো এই কাকতালীয় ঘটনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করার সাহস রাখব। আমি তখন শুধুই ভাবছি কতক্ষণে ঘটনাটা সবাইকে বলব।  

২৩

আমার স্ত্রী-সন্তান বাড়ি এসে পৌঁছল। আমাকে গভীর স্নেহে আলিঙ্গন করার পরই আমার মেয়েরা গেল তাদের ঠাকুমার কাছে। আমার মায়ের পাঁচ নাতি-নাতনি-ই তাঁকে খুব ভালোবাসে। মাকে দেখে মনে হচ্ছে শান্তই আছেন। সবার সঙ্গে কথা বলছেন। আমার মেয়েদের দেখেও ঠিক যেমন সব সময় করেন, তেমনই তাদের খোঁজ খবর নিলেন। ওরাও পরিস্থিতিকে বেশ সহজভাবে গ্রহণ করল। আসলে ঠাকুমার কাছ থেকে অভাবনীয় প্রতিক্রিয়া পেতে তারা অভ্যস্ত। ওরা মনে করে ওদের ঠাকুমা পৃথিবীতে অদ্বিতীয়াঃ মাটির কাছাকাছি থাকা এক অন্য গোত্রের মানুষ। আবার খুবই নিয়মনিষ্ঠ ও রাগী। তথাকথিত সামাজিক নিয়মকে প্রায়শই চ্যালেঞ্জ করেন। তাই ওরা মাকে খুব শ্রদ্ধা করে। আবার মা ওদের খুব হাসায়। নাতি-নাতনিদের কাছে ভালোবাসা পাওয়ার সেটাও একটা কারণ।

কলোম্বিয়া থেকে আগত বন্ধু মায়ের কাছে অনুমতি চাইলেন বাবাকে একবার দেখার জন্য। অবশ্যই মা রাজি হলেন। আমি তখন আমার মেয়েদের একই কথা বললাম। এক মেয়ে যেতে চাইল না। কিন্তু অন্যটি দূর থেকে দাদুকে একবার দেখল। কিছুই বলল না মুখে কিন্তু তার অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছিল কৌতূহল ও দুঃখের ভিতরের এক টানাপোড়েন। ঠিক তখনি দূরদর্শনে খবরটা সম্প্রসারিত হল। বিভিন্ন চ্যানেলে দেখানো হতে লাগল বাবার জীবনী, সংক্ষিপ্ত ও দীর্ঘ, বা তাঁর জীবনের টুকরো টুকরো অংশ। মা একবার এই চ্যানেল দেখছেন, তারপর অন্য চ্যানেল, তবে কোনো মন্তব্য করছেন না। মগ্ন হয়ে আছেন নিজের মধ্যে। আমরা তাঁর চারপাশে ঘিরে বসে আছি আর সেই মানুষটার জীবন ও সাফল্যের ধারাবিবরণী দেখছি যিনি শুয়ে আছেন, ঠিক পাশের ঘরে, মৃত।


টীকা

সেমানা সান্তাঃ বা পবিত্র সপ্তাহ। ইস্টারের আগের সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ক্যাথলিক ধর্মের একটি অনুষ্ঠান। সারা সপ্তাহ ধরে এটি পালন করা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে যীশু খ্রীস্টের জীবনী ও বাণী পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে মধ্যযুগে স্পেনে এই উৎসবের সূচনা হয়।  




আগের পর্ব

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | ৫ম পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

Thursday, August 18, 2022

অশোক বাজপেয়ীর কবিতা | অনুবাদ: দেবলীনা চক্রবর্তী

আত্মাই শরীরের অনন্ত স্বপ্ন


বৃক্ষ হল সেই প্রাণ যা পৃথিবীর শরীর থেকে বেড়ে ওঠা এক অটুট বন্ধন


ফুল ততক্ষণই ফুল থাকে যতক্ষণ সে গাছের অংশ হয়ে ফুটে থাকে 

আর পাতা ততক্ষণ সজীব থাকে যতক্ষণ সে গাছের শরীরের সঙ্গে গেঁথে থাকে


শরীর সাধনায় লিপ্ত থাকাকালীনই একমাত্র শরীর ও আত্মার অভিন্নতাকে অনুভব করা সম্ভব


কারণ আত্মাই শরীরের অনন্ত স্বপ্ন দেখে।


উপাসনা এবং চিৎকারের মধ্যবর্তীতে


যেভাবে তুমি ছিলে 

তোমার তরঙ্গায়িত দেহ বিভঙ্গ নিয়ে

মহাশূন্যে থেকে ভালোবাসার মতো

সীমিত আধারে সঞ্চারিত হয়ে 

সেইখানে কি আমি স্থাপন করতে পারি কিছু শব্দবন্ধ

যার সংযোজনে কাব্য গঠন হতে পারে?


তোমার উন্মুক্ত একাকী আলোকিত 

আকাশ আছে যাকে আমার কোনও 

ইচ্ছে বাসনা, কোনও চিৎকার ছুঁতে পারে না

সেখানে অতীত হল এক কিরণ 

আর ভবিষৎ এক অপ্রত্যাশিত ফুল:


শাখা পল্লবিত হয় মুদ্রায় 

আর মুদ্রা এক নীরব প্রার্থনা

সংগীত হল নিঃসঙ্গতা 

চট্ট্যান যেমন ফুল তেমনি ফুলও সেই চট্ট্যান

শরীর তো সমুদ্র 

আবার সমুদ্র হল এক আকাশ 

এবং আকাশই একমাত্র চিৎকার

সেই চিৎকার হল উপাসনা


আমি দেখি 

ক্রমশ কাছে আসা অন্তকে

নদী একাকার হয় সাগরে 

আর অবাঞ্ছিত জল ফিরে আসে 

সময় এবং কামনায়,

আমি প্রথমবার চিনতে পারি 

শব্দকে অবসাদগ্রস্থ হতে 

উপাসনা এবং চিৎকারের মধ্যবর্তীতে অপেক্ষারত 

কবিতা 

যা কোথাও স্থাপন করা সম্ভব নয়।


পাত্র


হটাৎ জানা গেল যে এমন কোনও 

কানা উঁচু পাত্র নেই যেখানে কিছু

দুঃখ আর হরিয়ালি সব্জি রাখা হত

এখন আর নেই..

দুঃখ রাখার জায়গা

ধীরে ধীরে কমে আসছে।


সে আমাতে 


আমার মধ্যে যে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে তাকে নিয়ে আমি ভাবি না

আমার দেহের হাড় মজ্জা নিয়েও আমার ভ্রুক্ষেপ নেই 

যে আত্মা আমারই তাকেও আমি স্মরণ করি না 

যে আমার মনের ভিতর আছে, তবে তাকে কেন ভুলতে পারি না!


তাকে প্রশ্ন করো


হাওয়াকে নয়, তাকে প্রশ্ন করো

সে শব্দ থেকে এখনও অদৃশ্য কেন?

শব্দকে নয় বরং তার কাছে জানো 

সে শব্দের ধরা ছোঁয়ার বাইরে কেন? 

মৌনতাকে নয়, তার কাছে জানতে চাও

ঠিকানা তার ধ্বনি থেকে দূরে...

কিন্তু কত দূর আর কোথায়?


প্রেমের জন্য


সে তার প্রেমের জন্য স্থান সংরক্ষণ করল

সূর্য চন্দ্রকে একপাশে রেখে

আলাদা করে রাখলো তারাদের

বনলতাদের সরিয়ে দিল

ঝেড়ে ঝুরে নিল পৃথিবী

তারপর আকাশের গায়ের

ভাঁজ পরিপাটি করে

সে তার প্রেমের জন্য স্থান সংরক্ষণ করল


গড়া


কিছু প্রেম

কিছু প্রতীক্ষা 

কিছু কামনা দিয়ে 

রচিত হয়েছিল সে

--রক্ত মাংস দিয়ে 

গড়া তো ছিল বহু আগেই


শুধু শব্দ দিয়ে নয়


শুধুমাত্র শব্দ দিয়ে নয়

তাকে স্পর্শ না করেও ছুঁয়ে

চুম্বন না করেও সিক্ত হয়ে

বন্ধনে না জড়িয়েও দু'বাহুর আলিঙ্গনে 

বহুদূর থেকে তার প্রস্ফুটিত রূপ

চোখে না দেখেও দৃষ্ট হওয়া 

তাকে আমি বললাম।


শেষ 


সব কিছুর পরেও

বেচেঁ থাকবে শুধু প্রেম 

সঙ্গমের পরে সজ্জায় লেগে থাকা ভাঁজ যেমন

আমৃত্যু বিষয় ভাবনা,

অশ্বারোহীর দ্বারা পদদলিত হওয়া সত্ত্বেও

হরিৎ চাদর জড়িয়ে ধরিত্রীর পড়ে থাকা, 

গ্রীষ্মের শীর্ণ শুষ্ক ঝরনার কঠিন বুকে 

লেগে থাকা নোনা জলের ধারার মতো

অব্যাহত থাকবে 

শেষ পর্যন্ত

প্রেম



-------------------------------------------------------------------------

ভারতীয় কবি, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সমালোচক অশোক বাজপেয়ী। সরকারি কর্মচারি ছিলেন। তিনি ললিত কলা আকাদেমি, ভারতের জাতীয় শিল্প আলাদেমি, সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৯৪ সালে তাঁর কবিতা সংগ্রহ 'কহি নেহি ওহি' জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ-- শহর আব ভি সম্ভবনা হ্যায় (১৯৬৬), তৎপুরুষ (১৯৮৬), বাহুড়ি আকেলা (১৯৯২)। দায়াবতি মোদী কবি শেখর সম্মান ও কবীর সম্মাননা পেয়েছেন। ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের সরকারি সম্মানেও ভূষিত হয়েছেন।

Tuesday, August 9, 2022

পাঁচটি কবিতা | ইকারো ভালদেররামা | স্প্যানিশ থেকে বাংলা অনুবাদ: জয়া চৌধুরী

মূলের যত কাঁপন (Tremores del origen)


অব্যর্থ সত্য।

অব্যর্থ সত্যি কি?

            (কোরান ৬৯, ১) 


একটি অস্তিত্বহীন বইও দৃঢ়ভাবে বলে থাকে

যিনি বুদ্ধের পথে হাঁটেন

তাঁকে শান্ত হতে শিখতে হয়।

“আলোকিত কন্ঠ-- অস্তিত্বহীন বইটি বলে থাকে--

হল জলের নীচে থাকা পদ্ম যেন”।

এই ভাবনা (নিগূঢ় মৃগ যেন)

সেই মহান অতীন্দ্রিয় কবি আল তুরাইয়েকের 

সাঙ্গীতিক বুনন-– যিনি রাঙিয়ে 

তোলেন, আরবী জীবনীকারদের মতে

তিনি কখনও অস্তিত্ববান ছিলেন না--

“শব্দের খোলবিশেষ

                আকাশের নিচে থাকা প্রাণীরা

ওদের আগলে রাখি মূলের যত কাঁপন থেকে।


এখানে-- আমার গভীরতম জলে--

কবিতারা পুষ্পিত হয়”।



শব্দের বিশুদ্ধ দুধ (Leche pura del sonido)


তিনি চলমান এবং একই সঙ্গে অচল

                  (শ্রীভগবদ্গীতা ত্রয়োদশ অধ্যায়, ১৫)


শব্দের বিশুদ্ধ দুধ

তোমার পায়ের মাঝে খোলা আকাশ,

নরকের ওইপারে

যেখানে সব কিছুর জন্ম। 


শীর্ষসুখ, আলোর তীর ঘেঁষে

মহাজাগতিক পশু 

এসো প্রার্থনা করি--


যিশুখ্রিস্টের নাভিকুণ্ডলী, 

স্বর্গীয় কোষের খাদ্য,

নারীর গর্ভপুষ্পে স্বর্গের মূল।

স্তন্যপায়ী কুমারী, স্তন্যপায়ী ঈশ্বর,

স্তন্যপায়ী রহস্য--

এসো নগ্ন হই।


স্তন্যপায়ী কুমারী, স্তন্যপায়ী ঈশ্বর,

স্তন্যপায়ী রহস্য--

এসো স্তন্যপান করি। 


তোমার ক্রিয়ায় যদি সারস গর্ভবতী হয় 

যার উষ্ণতা নেমে আসে আমাদের উপর--

শতাব্দী জুড়ে শতাব্দী থেকে আসা কলম ও সঙ্গীত, 

বাগানের বিষাক্ত দাতুরা গাছে থাকা কলম ও সঙ্গীত।



অন্য পাখিটি (Otro pájaro)


যে স্বপ্ন আমি দেখেছি আপনারা তা শুনুন

                (জেনেসিস ৩৫, ৬)


পাখিটির গভীর অন্দরে

গায় গান

যে ঘুমায় অন্য পাখিতে,


আমার স্বপ্নের কম্পনশীল 

রামধনু জঙ্গলে। 



কেরুবিন, ঈশ্বরে মহিমা রক্ষক দেবদূত (Querubín)


দেবদূতেদের দেখবে তুমি

          (কোরান ৩৯, ৭২)


জাগুয়ারের বেদীর উপর

একজন দেবদূত আমাকে তাঁর দেহ নিবেদন করেছিলেন,

তাঁর ছায়াহীন পশুমাংস।

তাঁকে বলেছি-- “তুমি ধূলিকণা, হবে সূর্য

এবং নাড়িভুঁড়ি, যারা আমার উপর রাজত্ব করে 

তারা তোমায় গ্রহণ করে। তুমি প্রবেশ করো, আমার অন্দরে,

                                      প্রগাঢ় অদ্ভূত জীব, আনন্দ কর”!


সেসময়, এমনই ছিল-

রাত্রি উন্মোচিত হয়েছিল তার হলুদ চোয়ালে,

এবং একটি পাখি ঘোষণা করেছিল তার অনুষ্ঠান-- 

কাইউহ, কাইউহ,

কাইউহ, কাইউহ।


(আকাশ-নীল অণু চর্বণ করতে করতে)

তখনই আমার দাঁতেরা জয় করেছিল,

অ্যানাকোন্ডার, চামান পশুর, ভেড়ার, তেলাপোকার, অশ্বের,

হাতি, সীগাল, গ্রহদের,

জাগুয়ারের বেদীর উপরে থাকা এক রহস্য,

স্বর্গের দেবদূতেরা পুষ্টি গ্রহণ করেন,

জঙ্গলে জন্মেছিল যে সব জীবন্ত প্রাণ 

আলোর সর্বভুক বিচ্ছুরণ থেকে।


চলো প্রার্থনা করি--

পুতুমাইয়ো নদীতীরের ইন্ডিয়ান দেবদূত,

ব্যাঘ্রদেবতা যিনি গ্রাস করেন মহাবিশ্ব,


প্রবেশ করো আমার ভেতরে,

                  আনন্দ কর! 



ছাগনন্দিনী (Niña cabra)


সকলেই আমার ভিতর

          (শ্রীভগবদ্গীতা নবম অধ্যায়, ৪)


তুমি, ছাগ নন্দিনী,

নামহীন, রাজনন্দিনী, 

বিচরণরত, 

সাদা পশম, অরণ্যের নিস্তব্ধতা,

আলোর ধ্বংসাবশেষ,

এসো              আমার দৃষ্টির ভিতর নিয়ে এসো--

নিদ্রামগ্ন বাদুড় ভরা বাগানে--

বিস্ময়কর শিং যত,

তীক্ষ্ণ হীরকেরা

যারা আহত করেছিল বন্য পশুদের

হলুদ ফুসফুস।


ছাগনন্দিনী,

আমার কুয়াশার কুয়াশা

নক্ষত্রমাতা এবং ইউনিকর্নের আতংক,

ফিরিয়ে দাও আমার শরীরে 

                       তার পাশব প্রশ্বাস।




-------------------------------------------------------------------------

কলম্বিয়ান কবি ইকারো ভালদেররামা। স্প্যানিশ ভাষায় লেখেন। একই সঙ্গে তিনি গায়ক ও প্রযোজক। সারা পৃথিবী ঘুরে বেরিয়েছেন। সাইবেরিয়া ও মঙ্গোলিয়ার সংস্কৃতি তাঁর বিশেষ ঝোঁক। কিছুদিন আগে কলকাতা পোয়েট্রি কনফ্লুয়েন্সে তিনি থ্রোট সিঙ্গিং পরিবেশন করেন।

Saturday, July 2, 2022

কবিতায় ভস্মীভূত এক কবি: কে সচ্চিদানন্দনের কবিতা | অনুবাদ: অরিত্র সান্যাল

[কবিকে তাঁর মূল ভাষায় পড়তে না পারার দুঃখ একটি পবিত্র অনুভূতি। এতে পাঠকের বিবেক অটুট থাকে। এই অশ্রু-ঝলোমলো বিশ্বাস নিয়েই কবি কোইয়ামপারাম্বাথ সচ্চিদানন্দনকে অনুবাদ করে ফেলা। কবি লেখেন মালায়লম ভাষায়, পরে অনুবাদ নিজেই করেন ইংরেজিতে। সেই ইংরেজি থেকে বাংলায়, খঞ্জপদক্ষেপে, কবিতাগুলিকে বয়ে আনবার কাজটি অপরাধের হল কি না – তা আর কবেই বা কে জানতে পেরেছেন!

জুন মাসের অগ্নিদাপট চলছে বাইরে। অ্যান্টনিম পত্রিকার উদ্যোগে শহরে কলকাতা পোয়েট্রি কনফ্লুয়েন্সে যোগ দিতে এসে কবি এসে উঠেছেন পূর্ব কলকাতার একটি পান্থনিবাসে। তারই একটা ঘরে বসে আছি, অর্থাৎ, একটি ঘরে বসে দুই ভারতীয় পরস্পরের সঙ্গে ইংরেজিতে আড্ডা মারছে। এর মাঝে চা এল। কবি ও পাঠকের মধ্যে ভাষার দূরত্ব নিয়ে গভীর কথা পাড়তে যাব কি এমন সময় কবি ফুড়ুত হেসে হঠাৎ বলে উঠলেন – যখনই কোলকাতা আসি, আমি হতবাক হয়ে যাই। সারা পৃথিবী জুড়ে মালায়লি মানুষ ছড়িয়ে আছেন, কিন্তু এত বাঙালি একসঙ্গে কেরালা ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না।

অতঃপর, আমি প্রশ্নটি গিলে নিই। নিশ্চিন্ত হই-– আমরা সর্বত্র আছি।]   


আঙুলের ছাপ


প্রাচীন কেল্লার ফটকে

এই আঙুলের ছাপগুলো দেখো:

কয়েকটি ঝুলেকালিতে ছাপা হয়ে আছে,

কয়েকটি অশ্রুতে,

তার মধ্যে কিছু, যারা উঁকি দিয়েছিল সেই শিশুদের,

কিছু, এখানে ঢুকতে পারার আগেই

খিদের চোটে ধ্বসে পড়া বুড়োদের,

আর কিছু, সেই জোয়ান ছোঁড়াদের যারা

জোর করে ঢুকতে গিয়ে, অশেষ রাত্রিতে

সটান থুবড়ে পড়েছিল।


আমিও এই সিংহদরজায়

রেখে যাচ্ছি নিজের আঙুলের ছাপ, রক্তে:

যারা অনাগত তাদের প্রতি

একটি স্মারক আর একটি হুঁশিয়ারি:

আমার কবিতা। 


রচনাকাল: ১৯৮৮


কবিতায়


নিজের কবিতায় আমি পুড়ে ছাই হয়ে যাই,

ঠিক যেমন চিতায়।

কাঁচা কাঠের মতো শব্দের পর শব্দ

আমি লেখায় গুছিয়ে তুলেছি।


কলাপাতা থেকে যখন আমায় চড়ানো হল

চিতার ওপর, শব্দে দাউদাউ আগুন।

সেখান থেকে আমার হাড়ের ভেঙে ফাটার 

আওয়াজ পাবে তুমি, 

হৃৎপিণ্ড পুড়ে যাবার তেল ছ্যাঁকছ্যাঁক ধ্বনি,

গলা পুড়ে যাবার নিঃশব্দ গান।


আমার চারদিকে তুমি দাঁড়িয়ে থেকে দেখ

যে জীবন আমি নিজের চোখে দেখি

তাতে জ্বলন্ত কয়লা পড়তে থাকে,

আমার শিরা দিয়ে গলগল করে স্বপ্ন 

বেরিয়ে যায়, আমার হুহু বয়ে যাওয়া ঘিলু থেকে

স্মৃতি আলুথালু।


তুমি তেল ঢালছ, আর চাপাচ্ছ কাঠের ওপর কাঠ,

আমার অন্ত্রনাড়িভুঁড়িজাল নেড়ে দিচ্ছ কাঠি দিয়ে।

একটা ঘুমপাড়ানি গান আমার কানে পুড়ছে,

গিঁঠ থেকে গিঁঠ খুলে একে একে আমার আঙুলগুলো পড়ে যাচ্ছে,

যেটুকু দূরত্ব আমি হেঁটে এসেছি জ্বলে যাচ্ছে,

আমি ছাই হয়ে যাচ্ছি। 

সেই ছাইয়ে এক বেড়াল তার ছানাপোনা নিয়ে উষ্ণতার ওম খুঁজে নেয়,

সেই ছাইয়ে একটা বুনো দারুচিনি গাছ গজিয়ে ওঠে, ফুল ফোটায়। 

সেই ছাইয়ে কালো কালো বাচ্চারা লাফায় দাপায়, খেলা করে।

তুমি এ ছাই গঙ্গায় ঢেলো না, অনুরোধ করি।


[কেরালার আদি রীতি অনুসারে মৃতদেহকে প্রথমে কলাপাতায় শোওয়ানো হয়। তারপর চিতায়।] 

                       

রচনাকাল: ১৯৯২


যখন কবিতা পুড়ে যায়


যখন কবিতা পুড়ে যায়, তা থেকে

গ্যাস চেম্বারে দগ্ধ শিশুদের গন্ধ আসে।

এখানে মড়-মড় করে যে ভাঙার শব্দ 

তা যুদ্ধের ধোঁওয়ায় পুড়ে আংড়া হয়ে যাওয়া পাতার।

অনাথ, ল্যাংটা, সারা গায়ে পোড়া দাগ,

রাস্তায় রাস্তায় ছুটে বেড়ায় কবিতা।

যা-কিছু অতিক্রম করে সব ছাই:

স্টক এক্সচেঞ্জ, প্রমোদ-বিপণী,

অস্ত্রাগার, দেওয়াল, দেওয়াল।

কবিতার ছাই থেকে একটি তোতা উঠে আসে

তার খোঁড়া জিভের ওপর নির্বাসিতা সীতার

প্রতিশোধের গল্প নিয়ে। 


রচনাকাল: ১৯৯২


ঘর, একটি জন্তু


ঘর একটি জন্তু যার ফুসফুস থাকে শরীরের বাইরে। সে কারণে 

সামান্য রৌদ্র বা তুষার লাগলেই তার জ্বর হয়ে যায়। 

হাওয়া-বাতাস ঝড়-জল এমন চলতেই থাকলে ঘর একদিন মরে যাবে। 


রচনাকাল: ১৯৯৫


অমরত্ব


হাজার হাজার কবি লিখেও

আজ বিস্মৃত।

স্মরণে শুধু একজনই থেকে যান।

একা একা অমর হবার থেকে

আমি চাইব বরং বিস্মৃত হয়ে যেতে

হাজার হাজার কবির সঙ্গে


রচনাকাল: ১৯৯৬



ঢোল


কোথা থেকে শব্দ আসে – তা উৎসুক হয়ে

খুঁজতে গিয়ে আমি একবার

ঢোলের চামড়ায় ছ্যাঁদা করে ফেলি

তারপর ভিতরে উঁকি দিই


অরণ্য আছে ভিতরে,

ঝমঝম বৃষ্টিতে জন্তুজানোয়ার ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে,

