Saturday, October 14, 2023

চাহনি | পর্ব ৮ | মন্দার মুখোপাধ্যায়


প্রস্তাব

ইশকুল বয়স। মনে হয় চোদ্দ। ক্লাস এইট। ইশকুলের পাঁচিল আর তাদের বাড়ির মধ্যে একটাই সরু পিচ রাস্তা। বাড়িটাও এই রাস্তার ওপরেই। দোতলায়, কাঠের খড়খড়ি দেওয়া জানলাগুলো খুব বড় বড়। খড়খড়ি টেনে, তার ফাঁক দিয়ে এখান থেকেই যে সে রোজ আমাকে দেখে, তা আমি বেশ অনুমান  করতে পারি। কী করে বুঝি! তা জানি না। বয়সে আমার থেকে বছর কয়েকের বড় বলেই আন্দাজ হয়। কিন্তু সে অনুপাতে চালচলনে একটু বেশিরকমই আত্মবিশ্বাসী। মাঝে মাঝে সামনে দিয়ে হেঁটে যায়, নিজেকে চেনাতে। চিনিয়েছে, মোড়ের আড্ডায় দাঁড়িয়েও চকিতে আমার দিকে তাকিয়ে। এসবে আমল না দিলেও সামান্য কেঁপে, মাথা নিচু করে নিজের রাস্তায় চলে গিয়েছি বার বার। তাই তার দিক থেকে এগিয়ে এসে কথা বলা বা আলাপ করার প্রশ্নই ওঠে না। তাকে আমি এভাবেই চিহ্নিত করেছিলাম তার ওই চকিত দেখায়। সুঠাম এবং রূপবান চেহারা। একমুখ নরম দাড়ি, কোঁকড়া চুল আর দৃপ্ত চোখ।

শনি রবিবারও ওই স্কুলে যেতাম, ছবি আঁকা শিখতে। সেদিন ক্লাস শেষ হলে দারোয়ানের চোখ এড়িয়ে, বাউন্ডারি পাঁচিলের কোনায় গিয়ে সেই গাছটার নীচে এসে দাড়িয়েছিলাম। ভেবেছিলাম কিছু কমলা ফুল কুড়িয়ে নেব, যদি দু’একটা পাই! গাছটার নাম জানতাম না। ফুলগুলো এত সুন্দর যে মাঝে মাঝেই কুড়িয়ে এনে পাত্রে সাজিয়ে স্টিল লাইফ আঁকতাম। কখনও স্কার্ট বা ফ্রকের ঘেরে ফেব্রিক পেইন্ট করলেও ওই ফুল। তখন আমার প্রিয় বই বা ডায়েরির ভাঁজেও পাওয়া যেত ওই শুকনো ফুল আর তার পাতা। পাতাগুলিও অন্যরকম সবুজ। গাঢ় নয়, হালকা। 

সেদিন নাগালের মধ্যেই ছোট ছোট স্তবক দেখে, মাথা তুলে হাত বাড়াতেই ওদের জানলাটায় চোখ পড়েছিল। সেদিন আর খড়খড়ির আড়াল থেকে নয়। জানলাটা হাট খুলে, দু'হাতে দু'টো লোহার রেলিং ধরে সে দাঁড়িয়ে আছে। যেন এক অকপট মুগ্ধতায় স্নান করে। গায়ে ছিল সাদা পায়জামা আর গেঞ্জি। কোঁকড়া চুলগুলো ভিজে পাট পাট। তার সর্বাঙ্গে রবিবারের আরাম। জানলাটা মানুষের থেকেও লম্বা বলে তার পুরো শরীরটাই সেদিনও দেখা গিয়ছিল।

ফুলের ফাঁক দিয়ে তার চোখে আমার চোখ পড়তেই সে হাসল নিভৃতে। তার সেই নিজস্ব চাহনিতে কোনও সংকোচ নেই। আমি কেমন কুঁকড়ে গেলাম। চোখ নামিয়ে ফুল-সমেত ডালটা ছেড়ে, মাথা নামিয়ে গেটের দিকে হাঁটা দিলাম দ্রুত। মায়ের ডিজাইনে বানানো কমলা রঙের আমব্রেলা কাটের  সুতির ফ্রক  পরা, আমার সেই টিংটিঙে শরীরে সে কী ভাললাগা! আর তার ওই চাহনিতে যেন বড় হয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি।

সে কি বুঝেছিল, হাসি ফিরিয়ে না দিলেও কতখানি সম্মতি ছিল আমার! অচেনা শিহরণে কত হাসি ঝরেছিল মনের গভীরে!

আজও জানি না যে কী ফুলের গাছ ছিল সেটা! রাস্তায় বা বাগানে ওই কমলা ফুলের গাছ দেখলেই এখনও তো কেঁপে উঠি। মনে পড়ে তার সেই নির্ণিমেষ চেয়ে থাকা; অভ্যর্থনার উষ্ণ প্রকাশ; সপ্রতিভ হাসি। 

আমার মন থেকে কোনওদিন কি মুছে যাবে তার সেই নির্ণিমেষ চাহনি…… প্রেমের প্রস্তাব!

Tuesday, October 10, 2023

উত্তর শিলালিপি | কমলেশ রাহারায় স্মরণ সংখ্যা | শরৎ ১৪৩০


স্বাগতকথন

কবি কমলেশ রাহারায়ের (১৯৪৬-২০২১) পারলৌকিক কাজে এসেছিলেন তাঁর বন্ধু-স্বজন। সেদিনের অনুষ্ঠানে একটি ডায়রিতে তাঁরা লিখে দিয়েছিলেন এইসব স্মৃতিকথন। পরেও অনেকে এসে নানা সময় ভরিয়ে তুলেছেন সেই ডায়রির পৃষ্ঠা। কবির স্বপ্নের পত্রিকা 'উত্তর শিলালিপি' এবার সেইসব লেখাকে একসঙ্গে প্রকাশ করল। সেই সঙ্গে শুরুতেই রইল তাঁর একটি কবিতা এবং অনুবাদ। পাশাপাশি থাকল আমাকে লেখা কমলেশ রাহারায় সম্পর্কিত পাঁচটি চিঠি। সবশেষে কবির তিন পর্বের ভিডিও সাক্ষাৎকার।

অরুণাভ রাহারায়

সম্পাদক, উত্তর শিলালিপি

---------------------------------------------------------

ক্রম

কমলেশ রাহারায়ের কবিতা ও জগন্নাথ বিশ্বাসের অনুবাদ

ই-চিঠি: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সিতাংশু যশশ্চন্দ্র, হান্স হার্ডার, অশ্বিনী কুমার, উদয়ন বাজপেয়ী

স্মরণলিপি: অর্ণব সেন, পবিত্রভূষণ সরকার, নিখিলেশ রায়, রামেশ্বর রায়, মধুমিতা চক্রবর্তী, সঞ্চিতা দাশ, উত্তম চৌধুরী, শান্তনু দত্ত, কল্যাণ হোড়, প্রশান্ত দেবনাথ, আমিনুর রাহমান, উত্তমকুমার মোদক, সঞ্জয় সাহা, অম্বরীশ ঘোষ, গৌরব চক্রবর্তী, ব্রহ্মজিৎ সরকার, দেবায়ন চৌধুরী

কমলেশ রাহারায়ের ভিডিও সাক্ষাৎকার

---------------------------------------------------------

কণ্ঠস্বর

কমলেশ রাহারায় 

আজকাল শৃঙ্গহরিণ নিয়ে পুননির্মাণে মেতে উঠি

এই ছায়ারোদে সে একাই যেন উৎসবমুখর

তুরুপের তাস ভেবে তাকেই ছিঁটিয়ে দিচ্ছি তৃষ্ণাজল 

তবু কেন বলে সে, হৃদয়ে রেখেছ পোড়াকাঠ


আমার কণ্ঠস্বর সুদীপ্ত হাওয়ায় ভাসে 

তুমি কি শুনতে পাও এই বেলা অবেলায় 

সাগর দিঘির জলে কতখানি শীতল সহিষ্ণু হয় 


আমি অর্জুন নই শব্দমোহর ক্রমান্বয়ে রেখেছি পাতায় 

এইসব নৈবেদ্য সাজাতে গিয়ে ক্ষণে ক্ষণে বৃক্ষমঙ্গল হই

তুমি অনুভবে হঠাৎ বৃষ্টিদিনে-- রম্য চাঁদ দিলে না কখনও


তবু অকুলবিহারী গন্ধ, সারারাত দিগ্বিদিক

তোমাকে সঙ্গে নিয়ে মুগ্ধতায় হেঁটে যাব বাকি পথ


Voice

Kamalesh Raha Roy

Translated by Jagannath Biswas


Now I devote in reconstructing horned deer,

In this shady sun he seems festive alone

Assuming a trump-card I throw to him his thirst-water

Yet, why he says, burnt wood is kept in heart.


My voice floats in luminous air 

can you hear

how much cold is tolerable

in lake and sea


I am no Arjun, I keep coinages in leaves,

For this oblation I become the plant-god moment by moment 

Your feelings never on a rainy day 

Gave a bright moon


Yet a redolence everywhere, the entire night

I will walk with you enchanted the rest of the path.

---------------------------------------------------------

ই-চিঠি

অরুণাভ,

পিতৃবিয়োগ বড়ই বেদনাদায়ক। ঠাকুর তোমাকে এ শোক সহ্য করার শক্তি দিন।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

---------------------------------------------------------

Dear Arunava, 

in this time of sheer grief and pain, we are with you as much as we can. The image that you have sent,  of your father, poet Kamalesh Raha Roy, at his writing desk early in the morning, enables me to feel your closeness with him. And the absence. "From the hollow of the tree", as your poem says, "a musical melody" is heard. In his poems you would be able to be with him, and in your poems too.... We keep in touch through WhatsApp and email for now. 

Warm personal regards, 

Sitanshu Yashaschandra

বি দ্র: গুজরাটি সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি ও লেখক। সাহিত্য আকদেমি ও পদ্মশ্রী প্রাপক।

---------------------------------------------------------

Priyo Arunabha,

apnar babar mrityusombad peye khub kharap laglo. baba-chheler somporkota amader jibone birat boro ekta bhumika rakhe. tar opor dekhchhi sahityer madhyome apnader dujoner ei prakritik jogajoger baireo ekta jogsutro chhilo.

babara kintu chole geleo onekdin amader songe theke jan bole amar obhiggota.

asha kori apni babake haranor duhkho samle nite parben. amar antorik somobedona neben.

Hans Harder

বি দ্র: হান্স হার্ডার, জার্মান অধ্যাপক ও বাঙালির পরম আত্মীয়।

---------------------------------------------------------

Dear Arunava, 

Sad to hear this- passing away of your dad, a poet too. Very tough to over come grief , yet I am sure you will memorialize him in your works and he will live  in "folklores from oyster shell!"....the best life is to stay etched in the memories and in folklores that is what you father has gifted to you.   Hope, you and your family stay well cherish his memories and his poems...

Ashwani Kumar

বি দ্র: কবি ও মুম্বয়ের টাটা ইনিস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সাইন্সের প্রফেসর।

---------------------------------------------------------

Dear Arunava, 

Both of Kamalesh ji 's are really nice.  I loved reading them.  If I may use a mathematical expression,  I will say: in poems there sadness 'under root' vast expense.

Udayan Vajpeyi

বি দ্র: হিন্দি ভাষার সুপরিচিত কবি। ভোপালবাসী।

---------------------------------------------------------

স্মরণলিপি

তাঁর পরিচিতি ছিল ব্যাপক

অর্ণব সেন

কমলেশ রাহারায়কে আমি কলেজে ছাত্র হিসাবে পেয়েছিলাম। সত্তর-আশির দশকে। বিশ শতকে, তাঁর পরিচিতি ছিল ব্যাপক। তুষার বন্দ্যোপাধ্যায় ও পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত সম্পাদিত ‘উত্তরের কবিতা’ সংকলনের প্রবীণতম কবি গণেশ রায়, নবীনতম কবি একমাত্র কমলেশ রাহারায়। তবে, জলপাই-ডুয়ার্সে তাঁকে সম্ভাবনাময় কবি হিসাবে আবিষ্কার করেছিলেন কবি বঙ্কিম মাহাতো, কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র হিসাবে। বঙ্কিম অবশ্য রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসাবে চলে যান। 

কমলেশ রাহারায়ের দু’টি মাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘বিপরীত বসন্ত’ এবং ‘লিনোকাটে তাপ নিচ্ছি’-– আসলে কবি হিসাবে যত ব্যাপক পরিচিতি তাঁর, সেই তুলনায় কবিতার বই করা হয়নি। স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত কবি বলেই তাঁকে চিনেছি। তবে শুধু কবি নয়, গায়ক হিসাবেও তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল মঞ্চে, ঘরেবাইরে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের অনেকের সঙ্গে কমলেশ ডুরুঙ্গামারি গিয়েছিল সাহায্য দিতে। তাঁর গানে বিপুল সাড়া তুলেছিল সমবেত জনতার মধ্যে। সে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য!

