Wednesday, November 10, 2021

সিলভিয়া এউখেনিয়া কাস্তিয়েরোর কবিতা | সেই সামান্য বিরহে

মূল স্প্যানিশ থেকে বাংলায় অনুবাদ | জয়া চৌধুরী


পঞ্চম বসবাস: মোহভঙ্গ 

প্রতিবার যখন ভুট্টার কাণ্ড আরও লাল হতে থাকে

ভুট্টা গাছের পাতা থেকে ঝোলে একটা ফারের পুতুল

বালিকারা লুকোচুরি খেলে

এবং কাকতাড়ুয়াদের অনাবৃত করে ফেলতে থাকে।

সে রয়ে যায় মুখহীন, পরে এক চোখ কানাও,

কান দুটো ওকে হিঁচড়ে টানতে থাকে যতক্ষণে না সে স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।

ফুটো ফুটো জালিকায় ভরা আমার বাবাকে ওরা 

যখন অপহরণ করেছিল ঠিক তেমনটি। 

সেই সমতল বিকেলে 

মনে হচ্ছিল ভুট্টার শীষ বেয়ে বয়ে যাচ্ছে রক্ত;

পুতুলের তখন আর নাক নেই, দেখতে পায় না গন্ধও নয়,

চিৎকার করতেও পারে না, বহু মানুষের মাঝখানে ও মারা গিয়েছে,

যেখানে সব শবদেহ রয়েছে বালিকারা সেখানে ওকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল

তখন সবে ওরা ক’জন ভদ্রলোককে বড় বড় পিস্তল দিয়ে গুলি করে উঠেছিল।


বাহুল্যবর্জিত শূন্য

বিকেলের তীব্র আবেগ

সেই কালিমা যা আমার পিছনে ধেয়ে আসে

সেই শুভ্রতা যা আমার স্কার্টকে রঙিন করে তোলে

পৃথিবীর এই খণ্ডে এ হল গোধূলি

আমাকে দংশায় আগুন

ফুলে ওঠে পেট

মুখ জ্বলতে থাকে

মনে হয় বুক থেকে বের হয়ে আসছে পা দুটো

এ হল ভয় যা কর্কশ আওয়াজে আমার শিরদাঁড়া খায়

সমস্ত ভুট্টা ক্ষেত পুড়তে থাকে

জ্বলতে থাকে সমগ্র জনপদ

বাহুল্যবর্জিত শূন্যরা

দুলতে থাকা বৃক্ষদের দিকে

আমার লাল স্কার্ট ছড়িয়ে পড়ে

বিদ্ধকারী সাঁড়াশিদের মতো

ভাঙা জানলারা পড়ে যায়

আমার পোড়া হাতদুটো জল খোঁজে

এক শ্বাসরোধী আগুন খড়ের উপর চিৎকার করে

ডুবে যাওয়া আমার সে চিৎকার, একটা কাঁপুনি

আগুনে গোটা পাহাড় দুমড়ে যায় 

তোমার ভেদকারী চোখেরা আমাকে পলকহীন রেখে দেয়

শস্যাগারে বাড়তে থাকে আগুন

পাশে পাহাড়ে তখন কেবল বাহুল্যবর্জিত শূন্য।


একটি ক্রিসেন্থিমাম পরিধান করি

এবং চুলের উপর সাদা মুকুট;

মা পরেন সাদা জুঁইফুল

এবং গোলাপের মুকুট, কাঁটাগুলি একটি আঙুলে ফোটে।

কাঠের ড্রয়ারে 

ও তার খুলির ভিতরকার বিরাট গর্তে

বাবার গভীর চাহনিতে মা কেঁদে ওঠেন।

ঠাকুমা বাবাকে গুছিয়ে দিয়েছিল যাতে ওরা তাঁকে দেখতে না পায়

কিন্তু আমার মনে তো ওঁরা থাকবেনই। 

মা জানু ঢাকা মোজা পরেছেন, কুঁজো হয়ে হাঁটেন,

চোখে পাথুরে চাহনি, ওঁর আঙুলের রক্ত

বাবার মুখের ওপরে পড়ে টপ টপ, সঙ্গী থাকা কুমারী 

মেরীর ছবিটিতেও। বাবা হাসতে থাকেন,

হয়ত তখনও পালিয়ে না গিয়ে মেঘের ভিতরে থাকেন,

বাবা ভুট্টাক্ষেত বুনতেন এবং মিথ্যে বলতেন,

তারপর লুকিয়ে পড়তেন 

যতক্ষণ না ফের বেরিয়ে পড়েন এবং পাহাড়ে হারিয়ে যান,

ওঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় ওরা পায়, কথা বলছিলেন না, কেবল মিথ্যে বলছেন।

ক্রিসেনথিমাম ফুলেদের পাপড়ি ঝরে পড়ে,

মৃত্যু গন্ধ ছড়িয়ে ঢলে পড়তে থাকে জুঁই, তবে ঠাম্মার

গ্লাডিওলাসের শাখারা ঢের বেশি সিরিয়াস, সুগন্ধ ছড়ায় না, কাঁটাও ফোটায় না।

তারা দুঃখী হয় না কক্ষনও।


যেদিন থেকে বহুবার ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়া শরীর পড়েছে

ঝোপঝাড় দেখলে মনে হয় কাকতাড়ুয়াদের জন্ম দেবার পক্ষে ওরা যথেষ্ট উর্বর 

এবং বিছানার চাদরের মত ওরা ঝুলতে থাকে

দেখায় যেন তীর বিঁধে আছে কাণ্ডে,

আকাশ অন্ধকার করে দিয়ে পাখিরা চিৎকার করতে থাকে

এবং পালায়।

এককোণে ভীষণ লালচুলো এক ডাইনির উদয় হয়

তার মুখে ঘাস আটকে রয়েছে।

নিরলঙ্কার যন্ত্রণার ভেতরে স্তব্ধ, এ এক গর্ভপাত হওয়া চিৎকার।

ডাইনিটা বেগনি। ট্রেন থেকে ছেঁচড়ে নামিয়ে আনার আগে

ওকে নিশ্চয় ওদের শ্বাসরোধ করে রাখতে হয়েছিল। দুলছিল

ঝড়ের সামনে দোল খাচ্ছে বলে, পাশে থাকা ভুট্টার পাতাদের

দেখে মনে হয় দুর্ভাগ্য দেখে মুখ ভ্যাংচাচ্ছে।

চোখ খুবলে নিতে পাতিকাকেরা এগিয়ে আসে,

দুটি গভীর গর্তের

ভেতরকার গোলকধাঁধা দেখতে রেখে যায়;

পরে শকুনেরা তা খেয়ে ফেলে

ভাঙা হাড়গোড়গুলো ফেলে যায়।

সে নারী প্রতিরাতে লাঙল হাতে

গ্রামবাসীর জানলায় উঁকি দেয়।


আগ্নেয়গিরির মতো, কলঙ্কময় সূর্যের আলোয়

ভরাভর্তি চারমাথার মোড়ে ছোটরা দৌড়াদৌড়ি করে;

দেয়ালে বিষুবরৈখিক স্বরভঙ্গি,

কুটিরশিল্প, ইন্ডিয়ান জনজাতির মানুষ, মদ;

ধীরস্থির বুড়োদের জাল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট 

এবং মেঝে ঢেকে দেয়া পাতারা।

তিনজন পুরুষ কাছে এগিয়ে আসে, হাঁটার সময় তারা একেবেঁকে চলে,

দেখলে মনে হয় চোখ নেই, চারমাথার মোড়ের আধখানা গিয়ে

পালানোর পথ খোঁজে, একটা ডাকের জন্য অপেক্ষা করে, নগ্ন আকাশে

লুকোতে চাইবার এক চিহ্ন,

চারমাথার উপরে ছুরি দিয়ে ফালাফালা করার মতো একটা শতপদী কেঁচো 

পবিত্র নৈবেদ্য-গিঁট,

গলা, হৃৎপিণ্ড। এবং ওরা শুকিয়ে যায়।


আধঘুমন্ত মানুষ।

দ্রুত হাতদা-র ধার দিয়ে স্তন দুটো ছোঁয়।

ট্রেনের ছাদে

মুরগিপালকেরা তাদের হ্যাচারি বয়।

ডানা ক্ষইতে থাকা মোটাসোটা মুরগিরা 

নড়াচড়া করতে পারে না।

পাতা জুড়ে একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ে,

ঘাড়ের প্রধান শিরা প্রতি মুহূর্তে আরও পুরু হয়ে চলে--

এটা ভয়-- ছুরি ও ছেদ চওড়া হতে থাকে,

বাড়তে থাকে-- রক্ত বুদবুদ করে ফুটতে থাকে

বাতাসের সংস্পর্শে কালো হয়ে যায়। 

মাথা চোখ বোজাতে সে অস্বীকার করে

যেন তাদের খুঁজছে।

ভেতর থেকে থকথকে কাদার গন্ধ ফুটতে থাকে।


যেদিন অপহরণ ঘটেছিল

আমার পুতুলটা লাল পুকুরে পড়ে গিয়েছিল,

মাথায় ফুটো ছিল ওটার 

আমরা তখন দৌড়চ্ছিলাম আর মা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

আমার পুতুলটা ভাঙা চোখে আকাশের দিকে 

মুখ করে পড়েছিল 

এবং একটা গর্তের ভেতরে

প্লাস্টিকের মতো দুটো গুলি আটকে ছিল।

আমার ত্বকে ঠাণ্ডা লাগছে 

নখেরা আমায় চিরে ফেলতে আসছে,

আঙুল দিয়ে কেটেও ফেলল।

আমার ক্ষতি করল ওরা। 

শূন্য থেকে নীল চোখে আমার পুতুল

আমার দিকে চেয়ে রইল,

নোংরা রক্তটাকে আমি দেখেই যাচ্ছি।



---------------------------------------------------------

কবি সিলভিয়া এউখেনিয়া কাস্তিয়েরো মানসানো (Silvia Eugenia Castillero Manzano) জন্মেছেন মেক্সিকো শহরে। গুয়াদালাখারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য পত্রিকা ‘লুভিনা’ সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। ২০১২ সালে বাইসেন্টিনিয়াল লেটার্স পুরষ্কার পেয়েছেন। সপরিবারে কলকাতায় এসেছিলেন ২০১৯ সালে। আইসিসিআরে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি।