বানে নদী ক্ষিপ্ত, বাতাস

ঘণীভূত আকাশের নিচে ক্ষেপে উঠেছে।

একটা জংলি দেবতা বাইসন চড়ে

শিঙায় ফুঁ মারছে।

আমি ভয়ে কেঁপে উঠি, পালিয়ে আসি।

তখন আমার বয়স চার বছর।


এখনও যখন ঢোলের আওয়াজ শুনি,

আমি অকাতরে বৃষ্টির মধ্যে একটা

অরণ্যে পৌঁছে যাই,

সমুদ্রের মাঝে একটা দ্বীপ,

আর আমি সেখানে অপেক্ষা করি, ঝড় থামবার,

রক পাখির চঞ্চু থেকে সূর্যের জ্যান্ত দেখা দেবার,

আর মূল ভূখণ্ড থেকে

আমার সহচরের

ফুল, আর কলম নিয়ে আসবার


রচনাকাল: ২০০০



ভয়


ছোটবেলায়

আমি খুব ভয় পেতাম পেঁচার ডাকে

আর মায়ের আড়ালে লুকিয়ে যেতাম।

এখন শীতের চাঁদ

মেঘ থেকে সেই ডাক ছাড়ে।

মা মৃত্যুর আড়ালে লুকিয়ে গেছে

শৈশব মেঘের ওপার থেকে উঁকি দেয়

চাঁদের চোখের প্রাপ্তবয়স্ক ঝিলিক

তার ওপর পড়ে।


আর আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। 


রচনাকাল: ২০০২  



শিলং যাবার পথে


শিলং যাবার পথে

উমিয়াম লেকের কালচে বাদামী ঘাটে

একটি নীল কৃষ্ণচূড়ার ঝালর,

তার তলায় আমি তাঁকে দেখিঃ বনলতা সেন।


আজ, এক দশক পার করে

আবার সে লেকের পাশ দিয়ে যাচ্ছি।

উনি এখনও সেখানেই দাঁড়িয়েঃ

উপচে পড়া নীল কৃষ্ণচূড়া

এক খণ্ড বেগুনি মেঘের তলে

আকাশে ধাবমান।


রচনাকাল: ২০০৩


বয়ঃসন্ধি


মাস্টারমশাই অঙ্ক মুছে দিয়ে চলে গিয়েছেন,

শুধু যোগচিহ্ন, বিয়োগচিহ্ন আর মোটে একটা শূন্য

পড়ে আছে ব্ল্যাকবোর্ডে।

যোসেফ যোগচিহ্ন নিয়ে নিল

আর আমিনা, বিয়োগচিহ্নটা।

আমি শূন্য পকেটে ভরে

চলেই আসছিলাম কি এমন সময়

একটা বিশাল কাক ডেকে উঠল,

একটা গাছ রাস্তা পেরিয়ে গেল,

পথে একটা তারা খসে পড়ে

ভেঙে খান খান।

মুষলধারা বৃষ্টিতে আমার

শূন্যটিও গলে যায়।


আমি ফিরে যাই আর

আয়নায় দেখি:

আমার গোঁফ গজিয়েছে। 


রচনাকাল: ২০০৪


দরজাওয়ালা একটা মানুষ


দরজা নিয়ে একটা মানুষ

শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে,

একটি লাগসই বাড়ি চাই।


সে মানুষ নিজের মানুষীর

স্বপ্ন দেখছে, বাচ্চাকাচ্চা, ইয়ারদোস্ত 

সবাই এই দরজা দিয়েই ঢুকে আসছে।

এখন সে দেখতে পায়

আস্ত দুনিয়াই ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে

তার না-হওয়া বাড়িতে:

কত লোক, গাড়ি-ঘোড়া, গাছপালা

পশু পাখি, সবকিছু।


আর দরজাটা, দরজার স্বপ্নটা

মাটির ওপর উঠে যাচ্ছে,

তার ইচ্ছে স্বর্গের স্বর্ণদুয়ার হয়ে ওঠার,

সে কল্পনা করছে মেঘ, রঙধনু,

দত্যিদানো, পরী আর সাধুসন্তেরা

তার মধ্যে দিয়ে চলাচল করছে।


কিন্তু দরজাটির জন্য যে প্রকৃত অপেক্ষা করে আছে

নরকের অধিপতি।

এখন দরজাটি চায়

গাছ হতে, ফুল পাতার সম্ভার

দুলে উঠবে হাওয়ায়,

গৃহহারা ফেরিওয়ালাকে

ছায়া দিতে।


দরজা নিয়ে একটি মানুষ হেঁটে যাচ্ছে

শহরের রাস্তায় রাস্তায়,

একটি তারা হেঁটে যাচ্ছে তার সঙ্গে। 


রচনাকাল: ২০০৬



ঋণস্বীকার:

কে সচ্চিদানন্দনের The Missing Rib (Collected Poems 1973-2015) নামক কাব্যসংকলনটি প্রকাশ করেছে Poetrywala। মূলত সেই সংকলন থেকেই কবিতাগুলো চয়ন করা।

Sunday, February 6, 2022

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | চতুর্থ পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

১৪

আবার আমি কয়েক দিনের জন্য লস এঞ্জেলসে ফিরে গেলাম এডিটিংয়ের কাজে। দ্বিতীয় দিনে একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আলো নিভিয়ে দিতেই একটা প্রচণ্ড ভয় আমায় চেপে ধরল, এই বুঝি মাঝরাতে ফোন বেজে উঠবে। আর ঠিক সেটাই ঘটল। ফোনের অপর প্রান্তে ভায়ের গলা শুনতে পেলাম, সচেতনভাবে শান্ত থাকার চেষ্টা রয়েছে সেই স্বরে।

-হ্যালো, বাবার খুব জ্বর। ডাক্তার বলছেন তোমার এখুনি ফিরে আসাই ভালো।

ফোন রেখে ফোনেই পরের দিন ভোরের একটা টিকিট বুক করলাম। তারপর সেই অন্ধকারের মধ্যে সারারাত জেগে শুয়ে আছি। বুকের মধ্যে এক প্রবল কষ্টের অনুভূতি, ভায়ের জন্য, মায়ের জন্য এবং নিজের জন্যও। আমরা মানে আমি আর আমার ভাই যখন ছোট ছিলাম, মেহিকো আর স্পেনে বড় হয়ে উঠছি আর বাবা-মা দুজনের পরিবারের অন্যান্য সবাই থাকতেন কলোম্বিয়ায়, তখন আমরা যেন ছিলাম একটা ছোট্ট দল, একটা ক্লাবের মতো। সেই ক্লাবের প্রথম সদস্য এখন চলে যাওয়ার পথে। সেটা মেনে নিতে পারছিলাম না।

পরের দিন প্লেনের মধ্যে বসে মুহূর্তের জন্য আমি মনে করতে পারছিলাম না আমি ঠিক কোথায় যাচ্ছি, মেহিকোর দিকে যাচ্ছি নাকি মেহিকো থেকে ফিরছি। এমনই ছিল শেষের সেই দিনগুলোর বিভ্রান্তি। বিমানবন্দরে নেমে ইমিগ্রেশনের কাজ ও মালপত্র সংগ্রহের মধ্যে এক ফাঁকে ভাইকে ফোন করলাম।

-আমাদের হাতে আর ২৪ ঘণ্টা সময়ও নেই, সে বলল।

“আর মাস দুয়েক” থেকে “বড় জোর কয়েক সপ্তাহ”, সেখান থেকে “মাত্র ২৪ ঘণ্টা”-য় কিভাবে চলে এলাম আমরা? অসংখ্য নার্স, শল্যচিকিৎসক, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, ফুসফুস বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের প্রধান ও বার্ধক্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অগণিত কথোপকথনের পর, যাঁরা এতদিন কোনও কিছুই লুকিয়ে যাননি, তাঁদের এই নতুন ঘোষণার দৃঢ়তা যে কী নিষ্ঠুর! বাবার হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অবশ্য সমস্ত কিছু নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে দিয়েছিলেন, কি কি করা সম্ভব আর সম্ভাবনাই বা কী। এবার আমরা একটা নিশ্চিত জায়গায় এসে পৌঁছলাম। তবুও, যে নিশ্চয়তার সঙ্গে তাঁরা বলছেন যে আর একটা মাত্র দিন মাত্র বাকি, তা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল, কিন্তু এ ছাড়া আর কোনও হিসাবও তো সামনে নেই। দুটো কিডনিই কাজ করছে না, রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে, তা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া একসময় বন্ধ করে দেবে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাপ্তি যেভাবে ঘটেছে, বাবা তাদেরই অনুসরণ করছেন। এই যে জীবন, সেই কোন প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বয়ে চলেছে, আজও তা একই রকমভাবে অনিশ্চিত রয়ে গেছে। শুধু মৃত্যু যখন শিয়রে এসে দাঁড়ায়, সে কাউকে নিরাশ করে না। 

মালপত্রের বেল্টের দিকে যেতে যেতে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, নিজেকে মনে হল ছ’ ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা ও ১০৯ কেজি ওজনের স্কুলে পড়া ছোট্ট একটি লাজুক বালক। 

১৫

দিনের বেলার নার্সকে বললাম, বাবার মধ্যে সামান্যতম কোনও পরিবর্তন বা সেরকম কোনও লক্ষণ দেখলে, যা শেষের সেই ক্ষণের ইঙ্গিত বলে মনে হবে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে যেন আমাকে ডাকেন। তার সঙ্গে অবশ্য এও বললাম যে এটা কোনও নির্দেশ নয়, যদি কিছু লক্ষ্য করেন, তাহলে আমাকে জানালে আমি বাধিত হব। আমার ভায়ের স্ত্রী ও তার ছেলেমেয়েরা প্যারিস থেকে রওনা দিয়েছে আর আমার স্ত্রী ও মেয়েরা পরের দিন সকালের প্লেনে আসবে।

সেদিন দুপুরে, মা খাবার খেয়ে একটু ঘুমচ্ছেন, আমি বাবার পড়ার ঘরে বসে খুটখাট কাজ করছিলাম, বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি, মনে হল সব কিছু কী অদ্ভুত শান্ত! বাগানে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। অবাক হয়ে দেখলাম এই বাড়িরই উপরের একটা ঘরে একজন মানুষের জীবন নিভে আসছে, কিন্তু তার জন্য কোথাও বিন্দুমাত্র কোনও বিচলন নেই।

এই বাড়িটি যে লোকালয়ে অবস্থিত তা তৈরি করেছিলেন স্থপতি লুইস বারাগান, চার-পাঁচের দশকে। প্রাথমিকভাবে বাড়িগুলো ছিল মর্ডানিস্ট স্টাইলের, কিন্তু পরবর্তীতে, সাত-আটের দশকে, যে বিরাট বড় বড় বাড়ি তৈরি হয় তার স্থাপত্যশৈলীর যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে। বাবা কোনোদিনই এই জায়গাটার ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন না। কিন্তু একটা বাড়ি খুঁজে পেলেন, ব্যতিক্রমী স্থপতি মানুয়েল পাররার তৈরি। তিনি নিজস্ব একটা স্টাইল উদ্ভাবন করেছিলেন: ঔপনিবেশিক মেহিকো, স্পেনীয় এবং মূর স্টাইলের একটি সংমিশ্রণ। পুরোন বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে দরজা, জানলার ফ্রেম ও পাথরের কাজ সংগ্রহ করে নতুন বাড়ির অঙ্গীভূত করতেন। ফলে অন্যান্য যা উপাদানই ব্যবহার করা হোক না কেন বাড়ির একটা নিজস্বতা তৈরি হত, তাতে সঞ্চারিত হত মানবিক উত্তাপ। বাবা সবসময় তাঁর প্রশংসা করতেন এবং প্রতিবেশী আধুনিকমনস্ক বুদ্ধিজীবী ও শ্বেত পাথরের বিরাট বিরাট সব প্রাসাদের মাঝখানে এই বাড়িতে বাস করাটা বেশ উপভোগ করতেন।

মনে আছে ছোটবেলায় বাগানে ঘাসের উপর চিত হয়ে শুয়ে আকাশ দেখতাম। এই বাগানটাকে তখন কী ভালোই না লাগত! (এমনকি সেই বয়সেও বুঝতে পারতাম যে বাচ্চাদের ভালো লাগার জায়গাগুলো সবসময় যে বাস্তবে খুব আকর্ষণীয় হবে এমনটা নয়।) এই জায়গাটা থেকে সন্ধ্যা নেমে আসা দেখার অনুভূতিটা ছিল অসাধারণ। মেহিকোর রাজধানীতে যাঁরা বাস করেন তাঁরা জানেন যে প্রায়শই এখানে অভূতপূর্ব সন্ধ্যা নামে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কখনো কখনো, বৃষ্টির পর, বাতাস হয়ে ওঠে সজীবস্বচ্ছ আর তাতে থাকে অপূর্ব এক সুবাস। দূরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে আহুস্কো আগ্নেয়গিরি আর হঠাৎই গোটা শহরের উপর নেমে আসে শান্তির আস্তরণ। তখন আর মনে হবে না যে একটা দূষণে ভরা, হট্টগোলে আকীর্ণ এক বৃহৎ নগরে আমরা বাস করছি, বরং অনেক আগে যেমন ছিল, সেই মায়াময় এক সুন্দরী উপত্যকায় থাকার অনুভূতি ঘন হয়ে আসবে মনে এবং মুহূর্তের জন্য নস্টালজিয়ার পাশাপাশি এক গভীর আশার সঞ্চার ঘটবে। আমার ভাইয়ের বিয়ে হয়েছিল এই বাগানে, এক সূর্যকরোজ্জ্বল দিনে। অনুষ্ঠান শুরুর ঘণ্টা খানেক পরে প্রচণ্ড ঝড় ও শিলাবৃষ্টি আছড়ে পড়ে। কিন্তু আমার বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। কারণ তাঁর বিশ্বাস, সেটা ছিল শুভ লক্ষণ। এটাও ঠিক যে ওরা তিরিশ বছর ধরে সুখী বিবাহিত জীবন যাপন করে আসছে।

এই বাগানেই বাবার ৭০ বছরের জন্মদিনের উৎসব হয়েছিল। তিনি ঠিক করেছিলেন শুধু তাঁর সমবয়সী মানুষদের নিমন্ত্রণ করবেন। তাঁর চেয়ে ছোট কিছু বন্ধু-বান্ধব খুবই ক্ষুব্ধ হন এতে, সেকথা তাঁর গোচরেও আনেন। কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইলেন; তাঁর মতে এই দীর্ঘ জীবনের সমস্ত পরিচিত বা কাছের মানুষদের এই বাড়িতে ধরানো সম্ভব নয়, তাই শুধুমাত্র তাঁর বয়সী মানুষদেরই ডাকা হবে। তবে মনে মনে দুঃখ পেয়েছিলেন, অন্যদের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার জন্য।

বাড়ির একতলাতে ছিলাম আমি। দুপুরের খাওয়ার পর রান্নাঘর পরিষ্কার করলাম। বসার ঘরটা ঠিক যেমন ছিল তেমনই আছে। তবে একেবারে নিশ্চিত করে সেকথা বলা যায় না, কারণ ঘরের আসবাবপত্র, সংগৃহীত প্রতিটি শিল্পকর্ম ও অগণিত ছোটখাটো জিনিষ সেখানে জড়ো হয়েছে দশকের পর দশক ধরে আর সেগুলো একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে এক অনির্দিষ্ট নতুনত্ব, আবার তার সঙ্গে রয়েছে প্রাচীনত্বের আভাসও। ওদের মধ্যে কিছু জিনিষ কবে যে আনা হয়েছিল তা সঠিকভাবে বলা অসম্ভব। বেশ পুরোন ছোট্ট একটা পাথরের তৈরি জিনিষ আছে, অনেকটা ফুলের মতো দেখতে, যার পাপড়িগুলো ছুরির মতো ধারালো। এটা আছে আটের দশকের গোড়া থেকে। রাফায়েল আলবের্তির হাতে লেখা একটা কবিতা আছে সাতের দশক থেকে - ৪০ বছর নির্বাসনে থাকার পর যখন তিনি মাদ্রিদে ফিরে যান তার পর। আরও আছে আলেখান্দ্রো ওব্রেগোনের একটি আত্মপ্রতিকৃতি, যার মধ্যে গুলির গর্ত হয়ে আছে (এক রাতে মদ্যপ অবস্থায় প্রচণ্ড রেগে গিয়ে শিল্পী রিভলভার দিয়ে নিজের ছবির চোখে গুলি করেন, কারণ তাঁর পরিণত বয়স্ক ছেলেরা ওই ছবির দখলদারি নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছিল) এবং লার্তিগের একটি ফটোগ্রাফির বই, যেটা সেই বারো বছর বয়স থেকে দেখে আসছি।

প্রায় ২৫ বছর যাবত বাড়িতে একটা টিয়াপাখি ছিল। বিকেলবেলায়, যখন কোনও একটা দরজা বন্ধ করা হত বা টেলিফোন বাজত, কখনো কখনো সে অদৃশ্য এক সুন্দরী তরুণীর উদ্দেশ্যে শিস দিত। তারপর, এই কাজটা করতে গিয়ে এত পরিশ্রম হয়ে যেত যে বাকি দিনটা নিঃশব্দে বিশ্রাম করত। আমরা সবাই যে তার প্রতি খুব মনোযোগী ছিলাম, এমনটা নয়; কিন্তু তার মৃত্যুর পর সকলেই খুব কাতর হয়ে পড়েছিলাম।

১৬

সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাবার ঘরের কাছে গেলাম। ভেতরে দেখলাম দিনের বেলার নার্সটি কিছু লিখছেন আর তাঁর সাহায্যকারিণী একটা পত্রিকা পড়ছেন। বাবা একদম শান্ত হয়ে শুয়ে আছেন, দেখে মনে হবে বুঝি ঘুমচ্ছেন। কিন্তু বাড়ির মধ্যে এই ঘরটাকে মনে হচ্ছে যেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আশপাশের সবকিছু ধীর, অচঞ্চল হলেও সময় সেখানে ঘোড়ায় জিন দিয়ে ছুটে চলেছে, এই মুহূর্ত থেকে পরের মুহূর্তে পৌঁছতে তার সে কী ভীষণ ব্যস্ততা! সে যেন আর নিয়মের অধীন নয়।

খাটের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বাবাকে দেখছিলাম। কী চেহারা হয়ে গেছে! মনে হল আমি শুধু তাঁর ছেলে নই, সেই ছোট্ট খোকাটি শুধু নই আর, একই সঙ্গে তাঁর পিতাও। বেশ ভালো করেই জানি যে তাঁর দীর্ঘ সাতাশি বছরের বিস্তৃত জীবনের কথা আমি বলছি। তার সূচনা, মধ্যগতি এবং সমাপ্তি – এখন আমার সামনে এবং তা থেকে বাচ্চাদের অ্যাকর্ডিয়ান বইয়ের মতো একটার পর একটা পাতা খুলে যাচ্ছে।

একজন মানুষের অন্তিম পরিণতি জেনে গেলে উৎকণ্ঠায় ভরে ওঠে মন। আমার জন্মের আগের যেসব কাহিনী, তা অবশ্যই ছিল বাবা, মা, কাকাদের বলা গল্প বা আত্মীয়, বন্ধু, সাংবাদিক, জীবনীকারদের পুনরাবৃত্তির এক মিশ্রণ এবং আমার কল্পনাশক্তি তাকে আরও নানা রঙে রঙিন করে তুলেছিল। বাবার বয়স যখন মেরেকেটে ছয়, একটা ফুটবল দলে গোলরক্ষক হিসেবে খেলতেন। তাঁর ধারণা ছিল যে তিনি বেশ ভালোই খেলতেন, সাধারণের চেয়েও ভালো এবং খুব গর্ববোধ করতেন তাই নিয়ে। এর দু’-এক বছর পরে উপযুক্ত চশমা ছাড়া সূর্যগ্রহণ দেখেছিলেন বলে তাঁর বাঁ চোখের মাঝখানের দৃষ্টি চলে যায়। একদিন তাঁর দাদুর বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন কয়েকজন মানুষ একটা লোকের মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর ওই মৃত ব্যক্তির স্ত্রী পেছন পেছন হাঁটছে, সে একহাতে একটা বাচ্চাকে ধরে আছে ও অন্য হাতে মৃত স্বামীর ঝুলে থাকা মাথাটা। তিনি নিজের ভাগের জেলির মধ্যে থুতু ফেলে এবং জুতোর মধ্যে কলাভাজা রেখে খেতেন যাতে ছোট ছোট অসংখ্য ভাইবোন তাঁর সেই খাবার কেড়ে খেতে না পারে। কৈশোরকালে মাগদালেনা নদী দিয়ে যাওয়ার সময় একবার প্রবল একাকীত্ব অনুভব করেছিলেন। প্যারিসে থাকার সময় একদিন দুপুরে এক মহিলার সঙ্গে দেখা করতে যান এবং কথা বলতে বলতে অকারণ দেরি করতে থাকেন যাতে ওই মহিলা তাঁকে খেয়ে যেতে বলেন, কারণ ওনার কাছে তখন একটা পয়সাও ছিল না আর কয়েকদিন ধরে খেতে পাননি কিছুই। কিন্তু এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সেখান থেকে বেরিয়ে ওই মহিলার বাড়িরই রাখা জঞ্জাল ঘেঁটে যা পেয়েছিলেন, তাই খেয়েছিলেন। (আমার যখন পনের বছর বয়স বাবা এই গল্পটা আমার সামনেই অন্যদের বলছিলেন আর কী লজ্জা যে করছিল আমার।) প্যারিসে সেই সময় ছিলেন চিলের এক নিঃসঙ্গ তরুণী বিয়োলেতা পাররা। সেখানে থাকা দেশছাড়া লাতিন আমেরিকার মানুষদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝেই তাঁর সঙ্গে দেখা হত বাবার। তিনি লেখালেখি করতেন এবং অসাধারণ হৃদয়স্পর্শী গান গাইতেন। অনেক বছর পরে তিনি আত্মহত্যা করেন। ১৯৬৬ সালের এক বিকেলে, মেহিকোর এই রাজধানী শহরে, বাড়ির দোতলায় উঠে মা যেখানে খাটের উপর শুয়ে ছিলেন, সেখানে গিয়ে বললেন, কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মৃত্যুর কথা লেখা শেষ হল।

-কর্নেলকে মেরে ফেললাম, তিনি বললেন, তিনি তখন সান্ত্বনার অতীত।

মা বুঝতেন বাবার কাছে এর অর্থ কতখানি। দুজনে দীর্ঘক্ষণ, একসঙ্গে, নিঃশব্দে বসে রইলেন।

একথা ঠিক যে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সাহিত্যিক জনপ্রিয়তার শিখরে অবস্থান করেছিলেন, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও সামাজিক প্রতিপত্তিও অর্জন করেছিলেন যথেষ্ট, কিন্তু তারই পাশাপাশি কিছু দিন গেছে বড় বেদনার। একদিকে যেমন ৪৬ বছর বয়সে আলবারো সেপেদার মৃত্যু, ড্রাগ-মাফিয়াদের দ্বারা ৬১ বছরের সাংবাদিক গিয়েরমো কানোর হত্যা ও তাঁর সবচেয়ে ছোট দুই ভাইয়ের মৃত্যু, অন্যদিকে তেমন খ্যাতির একাকীত্ব, স্মৃতিভ্রংশ ও তার ফলে লিখতে না পারা। একেবারে শেষের দিকে, তাঁর নিজের লেখা বই প্রকাশিত হওয়ার পর সেই প্রথম পড়তে শুরু করলেন এবং যেন প্রথমবার গল্পটা পড়ছেন এমনভাবে আমাকে একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, “কোন চুলো থেকে এসব বেরিয়েছে?” বইগুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে গেলেন, এক একবার মনে হচ্ছিল প্রচ্ছদটা যেন তাঁর চেনা, কিন্তু বিষয়বস্তু বিশেষ বুঝতে পারছিলেন না। কখনো কখনো বইটা বন্ধ করার পর পিছনের পাতায় নিজের ছবি দেখে এমন চমকে উঠতেন যে আবার বইটা ফিরে পড়ার চেষ্টা করতেন।