---------------------------------------------------------

কমলেশ সত্যিই আমার গুণমুগ্ধ ছিল

পবিত্রভূষণ সরকার

ছেলেবেলার বন্ধু কমলেশের প্রয়াণ আমার কাছে খুবই বেদনার। দীর্ঘদিন নানা বিষয়ে তাঁর সাথে আমার গভীর সম্পর্ক ছিল। সাহিত্য জগৎ কিংবা কবিতায় তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি আমাকে মুগ্ধ করত। আমার পত্রিকা (মাটিরছোঁয়া ও উৎস) এবং বিকল্প স্মারক পত্রিকায় তাঁর কবিতাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছি। কমলেশ সত্যিই আমার গুণমুগ্ধ ছিল। সাহিত্যের অঙ্গনে কমলেশের সাহচর্য ও সহযোগিতা চির অম্লান। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।

---------------------------------------------------------

আলিপুরদুয়ার শহরে কমলেশদা ছিলেন একটা বড় আশ্রয়

নিখিলেশ রায়

কমলেশদা (রাহারায়) থাকবেন না, আর তাঁর সম্পর্কে এইরকম একটা খাতায় আমাকে কিছু লিখতে হবে-- তা কোনওদিন ভাবিনি। আমার ছাত্রজীবনে লেখালিখি শুরুর দিকটায় আলিপুরদুয়ার শহরে কমলেশদা ছিলেন একটা বড় আশ্রয়। এত ভালোবাসা, ওই দিনগুলোতে, গ্রাম থেকে প্রথম প্রথম শহরে আসা এই ছেলেটি আর কারও কাছে পায়নি। সর্বক্ষণ উৎসাহ দিতেন। তাঁর নতুন লেখা শোনাতেন, নতুন লেখা শুনতে চাইতেন। তাঁর সঙ্গে কাটানো বহু স্মৃতি! অসম্ভব ইতিবাচক একটা বড় মনের অধিকারী কমলেশদা আজ নেই -এই শূন্যতা বহুদিন ভরাট হওয়ার নয়। তাঁকে আমার প্রণাম! 

---------------------------------------------------------

বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

রামেশ্বর রায়

প্রিয় কবি, কমলেশদা, চলে যাবার পর আমরা আলিপুরদুয়ারবাসী, শিল্প-সাহিত্য সকলে গভীরভাবে শোকাহত। ওঁর শেষকৃত্যের ক'টি চিত্রে রইল আমার বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। 

---------------------------------------------------------

হৃদয়ে আছেন কমলেশদা

মধুমিতা চক্রবর্তী

'নিজেকে বিপন্নতার খাদের ধারে নিয়ে না এলে কীভাবে কবিতা লিখবি'-- কমলেশদার অমোঘ উক্তিটি আজও তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে কবিতার ঝরনাতলায়। আপনি হৃদয়ে আছেন কমলেশদা। অনন্ত শ্রদ্ধা জানাই।

---------------------------------------------------------

কবিতায় আত্মভোলা এমন মানুষ দ্বিতীয়টি দেখিনি

সঞ্চিতা দাশ 

কমলেশদা সাহিত্যজীবনে আমার অভিভাবকস্বরূপ। আসতে যেতে তাঁর কোয়ার্টারে আড্ডা, এটা একসময় নৈমিত্তিক হয়ে উঠেছিল। অনেক অনুষ্ঠানে দ্বৈত কণ্ঠে গান গেয়েছি। কবিতায় আত্মভোলা এমন মানুষ দ্বিতীয়টি দেখিনি। তিনি চিরদিন আমার অন্তঃস্থলে শ্রদ্ধার আসনে থাকবেন।

---------------------------------------------------------

তাঁর স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানাই

উত্তম চৌধুরী

জীবনের অমোঘ সত্য মেনে কমলেশদা চলে গিয়েছেন। এ যাওয়া অপূরণীয়। আমাদের প্রিয় মানুষ, প্রিয় কবি। আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। সে সব মনে পড়লে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে উঠি। তাঁর স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানাই।

---------------------------------------------------------

ওঁর সৌজন্যে আমি মুগ্ধ

শান্তনু দত্ত

প্রথম কমলেশদাকে যখন দেখি সেটা ২০০২ সাল। এর আগে আমি আলিপুরদুয়ারে নিয়মিত থাকলেও সামাজিক প্রতিবেশে সেভাবে মেলামেশার সুযোগ পাইনি। ওঁর পুত্র অরুণাভ আমাদের বিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার সুবাদে এবং আমার প্রধান শিক্ষকতায় নিয়োজিত হওয়ার পর ওঁর সঙ্গে আলাপচারিতার সুযোগ হয় এবং শীঘ্রই আমি কমলেশদার লেখালিখির প্রেমে পড়ি। ‘আপনার কবিতা আমার খুব ভালো লাগে’-- এ কথা শুনে উনি উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। আমার পাঠ-প্রতিক্রিয়া ওঁর মতো বড় মাপের কবির কাছে তুচ্ছ হলেও সেদিন ওঁর সৌজন্যে আমি মুগ্ধ হয়েছি।

---------------------------------------------------------

শূন্যতা কোনও দিনই পূর্ণ হবে না

কল্যাণ হোড়

সেই শৈশব থেকে চিনতাম কমলেশদাকে। পরবর্তীতে ৮০-র দশকে লেখালিখি সূত্রে ওঁর সঙ্গে ঘনিষ্টতা। অসাধারণ মনের এবং অসাধারণ লেখার মধ্যে দিয়ে তিনি সবার প্রিয় ছিলেন। ওঁর শূন্যতা কোনও দিনই পূর্ণ হবে না। দাদা যেখানেই থাকুন শান্তিতে থাকুন।


লেখালিখির ক্ষেত্রে তাঁর কাছে আমার অনেক ঋণ

প্রশান্ত দেবনাথ

সকলকেই চলে যেতে হয় একদিন জীবনের ওপারে। এই সত্য জানি। কিন্তু কারও চলে যাওয়া একেবারে নির্বাক করে দেয়। কথাগুলো যেন পাথর হয়ে যায়। কবি কমলেশ রাহারায় আমার খুব কাছের মানুষ ছিলেন। লেখালিখির ক্ষেত্রে তাঁর কাছে আমার অনেক ঋণ। তিনি চলে গেছেন এ কথা ঠিক। কিন্তু কমলেশদা আমাদের ভালোবাসায় এখনও আছেন, এভাবে চিরদিনই থাকবেন। তাঁকে আমার শ্রদ্ধা জানাই।

---------------------------------------------------------

তিনি যে আমার জীবনের ধ্রুবতারা

আমিনুর রাহমান

প্রিয় মানুষ। প্রিয় কবি। আমার প্রিয় দাদা আজ ঘরে নেই। কিন্তু এ ঘরে তাঁর ঘ্রাণ পাচ্ছি, তাঁর কণ্ঠে শুনতে পাচ্ছি সৃষ্টি। অন্তরে তাঁর প্রতিধ্বনি আমাকে শিহরিত করছে তেমনই। 'বৈঠা'র জন্মলগ্ন থেকে তাঁর ছায়া পেয়েছি, স্নেহ-মায়া পেয়েছি অনাবিল। সংস্কৃতি আর সাহিত্যের প্রিয় শহর আলিপুরদুয়ারকে চিনিয়েছিলেন হাত ধরে। কত গুণী মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি পিতৃসম দাদার হাত ধরে।

সারা জীবনেও শিক্ষা ফুরায় না দেওয়া-নেওয়ার ফুলেল নৈবেদ্য। তাঁর কাছে শুধু নিয়েছি আর নিয়েছি। দিয়েছি তাঁরই আশির্বাদের 'বৈঠার ছলাৎছল শব্দটুক' শুধু।

যতদিন বইতে পারব-- বৈঠার প্রতিটি ঢেউ ভাঙার ভাষায় মনে রবেন কমলেশদা। জানি প্রতি মুহূর্তে পাব তাঁর সাড়া। তিনি যে আমার জীবনের ধ্রুবতারা। স্মৃতির প্রতি গভীর ও বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

---------------------------------------------------------

কবি জেগে থাকেনই

উত্তমকুমার মোদক

সঙ্গীত ও সাহিত্যের মাধুর্য্য পাশাপাশি আত্মলীন বহন করে গিয়েছেন কমলেশ রাহারায়। আমি নয় দশকের প্রথমার্ধে কবির সঙ্গে পরিচিত হই। এরপর তিনি স্নেহ ভালোবাসায় জড়িয়ে নিয়েছিলেন আমাদের, বিনিময়ে অকপট, অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা পেয়েছেন সঙ্গীত ও কাব্যকৃতীর জন্য আন্তরিক। বলা যায়, কমলেশদা ছিলেন আমাদের সাহিত্যচর্চার নায়ক ও নেতা। তিনি চিরস্মরণীয় থাকবেন।

---------------------------------------------------------

বিশ্বাসের কাছে সৎ ছিলেন কমলেশদা

সঞ্জয় সাহা

'কেন প্রেম দিলে দ্বীপ্রহরে

ভেবে দেখ,

পুনর্বার ভেবে দেখ, করলি তো ভুল

বৃষ্টিভেজা গল্পবকুল'

কমলেশদার এই কবিতাটা যখন পড়ি তখন আমি কমলেশদাকে চিনি না, জানিও না। বেরিয়েছিল একটি ছোট্ট ফোল্ডারের মতো কাগজ ‘মঞ্জিল’-এ (সম্ভবত)। বাংলার ১৩৯৯ সনের দিকে। কেননা স্মৃতিতে সেই সবুজ ফোল্ডারটির উপরের এই সন আর নিচে কমলেশদার কবিতাটা ভেসে উঠছে। পরিচয় তার একদশক পরে, সম্ভবত কোচবিহারে। বয়সের অনেক তফাৎ থাকলেও স্নেহ ও বন্ধুত্ব দুইই পেয়েছি। কমলেশদা একবার কবিতার নামে যা খুশি শব্দ প্রয়োগে ক্ষেপে গিয়েছিলেন বলে মনে আছে এই আলিপুরদুয়ারেরই বড় কবিসভায়। কেননা কোনও এক জনৈক কবি লিখেছিলেন-- ‘আলেকজান্ডার ট্রেনের কামরায় দাঁতন বেচেন’। বিশ্বাসের কাছে সৎ ছিলেন কমলেশদা। আরও অনেক মজার মজার যাপন কথা শুনেছি ওঁর বন্ধু রমাপ্রসাদ নাগের কাছে। কমলেশদার আত্মার শান্তি কামনা করি। প্রণাম দাদা।  

---------------------------------------------------------

বন্ধুর মতো মেশার সুযোগ পেয়েছি

অম্বরীশ ঘোষ

যেই মানুষটার কাছ থেকে আজীবন শুধু শিখেই গেলাম, দু’হাত পেতে নিয়েই গেলাম, সেই মানুষটা ‘নেই’-- এই শব্দটায় আমি বিশ্বাসী নই। যা কিছু জ্ঞান, প্রাপ্তি, জনসংযোগের উপায়, মানুষ হিসাবে বিস্তার, তার সবটা জুড়েই থেকে যাবেন এই মানুষটা। ‘মামা’ সম্বোধন করলেও বন্ধুর মতো মেশার সুযোগ পেয়েছি, সমাজ-সংস্কৃতিতে বিচরণের সৌভাগ্য হয়েছে ওনার সঙ্গে। যতদিন সাহিত্য-সংস্কৃতি থাকবে, ততদিন কমলেশ রাহারায় থাকবেন।

---------------------------------------------------------

কবিজন্মের কুঁড়ি প্রস্ফুটিত হয় কবি কমলেশ রাহারায়ের স্নেহস্পর্শে

গৌরব চক্রবর্তী

'অথচ কেউ জানে না

কোন পাহাড়ে অদলবদল হল মেঘ

একা একা সূর্য উদয় হল...' 

              –কমলেশ রাহারায়

কাকু, অর্থাৎ কবি কমলেশ রাহারায় সম্পর্কে এই লেখা কীভাবে লিখব? কী লিখব? আমার এই সামান্য কবিজীবনের সূচনাকালীন ঘ্রাণ এই কাকুর কাছ থেকে পাওয়া! আমার কবিজন্মের কুঁড়ি প্রস্ফুটিত হয় কবি কমলেশ রাহারায়ের স্নেহস্পর্শে, তাঁর আদরজনিত প্রশ্রয়ে, তাঁর কবিতার আশ্রয়ে এসেই। তিনি যে সন্তানস্নেহে তাঁর কবিতা ভাবনা ও কবিজীবন আমার যাপন ও জীবনের মধ্যে সঞ্চারিত করে দিয়েছেন, সেই বীজ ফেটে ফেটে আজও কিছু চারাগাছের জন্ম হয় আমার লেখার খাতায় –সেগুলোকেই আমি কবিতা বলে ডাকি। কবি কমলেশ রাহারায় আমার শুরুর দিকের কবিতাগুলির ঠিকঠাক দিক-নির্দেশ করিয়া দিয়েছেন বলেই... আজও কেউ কেউ আমার নামের সঙ্গে ‘কবি’ শব্দটি জুড়ে দিতে পারেন আজও! এই ঋণ শোধ হওয়ার নয়... শোধ করার নয়! কাকু আছেন। থাকবেন -কাকু হয়ে, বিরাট মাপের একজন কবি হয়ে থেকে যাবেন আমার হৃদয়ে চিরকাল...

---------------------------------------------------------

শূন্য ঘরে শুধু স্মৃতি পড়ে আছে

ব্রহ্মজিৎ সরকার

এই ঘরে ঢুকেই দেখি বিছানাটি নেই। বিছানার উপর কবিও নেই। প্রায় চার বছর আগে এখানেই কাকুর সঙ্গে অর্থাৎ কবি কমলেশ রাহারায়ের সঙ্গে শেষ আড্ডা ও কথা হয়েছিল।

আজ এই শূন্য ঘরে শুধু স্মৃতি পড়ে আছে। স্বর্গীয় কবি কমলেশ রাহারায়ের জন্য থাকল আমার প্রণাম ও অনেক অনেক শ্রদ্ধা।

---------------------------------------------------------

ভালোবাসাই বুঝি দুঃসাহসী করে তোলে

দেবায়ন চৌধুরী

অরুণাভ কতবার বলেছে বাড়িতে আসতে, হয়ে ওঠেনি। আজ হল। কিন্তু কাকুর সঙ্গে দেখা হল না। ওঁর ছবির সামনে যে দু-কথা লিখছি, এটা হয়তো দুঃসাহস। ভালোবাসাই বুঝি দুঃসাহসী করে তোলে।

কবির বাড়ি দেখলাম। উত্তরাধিকার বয়ে চলেছে নদীর মতো…

শুদ্ধ হবার পালা...