Saturday, November 6, 2021

মেহুল দেবকলার কবিতা


দুই শহর

আমার সর্বকনিষ্ঠ বন্ধুর জন্য তাঁর ৮০তম জন্মদিনে 


বাংলা অনুবাদ: শ্যামশ্রী রায় কর্মকার 

গুজরাটি থেকে ইংরেজি অনুবাদ: অন্তরা দেবসেন


তুমি কি বিশ্বাস করবে 

শীতের সকালে যে হাসির উষ্ণতা দেয়

সেই শহরের প্রত্যন্ত এক কোণে আমরা ছোট্ট কলকাতা গড়েছি

তোমার হাসির মতো উচ্ছল, প্রাণখোলা সে 


গুরুদেব 

হয়তো কোমল মমতায় 

শিশুটিকে তুলে 

বসিয়েছিলেন তাঁর কোলে

মৃদুস্বরে উচ্চারণ করেছিলেন ন ব নী তা 

তুমি তখনও নিশ্চিত হেসেছিলে


আমি জানি 

এই তীব্র শীতের রাতে 

ভালবাসার কোন ঘরে 

এখন লিখছ তুমি, কিংবা পড়ছ 

পরম শান্তিতে 


মধ্যরাত্রিতে 

তোমার ফোন 

হোয়াটসঅ্যাপ বার্তারা

ভিডিয়ো কলের জন্য 

তুমি অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিলে

ওমনি তোমার চোখ বলে উঠলো অজস্র কথা 


কাঁটা বিছিয়ে রাখা রাস্তায় যখন আমি পথ হারিয়ে ফেলি 

কবিতা ও ক্ষমতার টানাপোড়েনের মাঝখানে 

তুমি এসো হাত ধরো, পথ দেখিয়ে যাও প্রতিবার 

বলে ওঠো, 'মেহুল, তুমি আমার ছেলের মতো'


নিয়তি আর আমি 

সুদূর ভাদোদরায় 

ছোট্ট একটা কলকাতা গড়েছি

এবং আমি জানি 

ওখানেও ছোট্ট ভাদোদারা গড়ে উঠছে 

আর তোমার কবিতার মতো আমাদের বন্ধুত্বও অক্ষয়, শাশ্বত। 


এই তো 

ক'দিন আগে 

তুমি বললে, 'আমার গলা বুঁজে  আসছে' 

আমার বুক কেঁপে উঠল 

কিন্তু জানি 

আমার আগেও ছিলে 

আমার পরেও থাকবে তুমি 

যতদিন এই দুই শহর 

বেঁচে থাকবে


১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

ভাদোদরা



---------------------------------------------------------

মেহুল দেবকলা (Mehul Devkala) সাম্প্রতিক গুজরাটি কবিতার অন্যতম নাম। সমাজকর্মী হিসেবে সুপরিচিত। পাশাপাশি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি নির্মাতা। বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়। যোগ দিয়েছেন সাহিত্য আকাদেমির অল ইন্ডিয়া ইয়ং রাইটার্স মিটে। নবনীতা দেবসেনের স্নেহধন্য।

Thursday, October 21, 2021

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায়


গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

আমি আর আমার ভাই যখন ছোট ছিলাম, বাবা আমাদেরকে একটা কথা দিতে বলেছিলেন: আমরা যেন ২০০০ সালের নববর্ষের আগের দিনটি তাঁর সঙ্গে উদযাপন করি। আমাদের কৈশোরেও তিনি বহুবার এই প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এমন কি তাঁর জোরাজুরিতে আমার একটু অস্বস্তিই হত। কিন্তু বড় হওয়ার পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে এ ছিল তাঁর সেই সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা। বিংশ শতাব্দী শেষ লগ্নে যখন পৌঁছবে, তখন তাঁর বয়স হবে বাহাত্তর আর আমার চল্লিশ। ছোটবেলায় কিন্তু ওই সময়টাকে খুব দূরে বলে মনে হত না। পরবর্তীকালে আমরা মানে আমি আর আমার ভাই বড় হয়ে যাওয়ার পর অবশ্য এই প্রতিজ্ঞার কথা আর বিশেষ বলা হত না। তবে ওই দিন আমরা সবাই একসঙ্গে ছিলাম বাবার সবচেয়ে পছন্দের শহরে, কার্তাহেনা দে ইন্দিয়াসে। সেদিন বাবা একটু লাজুক স্বরে আমায় বলেছিলেন, ‘তোমার সঙ্গে আমার একটা চুক্তি ছিল, মনে আছে?।’ সম্ভবত আমাকে জোরাজুরি করার জন্য একটু অস্বস্তিতে ছিলেন। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, মনে আছে।’ সেই দিনের পর থেকে আর কখনও আমরা এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করিনি। তারপর তিনি আরও পনের বছর বেঁচে ছিলেন।

তাঁর বয়স যখন সত্তরের কাছাকাছি, তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘রাতে আলো নিভে যাওয়ার পর কি ভাব?’ ‘ভাবি যে প্রায় শেষ হয়ে এল।’ তারপর একটু হেসে বললেন, ‘তবে আরও কিছু সময় বাকি আছে, এখনই দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই।’ শুধু আমাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যই যে সেকথা বলেছিলেন তা নয়, বাস্তবিক তিনি আশাবাদী ছিলেন। ‘একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখবে যে তুমি বুড়ো হয়ে গেছ। ব্যাপারটা এতটাই আকস্মিক, আগে থেকে কিছুই জানা যায় না, নাটকের মতো আবির্ভূত হয়।’ বাবা বলে চললেন, ‘অনেক বছর আগে একবার শুনেছিলাম যে লেখকের জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন আর দীর্ঘ কাহিনি লিখতে পারা যায় না। মস্তিষ্ক আর তখন উপন্যাসের বিস্তৃত আঙ্গিক বা তার জটিল বুননকে ধারণ করতে পারে না। সেটা যে ঠিক তা এখন বুঝতে পারি। তাই এখন থেকে ছোট ছোট লেখা লিখতে হবে।’

তারপর তাঁর বয়স যখন আশি, তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেমন লাগছে এখন?

-আশির কোঠায় এসে পুরো চিত্রটা বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়। আর শেষের সেই ক্ষণ এগিয়ে আসছে।

-তোমার কি ভয় লাগছে?

-না, গভীর বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হচ্ছি।

এই সব কথাগুলো মনে পড়ে আর তাঁর কথার সারল্য আমায় ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। তবে তার থেকেও বেশি কষ্ট দেয় আমার প্রশ্নের নিষ্ঠুরতা।

২০১৪ সালের মার্চ মাস। একটা সপ্তাহের মাঝামাঝি এক দিন সকালবেলা মাকে ফোন করেছিলাম। মা বললেন যে দুদিন হল ঠাণ্ডা লেগে বাবা বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। বাবার ক্ষেত্রে এটা নতুন কিছু নয়, কিন্তু এবারের অসুখটা যেন একটু আলাদা। মা বললেন, ‘খাচ্ছে না আর উঠেও বসতে চাইছে না। এটা ঠিক আগের মতো নয়, একেবারে কিছুই করতে পারছে না। আলবারোর ঠিক এই রকমভাবেই শুরু হয়েছিল।’ বাবার এক বন্ধুর কথা বললেন মা, তিনি আগের বছর মারা গিয়েছেন। তারপর বললেন, ‘এবার আর ভালো হবে না।’ এ ছিল মায়ের ভবিষ্যৎবাণী। তবুও আমি উদ্বিগ্ন হইনি, ভেবেছিলাম দুশ্চিন্তা থেকেই মা এসব বলছেন। কিছুদিন আগে অল্প সময়ের ব্যবধানে বেশ কয়েকজন কাছের মানুষ চলে গিয়েছেন। তার মধ্যে মাকে সবথেকে কষ্ট দিয়েছিল ছোট দুই ভায়ের মৃত্যু। তাঁরা মায়ের খুব স্নেহের মানুষ ছিলেন। যাই হোক, ফোনটা করার পর থেকে আমি ভাবতে শুরু করলাম, এই কি তবে শেষের শুরু?

আমার মা দু’-দুবার ক্যান্সারকে পরাস্ত করে ভালো হয়ে উঠেছিলেন। সেই ব্যাপারেই কিছু ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাঁকে তখন লস অ্যাঞ্জেলসে যেতে হবে। সেই জন্য ঠিক হল যে আমার ভাই প্যারিস (যেখানে সে থাকে) থেকে মেহিকো শহরে আসবে বাবার পাশে থাকার জন্য। আর আমি মায়ের সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকব। ভাই এখানে আসতেই বাবার হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য ডাক্তারেরা বললেন যে বাবার নিউমোনিয়া হয়েছে। তাই হাসপাতালে ভর্তি করলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা হবে। মনে হল শেষের দিকে ডাক্তারেরা এ কথাটা মাকে আগেই বলেছিলেন, কিন্তু মা তেমন গা করেননি। হতে পারে ডাক্তারি পরীক্ষায় কি বের হবে তাই নিয়ে মা ভয় পাচ্ছিলেন।

পরের কয়েক দিন ধরে ভায়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে হাসপাতালের ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। হাসপাতালে ভর্তি করতে গিয়ে ভাই যেই বাবার নাম বলেছে সেখানে যে মহিলা অফিসার ছিলেন তিনি রীতিমতো আবেগপ্রবণ হয়ে চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে ভগবান! লেখক গার্সিয়া মার্কেস? আমি কি আমার বৌদিকে (অথবা ননদকে) ফোন করে ওনার কথাটা বলতে পারি? এই খবরটা জানা ওঁর পক্ষে খুব জরুরি।’ ভাই তাঁকে সেটা না করতে বিশেষভাবে অনুরোধ করে। তাতে মহিলার মুখটা বেজার হয়ে যায়। তারপর গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য বারান্দার একেবারে শেষে অপেক্ষাকৃত স্বতন্ত্র একটি ঘরে বাবাকে রাখা হয়। কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল দেখা গেল ডাক্তার, নার্স, স্ট্রেচার নিয়ে যাওয়ার লোক, টেকনিশিয়ান, অন্য রুগী, হাসপাতালের তত্ত্বাবধানের কর্মী, মায় সেই অফিসারের বৌদি পর্যন্ত একে একে দরজার কাছে আসছে শুধু একবার তাঁকে দেখার জন্য। এর ফলে হাসপাতাল থেকে বেশি লোকের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিল। তাছাড়া, সাংবাদিকেরাও ধীরে ধীরে হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে জড়ো হতে শুরু করেছেন এবং ইতিমধ্যে খবরে প্রকাশিত যে তাঁর অবস্থা সংকটজনক। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে তাঁরা প্রকৃত খবরই প্রকাশ করবেন, কারণ আমার বাবার অসুস্থতা তো এক অর্থে অগণিত মানুষেরও বিষয়। সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া তাই সম্ভব নয়। কেননা আমরা জানি যে এই কৌতূহলের একটা বিরাট অংশের উদ্ভব দুর্ভাবনা থেকে, শ্রদ্ধা থেকে, ভালোবাসা থেকে। আমরা যখন ছোট ছিলাম আমাদের বাবা মা সবাইকে বলতেন যে আমরাই হচ্ছি গোটা বিশ্বের মধ্যে সব চাইতে ভালো ছেলে। এর ফলে ভালো ছেলে হওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনও পথ ছিল না। তাই সে ক্ষমতা থাক বা না থাক অত্যন্ত ভদ্রতা ও বিনয়ের সঙ্গে আমরা এই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলাম। আবার সেটা এমনভাবে করতে হল যাতে যে কোনও অবস্থাতেই আমার মা ঠিক যেমন ভাবে চেয়েছেন তেমন ভাবে তাঁর ব্যক্তিজীবন ও বহির্জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা বজায় থাকে। তাঁর কাছে এটা সব সময়েই খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সম্ভবত টেলিভিশনে খোশগল্পের যেসব বাজে প্রোগ্রাম হত সেগুলো দেখার ফল। ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই’, কথাটা আমাদের মনে করিয়ে দিতে পছন্দ করতেন তিনি। তাই এটা আমার অজানা ছিল না যে তাঁর জীবদ্দশায় এই স্মৃতিচারণ প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না।