সেখানে দাঁড়িয়ে আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হল যে ডিমেন্সিয়া সত্ত্বেও (এবং সম্ভবত মরফিনের প্রভাব সত্ত্বেও) এখনো পর্যন্ত তাঁর মস্তিষ্ক ঠিক তেমনই সৃজনশীলতায় পরিপূর্ণ, যেমনটা ছিল সারাজীবন। হয়তো খানিক ক্ষত তৈরি হয়েছে, তাই পুরোন চিন্তাভাবনায় ফিরতে পারছেন না বা যুক্তির শৃঙ্খলা বজায় থাকছে না, কিন্তু এখনো সক্রিয় আছে। সর্বদাই তাঁর কল্পনাশক্তিতে ছিল প্রতিভার অভূতপূর্ব স্ফুরণ। বুয়েন্দিয়া পরিবারের ছয় প্রজন্ম নিয়ে তৈরি হয়েছিল ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’। অবশ্য আরও দুই প্রজন্মের সমস্ত উপাদান তাঁর কাছে সঞ্চিত ছিল। কিন্তু উপন্যাসটি অনেক বেশি বড় ও ক্লান্তিকর হয়ে যাবে এই ভয়ে তা বাদ দেন। বাবা মনে করতেন কঠোর নিয়মানুবর্তিতা হল একটি উপন্যাস লেখার প্রধান স্তম্ভগুলির একটি, বিশেষ করে গল্পের কাঠামো ও তার সীমানা প্রস্তুত করার জন্য। যাঁরা মনে করতেন যে উপন্যাসের গঠনশৈলী নির্মাণের ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীনতা পাওয়া যায় এবং সেই কারণে সিনেমার চিত্রনাট্য বা একটি গল্প লেখার থেকে উপন্যাস লেখা অনেক বেশি সহজ, তিনি তাঁদের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তিনি বলতেন যে একজন ঔপন্যাসিককে অবশ্যই তার যাত্রাপথ নির্দিষ্ট করে নিতে হবে, যাতে ‘উপন্যাসের চোরাবালিতে’ হারিয়ে না যান।

১৯২৭ সালে আরাকাতাকা থেকে ২০১৪ সালে মেহিকো শহরে আজকের এই দিন – এক দীর্ঘ ও ব্যতিক্রমী যাত্রা, সমাধি প্রস্তরের উপর শুধু ওই তারিখদুটো দিয়ে যাকে আয়ত্ত করার চেষ্টা নিতান্তই বৃথা। আমার মতে, লাতিন আমেরিকার প্রায় কোনও মানুষই এরকম বিশেষত্ব ও সৌভাগ্যপূর্ণ জীবন যাপন করেননি। যাঁরা একথা মেনে নিতে পারেন বলে আমার মনে হয়, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে যিনি থাকতেন, তিনি আমার বাবা। 


আগের পর্ব


গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | তৃতীয় পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

Saturday, December 25, 2021

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | তৃতীয় পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি প্রতিদিন দুপুরবেলায় বাবা-মা ঘুমতেন। প্রায় কখনোই তার ব্যত্যয় ঘটেনি। মাঝে মধ্যে বাবা আমাদের বলতেন যদি সময় মতো ঘুম না ভাঙে তাহলে তাঁকে ডেকে দিতে। কিন্তু আমি আর আমার ভাই দুজনে সেই ছোটবেলাতেই বুঝে গিয়েছিলাম যে কাজটা খুবই ঝুঁকির। জাগানোর সময় যদি কেউ তাঁর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকত বা তাঁর গায়ে হাত দিয়ে ডাকত, সঙ্গে সঙ্গে এমন চিৎকার করে লাফিয়ে উঠতেন যেন প্রচণ্ড ভয় পেয়েছেন আর এমনভাবে হাত নাড়াতেন যেন কারুর থেকে বা কোনও কিছুর থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চাইছেন। তখন খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাসও নিতেন। জাগ্রত বিশ্বে নিজেকে খুঁজে নিতে তাঁর কয়েক লহমা সময় লাগত। তাই আমরা একটা কৌশল আবিষ্কার করেছিলাম: শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে খুব আস্তে আস্তে নরম স্বরে তাঁর নাম ধরে একটানা ডেকে যেতাম। তা সত্ত্বেও কখনও কখনও লাফ দিয়ে জেগে উঠতেন, তবে সাধারণত তা করতেন না। আর যেই তিনি ভয় পেয়ে জেগে উঠতেন আমরা এক ছুটে বারান্দায় পালিয়ে যেতাম।

তারপর ভালো করে ঘুম কেটে গেলে এমন করে দু’হাত মুখে বোলাতেন যেন মনে হত ধীরে ধীরে মুখ ধুচ্ছেন। তারপর তাঁর সেই প্রিয় নাম ধরে আমাদের ডাকতেন: ‘পেররো বুররো’১। হাতছানি দিয়ে আমাদের কাছে ডাকতেন ও তাঁকে চুমু খেতে বলতেন। জিজ্ঞাসা করতেন: “নতুন কি খবর আছে? কেমন চলছে সব?” রাতেও প্রায়শই শুনতে পেতাম ঘুমের মধ্যে গোঁ গোঁ শব্দ করছেন আর জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন। মা তখন কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বাবাকে ডেকে তুলতেন। একদিন ওইরকম অশান্ত ভাবে সিয়েস্তা২ থেকে ওঠার পর তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কি স্বপ্ন দেখছিলেন। তিনি চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করলেন।

-একটা খুব সুন্দর দিন আর আমি একটা ছোট ডিঙি নৌকায় বসে আছি, কিন্তু সঙ্গে কোনও দাঁড় নেই। একটা তিরতিরে শান্ত নদীর উপর দিয়ে নিঃশব্দে, খুব ধীরে ধীরে ভেসে চলেছি।

-এখানে দুঃস্বপ্নটা কোথায়? জিজ্ঞাসা করলাম।

-আমি জানি না।

কিন্তু আমার ধারণা যে তিনি জানতেন। কারণ তাঁর লেখায় সাংকেতিক কিছু আছে এ কথা তিনি সমানে অস্বীকার করলেও এবং কেতাবি ও বিদ্বজ্জনের সব তত্ত্ব যা তার গল্পের মধ্যে রূপকের সন্ধান করে তার থেকে সব সময় নিজেকে দূরে রাখলেও তিনি জানতেন যে আর সকলের মতো তিনিও অজ্ঞান মনের দাস। জানতেন যে একটা জিনিষ অন্য জিনিষের ভাবার্থ বহন করতে পারে। এবং অন্য অনেক লেখকের মতোই ধ্বংস এবং তার সর্বোচ্চ প্রকাশ মৃত্যু সম্পর্কে উদ্বিগ্ন ছিলেন। মৃত্যু– শৃঙ্খলাপূর্ণ ও শৃঙ্খলাহীন, যৌক্তিক ও যুক্তিহীন, অবধারিত ও অগ্রহণীয়।   

বাবার বয়স যখন সবে সত্তরের কোঠায়, বেশ কয়েকবার কেমোথেরাপির সময়ে এবং পরে, তিনি তাঁর স্মৃতিকথা লিখেছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন কয়েক খণ্ডে তা প্রকাশ করবেন। প্রথম খণ্ড শুরু হয়েছিল বহু পুরনো স্মৃতির হাত ধরে আর শেষ হল তাঁর সাতাশ বছর বয়সে, যখন সাংবাদিক হিসাবে প্যারিসে গিয়েছেন। কিন্তু তারপর আর কিছু লিখলেন না, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল সাফল্যের সময়গুলোর কথাই শুধু লিখলে আর সব বিখ্যাত আত্মজীবনীর মতো খ্যাতনামা ব্যক্তিদের সঙ্গে যাপনের মহিমা কীর্তন করা হবে। যেমন, অমুক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এক রাত কি তমুক চিত্রকরের চিত্রশালা দর্শন বা রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র কি এক প্রতিভাধর বিপ্লবীর সঙ্গে জলযোগ।

-আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডটাই আমার ভালো লাগে, বাবা বলেছিলেন, কারণ ওর মধ্যেই আছে আমার লেখক হয়ে ওঠার সময়টার কথা।

একবার একটা অন্য প্রসঙ্গে বলেছিলেন:

-আট বছর বয়সের পর আর আমার জীবনে আকর্ষণীয় কিছু ঘটেনি।

ওই বয়সেই তিনি দাদু-দিদিমার বাড়ি ছেড়ে, আরাকাতাকা ছেড়ে চলে এসেছিলেন। ছেড়ে এসেছিলেন সেই জগৎ যা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল তাঁর প্রথম দিকের সৃষ্টিকে। তিনি স্বীকারও করেছিলেন যে প্রথম জীবনের লেখাগুলোই ছিল ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’-র জন্য হাত পাকানোর আসর।

স্মৃতিকথা লেখার জন্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে বাবা তাঁর প্রাইমারি স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকের সঙ্গেই সেই শৈশবের পর আর দেখা হয়নি বা কোনোরকম কোনও যোগাযোগ ছিল না। কয়েকজনের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ে বা স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলেন, কারণ বন্ধুটি মারা গিয়েছিলেন। জীবনের এই দীর্ঘ পথ পারি দিতে গিয়ে যে কিছু বন্ধুকে ইতিমধ্যেই হারিয়ে ফেলেছেন, এ আশঙ্কা তাঁর ছিল। কিন্তু কয়েকজনের ক্ষেত্রে যখন শুনলেন যে কিছু সময় মাত্র আগে তাঁরা মারা গেছেন তখন খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। তাঁরা সফল জীবন যাপন করেছেন, মোটামুটি সুখী ও সৃষ্টিশীল জীবন ছিল তাঁদের এবং সত্তরের কোঠায় পৌঁছে মারা গিয়েছেন, যা ছিল মৃত্যুর গড় বয়স। তাই ওই সব বন্ধুদের মৃত্যু কোনও ট্র্যাজিক ঘটনা নয়, বরং জীবনচক্রের স্বাভাবিক পরিণতিই বলা যায়। এই সময়টার পর তিনি বলতে থাকেন ‘আগে মারা যাননি এরকম অনেক মানুষ এখন মারা যাচ্ছেন’ এবং নিজের রসিকতায় নিজেই হাসতেন।

১০

যদিও স্বভাবগতভাবে তিনি মিশুকে ছিলেন এবং আপাতভাবে মনে হত যে বাইরের জগতের সঙ্গে তিনি ভালোই খাপ খাইয়ে নিয়েছেন, কিন্তু আমার বাবা আসলে খুবই মুখচোরা মানুষ, তাঁকে অন্তর্মুখী বললেও ভুল বলা হবে না। তাই বলে খ্যাতি উপভোগ করতে পারতেন না, তা নয় বা দীর্ঘ সময় ধরে খ্যাতির শীর্ষে থাকার ফলে নার্সিসিজম থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন, এমনটাও বলা যায় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সমস্ত সময় খ্যাতি ও সাহিত্যিক সাফল্যকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। আমাদেরকে (এবং নিজেকেও) বারবার মনে করিয়ে দিতেন যে তলস্তয়, প্রুস্ত আর বোর্হেস নোবেল পাননি। যেমন পাননি তাঁর প্রিয় লেখক ভার্জিনিয়া উলফ, হুয়ান রুলফো ও গ্রাহাম গ্রিন। মাঝে মাঝে তাঁর মনে হত যে এই সাফল্য তিনি অর্জন করেননি, তাঁর জীবনে ঘটে গেছে মাত্র। কখনও নিজের প্রকাশিত বই ফিরে পড়তেন না (অবশ্য শেষ বয়সে যখন তাঁর স্মৃতি ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল তখন এই কাজটা অনেকবার করেছেন)এই ভয়ে যে অসম্পূর্ণতা খুঁজে পেতে পারেন আর সেটা তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে ব্যহত করবে।

১১

দু’দিনের জন্য আমাকে লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিরতে হল। সেখানে একটা চলচ্চিত্রের এডিটিংয়ের কাজ করছিলাম। গল্পটা হল বাবা আর ছেলের। যে দৃশ্যটা নিয়ে তখন কাজ করছিলাম, একটা দীর্ঘ ক্লাইম্যাক্সের দৃশ্য, সেখানে একটার পর একটা ঘটনার মধ্যে দিয়ে বাবা ধীরে ধীরে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে এবং তার জন্য সম্ভবত ছেলেটিও খানিকটা দায়ী। দৃশ্যটি খুবই করুণ, একটা দুর্ঘটনার পর সংঘর্ষ হল, তারপর মৃতদেহ বহন করে আনা হল, তাকে ধোয়া হল, তারপর শেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মৃতদেহটি ধ্বংস হয়ে গেল আর এই পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে গেল বাবা। যখন নিজের বাবার জীবনের শেষ কয়েকটা মাত্র দিন কি কয়েকটা সপ্তাহ বাকি, তখন এরকম একটা বিষয় নিয়ে কাজ করতে গেলে যে ভয়ংকর অনুভূতির সম্মুখীন হতে হবে তা কারুর পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবুও ঈশ্বরের পরিহাস হিসাবেই তাকে মেনে নিলাম। কিন্তু সময় যত এগোতে থাকল এই দৃশ্যগুলো নিয়ে আর অনায়াসে কাজ করে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। আমি শ্রান্ত, বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছিলাম। এই রকম একটা গল্প লেখার জন্য তখন নিজের উপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তখন প্রচুর চকোলেট খেতাম আর ভাবতাম যে গল্প আমাদের হাসায় সেটা লেখাই বোধহয় সবথেকে ভালো। আমি নিশ্চিত, পরের বার তাই-ই করব। অথবা হয়তো তা করব না।  

চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবে কাজ শুরু করার প্রথম দিকে অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন কোন কোন শিল্পীর কাজ আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। আমি বেশ সতর্কতার সঙ্গে নামের একটা তালিকা বলতাম। মোটামুটি একটা নিজস্বতা বজায় রাখার চেষ্টা করতাম, তবে অনেক নামই ছিল অবধারিত। কিন্তু একটা পর্যায়ে পৌঁছে বুঝতে পারলাম যে আসলে আমি সত্যকথন থেকে বিরত থেকেছি। কোনও পরিচালক, লেখক, কবি, এমনকি কোনও ছবি বা গান আমাকে যা প্রভাবিত করেছে তার থেকে ঢের ঢের বেশি প্রভাবিত হয়েছি আমার বাবা-মায়ের দ্বারা, আমার ভাই, আমার স্ত্রী আর আমার মেয়েদের দ্বারা। জীবনের সমস্ত মূল্যবান শিক্ষা মানুষ মূলত বাড়ি থেকেই  শেখে।

১২

এক সপ্তাহের একটু বেশি হল বাবা হাসপাতাল থেকে বাড়ি এসেছেন, কিন্তু মেহিকো থেকে ফিরে আসার পর মাকে এর মধ্যেই খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আমার কি মনে হয় যে সত্যি সত্যিই আরও কয়েকটা মাস বাকি। এমনভাবে প্রশ্নটা করলেন যে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম এই সময়কে ধারণ করার ক্ষমতা তাঁর নেই। বাবার জন্য বাড়িতে অত্যন্ত সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাঁকে রাখা হয়েছিল প্রধান শোবার ঘরগুলোর থেকে একটু দূরে, দিনে-রাতে সর্বক্ষণ দেখাশোনার লোক ছিল এবং সর্বোপরি তিনি বেশ শান্তই ছিলেন। বাড়ির বাকি অংশে মনেও হত না যে সেখানে অস্বাভাবিক কিছু ঘটে চলেছে। কিন্তু আমার মায়ের কাছে বাবার ওই ঘরটার ঘড়ির টিকটিক শব্দটাকেও মনে হত বড় দীর্ঘ আর গির্জার ঘণ্টাধ্বনির মতো উচ্চকিত।

মাকে বললাম, অত দিন বোধহয় পাব না। তবে সেকথা বলেছিলাম শুধুমাত্র মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। পরের দিন সকালে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এলেন এবং বেশ কিছুক্ষণ ধরে বাবাকে পরীক্ষা করার পর মত বদলালেন: মনে হয় না আরও কয়েক মাস, বড় জোর আর কয়েক সপ্তাহ। মা চুপচাপ কথাটা শুনলেন সিগারেট খেতে খেতে, সম্ভবত একই সঙ্গে স্বস্তি ও বেদনার বোধ তাঁকে ঘিরে ধরল।

বেশ কিছুক্ষণ পরে বছর চল্লিশের একজন বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ এসে মাকে বোঝাতে লাগলেন শেষের সেই সময়ে কিভাবে যত্ন নিতে হবে। তখনও পর্যন্ত যতজন চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে তাঁদের মধ্যে ইনিই সর্বকনিষ্ঠ। ব্যাপারটা বেশ অপ্রত্যাশিতই ছিল, কেননা এরকম একজন যুবক বার্ধক্যের সমস্যা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হবেন তা আর কে আশা করে। মা তো তাঁকে প্রায় জেরা করলেন, যেমন সবাইকে করেন। চিকিৎসক আমাদেরকে বললেন যে বাবার একটা লিম্ফ নোড ক্যান্সার হয়েছে যা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তখন তাঁকে একেবারে অন্যরকম মনে হল, যেন খুবই বিষণ্ণ হয়ে পড়েছেন। তাঁর নিজের থেকে বয়সে অনেক বড় রোগীর মুমূর্ষু অবস্থার সামনে তিনি নিশ্চয়ই অস্থির হয়ে পড়েছেন। বললেন যে সেই মুহূর্তটি যখন আসবে, আমরা চাইলে স্যালাইন খুলে দিয়ে সময়কে ত্বরান্বিত করতে পারি। আমাদের ব্যাখ্যা করে বললেন যে কিছু দেশের নিয়ম অনুযায়ী কোনও অবস্থাতেই রোগীর স্যালাইন খুলে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না, যেহেতু সেখানে জলের প্রয়োজনকে মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে গণ্য করা হয়। কিন্তু মেহিকোর আইন ভিন্ন আর তাই মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে পরিবারের লোকজন স্যালাইন খুলে দেওয়ার অনুমতি দেয় আর এটা খুব একটা বিরল ঘটনা নয়। তাছাড়া রোগী তখন ওষুধের প্রভাবে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে, ফলে কষ্ট পায় না। নিঃশব্দে তাঁর সমস্ত কথা শুনলাম, যেন কোনও একটি লেখার এক অদ্ভুত স্বগতোক্তি আমরা শুনছি। কথাগুলো নির্দয় এবং অদ্ভুত। বাস্তববাদী, সহানুভূতিপূর্ণ, হননোদ্যত।

১৩

মা আর আমি একসঙ্গে বসে টিভিতে খবর দেখছি, হঠাৎ আমাকে বললেন: “আমাদের তৈরি থাকতে হবে কেননা একটা সার্কাস হতে চলেছে।” বাবার মৃত্যুর মুহূর্তে গোটা পৃথিবীর সংবাদ মাধ্যম, পাঠক ও বন্ধুদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়ার সূচনা হবে মা তার কথাই বলছিলেন। বাবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই অসংখ্য মানুষ ফোন করতে ও চিঠি লিখতে শুরু করেছিলেন। তারপর কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ঘোষণা করল যে তিনি বাড়ি ফিরে গিয়েছেন, জীবনের অন্তিম সময়টুকু যাপনের জন্য। তাঁর ৮৭ বছর বয়স, সুতরাং যে কোনও সময়ে কিছু একটা ঘটে যেতে পারে।

ভায়ের সঙ্গে আলোচনা করে স্থির করলাম বাবা মারা যাওয়ার পরেই কয়েকজন সাংবাদিক, যাঁদের সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ আছে, তাঁদের ফোন করতে হবে। তবে সেটা খুব বেশি নয়: কলোম্বিয়ার দুজন, একজন সে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রের আর অন্যজন, বছর কুড়ি বয়সে বাবা যে সংবাদপত্রে প্রথম কাজ শুরু করেন, সেখানকার। আর মেহিকোতে দেশের প্রধান সাংবাদিকদের মধ্যে অন্যতম এক মহিলা সাংবাদিক, যিনি রেডিও ও টিভির সংবাদের সঙ্গে যুক্ত। তাছাড়া কয়েকজন নিকট বন্ধুদের জানাতে হবে, যাঁরা তাঁদের সুবিধামতো খবরটি প্রচার করবেন। এঁদের মধ্যে অবশ্যই ছিলেন বাবার এজেন্ট ও বান্ধবী, বার্সেলোনার এক দম্পতি এবং এক ভাই, যিনি কলোম্বিয়ায় তাঁর পরিবারের অন্যতম মূল স্তম্ভ। যদিও এঁরা সকলেই এই অন্তিম পরিস্থিতি সম্বন্ধে অবগত ছিলেন।

টীকা:

১। পেররো বুররো: পেররো অর্থাৎ কুকুর আর বুররো অর্থাৎ গাধা।

২। সিয়েস্তা: ভাতঘুম


আগের পর্ব

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | দ্বিতীয় পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

Monday, November 15, 2021

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | দ্বিতীয় পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”


একান্ত আপনজনের মৃত্যু সম্বন্ধে লিখতে গেলে একটা দূরত্বের প্রয়োজন, সময়ের দূরত্ব। ঘটনাটা যেন অনেক পুরোনো হয়, লেখনি নিজে যতটা প্রাচীন, ততটা। তাই এ লেখার কাজে হাত দিতেই গলার কাছে কি যেন একটা দলা পাকিয়ে উঠল। বিষয়গুলো এক এক করে নির্দিষ্ট করে নেওয়ার কথা ভাবতেই আমি ভয়ে কেঁপে উঠলাম, তারপর সেগুলো লিখতে গিয়ে ভীষণ বিব্রত বোধ করছিলাম আর তাদের ফিরে পড়তে গিয়ে একেবারে হতোদ্যম হয়ে পড়লাম। আসলে, আমার বাবার খ্যাতিই এই লেখার ক্ষেত্রে মানসিক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করছিল। লেখার প্রয়োজনীয়তার চেয়েও তখন বড় হয়ে দাঁড়াল আমার দ্বিধা। মনের মধ্যে বারবার সন্দেহ হচ্ছিল, আজকের মধ্যমেধার বাজারে নিজের খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি না তো। তার চেয়ে বোধহয় খ্যাতির অন্তরালে থেকে না লেখাই ভালো ছিল। আসলে তো আমি আড়ালে থাকাটাই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। কিন্তু লেখনির ক্ষেত্রে যা ঘটে, লেখক বিষয়কে নয় বরং বিষয় লেখককে বেছে নেয় আর তখন সমস্ত বাধাই অকৃতকার্য হয়ে যায়।

মাস কয়েক আগে এক বান্ধবী আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, স্মৃতিশক্তি হারিয়ে আমার বাবা কেমন আছেন? তাকে বললাম, তিনি শুধুমাত্র বর্তমান সময়ে বেঁচে আছেন, অতীতের বোঝা নেই, ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাও নেই। অতীতের অভিজ্ঞতার উপর ভর করে বা গল্পের অন্যতম উৎসের মতো পূর্ব অভিজ্ঞতার বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যে ভবিষ্যতের দর্শন, তাঁর জীবনে তার আর কোনও ভূমিকা নেই। 

-তাহলে তিনি বুঝতে পারছেন না যে মারা যাবেন, বান্ধবীটি বলল, কি সৌভাগ্যবান!

বান্ধবীকে যা বলেছিলাম তা প্রকৃত বাস্তবের একটি সরলিকৃত অংশ মাত্র। বাবার চৈতন্যে তখনও পর্যন্ত অতীতের ছাপ রয়ে গিয়েছিল। যেমন ভাবে আগে অন্যদের সঙ্গে কথা বলতেন, একটার পর একটা প্রশ্ন করে, ‘কেমন আছো?’ ‘এখন কোথায় থাকো?’, ‘বাড়ির সবাই কেমন আছে?’, সেই অভ্যাসের প্রতিধ্বনির মতো তিনি কথা বলে যেতেন। কিন্তু মাঝে মাঝে আরেকটু বেশি কিছু বলতে যেতেন, আর তখনই খেই হারিয়ে ফেলতেন মাঝপথে। ভুলে যেতেন কি নিয়ে কথা বলছিলেন আর চুপ করে যেতেন। তখন তাঁর সেই বিভ্রান্ত অবস্থা (সিগারেটের ধোঁয়ার ক্ষণিক উপস্থিতির মতোই তাঁর মুখে লজ্জার অরুণাভা মুহূর্তের জন্য খেলা করে যেত) দেখে বোঝা যেত এরকমভাবে কথা বলে যাওয়াটা একসময় তাঁর কাছে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার মতোই স্বাভাবিক ছিল। রসিকতা, আনন্দ, স্মৃতিমেদুরতা আর উত্তেজনায় ভরপুর সেই সব কথোপকথন। তাঁর সব বর্ষীয়ান বন্ধুরা বলতেন যে তিনি লেখায় যেমন আলাপেও তেমন সমান প্রতিভাধর। ভবিষ্যতের ভাবনাও যে পুরোপুরি ত্যাগ করেছিলেন এমনটা নয়। সন্ধ্যে হলে মাঝে মাঝেই জিজ্ঞাসা করতেন, ‘আজ রাতে আমরা কোথায় যাব? বেশ আনন্দ হয় তেমন একটা জায়গায় যাওয়া যাক। চলো নাচতে যাই। কেন? কেন নয়?’ প্রসঙ্গটা একটু পালটে দিলেই ভুলে যেতেন কি বলছিলেন এতক্ষণ।  

বাবা মাকে চিনতে পারতেন আর কত নামে যে তাঁকে ডাকতেন: মেচে, মেরসেদেস, জননী, লা মাদ্রে সান্তা। কিন্তু কিছু দিন আগে কয়েক মাসের জন্য পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়েছিল। তখন সারা জীবনের সঙ্গিনী নিজের স্ত্রীর কথা মনে করতে পারলেও সামনে যে মহিলাটি রয়েছেন, তিনি-ই যে তাঁর স্ত্রী, সেকথা হাজারবার বললেও বিশ্বাস করতে পারতেন না। 

-এই মেয়েটি আমার কেউ নয়, তবে কেন সে এখানে রয়েছে আর বাড়ির সব কাজ দেখাশোনা করছে?