---------------------------------------------------------

ভিডিও সাক্ষাৎকার শুনতে লিংকে ক্লিক করুন

কমলেশ রাহারায়ের ভিডিও সাক্ষাৎকার ১

কমলেশ রাহারায়ের ভিডিও সাক্ষাৎকার ২

কমলেশ রাহারায়ের ভিডিও সাক্ষাৎকার ৩



Saturday, September 23, 2023

চাহনি | পর্ব ৭ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

চক্ষুদান

চক্ষুদান কথাটার অর্থ আজকাল আমূল বদলে গেছে। সদ্যমৃতের সজীব চোখ আই ব্যাঙ্কে রেখে জীবিতকে চক্ষুষ্মান করা। এতে একজন দাতা এবং অন্যজন গ্রহীতা। আর পুরো কাজটি করেন চিকিৎসকেরা। এ এক মহতী সেবা। অন্ধ বা প্রায়ান্ধদের চোখে আলো ফোটে। আমাদের শৈশব এবং কৈশোরে চক্ষুদান বলতে একমাত্র যা বোঝাতো তা হল, বিগ্রহের চোখ ফোটানো। এ কাজটি প্রথমে করতেন প্রতিমা শিল্পীরা। পরে পুজোপাঠের মধ্যে দিয়ে, সেই বিগ্রহে প্রাণ সঞ্চার করে তাকে সজল করে তুলতেন পুরোহিত। এ এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। সকলের মনে হবে-– মা যেন চেয়ে আছেন।

বাড়ির খুব কাছেই ভটচায্যি বাড়িতে দুর্গা পুজা হতো। রথেরদিন খুঁটি পুজো করে ঘট বসত। এরপর কবে যেন মাটির ঢিবি রাখা হতো চণ্ডীমণ্ডপে; আর শুরু হয়ে যেত প্রতিমা গড়ার কাজ। একটা বাঁশের চালচিত্রে ছেলেপিলে বাহন-সহ মাদুগ্গার সংসার। প্রতিদিন ইস্কুলের পরে, বিকেলের খেলা বাদ দিয়ে আর ছুটির দিনগুলো দুপুর থেকে সেখানেই পড়ে থাকতাম। হাঁ করে দেখতাম সেই ঠাকুর গড়া। মাস খানেক ধরে সে পব্বো শেষ হলে, শুরু হতো মায়ের চক্ষুদান। তখন কিন্তু নির্জন মণ্ডপে একা সেই বুড়ো মানুষটি যিনি চোখ আঁকবেন। ভোর থেকে সবাই দেখতে পাবে মায়ের চোখ কেমন চেয়ে আছে। আমি অবশ্য অসুর এবং সিংহের চোখজোড়াও দেখতাম। সিংহের হুঙ্কার আর অসুরের ভয় দুটোই প্রকাশ পেত ওই আঁকা মণিতে। আর মায়ের চোখে যেন উৎসব। আমাদের নতুন জামা-জুতো পাওয়ার আনন্দ । মজা লাগত গণেশের কুতকুতে চোখ দেখেও। কী একটা আকর্ষণ থাকতো তাতেও। তবে কার্ত্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী-– এই তিনজনের চোখ প্রায় এক রকম। মিষ্টি মিষ্টি সেজে তাকিয়ে থাকা। 

প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে কত না প্রতিমা আর তার কী বিচিত্র সব অভিব্যক্তি! তেজ, শক্তি, প্রসন্নতা-– একেক শিল্পীর একেক রকম প্রকাশ। কিন্তু যে একটা ব্যাপারে সমতা ছিল, তা হল সবই কিন্তু প্রতিমার চোখ। এ চাহনি মানুষের দৃষ্টিতে পাইনি। এমনকি অভিনয় বা নাচেও তাঁদের প্রতিমার মতো মনে হয়; কিন্তু প্রতিমা মনে হয় না। এ চাহনি দেবীর। মনে হয় একমাত্র মূর্তিতেই ফুটে ওঠে কারণ তা স্থির। এ চোখের পলক পড়ে না।

প্রতি বছর একবার কুমোরটুলি যাই। যাই কালীঘাটের পোটো পাড়াতেও। তা ছাড়াও এ শহরের নানান আনাচ কানাচে কুমোরদের কিছু সাবেক ঘর এখনও নয় নয় করেও আছে। বিশ্বকর্মা পুজো হয়ে গেলেই শুরু হয়ে যায় দুর্গা প্রতিমা গড়ার কাজ। ছোট্ট ছোট্ট ঘরে ঠাসাঠাসি করে রাখা মস্ত মস্ত প্রতিমা। মাটির কাজ শেষ হয়ে এবার রং এবং চক্ষুদান হবে। বেশিরভাগই বারোয়ারি পুজোর অর্ডারি ঠাকুর। শিল্পীদের জিজ্ঞাসা করি কেমন লাগে ওই চক্ষুদান পর্ব! সকলেরই প্রায় এক উত্তর– মা এসে আঁকিয়ে নেন। এই অনুভুতিটাই বোধহয় চক্ষুদানের আসল চাবি কাঠি। এবারেও যখন গেলাম, মনে হল ওই এ কোণা ও কোণা থেকেও মা যেন দেখছেন। বাকি সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তো পুতুলের, কিন্তু চোখের দিকে তাকালেই তা যেন শক্তি! উৎসব।

হয়তো এ জন্যই মানুষের চেয়ে থাকায় যা চাহনি, দেবী মূর্তির ওই চেয়ে থাকা হল–- পূর্ণদৃষ্টি। যে দৃষ্টিতে পলক পড়ে না। তবুও তা সতেজ এবং বাঙ্ময়।

Tuesday, September 5, 2023

অধরা গালিব ও তাঁর গজল | মহিউদ্দিন সাইফ

উর্দু শায়েরি আর গালিব যেন সমার্থক। গালিবের মনন, চিন্তন আর কল্পনা বিশ্বসাহিত্যে বিস্ময়কর। বড় কবিদের শায়েরির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হল 'মানি আফ্রিনিশি' অর্থাৎ নতুন নতুন অর্থের জন্ম দেওয়া। গালিবের শায়েরি হল তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

আমি চিরকালই গালিবের কবিতার ন্যাওটা। আর আমার উর্দু কাব্যচর্চাও শুরু হয় তাঁকে দিয়েই। যেমন ফারসি শুরু হয় মওলা রুমিকে দিয়ে। গালিবের কবিতা আমার নিজের কাব্যবোধ ও কাব্যভুবন গড়ে তুলতে এক অতুলন ভূমিকা রেখেছে। গালিব অনুবাদের কোনও ইচ্ছে আমার ছিল না প্রথমে। কারণ অনুবাদে গালিব আনা পৃথিবীর কঠিনতম কাজের একটি। কিন্তু তাঁর শের বা গজলের বাংলা অনুবাদ দেখে আমার আক্ষেপ হয়েছে বারবার। তখন থেকে স্বপ্ন দেখেছি যোগ্যতা অর্জন করলে, বুকের পাটা তৈরি হলে আমি নিশ্চয় একদিন গালিব অনুবাদে হাত দেব। বেশ কয়েকদিন ধরে গালিবের অনুবাদ বিষয়ে বিভিন্ন ভাবনা ভাবতে ভাবতে বিপ্লবদার (কবি বিপ্লব চৌধুরী) ফোন থেকে একদিন কল এল। অরুণাভদার সঙ্গে আলাপ হতেই তিনি গালিবের অনুবাদের কথা তুললেন। আমি যেন মনে আরেকটু জোর পেলাম। তারই ফলস্বরূপ কাজে নেমে পড়া।

আমি আগেই বলেছি অনুবাদে গালিব নামানো পৃথিবীর কঠিনতম কাজের একটি। এটা জেনেই আমি তাতে হাত দিয়েছি। প্রাণপণ দিয়ে চেষ্টা করেছি মূলের ভাবটিকে অবিকৃত রাখার। চেষ্টা করেছি 'মানি আফ্রিনিশি'র আশ্চর্য বৈশিষ্টকে ঠিক রাখার। মূল গজলের ভঙ্গি মোতাবেক বাংলা অনুবাদে বিভিন্ন ছন্দ ব্যবহার করতে হয়েছে আমাকে। আমার প্রচেষ্টা কতটুকু কৃতকার্য হয়েছে সেকথা রসিকজন ঠিক বলতে পারবেন। ত্রুটি দেখে করুণাবশে ক্ষমাও করবেন জানি। এখন তাহলে গালিব পড়ি!

১. 

(নক্শ ফরিয়াদি হ্যা কিস্ কি)


চিত্রগরীর খেয়ালিপনার অভিযোগ করে ছবি যে কার!

সামান্য এক কাগজ-লেবাস পরানো রয়েছে গায়ে সবার।


শুধিও না একাকীত্বের কথা, জীবনের এই দুর্বিপাক,

সন্ধে পেরিয়ে সকালকে আনা, গিরি কেটে আনা শীরের ধার।


বে-কাবু এই প্রেমের আবেগ বেড়ে গেছে দেখো এইভাবে,

তলোয়ার থেকে তীক্ষ্ণতা তার বেরিয়ে এসেছে বে-কারার।


যেভাবে পারুক বিছাক চেতনা শ্রবণের জাল, বুঝতে চাক,

আমার বাচনভঙ্গি পুরাণপাখির তুল্য, এই তো সার।


বন্দিত্বেও পায়ের তলায় আগুন রেখেই রই 'গালিব',

অগ্নিদগ্ধ লোমরাজিই তো শিকলের কড়া হল আমার।


২.

(শওক হর রঙ্গ্)


বাসনা শত্রু হল প্রতিপলে বাঁচবার উপায় গুলির,

ছবির পর্দা, তবু দেখা যায় মজনুর নগ্ন শরীর।


ক্ষতও তো বুঝল না হৃদয়ের ব্যাকুলতা, মর্ম গভীর

যখ্মি হৃদয় থেকে ডানা মেলে উড়ে গেল বেদনার তীর।


দীপের ধোঁয়াটি আর ফুলের সুবাস আর কান্না বুকের

তোমার আসর থেকে যে-ই বেরোল, হয়ে ব্যাকুল অধীর।


বাসনাদগ্ধ এই মন আমার বেদনার থালা সুস্বাদু,

বন্ধুরা তুলে নিল, যে যেমন নিতে পারে বেদনার ক্ষীর।


বাসনার পথে জেনো নিজেকে ত্যাজ্য করা কঠিন মোকাম

তাও পার হওয়া গেল, বাকি থাকে বল আর কোন কোন তীর?


হৃদয়ে আবার এক কান্নার হাহাকার উঠল 'গালিব'

বৃষ্টি হল না বলে ঝড় হয়ে বেরল যে তারই নজির।


৩.

(দহর মেঁ নক্শে-ওয়াফা)


অনুরক্তির ছবি এ জগতে প্রবোধের হল না কারণ,

নিজের অর্থে লাজ পেল না পেল না এই শব্দ এমন।


মৃত্যু কামনা করি ছাড়া পেতে অনুরক্তির গ্লানি হতে,

কিন্তু সে অবকাশটুকুও তো দিল না সে নিদয় এমন।


হৃদয় পথিক হয়ে থেকে যাক মদিরা ও পেয়ালার পথে,

খোদাভক্তির পথে প্রাণ আমার কিছুতেই গেল না যখন।


মিলনের কথা তুমি দাওনিকো, তবু রাজি হয়ে আছি আমি

সুসম্ভাষণ চেয়ে হল না এ কান আমার আতুর যেমন।


ভাগ্যবিড়ম্বিত হয়ে আছি, কার কাছে করি অভিযোগ?

চাইছি মরণ হোক, হায়! তবু কিছুতেই আসে না মরণ।


মরে যাই ক্ষীণতনু গালিবের এমন নাজুক হাল দেখে,

জীবন ফিরিয়ে আনা ঈশার ও ফুঁ-টুকুও হল না সহন!


৪.

(ইশ্ক মুঝকো নহি)


প্রেম নয় এ উন্মাদনা, উন্মাদনাই হল

আমার উন্মাদনা তোমার খ্যাতির উপায় হল।


সম্পর্ক ছিন্ন তুমি কোরো না এইভাবে

কিছু না থাক না-হয় এবার শত্রুতাটাই রইল।


সঙ্গে আমি থাকলে তোমার কিসের অপমান?

লোকসমাজের ভয় থাকে তো নির্জনতায় চল।


আমি তোমার শত্রু তো নই, দ্বিধা কেন হায়!

না-হয় তোমার পরের সাথে ভালবাসাই হল।


যেটুক আছ, আছ নিজের অস্তিত্বের জোরে

চেতনা যদি না থাকে তো অচেতনাই হল।


প্রেমের থেকে বাফার থেকে ছাড়িয়ে নিলাম হাত

প্রেমে থাকা না থাকে তো দুঃখে থাকাই হল।


অবিচারের আকাশ তুমি কিছু তো দাও হাতে

বিদায়বেলার তোফা না-হয় হা-হুতাশই হল।


আমিও সব মেনে নেওয়ার স্বভাব করে নেব

তোমার নাহয় স্বভাব হয়ে উপেক্ষাটাই রইল।


বঁধুর সাথে নেহার বাঁধন কেটে গেলে 'আসাদ'

মিলন তো আর থাকে না, তাই আকাঙ্ক্ষাটাই রইল।


(ভণিতায় কোথাও তিনি 'গালিব' কোথাও বা 'আসাদ' ব্যবহার করেছেন)


৫.