আমার ভায়ের সঙ্গে বাবার দেখা হয়নি প্রায় দু'মাস হয়ে গেছে। তাই বাবাকে খুব বিচলিত দেখাচ্ছিল। কারণ ভাইকে চিনতে পারছেন না আর কোথায় আছেন সেটাও বুঝতে পারছেন না। ফলে আরও বেশি নার্ভাস হয়ে পড়ছেন। এরই মধ্যে ড্রাইভার ও সেক্রেটারির উপস্থিতি তাঁকে একটু শান্ত করছিল। ওঁরা পালা করে বাবার কাছে থাকছিলেন। আর ছিলেন বাড়ির রাঁধুনি ও গৃহকর্মে সাহায্যকারী মহিলা। তাঁরাই রাতে বাবার কাছে থাকছিলেন। ভায়ের সেখানে থাকার বিশেষ প্রয়োজন ছিল না, বরং দরকার ছিল একটি পরিচিত মুখ, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে যাকে দেখলে বাবা শান্ত থাকবেন। ডাক্তারেরা আমার ভাইকে জিজ্ঞাসা করলেন কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় এখন বাবাকে সে কেমন দেখছে। কেননা তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না তাঁর মানসিক অবস্থা ডেমেন্সিয়ার কারণে না শারীরিক দুর্বলতার জন্য। তিনি প্রায় কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। অতি সাধারণ কিছু প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারছিলেন না। ভাই ডাক্তারদের বলল যে এখন অবস্থা একটু বেশি খারাপ হয়েছে ঠিকই, তবে বহু মাস যাবৎ বাবা এই রকম অবস্থাতেই আছেন। 

এই হাসপাতালটি দেশের মধ্যে চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষণের অন্যতম একটি কেন্দ্র। তাই সকাল হতে না হতেই একজন চিকিৎসক আবির্ভূত হন একদল ইনটার্ন চিকিৎসক সঙ্গে নিয়ে। তাঁরা রোগীর বিছানার পায়ের কাছে জড়ো হয়ে অধ্যাপক চিকিৎসকের কথা শোনেন আর তিনি রোগীর অবস্থা ও তৎসংক্রান্ত চিকিৎসা নিয়ে কথা বলে যান। আমার ভায়ের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে ওই ইনটার্নদের কোনওই ধারণা ছিল না তাঁরা ঠিক কার চিকিৎসা করছেন। কিন্তু তাঁকে দেখতে দেখতে তাঁদের মুখে যে কৌতূহলের আভাস ফুটে উঠত সেটাই বলে দিত যে তাঁরা কিছুটা আন্দাজ করতে পারছেন। তারপর চিকিৎসক তাঁদের জিজ্ঞাসা করলেন কারুর কোনও প্রশ্ন আছে কিনা, তাঁরা সকলেই মাথা নাড়লেন এবং বাধ্য ছাত্রের মতো অধ্যাপককে অনুসরণ করে বেরিয়ে গেলেন।

দিনে অন্তত পক্ষে দু’বার, যখন হাসপাতালে ঢোকে আর বেরোয়, অগণিত সাংবাদিকের দল আমার ভাইকে চিৎকার করে ডাকে। আর সেও উনিশ শতকের প্রারম্ভের ভদ্রলোকের মতো ভদ্রতা বজায় না রেখে পারে না। তাই কেউ তাকে সরাসরি ডাকলে তাকে অগ্রাহ্যও করতে পারে না। ফলে যখনই তাকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, ‘গোনসালো, আপনার বাবা আজ কেমন আছেন?’, সে বাধ্য হয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে যায় আর অমনি তাকে ঘিরে ধরে গণমাধ্যমের চক্রব্যূহ। দূরদর্শনে সেই ছবি দেখে বুঝতে পারতাম একটু ঘাবড়ে গেলেও সবকিছু নিখুঁত শৃঙ্খলার সঙ্গেই সে নিয়ন্ত্রণ করছে। তবুও এই ধরণের আচরণ পরিহার করতে বলতাম। ওকে বোঝালাম যে যদি একজন চিত্রতারকার একটা ছবিতে দেখা যায় যে তিনি ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে আসছেন মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকে আছে, মুখে বিরক্তির চিহ্ন এবং আশপাশের কোনও কিছুকেই গ্রাহ্য করছেন না, তার মানে এই নয় যে তিনি অমার্জিত বা উদ্ধত। তিনি শুধুমাত্র মর্যাদা বজায় রেখে যত দ্রুত সম্ভব গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমার কথা এমনভাবে শুনল যেন মনে হল ওকে কোনও অপরাধের অংশী হওয়ার জন্য বোঝাবার চেষ্টা করছি। এমনকি শেষ পর্যন্ত আমার কথা মেনে নিলেও নিজেকে দোষী মনে করছিল। তবে স্বীকার করল যে সময়ের সঙ্গে এই খ্যাতির জগতের অদ্ভুত নিয়ম-কানুনগুলো ধীরে ধীরে রপ্ত করতে পারবে।

চিকিৎসার ফলে বাবার নিউমোনিয়ার সমস্যার কিছুটা উন্নতি হচ্ছিল, কিন্তু টমোগ্রাফির ছবিতে দেখা গেল যে প্লুরা অঞ্চলে এবং ফুসফুস ও লিভারের কিছু অংশেও জল জমেছে। তার সঙ্গে রয়েছে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার। তবে বায়োপ্সি না করে চিকিৎসকেরা সে ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হতে পারছেন না। কিন্তু সম্পূর্ণ অজ্ঞান না করে বায়োপ্সির জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। অথচ তাঁর শরীরের যা অবস্থা তাতে অজ্ঞান করার পরে হয়তো স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারবেন না। তখন তাঁকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া ছাড়া আর কোনও পথ থাকবে না। দূরদর্শনের চিকিৎসা সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে এই বিষয়টা দেখায়, তবে ব্যাপারটা খুব সহজে দেখালেও আসলে তা ভয়ংকর। লস অ্যাঞ্জেলসে মাকে পরিস্থিতিটা খুলে বললাম এবং ঠিক যা ভেবেছিলাম, তাই হল, মা ভেন্টিলেটরে দিতে চাইলেন না। সুতরাং অপারেশন ছাড়া বায়োপ্সি করা গেল না, ফলে ক্যান্সার ধরা গেল না আর সেই মতো চিকিৎসাও শুরু হল না।

আমি আর আমার ভাই আলোচনা করে ঠিক করলাম যে সে চিকিৎসকদের মধ্যে একজনকে, জেনারেল ফিজিশিয়ান বা পালমোনোলজিস্টকে রোগনির্ণয়ের জন্য একটু চাপ সৃষ্টি করতে হবে। ভাই জিজ্ঞাসা করল, ‘যদি ধরা নিই ফুসফুসে বা লিভারে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার আছে, সে ক্ষেত্রে কি করতে হবে?’ সম্ভবত কয়েক মাস বা তার একটু বেশি বেঁচে থাকবেন, তবে অবশ্যই কেমোথেরাপি করতে হবে। লস অ্যাঞ্জেলসে বাবার এক ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বন্ধুকে পুরো পরিস্থিতি ও উপসর্গের কথা বললাম। তিনি শান্তভাবে বললেন, ‘সম্ভবত এটি ফুসফুসের ক্যান্সার।’ তারপর বললেন, ‘ওখানকার চিকিৎসকেরাও যদি এটাই সন্দেহ করেন তাহলে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে এসো, যেমন ভাবে রাখলে স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন তেমন ভাবে রাখো আর কোনও ভাবেই হাসপাতালে ফিরিয়ে নিয়ে যেও না। হাসপাতালে রাখলে সকলেরই কষ্ট।’ মেহিকোতে আমার শাশুড়ির সঙ্গে কথা বললাম, তিনি একজন চিকিৎসক। সব শুনে তিনিও একই কথা বললেন – হাসপাতাল থেকে দূরে রাখতে যাতে আমার বাবা এবং আমাদের সকলেরই সুবিধা হয়।  

মাকে আমি সব কথা খুলে বললাম। যেখানে তাঁর সবচেয়ে বেশি ভয়, ঠিক সেটাই আমি নিশ্চিত করলাম: অর্ধ শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে যিনি তাঁর জীবনসঙ্গী তিনি এখন মৃত্যুর সম্মুখীন। সে দিনটা ছিল শনিবার। সকালবেলা অপেক্ষা করছি কতক্ষণে মা আর আমি একটু একা হব। তারপর তাঁকে বিস্তারিত ভাবে বললাম এই কদিন কি কি হয়েছে আর কিই বা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। মা আমার কথা শুনলেন, তারপর আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন বিশেষ আগ্রহ নেই, কেমন একটা অবসন্ন ভাব, যেন বা বহুবার শোনা একটা গল্প তিনি আরেকবার শুনছেন। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে দরকারি প্রসঙ্গে এসে পৌঁছলাম; সংক্ষেপে কিন্তু পরিষ্কার করে বললাম: খুব সম্ভবত ফুসফুস বা লিভার অথবা দু’ জায়গাতেই ক্যান্সার হয়েছে, তাই সময় আর বেশি নেই, বড়জোর কয়েক মাস। মা কিছু বলার আগেই টেলিফোন বেজে উঠল। মা ফোন ধরলেন। আমি অবাক হয়ে গেলাম। তাঁকে হতভম্ব হয়ে দেখছি। স্পেনের কারুর সঙ্গে কথা বলছেন। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকার মতো মনের জোর দেখে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। মানসিক আলোড়ন সত্ত্বেও তাঁর এমন সহজভাবে কথা বলে যাওয়ার ক্ষমতা অতুলনীয়। তবুও, মনের অতখানি জোর থাকা সত্ত্বেও, শেষ পর্যন্ত আর পাঁচজনের মতোই বিচলিত হয়ে উঠলেন। তাই তাড়াতাড়ি কথা শেষ করে ফোন রেখে দিয়ে আমার দিকে ঘুরে শান্ত স্বরে বললেন, ‘এখন কি হবে?’ যেন বা আমাদের স্থির করতে হবে আমরা বড় রাস্তা ধরে যাব না গলির মধ্যে দিয়ে। ‘পরশু গোনসালো বাবাকে বাড়ি নিয়ে আসবে। আমাদের এখন মেহিকোয় ফিরে যেতে হবে।’ মা মাথা নাড়লেন, সবটুকু আত্মস্থ করলেন, তারপর আমায় জিজ্ঞাসা করলেন,

-তার মানে সেই সময় এসে গেছে? তোমার বাবার শেষ সময়?  

-হ্যাঁ, তাই তো মনে হচ্ছে।

-ওঃ মা গো!