মা তখন রেগে উঠতেন। 

-‘কি হয়েছে ওর?’ অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞাসা করতেন। 

-বাবা এটা করছে না মা, করছে ওঁর ডিমেন্সিয়া।

মা আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি তাঁকে ভুল বোঝাচ্ছি। আশ্চর্যজনকভাবে এই পর্যায়টা কেটে গেল এবং বাবার স্মৃতিতে মা আবার তাঁর নিজের জায়গা ফিরে পেলেন, তাঁর সেই আজীবনের সহচরী। সেটাই ছিল তাঁদের শেষ বন্ধন। তাঁর সেক্রেটারি, গাড়ির চালক, রাঁধুনি-- যাঁরা দীর্ঘদিন এ বাড়িতে কাজ করেছেন তাঁদের সবাইকে চিনতে পারতেন। তাঁরা সবাই ছিলেন কাছের মানুষ, পছন্দের মানুষ, যাঁরা তাঁকে আগলে রাখবেন। কিন্তু কারুর নাম মনে রাখতে পারতেন না। আমি আর আমার ভাই যখন তাঁকে দেখতে যেতাম খুব সতর্কভাবে অনেকক্ষণ ধরে আমাদের দেখতেন, যেন একটা প্রবল কৌতূহলের ব্যাপার। আমাদের মুখ দেখে বহুদিন আগের কিছু একটা মনে পড়ত হয়তো, কিন্তু আর আমাদের চিনতে পারতেন না। 

-পাশের ঘরে ওরা কারা? কর্মচারীদের একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন।

-আপনার ছেলেরা।

-সত্যি? ওই লোকগুলো? ধুর ছাই, বিশ্বাসই করা যায় না। 

বছর দুয়েক আগে একটা ভয়ংকর দুঃসময় এসেছিল আমাদের জীবনে। বাবা তখন পরিষ্কার বুঝতে পারছিলেন যে ধীরে ধীরে তাঁর স্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। এই কথাটা বার বার বলতেন আর সমানে আমাদের সাহায্য চাইতেন। একটা মানুষকে ওই চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে দেখা এবং একই কথার বারংবার পুনরাবৃত্তি সহ্য করা যে কি ভয়ানক! বাবা বলতেন, ‘আমার কাজই হল স্মৃতিকে নিয়ে। স্মৃতি হচ্ছে আমার কাজ করার যন্ত্র ও প্রাথমিক উপাদান। সেই স্মৃতি ছাড়া আমি কাজ করতে পারব না, তোমরা আমায় দয়া করে সাহায্য করো।’ তারপর এই কথাটাই বিভিন্ন ভাবে বলে যেতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে। খুবই বিধ্বস্ত হয়ে পড়তেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পর্যায়টা চলে গেল। খানিকটা শান্ত হয়েছিলেন আর মাঝে মাঝে বলতেন:

-আমার স্মৃতিভ্রংশ হচ্ছে, কিন্তু তা যে হারিয়ে ফেলছি সৌভাগ্যক্রমে সেটাই আমি ভুলে যাচ্ছি।

অথবা,

-সবাই এমন করে যেন আমি একটা বাচ্চা ছেলে। তবে সেটা আমার মন্দ লাগে না।  

বাবার সেক্রেটারি আমাকে বলেছিলেন, একদিন বিকেলে তাঁকে দেখতে পান বাগানের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে, তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ বহু দূরে, গভীর কোনও ভাবনায় যেন ডুবে আছেন। 

-এখানে কি করছেন, দোন গাব্রিয়েল?

-কাঁদছি।

-কাঁদছেন? কই না তো?

-হ্যাঁ কাঁদছি, তবে চোখ দিয়ে জল পড়ছে না। বুঝতে পারছ না যে আমার মাথায় আর কিছুই নেই?  

 আরেকদিন সেক্রেটারিকে বললেন:

-এটা আমার বাড়ি নয়। আমি আমার বাড়ি যাব। আমার বাবার বাড়িতে। সেখানে বাবার খাটের পাশেই আমার খাট আছে। 

 আমাদের সন্দেহ হচ্ছিল যে উনি বাবার কথা নয়, বলছিলেন দাদামশাই কর্নেলের কথা (কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার চরিত্র যাঁর আদলে গঠিত)। আট বছর বয়স পর্যন্ত তিনি দাদুর সঙ্গে ছিলেন এবং তিনিই তাঁকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁর খাটের পাশে একটা ছোট্ট তোষকের উপর আমার বাবা ঘুমোতেন। ১৯৩৫ সালের পরে আর তাঁদের দেখা হয়নি।

-এরকমই অবস্থা হয়েছিল আপনার বাবার, তাঁর সহকারী আমায় বলেছিলেন, কি সুন্দরভাবে সব কিছু বলতেন, এমনকি ভয়ংকর ব্যাপারও। 

একদিন সকালে চিকিৎসা সঙ্ক্রান্ত জিনিষপত্র ভাড়া দেয় এমন একটি কোম্পানির এক মহিলা কর্মচারী এসে একটা খাট দিয়ে গেলেন। বাবার সেক্রেটারির নির্দেশ অনুসারে তিনি সেটাকে গেস্টরুমে রাখলেন। কিছুক্ষণ পরে, রাতের খবরে সেই মহিলা দেখলেন যে অ্যাম্বুলেন্সে করে আমার বাবাকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তখন তিনি বুঝতে পারলেন কার জন্য ওই খাট তিনি এনেছিলেন। পরের দিন তাঁর মালিকের নাম করে একটি চিঠিতে তিনি আমাদের লেখেন, বাবার জন্য খাটটি দিতে পারায় তাঁরা গর্বিত এবং তার জন্য অবশ্যই কোনও টাকা দিতে হবে না। আমার মা প্রথমে এটা মেনে নিতে চাননি, কারণ তিনি মনে করতেন যে সমস্ত খরচ নিজেদের পকেট থেকেই করা উচিত। তবে পরে তাঁকে আমরা বোঝালাম যে এক্ষেত্রে বিরোধীতা না করাই শ্রেয়।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসার পর বাবার ডিসচার্জ সার্টিফিকেট একটি ট্যাবলয়েডে প্রকাশিত হল। সম্ভবত আমার ভায়ের হাত থেকে সার্টিফিকেটটা পড়ে গিয়েছিল এবং হাসপাতালে দেখা করতে আসা কোনও এক মহিলা সেটা কুড়িয়ে পান। তিনি সেটা দেন তাঁর মেয়েকে, যার তখন একটা অপারেশন হয়েছিল এবং সে বাবার লেখার খুব ভক্ত ছিল। কিন্তু সেখান থেকে কিভাবে যে কাগজটা খবরের কাগজের অফিস অবধি পৌঁছে গিয়েছিল সেটা এখনও একটা রহস্যই রয়ে গেছে।

যে মুহূর্ত থেকে রটে গেল যে আমার বাবা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন গণমাধ্যমের লোকজন এবং তাঁর গুণমুগ্ধরা একে একে বাড়ির বাইরে জড়ো হতে শুরু করলেন। হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসার দিন প্রায় শ’খানেক লোকের ভিড় ছিল বাড়ির সামনে। এমনকি সরকার থেকে পুলিশ পোস্টিং করা হল যাতে বাড়ির মূল ফটকের সামনের নির্দিষ্ট একটা অংশ পর্যন্ত কেউ না আসতে পারে। অ্যাম্বুলেন্সটাকে গ্যারেজের মধ্যে উলটো দিকে মুখ করে ঢোকানো হল। কিন্তু সেটা এত বড় যে দরজা খোলার জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। আমার ভাই, বাড়ির একজন কর্মচারী ও বাবার সেক্রেটারি একটা চাদরকে পর্দার মতো উপরে তুলে ধরলেন যাতে কেউ ছবি তুলতে না পারে আর তখনই বাবাকে অ্যাম্বুলেন্সের পেছন দিক দিয়ে বের করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল। তারপর যখন দেখলাম যে আমাদের সামান্য ব্যক্তিগত পরিসরটুকু রক্ষা করতে আমার ভাই যে চাদর ঝুলিয়ে রেখেছিল সেই ছবিটাও প্রকাশিত হয়ে গেছে, তখন আমি সত্যি সত্যিই রেগে উঠেছিলাম। কিন্তু তারপর নিজেকে বললাম, শান্ত হও, কারণ দরজার বাইরে এই যে এত মানুষ জড়ো হয়েছেন তাঁদের অধিকাংশই বাবার ভক্ত পাঠককুল এবং বাকিরা কোনও ছোটখাটো পত্রিকার নয় বরং গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ মাধ্যমের সব প্রতিনিধি। 

বন্ধু-বান্ধব বা চিকিৎসক যাঁরাই বাড়ির ভেতরে ঢুকছেন বা বেরোচ্ছেন সাংবাদিকেরা তাঁদেরকে সঙ্গে সঙ্গে ছেঁকে ধরছেন নতুন খবর জানার জন্য। এঁদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তখন আমরা অন্য একটা গ্যারেজ ব্যবহার করতাম এবং গ্যারেজে গাড়ি ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ করে দিতাম। বাবার সেক্রেটারি আমায় একটা ঘটনার কথা বলেছিলেন। সেই সপ্তাহে একদিন আমার মা বাইরে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু ফেরার সময় গ্যারেজের দরজা খুলতে পারেননি। তখন কয়েক পা এগিয়ে মূল দরজা দিয়ে ঢোকা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। কিন্তু যেই তিনি গাড়ি থেকে নামলেন স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা ও আবেগে সঙ্গে সঙ্গে পুরো রাস্তাটা নিঃস্তব্ধ হয়ে গেল। তিনি মাথাটা একটু হেলিয়ে, যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছেন এমনভাবে সেই পথটুকু পার হয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁকে খুব একটা উত্তেজিত বলে মনে হল না, এমনকি চারপাশের সবাই যে চুপ করে গেল সে ব্যাপারেও সম্পূর্ণ উদাসীন, যেন মনে হচ্ছিল নিজের শোবার ঘর থেকে বাথরুমের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। আমার বাবা প্রায়ই বলতেন মায়ের মতো এমন আশ্চর্য মানুষ তিনি আর কখনও দেখেননি।

বাবাকে আমরা তাঁদের শোবার ঘরে রাখলাম না, কেননা তাতে মায়ের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে। তাঁকে রাখলাম বারান্দার প্রান্তের একটা ঘরে যেটা গেস্টরুম হিসেবে ব্যবহৃত হত, আবার মাঝে মাঝে প্রোজেক্টর লাগিয়ে সিনেমাও দেখা হত। কয়েক দশক আগে ওখানে একটা বড় ছাদ ছিল আর কলেজের সব ছেলেমেয়েরা এসে সিগারেট খেত। তবে পরে জায়গাটাকে ঘিরে দেওয়া হয়।

হাসপাতালের মতো খাটে শুইয়ে দেওয়ার পর বাবার প্রথম কথা, ‘বাড়ি যাব’। বেশ বিরক্ত হয়ে ফিসফিস করে প্রায় অবোধ্য স্বরে বললেন। মা তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে তিনি বাড়িতেই আছেন। কিন্তু অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে চারপাশে তাকালেন, মনে হল না যে কিছু চিনতে পারছেন। তিনি ডান হাতটা তুললেন, বেশ কাঁপছে, তারপর তাকে মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে একটা ভঙ্গী করলেন যা একেবারেই তাঁর নিজস্ব। হাতটা প্রথমে কপালে রাখলেন, তারপর চোখের উপর ধীরে ধীরে বুলিয়ে চোখদুটো বন্ধ করলেন। এরপর ভ্রু কুঁচকে ঠোঁটদুটো টিপে বন্ধ করলেন। যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, বা গভীর মনোযোগ দিতেন কিংবা কিছু শুনে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে যেতেন, তখন এই ভঙ্গীটা করতেন। সাধারণত কারুর কোনও কষ্টের কথা শুনেও এরকম করতেন। পরের কয়েক দিন এই ভঙ্গীটা ঘনঘন করতে লাগলেন।

বাবাকে দেখাশোনা করার জন্য সাধারণত দুজন লোক ছিলেন। তার সঙ্গে দু’জন নার্স দিনে ও রাতে পালা করে তাঁর কাছে থাকতেন। দিনের বেলার নার্সটি ছিলেন সত্যিই অসাধারণ। হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়ার সময় ওখান থেকেই তাঁকে সুপারিশ করেছিল। তাঁর বয়স তখন তিরিশের কোঠার শেষের দিকে। বিবাহিতা তবে অপুত্রক, খুবই ভদ্র ও শান্ত, আত্মবিশ্বাসী এবং খুব হাসিখুশি। তিনি সমস্ত কিছু নিখুঁতভাবে, পরিষ্কার হাতের লেখায় লিখে রাখতেন। ওষুধ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিষ নির্ভুলভাবে গুছিয়ে রাখতেন আর ঘরের পর্দাগুলো এমনভাবে খোলা-বন্ধ করতেন যাতে সারা দিন ঘরের মধ্যে একটা শান্ত, স্তিমিত আলো খেলা করে। তাঁর কাজের দক্ষতা ও সুমধুর ব্যক্তিত্ব তাঁকে অপরিহার্য করে তুলেছিল। সর্বোপরি রোগীর প্রতি ছিল তাঁর সস্নেহ ভালোবাসা। বাবাকে ডাকতেন ‘ডার্লিং’ বা ‘ছোট্ট সোনা’ বলে। শুধু একবারই তাঁকে উত্তেজিত হতে দেখেছিলাম। চিকিৎসকের শেষ নির্দেশগুলো দেখতে গিয়ে একটা অসঙ্গতি তাঁর চোখে ধরা পড়ল। বাবার নির্দেশ ছিল সেই রকম সময় উপস্থিত হলে তাঁকে যেন কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা নাহয়। নার্সটির মনে হয়েছিল চিকিৎসকের নির্দেশ যেন বাবার ইচ্ছার সঙ্গে মিলছে না। অন্য সমস্ত কাজ পাশে সরিয়ে রেখে টানা আধ ঘন্টা ধরে সব কাগজপত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন ও ফোনে বিভিন্ন মেসেজ পাঠালেন। শেষ পর্যন্ত কার্ডিয়োলজিস্টের সঙ্গে কথা বলে তবে নিশ্চিন্ত হলেন। তারপর মা যখন তাঁর শেষ স্বাক্ষরটা করলেন এবং আমি বললাম যে সব কিছু আমাদের ইচ্ছানুযায়ী হয়েছে, তবেই তিনি আশ্বস্ত হলেন এবং নিজের কাজে ফিরে গেলেন।

কখনও কখনও বাবা জেগে উঠতেন আর সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে আলোড়ন পড়ে যেত। পরিবারের লোকজন, যাঁরা তাঁর দেখাশোনা করতেন এবং অনেক সময়েই একজন গৃহ চিকিৎসক সবাই সানন্দে তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতাম। তাঁকে কত কি জিজ্ঞাসা করতাম, মন দিয়ে শুনতাম উত্তরে কি বলেন আর এভাবেই জমে উঠত আমাদের গল্প-গুজব। বাবা জাগ্রত অবস্থায় থাকলে আমাদের যে কি আনন্দ হত! আর চিকিৎসক ও নার্সরা এরকম একজন কিংবদন্তিতুল্য মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পেরে খুবই আবেগ প্রবণ হয়ে পড়তেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলায় এতই আনন্দ হত যে আমরা ভুলে যেতাম এই মানুষটা গত কয়েক বছর ধরে স্মৃতিভ্রংশের শিকার। যে মানুষটার সঙ্গে কথা বলছি তিনি আসলে হারিয়ে গেছেন, তিনি আদৌ কিছু বুঝতে পারছেন না। আসলে এই মানুষটা সেই মানুষটাই নয়। 

দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার বিছানায় তাঁর শুয়ে থাকার ভঙ্গি বদল করা হত। গায়ে মালিশ ও অঙ্গসঞ্চালন করে দেওয়া হত। তিনি জেগে থাকলে দেখতে পেতাম আরামে তাঁর চোখ বুজে আসছে। এক যুবক চিকিৎসক, যিনি হাসপাতালের প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের প্রধান এবং তাঁর বাবা ছিলেন কলোম্বিয়ার মানুষ, একদিন বিকেলে বাবাকে দেখতে এলেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন আছেন। বাবা উত্তর দিলেন, ‘খোদিদো’১। তখন যে নার্সটি ছিলেন তিনি তাঁর দীর্ঘ বিবৃতির শেষে বললেন যে বাবার যৌনাঙ্গের ত্বকে সমস্যা আছে আর সেখানে ক্রিম লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাবা কথাটা শুনে বেশ ঘাবড়ে গেলেন। কিন্তু পরমুহূর্তেই হেসে ফেললেন আর তাতেই বোঝা গেল যে তিনি মজা করছেন। তারপর ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট করার জন্য বললেনঃ ‘ও আসলে আমার বিচির কথা বলতে চেয়েছে।’ সবাই তখন হো হো করে হাসছে। মনে হত তাঁর রসবোধ তাঁর স্মৃতিভ্রংশতাকেও জয় করতে পেরেছিল। সেটা ছিল তাঁর সত্ত্বারই অংশ। নিজের শরীরের ব্যাপারে বাবা বেশ সতর্ক ছিলেন, প্রায় লাজুকই বলা চলে। তবে যেভাবে সবাই তাঁর সেবা করেছিলেন তাতে কখনই তাঁর সম্ভ্রম এতটুকু ব্যাহত হয়নি। যে সহৃদয় সেবা তিনি পেয়েছিলেন তাতে নিশ্চয়ই খুশি হয়েছিলেন। 

দু’জন নার্স, দু’জন সহকারী এবং ঘরের কাজের একজন বা দুজন মেয়ে তাঁদের পালা বদল করার সময় কয়েক মিনিটের জন্য নিজেদের মধ্যে কথা বলে নিতেন। বাবার সেক্রেটারি বিছানার চাদর বদল করার সময় একবার বলেছিলেন যে তিনি শুনেছিলেন বাবার পা নাকি খুব সুন্দর ছিল। অন্য মহিলারা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দিকে তাকান এবং সায় দেন। আমি জানিনা কোন চুলো থেকে এইসব কথা তাঁরা আমদানি করতেন। তবে এসব ব্যাপারে বেশি প্রশ্ন না করাই শ্রেয়। 

কখনও কখনও মহিলাদের সম্মিলিত কন্ঠস্বরে তিনি জেগে উঠতেন। চোখ খুলতেন আর যেই ওই মহিলারা তাঁর দিকে ফিরে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে তাঁর কুশল জিজ্ঞাসা করতেন সঙ্গে সঙ্গে চোখদুটো জ্বল জ্বল করে উঠত। এরকমই একটি সময়ে আমি তাঁর পাশের ঘরে ছিলাম। শুনতে পেলাম যে মেয়েগুলো খুব হাসছে। ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে। তাঁরা আমাকে বললেন যে বাবা চোখ খুলে খুব মনোযোগ দিয়ে তাঁদের দেখেছেন এবং তারপর শান্ত স্বরে বলেছেন:

-তোমাদের সবার সঙ্গে একসঙ্গে পারব না। 

একটু পরে, মা ঘরে ঢুকতেই, তাঁর গলার স্বর ও উপস্থিতি সবাইকে সম্মোহিত করে চুপ করিয়ে দিল।  


টীকাঃ

খোদিদো– ইংরাজি ভাষায় এর অর্থ ‘fucked’


আগের পর্ব: 

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায়

Thursday, November 11, 2021

দি গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর | ফিওদর দস্তয়েভস্কি

অনুবাদ | মলয় রায়চৌধুরী

"একেবারে অসম্ভব", আইভান হেসে বলল, "ভূমিকাসহ আরম্ভ করি তাহলে, আমি ষোড়শ শতাব্দীর কবিতায় বর্ণিত ঘটনা উল্লেখ করছি, সে একটা যুগ ছিল বটে-- যেমনটা তোমাদের স্কুলে বলা হয়েছিল-- যখন কবিদের মধ্যে উচ্চতর  ব্রহ্মাণ্ডের অধিবাসীদের ও ক্ষমতাধরদের মর্ত্যে নামিয়ে আনার আর মরজগতের প্রাণীদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করাবার দুর্দান্ত ফ্যাশন ছিল... ফ্রান্সে  নোটারিদের কেরানিরা, আর পাঁচিল-ঘেরা মঠের যাজকরাও দুর্দান্ত অনুষ্ঠান, নাটকীয় অভিনয় করতেন, যাতে ম্যাডোনা, দেবদূতরা, সন্তরা, যিশুখ্রিস্ট, দীর্ঘ দৃশ্য গড়ে তুলতেন, এমনকি স্বয়ং ঈশ্বর আসতেন, তখন সবকিছুই ছিল শিল্পহীন আর আদিম। তার একটা উদাহরণ হতে পারে ভিক্টর হুগোর নাটক, 'নতরে দেম দে প্যারিসে যাতে', মিউনিসিপ্যাল হলে, ‘লে বোন জাজমেন্ট দে লা ট্রেস-সান্তে এত গ্রাসিউজ ভিয়ার্জ মারি’ নামে একখানা নাটক লুই একাদশের সম্মানে অভিনীত হয়েছিল, সেখানে ভার্জিন মেরি নিজে উপস্থিত হয়ে তাঁর 'শুভ আশীর্বাদ' দিয়েছিলেন। মস্কোতে, প্রিপেট্রিয়ান কালখণ্ডে, প্রায় একই চরিত্রদের অভিনয়, বিশেষ করে ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে নির্বাচিত, সকলের বেশ পছন্দ ছিল। এই ধরনের নাটকগুলো ছাড়াও, পৃথিবী ছেয়ে গিয়েছিল রহস্যময় রচনায়, 'ছন্দ-কবিতায়'-- যার নায়করা সর্বদা নির্বাচিত হত দেবদূত, সন্ত আর অন্যান্য স্বর্গীয় নাগরিকদের মধ্যে থেকে, যারা সেই কালখণ্ডের ভক্তিমূলক উদ্দেশ্যে সাড়া দিতে পারত। রোমান ক্যাথলিক যাজকদের মতন আমাদের সমাজ-বিচ্ছিন্ন মঠগুলো, নিজেদের সময় কাটাতো অনুবাদ, অনুলিপি এমনকি এই ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে মূল রচনা লেখায়, আর এটা মনে রেখো, ছিল তার্তারদের সময়কালে! ..এই প্রসঙ্গে, আমি কনভেন্টে সংকলিত একটা কবিতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি-- নিঃসন্দেহে গ্রীক থেকে অনুবাদ, যাকে বলা হয়, 'অভিশপ্তদের মাঝে ঈশ্বরের মায়ের পরিভ্রমণ', যার মধ্যে রয়েছে প্রসঙ্গ অনুযায়ী ছবি আর দান্তের চেয়ে নিকৃষ্ট চিন্তাভাবনা করার সাহস। 'ঈশ্বরের মা' নরক দেখতে যান, প্রধান দেবদূত মাইকেলকে সঙ্গে করে, যে ওনার পথপ্রদর্শক হিসাবে 'অভিশপ্তবাহিনী'কে দেখায়। মা তাদের সবাইকে প্রত্যক্ষ করেন এবং তাদের নানারকম নির্যাতনের সাক্ষী হন। নির্যাতনের অন্য অনেক অসাধারণ উল্লেখযোগ্য যন্ত্রণার মধ্যে— প্রত্যেক শ্রেণীর পাপীদের নির্ধারিত বিশেষ যন্ত্রণা—  লক্ষ্য করার যোগ্য, যেমন 'অভিশপ্ত' শ্রেণীর একটা দলকে ধীরে ধীরে গন্ধক ও আগুনের জ্বলন্ত হ্রদে চুবিয়ে দেওয়া হয়। যারা পাপ করে তাদের এত নীচে ডুবিয়ে দেয়া হয় যে তারা আর ওপরে উঠতে পারে না, আর ঈশ্বর তাদের চিরকালের জন্য ভুলে যান, অর্থাৎ তারা সর্বজ্ঞের স্মৃতি থেকে মুছে যায়, লেখা হয়েছে কবিতাটায়-- এক অসাধারণ চিন্তার গভীর অভিব্যক্তি, যদি তার নীবিড় বিশ্লেষণ করা হয়। ভার্জিন মেরি ভয়ঙ্করভাবে হতবাক, এবং ঈশ্বরের সিংহাসনের সামনে কান্নায় হাঁটু গেড়ে বসেন, এবং অনুনয় করেন যে নরকে তিনি যা দেখেছেন-- সবই, সমস্ত কিছু, ওদের শাস্তি মুকুব করে দেয়া উচিত। ঈশ্বরের সাথে তাঁর কথোপকথনটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ভার্জিন মেরি বলেন, তিনি কখনও ঈশ্বরকে ছেড়ে যাবেন না। ঈশ্বর তখন ভার্জিন মেরির ছেলের বিদ্ধ হাত ও পায়ের দিকে ইঙ্গিত করে চেঁচিয়ে ওঠেন, 'আমি কীভাবে ওনার জল্লাদদের ক্ষমা করতে পারি?' তিনি তখন আদেশ দেন যে সমস্ত সন্ত, শহিদ, দেবদূত এবং প্রধান দেবদূত, তাঁকে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করবে যিনি একমেব ও অপরিবর্তনীয় এবং তাঁর ক্রোধকে দয়ায় পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ করবে-- ওদের সবাইকে ক্ষমা করুন। ঈশ্বরের সঙ্গে সমঝোতার পর কবিতাটি শেষ হয়, অনেকটা গুড ফ্রাইডে আর ট্রিনিটির মাঝের সময়টায় অত্যাচারের বার্ষিক অবকাশ, 'অতল গহ্বর' থেকে অভিশপ্তদের কন্ঠে ঈশ্বরের উচ্চ প্রশংসায় সমবেত গান, তাঁকে ধন্যবাদ দেওয়া আর এই কথা বলা:

আপনিই ঠিক, হে প্রভু, খুব সঠিক, 

ন্যায় বিচার করে আপনি আমাদের অভিশপ্ত করেছেন।

"আমার কবিতা একই চরিত্রের।" 

"এই দৃশ্যে, যিশুখ্রিষ্ট নিজে আবির্ভূত হন। সত্য, তিনি কিছুই বলেন না, কেবল উপস্থিত হন এবং দৃষ্টির বাইরে চলে যান। ক্ষমতা এবং মহান গৌরব নিয়ে আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার পর পনেরোটা শতক কেটে গেছে; তাঁর ভবিষ্যবক্তা চিৎকার করে একথা বলার পর, যে, 'প্রভুর পথ প্রস্তুত করো', পনেরোটা দীর্ঘ শতক কেটে গেছে!" যেহেতু তিনি  পৃথিবীতে থাকাকালীনই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, 'সেই দিন ও সময় কেউ জানে না, না, স্বর্গের দেবদূতরা নয়, জানেন কেবল আমার পিতা।' কিন্তু খ্রিস্টিয়জগৎ এখনও তাঁর আগমনের আশায় অপেক্ষা করে আছে। 

"একই পুরোনো বিশ্বাস আঁকড়ে আর একই আবেগে জগত তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে; হ্যাঁ, আরও বেশি বিশ্বাসের সাথে, স্বর্গ থেকে মানুষের কাছে শেষ ইশারা আসার পর পনেরো শতক কেটে গেছে,

আর অন্ধ বিশ্বাস একা থেকে গেল 

আস্থাশীল হৃদয়কে শান্ত করার জন্য, 

যেহেতু স্বর্গ আর কোনও ইশারা পাঠাবে না। 

"একথা সত্যি, আবার, আমরা সকলেই অলৌকিক ঘটনা ঘটার কথা শুনেছি, যদিও 'অলৌকিক যুগ' চলে যাবার পর আর ফিরে আসে না। আমাদের ছিল আর এখনও আছে, আমদের সন্তরা, যাঁরা অলৌকিকভাবে নিরাময় করতে পারতেন; এবং যদি আমরা  তাঁদের জীবনী লেখকদের বিশ্বাস করতে পারি, তাঁদের মধ্যে এমন লোকও ছিল যাঁদের কাছে স্বর্গের রানী নিজে এসেছিলেন। কিন্তু শয়তান তো ঘুমোয় না, আর সন্দেহের প্রথম বীজ, আর সেই সমস্ত বিস্ময়কর ব্যাপারের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস, ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে খ্রিষ্টিয়জগতে উঁকি দিতে আরম্ভ করেছিল। ঠিক সেই সময়েই জার্মানির উত্তরে এক নতুন এবং ভয়ঙ্কর ধর্মদ্রোহী প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল। [লুথারের সংস্কার] ...একটি বিশাল নক্ষত্র 'যেন তা প্রদীপের আলোর মতন ঝিকমিকে... ঝর্ণার জলে পড়ল'... এবং 'তা  তেতো হয়ে গেল।' সেই ‘ধর্মদ্রোহী’ নিন্দার সাথে 'অলৌকিক ঘটনা' অস্বীকার করল। কিন্তু যারা বিশ্বস্ত ছিল তারা আরও বেশি উৎসাহভরে বিশ্বাস করতে লাগল, মানবজাতির অশ্রুজল ঈশ্বরের কাছে আগের মতোই পৌঁছোচ্ছিল, এবং খ্রিস্টানবিশ্ব আগের মতোই আত্মবিশ্বাসের সাথে তাঁর আগমনের জন্য অপেক্ষা করছিল; লোকেরা তাঁকে ভালবাসতো এবং তাঁর উপর তাদের আস্থা ছিল, আগে যেমন লোকেরা তাঁর জন্য নিজেদের নিরম্বু ও ক্ষুধার্ত উপবাসী রেখে, দুঃখ আর যন্ত্রণাভোগ করত, ঠিক তেমনই করতো এই সময়ে... কত শতাব্দী যাবত দুর্বল আর বিশ্বাসী মানুষেরা তাঁর কাছে অনুনয়-বিনয় করেছে, বিশ্বাসভরে কেঁদেছে, বলেছে: ‘আর কতোকাল হে প্রভু, পবিত্র ও সত্য, তুমি কি আর আসবে না?’ কত দীর্ঘ শতাব্দী তাঁর কাছে নিরর্থক আবেদন করেছে যে, অবশেষে, তাঁর অপার করুণায়, তিনি প্রার্থনায় সাড়া দিতে সম্মত হলেন ...উনি নির্ণয় নিলেন যে আরেকবার, তা যদি এক ঘণ্টার জন্যেও হয়, জনগণের জন্য-- তাঁর যন্ত্রণাক্ত, অত্যাচারিত, মারাত্মক পাপী, তাঁর আদরের শিশুসন্তানের মতো, বিশ্বাসী মানুষেরা-- তাঁকে আবার দেখতে পাবে। এই ঘটনার দৃশ্যটি আমি স্পেনে নিয়ে গেছি, সেভাইলেতে, ইনকুইজিশনের ভয়ঙ্কর সময়ে, যখন, ঈশ্বরের মহিমাময় গৌরবের জন্য, সারা দেশ জুড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। 

দুষ্ট অবিশ্বাসীদের খুঁটিতে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হচ্ছিল, 

যাজকদের বিচারের জাঁকজমকের পর। 

"এই বিশেষ সফরের, অবশ্যই, প্রতিশ্রুত আগমনের সাথে কোনও সম্পর্ক নেই, যখন, নির্ধারিত দিনক্ষণ অনুযায়ী, 'সেই দিনগুলির দুর্দশার পরে,' তিনি আবিভূত হবেন 'স্বর্গের মেঘের ভেতর দিয়ে'। কারণ, 'ঈশ্বরপুত্রের আগমন', যেমনটি আমাদের জানানো হয়েছে, হঠাৎ করেই ঘটবে, 'যেমন বিদ্যুৎ পূর্ব দিক থেকে চকিতে আসে এবং পশ্চিম দিকে ঝলকানি দেয়।' না; এই একবার, তিনি অপরিচিত হয়ে আসতে চেয়েছিলেন, এবং তাঁর সন্তানদের মধ্যে উপস্থিত হতে চেয়েছিলেন। ঠিক তখনই, যখন বিধর্মীদের হাড়গুলো, যাদের জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার দণ্ড দেওয়া হয়েছিল, আগুনে ফাটার আওয়াজ শুরু করেছিল। তাঁর অপার করুণার দরুণ, তিনি আরেকবার সেই ভাবেই দেখা দিতে চেয়েছিলেন যে-রূপে পনেরো শতাব্দী আগে মর্ত্যলোকে এসেছিলেন। তিনি ঠিক সেই সময়েই নেমে আসেন যখন রাজা, দরবারের সদস্যরা, সেনানীরা, যাজকরা, আর রাজদরবারের সুন্দরীরা, সেভাইলের সমস্ত মানুষের সামনে, একশোর বেশি বিধর্মী বজ্জাতকে ভয়াবহ ‘অটো-দা-ফে অ্যাড মেজরমে দেই গ্লোরিয়ামে’ জ্যান্ত পোড়ানো হচ্ছে, কার্ডিনাল গ্র্যান্ড ইনকুইজিটরের আদেশে। তিনি চুপচাপ এবং অঘোষিত এসেছেন; তবুও সবাই-- কত অদ্ভুত-- হ্যাঁ, সবাই তাঁকে তক্ষুনি চিনতে পারে! জনগণ তাঁর দিকে ছুটে যায়, যেন তারা কোনও অপ্রতিরোধ্য শক্তি দ্বারা আকর্ষিত; তারা তাঁকে ঘিরে ধরে, তাঁর চারপাশে ঠেলাঠেলি ভিড় করে, তারা তাঁকে অনুসরণ করে... নিঃশব্দে, তাঁর ঠোঁটে অসীম মমতার মৃদু হাসি, তিনি ঘন ভিড় অতিক্রম করেন, এবং হালকা পায়ে এগিয়ে যান। প্রেমের সূর্য তার হৃদয়ে উদ্ভাসিত, এবং তাঁর চোখ থেকে আলো, প্রজ্ঞা ও শক্তির উজ্জ্বল রশ্মি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, এবং তাঁকে ঘিরে জড়ো হওয়া জনগণের ওপর ঝরে পড়ছিল, তাদের হৃদয়কে ভালোবাসায় স্পন্দিত করে তুলছিল। তিনি তাঁর হাত তাদের মাথায় বুলিয়ে দিলেন, আশীর্বাদ করলেন, আর তাঁর সামান্য ছোঁয়ায়, এমনকি তাঁর পোশাক থেকে, একটি নিরাময়কারী শক্তিপ্রবাহ বইতে থাকে। একজন বৃদ্ধ, জন্ম থেকে অন্ধ, কাকিয়ে ওঠে, 'প্রভু, আমাকে সুস্থ করুন, যাতে আমি আপনাকে দেখতে পারি!' আর তার অন্ধ চোখ থেকে আবরণ খসে পড়ে, এবং অন্ধ লোকটি তাঁকে দেখতে পায়... জনগণ আনন্দে কাঁদতে আরম্ভ করে, এবং যে মাটিতে তিনি পা রাখছিলেন সেখানটায় সবাই চুমু খেতে থাকে। শিশুরা তাঁর চলার পথে ফুল ছিটিয়ে আশীর্বাদ পাওয়ার গান গায়! এ তো তিনিই, তিনি নিজেই, তারা একে অপরকে বলে, ইনি অবশ্যই ঈশ্বরপুত্র স্বয়ং, তিনি ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না! পুরানো গির্জার প্রবেশপথে তিনি থামেন, ঠিক তখনই একটি সাদা রঙের কফিন ভেতরে নিয়ে আসা হচ্ছিল, বহনকারীরা বিলাপ করে জোরে-জোরে কাঁদছিল। কফিনের ঢাকনা খোলা, আর তাতে শয়ানো একটি ফর্সা শিশু, সাত বছর বয়সী, শহরের একজন বিশিষ্ট নাগরিকের একমাত্র সন্তান। ছোট্ট শবটি ফুলের তলায় চাপা পড়ে আছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত যাজক, যিনি শবযাত্রীদের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন, তাকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিল এবং যাজক ভ্রূকুটি করলেন। হঠাৎ একটি ক্রন্দনরত চিৎকার শোনা যায়, এবং শোকাহত মা ঈশ্বরপুত্রের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে থাকে। 'যদি তুমিই সেই হও, তাহলে আমার সন্তানকে জীবিত করে তোলো!' শবযাত্রীদের মিছিল থেমে যায়, এবং ছোট্ট কফিনটি আলতো করে তাঁর পায়ের কাছে নামানো হয়। ঐশ্বরিক করুণা তাঁর দৃষ্টি থেকে প্রবাহিত হয়, এবং যখন তিনি শিশুটির দিকে তাকান, ঈশ্বরপুত্রের ঠোঁট দু'টিকে ফিসফিস করতে শোনা যায়, 'তালিথা কুমি' (ছোট্ট খুকি, আমি তোমাকে বলছি, উঠে পড়ো) এবং শিশুর মা শুনে থমকে যায়।' শিশুটি তার কফিনে উঠে দাঁড়ায়। তার ছোট্ট হাতদুটিতে তখনও সাদা গোলাপের গোছা, যা তার মৃত্যুর পর রাখা হয়েছিল এবং বড়-বড় বিস্মিত চোখে চারদিকে তাকিয়ে সে মিষ্টি হাসতে লাগলো... জনতা অত্যন্ত উত্তেজিত। তাদের মধ্যে ভয়ানক হইচই আরম্ভ হয়ে গেল, জনসাধারণ চিৎকার করে জোরে জোরে কাঁদতে লাগল, তখনই হঠাৎ, গির্জার দরজার সামনে, কার্ডিনাল গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর নিজেই হাজির হলেন... তিনি দীর্ঘদেহী, প্রায় নব্বুই বছর বয়সের শুকনো-মুখ বুড়ো, ভেতরে ঢোকা চোখ, যার গহ্বর থেকে দুটি জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ চমকাচ্ছিল। রোমান ক্যাথলিক চার্চের শত্রুদের ‘অটো দা-ফে’ অনুষ্ঠানে যোগ দেবার সময়ে জনগণের সামনে যে আড়ম্বরপূর্ণ কার্ডিনালের পোশাক পরেছিলেন, তা খুলে রেখে এসেছেন, আর এখন পরে আছেন পুরানো, রুক্ষ, যাজকদের ঢোলা আলখাল্লা। তাঁর নিষ্ঠুর সহকারী আর 'পবিত্র রক্ষীদলের' ক্রীতদাসরা দূর থেকে ইনকুইজিটরকে অনুসরণ করছিল। তিনি ভিড়ের সামনে থামলেন এবং এদিক-ওদিক তাকালেন। তিনি সবই দেখেছেন। তিনি ঈশ্বরের পায়ের কাছে ছোট্ট কফিন রাখার দৃশ্য দেখেছেন, জীবন ফিরে পাওয়ার সাক্ষী হয়েছেন। আর এখন, তাঁর কালো হয়ে-যাওয়া, বিষণ্ণ মুখ আরও কালো হয়ে গেছে; তাঁর লোমশ ধূসর ভ্রু একের সঙ্গে আরেক মিশে আছে, এবং তাঁর গর্তে-ঢোকা চোখে ভয়াবহ আলোয় জ্বলজ্বল করছিল। আস্তে আস্তে আঙুল তুলে, তিনি তাঁর চাকরদের নির্দেশ দেন ঈশ্বরপুত্রকে গ্রেপ্তার করতে... "সুশৃঙ্খল, বশীভূত আর এখন হাড়হিম মানুষের উপর ইনকুইজিটরের ক্ষমতা এমন, যে বিশাল ভিড় তাড়াতাড়ি পথ ছেড়ে দেয়, এবং প্রহরীদের সামনে থেকে এদিক-ওদিক পালিয়ে যায়, শীতল নীরবতার মধ্যে প্রতিবাদের টুঁ শব্দটুকুও না করে, ঈশ্বরপুত্রের গায়ে তাদের অপবিত্র হাত রাখার অনুমতি পায় এবং অপরিচিত ঈশ্বরপুত্রকে দূরে নিয়ে যায়... সেই একই লোকজন, যেন তারা একটি-মাত্র মানুষ, বৃদ্ধ ইনকুইজিটর তাদের আশীর্বাদ করার পর, সামনের মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে, ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। প্রহরীরা তাদের বন্দিকে পবিত্র বিচারের বেশ পুরোনো অট্টালিকায় নিয়ে যায়; ঈশ্বরপুত্রকে  সংকীর্ণ, অন্ধকারাচ্ছন্ন, দমবন্ধকরা কারাগারের ঘরে ঠেলে দিয়ে, তালাবন্ধ করে এবং বিদায় নেয়... "দিন শেষ হয়, এবং রাত নামে-- একটি অন্ধকার, গরম, দমবন্ধ স্প্যানিশ রাত-- সেভিল শহরে চুপি-চুপি ঢুকে পড়ে গ্যাঁট হয়ে বসে। বাতাসে চাঁপা আর কমলা ফুলের গন্ধ ভেসে আসে। বিচারসভার পুরোনো হলঘরের আদিম অন্ধকারে লোহার দরজা হঠাৎ খুলে দেওয়া হয়, এবং গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর, একটা টিমটিমে লণ্ঠন হাতে ঝুলিয়ে, আস্তে আস্তে অন্ধকূপের মধ্যে প্রবেশ করে। লোকটা একা, এবং, তার পেছনে ভারী দরজা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে সে চৌকাঠে থেমে যায়, আর এক বা দুই মিনিটের জন্য গোমড়ামুখে আর চুপচাপ  তার সামনে ঈশ্বরপুত্রের মুখমণ্ডল খুঁটিয়ে দ্যাখে। গুনে-গুনে কয়েক পা এগিয়ে, শেষ পর্যন্ত, বুড়ো ইনকুইজিটর তার লণ্ঠন টেবিলে রেখে দেয় আর এইভাবে ঈশ্বরপুত্রকে সম্বোধন করে:

"তাহলে তুমিই!... তুমি !" ... কোনও উত্তর না পেয়ে, ইনকুইজিটর দ্রুত কথা চালিয়ে যায়: "না, উত্তর দিতে হবে না; চুপ করেই থাকো!... আর তুমি কীই বা বলতে পারো?.. আমি ভালোভাবেই তোমার উত্তর জানি... তাছাড়া, তুমি এর আগে যে উক্তি করেছিলে তার সাথে একটি অক্ষরও যোগ করার অধিকার নেই তোমার... কেন তুমি এখন ফিরে এলে, আমাদের কাজে বাধা দেওয়ার জন্য? তুমি নির্ঘাৎ সেই কাজের জন্যই এসেছ, আর তুমি তা ভালো করে জানো। কিন্তু তুমি কি জানো, আগামীকাল  সকালে তোমার জন্য কী অপেক্ষা করছে? আমি জানি না, আর জানতেও চাই না যে তুমি কে: তুমি নিজেই এসেছ নাকি নিজের প্রতিকৃতি পাঠিয়েছ, আগামীকাল আমি তোমাকে দণ্ডদান করে খুঁটিতে বেঁধে পোড়াব, যেন তুমি সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাসী; আর সেই একই লোকেরা, যারা আজকে তোমার পায়ে চুমু খাচ্ছিল, কালকে আমার একটা আঙুলের ইশারায়, তারা তোমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার চিতায় আগুন দিতে ছুটে আসবে... তুমি কি এই বিষয়ে সচেতন? "লোকটা বলতে থাকে, যেন একান্ত চিন্তায় কথা বলছে, এবং একবারের জন্যও তার সামনেকার নম্র মুখ থেকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সরিয়ে নেয়নি।"

“যা বর্ণনা করা হল আমি অমন পরিস্থিতি বিশেষ উপলব্ধি করতে পারছি না-- এসব কী, আইভান?" হঠাৎ বাধা দিল অ্যালিয়োশা, যে  এতক্ষণ তার ভাইয়ের কথা চুপচাপ শুনছিল, বলে উঠল। "এটা কি এক অভিনব কল্পনা, নাকি বুড়ো লোকটার কিছু ভুল, একটা অসম্ভব লেনদেন?"  "তুমি যদি চাও তাহলে পরেরটাই হোক", আইভান হেসে বলল, "তাহলে আধুনিক বাস্তববাদ তোমার রুচিকে এতটাই বিকৃত করে দিয়েছে যে, তুমি অভিনব জগতের কোনও কিছু উপলব্ধি করতে অক্ষম বোধ করছ... তাহলে লেনদেনই মনে করা হোক, যদি তুমি তাই মনে করো। তাছাড়া, ইনকুইজিটরের বয়স নব্বুই বছর, আর ক্ষমতার আদর্শ নিরূপণ করতে-করতে পাগল হয়ে গিয়ে থাকবে; কিংবা, এটা তার দৃষ্টির বিভ্রম হতে পারে, মৃত্যুর কল্পনায় জারিত, দুপুরের শতাধিক অবিশ্বাসীকে পুড়িয়ে মারার তাপে মাথা গরম... কিন্তু কবিতাটির জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হল এই যে, এটা কি লেনদেন নাকি অনিয়ন্ত্রিত কল্পনা? প্রশ্ন হল, ইনকুইজিটরকে নিজের হৃদয়কে মুক্ত করতে হবে; শেষ পর্যন্ত তাকে তার ভাবনা প্রকাশ করতে হবে; আর নব্বুই বছর যাবত যে রহস্য মনের মধ্যে গোপন করে রেখেছে, তা জোরে-জোরে বলতে শুরু করে।” 

"এবং তার বন্দি, তিনি কি কখনও উত্তর দেন না? তিনি কি কোনও কথা না বলে, তার দিকে তাকিয়ে, চুপ করে থাকেন?" 