(সাতাঈশগর হ্যা যাহিদ)


আল্লার ভক্ত যে-স্বর্গের বাগিচার গুণগানে চুর হয়ে আছে,

অমন ফুলের তোড়া আমাদের বেখুদের ভুলে যাওয়া তাকে পড়ে আছে।


ফুরসত দেয় যদি সামান্য এ-জগত তবে আমি দেখাব জরুর,

হৃদয়ের দাগগুলি ঝাড়বাতি-প্রদীপের একেকটি বীজ হয়ে আছে।


তোমার রূপের বিভা এ আরশিনগরের কী হালত করে গেছে দেখো,

প্রতিদিন বাগানের শিশিরের ভুবনের রৌদ্র যে-হাল করে গেছে।


সৃষ্টিরই খাঁজে খাঁজে লুকায়িত আছে জেনো ধ্বংসের সমূহ কারণ,

ফসলবিনাশী বাজে যে তত্ত্ব আছে তা কৃষাণের ক্রোধেও তো আছে।


লাখে লাখ বাসনা সে নিহত লুকানো আছে এ নীরবতার অন্তরে,

অস্তি আমার যেন পথিকের কবরের নিভু নিভু দীপ হয়ে আছে।


এখন কেবল সেই প্রেমাষ্পদের স্মৃতি আর তার ছবিটি সহায়

বিধুর হৃদয় যেন ইসুফের কারাগারে কুঠুরি নিজন হয়ে আছে।


আমি তো দেখছি শুধু 'ফানা'র পথটি আছে দৃষ্টিতে আমার 'গালিব'

এ সেই সূত্র যাতে অস্তির কণাগুলি মালার মতন গাঁথা আছে।

Saturday, September 2, 2023

চাহনি | পর্ব ৬ | মন্দার মুখোপাধ্যায়


চোখে চোখ

চেনা মানুষকে ভিড়ের মধ্যে খুঁজে পাওয়া এমন কিছু আহামরি কি! বিশেষত তাঁর সঙ্গে যদি প্রতিনিয়ত দেখা সাক্ষাৎ হয়; কারণ নিয়মিত কথা বলা ও সহাবস্থানের একটা নিজস্ব মেমরি বক্স থাকেই। যোগাযোগে থাকা মানুষ, ভিড়ের মধ্যেও তাই চট করে চোখে পড়ে যায়; মুখ না দেখেও, পিঠ ফিরিয়ে থাকা তার দেহ রেখাতেও চিনতে তাই ভুল হয় না। কিন্তু যে মানুষটির সঙ্গে সামনাসামনি কথা হয়েছে একবার বা বড় জোর দুবার, তাও প্রায় বছর দশেক আগে এবং তা আরও অনেকের মধ্যে, সেখানে নিকট বোধ গড়ে ওঠা বিস্ময়কর বৈকি। তা ছাড়াও মানুষটি এতোই বিশিষ্ট এবং আকাঙ্ক্ষিত যে, ওরকম গুচ্ছগুচ্ছ গুণগ্রাহী এবং রূপমুগ্ধদের সঙ্গে তাঁর প্রতিদিনই আলাপ পরিচয় হয়; ফলে আমাকে চেনা এবং মনে রাখা একেবারেই অসম্ভব; তা ছাড়াও তাঁর কোনও বৃত্ত মানে, কাজ বা পরিচিত গণ্ডি, কোথাওই আমি পড়ি না। ফলে আমার সেই চমকে ওঠার বিস্ময় ও বুক ধুক পুক আনন্দ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবেই আজও মন জুড়ে রাজত্ব করছে।

একটি স্মরণ সভার আমন্ত্রণ পেয়ে, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় দেখি তাঁর নাম; লকডাউনের সময় ফেসবুক সক্রিয়তায় তাঁর সঙ্গে এক নিবিড় যোগাযোগ ঘটে। কবে বা কেন যে আমিও তার ‘ফ্রেন্ডস ওনলি’ বন্ধু গ্রুপে ধরা আছি, তা খেয়াল করিনি তেমন; কিন্তু লকডাউনে প্রতিদিন নিয়ম করে কবিতা পাঠ শুরু করলেন তিনি; একই সঙ্গে বাংলা কবিতা এবং তার ইংরেজি তর্জমা; আবার কখনও ইংরেজি তর্জমা সমেত অন্য ভাষার কবিতাও; তাঁর সেই জ্ঞান, প্রস্তুতি, নিষ্ঠা অনেকের সঙ্গে মুগ্ধ করেছে আমাকেও। লকডাউন শেষে সে সব পর্ব মিলিয়ে গেলেও, প্রায় বছর খানেক ধরে, ফেসবুকে প্রতিদিন দেখা হওয়ায় কেমন এক নিকট সান্নিধ্য গড়ে উঠেছিল; মনে হয়েছিল আলাপ পরিচয়ের মধ্যে কোনও দূরত্ব বা চ্ছেদ নেই যেন; দেখা হলেই কথা হবে, যেন বা এতটাই চেনা; কিন্তু সে তো আমার মনের ভাব; তাঁর মতো প্রথিতযশা মানুষটিরও যে এমনই মনে হবে, তা ভাবা বাতুলতা বৈকি! কিন্তু সেদিন তো তাইই ঘটল!

পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ, এবং প্রায়ান্ধকার; তাঁর আসবার অপেক্ষায় আমারা সকলে, কারণ তিনিই তো উদ্বোধক; সময়ের মিনিট তিনেক দেরিতে ঢুকতেই প্রবেশ দ্বারের আলো এসে পড়ল সামনের কয়েকটি সারিতে; আর হতবাক করে দিয়ে, তাঁর চশমা ঢাকা চোখেও উচ্ছ্বাস জাগিয়ে হাত নাড়লেন তিনি, দ্বিতীয় সারিতে বসা আমার দিকে সহজ তাকিয়ে! আমার দুপাশে বসা অতিথিরা আমাকে নজর করার আগেই লজ্জায় বা আনন্দে মাথা নামিয়ে নিলাম; ওই হাত নাড়া যেন আমার দিকে নয়; পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে তাঁর চেনা মানুষের কী অভাব ঘটেছে! এটা বিশ্বাস করতে আমারও বেশ আরাম লাগল; কিন্তু মঞ্চে উঠে, নিজের চেয়ারে বসে এবার তিনি আরও ভাল করে মিলিয়ে নিলেন আমাকে; কোনও এক সময় ফেসবুকেই জানতে চেয়েছিলেন, আমার লেখা একটি বই সম্পর্কে; মানে কী ভাবে কোথায় পাওয়া যেতে পারে ইত্যাদি; ফলে, মনে ক্ষীণ আশা নিয়ে ওই বইটি আমি সঙ্গে নিয়েই গিয়েছিলাম এই ভেবে যে, নিজে না পারলেও, কারও হাত দিয়ে ওইদিন ওঁর হাতে ঠিকই পৌঁছে দিতে পারব। অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব সেরে, তিনি আবার যখন মঞ্চে এসে বসলেন, একজনকে অনুরোধ করামাত্র তিনি বইটি তাঁর হাতে দিয়ে এলেন। দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠানের আগে চা পানের বিরতি হয়ে, আলো নিভলেই, চুপি সাড়ে বেরিয়ে এলাম, প্রেক্ষাগৃহ থেকে; পরদিন সকালে মোবাইল অন করতেই দেখি, ফেসবুকেই আমাকে লিখেছেন, ‘বই পেলাম, কিন্তু মঞ্চ থেকে নেমে প্রেক্ষাগৃহে ফিরে এসে, পরে আর তোমাকে দেখলাম না; তোমার সিটটা ফাঁকা…।’

তাঁর সেদিনের সেই চাহনি একথাই বুঝিয়ে দিল, আলো বা অন্ধকার যাই থাক না কেন– প্রাণে সাড়া জাগলে, সে তোমাকে ঠিক খুঁজে নেবে; আর বুঝিয়েও দেবে যে – এই তো, ঠিক দেখতে পেয়েছি! চাহনির এই সম্মোহনে শুধু চোখ নয়, দৃষ্টি নয় মনও কাজ করে; কাজ করে অন্তরঙ্গ যাপনের এক নিবিড় মাধুর্য; হয়তো সামান্য কিছু শূন্যতা বোধও। আর এই জন্যেই তা ভোলা যায় না; চিরকালের সম্পদ হয়ে রয়ে যায় মনের গভীরে।


আগের পর্ব

চাহনি | পর্ব ৫ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

Saturday, June 17, 2023

কবীর চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা

প্রশ্ন


হাতের উপর হাত রেখেছি, ঠোঁটের ফাঁকে বিষ, 

এইটুকুতেই প্রেমের কথা শেষ হলে কি চলে?

মন মেজাজের আবেশটুকু

তৃষ্ণা হয়ে ভিজতে ভিজতে 

শরীরজুড়ে নামলো এসে এক আষাঢ়ের জলে।

হাতের উপর হাতটি রাখা, আঙুলরা একজোট, 

এমন সময়ে শরীর কি তোর ছুটির কথা বলে?


ভাবিস না আর তার কথাটি, দেখবি ও সব খালি

মন-ভুলোনো ঘর-ফুরোনো প্রেম পিরিতির ধুলো, 

প্রতীক্ষাতেই থাকবি যদি

একলা বসে নিরবধি, 

কার দুয়ারে আস্তে আস্তে জমবে স্মৃতিগুলো?

হাতের উপর হাত রেখে দেখ, চোখের নীচে কালি, 

এই আকালে ঠোঁটদুটি তোর কার অন্ধকার ছুঁলো?


হাতের উপর হাত রেখেছি, ঠোঁটের ফাঁকে ঝড়,

দুটি জিভের এক সহবাস, স্বাদ কি পড়ে মনে?

আষাঢ় গেছে, শ্রাবণ গেছে

নিরুদ্দেশের অন্বেষণে,

এক ফালি মেঘ একরোখা তাও ফুঁসছে ঈশান কোণে।

হাতের উপর হাতের বসত, অনির্বাণ অধর, 

এমন সময়ে অপেক্ষাতে শরীর কি দিন গোনে?


নেটিভিটি


আজ ভোরের ট্রেনে ডেলি প্যাসেঞ্জারেরা

আর পাশের বাড়ি থেকে বৃদ্ধ কিশোরবাবু

এসেছেন

নবজাতক শিশুটিকে দেখতে। 


এখনও কথা ফোটেনি আধো-আধো বুলিতে, 

দীঘির মত স্বচ্ছ চোখে সে অবাক হয়ে দেখছে দুনিয়াটা।

ভাষা নেই, স্মৃতি নেই, শ্লেষ নেই, 

তবু তাকে দেখবে বলেই এসেছে 

ফড়িং আর মৌমাছি,

রুই কাতলা তেলাপিয়া আর

পাড়ার সবচেয়ে ডাকসাইটে হুলো বেড়ালটা। 


রাষ্ট্রপতি কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন,

তাঁর হেলিকপ্টার নামবে সামনের মাঠে

তাড়াহুড়ো করে বানানো জোড়াতালি হেলিপ্যাডে।

শতদল ক্লাবের চেয়ারম্যান দেবাশিসবাবু

আর বাবাই বলে যে ছেলেটা 

পাড়ায় সব্বার টিভি সারায়,

সবাই এসেছে নবজাতককে দেখতে। 


রিকশা থেকে হন্তদন্ত হয়ে নেমেছেন জ্যোতিষার্ণব, 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক সাহেব অবশ্য

ট্রামেই এসেছেন, 

বেসামাল ধুলোবালি উড়িয়ে এসেছে হেমন্তের হাওয়া,

আর আকাশে টিকিট না কেটেই ঢুকে পড়েছে

অকালের মেঘ।


হালকা বৃষ্টি এসেছে সকাল থেকেই, 

তার সঙ্গে মিষ্টির দোকানের মালিক অমিতদাও 

দুই মেয়ে আর স্কুলের বন্ধু রনিকে নিয়ে এসেছেন

নবজাতককে দেখবেন বলে।


এ নবজাতকের কথা লেখা আছে 

আদিম কবিতার খাতায়। 

পৃথিবীর কোনো এক অনির্দিষ্ট যুগে

সমুদ্রের গর্ভ থেকে উঠে আসবে এই শিশু, 

আকাশের বুক চিরে ছুটে যাবে আশ্চর্য উল্কা, 

আর পূবের দিগন্ত থেকে উপহার নিয়ে আসবে

তিনজন বেরসিক বুড়ো। 


আর ঠিক তখনই এই নবজাতক

দেয়ালা করতে করতে

রচনা করবে এক নতুন পৃথিবী।

তার এক পা থাকবে মহাকাশে, 

অন্য পা থাকবে আগ্নেয়গিরির অতলে,

আর সে দু’ হাত বাড়িয়ে খেলতে খেলতে

হয় পৃথিবীতে গড়ে তুলবে অতুলনীয় এক স্বর্গরাজ্য, 

নয় সবকিছু ধ্বংস করে

আবার নতুন করে ঘুঁটি সাজাতে বসবে। 


দাড়ির গল্প


পঞ্জিকাতে লগ্ন দেখে সেলুন দিলাম পাড়ি, 

বাড়ি এবং হাঁড়ির পরেই সবসে প্যায়ারা দাড়ি!