বলে ইলেকট্রনিক সিগারেট ধরালেন।


(ক্রমশ)

Saturday, October 16, 2021

Poems of Arunava Raha Roy


Rabindra Sadan


Suddenly what happened, that your mobile phone flew away & landed inside my pocket directly from the space! What happened suddenly, that we kept stand still on the Rabindra Sadan back stage and the whole auditorium transferred into a ship! Oh look over there in the second floor, the white bearded captain whistling to command & start the journey. The fun & frolic will be starting right now… the young ladies from Andaman were about to start playing billiard! Where will we be floating away with this ship? Let's go, let us stand united close to the deck railing… let the wind starts floating hitting our sails. This scenario alike to Titanic, let it stand here, now let us flee away leaving the scene, leaving ourselves... to have some beer somewhere else.. Let a world, absolutely owned by us, starts revolving around us. The lord himself is standing just a bit outside the universe, with that world keeping on his palm... No other way to go! Without spoiling each other we won't be able to go anywhere else leaving this orbit, never ever...

(Translated from Bengali: Debanjana Mukherjee Bhowmik)


Bygone


Staying far is good.

Staying far means

we can never meet again.


Is it good, not to meet?

Definitely not!


But, being far can mean

that we can perhaps meet in

some coffee shop around

the city...

(Translated from Bengali: Anindita Bose)


Faraway


You remained silent,

you had a reason too!

I too did not say anything for many days...

So, now, shall we begin to

talk again?


Let alone meeting,

many days you did not even ask me to write and yet

on your words I could have traveled

to Shimla-Manali...

since there were mountains,

there were some more songs


"Hey poet, how are you?"

You can break the

pattern and ask me once.

(Translated from Bengali: Anindita Bose)


Bodhi


If you gift poems,

how long can I keep writing?

Shall I inscribe you into my

visceral intensity?


Deep inside that tree hollow

whose Esraj plays such a

pristine melody?


As your vibrations come

closer to me, an intense

desire to create more engulfs

my existence.

I revive again to attain the

light through the collaged-water...

(Translated from Bengali: Anindita Bose)


Spring Restaurant


Come, let us travel from one

Spring to another...


Let us meet.

Let me listen your

Nightingale voice

When you speak.

Tell me about your

father's well-being!


Come,

let us go from one Spring to

another...


Let us both sink and drink

water...


Let us perch

within the moonspace

and converse...

(Translated from Bengali: Anindita Bose)


At Jorasanko with Snija


I ran out of poems

But a few of the songs of you came flipping their wings all the way to me,

I ask my writings to get drenched in soothing water,

I assure them that there is nothing that can be better


My dearest,I give you the name 'Snija'

I shall call you lovingly by this name from this very moment 

I shall drape your love all over my new born poems


During the rainy season the blow came from far away America...

Forget it, I thought with a sigh;

My dear, come, let's take a stroll at Jorasanko, together you and I

(Translated from Bengali: Pratyush Karmakar)


Goddess


For long I had been walking on a rope 

Albeit it was tough

But I travelled a fruitful distance no doubt 

Where I finally stopped is called earth

Some unknown artist meticulously made you with this very earth

I place poems in your ten palms instead of brutal weapons,

But you fling all the poems unto the unknown;

After some moments of loathsome disgust


The poems will become burning stars

(Translated from Bengali: Pratyush Karmakar)


Myth


If you really hurt me I shall not hesitate to go away

And lean against the dejected sky


Why are you so silent yet unfathomable?


You are like a drop of water on the floor


Today I retrieved this drop of water from the River Jalangi 


While still leaning against the sky I shall certainly make you understand-


That you are water


I shall, one day, like the fabled crow, bring you up from the depth of the earthen pitcher by putting stone chips one after the other until I can touch you. 


You are water

(Translated from Bengali: Pratyush Karmakar)


Silent Belle


The colour of your disregard is like that of the dusk in flight

Which hides itself on the back of the moon


Sleepy eyelids are like weary rivulet which wash away all the light within


You come hurriedly to the office gate,

And lo! There drips down your body a lightning divine

(Translated from Bengali: Pratyush Karmakar)


Wonder


You are such a lover! What a poem!

You didn't come to Manali but through pen.

Bloomed in the tub, on the edge of the current...


Bless me, waking up late night

I am sitting in the hotel room to write you.


Those who have come to travel, no one knows

Here you are every day pick up the sun

from the alloy and burn it on the top of the mountain..

(Translated from Bengali: Mahmud Mitul)


---------------------------------------------------------

Arunava Raha Roy born in 1991 in Alipurduar town of West Bengal, India. He did his higher education in Kolkata. He loves poetry from his early age, had stemmed from his father who was a known poet. Since then, his work has been publishing regularly in leading magazine of Bengal. In the first stage of professional career he worked as a Poetry Editor in a print magazine and worked also as the Literary Editor in a web magazine. He has completed M. Phil from Assam University.

He has published four books of his own creation of poetry-- Sabuj Patar Megh (2010), Dinanter Bhasha (2015), Khamkheyali Pashbalish (2018) and Snijar Sange Jorasankoy (2020). He is the recipient of Barnali Smriti Puraskar (2015), Uralpool Puraskar (2017) and Soumen Basu puraskar (2017). He has recieved Travel Grant 2018 from Sahitya Akademi. Attend All India Young Writers Meet, May 2021 (Sahitya Akademi, Government of India). Attend Dhaka Lit Fest, Nov 2018. Went to Bangladesh Amar Ekhushe Grantha Mela, Feb 2018. Email: arunavaraharoy@gmail.com

Thursday, May 20, 2021

দুটি কবিতা :: রবিন মাইয়ার্স

অনুবাদ: অরিত্র সান্যাল

নিউ ইয়র্ক সিটি


বাচ্চা মেয়েটা নিজে থেকেই

ওর গোলাপ-পাপড়ির মতো ব্যাগটা

পুলিশকে দিতে গেল।

সেই জায়গায় আর তার বাইরেও

তখন তুষার পড়ছে, আকাশ 

ভাঙাচোরা, নাপিতের দোকান থেকে 

গান, চোদ্দ ডলারের 

ওয়াইন গ্লাস, 

ধুসর পায়রাগুলো, রাইকার আইল্যাণ্ড,

আইস স্কেটাররা আলিঙ্গন করছে

পরস্পরকে, কারও

উত্থান আর পতন কিন্তু

সে সব এই গল্পে

বলার মতো নয়। মেয়েটার মা

মিটমিট করে জ্বলছে 

মেয়েটার পিছনে। পুলিশটি

খামখেয়ালি বাবার মতো

বাঁকা হাসি দেয়। কেউ একটা

স্টিল ড্রাম

বাজাল এই সমস্তকিছুর তলায়। সুড়ঙ্গের 

ধাতু মজ্জায় তার মন্ত্র একটা

চকিত ঝলক উচ্চারণ করে, আমাদের

নত হতে বলে। যদি কিছু দেখে থাকো,

বলো তবে, যদি এখানে আছ,

তার মূল্য চোকাও 

                    (৯ মার্চ, ২০১৯)


ভারমন্ট


ওই ছায়াচ্ছন্ন তুষার এতই নীল অদ্ভুত যে

দেখে মনে হয় সে কখনও নিজেকে নিয়ে বাঁধা গান শোনেনি


আর তার বেশিটাই ছাই হয়ে

উঠে যাচ্ছে পাহাড়চূড়োয়

দেখতে পাচ্ছি।


খুব অল্প সময়ের জন্যই এখানে আলো আসে

আর তা এতই ঠাণ্ডা যে জীবন বেরিয়ে যায়


যদি যেতে দাও।

দেবদারু জেগে ওঠে হত পশুপাখির মধ্যে


উজ্জ্বল।

এত রকমের জৈব দশা


বসন্তে বেড়ে ওঠে।

রাখে কোথায় নিজেকে, কীভাবে


জোগায় বিশ্বাস যে

বেঁচে থাকবে?


অন্য জীবনে আমি,

আরিজোনায় পরিচারিকা হয়ে থাকি 


আমার লিউকেমিয়া আছে,

আমি পাড়া-প্রতিবেশীদের প্রতি নিষ্ঠুর,


আমি এক মহিলার প্রেমে পড়েছি,

আমি রোজ এক ল্যাপ সাঁতরাই।


অন্য অন্যতর এক জীবনে আমি রুগী,

আমি তুষারপাত করি।

                       (১১এপ্রিল, ২০১৯)




-------------------------------------------------------------------------

কবি পরিচিতি: রবিন মাইয়ার্স (Robin Myers, B. 1986) আক্ষরিক অর্থেই শূন্য দশকের কবি। আশা করা যায়, বাংলা সাহিত্যের জগতে সে থাকলে কবিতে কবিতে দ্রুত আলাপ জমে উঠত। কিন্তু থাকে সে মেক্সিকোয়, সুদূর মেক্সিকোয়। এ সত্ত্বেও অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ যে ঘটে গেল তা কেবল অরুণাভ রাহারায়ের উদ্যোগেই। কাছ থেকে দেখতে পেলাম পাকেচক্রে আমরা যে অন্তহীন দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে চলেছি, রবিন তাতে স্পষ্ট জেগে আছে; সাধ্যমতো রুখে দাঁড়াচ্ছে, যতটা বিদ্রোহ এক কবিকে মানায়-– করছে। এই লেখাদুটি সেই সক্রিয়তার সাক্ষ্য বহন করে। লেখাদুটির মধ্যে বয়ে চলা চাপা রাজনৈতিক আঁচটি নিয়ে একদিন জিজ্ঞেস করায় রবিন সরাসরি জানাল, আলাদা করে রাজনৈতিক কবিতা লেখার দায় তার নেই। কিন্তু একটা সময়-– যে সময়ে আমরা বেঁচে আছি, তার থেকে তো আর অন্ধ হয়ে নিস্তার লাভ করা যায় না! এই ইঙ্গিতেই পরিষ্কার বোঝা যায় রবিন নিজের ভাষাগত, ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে শিকড়ের মতো গেঁথে দিয়েছে তার অস্তিত্বের শিরা উপশিরা। কবিতায় তো বটেই, অনুবাদকর্মেও রবিনের সিদ্ধি আকাশছোঁওয়া। একজন অনুবাদক হিসেবেই রবিন প্রথমত আমাদের কাছে পৌঁছয়। Kenyon Review, the Harvard Review, Two Lines, The Offing, Waxwing, Beloit Poetry Journal, Asymptote, the Los Angeles Review of Books, Granta , Tupelo Quarterly আর Inventory প্রভৃতি শীর্ষস্থানীয় সাহিত্যপত্রে তার বিভিন্ন অনুবাদ প্রকাশিত। ২০০৯ সালে American Literary Translators Association (ALTA)-এর ফেলোশিপ; ২০১৪-তে, Banff Literary Translation Centre (BILTC)-এ রেসিডেন্সি; আর ২০১৭ সালে রবিন feminist translation colloquium A-Fest- অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করে।

Sunday, April 18, 2021

সেই নীল ঘর :: লেইরে বিয়াতে গার্সিয়া


অনুবাদ: শ্যামশ্রী রায় কর্মকার 

ঘরটা খাপছাড়া, অসমান। বছর তিনেকের বাচ্চার হাতে আঁকা টেরাবাঁকা ড্রইংয়ের মতো। সিলিংটা জানলার দিকে ঢালু হয়ে আসায় ঘরের মধ্যে একটা আমন্ত্রণ ফুটে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল একটা নিজস্ব চরিত্র আছে। 