"অবশ্যই; আর তাছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না," আইভান উত্তরে বলে। "গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর যে কথাগুলো বলেছিল সেগুলোই আবার বলে, যে, ঈশ্বরপুত্রের বলা আগের কথার সাথে একটি অক্ষরও যোগ করার অধিকার নেই। পরিস্থিতি তক্ষুনি স্পষ্ট করার জন্য, ওপরের প্রাথমিক স্বগতসংলাপ ছিল রোমান ক্যাথলিক ধর্মের অন্তর্নিহিত মর্মার্থ বোঝানোর খাতিরে-- যেমন আমি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে পারি, লোকটার কথার মানে, সংক্ষেপে: 'তুমি পোপের কাছে সবকিছু দিয়েছিলে, এবং সবকিছুই এখন তার একার উপর নির্ভর করে; আমাদের কাজে বাধা দিতে তোমার ফিরে আসার কোনও কারণই থাকতে পারে না।' এই বিষয়ে জেসুইটরা শুধু কথাই বলে না, লেখেও একইভাবে। "তুমি কি আমাদের কাছে সেই পৃথিবীর অন্তত একটি রহস্যের কথা ফাঁস করতে পারো, যেখান থেকে তুমি এসেছ?' বুড়ো ইনকুইজিটর জিগ্যেস করে ঈশ্বরপুত্রকে, আর নিজেই তাড়াতাড়ি তার উত্তর দেয়। “না, তোমার কোনও অধিকার নেই তা বলার, কেননা তা হবে সেই একই কথা যা তুমি এর আগে বলেছিলে, যখন তুমি পৃথিবীতে ছিলে, তখন সাধারণ মানুষের জন্য যে-উদ্দেশে লড়াই করেছিলে, তাদের তা থেকে বঞ্চিত করছ... তুমি এখন নতুন যা-কিছু ঘোষণা করবে তা  পছন্দের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হবে, কারণ এটি একটি নতুন এবং অলৌকিক ব্যাপার হিসাবে প্রকাশিত হবে, যা পনেরোশো বছরের পুরানো ঘোষণাকে অতিক্রম করে যাবে, যখন তুমি বারবার জনগণকে বলেছিলে: "সত্য তোমাদের মুক্ত করবে।" তাহলে তাকিয়ে দেখো, তোমার এখনকার 'মুক্ত' মানুষদের দিকে! 'বুড়ো লোকটা টিটকিরি মেরে বলে। ‘হ্যাঁ…! তাতে আমাদের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে।’ নিজের শিকারের দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে থাকে সে। 'কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত আমাদের কাজ সম্পন্ন করেছি, এবং তা  তোমার নাম করে... কেননা দীর্ঘ পনেরো শতাব্দী ধরে সেই 'স্বাধীনতার' জন্য আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে এবং দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছে: কিন্তু এখন আমরা জয়ী হয়েছি আর আমাদের কাজ মিটে গেছে, আর তা বেশ ভালো এবং দৃঢ়ভাবে সম্পন্ন হয়েছে।... বিশ্বাস কোরো না যে তুমি এত শক্তিশালী!... এবং কেনই বা তুমি আমার দিকে ভিরু চোখে তাকাচ্ছ, যেন আমি তোমার ধিক্কারেরও যোগ্য নই?... তাহলে জেনে রাখো, লোকেরা তাদের মুক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত এবং সন্তুষ্ট বোধ করে; এবং সেকারণেই তারা নিজেদের এবং তাদের নিজস্ব ইচ্ছায়, সেই স্বাধীনতাকে, আমাদের পায়ের কাছে ঝুঁকে পড়ে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। যাই হোক, সেটাই আমরা করেছি। তুমি কি সেই জন্যই কষ্ট করেছিলে? এটা কি সেই ধরনের 'মুক্তি' যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাদের দিয়েছ?” 

"এখন, আরেকবার, তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি না," অ্যালিয়োশা বাধা দিয়ে বলল। "বুড়ো কি উপহাস করছিল এবং হাসছিল?"

"একেবারেই নয়। উনি এটাকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছিলেন, উনি মনে করেন যেন নিজে অনন্য সাধারণ মানবসেবা করেছেন, ওনার যাজকভাইরা এবং জেসুইটরা, লোকেদের স্বাধীনতাকে জয় করে এবং নিজেদের কর্তৃত্বের অধীনে নিয়ে এসে, একটি মহান কাজ করেছেন, এবং গর্বভরে মনে করেন যে তা করা হয়েছে বিশ্বের মঙ্গলের জন্য।... ‘এবার এখন’, উনি বলেন (ইনকুইজিশন সম্পর্কে), ‘আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে, প্রথমবার, মানবজাতিকে খুশি করার বিষয়ে ঐকান্তিক চিন্তা করার। মানুষ জন্মায় দ্রোহী হয়ে, আর দ্রোহীরা কি কখনও সুখী হতে পারে?... তোমাকে এ ব্যাপারে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু দেখা যাচ্ছে তা কোনও কাজে লাগেনি, কেননা তুমি মানবজাতিকে খুশি করতে পারে এমন একটিমাত্র উপায়কে প্রত্যাখ্যান করেছ; সৌভাগ্যবশত তোমার যাবার সময়ে তুমি আমাদের দায়িত্বে কাজটি দিয়ে গেছ... তুমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে, নিজের উক্তির অঙ্গীকারের মাধ্যমে, আমাদের বন্ধন ও মোচনের অধিকার দিচ্ছো... এবং নিঃসন্দেহে, এখন তুমি  আমাদের তা থেকে বঞ্চিত করার কথা ভাবতে পারো না!"

"কিন্তু 'তোমাকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছিল" কথাগুলো বলতে উনি কী বোঝাতে চাইছেন?" জানতে চাইল অ্যালেক্সিস।