দাড়ি ব্রহ্মা, দাড়ি বিষ্ণু, দাড়ি মহেশ্বর, 

আল্লাতালা, গড, যীশু সব দাড়ির মাতব্বর। 


সেই দাড়িটিই কাটতে হবে, পাষাণ সমাজ বলে;

আধকামানো গাল নিয়ে কি আপিস যাওয়া চলে?

ক্ষুরটি হাতে যতই কাছে আসেন পরামানিক, 

বিষণ্ণতায় দাড়ির কথাই ভাবছি বসে খানিক। 


কারোর দাড়ি লম্বামাফিক, কারোর দাড়ি খাটো, 

কারোর দাড়ি ছাগল-সমান, থুতনি আঁটোসাঁটো।

এক একজনের দাড়ির ডগা পিছনপানে মোড়া, 

কারোর দাড়ি গোঁফের সঙ্গে এক্কেবারে জোড়া। 


হরেক রকম দাড়ির বাহার দেখতে যাবো কোথা? 

এই জগতের যতেক মহান মানুষ দাড়ির হোতা। 

মার্ক্স, ফ্রয়েড, শোপেনহাউয়ার, লেনিন এবং র্যালে, 

মাথায় যাঁদের বুদ্ধি, তাঁদের দাড়িও থাকে গালে।


আমার দাড়ি কামায় যে’জন, সে’জন সুজন বটে, 

থুতনি জুড়ে রাখছি দাড়ি, মগজ থাকুক ঘটে। 

টাকা কামাই সাধ্য কোথায়? দাড়িই কামাই ব্লেডে।

কমুক টাকা, বাড়ুক দাড়ি, দাড়িরই পে-গ্রেডে। 


ঢিল মারো


মৌমাছির চাকে ঢিল মারো,

ইচ্ছে করেই। 


বহু দিন, বহু যুগ, বহু মুহূর্ত ধরে

ভন ভন ভন ভন শব্দে 

বড় ব্যস্ত হয়ে পড়েছো ভায়া।

দিনের বেলা সমস্যা না হলে'ও,

রাত বিরেতে খাওয়ার পালা শেষ করে

শুতে গেলে

অন্ধকার নিঝুম নিস্তব্ধ রাত্তিরে

ঐ একটানা একঘেয়ে ভন ভন শব্দটা

তোমার বিরক্তিকর লাগে না?


হাতের কাছেই পাটকেল আছে, 

পাঁচটি মধ্যবিত্ত কলমপেষা আঙ্গুলে 

জীবনে প্রথমবার

কোনো কিছুকে শক্ত করে চেপে ধরো,

এক চোখ বন্ধ করে নিশানায় টিপ করে নাও, 

অর্জুনের সেই পাখির চোখের মত।

তারপর বেশী না ভেবে, 

ইচ্ছেটা কেটে পড়বার আগেই

ধাঁই করে ঢিলখানা ছুঁড়ে মারো 

চাকের গায়ে, 

যেখানে হাজার হাজার মৌমাছি, 

না কি ভীমরুল, না কি বোলতা, 

ভন ভন শব্দে যে যার নিজের বাচালতাটুকু, 

নিজের অন্ধ বিশ্বাসটুকু ক্রমাগত জাহির করে চলেছে, 

বিবাদ বিতর্কের তোয়াক্কা না করে। 


মতামতের চাকে ঢিল মারো, 

ইচ্ছে করেই। 

শত সহস্র হুলের খোঁচা সহ্য করো, 

সহ্য করো নির্বোধ গালিগালাজের বিষের জ্বালা,

সহ্য করো ধর্মের দংশন, 

সহ্য করো ভদ্রলোকের ক্লীব তিরষ্কার,

সহ্য করো শ্রেণীহিংসার যাতনা, 

সহ্য করো, সহ্য করো ভাই,

দাঁতে দাঁত চিপে, জিভ কামড়ে 

সব সহ্য করেই

মতামতের চাকে ঢিল মারো, 

দেখোই না,

মধু মেলে কি না মেলে।

Thursday, June 1, 2023

চাহনি | পর্ব ৫ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

‘সাদা নেগেটিভ’

যখন একটা কিছু বলার আগেই, শুরু হয়ে যায় গড়াগড়ি পেড়ে হাসি, তখনই বোঝা যায় যে আলোচনার বিষয়টা কী। গল্পের আভাসে জনা দুই হাসে, আর বাকিরা অবাক হয়ে দেখে। গল্পটা আর বলাই হয় না। বাড়ি, বা ইস্কুল বন্ধু, বা পাড়ার বন্ধুদের আড্ডা মানেই তাই। একসঙ্গে ঠাসাঠাসি করে বড় হওয়া মানেই, সময়ের সিন্দুকে জমে থাকা হাসির রসদ। আমাদের দু-বোনের চাল চলনে মিলের থেকে অমিলটাই বেশি। কিন্তু এই এক ব্যাপারে দুজনেই সেই “ঘাড় কেন কাত?/ আরে, আমরা যে এক জাত!” এখানেই অব্যর্থ দুজনের সেই দুষ্টুমি ভরা চাহনি, যা আজ এই বাষট্টি এবং পঁয়ষট্টি পার করেও একেবারে এক এবং অবিকল। 

এ বয়সে তো বেশিরভাগ জমায়েত মানেই শ্রাদ্ধ বা স্মরণ সভা; আর না হয়তো  বা দিন পনের, কী মাস খানেক কাটিয়ে ছেলে মেয়েরা বিদেশে ফিরে যাবার আগে, একবার গণ দেখা করে নেওয়া। ফলে মন খারাপের ভাগটাই উপচে থাকে। সেখানেও দেখলাম প্রৌঢ়ত্ব পার করে বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছেও দু-বোনের সেই ফক্কড়িও হেসে কুটিপাটি হওয়ায় কোনও ব্যতিক্রম হল না। কেউ হয়তো গমগমে গলায় গান ধরে, গেয়েই চলেছে; থামার নামটি নেই, বোন ওমনি আমার দিকে স্থির তাকিয়ে, টুক করে ভ্রূ নাচিয়ে দেবে, আর আমিও কুল কুল করে হাসতে শুরু করব। এই যে মস্করা চাহনি এর যেন শেষ নেই। সেটা যে কোন চরমে যেতে পারে তা সেদিন বুঝলাম। মাস দুয়েক আগে আমার একটা সার্জারি হয়েছে, আর বোন ছাড়া পেয়েছে সদ্য। আমার হাঁটু এবং ওর পেট সব নড়ে চড়ে গেছে; কাছের মানুষদের আতুপুতু এবং তয় তপ্পনের শেষ নেই। তার মধ্যে শুরু হল চমকদার ঈশারা এবং গড়াগড়ি পেড়ে হাসি। ভারি বয়স, ভারি শরীর সঙ্গে নানা রকমের মনভার; কোথায় কী! হেসেই চলেছি। আমাদের ছেলে মেয়েদুটোরও এ সব প্রসঙ্গ শুনে শুনে প্রায় মুখস্থ; ওদের তেমন হাসিও তাই পায় না। কিন্তু আমরা দুর্নিবার গতিতে এমন হাসছি, যেন কেউ কাতুকুতু দিয়েই চলেছে। 

আর এও তো আশ্চর্য যে, সেই এক ঘনত্বের হাসি এবং একইরকম ইশারা। সেদিন খুবই গুরুগম্ভীর এক স্মরণ সভায় দুজনে গিয়েছি। পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ। সকলেরই মন ভার এবং বিশিষ্ট সঙ্গে সকলেই মার্জিত আচরণে বদ্ধপরিকর। তো একজন দেরিতে ঢোকায়, দরজা খুলতেই তাঁকে দেখা গেল, পূর্ণ আলোয়। আপাদমস্তক সাদা পোশাক এবং কলপহীন সাদায় মুখ মুন্ডল ঘেরায় তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে, পরচুল মাথায় বিশেষ কোনও নাটকের চরিত্র যেন। ছায়াছন্ন অন্ধকারেও, পাশে বসে থাকা বোনের ঈশারাটি যেন কান দিয়েই দেখতে পালাম। দেখতে পেলাম, মুখে আঁচল চাপা দিয়ে তার হাসি চাপার চেষ্টা। সেই সংক্রমণে আমিও তখন ফুলে, ফেঁপে, দুলে একশা। ওই মানুষটিকে দেখে যত না হাসি পেয়েছিল, তার থেকে ঢের গুণ হাসি এল বোনের চোখ আর ভ্রূর ইশারায়; পাশাপাশি বসায়; কনুইয়ের গুঁতোগুঁতিতে। আমার কপট শাসন ওকে যেন আরও হাসাচ্ছে। এই যে দুজনের চাহনির ক্রশ কানেকশন– আসলে আমার কপট  শাসন যেন ওর অন্তহীন মস্করার প্রশ্রয়, এর কোনও ব্যখ্যা আছে! গপ্পোও কিছু নেই। গত পঞ্চাশ বছর ধরে দেখা মানুষটা আজ যখন হাসি উস্কে দিলেন, তখন  তাঁর সম্পর্কে যে ধারণা তাতে হাসি, তাঁকে আগেও যতবার দেখেছি তাতে হাসি; তাঁর এতদিনকার চলন, বলন, সাজ, গড়ন সব মুছে গিয়ে, ততক্ষনাৎ ফিস্ফিসিয়ে তাঁর  নতুন নামকরণ  হল– ‘এতো পুরো উল্টো নেগেটিভ রে– কালোর বদলে সবটাই সাদা’।

বুড়ো বয়সে অনেক কিছুর মতোই আর যা যা চেপে রাখা যায় না– তা হল চাহনি এবং কুলকুল করে বন্যার মতো হাসি।




আগের পর্ব

চাহনি | পর্ব ৪ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

Saturday, May 20, 2023

চাহনি | পর্ব ৪ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

উৎসার

শুধু যে শান্তিনিকেতন তাই নয়, কয়েক প্রজন্ম জুড়ে কোনও না কোনও ভাবে এঁরা সকলেই, বিশ্বভারতীতেই পড়াশোনা করেছেন বা চাকরি করেছেন। তাতেও অবশ্য সবাইকে যে খুব মনে ধরে তা নয়। কিন্তু এই পরিবারটি বড় অদ্ভুত রকমের স্বাধীন, আবার একই সঙ্গে, সর্বত ভাবেই রবীন্দ্রনাথেই স্থিত; কিন্তু সে তাঁদের নিজস্ব অভিধান ও নিয়মে; ফলে এ বাড়ির দুই বোনের সঙ্গে আলাপ হয়ে খুব তাড়াতাড়িই নিকট হয়ে গেলাম। ষাটের দশকে দেখা শান্তিনিকেতন যেন ফিরে এল নব্বইয়ের সীমানায়। ইতিমধ্যে বসন্ত উৎসবে এসে, অনুষ্ঠানের পর দুম করে আলাপ হল, এ বাড়ির বড় ছেলে, মানে ওই দুই বোনের দাদার সঙ্গে। মস্ত এক জোড়া গোঁফের সঙ্গে মানান সই পরিশিলীত ইংরেজি, হিন্দি এবং বাংলা উচ্চারণ ও শব্দ চয়ন। দোহারা দীর্ঘ চেহারায় যে নিপুণতায় ধুতি পাঞ্জাবি, সেই একই রকম অনায়াস স্বাচ্ছন্দে শর্ট স্লিভ ট্রাউজার, ফেডেড জিন্স এবং ঝকঝকে পালিশের বুট। স্মার্টনেসটা এতোটাই আটপৌরে! বেশি কথা বলেন না। তীক্ষ্ণ চোখে একভাবে চেয়ে থাকেন। আমার থেকে প্রায় পনের বছরের বড়, কিন্তু দৃষ্টিপাতে না কোনও কপট স্নেহ, না সঙ্কোচ। অথচ মানুষটি জড়সড়ো; কুন্ঠিত। স্ত্রী ধমক দিলেই শুধু মাথা নয়, গলা শুদ্ধু নিজের  মাথাখানি  নিজের বুকের কাছে ঝুলিয়ে, অপরাধী বালকের মতো বকুনি খান। সেই উজ্জ্বল হাসি মুহূর্তে বদলে যায় বিষাদে। তাঁর স্ত্রীও বিশ্বভারতী থেকেই পাশ দেওয়া এবং সুকন্ঠি। স্ত্রীর পছন্দেরই একের পর এক গান শোনাচ্ছেন দুজনে; কিন্তু আমার কানে কী যেন কম বাজছে। আগের সন্ধেতে যখন উনি একা কিছু গান শুনিয়েছিলেন, সেই গলার বলিষ্ঠ মাদকতা, যেন ওই দুজনে গাওয়া গানে নেই। আমি তো গান গাইতে জানি না, ফলে কারণটা ধরতে পারলাম না। কিন্তু মানুষটির অপরাধী ভঙ্গি আমার মনে কেন জানিনা গাঁথা হয়ে গেল। আসলে সংশয়ের একটা কাঁটা যেন বিঁধে রইল কোথাও; কোথায় বেমানান ইনি?