গৃহসজ্জা সাদামাটা। ঘর দেখলে বাসিন্দার সম্বন্ধে মোটামুটি একটা অনুমান করে নেওয়া যায়। দেওয়ালগুলিতে নীল রঙের প্লাস্টার। তার মধ্যে একটি আবার বাহারি পেন্সিল ও জলরঙে আঁকা ছবিতে, নানা দেশের মানচিত্রে আর অসমাপ্ত বাক্যে ভরা। জানলার দুপাশে যে পর্দাটা লেপ্টে আছে, তার রং নিশাচর নীল। জানালার নিচে বিছানা ও ডেস্ক। ডেস্কের উপর এক তাড়া কাগজ ও কয়েকটা কলম ইচ্ছামত ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। 

ঘরের মধ্যে একটা ছোট চেয়ার। আমি তাতেই বসেছিলাম। বিছানায় বসা উচিৎ কি উচিৎ না – এই এক দ্বিধা ছিল। বিছানাটা চেয়ারের চাইতে অনেক বেশি আরামদায়ক বলে মনে হচ্ছিল। চেয়ারের পিঠটা বেশ উঁচু। কাপড়ের পুর দেওয়া সিট। চেয়ারের হাতলদুটো আমার পক্ষে একটু নিচুই বলা যায়। আমার পা দুটো আবার চেয়ারের তুলনায় লম্বা। অবাক কান্ড! তবুও চেয়ারটায় বসে আরাম পাচ্ছিলাম। আরেকটু জমিয়ে বসবো বলে একটু নড়েচড়ে বসার ভঙ্গিটা ঠিক করে নিতেই চেয়ারের পিঠের সঙ্গে আমার পিঠ খাপে খাপে মিলে গেলো। আমি আরামে হেলান দিলাম। 

ঘরটা একেবারে নিঃশব্দ। আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। ঘরে ঢোকার আগে এত শব্দ ছিল। করিডরে মানুষের গলা, লোহার দরজাওয়ালা পুরনো লিফটের ঘড়ঘড়, রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যালে মানুষ আর গাড়ির গাদাগাদি ভিড়ের আওয়াজ। সোমবারের অফিস টাইমে সারা পৃথিবীর তাড়া থাকে, কারণ সবারই দেরি হয়ে যায়। কিন্তু, যখন থেকে আমি ওই ঘরটার ভেতর ঢুকে পড়লাম, একটা নিঃশ্বাসের শব্দও পাচ্ছিলাম না। কেউ ফিসফিসও করছিল না। শুধুই গভীর স্তব্ধতা। ওই পর্দার নীল রঙের মতই, বোবা। 

বিছানার চাদরটাও নীল বলে মনে হচ্ছিল। মহিলার চোখ দুটোও, সম্ভবত। আমার ঠিক মনে পড়ছে না এখন। আমার জিভ থেকে রঙের কোরকগুলো মুছে গেছে। শুধু মনে পড়ছে যে আমি ওই নীল নৈঃশব্দ্যের কথা আর ভাবতে পারছিলাম না। 

তারপর, আমি এলাম।




-------------------------------------------------------------------------

লেখক পরিচিতি: লেইরে বিয়াতে গার্সিয়ার জন্ম স্পেনের বিগোতে। বহু ভাষায় পারদর্শী এই লেখিকা একজন ভাষা শিক্ষিকা। বিগত দশকের প্রথম দিকে কয়েক বছর কলকাতায় ছিলেন। মূলত গদ্য লেখেন ইংরাজি ও স্প্যানিশ ভাষায়। সংবাদ প্রতিদিন, দুকূল, পরম্পরা, দ্য ড্রিমিং মেসিন প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর নানা লেখা প্রকাশিত হয়েছে। নিজের লেখার পাশাপাশি অনুবাদও করে চলেছেন।

Thursday, April 15, 2021

রবার্ট অ্যাডামসনের কবিতা


অনুবাদ: অরিত্র সান্যাল

শীতে, হাসপাতালের বিছানায়


ব্যথা বেদনার বড়িগুলোর ধাক্কায় লম্বা করিডোর দিয়ে

আমি যেখানে এলাম, স্মৃতি সেই ঘর

সবুজ ঢেউয়ের স্বচ্ছ বাষ্পে চড়ে যন্ত্রণা দূরে সরে যাচ্ছিল

কিছু কিছু ছবির ঝলক আসে, চলে যায়


সে বয়সে আমি কবিতা ছাপাবো বলে লিখিনি

তবে, আমার আশেপাশে জীবন যুদ্ধে পিষ্ট হয়ে যাওয়া কিছু পাঠক ছিল  

আমি তাদের মনোযোগ পেতে চেয়েছি

আমার উঠোনে দুশ্চিন্তার মতো ওরা ভেসে বেড়াত


কখনও সিগারেটে টান দিচ্ছি কখনও ইতিউতি দেখছি

কী ভাঙার জন্য আর কী শাস্তি বাকি বা চিত্তবিক্ষেপ

স্মৃতির সূক্ষ্ম ধাতব পাত ভেসে উঠতে থাকে 

মনের উপরিতলে আবার কামড় দেবে বলে


আমার কোনও ধারণা নেই কেন কবিতা আমায় ধরে ফেলল স্কুইডের মতো

মগজ থেকে ঝুলে থাকল দুর্গত আবহাওয়ায়

ভিন পরিবেশে একটা প্রাণী

তার শতাব্দী প্রাচীন জীবন নিয়ে জেগে উঠছে


ভাবনা-চিন্তাকে কালির মতো হতে হবে এবং

হতে হবে এমন যাতে ঝটতি শিকারে টোপের কাজ করতে পারে

কালো চঞ্চুতে আর গভীর থেকে বোধ জেগে উঠবে

সে এক দিন ছিল যখন কবিতা ছিল বুনো জন্তু বশ করার ছল


তখন না ছিল মাছ, না ছিল পাখি তাই

আমি পংক্তি রচনা করেছি তাদের জন্য, জীবন যাদের তিক্ততায় ভরা

চোখ তাদের রোষে লাল চঞ্চল

যখন আগামী কবিতাগুলি আমার জন্য অপেক্ষায় রত



-------------------------------------------------------------------------

কবি পরিচিতি: অস্ট্রেলিয়ার সমসাময়িক কবিতার মানচিত্রে রবার্ট অ্যাডামসন সে ভাষাসংস্কৃতির প্রধানতম কবিদের একজন। জন্ম ১৯৪৩ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ১৯৭০ এ প্রকাশ পায়, ক্যান্টিকলস অন দ্য স্কিন। রবার্টের কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১৬-র বেশি। বিবিধ সম্মানে ভূষিত রবার্ট অস্ট্রেলিয়ার সম্ভ্রান্ত প্রকাশনা সংস্থা পেপার বার্ক প্রেসের কর্ণধার। 

-------------------------------------------------------------------------

অনুবাদকের পরিচয়: কবি এবং অনুবাদক অরিত্র সান্যালের জন্ম ১৯৮৩ সালে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ-- নাবিক বিন্দু থেকে (২০১০), আজ কারও জন্মদিন নয় (২০১৩), নিজের আয়ুর মতো শ্যামবর্ণ (২০১৫) এবং একটা বহু পুরোনো নেই (২০১৮)। সমসাময়িক আমেরিকান কবিদের লেখা অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন – ‘ব্রিজেবল লাইনস’ (২০১৯) গ্রন্থে। এ বছর প্রকাশ পেয়েছে পৌলমী সেনগুপ্তর সঙ্গে যৌথ অনুবাদে কানাডিয়ান কবি আদিনা কারাসিকের কবিতা 'সালোমে বীরাঙ্গণা'।

Tuesday, April 13, 2021

অতিথি বীক্ষণ :: কমলেশ রাহারায়


আমি তার কেমন উত্তরসুরি, একদিন মেপে দেখি

দৈর্ঘ্যপ্রস্থ,মনের ভিতরে ঝিলিক দিচ্ছে রংবেরং মনস্তাপ

আর কোনও অঙ্কিত শব্দ নেই, শূন্য ভাঁড়ার  যেমন

থাকার কথা, প্রারম্ভিক বিষাদে তেমন রক্তমেঘ জমে যায় 

চেনা-অচেনা, দেখা অদেখায় তবু গ্রীবা তুলি 

সবুজ সংকেত পাঠাই, দহনের এই এক পরিণাম


অথচ যে কোনও মানুষ চায় অনুযোগ বাদ দিয়ে জোৎস্নার ভিতর

তার নিজস্ব প্রতিধ্বনি আকাশমাটি জলে স্বপ্নময় হোক

সারাদিন অসম সাহসী এক মেষপালক বধ্যভূমিতে

অন্তত একবার ভাঙাচোরা মুখ আর মাথাটা তুলুক

নিসর্গ শরীরে মানুষের শিরস্ত্রাণ একবার ঝলমল করে উঠুক 

কে না চায় ঝিনুকের ভিতর থেকে উঠে আসুক ব্রতকথা 


মূলত সব যেন অর্গ্যানের সুর, অস্ত্রবিহীন পথ

গোধূলির মাঠ ভেবে দেবদারু অতিথিবীক্ষণ

এতদূর এসে গেছি আমন্ত্রণ ছাড়া ,ভ্রুক্ষেপ করিনি


---------------------------------------------------------

Guest Vision

Kamalesh Raha Roy


How I am his successor, I try to measure;

An absent-minded flower flickers in my mind,

And there are no words drawn, the way an empty storage

Is expected, the way bloody cloud, known unknown,

Overcast, I lift my face to send the greenlight,

This is the consequence of combustion


Still a man wishes his own echo

Reflected everywhere, an intrepid shepherd

Raise his head in the slaughterhouse, his crown

Shimmer in the nature, who does not want 

Folklores from oyster shell!


Chiefly everything sounds like the music from the organ,

A path to walk unarmed, looking at the Deodar guest vision 

and thinking it the field of dusk, I have made so far

Without caring for a call.



Translated by Jagannath Biswas

Painter: Paul Klee

না-পাঠানো চিঠি :: উত্তমকুমার মোদক


ভারতবর্ষের নামে চিঠি পাঠাই এক বিশ্বগ্রাম থেকে

জানি, পরম্পরার ভেতর সব, গ্রিল বসানো ফাঁক

তবু, দেখো, আহ্নিক-একাদশী সারছে কামার্তরা।


একটি অন্ধরাস্তা ধ'রে খুনীরা আসে রক্তমাংস চেয়ে

লালফিতের ফাঁসে কাঁদছে অধিকারের পাখি!

সব প্রবাহের মুখগুলি পরিকল্পিত ঘোরানো!


উৎসের দিকে উল্টো, নামানো থাকছে,পতাকা!

মগজের ভেতর দিয়ে উড়ন্ত ফোরলেন

চাষের ক্ষেতে কর্পোরেটের গুদামঘরের তালা


সংবিধানের ধারায় জমছে পদার্থের রেচন

শাসকের মুখ ঝামলায় নয়া-খনার বচন!





চিত্রকলা: হিরণ মিত্র

Sunday, April 11, 2021

হৃদয় হোম চৌধুরী-র কবিতা


খেলা

আবেগ তোমায় আত্মীয় করেছি

হৃৎপিন্ডে সহস্র শব্দের হাহাকার না হলে দেখতাম

কী করে?