"এই কথাগুলো বুড়োটাকে তার কথার ন্যায্যতার চাবিকাঠি ধরিয়ে দেয়... কিন্তু শোনো--

"ভয়ঙ্কর এবং জ্ঞানী আত্মা, আত্ম-বিনাশকারী এবং অ-সত্তার আত্মা," বলা বজায় রাখে ইনকুইজিটর, "অস্বীকৃতির মহান আত্মা তোমার সাথে বিজনপ্রদেশে কথাবার্তা বলেছিল, এবং আমাদের বলা হয়েছে যে সে তোমাকে" প্রলুব্ধ করেছিল "...এটা কি সত্যি ঘটনা? আর যদি সত্যিই তাই হয়ে থাকে, তাহলে সেই তিনটি প্রলোভনে যা ছিল, যেগুলো তুমি প্রত্যাখ্যান করেছিলে, এবং যেগুলোকে বলা হয় 'প্রলোভন', তার চেয়ে আলাদা একটিও উক্তি করা চলে না। হ্যাঁ; পৃথিবীতে যদি কোনও সত্যিকার অবাককরা অলৌকিক ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তা সেই দিনকার তোমার তিনটি প্রলোভন আর মূলতঃ এই তিনটি ছোট বাক্যে রয়েছে অনন্যসাধারণ অলৌকিকতা। যদি সম্ভব হতো যে ওগুলো চিরকালের জন্য উবে গিয়ে লোপাট হয়ে যাক, কোনও রেশ না রেখে, রেকর্ড থেকে এবং মানুষের স্মৃতি থেকে, এবং তা তোমার ইতিহাসে আরেকবার জরুরি হয়ে উঠত উদ্ভাবন করার, আবিষ্কারের,  তুমি কি মনে করো যে বিশ্বের সমস্ত ঋষি, বিধায়ক, দীক্ষাদাতা, দার্শনিক এবং চিন্তাবিদ প্রমুখদের ডেকে যদি বলা হত এইরকম তিনটি প্রশ্ন তৈরি করতে, ঘটনার বিশালত্বের পরিপ্রেক্ষিতে, যেগুলো তিনটি ছোটো বাক্যে আমাদের জগতের ভবিষ্যতের সমগ্র ইতিহাস ও মানবতাকে-- তুমি কি বিশ্বাস করো, আমি জিগ্যেস করছি তোমাকে, শক্তিশালী এবং সর্বজ্ঞ বুদ্ধির আত্মার দ্বারা বিজনপ্রদেশে তোমাকে দেওয়া তিনটি প্রস্তাবের শক্তি এবং চিন্তার গভীরতা তাঁদের সমস্ত সম্মিলিত প্রচেষ্টা কখনও অমন কিছু তৈরি করতে পারতো? শুধুমাত্র তাদের বিস্ময়কর যোগ্যতার মাপকাঠিতে বিচার করে, যে কেউ  বুঝতে পারে যে তারা একটি সসীম, পার্থিব বুদ্ধি থেকে উদ্ভূত হয়নি, বরং প্রকৃতপক্ষে, চিরন্তন এবং পরম-শাশ্বত থেকে হয়েছে। এই তিনটি প্রস্তাবে আমরা যা  খুঁজে পাই, তারা একটিমাত্র হয়ে গিয়ে আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী শুনিয়েছে, মানুষের সম্পূর্ণ পরবর্তী ইতিহাস; বলতে গেলে, আমাদের তিনটি চিত্রকল্প দেখানো হয়েছে, তাদের মধ্যে ভবিষ্যতের সমস্ত স্বতঃস্ফূর্ত, অদ্রবণীয় সমস্যা এবং বিশ্বজুড়ে মানবপ্রকৃতির পরস্পরবিরোধিতা তুলে ধরা হয়েছে। সেই কালখণ্ডে, তাদের অন্তর্গত বিস্ময়কর প্রজ্ঞা এতটা সহজবোধ্য ছিল না, যা এখন মনে হয়, কেননা ভবিষ্যত ব্যাপারটা তখন ছিল আবরণের আড়ালে ঢাকা; কিন্তু এখন, যখন পনেরো শতাব্দী পেরিয়ে গেছে, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এই তিনটি প্রশ্নে সব কিছুরই এত বিস্ময়করভাবে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, যে তাতে বাড়তি কিছু যোগ করা বা তা থেকে বাদ দেওয়া একেবারে অসম্ভব! "তাহলে নিজেই সিদ্ধান্ত নাও," ইনকুইজিটর কঠোরভাবে এগিয়ে গেল, 'দুজনের মধ্যে কোনজন সঠিক ছিলেন: যিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, নাকি যিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন? প্রথম প্রশ্নটির সূক্ষ্ম অর্থটি মনে রেখো, যা এইকথা বলে: তুমি কি খালি হাতে পৃথিবীতে যাবে? তুমি কি সেখানে মুক্তি সম্পর্কিত তোমার অস্পষ্ট এবং অনির্ধারিত প্রতিশ্রুতিসহ যেতে চাও, যা মানুষেরা, যারা প্রকৃতিগতভাবে নিস্তেজ এবং বেয়াড়া, যারা বুঝতে এতোই অক্ষম, যে তারা ভয়ে এড়িয়ে যায়? কেননা মানবজাতির কাছে ব্যক্তি-স্বাধীনতার চেয়ে অসহ্য আর কিছু ছিল না। তুমি কি এই পাথরগুলোকে নির্জন এবং উজ্জ্বল বিজনপ্রদেশে দেখেছ? এই পাথরগুলোকে রুটি বানানোর নির্দেশ দাও-- মানবজাতি তাহলে তোমার পেছনে ছুটবে, এক পাল গবাদি পশুর মতন বিনয়ী ও কৃতজ্ঞ হয়ে। কিন্তু এতোকিছু সত্ত্বেও তা হবে সর্বদা ভিন্ন আর কাঁপুনি দেবে, পাছে তুমি নিজের হাত সরিয়ে নাও এবং তারা তাদের রুটি হারায়! মানুষকে তাদের স্বাধীন ইচ্ছের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ভয়ে তুমি প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলে; কেননা বেছে নেবার স্বাধীনতা কোথায়ই বা থাকে যদি মানুষকে রুটির ঘুষ দেওয়া হয়? মানুষের জীবন শুধু রুটি খেয়ে বেঁচে থাকার নয়— তুমিই তা বলেছিলে। তুমি জানো না, সম্ভবত, ঠিক সেই পার্থিব রুটির নামেই একদিন জাগতিক আত্মা জেগে উঠবে, সংগ্রাম করবে এবং অবশেষে তোমাকে বশীভূত করবে, তার পরে ক্ষুধার্ত জনতা চিৎকার করে বলবে: "কে সেই পশু, যে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আগুন নামিয়ে এনেছিল!" তুমি কি তা জানো না, কিন্তু কয়েক শতাব্দী পরে, এবং সমগ্র মানবজাতি তার প্রজ্ঞার জোরে এবং তার মুখপত্র ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে ঘোষণা করবে, যে, জগতে আর কোনও অপরাধ ঘটে না, তাই পৃথিবীতে আর কোনও পাপ নেই, তাহলে কেবল ক্ষুধার্ত মানুষ থাকবে? "আগে আমাদের খেতে দাও আর তারপর আমাদের সৎ হতে বল!" তোমার বিরুদ্ধে তোলা পতাকায় এই কথাগুলো লেখা থাকবে -- এমন একটি পতাকা যা তোমার গির্জাকে তার ভিত্তি পর্যন্ত ধ্বংস করে দেবে এবং তোমার বিগ্রহের জায়গায় আরও একবার বাবেলের ভয়ঙ্কর মিনার উঠে দাঁড়াবে; আর যদিও ভবনটি অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়া হবে, প্রথমটির মতন, তবুও এই তথ্য খোদাই করা থাকবে যে তুমি প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে পারতে, কিন্তু করোনি, তা হল এই যে সেই নতুন মিনার নির্মাণের প্রচেষ্টা রোধ তুমি করোনি এবং এইভাবে মানবজাতিকে হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে অনর্থক কষ্ট থেকে রক্ষা করোনি। এবং জনগণ আবার আমাদের কাছেই ফিরে আসবে। তারা আমাদের খুঁজে বেড়াবে ভূগর্ভস্হ সমাধিতে, কারণ আমরা আরও একবার নির্যাতিত ও শহিদ হব— এবং তারা আমাদের কাছে এসে কাঁদতে থাকবে: "আমাদের খেতে দিন, কারণ যারা আমাদের স্বর্গ থেকে আগুন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা আমাদের ঠকিয়েছে!" তখনই আমরা তাদের জন্য তাদের মিনার নির্মাণ শেষ করব। কারণ যারা একা তাদের খাওয়াবে তারাই মিনারটা সম্পূর্ণ করবে, আর আমরা তাদের তোমার নামে খাবার খাওয়াব এবং তাদের কাছে মিথ্যা বলব যে এটি তোমার নামে করা হচ্ছে। ওহ, আমাদের সাহায্য ছাড়া তারা কখনই, কখনই, নিজেদের খাওয়াতে শিখবে না! যতক্ষণ তারা মুক্ত থাকবে ততক্ষণ কোনও বিজ্ঞান তাদের রুটি দেবে না, যতদিন তারা মুক্ত থাকবে, যতদিন না তারা সেই মুক্তিবোধকে আমাদের পায়ের কাছে রেখে বলবে: "আমাদের দাস করে তুলুন, কিন্তু আমাদের খেতে দিন!" সেই দিনটি অবশ্যই আসবে যখন মানুষ বুঝতে পারবে যে মানবমুক্তি এবং সকলের সন্তুষ্টির জন্য দৈনন্দিন রুটির যোগান দেওয়া একই সঙ্গে অচিন্তনীয়, কেননা মানুষ কখনওই নিজেদের মধ্যে ওই দুটো ব্যাপারকে সমানভাবে ভাগ করতে পারবে না। এবং তারা এটাও বুঝতে পারবে যে তারা কখনই মুক্ত হতে পারে না, কারণ তারা দুর্বল, দুষ্ট, দুঃখভোগী এবং জন্মগতভাবে বজ্জাত এবং দ্রোহী। তুমি তাদের জীবনের রুটি দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছ , স্বর্গের রুটি; কিন্তু আমি তোমাকে আবার জিজ্ঞাসা করছি, সেই রুটি কি কখনও দুর্বল ও দুষ্ট, চির-অকৃতজ্ঞ মানবজাতির কাছে, পৃথিবীতে তাদের প্রতিদিনের রুটির সমান হতে পারে? এবং এমনকি ধরে নিচ্ছি যে হাজার হাজার এবং লক্ষ-লক্ষ মানুষ তোমাকে অনুসরণ করে, তোমার স্বর্গীয় রুটি পাবার জন্য, তাহলে কোটি কোটি মানুষের কী হবে যারা জাগতিক রুটিকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য দুর্বলচিত্ত, তারা তোমার  স্বর্গীয় রুটি নিয়ে কী করবে? অথবা এটা কি তবে হাজার হাজার বীর এবং পরাক্রমশালীদের মধ্যে নির্বাচিত লোকজন, যারা তোমার কাছে খুব প্রিয়, যখন কি না বাকি লক্ষ লক্ষ, সমুদ্রের বালির দানার মতন অসংখ্য, দুর্বল এবং স্নেহময়, তাদের মাল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে ওই লোকদের জন্য? না না! আমাদের দৃষ্টিতে এবং আমাদের কাজের উদ্দেশ্যে দুর্বল এবং নিম্নবর্গের মানুষ আমাদের কাছে বেশি প্রিয়। একথা সত্য যে তারা দুষ্ট এবং দ্রোহী, কিন্তু আমরা তাদের অনুগত হতে বাধ্য করব, এবং তারাই আমাদের সবচেয়ে বেশি গুণগান করবে। তারা আমাদের দেবতা হিসেবে গণ্য করবে এবং সেই সব লোকেদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে যারা শাসনের মাধ্যমে জনসাধারণকে নেতৃত্ব দিতে সম্মত হয়েছে আর তাদের স্বাধীনতার বোঝা বইছে-- শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে সেই মুক্তি কি ভয়ঙ্করই না হবে! তারপর আমরা তাদের বলব যে এটা তোমার ইচ্ছার প্রতি আনুগত্য এবং তোমার নামে আমরা তাদের উপর শাসন করছি। আমরা তাদের আরও একবার ঠকাব এবং তাদের মিথ্যাকথা বলব-- কেননা আর কখনও, আমরা তোমাকে আর আমাদের মাঝে আসতে দেব না। এই প্রতারণার মধ্যে আমরা নিজেদের যন্ত্রণা খুঁজে পাব, কারণ আমাদের অনন্তকাল মিথ্যাকথা বলতে হবে, এবং কখনও মিথ্যাকথা বলা বন্ধ করা চলবে না! 'প্রথম' প্রলোভন "এর গোপন মর্ম এটাই, এবং তুমি  স্বাধীনতার স্বার্থে বিজনপ্রান্তরে সেটিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলে যেটিকে তুমি সর্বোত্তম মনে করেছিলে। এদিকে তোমাকে যিনি লোভ দেখাচ্ছিলেন, তাঁর প্রস্তাবটিতে আরও একটি ঘোর বিশ্ব-রহস্য আছে। 'রুটিকে' গ্রহণ করলে, তুমি সন্তুষ্ট করতে পারতে এবং একটি সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষার উত্তর দিতে পারতে, যা রয়েছে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে নিরন্তর আকাঙ্ক্ষা হিসেবে, ঘাপটি মেরে আছে মানব-সমষ্টির বুকে লুকিয়ে, সেই সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর সমস্যা-- "কাকে বা কী আমরা  পুজো করব?" পুজো করার জন্য তাড়াতাড়ি একটা নতুন বস্তু বা ধারণা খুঁজে পাবার তুলনায় যে ব্যক্তি সব ধর্মীয় পক্ষপাত থেকে নিজেকে মুক্ত করেছে তার জন্য এর চেয়ে বড় বা বেশি বেদনাদায়ক উদ্বেগ আর নেই। কিন্তু মানুষ তাঁরই সামনে নতজানু হতে চায়, যে কেবলমাত্র বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠের দ্বারা স্বীকৃত, তার সমস্ত সহগামীদের দ্বারা যদি নাও হয়, পূজিত হবার অধিকার তার আছে; তার অধিকার এতই প্রশ্নাতীত যে, মানুষ সর্বসম্মতভাবে তার কাছে মাথা নোয়াতে রাজি হয়। এই দুঃখী প্রাণীদের প্রধান উদ্বেগের কারণ তাদের নিজের পছন্দের মূর্তি খুঁজে তাকে পুজো করা নয়, বরং অন্যরা যাতে বিশ্বাস করবে তা আবিষ্কার করা, আর সমবেত হয়ে মাথা নত করার সম্মতি দেওয়া। এটা প্রতিটি মানুষের এমন এক প্রবৃত্তি যা সবাই মিলে একসঙ্গে করে, আর সেটাই প্রত্যেক মানুষের প্রধান যন্ত্রণা, যা সময়ের আরম্ভ থেকে মানবজাতির প্রধান উদ্বেগ হয়ে রয়েছে। ধর্মীয় উপাসনার সেই সর্বজনীনতার জন্যই মানুষ একে অপরকে তলোয়ার দিয়ে ধ্বংস করেছে। নিজেদের জন্য দেবতা গড়ে নিয়ে, তারা একে অপরের কাছে আবেদন করতে শুরু করেছিল: "আপনার দেবতাদের পরিত্যাগ করুন, আসুন এবং আমাদের দেবতাকে প্রণাম করুন, নয়তো আপনাদের সবায়ের এবং আপনাদের মূর্তির মৃত্যু অবধারিত!" এবং  এই পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত  তারা তা করে যাবে; যখন সমস্ত দেবতা নিজেরাই অদৃশ্য হয়ে যাবে, তখনও তারা তা চালিয়ে যাবে, তারপর মানুষ কোনও ধারণার সামনে নতজানু হয়ে তার পুজো করবে। তুমি তো জানতে, তুমি মানব প্রকৃতির সেই রহস্যময় মৌলিক গুণ সম্পর্কে মোটেই অজ্ঞ নও, এবং তবুও তুমি তোমাকে দেওয়া  পরম পতাকাটি প্রত্যাখ্যান করলে, যার প্রতি সমস্ত জাতি সমর্পিত থাকবে এবং যার সামনে সকলেই মাথা নোয়াবে-- পার্থিব রুটির পতাকা, মুক্তির নামে প্রত্যাখ্যাত এবং 'ঈশ্বরের রাজ্যে রুটি' পাবার প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন! তাহলে দেখো, সেই 'মুক্তির' জন্য তুমি আরও কী করেছ! আমি তোমাকে আবার বলছি, মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় কোনও উদ্বেগ নেই যে সে এমন কাউকে খুঁজে পাক যাকে সে নিজের স্বাধীনতা উপহার দিয়ে দেবে, যা নিয়ে ওই দুর্ভাগা প্রাণীদের জন্ম হয়। কিন্তু সেই একজন লোকই তাদের মুখ বন্ধ করে দিতে পারে আর তাদের বিবেককে নীরব ও শান্ত করার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে, যে বাদবাকি সমস্ত মানুষের স্বাধীনতার মালিক হবে। 'দৈনন্দিন রুটি' দিয়ে তোমাকে একটি অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা উপহার দেওয়া হয়েছিল: একজন মানুষকে 'রুটি' দেখাও আর সে তোমাকে অনুসরণ করবে, কেননা রুটির আকর্ষণের চেয়ে আর কীই বা চাহিদা তার থাকতে পারে? কিন্তু যদি, একই সাথে, অন্য একজন তার বিবেকের মালিক হতে সফল হয়-- ওহ! তাহলে তোমার রুটির কথাও ভুলে যাবে, আর মানুষ সেই লোকটাকে অনুসরণ করবে যে তার বিবেককে প্রলুব্ধ করেছে। এ-পর্যন্ত তুমি ঠিকই ছিলে। কেননা মানুষের রহস্য কেবল তার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই সীমিত নয়, বরং সমস্যায়-- কীসের জন্য আদৌ বেঁচে থাকা উচিত, এই বোধে? তার বেঁচে থাকার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে, মানুষ কখনও বেঁচে থাকতে রাজি হবে না, এবং পৃথিবীতে টিকে থাকার বদলে বরং নিজেকে ধ্বংস করে ফেলবে, যদিও তাকে চারিপাশে রুটি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। এটাই সত্য। কিন্তু কী ঘটেছে? মানুষের স্বাধীনতাকে কব্জা করার বদলে, তুমি তাকে আরও বিশাল করে তুলেছ! তুমি কি আবার ভুলে গেছো যে, মানুষের কাছে শুভ এবং অশুভ সম্পর্কে জ্ঞানের তুলনায় আরাম, এমনকি মৃত্যুও, গ্রহণযোগ্য? বিবেকের স্বাধীনতার চেয়ে কিছুই তার চোখে বেশি প্রলোভনযুক্ত বলে মনে হয় না, এবং তার চেয়ে কিছুই বেশি বেদনাদায়ক নয়। আর দেখো! সমস্ত মানুষের বিবেকের চিরকালীন দৃঢ় বনেদ গড়ার বদলে, তুমি তাদের আলোড়িত করতে বেছে নিয়েছ তাদের ভেতরকার অস্বাভাবিক, রহস্যময় এবং অনির্দিষ্ট, যা-কিছু মানুষের ক্ষমতার বাইরে, আর এমনভাবে তা করেছ যেন কোনও কালে তোমার প্রতি তাদের ভক্তি ছিল না, এবং তবুও তুমি নাকি "ঈশ্বরপুত্র যিনি তার বন্ধুদের জন্য তাঁর জীবন দিতে!" আবির্ভূত হয়েছ। মানুষের কাছে যে উদ্বেগ অজানা ছিল তাই দিয়ে তাদের আত্মাকে বোঝাই করে দিয়েছ। অবাধে দেওয়া মানুষের ভালবাসার জন্য তৃষ্ণার্ত, মানুষকে প্রলুব্ধ করে এবং তোমার দ্বারা মোহিত ও বশীভূত করে, যাতে তারা তোমার দেখানো পথ অনুসরণ করে, সেই পুরানো এবং দূরদর্শী নিয়মের বদলে, তাদের হৃদয়ে তোমার প্রতিচ্ছবির পথনির্দেশে, তুমি তাদের স্বেচ্ছায় শুভ ও অশুভ বেছে নেবার অধিকার দিয়েছ। কিন্তু তুমি কখনও স্বপ্নেও তেমন সম্ভাবনার কথা ভাবোনি, না, সেই নিশ্চয়তার, যে, সেই একই মানুষেরা একদিন তোমার মূর্তি আর তোমার সত্যকেও পালটে দেবে, একথা জানার পর যে, তাদের ওপর স্বাধীনতা বেছে নেবার মতো ভয়ঙ্কর বোঝা চাপিয়ে ভারাক্রান্ত করা হয়েছে? একটা সময় নিশ্চয় আসবে যখন মানুষ বলে উঠবে যে সত্য এবং আলো তোমার মধ্যে থাকতে পারে না, কেননা  কর্মকাণ্ড এবং অসাধ্য সমস্যার বোঝা চাপিয়ে তোমার চেয়ে তাদের অমন বিভ্রান্তি আর মানসিক যন্ত্রণায় আর কেউ  ফেলে যেতে পারত না। সুতরাং, তুমি নিজের রাজ্যের ধ্বংসের ভিত্তি স্থাপন করেছ এবং এর জন্য তুমি ছাড়া আর কেউ দায়ী নয়। "ইতিমধ্যে, সাফল্যের সমস্ত সুযোগ তোমাকে দেয়া হয়েছিল।" পৃথিবীতে তিনটি ক্ষমতাশক্তি আছে, এই দুর্বল বিদ্রোহীদের বিবেককে ফুসলিয়ে চিরকালের জন্য বিজয় পাবার-- মানুষকে-- তাদের নিজেদের ভালোর জন্য; এবং এই ক্ষমতাশক্তি হল: অলৌকিকতা, রহস্য এবং কর্তৃত্ব। তুমি তিনটিকেই প্রত্যাখ্যান করেছ। আর তুমিই প্রথম উদাহরণ স্থাপন করলে। যখন মহান ও জ্ঞানী আত্মা তোমাকে মন্দিরের চূড়ায় বসিয়েছিল এবং তোমাকে বলেছিল, "আপনি যদি ঈশ্বরের পুত্র হন, তাহলে নিজেকে নামিয়ে আনুন, কারণ এটি ইতিমধ্যে লিখিত যে, ঈশ্বর আপনার দেবদূতদের আপনার দায়িত্ব দেবেন: এবং  তারা হাতে করে তুলে ধরে আপনাকে বয়ে নিয়ে যাবে, যাতে না আপনি পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে যান।” এইভাবে তোমার পিতার প্রতি বিশ্বাস স্পষ্ট হত, কিন্তু তুমি তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে এবং তাকে মান্যতা দিলে না। ওহ, নিঃসন্দেহে, তুমি এই সমস্ত অভাবনীয় ব্যাপার সম্পর্কে গর্বের সাথে একজন ভগবানের মতন আচরণ করেছিলে, কিন্তু তারপর মানুষর-- সেই দুর্বল আর দ্রোহী জাতি-- তারাও কি ভগবান, যে তোমার প্রত্যাখ্যান বুঝতে পারেনি? অবশ্যই, তুমি ভালভাবেই জানতে যে, এক ধাপ এগিয়ে গেলে, নিজেকে নামিয়ে আনার সামান্যতম প্রয়াস করলে, তুমি "নিজের প্রভু নিজের ঈশ্বরকে" প্রলুব্ধ করতে, হঠাৎ তার প্রতি অবাধ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে, এবং নিজেকে পৃথিবীর ধুলোর পরমাণুতে পালটে ফেলতে, সেই একই পৃথিবী, যাকে তুমি বাঁচাতে এসেছিলে, এবং এইভাবে সেই জ্ঞানী আত্মাকে অনুমতি দিতে যে তোমাকে জয়ী ও আনন্দিত করতে প্রলুব্ধ করেছিল। যাই হোক, তাহলে, এই পৃথিবীতে তোমার মতো কতজনকে পাওয়া যাবে, আমি তোমার কাছে জানতে চাইছি? তুমি কি কখনও এক মুহূর্তের জন্যও ভেবে দেখেছ যে মানুষেরও অমন প্রলোভন প্রতিরোধ করার শক্তি আছে? জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুহূর্তে, যখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বেদনাদায়ক এবং বিভ্রান্তিকর সমস্যাগুলি মানুষের আত্মার মধ্যে লড়াই করে, সত্যিকারের সমাধানের জন্য তার হৃদয়ের মুক্ত সিদ্ধান্তের জন্য অলৌকিকতা এবং বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করার মতন মানুষের প্রকৃতি কি গড়া হয়েছে? ওহ, তুমি ভাল করেই জানো যে তোমার সেই কর্মকাণ্ড যুগ যুগ ধরে বইতে লিখে রাখা থাকবে, পৃথিবীর শেষ সীমায় তা পৌঁছে যাবে, আর তোমার আশা ছিল যে, তোমার পদাঙ্ক অনুসরণ করে, মানুষ তার ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে, কোনও রকম অলৌকিকতা ছাড়াই তার বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখবে! কিন্তু তুমি জানতে না, মনে হয়, মানুষ যত তাড়াতাড়ি অলৌকিকতাকে প্রত্যাখ্যান করবে ঠিক ততো তাড়াতাড়িই ঈশ্বরকে প্রত্যাখ্যান করবে, কেননা মানুষ ঈশ্বরকে ততোটা চায় না, যতটা তাঁর কাছে তাঁরই 'একটি প্রতীক' মানুষ চায়। এবং এইভাবে, যেমন অলৌকিক ঘটনা ছাড়া মানুষ থাকতে পারে না, তাই, অলৌকিকতা ছাড়া বেঁচে থাকার বদলে, সে নিজের জন্য নিজেই নতুন বিস্ময় তৈরি করবে; এবং সে একজন দ্রোহী, একজন বিদ্বেষী, এবং একশো বার নাস্তিক হয়ে, গণৎকারের হাতসাফাই, বুড়ি ডাইনির জাদুর কাছে মাথা নত করবে এবং পুজো করবে। যখন মানুষ ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে এবং মাথা নাড়িয়ে তোমাকে বলছিল-- "তুমি যদি নিজেকে ঈশ্বরের পুত্র মনে করো, তাহলে নিজেকে বাঁচাও, আর আমরা তাহলে তোমাকে বিশ্বাস করব," তখন ক্রুশকাঠ থেকে নামতে তোমার অস্বীকৃতি, সেই একই দৃঢ় সঙ্কল্পের কারণে-- অলৌকিকতার মাধ্যমে মানুষকে দাসানুদাস করতে অস্বীকার করেছিলে, অথচ তোমার প্রতি বিশ্বাস অর্জন করেছ কোনও রকম জাদুকরি প্রভাব ছাড়াই। তুমি মুক্তমনা এবং অপ্রভাবিত প্রেমের জন্য আকুল ছিলে, এবং দাসদের আবেগপ্রবণ শ্রদ্ধা প্রত্যাখ্যান করেছিলে যাতে তাদের ইচ্ছাবোধ একটি ক্ষমতাশক্তির কাছে চিরকালের জন্য অধীন হয়ে যায়। তুমি মানুষকে উঁচুতে বসিয়ে বিচার করো, অথচ, তারা দ্রোহীও, তারা জন্মগত দাস এবং তার বেশি কিছু নয়। ভাবো, আরেকবার তাদের বিচার করো, আজ যখন সেই মুহূর্ত থেকে পনেরো শতক কেটে গেছে। তাদের দিকে তাকাও, যাদের তুমি নিজের স্তরে উন্নীত করার চেষ্টা করেছিলে! আমি শপথ করে বলতে পারি যে মানুষ তোমার চেয়ে দুর্বল আর নিচুস্তরের যা তুমি কখনও কল্পনা করোনো। তুমি যা আশা করেছিলে তা কি পেয়েছ? তাকে এত দামি করে তুলে এমন আচরণ করেছো যেন তোমার হৃদয়ে তাদের জন্য কোনও ভালবাসা নেই, কারণ মানুষ তা দিতে না পারলেও তুমি তার কাছ থেকে বেশি কিছু চেয়েছো— হ্যাঁ তুমি, যে কিনা মানুষকে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসে! তুমি যদি মানুষকে কম সম্মান করতে, তাহলে তুমি তার কাছে কম দাবি করতে, এবং এটি ভালবাসার মতোই হত, কারণ তার বোঝা হালকা করা হত। মানুষ দুর্বল এবং কাপুরুষ।  ব্যাপারটা কেমন হবে, যদি সে এখন আমাদের ইচ্ছা ও শক্তির বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে দাঙ্গা এবং দ্রোহ বাধায়, এবং সেই দ্রোহের কারণে গর্ববোধ করে? এটি একটি স্কুল-বালকের ক্ষুদ্র অহংকার এবং অসার। এটা ছোট বাচ্চাদের তাণ্ডব, যেন ক্লাসে বিদ্রোহ করা আর শিক্ষককে বাইরে বের করে দেওয়া। কিন্তু এটা দীর্ঘস্থায়ী হবে না, এবং যখন তাদের বিজয়ের দিন শেষ হবে, তখন তাদের এর জন্য বড়ো দাম চোকাতে হবে। তারা মন্দির ধ্বংস করবে এবং গুঁড়িয়ে দেবে, পৃথিবীকে রক্তে প্লাবিত করবে। কিন্তু নির্বোধ শিশুদের মতন একদিন শিখতে পারবে যে, তারা দ্রোহী আর প্রবৃত্তিগত কারণে বিদ্রোহী হলেও, তারা দীর্ঘ সময় বিদ্রোহের মনোভাব বজায় রাখার পক্ষে খুব দুর্বল। মূর্খের কান্নায় ভুগে তারা স্বীকার করবে যে, যিনি তাদের বিদ্রোহী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিঃসন্দেহে তাদের ব্যঙ্গ করার জন্য তা করেছেন। তারা হতাশ হয়ে কথাগুলো ঘোষণা করবে, এবং এই ধরনের নিন্দনীয় উক্তি তাদের দুঃখ-কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেবে— কারণ মানুষের স্বভাব নিন্দা সহ্য করতে পারে না, এবং শেষ পর্যন্ত  প্রতিশোধ নেয়। "আর এইভাবে, মানবজাতি এবং তার মুক্তির জন্য তোমার ভোগান্তির পরেও, মানুষের বর্তমান অবস্থাকে তিনটি সারশব্দে বলা যেতে পারে: অশান্তি, বিভ্রান্তি, দুর্দশা! তোমার মহান ভবিষ্যবক্তা সন্তজন তার দিব্যদৃষ্টি নথিভূক্ত করে গেছে যে সে দেখেছিল—ঈশ্বরের নির্বাচিত সেবকদের প্রথম পুনরুত্থানের সময়ে-- তাদের কপালে "তাদের যে সংখ্যাচিহ্ণ খোদাই করা ছিল", তা প্রতিটি গোত্রের 'বারো হাজার' লোকের । কিন্তু সত্যিই কি তারা এতোজন? সেক্ষেত্রে তারা মানুষ নয়, তারা দেবতা। সুদীর্ঘ বছর তারা তোমার ক্রুশকাঠ বয়েছিল, বছরের পর বছর ধরে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত দেহে, ভয়াবহ বিজনপ্রান্তর এবং মরুভূমিতে, পঙ্গপাল এবং শেকড় খেয়ে-- এবং তোমার প্রতি অবাধ ভালোবাসার এই শিশুর দল, এবং তোমার নামে আত্মত্যাগকারী, তুমি তো নিশ্চয়ই গর্ব  অনুভব করেছিলে, না কি? কিন্তু মনে রেখো, এরা মাত্র কয়েক হাজার-- দেবতাই, মানুষ নয়; এবং বাদবাকিরা? আর শক্তিমানরা যা সহ্য করতে পেরেছে তা দুর্বলরা সহ্য করতে পারছে না বলে কেন তার জন্য দুর্বলকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে? কেন এমন ভয়ঙ্কর ক্ষমতা ধারণ করতে অক্ষম এক আত্মাকে তার দুর্বলতার জন্য শাস্তি দেওয়া হবে? তুমি কি সত্যিই  একা এসেছিলে, যারা 'নির্বাচিত', তাদের জন্য? যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের সীমাবদ্ধ মনে রহস্যখানা চির-রহস্যময় থেকে যাবে। এবং যদি তা রহস্যই হয়, তাহলে কি আমরা একে সেই হিসাবে ঘোষণা এবং প্রচার করে ঠিক কাজ করেছিলুম, তাদের শিক্ষা দিয়েছিলুম যে, তোমাকে দেওয়া তাদের অপরিসীম ভালোবাসা বা বিবেকের স্বাধীনতা যা-ই হোক, তা মোটেই জরুরি নয়, বরং কেবল সেই অজ্ঞাত রহস্য, যা তাদের অন্ধভাবে মেনে চলতে হবে, এমনকি তা  তাদের বিবেকের বিরুদ্ধে হলেও তাকে মেনে চলতে হবে। আমরা সেটাই শিখিয়েছি। আমরা তোমার শিক্ষাকে সংশোধন করে উন্নত করেছি এবং তাকে "অলৌকিকতা, রহস্য এবং কর্তৃত্ব"-র উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছি। আর মানুষ আরেকবার গোরুর পালের মতন নিজেদের জন্য হুকুম পেয়ে তা তামিল করতে উল্লসিত বোধ করেছে, এবং শেষ পর্যন্ত তোমার চাপানো ভয়াবহ বোঝা থেকে নিজেদের হৃদয়কে মুক্ত করতে পেরেছে, যা তাদের কষ্টের কারণ হয়ে গিয়েছিল। আমাকে বলো তো, আমরা কি ঠিক কাজ করিনি? আমরা কি মানবতার প্রতি আমাদের মহৎ ভালোবাসা দেখাইনি, তাদের নম্র চেতনার  অসহায়তাকে অনুধাবন করে, দয়াশীলতায় তাদের ভারি বোঝা হালকা করে, এবং তার দুর্বল স্বভাবের জন্য প্রতিটি পাপের অনুমতি প্রদান করে এবং ক্ষমাশীল হয়ে আমরা কি তাদের মঙ্গল করিনি, যদি তারা তা আমাদের অনুমোদন অনুযায়ী করে থাকে? তাহলে, কেন তুমি আবার আমাদের কাজে বাগড়া দিতে এসেছ? আর  কেনই বা তুমি আমার দিকে এত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নম্র চোখে তাকিয়ে আছ, আর এমন চুপচাপ? বরং তোমার তো ক্রুদ্ধ হওয়া  উচিত, কারণ আমি তোমার ভালোবাসা চাই না, আমি তা প্রত্যাখ্যান করছি, আর আমি তোমাকে নয়, নিজেকে ভালোবাসি। আমি কেন তোমার কাছে সত্য গোপন করব? আমি বেশ ভালোভাবেই জানি কার সাথে আমি এখন কথা বলছি! আমার যা বলবার ছিল তা তুমি আগে থেকে জানতে, আমি তা তোমার চোখের ভাষা থেকে বুঝতে পেরেছি। আমি কেনই বা তোমার কাছ থেকে আমাদের রহস্য গোপন করব? তুমি যদি আমার মুখ থেকে শুনতে চাও, তাহলে শোনো: তুমি ঈশ্বরপুত্র হলেও তোমার  সঙ্গে আমরা নেই, বরং ওনার সঙ্গে আছি, আর সেটাই আমাদের গোপন রহস্য! বহু শতাব্দী ধরে আমরা তোমাকে পরিত্যাগ করে ওনাকে অনুসরণ করেছি, হ্যাঁ-- আট শতক। আজ থেকে আটশো বছর হল যখন আমরা তাঁর কাছ থেকে তোমার দ্বারা প্রত্যাখ্যাত উপহারটি ধিক্কার দিয়ে গ্রহণ করেছি; সেই শেষ উপহার যা উনি তোমাকে পাহাড়ের চূড়ায় উপহার দিয়েছিলেন, যখন পৃথিবীর সমস্ত রাজ্য এবং তাদের গৌরব দেখিয়ে তিনি তোমাকে বলেছিলেন: "যদি তুমি নিচে নেমে আমার পুজো করো তবে এই সবকিছু আমি তোমাকে দিয়ে দেব!" আমরা তাঁর কাছ থেকে নিয়েছিলাম রোম সাম্রাজ্য, আর সম্রাট সিজারের তরোয়াল, আর  নিজেদের এই পৃথিবীর একমাত্র রাজা হিসেবে ঘোষণা করেছিলাম, যদিও আমাদের কাজ এখনও পুরো সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু এর জন্য কাকে দোষী করা হবে? আমাদের কাজ এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, কিন্তু  শুরু তো করা গেছে। এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হয়ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, এবং ততদিন মানবজাতিকে অনেক কষ্ট পেতে হবে, কিন্তু আমরা একদিন নিশ্চিত লক্ষ্যে পৌঁছব, এবং জগতের একমাত্র কর্তা হবো, এবং তারপর মানুষের সার্বজনীন সুখের কথা ভাববার সময় পাওয়া যাবে। "তুমি নিজে সম্রাট সিজারের তরোয়াল তুলে নিতে পারতে; কেন তুমি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলে? শক্তিশালী আত্মার দেয়া তৃতীয় প্রস্তাবটা গ্রহণ করলে তুমি জগতের প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারতে, যা মানুষ নিজের জন্য চায়; মানুষ পুজো করার জন্য একটা অটল বস্তু খুঁজে পেত; যা তার বিবেককে উপস্থাপিত করতে পারত, এবং অপরটি সবাইকে একত্রিত করে  সর্বজনীন এবং সমন্বয়পূর্ণ পিঁপড়ে-পাহাড়ে পরিণত করতে পারত; কেননা ভূবনব্যাপী মিলনের জন্য একটি সহজাত প্রয়োজন হল মানবজাতির জন্য তৃতীয় এবং চূড়ান্ত দুর্বিপাক; যা সমগ্রভাবে মানুষ নিজেদের একত্রিত করার জন্য করেনি। অনেক তো ছিল, মহান ইতিহাসের মহান জাতি, কিন্তু তারা যতো বড়ো ছিল, তারা ততো অসন্তুষ্ট বোধ করেছে, কেননা তারা মানুষের  একটি সার্বজনীন একীকরণের প্রবল প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। তৈমুর আর চেঙ্গিজ খানের মতো মহান বিজেতারা, জয় করার প্রচেষ্টায় পৃথিবীর মুখে ঘূর্ণিঝড়ের মতন আছড়ে পড়েছে, কিন্তু তারাও, হয়তো অসচেতনভাবে, সর্বজনীন এবং সাধারণ একীকরণের জন্য একই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। জগতের রাজত্ব এবং সিজারের রাজসিক বেগুনি পোশাক গ্রহণ করে, যে-কেউ সার্বজনীন রাজ্য খুঁজে পেত, এবং মানবজাতির কাছে অনন্ত শান্তি আনতে পারত। আর যিনি মানবজাতির বিবেকের অধিকারী হয়েছেন এবং তাদের হাতে মানুষের দৈনন্দিন রুটি দিতে পেরেছেন তাঁর চেয়ে ভালো আর কে-ই বা মানবজাতিকে শাসন করতে পারেন? সিজারের তরোয়াল এবং বেগুনি পোশাক গ্রহণ করে, আমরা নিঃসন্দেহে, তোমাকে বঞ্চিত করেছি, এখন থেকে তাঁকে একাই তুমি অনুসরণ করবে। ওহ, বহু শতাব্দীর বুদ্ধিবৃত্তিক হাতাহাতি এবং বিদ্রোহের মুক্ত চিন্তাধারা এখনও আমাদের সামনে রয়েছে, এবং তাদের বিজ্ঞান ফুরিয়ে যাবে নরমাংসভক্ষণে, কেননা আমাদের সাহায্য ছাড়াই ব্যাবিলনের মিনার গড়া শুরু করার পর, ওদের তা শেষ করতে হবে নরমাংসভক্ষণে। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই নৈরাজ্যবাদী দৈত্যটা আমাদের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করবে, আর আমাদের পায়ের তলা চাটবে, এবং তাতে রক্তের অশ্রু ছিটিয়ে দেবে আর আমরা রক্তবর্ণ দৈত্যটার ওপর বসে থাকব, আর 'জঘন্য ও নোংরামিতে পরিপূর্ণ' সোনার পেয়ালাটা উঁচুতে তুলে ধরে দেখাবো যে তার উপরে  'রহস্য' শব্দটি লেখা রয়েছে! কিন্তু কেবল তারপরই মানুষ শান্তি ও সুখের রাজ্যের সূচনা দেখতে পাবে। তুমি তোমার নিজের নির্বাচিতদের নিয়ে গর্বিত, কিন্তু এই নির্বাচিতরা ছাড়া তোমার আর কেউ নেই, এবং আমরা-- আমরা বাদবাকি সবাইকে বিশ্রাম দেব। কিন্তু সেটাই শেষ নয়। তোমার নির্বাচিতরা এবং তোমার আঙুর ক্ষেতের শ্রমিকদের মধ্যে অনেকেই, যারা তোমার আরেকবার আসার অপেক্ষায় ক্লান্ত, তারা তাদের হৃদয়ের দুর্দান্ত উদ্দীপনা এবং তাদের আধ্যাত্মিক শক্তিকে ইতিমধ্যে অন্য ব্যাপারে নিয়ে গেছে, আর আজও নিয়ে যাচ্ছে, এবং শেষ পর্যন্ত তোমার বিরুদ্ধে তোমারই মুক্তির পতাকা তুলবে। কিন্তু তার জন্য তোমাকে নিজেকেই ধন্যবাদ দিতে হবে। আমাদের শাসনের অধীনে এবং দাপটে সকলেই আনন্দে থাকবে, এবং তোমার মুক্ত পতাকার অধীনে তারা যেমন বিদ্রোহ করত, বা একে অপরকে ধ্বংস করত, তা আর করবে না। ওহ, আমরা যত্ন নিয়ে তাদের কাছে প্রমাণ করব যে তারা যদি সম্পূর্ণ মুক্তি পেতে চায়, তাহলে তাদের  আমাদের খাতিরে নিজেদের স্বাধীনতাকে বাতিল করতে হবে আর পুরোপুরি আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। তুমি কী ভাবছ যে আমরা ধ্রুব কথাবর্তা বলছি নাকি মিথ্যা আওড়াচ্ছি? ওরা সবাই নিজেদের কাছে আমাদের ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে, কেননা ওরা দেখবে যে, তোমার দেওয়া মুক্তি ওদের কতটা অবমাননাকর দাসত্ব এবং সংঘাতের দিকে নিয়ে গেছে। মুক্তি, চিন্তার স্বাধীনতা এবং বিবেকের স্বাধীনতা এবং বিজ্ঞান তাদের এমন দুর্গম বাধাবিপত্তির মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলবে, এমন সমস্ত বিস্ময় ও সমাধানের অতীত রহস্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে, যে তাদের মধ্যে কেউ কেউ-- যারা বাকিদের চেয়ে বেশি বিদ্রোহী এবং বেপরোয়া-- নিজেদের ধ্বংস করে ফেলবে; অন্যরা-- বিদ্রোহী হলেও দুর্বল-- একে অপরকে ধ্বংস করবে; বাদবাকিরা, দুর্বল, অসহায় এবং দুঃখী, ফিরে এসে আমাদের পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে পড়বে আর কেঁদেকেঁদে বলবে: "হ্যাঁ, যিশুর পিতা, আপনিই যথার্থ ছিলেন; আপনি একা ঈশ্বরের রহস্যের অধিকারী, এবং আমরা আপনার কাছে ফিরে এসেছি, প্রার্থনা করছি যে আমাদের নিজের কাছ থেকে আপনি আমাদের রক্ষা করুন!" আমাদের কাছ থেকে খাবার রুটি পেয়ে,  তারা স্পষ্টভাবে টের পাবে যে আমরা তাদের কাছ থেকেই রুটি নিই, যে রুটি তাদের নিজের হাতে তৈরি, কিন্তু সমানভাবে কোন অলৌকিকতা  ছাড়াই তাদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়; আর তা উপলব্ধি করার পর, যদিও আমরা পাথরকে রুটিতে রূপান্তরিত করিনি, তবুও রুটি তারা পেয়েছে, যখন কিনা অন্য প্রতিটি রুটি সত্যই তাদের নিজের হাতে পাথরে পরিণত হয়েছে, তারা তা পেয়ে বরং অত্যন্ত আনন্দিত হবে। ততদিন পর্যন্ত, তারা কখনও সুখী হবে না। আর কে তাদের অন্ধ করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে, বলো তুমি? তুমি ছাড়া আর কে-ই বা জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে  অজানা পথে পরিচালিত করেছে? কিন্তু আমরা আরও একবার ভেড়াগুলোকে খেদিয়ে আনবো আর চিরকালের জন্য আমাদের হুকুমের অধীনে রাখব। আমরা তাদের নিজস্ব দুর্বলতা প্রমাণ করে দেবো, এবং তাদের আবার হৃতমান করে রাখব, যদিও তারা তোমার কাছে শুধুমাত্র গর্ব করতে শিখেছে, কেননা তাদের যোগ্যতার চেয়ে বেশি তুমি তাদের গুরুত্ব দিয়েছ। আমরা তাদের সেই শান্ত, নিরহঙ্কার সুখ দেব, যা অমন দুর্বল, মূর্খ প্রাণীদের উপকার করে, এবং একবার তাদের দৃষ্টিতে তাদেরই দুর্বলতা প্রমাণ করার পর, তারা হয়ে উঠবে ভীরু এবং অনুগত, এবং মুরগির বাচ্চারা যেমন মুরগির চারপাশে জড়ো হয়, তেমন আমাদের চারপাশে ঘুরঘুর করবে। তারা অবাক হয়ে আমাদের কুসংস্কারের প্রশংসা করবে আর এত গৌরবময় ও জ্ঞানী মানুষের নেতৃত্ব দেখে তাদের মুষ্টিমেয় কয়েকজন মিলে লক্ষ-কোটি মানুষের দলকে বশীভূত করতে পারবে। মানুষ ক্রমে আমাদের ভয় পেতে শুরু করবে। আমাদের সামান্যতম ক্রোধে তারা ঘাবড়ে যাবে, তাদের বুদ্ধি দুর্বল হয়ে যাবে, তাদের চোখ শিশু এবং মহিলাদের মতো সহজেই কান্নায় ভেসে যাবে; কিন্তু আমরা তাদের দুঃখ এবং কান্না থেকে হাসি, শিশুসুলভ আনন্দ এবং আনন্দময় গানের সহজ অবস্থান্তর শেখাব। হ্যাঁ; আমরা তাদের ক্রীতদাসের মতো কাজ করতে বাধ্য করব, কিন্তু তাদের বিনোদনের সময় তাদের একটি নিষ্পাপ শিশুর মতো জীবন থাকবে, খেলাধুলা এবং আনন্দময় উল্লাসে ভরপুর। এমনকি আমরা তাদের পাপ করার অনুমতি দেব, কেননা দুর্বল এবং অসহায়, তার দরুণ তারা আমাদের  প্রতি আরও বেশি ভালবাসা অনুভব করবে, যাতে তারা এতে লিপ্ত হতে পারে। আমরা তাদের বলব যে, সব ধরনের পাপ থেকে তারা পরিত্রাণ পাবে, যদি সেগুলো আমাদের অনুমতি নিয়ে করা হয়; যাতে এই সমস্ত পাপের দায় আমরা নিজেদের উপর নিয়ে নিই, কারণ আমরা জগতকে এতই ভালবাসি যে, আমরা তার সন্তুষ্টির জন্য আমাদের আত্মাকে উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত। আর, তাদের সামনে বলির পাঁঠা এবং উদ্ধারকারীর আলোয় হাজির হলে, আমদের আরও বেশি শ্রদ্ধা করা হবে। আমাদের কাছে তাদের কোনও গোপনীয়তা থাকবে না। তাদের স্ত্রী আর রক্ষিতাদের সঙ্গে বসবাসের অনুমতি দেওয়া, অথবা তা নিষিদ্ধ করা, সন্তান বিয়োনো বা নিঃসন্তান থাকা, নির্ভর করবে আমাদের প্রতি তাদের আনুগত্যের মাত্রার ওপর; এবং তারা তাদের আত্মার সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক রহস্য আমাদের কাছে আনন্দের সাথে খোলাখুলি বলবে— সবাই, তারা সবাই আমাদের পায়ের কাছে লুটিয়ে থাকবে, এবং আমরা তাদের কাণ্ড-কারখানা তোমার নাম নিয়ে অনুমোদন করব, এবং মাফ করে দেব, আর তারা আমাদের বিশ্বাস করবে এবং উল্লসিত হয়ে আমাদের মধ্যস্থতা স্বীকার করবে, কেননা এটি তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এবং নির্যাতন থেকে মুক্তি দেবে— নিজেদের জন্য স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সিদ্ধান্তের বোঝা থেকে বাঁচবে। এবং সকলেই খুশি হবে, সবাই, তাদের দু-এক দল শাসক ছাড়া বাকি সবাই। কারণ আমরা, আমরা যারা  মহান রহস্যের রক্ষক তারাই হব দুর্দশাগ্রস্ত। সেখানে থাকবে লক্ষ লক্ষ সুখী খোকাখুকু, এবং এক লক্ষ শহীদ যারা নিজেদের উপর শুভ ও অশুভ জ্ঞানের অভিশাপ চাপিয়ে নিয়েছে। শান্তিপূর্ণ হবে তাদের অন্তিমযাত্রা, এবং শান্তিপূর্ণভাবে তারা মারা যাবে, তোমার নামে, কবরের চবুতরাগুলোর পেছনে-- সেখানে মরে পড়ে থাকবে। কিন্তু আমরা গোপনীয়তাকে পবিত্র রাখব, এবং তাদের ভালোর জন্য তোমার রাজ্যে অনন্তকালীন জীবনের মরীচিকা দেখিয়ে ঠকাব। কেননা, কবরের ওপারে সত্যিই কি জীবনের মতো কিছু আছে, নিঃসন্দেহে তাদের মতন বোকাদের মগজে তা ঢুকবে না! লোকেরা আমাদের বলে আর তোমার পুনরাগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করি, যে, পৃথিবীতে আরও একবার তুমি বিজয় লাভ করবে; সঙ্গে থাকবে তোমার  নির্বাচিত সেনাবাহিনী, গর্বিত এবং শক্তিশালী; কিন্তু আমরা তোমাকে বোঝাবো যে, তারা নিজেদের বাঁচিয়েছে বটে কিন্তু আমরা সবাইকে রক্ষা করেছি। আমাদের সেই বড় অসম্মানেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে যে, সেই বেশ্যারমণী অপেক্ষা করছে, "মহান ব্যাবিলন, যে কিনা বেশ্যাদের মাতা-ঠাকরুন"-- যিনি বাইবেল-কথিত দানবের ওপর বসে আছেন, তার হাতে রয়েছে ‘রহস্য’, শব্দটা খোদাই করা তার কপালে; এবং আমাদের বলা হয়েছে যে দুর্বলরা, মেষশাবকগুলো তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে এবং তাঁকে নিঃসঙ্গ ও নগ্ন করবে। কিন্তু তারপর আমি উঠে দাঁড়াব, এবং আঙুল তুলে তোমাকে দেখাব পাপমুক্ত সেই লক্ষ লক্ষ সুখী শিশু। এবং আমরা যারা নিজেদের পাপ নিজেদের উপর নিয়েছি, নিজেদের ভালোর জন্য, তোমার সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করব: "আপনি যদি পারেন এবং সাহস থাকে, তবে আমাদের বিচার করে দেখান!" তাহলে জেনে রাখো যে আমি তোমাকে মোটেই ভয় পাই না। জেনে রেখো যে আমিও ভয়াবহ বিজনভূমিতে বাস করেছি, যেখানে আমি পঙ্গপাল এবং শেকড় খেয়ে বেঁচেছিলুম, আমারও আছে পূতস্বাধীনতা, যা দিয়ে তুমি মানুষকে আশীর্বাদ করেছ এবং আমিও একবার তোমার নির্বাচিত, গর্বিতদের দলে যোগ দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিলুম। কিন্তু আমি আমার বিভ্রান্তি কাটিয়ে উঠেছিলুম আর তখন থেকে উন্মাদনার সেবা করতে অস্বীকার করেছি। যারা তোমার ভুল সংশোধন করেছে তাদের সৈন্যদলে যোগ দিতে আমি ফিরে এসেছি। আমি গর্বিতদের ছেড়ে সত্যকার নম্রদের কাছে ফিরে এসেছি, আর তা স্রেফ তাদের নিজেদের সুখের জন্য। এখন আমি তোমাকে যা বলছি তা মুছে যাবে, এবং আমাদের রাজ্য ঠিকই গড়ে উঠবে, আমি তোমাকে বলছি, আগামীকালের পরই তুমি সেই অনুগত মানুষের দল দেখতে পাবে, যারা আমার হাতের একটি ইশারায় ছুটে গিয়ে তোমার খুঁটিতে জ্বলন্ত কয়লা ফেলবে, যার ওপর দাঁড় করিয়ে আমি তোমাকে আগুনে পুড়িয়ে মারব, আমাদের কাজে গোলমাল বাধাবার সাহস করার জন্য। কারণ, যদি কখনও কেউ থেকে থাকে যে আমাদের ইনকুইজিশনের অগ্নিকুণ্ডে পুড়ে মরার যোগ্য-- তাহলে সে তুমি! আগামীকাল আমি তোমাকে পুড়িয়ে মারব। যা বলার ছিল তা বলে দিলুম।" 