কলকাতায় ফিরে হঠাৎই একদিন দেখি, আমার সামনে থেমে যাওয়া গাড়ির কাচ নামিয়ে, উনি আমাকে জলদি উঠে পড়তে বলছেন। ওঁর পাশের সিটে চড়ে বসতেই, সিগন্যাল ছেড়ে দিল। আর রাসবিহারী ক্রশিং, যেখানে আমার নেমে যাওয়ার কথা, সেখানে পৌঁছনোর আগেই শুরু হয়ে গেল ঝম ঝম বৃষ্টি। কোনও অনুরোধ ছাড়াই দুম করে শুরু করে দিলেন, ‘রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা...’। আমার হাতে ভাগ্যিস স্টিয়ারিং নেই; কী যে থানা পুলিশ হয়ে যেত কে জানে! মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন গেল নেমে যাওয়ার চেনা পথ। 

নেশাগ্রস্তের মতো চোখ খুলে পাশে তাকিয়ে দেখি, তার সপ্তকে গান ধরে, প্রবল আনন্দে মুগ্ধ তাকিয়ে আছেন সামনের দিকে; চোখের ওপর যেন আর কালো পিচ রাস্তা ও কংক্রিট জঙ্গলে ঘেরা শহর কলকাতা নয়; শান্তিনিকেতনের মাঠঘাট, গাছপালা আর রাঙামাটির পথ; বৃষ্টি আর তুফান দেখছেন। দেখছেন গানের সেই অবাধ মুক্তি, সঙ্গতে যখন নিজের গলায় মন্দ্র সপ্তকে বাজ আর বিদ্যুৎ। তাঁর ওই চেয়ে থাকায় দেখেছিলাম, গান; দেখেছিলাম মুক্তি। বুঝেছিলাম যে এই তাঁর নিজের স্কেল, দ্বৈত গানে যা সমঝোতা করে বামন হয়ে যায়। আজ তা নিজের গহন থেকে উৎসারিত এবং অবাধ।

তাঁর ওই দৃষ্টিতে তাই বৃষ্টির অবিশ্রাম ঝরে পড়া আর তীব্র আনন্দ। এক আকাশ থেকে আর আকাশে ছুটে বেড়ানো; এবং আমার সংশয়ের অবসানে অসামান্য উপহার ওই মুক্ত কন্ঠের গান।

দেখলাম, শূন্যে দৃষ্টি বিছিয়েও মানুষ কেমন উৎসারিত হয়ে আসে তার স্বমহিমায়।

ওই দৃষ্টির অর্থ কি তবে, 

‘যায় নিয়ে যায়, আমায় নিয়ে যায় আপন গানের টানে…ঘর ছাড়া কোন পথের পানে’।



আগের পর্ব

চাহনি | পর্ব ৩ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

Saturday, April 22, 2023

চাহনি | পর্ব ৩ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

 

সতর্ক

সাদার্ন আভেন্যুয়ের প্রায় পুরোটা জুড়েই রেলিং ঘেরা লেক। বিকেল পাঁচটা; এখনও তবু গণগণে রোদ্দুর; সঙ্গে দুর্জয় গরম। চৈত্র শেষ হতে চলেছে যে! লায়ন সাফারি পার্কের গেট দিয়ে ঢুকলে, হাঁটার স্ট্রেচটা বেশ ফাঁকাই থাকে। হকারদের ঝামেলাও নেই। উপরন্তু, ব্যাটারি চালিত একটা সাদা বেঁটে চারচাকায় পুলিশের ধীর টহলদারি। এরই মধ্যে, বড় গেট পেরিয়ে ঢুকেই যে রেলিং ঘেরি, সেটা বেশ নিরিবিলি। সিমেন্ট বাঁধানো উঁচু উঁচু বসার জায়গা; কোনওটা সোজা বেঞ্চি;  কোনওটা আবার অর্ধেক গোল। নিচেটা যদিও ঝাঁট দেওয়া সাফ সুতরো, তা হলেও বেঞ্চিগুলোয় পাখিদের সাদা এবং ধুসর হাগুর টাটকা বা বাসি ছোপ থাকবেই। যারা নিয়মিত আসে, তারা বেশ খবরের কাগজ বা টুকরো পিচবোর্ড নিয়েই আসে। অনেকে গামছা পেতে সটান লম্বা হয়ে, নাক ডাকিয়ে, বেঞ্চি জুড়ে ঘুমোয়। ভাল পোশাকের ডেলিভারি বয়রা হাত পা ছড়িয়ে টিফিন খায়; বাকিরা আসে জোড়ায় জোড়ায়, আদরে জুড়তে। হন্টন বিলাসীরাও এদিকে আসে না; আসেনা টহলদার পুলিশ; এ বেশ মাধবীকুঞ্জের মনোরম আবেশ। তবে, আমার মতো ঠায় বসে কোকিলের ডাক শুনতে, বা গাছের ওপর ধীরে ধীরে আলোর বদল দেখতে, কিম্বা পাখিদের স্নান দেখে মজা পেতে-- আর কেউ আসে বলে মনে হয় না। সকলেই আসে কিছু কিছু না কিছু কাজ সারতে; ঘুম, খাওয়া বা আদরের উদ্দেশে। এমন কি পাখিরাও তাই, কাজে আসে। আমিই বোধহয় একমাত্র সেই হঠকারি আলসে, যে শুধু বসতে আসে দু দণ্ড।

প্রথমদিকে, গাছের নিচে যুগলদের অবস্থান দেখে একটু অস্বস্তি যে হতো না তা নয়। পরে মনে হতো, একাই বসে আছি; কারণ সকলেরই তো সেই একই পোষ মানা আচরণ আর নিঃশব্দে টুক করে বেঞ্চি খালি করে চলে যাওয়া। আর এও আশ্চর্য যে আমার পছন্দের বেঞ্চিটা সব সময় খালি পাই, কারণ সেটি খুবই প্রকাশ্য। আজ ঢুকেই দেখি দুধ সাদা জলের ফোয়ারা ছুটছে; সঙ্গে ওয়াটার লাইটের বাহারি জ্বলা নেভা। ফলে পাখিরা সব পালিয়েছে, এমনকি কাকও। সেই আওয়াজে বাতাস বা পাতার শব্দও আর শোনা যাচ্ছে না। আর আমার বসার জায়গায় একজন পুরুষ জমকালো লুঙ্গি ও কালো গেঞ্জি পরে, নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে; রাস্তার বাঁদিকে খালি না পেয়ে ডান দিকে বসে দেখি, মাথার ওপর পাতার ছায়া আর ফাঁক ফোকর গলে, চড়া রোদের ‘পিঙ্ক ফ্লয়েড’ ঝিলিমিল। ফোয়ারার শোভায় পাখিদের হারিয়ে, এদিক ওদিক তাকাতেই ডানদিকে অল্প দূরেই দেখি, মিষ্টি মিষ্টি চেহারার মেয়েটি নিশিন্তে নিজেকে সঁপে দিয়েছে একজন তুলনায় বয়স্ক ছেলের হাতে। ছেলেটি একেবারেই প্রেমিকোচিত নয়। মনে হচ্ছে বাজারের থলেটা পাশে নামিয়ে রেখে, মেয়েটাকে আদর নামক প্রবোধ দিয়ে, আবার বাজার করে বাড়ি ফিরে বউকে বলবে, ‘তোমার হাতের সেই লেবু চা’! মেয়েটাকে দেখে কী যে ভাল লাগছিল; কী সরল, আর কী নির্ভরতা! অনভিজ্ঞতার আরাম আর আনন্দ ওর সবটুকু জুড়ে। বেশ কিছুক্ষণ পরে আবার ওদিকে চোখ বোলাতেই দেখি, মেয়েটিকে বেঞ্চিতে বসিয়ে, দুষ্টু কাকু গোছের ছেলেটি এবার উঠে দাঁড়াল, মুখোমুখি। লগ্ন মেয়েটি তাতেও মুখ গুঁজে, নিশিন্তে তাকে জড়িয়ে; আর ছেলেটি যেন স্নেহের স্পর্শ বোলাতেই এসেছে, অভিভাবক সুলভ এমন ভঙ্গিতে, মেয়েটির মাথা থেকে কাঁধ বেয়ে হাত নামাতে নামাতে, বাহুর নিচে স্পর্শ করেই, সন্তর্পণে আমার দিকে ঘুরে দেখতে লাগল। আমিও  স্থির দৃষ্টিতে দেখলাম যে, নিজের নাকে সে কখন যেন চশমা এঁটে নিয়েছে; মেয়েটার কোনও আড়ষ্টতা নেই; অথচ লোকটা (ছেলে নয় তো!) বাহু বন্ধনে মেয়েটিকে ধরে রেখেও, অপরাধীর চোখে আমাকেও দেখছে। ভাগ্যিস চোখ সরাইনি; না হলে তো দেখতেই পেতাম না, প্যান্টের বাঁ পকেট থেকে মোবাইল বের করে, সঙ্গোপনে তার সময় দেখা; হায় রে! উঠে দাঁড়ানো, নাকে চশমা আঁটা এবং মোবাইলে সময় দেখা-– এসবই হল মেয়েটিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ছেড়ে যাবার ছল। ধূর্তের অভিজ্ঞ প্রস্তুতি!

কোথায় ভাবছি ,

প্রহর শেষে আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস…

তা না, অতি লোলুপের, আরও এক কাঠি ওপরে গিয়ে, অতি সতর্ক চাহনি!



আগের পর্ব

চাহনি | পর্ব ২ | দোলনচাঁপা | মন্দার মুখোপাধ্যায়

Tuesday, April 4, 2023

চাহনি | পর্ব ২ | দোলনচাঁপা | মন্দার মুখোপাধ্যায়

বছর আঠারো বয়েস। ইস্কুলের শেষ ক্লাস। পুজোর ছুটিতে মায়ের সঙ্গে এবার মধুপুর। বাবার বন্ধু সুরম্য জেঠুর বাড়ি। জেঠু জেঠিমা ছাড়াও বাড়ি ভর্তি লোক। সাত ভাইবোন সমেত, বড় দাদার এক বউ এবং দুটি ছানা। বাবা চলে যাবার পর, বহু মাস পরে, মাকে আবার হাসতে দেখল মিলি। সকাল সন্ধে জমিয়ে আড্ডা, গান, কবিতা আর দফায় দফায় চা। তিনখানি ঘরের একটা আটপৌরে, একতলা বাড়ি। রান্নাঘর লাগোয়া উঠোনের ওপারে, পাঁচিলের গায়ের নিচে যেটুকু মাটি, সেখানেই সাদা রঙের রাশি রাশি দোলন চাঁপা ফুটে আছে। নরম পাপড়ির মাঝখানে যেন লুকোনো সুগন্ধির ঝাঁপি। ভেতর উঠোন তাই সৌরভে ম ম করে। কুঁড়িগুলো সরু সরু লম্বা। এই ফুল ও সুগন্ধ মিলির কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। জেঠু বললেন, এর নাম দোলনচাঁপা।

ষষ্ঠীর সকাল। মায়ের কেনা সেই ফলসা রঙা তাঁতের ডুরে শাড়িটা পরে, কী মনে হল, একগুচ্ছ দোলনচাঁপা তুলে, নিজের একবেণীর বাঁ পাশে, যত্ন করে, ক্লিপ দিয়ে লাগাল মিলি। বাকি সকলে, এখনও এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ঘরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে এসে, বারান্দায় দাঁড়াল মিলি। এখান থেকে গেট অবধি জমি; অনেকখানি এমনিই পড়ে আছে। ঘাস ভর্তি প্রজাপতি আর শালিখের ওড়াউড়ি। থামের গায়ে হেলান দিয়ে মিলি দেখছে, ঘাসের ওপর তার লম্বাটে ছায়া। সেই ছায়ার কাছে আরও একটি ছায়ার আভাস দেখা যেতেই, মিলি চোখ তুলে তাকাল। ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে এলে, জুতোর শব্দ হয় না; তাই সে টের পাইনি।

মিলি দেখল, একজন আত্মবিশ্বাসী যুবক তাকে দেখছে, অপার মুগ্ধতায়। আনত চোখে মিলি হাত ছোঁয়াল তার বেণিতে লাগানো, সেই দোলনচাঁপা গুচ্ছে। তার মনে হল, এটাই যেন দৃষ্টি টানছে ওই যুবকের। স্মার্ট বললেও কম বলা হয়। বলিষ্ঠ শরীরে যেন বিদেশ বাসের ছাপ। পায়ে ভারি জুতো। চোখে চোখ রেখে সে জানতে চাইল, ‘তুমি কে’? মিলি বলল, ‘বেড়াতে এসেছি; এটা আমার জেঠুর বাড়ি’। দু-পায়ে সবল দাঁড়িয়ে মিলিকে সে শুধু দেখছে তো দেখেছই। সেই সম্মোহনে মিলি স্থাণুবৎ। ভেতর থেকে কে যেন বেরিয়ে এসে, সহর্ষে ভেতরে ডেকে নিল তাকে। মিলি জানল যে, যুবকটি এ বাড়ির বউদির ভাই। আগের রাতেই অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরেছে। ওখানকার পড়া শেষ করে, এবার সে এখানে চাকরি করবে।

সন্ধেবেলা আবার সে এলো। সাদা পায়জামা পাঞ্জাবির ওপর, গলায় একটা প্রিন্টেড সিল্কের স্কার্ফ জড়িয়ে। মিলিকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যামেলিয়া লাগাওনি’? 