সহস্র সমুদ্রের অমৃতধারা নিয়ে

                   আমার মায়েরা 

হেঁটে গেছে দিগন্তের সূর্যে লাগাম ধরতে 

আর তোমাকে মৌচাকের ঘর গুনে 

জারুল পাতার মাঝে ঘুমোতে দেখেছি রাতে-

বিছানায় নিয়ে এসে

ভালোবাসায় গল্প করার ইচ্ছেটুকু উবে গেছে-

শবের এই শহরে লাশ কম পড়েছিল একবার

বিচ্ছেদী সুরের মতো ভজন বেজেছিল

কফিনের কত সপ্তম পেরেক ফেলে দিয়েছি-- সে সব জানেনি হয়তো কেউ-

শ্মশানে চুল্লি জ্বলে; লাশ সাজিয়ে দিন

আঠারোর জীবনে শেষ খেলা,  দেশ ও জীবনের মিলন


কবি

নদীর কিনারে ফেলা নোঙর-অন্ধ আতুড়ঘরের চিৎকার- 

                      শুনতে চাই না আর।

ভাঙা আকাশের নতমুখ শোকের অবাধ পাথরে

                              প্রেমের খাটিয়া পেতে বিশ্রাম নেয়।

এসবের মাঝেও মনে রেখো

   

ধূসর স্টেশনে আমার পার্থিব দাম্পত্য শেষ হবে আগামীকাল


ফাঁসীগামী আত্মার ক্রন্দনে আয়নার কফিন দেখব--

অন্ধ কালো বিড়াল দু'টি পেছনে ফুঁপিয়ে ওঠে 

পৃথিবীর কখন অসুখ হবে আমি কখন ওষুধ দেব

কখন আমার পায়ের ছাপে পৃথিবীর অঙ্ক কষব 

ওদের পদপিষ্টে ভাঙা ভাতের থালা

কোন বসন্তবিলাপের সঙ্গী হবে!

কবিতা সঙ্গমের জন্য অপেক্ষায় আছি

শেষ সীমান্তে পৌঁছে যাব বলে এসেছি

এখানে কবিরা কি মরুভূমিতে চেরী খায়?


নগ্নপায়ে পলাশের বেড়ি জড়িয়ে পান্ডুলিপির পর পান্ডুলিপিতে কী অক্ষর ছাপেনি ওরা!

Sunday, January 3, 2021

ফের্নান্দো চেইয়ে-র কবিতা

 


অনুবাদ: জয়া চৌধুরী


সাদা রয়ে যাওয়া পাতার গাথা


সাদা রয়ে যাওয়া পাতারা সাধারণত শুভ্র হয়

এবং সাদা রং তার শূন্যতার ইঙ্গিত দেয়

এক এমন শূন্যের কথা বলে যেখানে

অক্ষর, এবং শব্দের অনুপস্থিতিতে থাকে

আলাপচারিতার এক অনন্ত সম্ভাবনা।


সাদা থেকে যাওয়া পাতা

ভাষার প্রতি এক ধরনের আমন্ত্রণ

সে চায় ওরা যেন তাকে অধিকার করে

মহাবিশ্বের ওই অনন্ত শূন্যতা

হৃদয়শূন্য ছিদ্রময় ওই ধাতু

ওই শূন্যের হতভাগ্য অংশটুকুর নিশ্চিতভাবে হয়ে ওঠাকে

ছেড়ে যেতে গিয়ে যে তাকে


অসম্মান করে সাদা পাতা চায় তাকে যেন

অতিক্রম করে যায় ওরা।


অনুতাপ


স্বীকার করছি,

প্রজাপতিদের আমি হত্যা করেছি।

সাধারণত ভাইয়ের সঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম

সূর্য যখন গাছের শাখা ঝলসে

দিতে দিতে দুপুরের ঘুম সারতেন,

সে ঘুম যত ঘন ততই ভাল।

দিন, নিচের দিকে

নদীর বুকে ঢলে

পড়তে পড়তে কষ্ট পায়

টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায় প্রজাপতিতে

ওদের বেশির ভাগই

ছিল হলদে

কমলা ও আরো আরো রঙের

দেখে মনে হত যেন ডানায় আঁকা আছে ঘড়িমুখ ।

অদেখাকে পাশ কাটাতে কাটাতে

উড়ে আসত স্পষ্ট হয়ে

যেন তারা জানত

ওদের জন্যই অপেক্ষমান

দানবাকারের অস্তিত্ব।

তাদের সর্পিল ঋতু জুড়ে

ভঙ্গুর রূপ উপহার দিতে দিতে

আঁকাবাঁকা পথে বেয়ে আসত ওরা

আগাম না দেখেই

ফুঁসে ওঠা প্রকৃতির কারণে

শাখাদের টুপটাপ ঝরে পড়া।


ওরা আসত সৌরতাপের ফুলকি বয়ে

ছন্দহীন নৃত্যে এবং নীরবে

প্রখর আলোয় এক হাস্যকর

হত্যায় ঘটা মৃত্যু হয়ে।

একথা স্বীকার করায় কী দারুণ যন্ত্রণা!

আমি প্রজাপতিদের হত্যা করেছি

এক ঘৃণ্য সৈনিক হয়েছি

রূপের বিরুদ্ধে

যে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র।


জীবন্ত দেহ যা গান গেয়ে চলে


এই অপ্রমাণিত ও প্রাচীন সঙ্গীতই হল

একটি একলা ছোট ছেলের অস্তিত্ব

ফলবান বৃক্ষ ও ফুলভরা গাছময় রোদমাখা উঠোন

যেখানে ধ্বনিত হয় বিশ্বপ্রকৃতির আনন্দময় স্বরকম্প

দূরাগত হালকা বৃষ্টির ছাঁটে নেচে ওঠে ফুল।

কত উদ্বেগের ভেতর কতখানি নিস্তব্ধতা,

বস্তুর সামনে এই অ্যারিস্টটলীয় বিস্ময়,

যেখানে বৃক্ষের আশ্রয়ে হ্রস্ব হয় প্রেম

এবং চলে যেতে যেতে শামুক ফেলে যায় হীরেকুচি।

আমি সেই ছোট ছেলেটি যে জীবিত এবং গান গায়

পূর্বপুরুষের দেয়া এই ভালবাসামাখা ভাষায়

ওঁরা এই স্তবকের স্বপ্নের শেকড় ছিলেন না,

হ্যাঁ তবুও তাঁরা সেই উপযুক্ত মৃত্তিকা জীবনের ঝাপটা আসে যেখানে।

কালো নদীর এক কবি, মৃত্যু অবধি উড়বার জন্য

যেখানে জন্মায় পাখি

কখনো কখনো, থেমে যায়, শব্দের ঘাটে,

এক অনন্ত আঙিনায় ঋতুস্নাত ফুলেদের ওপর।

খুঁজে ফেরা একাকীত্ব, প্রয়োজন, পরিপূর্ণ আলোয় শিশু থেকে

মহাবৈশ্বিক ভাষা থেকে কবি যেখানে পড়েন

বাস করেন আমার সাথে, এমনকি, মাঝরাতে

এবং পৃথিবীর বুকে নিয়ে আসে দুপুরের ঘুমের সুগন্ধ

যখন কেউ ঘুমোয় না, এবং নক্ষত্ররা যায় কেঁপে।

অটুট স্বপ্ন ও নিশ্চিত ভাবনার এক কবি

আমি যার অপ্রমাণিত ও প্রাচীন সঙ্গীতই হল


একটি একলা ছোট ছেলের অস্তিত্ব।


----------------------------

ফেরনান্দো চেইয়ে: কবি, গদ্যকার, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য-সমালোচক এবং স্টাইল-সংশোধক ফেরনান্দো চেইয়ের জন্ম ১৯৭৬

সালে উরুগুয়ের মেরসেদেস শহরে। “আঁকা পাখিদের কবিতা”, “লিখনভাষ্য ও স্টাইল সংশোধন-এর জেনারেল

কোর্স” “রিও দে প্লাতার ভূতের গল্প” “শব্দের দেয়াল” ইত্যাদি প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১০ টি।

কলম্বিয়ার গোল্ডেন বুক অফ দ্য ইয়ার(২০১৯), সাহিত্য সম্বন্ধীয় প্রবন্ধের জন্য জাতীয় পুরষ্কার

(২০১৭ এবং ২০১৯) ইত্যাদি অসংখ্য পুরষ্কারে সম্মানিত।

---------------------

জয়া চৌধুরী মূলতঃ অনুবাদক। মূল স্প্যানিশ ভাষা থেকে বাংলায় প্রকাশিত উপন্যাস, নাটক, ছোট গল্প,

কবিতার এতাবৎ ১০টি অনূদিত বই ও বাংলায় মৌলিক উপন্যাস একটি ও কবিতার বই দুটি প্রকাশিত।

ভারত বাংলাদেশ আমেরিকা প্যারাগুয়ে কিউবা আর্জেন্টিনা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ব্লগে

নিয়মিত অনুবাদ ও মৌলিক লেখা প্রকাশ করে থাকেন। প্রিয় শখ সেতার বাজান। স্প্যানিশ ভাষা শেখান

রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল অফ ল্যাঙ্গুয়েজ এবং সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ।

Wednesday, December 16, 2020

কালীঘাটের মেয়ে পরিণীতা

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায়: তখনও বেশি রাত হয়নি। দুর্গাপুর হাইওয়ে দিয়ে ফিরছি। আমরা জনা চারেক। একটা ধাবা দেখে গাড়ি দাঁড় করালাম। এখানে বেশ ভিড়। তবে বাইরে খোলা আকাশের নীচে চেয়ার-টেবিল পেতে বেশ গুছিয়ে রেখেছে ধাবা মালিক। চারটে চায়ের অর্ডার দিয়ে আমরা গল্পগুজব করছি। আমাদের লাগোয়া টেবিলে এক দম্পতি বসে। সঙ্গে আট-দশ বছরের একটি কন্যা। সে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে লক্ষ করি কন্যাটির মা আমার দিকে তাকাচ্ছে– যেন কিছু বলতে চায়! আমারও চোখটা ক্ষণে ক্ষণেই সেই মহিলার দিকে অজান্তে চলে যাচ্ছে। বলতে গেলে একটু অস্বস্তিই হচ্ছে। এইভাবে চলে কিছুকাল। তারপর ওই ভদ্রলোক ধাবার ভিতরে ঢোকে, হয়তো কিছু নতুন অর্ডার করতে, তখন হঠাৎই সেই মহিলা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছু বোঝার আগেই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলে, ‘স্যার ভালো আছেন?’ আমি তো যাকে বলে হতভম্ব! কে এই মেয়ে, কীভাবেই বা আমি তার স্যার হলাম তা কোনও অনুমানেই বুঝতে পারছি না। কোনও ভাবেই মেলাতে পারছি না। একবার মনে হল, কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডিজের ছাত্রী ছিল কিনা। তা-ও হতে পারে না। কেননা গত দশ বছর যে সব ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়েছি তাদের প্রত্যেকের মনে আছে– যাদের আমি নামে চিনি। এখনও আমি স্মৃতিভ্রষ্ট হইনি। তবে কে এই ছাত্রী?