আইভান থামল। ও ঘটনার মধ্যে সেঁদিয়ে গিয়েছিল আর প্রবল উত্তেজনায় কথা বলছিল, কিন্তু  হঠাৎ ফেটে পড়ল হাসতে হাসতে। 

"কিন্তু এ-সবকিছুই অযৌক্তিক!" অ্যালিয়োশা আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, যে ততক্ষণ পর্যন্ত বিভ্রান্ত এবং উত্তেজিত হয়ে চুপচাপ শুনছিল। "তোমার কবিতাটা খ্রিষ্টের মহিমা, মোটেই অভিযোগ নয়, যেমনটা তুমি, সম্ভবত, বোঝাতে চাইছিলে। আর কে-ই বা তোমাকে বিশ্বাস করবে যখন তুমি ‘মুক্তির’ কথা বলছ? ব্যাপারটা তাহলে কি আমাদের খ্রিস্টানদের বোঝা উচিত? তাহলে কি রোম (সমস্ত রোম নয়, সেকথা বলা অন্যায় হবে), কিন্তু রোমান ক্যাথলিকদের মধ্যে যারা সবচেয়ে খারাপ, ইনকুইজিটর আর জেসুইটরা, তাদের তুমি ফাঁস করতে চাইছিলে! তোমার ইনকুইজিটর তো একখানা বিদকুটে চরিত্র। কোন পাপগুলোর দায় তারা নিজেদের উপর নিচ্ছে? ওই সমস্ত রহস্যের রক্ষক কারা, যারা মানবজাতির কল্যাণের জন্য নিজেদের উপর অভিশাপ চাপিয়ে নিয়েছিল? তাদের সাথে কারোর কখনও দেখা হয়েছে? আমরা সবাই জেসুইটদের জানি, এবং তাদের পক্ষে ভালো কথা বলার কেউ নেই; কিন্তু তুমি তাদের যেমনভাবে তুলে ধরলে, তেমনটা কবে ছিল তারা? কক্ষনো ছিল না, কক্ষনো নয়! জেসুইটরা কেবল রোমান ক্যাথলিকদের একটা সেনাবাহিনী, যারা নিজেদের পার্থিব ভবিষ্যতের সাম্রাজ্যের জন্য তৈরি করছে, চাইছে একজন মুকুটপরা সম্রাট-- তাদের মাথার ওপর একজন রোমান প্রধান যাজক। সেটাই তাদের আদর্শ আর উদ্দেশ্য, যার মধ্যে কোনও রকম রহস্য বা অসহ্য যন্ত্রণা নেই। ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে প্ররোচিত চাহিদা, জীবনের মামুলি আর পার্থিব সুখের জন্য, নিজেদের লোকেদের দাস বানিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা, অনেকটা আমাদের দেশের কেনা গোলামের ব্যবস্থার মতন কিছু, নিজেদের ভূমি মালিক হিসাবে বজায় রাখা-- তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করা যেতে পারে। তারা হয়তো ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, এমনটাও সম্ভব, কিন্তু তোমার ওই যন্ত্রণাভোগী ইনকুইজিটর একেবারে ফালতু-- নিছক কষ্টকল্পনা!" 

"থামো! থামো!" আইভান বাধা দিয়ে হাসতে থাকে। "এত উত্তেজিত হয়ো না। তুমি বলছ এটা কষ্টকল্পনা, না-হয় তাই হোক! কিন্তু দাঁড়াও। অবশ্যই, এটা অভিনব। নিছক 'আনন্দ' কি এর উদ্দেশ্য? এটা কি যাজক প্যাসি তোমাকে শিখিয়েছেন?"

"না, না, একদম উল্টো, কারণ ফাদার প্যাসি একবার আমাকে নিজে যা বলেছিলেন, তার মতন কথাই তুমি বলছ, যদিও, হুবহু তা নয়-- একেবারে অন্যরকম কিছু" বলল আলেক্সিস, বেশ লজ্জায় পড়ে। 

"একটা দামি তথ্য, যদিও তোমার 'তা নয়' বলার পরও। আচ্ছা, আমাকে তুমি বল, তোমার কল্পনার ইনকুইজিটর আর জেসুইটরা 'মামুলি বস্তুগত সুখ' অর্জনের কারণ ছাড়া আর কেনই বা বেঁচে থাকতে চাইবে? কেন তাদের মধ্যে একজন সত্যিকারের শহিদকে পাওয়া যাবে না, যে একটা মহান এবং পবিত্র ধারণার নিয়ে যন্ত্রণা ভোগ করছে এবং হৃদয় দিয়ে মানবতাকে ভালোবেসেছে? এখন ধরে নিই যে এই 'মামুলি বস্তুগত সুখ' এর জন্যে হাঘরের মতন পড়ে থাকা সত্ত্বেও এই জেসুইটদের মধ্যে অন্তত একজন থাকতে পারে, আমার বুড়ো ইনকুইজিটরের মতন একজন, যিনি নিজে বিজনপ্রদেশে শেকড় খেয়ে বেঁচেছিলেন, মুক্ত ও নিখুঁত হওয়ার প্রয়াসে দেহের কষ্টকে সহ্য করতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু যিনি মানবতাকে ভালবাসায় ঢিলে দেননি কখনও, এবং যিনি একদিন ভবিষ্যদ্বাণীর  সত্য’র সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন; যিনি যতোটা পারেন বুঝতে পেরেছিলেন যে পুরোনো ব্যবস্থায় মানবতার বড় অংশ কখনওই সুখী হতে পারবে না, ব্যাপারটা সেই লোকগুলোর জন্য নয় যারা ভাবে যে একজন মহান আদর্শবাদী এসেছিলেন এবং মৃত্যু স্বীকার করেছিলেন আর ঈশ্বরপুত্রের সর্বজনীন সম্প্রীতির স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই সত্য উপলব্ধি করে, তিনি পৃথিবীতে ফিরে এসেছিলেন আর যোগ দিয়েছিলেন-- বুদ্ধিমান এবং ব্যবহারিক মানুষদের সাথে। এটা কি অত অসম্ভব মনে হয়?" 

"কার সাথে যোগ দিয়েছেন? কোন বুদ্ধিমান আর ব্যবহারিক মানুষ?" অ্যালিয়োশা বেশ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল। "তারা কেনই বা অন্য লোকেদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হবে, আর  তাদের কাছে কোন রহস্য এবং গোপনীয়তা থাকতে পারে? তাদের কোনওটাই নেই। তাদের যা আছে তা হলো নাস্তিকতা এবং অবিশ্বাস। তোমার ইনকুইজিটর ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, এবং এটাতেই যা কিছু রহস্য থাকতে পারে তা আছে!" 

"হয়তো তাই। তুমি ব্যাপারটা ঠিকই আঁচ করতে পেরেছ। আর সত্যিই এটা তাই, এবং সেটাই লোকটার পুরো রহস্য; কিন্তু এটা কি তাঁর মতো একজন মানুষের কাছে তীব্র যন্ত্রণা নয়, যিনি মরুভূমিতে তপস্যা করে নিজের সমস্ত জীবনযৌবন নষ্ট করেছিলেন, এবং তা সত্ত্বেও সহকর্মীদের প্রতি তাঁর ভালবাসা থেকে নিজেকে নিরাময় করতে পারেননি? তাঁর জীবনের শেষ দিকে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে আরম্ভ করেন যে মহান এবং ভয়ানক আত্মার পরামর্শ মেনে নিলে তবেই এই লক্ষ লক্ষ দুর্বল বিদ্রোহীদের ভাগ্য, 'বিদ্রূপে গড়া অর্ধ-সমাপ্ত মানুষের নমুনাগুলোকে', সহনীয় করে তোলা যায়। আর, একবার ব্যাপারটা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গেলে, তিনি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন যে সেই উদ্দেশ্যকে অর্জন করার জন্য, একজনকে জ্ঞানী আত্মার নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে, যিনি মৃত্যু এবং ধ্বংসের সেই ভয়ঙ্কর আত্মা, অতএব মিথ্যা এবং প্রতারণার একটি পদ্ধতি গ্রহণ করে মানবতাকে সচেতনভাবে মৃত্যু এবং ধ্বংসের দিকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে যেতে হবে, আর তাছাড়া, সব সময় তাদের ঠকাতে হবে, যাতে তারা বুঝতে না পারে যে তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এবং তাই দুঃখী অন্ধ লোকগুলোকে, অন্তত এই পৃথিবীতে তারা যতদিন আছে, আনন্দের বোধে ফুসলিয়ে রাখতে হবে। এবং এটা লিখে নিতে পারো: ঈশ্বরপুত্রের নামে একটি পাইকারি প্রতারণা, যাঁর আদর্শ নিয়ে বুড়োটা এত আবেগপ্রবণ ছিল, এত উদার, তার প্রায় সারা জীবন ধরে বিশ্বাস করেছিল! এটা কি কষ্ট নয়? 

আর এমন একটা একক ব্যতিক্রম যদি পাওয়া যেত, সেই সেনাবাহিনীর মধ্যে এবং শীর্ষে, 'যে কিনা ক্ষমতা ভোগ করার জন্য অথচ জীবনের নীচ সুখের জন্য লালায়িত, 'তুমি কি মনে করো যে অমন একজন মানুষ একটি ট্র্যাজেডি ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট? তাছাড়া, প্রধান নেতা হিসেবে আমার ইনকুইজিটর মশায়ের মতো একজন একক ব্যক্তি, সমগ্র রোমান ক্যাথলিক ব্যবস্থার বাস্তব ধারণাটি জেসুইট লোকজনদের দিকনির্দেশ করার জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হবে, আমার কবিতায় বর্ণিত একাকীত্বের সবচেয়ে বড় এবং প্রধানতম বিশ্বাস কোনও সময়েও আন্দোলনের মূল পরিচালকদের মাথা থেকে উবে যায়নি। কে জানে, সেই ভয়ঙ্কর বুড়ো ছাড়া, মানবতাকে এত দৃঢ়ভাবে, আর আদি উপায়ে ভালবেসেছে, এমনকি আমাদের দিনকালেও তিনি একাকী ব্যতিক্রমের আকারে বজায় রয়েছেন, যার অস্তিত্ব কেবল আকস্মিকতার কারণে নয়, বরং একটি স্পষ্ট পরস্পরনির্ভর সমঝোতা থেকে উঠে এসেছে, এক গোপন সঙ্গঠনের আকারে, যার উন্মেষ হয়েছিল বহু শতক আগে, যাতে রহস্যটিকে দুর্বল ও দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের  হঠকারী দৃষ্টি থেকে রক্ষা করা যায়, এবং তা কেবল কি তাদের নিজেদের আনন্দের জন্য? সুতরাং ব্যাপারটা তেমনই দাঁড়াল; এর অন্যথা হতে পারে না। আমার সন্দেহ হয় যে খ্রিস্টধর্মীর গোপন সংস্হা ফ্রিম্যাসনদের সংগঠনের ভিত্তিতে এ রকমই কোনও না কোনও রহস্য আছে, এবং রোমান ক্যাথলিক পাদ্রিরা যে তাদের ঘৃণা করে, তার কারণ এটাই, তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রতিযোগী, বিশ্বাসের  বিভেদ খুঁজে পাবার ভয়, যা উপলব্ধি করার জন্য গরুর পাল আর একজন রাখাল প্রয়োজন। যাই হোক, আমার ধারণা সমর্থনের উদ্দেশ্যে, আমাকে এমন একজন লেখকের মতন দেখতে লাগছে যে তার লেখালিখির সমালোচনা সহ্য করতে অক্ষম। এটাই যথেষ্ট।"

"তুমি সম্ভবত নিজেই একজন ফ্রিম্যাসন!" বলে উঠল অ্যালিয়োশা। "তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো না," ও যোগ করল, কণ্ঠস্বরে গভীর দুঃখ নিয়ে। কিন্তু হঠাৎ করে মন্তব্য করার দরুণ দেখল যে তার ভাই তার দিকে ঠাট্টার চোখে তাকিয়ে আছে, "তাহলে তুমি কীভাবে তোমার কবিতা শেষ করতে চাও?" ও অপ্রত্যাশিতভাবে জানতে চাইল, চোখ নামিয়ে, "নাকি, এটি এখানেই খতম?"

"আমার উদ্দেশ্য এরকম একটা দৃশ্য দিয়ে শেষ করা: নিজের হৃদয়কে হালকা করে, ইনকুইজিটর মশায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন ঈশ্বরপুত্রের মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য, নৈঃশব্দের বদলে তিক্ত ও তীক্ষ্ণ কথা শুনতে চাইছিলেন। ঈশ্বরপুত্রের স্তব্ধতা ইনকুইজিটরের ওপর বোঝার ভার হয়ে দাঁড়ায়। ইনকুইজিটর এতক্ষণ লক্ষ্য করছিলেন যে তাঁর ঈশ্বরপুত্র মহাআগ্রহে চুপচাপ তাঁর কথা শুনছেন, ইনকুইজিটরের মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে এবং বন্দির চোখ দু'টি মৃদুভাবে স্থির, এবং তা থেকে বোঝা যায় যে বন্দির উত্তর দেবার আগ্রহ নেই। ঈশ্বরপুত্র হঠাৎ উঠে দাঁড়ান; আস্তে আস্তে এবং নীরবে প্রশ্নকর্তার কাছে আসেন, তিনি তাঁর দিকে ঝুঁকে আলতোভাবে রক্তহীন, নব্বুই বছরের ঠোঁটজোড়ায় চুমু খান। এটাই ছিল যাবতীয় উত্তর। থরথর করে কাঁপতে থাকে গ্র্যাণ্ড ইনকুইজিটর; তার মুখের কোনায় দেখা দেয় আক্ষেপ-পীড়িত খিঁচুনি। ইনকুইজিটর দরজার কাছে গিয়ে কপাট খুলে দেয়, এবং ঈশ্বরপুত্রকে উদ্দেশ্য করে বলে, 'যান,' বলে ইনকুইজিটর, 'চলে যান, আর কখনও ফিরে আসবেন না ...আবার আসবেন না ...কখনও না, কখনও না!' এবং ঈশ্বরপুত্রকে অন্ধকার রাতে বেরিয়ে যেতে দেয়। বন্দি অদৃশ্য হয়ে যায়।"

"আর বুড়ো ইনকুইজিটর?"

"চুম্বন তার হৃদয়কে জ্বলিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু বুড়ো তার নিজের ধারণা এবং অবিশ্বাসে অটল ছিল।"

"আর তুমি, তার সাথে? তুমিও!" হতাশ হয়ে অ্যালিয়োশা বলে ওঠে। শুনে, অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে আইভান।