মিলি বলল, ‘দোলনচাঁপা’।

সদ্য বড় হয়ে ওঠা, সবে শাড়ি ধরা মিলি বুঝল যে, এ দেখাকেই বলে নিমেষ; বলে সম্মোহন। 

Saturday, March 4, 2023

দীপ্তি নাভালের কবিতা | অনুবাদ: দেবলীনা চক্রবর্তী

১৯৫৭ সালে পঞ্জাবের অমৃতসরে জন্মেছেন দীপ্তি নাভাল। পালামপুরে (হিমাচল) পড়াশোনা। পরে নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটি এবং ম্যানহাটনের কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জন। হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রতিভাবান অভিনেত্রী। বড়পর্দায় অনেক সফল চরিত্র উপহার দিয়েছেন। শ্যাম বেনেগালের ছবি 'জুনুন' দিয়ে বলিউডে পা রেখেছিলেন। এই যাত্রার আসল সূচনা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে 'এক বার ফির' ছবির মাধ্যমে। এই ছবির জন্য তিনি সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারও পান। তিনি একজন বহুমুখী ব্যক্তিত্ব। সংবেদনশীল কবি। তাঁর কবিতার বই 'লামহা-লামহা' খুবই জনপ্রিয়।

তিনি একজন প্রশংসনীয় অভিনেত্রীর পাশাপাশি একজন চিত্রকর এবং ফটোগ্রাফার। দীপ্তি নাভালের বাবা তাঁকে চিত্রশিল্পী বানাতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার মন চলে গিয়েছিল অভিনয় ও কবিতায়। যদিও, তিনি ছবি আঁকতেন এবং তাঁর শিল্পকলা প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি মাঝে মধ্যেই হিমাচল থেকে লাদাখের বিভিন্ন পাহাড় পর্বতে ট্রেকিং করতে ভালবাসেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজান। গানের প্রতিও রয়েছে তার গভীর অনুরাগ। মহিলা ও শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়ানোর উদ্দেশ্যে একটি চ্যারিটেবিল ট্রাস্ট গঠন করেছেন। 

গুলজার সাহেব দীপ্তি সম্বন্ধে বলেছেন 'দীপ্তি সেই পথ অনুসরণ করে যেখানে তাঁর সৌন্দর্য চেতনা তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং সে বাঁচে তাঁর আপন শর্তে। তাঁকে দেখে মনে হয় ভীষণ বাস্তবধর্মী, ভীষণ ব্যবহারিক কিন্তু সে একদমই তাঁর বিপরীত। তাঁর স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত হওয়ার লক্ষ্যে দৌড়চ্ছে আর তাঁর বাস্তব সেই স্বপ্নের পিছনে ধাওয়া করে চলেছে।'  

 

অজানা পথ 


অজানা পথে 

চলো আরও কিছুদূর হেঁটে যাই

কোন কথা না বলে 


নিজের নিজের নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গে নিয়ে

প্রশ্ন উত্তরের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে

রীতিনীতির কাঁটাতার পেরিয়ে

এসো আমরা পাশাপাশি চলি

কিছুই না বলে

হেঁটে যাই অনেকটা দূর


তুমি বিগত দিনের 

কোনও প্রসঙ্গ উত্থাপন করো না 

আমিও ভুলে যাওয়া 

কবিতার ছত্র না উচ্চারণ করে

কে তুমি

কে বা আমি 

এই সমস্ত কথা 

আর কিছুই না বলে ...


চলো আরও অনেকটা দূর 

অজানা পথে আমরা হেঁটে যাই 


একাকী রাত 


ঠান্ডা! একাকী রাত 

আর সে

হেঁটে যাচ্ছিল অনেকক্ষণ 

স্মৃতির চাদর গায়ে জড়িয়ে!


মিটি মিটি আলো 


কিছু মিটি মিটি আলো 

আর তুষার শৃঙ্গ থেকে গড়িয়ে আসা জোৎস্না 

সমস্ত চরাচরে যেন একটিই সুর প্রতিধ্বনিত


নীরবতার তো এমনি শব্দ 

হয় তাই না...

তুমিই তো বলেছিলে! 


এমনই প্রশান্তি যেন বাকি কোন কিছুই সত্যি নয়


এই রাত চুরি করেছি আমি 

আমার জীবন থেকে আমারই জন্য 


মসৃণ ঢালের ওপর  


মসৃণ ঢালে মেষপালকদের প্রাত্যহিক শোরগোল শেষ হয়েছে ইতিমধ্যে 

দিন যেন নিশ্চুপে পার হয়ে যাচ্ছে খুব পাশ ঘেঁষে

সাদা শিখরে দিগন্ত তার গোধূলি রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে

কোমল হাওয়ার গুনগুনানি ভেসে যাচ্ছে 

সমতলের মেঠো পথে আবার জলের ধারার মতো

সরু পথের আঁকা বাঁকা চলনে

খেলে বেড়ায় পড়ন্ত সূর্যের শেষ কিরণ এখনও পর্যন্ত

দেখে মনে হয় যেন গলানো কাঁচের চাদর বিছানো 


অনুরণিত হচ্ছে শোনো কোনও এক মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি 

আর সামনের ওই টিলা থেকে ভেসে আসছে গির্জার প্রার্থনা স্তব

আরো দূর থেকে কোন এক মসজিদের আজানের স্বর আন্দোলিত হচ্ছে 


এ এক সংযোগের সন্ধ্যা, আগে তো কখনও দেখিনি

হয়ত এমন এক সন্ধ্যার প্রতীক্ষাতেই ছিলাম 

স্থির হয়ে আছি চলতে চলতে 

প্রকৃতি ও ঈশ্বরের ঔদার্য এর আগে 

অবনত হই এই সান্ধ্যকালীন উপাসনার কাছে



আমি দেখেছি দিনকে রাত্রিতে বদলে যেতে  


আমি দেখেছি দূরে কোনও পর্বতের পায়ের কাছে

যখন সাঁঝ চুপিচুপি তার আস্তানা বানিয়ে নেয়

আর ভেড়ার দল তাড়িয়ে নিয়ে 

মেষপালকেরা সুরু কাঁচা পাকদন্ডি বেয়ে পাহাড়

থেকে নিচে নেমে যায়


আমি দেখেছি পাহাড়ের ঢালের ছায়া বাড়তে থাকে

তখন আরও নীচের ঘাঁটিতে 

সে এক একলা ছাতা ও চশমা

ছুঁয়ে নিতে চায় শেষবেলার সূর্যকে


হুঁ, দেখেছি এবং শুনেওছি

এই ঠান্ডা উপত্যকায় কখনও কোথাও 

প্রতিধ্বনিত হয় 

মোহন বাঁশির সুর ....


তখন 

এখানেই কোথাও কোনও না কোনও পাহাড়ের 

গায়ে হেলান দিয়ে থাকা দেবদারু গাছের নীচে

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি 

একটা আস্ত দিনকে দেখেছি রাত্রিতে বদলে যেতে। 


বেচারা মানুষগুলি 

 

সব মানুষ মাত্রই একই নজরে দেখে

নারী আর পুরুষের

সম্পর্ককে

কেননা তাদের যেন কোনও নাম দিতে পারে! 

ওই নামের ঘেরাটোপে আটকে থাকে

বেচারা মানুষগুলি! 


একটি কবিতা 


'এত গুমরে গুমরে থাকো..

সহজ কেন হও না তুমি!'

সহজ হতে গেলে কি জানো 

অনেকগুলি বছর পিছনে যেতে হবে

আর সেখান থেকেই শুরু করতে হবে

যেখানে কাঁধে ঝুলি নিয়ে

স্কুল যেতে শুরু করেছিলাম

এই মুহূর্ত মন বদল করে

যখন নতুন মন মেজাজ তৈরি করব 

আর তারপর যেদিন 

সহজ সরল হয়ে 

খিলখিলিয়ে

দমকে দমকে 

কোনো কথায় হেসে উঠব

তখন আমায় চিনতে পারবে তো?


আমার স্নায়ুর ভিতরে এক সুর আছে


আমার স্নায়ুর ভিতরে এক সুর আছে

এক মহাজাগতিক ছন্দ এখানে প্রবাহিত হচ্ছে


তুমিও শুনতে পাবে, যদি তুমি 

তোমার আঙুলের সুচাগ্র দিয়ে স্পর্শ করো 


তুমি কি তাকিয়েছ ওই তারাদের দিকে 

আর দেখেছো তাদের? দৃষ্টির বাহির হয়ে? 


এখানে যে শব্দ আছে, শুনতে পাও?

যখন স্পর্শ করো নুড়ি-- পাথর,

শুকনো পাতা বা বাতাস!


তুমি কি অনুভব করো এভাবেই

তোমার আত্মার আংশিক স্বচ্ছতাকে?


যখন তুমি হেঁটে যাও 

তখন ছুঁয়ে দেখো পৃথিবীকে?


সেভাবে জীবনকে ছুঁয়ে দেখো, যেভাবে বেচেঁ আছো


ছুঁয়েছ কি?

কখনও তুমি....

Friday, February 17, 2023

চাহনি | পর্ব ১ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

মুহূর্ত মানেই কি পলকে দেখা! চোখের পাতা পড়লেই অন্য সময়ে ঢুকে পড়া! গড়িয়ে যেতে যেতে আবার অপেক্ষা- আরও এক নতুন মুহূর্তের জন্য, যখন আবার পলক পড়বে না; স্থির হয়ে দেখিয়ে দেবে হৃদয় কী চায়! মূক  বা বাকরহিতও তো চোখে কথা বলে। স্বচ্ছ দীঘির মধ্যে কালো ছিপ-নৌকার মতো দুরন্ত ঘুরে বেড়ায় সেই  চোখের মণি; হঠাৎ স্থির হয়ে গেলেই তৈরি হয় এক  বিশেষ উচ্ছ্বাস। কিছুটা আচেনা; হয়তো অজানাও। মনও তখন আঁকড়ে ধরে সেই দৃষ্টিটুকুই। ধরে রাখতে চায় সেই গোপন সঙ্কেত, না হারানো বিশ্বাসের মতোই। রোজকার কথা, হাঁটাচলা, মানুষে মানুষে যাতায়াত, গাছে জল দেওয়া, খাবার বানানো, বার চারেক তা খাওয়া, নিয়ম করে স্নান-– সব ভুলে যাই ক্রমে। ঘুমিয়ে থাকা কিছু অপলক দৃষ্টি, কত কী যে মনে করিয়ে দেয়! সব যেন থরে থরে সাজানোই থাকে। কোনওটা সাধারণ তাকে, কোনওটা বা মোহর জ্ঞানে নিভৃত লকারে। 

কমলা, এমনই চকিতে দেখেছিল, তার দ্বিতীয় বরের সেই দৃষ্টি। প্রথম বিয়ে ভেঙে দ্বিতীয়তেও সুখী হয়নি কমলা; আবার সে পা বাড়িয়েছিল, নতুন প্রেমিকের রোশনাই ইশারায়। আধিপত্যের জেরে কানাই তা আন্দাজ করতেই, জোর লড়ালড়ি। গালাগালির অল্প পরেই মার-– লাথি ও চুলের মুঠি ধরে দুরমুশ। বিয়ে ছেড়ে, ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছিল কমলা; তবু সে ভুলতে পারে না, সেই এক ছবি। বেদম মারের পর কানাইয়ের হাত দুখানা নিজের হাতে জড়ো করে সে বলছে,

-চলো খেয়ে নেবে; তোমার পছন্দের রুটি তড়কাই বানিয়েছি।

মিথ্যে চুম্বনের আশ্বাস জাগিয়ে বলছে,

- এমন মার কেউ মারে!

রাগ ভুলে কানাইও চেয়ে আছে অপলক, কমলার চোখে। জানে, যে কমলার চোখে যা কিছু, সবটুকু মিথ্যে আর ছল; বরের মার থেকে নিজেকে বাঁচাবার পথটুকু সে শুধু করুণা বিছিয়ে দিয়েছে; তবু নরম হয়ে আসে কানাইয়ের রাগ আর ক্ষোভ; কমলা অবাক তাকায়-– এত স্বচ্ছ! এত নরম! এত নির্ভরতা! লজ্জায় নিভে আসে দুর্বল কমলা।

চুম্বন বা সঙ্গম নয়; আজও তার মনে পড়ে, কানাইয়ের সেই দৃষ্টিটুকু।

বৃষ্টি শেষে ভেজা মাঠের মতো, ঝকঝকে সবুজ।

Sunday, October 9, 2022

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | পর্ব ৬ | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য


গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

২০

দিনের বেলার নার্স ও সহকারিণী বাবাকে পরিষ্কার করে সাজিয়ে দিচ্ছিলেন শেষযাত্রার জন্য। নার্স মাকে জিজ্ঞাসা করলেন বাবাকে কোনো বিশেষ পোশাক পরিয়ে দিতে চান কিনা। মা বললেন, না। তখন নার্স একটি সাধারণ কাফন দেওয়ার কথা বললেন। মা নিয়ে এলেন এমব্রয়ডারি করা একটা পাতলা সাদা বিছানার চাদর আর সেটা নার্সের হাতে এমনভাবে দিলেন যেন সাধারণ একটা কিছু দিচ্ছেন।

একদিকে বাবাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে, অন্যদিকে একজন ডাক্তার মৃত্যুর শংসাপত্রের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র তৈরি করছেন। আমরা বুঝতে পারছিলাম যে গণমাধ্যমকে খবর দেওয়ার আগে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কারণ ঠিক সেই সময় বাবার খুব কাছের এক বন্ধু বিমানের মধ্যে রয়েছেন, কলোম্বিয়া থেকে আসছেন শেষ বিদায় জানাতে। মেহিকোর একজন বান্ধবী পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে ফিরতি বিমানে আসছেন, তিনিও রয়েছেন পথে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছিল আমার কিশোরী মেয়েদের নিয়ে। তারাও মাঝপথে। আমার স্ত্রীর সঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলস থেকে আসছে। আমি চাইছিলাম না যে বিমান থেকে নেমেই তারা ফোন খুলে জানতে পারুক তাদের দাদু চলে গেছেন। তাই যতক্ষণ না তাঁরা সবাই ধীরে সুস্থে বিমানবন্দরে পৌঁছন ও প্রথমে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে ফোন করছিলাম না। এই অবস্থা দেখলে বাবা নিশ্চয়ই খুব হাসতেন – ‘সবাই সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কোথাও যাওয়ার নেই’। 