এরপর আমার অবস্থা মালুম পেয়ে মেয়েটি বলে, ‘চিনতে পারছেন না স্যার? আমার নাম নীতা। আপনি আমাকে পরিণীতা বলে ডাকতেন– কালীঘাট। এই ‘কালীঘাট’ শব্দটির সঙ্গে যেন কয়েক কোটি ক্যালেন্ডারের পাতা আমার চোখের সামনে ঝরে পড়ল। আমি যেন ফিরে গেলাম সাতাশ-আঠাশ বছর পিছনে। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতার উপান্তে। বস্তি সংগঠনের এক নেতা সেই সময় আমাকে পটিয়ে ফেলেন যে, সরাসরি মানুষের জন্য কিছু করতে হবে, যারা সমাজে পিছিয়ে আছে। শুধু তাই নয়, তাদের জন্য কাজ করার লোক নেই। তো কী সেই কাজ? ঠিক হল কালীঘাটের নিষিদ্ধ পল্লিতে যে শিশু-কিশোররা আছে তাদের পড়ানোর দায়িত্ব নিতে হবে। এদের মধ্যে কিছু ছেলে মেয়ে স্কুলে যায় বটে কিন্তু পড়াশোনায় মন নেই। এদের উৎসাহিত করতে হবে। আমার সেই বয়সে এমন ধরনের কাজে নিযুক্ত হওয়াকে বেশ গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করলাম। সপ্তাহে দুদিন পড়াতে হবে। ফলে তেমন কোনও চাপ নেই ভেবে শুরু করে দিলাম।

চাপ কি আর ছিল না? টালিনালার ধারে যাকে বলা যায় আদি গঙ্গা, তার দূষিত জলে, পচা গন্ধে জায়গাটা ম ম করছে, একটা চালাঘরের মাটির দাওয়ায় প্রাথমিক ভাবে প্রায় জনা আটেক বাচ্চাকে নিয়ে আমার ক্লাস শুরু হল। চারদিকে মাছি ভন ভন করছে। দুর্গন্ধে প্রথম প্রথম বমি পেত। চারদিকের আবহ যাকে বলে মদোমাতাল আর কাঁচা খিস্তির বন্যায় রচিত হয়েছে। এখানে কেউ সোজা বা যাকে বলে সাধারণ ভাষায় কথা বলে না। সবাই উদমার্গের খিস্তি সম্বলিত ভাষাতেই অভ্যস্ত। এমনকী বাচ্চা-কাচ্চাদের সঙ্গে সেই একই ভাষায় কথা বলছে বড়োরা। প্রথম দিকে মনে হত এসব বন্ধ করতে হবে। মাথা গরম হয়ে যেত। কিন্তু ক্রমে অভ্যস্ত হয়ে যাই। সেই দাদা নেতাটি আমায় বুঝিয়েছিলেন, ‘আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। এখানকার তাবৎ পরিবেশ পালটানো তোমার কাজ নয়। আর তা পারবেও না। আমরা যদি এই বাচ্চাগুলোকে একটু লেখাপড়া শেখতে পারি তো জানবে বিরাট কাজ করা গেল।’ কথাটার যৌক্তিকতা আমার মনে ধরেছিল। ফলে বছর খানেক টানা টালিনালার পাশে এইসব বাচ্চাকাচ্চাদের পড়িয়ে গেছি। এদের লোক না হয়েও। কোথাও পুলিশ ঝামেলা করছে, কোনও খদ্দের মদ খেয়ে এসে হুজ্জুতি করছে, কার পালিয়ে যাওয়া বর এসে হুজ্জুতি করছে তার গতর খাটিয়ে বউ-এর কাছে, কে কাকে মারল ধরল, সব কিছুর মধ্যে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়তে থাকলাম। কিন্তু আমার মূল কাজ ছিল সপ্তাহে দুদিন এই তথাকথিত বাপহারা ছেলে মেয়েদের পড়ানো। ‘বাপহারা’ কথাটা লিখলাম এই কারণে যে, প্রায় প্রত্যেকটি ছেলে মেয়ে জানে না বা তাদের জানানো হয় না যে কে তার বাবা, কী তার নাম। কখনও কখনও মায়েরা মিথ্যে নাম বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হয়েছে যখন এরা স্কুলে ভরতি হতে গেছে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সব সময়েই বাপের নামটাই প্রধানত গ্রাহ্য করা হয়, ফলে তৈরি হয়েছে নানা জটিলতা। আর তখন তো আইন-কানুনও এখনকার মতো হয়নি।

এখানে এইসব শিশুকিশোরদের পড়াতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি, বিশেষ করে এই স্কুলে ভরতি করার সময়। আজকে প্রচুর না হলেও অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকলেও বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এদের জন্য লাগাতার কাজ করে যাচ্ছে। সে-সময় এই ধরনের কিছু সংগঠন থাকলেও তা যে খুব উচ্চকিত ছিল তা নয়। হয়তো সম্ভবও ছিল না। সে যাই হোক, এই ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার মধ্যে ধরে রাখাই ছিল একটা বিরাট কষ্টসাধ্য কাজ। কেননা মায়ের খদ্দের এলে তার মদটা, সিগারেটটা, খাবার-দারারটা নিয়ে এলেই কাঁচা পয়সা পাওয়া যায়। আর ওদের পড়াশোনা করার সময় ছিল সন্ধেবেলা। সে সময় তো এই অঞ্চল গমগম করছে।তখন কি আর পড়াশোনায় মন বসে! এদের মধ্যে অনেকেই ছিল লেখাপড়ায় বেশ ভালো, চটপট বুঝতে পারতো। কেউ কেউ একটু পিছিয়ে থাকা। তার করণটাও সহজেই বুঝে ফেলি। যে অবহেলায় ও মানসিক নিপীড়নের মধ্যে এরা জন্মায়, বড়ো হয়ে ওঠে– তাতে এই ধরণের সমস্যা খুব স্বাভাবিক। যেমন, আগেই বলেছি যে, একমাত্র মা-ই এদের ভরসা। তথাপি সেই মা যে তার ছেলে কিংবা মেয়ের জন্য খুব একটা কিছু করতে পারে তা নয়। নিদেন দুবেলা খাওয়াও অনেকের জোটে না। তারপর আছে রোগভোগ। আপাতত ফিরে যাই সেই কালীঘাট থেকে উঠে আসা নীতার সঙ্গে দেখা হওয়া প্রসঙ্গে।

কালীঘাট শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার পর যথারীতি আমি নীতাকে চিনতে পারি। বলি, ‘কেমন আছিস মা?’ বেশ গর্বের সঙ্গে সে বলে, ‘খুব ভালো আছি স্যার।’ মেয়েকে দেখিয়ে বলে, ‘এই আমার মেয়ে, আর ওই উনি হলেন আমার স্বামী।’ ইতিমধ্যে নীতার স্বামী ধাবা থেকে বেরিয়ে আসে। নীতা বলে, ‘ইনি, সেই স্যার, আমাদের কালীঘাটে পাড়াতেন।’ বুঝলাম, ছেলেটি আমার নাম পর্যন্ত জানে। স্বামী হাত মুখ ধুতে গেলে নীতাকে জিজ্ঞেস করি, ‘হ্যাঁ রে, পড়াশোনা কতটা করতে পড়েছিলি?’ নীতা এক গাল হেসে বলে ‘হায়ার সেকেন্ডারি অব্দি কিন্তু তারপর আর হল না। সংসার, মেয়ে সব সামলে আর পড়া হয়নি।’ ক্রমে সে চাপা গলায় শুরু করল তার জীবনবৃন্তান্ত। এই ছেলেটি নাকি ছিল তার মায়ের খদ্দের, প্রায়ই আসত। বয়সে প্রায় পনের বছরের বড়। সে-ই নাকি তার মাকে বুঝিয়ে নীতাকে বিয়ে করে। পাইপের ব্যবসা করে। আজ তার ব্যবসা বেশ জমে উঠেছে; বোঝা গেল সঙ্গের গাড়িটা দেখে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোর মা-র খবর কী?’ নীতা ছলছলে চোখে জানায়,’কঠিন ব্যাধিতে মারা গেছে।’ শেষ বয়সে আমার কাছেই থাকত। আর কটা দিন আগে মাকে নিজের কাছে নিয়ে এলে হয়তো বাঁচাতে পারতাম।’ এ তো প্রায় হিন্দি ছবির মিলানন্তক কাহিনি। তা হোক, আমায় কেন জানি একটা তৃপ্তির হাওয়া ছুঁয়ে গেল। ওরা পয়সা মিটিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমি খনিকক্ষণ স্মৃতির মেঘের মধ্যে যেন ডুবে গেলাম। এই রকম তো আরও ছাত্রছাত্রীরা ছিল। তাদের কী হল? তাদের সঙ্গে কখনও কি দেখা হয়ে যাবে! আজও তার অপেক্ষায়ই আছি।

Sunday, December 6, 2020

ল্যান্ডরে, রাস্কিন বন্ডের আইভি কটেজে


শিবু মণ্ডল: একটা শৈলশহর থেকে পর্যটক যখন অন্য শৈলশহরে যায় তখন তার কাছে দুটো অপশন থাকে– হয়তো সে কিছুটা উষ্ণতা রেখে যাবে নয়তো কিছুটা বাড়তি উষ্ণতা নিয়ে যাবে। এর আগে মুসৌরি তিনবার গিয়েছি কিন্তু ভালো লাগেনি। কেন যে শুধু শুধু দার্জিলিঙের তুলনা চলে আসত। ঘরের শহর বলেই কিনা, কে জানে! মাঝে ঋতুর ব্যবধান না থাকলেও, স্মৃতির ব্যবধান থেকে যায়। এই পার্থক্য একটা দূরত্ব তৈরি করেছিল আমাদের মধ্যে। কিন্তু এবার মুসৌরি এলাম নিজে ড্রাইভ করে। মনে হল যেন স্বপ্নে দেখা এক নৌকো চালিয়ে স্মৃতির স্রোতে ভেসে ভেসে চলে এলাম। গাড়িটি কেনার পর থেকে তাকে নৌকো ভাবতেই বেশি ভালো লাগে। আর যে কোনো ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনার স্মৃতিকে স্বপ্ন বলে ভ্রম হয়। কেনো যে এমন মনে হয় জানি না! তবে আমার ঠাকুরদার একটা ছোটো ডিঙি নৌকা ছিল দেশের বাড়িতে- ঠাকুরমার মুখে শুনি। ঠাকুরদাকে আমি দেখিনি। তবে মাঝে মাঝে কল্পনায় আসে একটি নদীঘেরা গ্রাম। বর্ষাকালে উঠানে হাঁটুজল। দাদু নৌকোয় বসে মাছ ধরে। ‘ইচ্ছা হইলে ঢাকা শহরে কামে যাইত। ইচ্ছা হইলে যাইত না- নাও নিয়া বাইরইয়া পড়ত।’- কথাগুলো বলার সুরে বিরক্তি ঝরে পড়লেও দীর্ঘশ্বাস লুকোতে পারে না আমার ঠাকুমা। আচ্ছা দাদু কি মৃত্যুর পরেও নৌকো চালান? যদি তাই হয় তবে তো সে নৌকো নিয়ে সব জায়গায় যেতে পারবেন। পাহাড়েও! আমিও মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখি নৌকো নিয়ে হিমালয়ে চলে গেছি ঈশ্বরের খোঁজে।