ঘরের মধ্যে ফিরে তাকালাম। বাবার দেহ আপাদমস্তক ঢাকা। খাট নামিয়ে সোজা করে দেওয়া হয়েছে আর তিনি টানটান হয়ে শুয়ে আছেন, শুধুমাত্র মাথাটা একটু তোলা, সেখানে একটা পাতলা বালিশ দেওয়া। তাঁর মুখ একদম পরিষ্কার আর যে তোয়ালে দিয়ে চোয়ালটা বেঁধে রাখা হয়েছিল সেটাও খুলে নেওয়া হয়েছে। এখন চোয়াল ঠিকঠাক আছে, নকল দাঁতও রয়েছে স্বস্থানে। কিন্তু তাঁকে বিবর্ণ আর গম্ভীর লাগছে। তবে শান্তিতে শুয়ে আছেন। যে কটি পাকা চুল আছে তা তাঁর মাথায় অলস ভাবে লেগে রয়েছে। এই চুল আমায় মনে করিয়ে দিল এক অভিজাতের আবক্ষ মূর্তি। আমার ভাগ্নী তাঁর পেটের উপর কয়েকটা হলুদ গোলাপ রেখে দিল। এই হলুদ গোলাপ ছিল বাবার সবচেয়ে প্রিয় আর তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই ফুল সৌভাগ্য বয়ে আনে।

এরপর কয়েক ঘন্টা আমরা বসে রইলাম মায়ের সঙ্গে। প্রতিদিনের মতোই মা দূরদর্শনে বিভিন্ন খবর দেখছেন অন্যমনষ্ক থাকার জন্য। একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে ওক্তাবিয়ো পাসের জীবনের উপর। তিনি বাবা-মায়ের দূরের বন্ধু ছিলেন এবং কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। মা অনুষ্ঠানটি খানিকক্ষণ দেখলেন, কিন্তু তাঁর মুখের ভাব থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে তিনি সেই সব তথ্যচিত্রের কথা ভাবছেন যেগুলো আগত দিনগুলোয় দেখবেন।

হঠাৎ মা বললেন, কাউকে উদ্দেশ্য না করে, বাবা বোধহয় আলবারোর সঙ্গে আছেন, ‘মদ খাচ্ছে আর বাজে বকছে’। বাবার বন্ধু আলবারো কয়েক মাস আগে মারা গেছেন।

এই সময় বাড়ির ফোন বেজে উঠল আর সচরাচর যা ঘটে না ঠিক সেটাই হল, মা ফোন তুললেন। বাবার এক বন্ধু ফোন করেছেন, তবে তাঁর সঙ্গে খুব ঘনঘন দেখা হয় না। তাই তিনি বাবার খবর নিতে ফোন করেছেন আর বললেন যে কিছু প্রয়োজন হলেই তিনি সর্বতোভাবে আমাদের সাহায্য করবেন। মা ধৈর্যের সঙ্গে তাঁর প্রতিটি কথা শুনলেন, তাঁকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানালেন আর তারপরেই বললেন যে বাবা নেই। ফোনের অপর প্রান্তে কী প্রতিক্রিয়া হল তা বোঝাই যায়, বিশেষ করে মায়ের ওই কাটা কাটা গলায় খবরটা শোনার পরে। মা একই রকম গলার স্বরে তাঁকে জানালেন এই কিছুক্ষণ আগে ঘটনাটা ঘটেছে, যেন মনে হল বাড়িতে খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে কথা বলছেন। আমার ভাগ্নে-ভাগ্নিরা খুবই শোকাচ্ছন্ন। কিন্তু তারা আমার মাকে ভালো করে চেনে আর তাই হাসি চাপার চেষ্টা করছে। শেষে যখন তাদের দিকে তাকিয়ে আমি চোখের ইশারা করলাম তারা আর হাসি চাপতে পারল না, দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

২১

বাবার কলোম্বিয়ার বন্ধু মেহিকো পৌঁছে গেছেন। সেকথা আমি জানতে পারলাম যখন দরজায় বেল বাজল। আমায় বলল যে তিনি একতলায় অপেক্ষা করছেন। নিচে নেমে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দিকে যেতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রায় ধাক্কা লেগে গেল আমার। কোনো সম্ভাষণ না করেই প্রথম যে কথাটা তাঁকে বললাম তা হল বাবা আর নেই। তিনি বাবার সবচেয়ে পুরোন বন্ধুদের একজন। তাঁকে আমি বাস্তবিক হতচকিত করে দিলাম। তিনি স্তম্ভিত হয়ে চুপ করে রইলেন। কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। চোখদুটোয় ছায়া ঘনিয়ে এল, বুঝি বা তাঁদের বন্ধুত্বের আদি থেকে অন্ত সমস্ত স্মৃতি এক মুহূর্তের মধ্যে তাঁর স্মৃতির সোপান ধরে ছুটে গেল। বুঝতে পারলাম এতটাই ক্লান্ত আর উদ্বিগ্ন হয়ে আছি যে এরকম বাজে ভাবে তাঁকে খবরটা দিয়ে ফেললাম। তখন জোর করে পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার চেষ্টা করতে লাগলাম।

যে বান্ধবী ছুটি কাটিয়ে ফিরছিলেন তিনিও যোগাযোগ করলেন। এবং তারপর যোগাযোগ করল আমার স্ত্রী। তাদের বিমান সবেমাত্র মাটি ছুঁয়েছে। বিমানের ভেতর থেকেই আমায় ফোন করল। তাঁকে সব বললাম। তাঁর দুঃখে আমার মন এতই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল যে মেয়েদের সঙ্গে আর কথা বলতে পারলাম না। অপেক্ষায় রইলাম দেখা হওয়া পর্যন্ত।

বেশ কিছু বন্ধুবান্ধবকে ফোন করলাম। প্রতিটি ফোনই ছিল আগেরটার চেয়ে বেশি কষ্টদায়ক। এঁরা প্রত্যেকেই যেহেতু ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন, তাই কেউই অবাক হলেন না। কিন্তু সকলেই চুপ করে গেলেন, কারুর মুখ দিয়ে কোনো শব্দ নির্গত হল না। এ যেন নিস্তব্ধতার চেয়েও বেশি শূণ্যতা। তাঁদের অধিকাংশই কোনো মন্তব্য না করে অন্যকে খবরটা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালনে রত হলেন। আর যিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে আমার বাবার সাহিত্যিক এজেন্ট ছিলেন, তিনি শুধু বললেন, ‘কী ভয়ংকর!’ আর কথাটা বললেন এমন করে যেন যে ঘটনাটা এতদিন অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছে সেটাই শেষ পর্যন্ত ঘটে গেল। আমি মনে মনে তাঁর মুখটা দেখতে পাচ্ছিলাম। চোখ বন্ধ করে গভীর চিন্তায় মগ্ন। নিজের মধ্যে আরো বেশি ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, যাতে অচিন্ত্যনীয় এই ঘটনা ধীরে ধীরে বাস্তবের রূপ পেতে থাকে। ‘কী ভয়ংকর!’ কথাটা আবার বললেন আর ফোন রেখে দিলেন। একই ধরণের প্রতিক্রিয়া পেলাম বাবার আজীবনের বন্ধুদের অনেকের কাছ থেকে। দুঃখের চেয়েও বেশি অবিশ্বাস। এমন একজন জীবনসাধক, চিরজায়মান, জীবনরসের রসিক, যাঁর অস্তিত্বের কত রঙ, কত রূপ, তিনি আজ নির্বাপিত, এ যেন অবিশ্বাস্য। 

এবার মনে হল সংবাদমাধ্যমের যাকে যাকে খবর দেওয়ার কথা তাদের ফোন করতে হবে। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে, কেননা সেটা ছিল সেমানা সান্তার [১] বৃহষ্পতিবার। একটি ক্যাথলিক দেশে সংবাদমাধ্যমের কর্তাদের পাওয়া তখন কার্যত অসম্ভব। বড়দিনের আগের দিনের মতো সেমানা সান্তার সময়েও বিশেষ কোনো খবর থাকে না। তাই তাঁরা সবাই বাইরে চলে গেছেন, সোমবারের আগে তাঁদের পাওয়া যাবে না। প্রায় দু’ ঘন্টা ধরে আমরা হাত জড়ো করে বসে রইলাম সেই খবরের মধ্যে বন্দী হয়ে যার জন্য সারা বিশ্ব অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু এখন আর তা শোনার কেউ নেই। শেষ পর্যন্ত বাবার সেই বান্ধবী, যিনি সবেমাত্র ছুটি কাটিয়ে ফিরেছেন, তাঁর শরণাপন্ন হলাম। তিনি রেডিয়োর একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তাঁর অনেক অনুগামীও আছে। তাঁকেই অনুরোধ করলাম খবরটা গণমাধ্যমে ঘোষণা করার জন্য। কয়েক মিনিটের মধ্যে সমস্ত জায়গায় ফোন ও মোবাইল বাজতে আরম্ভ করল আর সদর দরজার বাইরে শুরু হয়ে গেল সংবাদমাধ্যম, গুণগ্রাহী ও পুলিশের ক্রমবর্দ্ধমান ভিড়।

২২

বাবার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পরে বাবার সেক্রেটারি একটি ই-মেইল পেলেন। সেটি লিখেছেন বাবার এক বান্ধবী যাঁর সঙ্গে বহুদিন বাবার কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি জানতে চেয়েছেন আমাদের মনে আছে কিনা যে বাবার সৃষ্ট অন্যতম বিখ্যাত চরিত্র উরসুলা ইগুয়ারানও এমনই এক পবিত্র বৃহষ্পতিবারে মারা গিয়েছিল। চিঠিতে তিনি উপন্যাসের সেই অংশটি তুলে দিয়েছেন। সেটি পড়ে সেক্রেটারি আবিষ্কার করলেন যে উরসুলার মৃত্যুর ঠিক পরে কয়েকটি পাখি দিগভ্রান্ত হয়ে দেয়ালে ধাক্কা খায় ও মরে গিয়ে মেঝের উপর পড়ে থাকে। তিনি অংশটি জোরে জোরে পড়লেন ও ভাবতে লাগলেন সেই পাখিটার কথা যেটি সেদিনই একটু আগে মরে পড়েছিল। তারপর আমার দিকে তাকালেন। হয়তো আশা করছিলেন যে আমি বোকার মতো এই কাকতালীয় ঘটনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করার সাহস রাখব। আমি তখন শুধুই ভাবছি কতক্ষণে ঘটনাটা সবাইকে বলব।  

২৩

আমার স্ত্রী-সন্তান বাড়ি এসে পৌঁছল। আমাকে গভীর স্নেহে আলিঙ্গন করার পরই আমার মেয়েরা গেল তাদের ঠাকুমার কাছে। আমার মায়ের পাঁচ নাতি-নাতনি-ই তাঁকে খুব ভালোবাসে। মাকে দেখে মনে হচ্ছে শান্তই আছেন। সবার সঙ্গে কথা বলছেন। আমার মেয়েদের দেখেও ঠিক যেমন সব সময় করেন, তেমনই তাদের খোঁজ খবর নিলেন। ওরাও পরিস্থিতিকে বেশ সহজভাবে গ্রহণ করল। আসলে ঠাকুমার কাছ থেকে অভাবনীয় প্রতিক্রিয়া পেতে তারা অভ্যস্ত। ওরা মনে করে ওদের ঠাকুমা পৃথিবীতে অদ্বিতীয়াঃ মাটির কাছাকাছি থাকা এক অন্য গোত্রের মানুষ। আবার খুবই নিয়মনিষ্ঠ ও রাগী। তথাকথিত সামাজিক নিয়মকে প্রায়শই চ্যালেঞ্জ করেন। তাই ওরা মাকে খুব শ্রদ্ধা করে। আবার মা ওদের খুব হাসায়। নাতি-নাতনিদের কাছে ভালোবাসা পাওয়ার সেটাও একটা কারণ।

কলোম্বিয়া থেকে আগত বন্ধু মায়ের কাছে অনুমতি চাইলেন বাবাকে একবার দেখার জন্য। অবশ্যই মা রাজি হলেন। আমি তখন আমার মেয়েদের একই কথা বললাম। এক মেয়ে যেতে চাইল না। কিন্তু অন্যটি দূর থেকে দাদুকে একবার দেখল। কিছুই বলল না মুখে কিন্তু তার অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছিল কৌতূহল ও দুঃখের ভিতরের এক টানাপোড়েন। ঠিক তখনি দূরদর্শনে খবরটা সম্প্রসারিত হল। বিভিন্ন চ্যানেলে দেখানো হতে লাগল বাবার জীবনী, সংক্ষিপ্ত ও দীর্ঘ, বা তাঁর জীবনের টুকরো টুকরো অংশ। মা একবার এই চ্যানেল দেখছেন, তারপর অন্য চ্যানেল, তবে কোনো মন্তব্য করছেন না। মগ্ন হয়ে আছেন নিজের মধ্যে। আমরা তাঁর চারপাশে ঘিরে বসে আছি আর সেই মানুষটার জীবন ও সাফল্যের ধারাবিবরণী দেখছি যিনি শুয়ে আছেন, ঠিক পাশের ঘরে, মৃত।


টীকা

সেমানা সান্তাঃ বা পবিত্র সপ্তাহ। ইস্টারের আগের সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ক্যাথলিক ধর্মের একটি অনুষ্ঠান। সারা সপ্তাহ ধরে এটি পালন করা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে যীশু খ্রীস্টের জীবনী ও বাণী পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে মধ্যযুগে স্পেনে এই উৎসবের সূচনা হয়।  




আগের পর্ব

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | ৫ম পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য