রাস্কিন বন্ডের সঙ্গে দেখা হতে পারে এই ভেবেই হোটেল নিয়েছিলাম ল্যান্ডরের কাছাকাছি। যে পাহাড়ে আমাদের হোটেল তার উল্টোদিকের পাহাড়ের শিরদাঁড়ার একপ্রান্তে দেখা যাচ্ছে সেই আইভি কটেজ। নেট ঘেঁটে আগেই সেই ঠিকানা জেনে নিয়েছিলাম। এত জনপ্রিয় ও ভালবাসার সৃষ্টিকর্তা যে আমার ঘরের কোণেই চুপটি করে বসে আছেন ভাবতে অবাকই লাগে। হরিদ্বার থেকে মুসৌরির দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিমি। আর মুসৌরি থেকে ৮ কিমি পুব দিকে গেলেই তার যমজ শহর ল্যান্ডোর। সেদিন পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে গিয়েছিল। পরদিন সকাল নটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম হোটেল থেকে সবাই। দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছেও গেলাম আইভি কটেজের সামনে। নৌকার গলুইয়ের মতো বাড়িটির দুপাশে দুটি রাস্তা উঠে গেছে লালটিব্বা ভিউ পয়েন্টে। কিন্তু বাড়ি কোথায়? এ তো একটি তিব্বতি সরাইখানা। নাম ডোমা’স ইন! দেয়ালে তিব্বতি সংস্কৃতি ও বৌদ্ধধর্মের নানা রংবেরঙের চিত্রকলা অঙ্কিত বাড়িটি অনেক দূর থেকেই নজর কাড়ে। ডোমাস ইনের পিছনেই সাদা চুনকাম করা ছিমছাম একটি তিনতলা বাড়ি। জানালার বর্ডার ও টিনেরছাদ মেরুন রঙে রাঙানো। বাড়িটির অন্য পাশ দিয়ে রাস্তা থেকে পাহাড়ের গা ঘেঁষে সরু একটি সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়।

জানা ছিল মুসৌরির ম্যাল রোডের কেমব্রিজ বইয়ের দোকানে প্রতি শনিবার বিকেল ৪ টে থেকে ৬ টা পর্যন্ত রাস্কিন বন্ড পাঠক ও টুরিস্টদের সঙ্গে সময় কাটান। উৎসুক ও মুগ্ধ পাঠকেরা তাঁর অটোগ্রাফ নেয়, তাঁর সাঙ্গে ছবি তুলে ঈশ্বর দেখার মতো আনন্দ পায়। শৈশব ও কৈশোর থেকেই যার গল্প পড়ার পর চারপাশের চেনাজানা জীবন ও চরিত্রগুলিও যেন সেই গল্পের মতো লাগতে শুরু করে। চারপাশের অকিঞ্চিৎকর মানুষের জীবনও কত সুন্দর, কত মায়াময় হয়ে ওঠে তাঁর বই পড়ার পরে। মুসৌরি ও দেরাদুন হয়ে ওঠে পাঠকের স্বর্গ ও স্বর্গের দ্বার। এমনই সুন্দর ও সহজ অথচ কত গভীর শব্দ দিয়ে গড়া তাঁর সাহিত্যের জগৎ! এমন এক ধ্রুপদী লেখকের সান্নিধ্য পেয়ে পাঠকেরা আত্মহারা হবেন এটাই স্বাভাবিক। মনে পড়ে যেদিন পৌঁছলাম দিনটি ছিল রবিবার। সন্ধেবেলা ম্যাল রোডে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পেলাম দোকানটি। সামনে বড় একটি ব্যানারে রাস্কিন বন্ডের ছবি। দোকানটির যে র‍্যাকে তাকাই শুধু রাস্কিন বন্ডের বই। সর্বাগ্রে জ্বলজ্বল করছে রাস্কিন বন্ডের আত্মজীবনী ‘Lone Fox Dancing’! এক বছর আগেই বেরিয়েছে। এদিকে শিখা আগামীকাল আমার জন্মদিনের জন্য একটি পছন্দসই গিফট খুঁজছিল। বইটি দেখেই বললাম এটি আমায় গিফট দেবে? দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম লেখকের অটোগ্রাফ পেতে পারি কিনা। দোকানদারের বই বিক্রি দিয়ে কথা। অটোগ্রাফ তো উনি বিক্রি করেন না। তবু সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন কাল একবার ওনার বাড়ি চলে যান বইটি নিয়ে অটোগ্রাফ পেয়ে যাবেন। মনে মনে ভাবছি, ওনার মতো লেখক কি বিনা অ্যাপেয়ন্টমেন্টে দেখা করবেন? তাও আবার আমার সঙ্গে? আচ্ছা ওনার ফোন নম্বরটা দিন না! দোকান মালিক ফোন নম্বর দিতে চাইছেন না। বলল ফোন করার দরকার নেই উনি এমনিই দেখা করেন। সকালের দিকে চলে যাবেন। শেষে জোরাজুরি করাতে একটি ল্যান্ডফোনের নম্বর দিলেন।

সিঁড়ির বাইশটি ধাপ উত্তরণের পর যে ঘরটির সামনে এসে দাঁড়ালাম তার দরজায় কাঠের ফলকে লেখা রাস্কিন বন্ড, নিচে রাকেশ, বীণা। বিগত চল্লিশ বছর ধরে এই বাড়িতেই থাকেন রাস্কিন বন্ড তাঁর পরিবারের সঙ্গে! রাস্কিনের জন্ম হিমাচলের কসৌলিতে হলেও প্রায় ৬৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেরাদুন ও মুসৌরিতেই কাটিয়েছেন। যদিও যৌবনের প্রথমদিকে ভাগ্যসন্ধানে বছর তিনেক ইংল্যান্ডে ও পড়ে ফিরে এসে চাকুরিসূত্রে দিল্লীতে চার বছর কাটান। শেষে চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে সমস্তরকম উচ্চাশা ত্যাগ করে শুধু লেখালেখিকেই আঁকড়ে ধরতে চাইলেন। সব ছেড়ে পালিয়ে গেলেন হিমালয়ের নির্জনতায়। ১৯৬৩ থেকে পাকাপাকি ভাবে থেকে গেলেন মুসৌরিতে। সঙ্গী শুধু এক বালক, প্রকৃতির নির্জনতা আর সেই নির্জনতা ভঙ্গকারী টাইপরাইটারের শব্দ! সবুজ দরজাটির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবছি ডোরবেল বাজাবো কিনা। ৮৫ বছরের রাস্টি হয়তো তার ছাদের ঘরে বসে কোনও গল্পের প্লট ভাবছেন। অথবা অতীতের স্মৃতিচারণায় মগ্ন। আবার ডোরবেলের কর্কশ শব্দে তার মগ্নতা ভেঙে না-যায়! যদি বিরক্ত বোধ করেন? 

সেই ভেবেই স্ত্রী শিখা ও আমাদের দুই সন্তানকে সঙ্গে আনিনি। ওদের নীচের রেস্টুরেন্টে অপেক্ষায় রেখে এসেছি। ডোরবেল না বাজিয়ে দরজায় কান পাতি যদি তাঁর টাইপরাইটারের খটাখট শব্দে কোনও গল্পকথা ভেসে আসে। না তাও আসছে না। নার্ভাস আঙুলে আলতো করে দরজায় টোকা দিলাম। কেউ শুনতে পেল কি? না। মৃদু আওয়াজে ডাকলাম মিঃ বন্ড বাড়ি আছেন? মিঃ বন্ড শুনতে পাচ্ছেন! আমি একবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই! না কেউ শুনতে পেল না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বাইশটি ধাপ গুনে গুনে আবার নিচে নেমে এলাম। এবার হয়তো আর সাক্ষাৎ হল না। মোবাইল বের করে রাস্তা থেকে বাড়িটির কয়েকটি ছবি তুলে রেস্টুরেন্টের দিকে ফিরছি এমন সময় দেখি একজন বাড়িটির দিকে আসছে। লোকটি কি এই বাড়ির কেউ? নাকি কোনও কাজে এসেছে? জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলাম তিনি স্থানীয় পৌরসভার সাফাই কর্মচারী। বাড়ি বাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করা ও সাফাই করা তার কাজ। রাস্কিনের বাড়িতেই যাছে সাফাইয়ের কাজে। এই তো সুযোগ। লোকটিকে অনুরোধ করে যদি বাড়ির কারোর সঙ্গে কথা বলা যায়। কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারলাম লোকটি মদের নেশায় একটু মাতাল হয়ে আছে। গুরুত্ব দিয়ে তার নামধাম সাকিন ঠিকানা জানতে চাইতেই রাস্তার ধারে নিয়ে আমার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলো। নাম মুকেশ। আদতে বিহারের বাসিন্দা। তবে ছোটবেলাতেই কাকার সঙ্গে মুকেশ চলে আসে মুসৌরি রোজগারের উদ্যেশ্যে। তারপর এখানেই সংসার পেতে ছোটো একটি ভাড়াবাড়িতে বাস করছে। ছোটখাটো কালো দেখতে মুকেশের চেহারায় বেশ একটা পরিপাটির ছাপ আছে। ব্যাকব্রাশ করা চুলে তেলের গাঢ়তা চিকচিক করছে। তবে পরনের সবুজ টিশার্টটি ওদের ইউনিফর্ম। শেষে ওর কাজের কথা ভুলে আমাকে রাস্কিনের সঙ্গে দেখা করানোর জন্য যেন পণ করে বসল। 

আমাকে নিয়ে গেল বাড়িটির নিচের তলায় একটি অপ্রচলিত ছোটো দরজার কাছে। সেখানে ডোরবেল টিপতেই যে লম্বা মতন তরুণ বেরিয়ে এলেন দেখে তাঁকে রাকেশ বলেই মনে হল। আমার আসার কারণটি জানতে চাইল। তারপর স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বলল‘রাস্কিন তো এখন বাড়ি নেই।’ আমি বুঝতে পারলাম একজন সাধারণ দর্শন প্রার্থীকে এড়িয়ে যাবার সবচেয়ে সহজ পন্থাটিই আমার উপরে প্রয়োগ করেছেন তিনি। তাঁকে অনুরোধ করে বললাম যে ওঁনার একটি অটোগ্রাফ নিয়েই চলে যাবো। সে বলল ঠিক আছে আমাকে বইটি দিন আমি অটোগ্রাফ নিয়ে আসছি। ‘মিঃ রাকেশ বহুদূর থেকে এসেছি আমি শুধু ঈশ্বরতুল্য প্রিয় লেখকটিকে একবার নিজের চোখে দেখব বলে। বাংলা থেকে এসেছি কাল। আগামীকাল চলে যাবো হরিদ্বার। বাড়ির দোরগোড়ায় এসেও যদি দেখা না করে ফিরে যাই খুবই মনখারাপ হয়ে যাবে।’ অগত্যা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে একটি ইমোশনাল পরিবেশ সৃষ্টি করতেই হল। মুহূর্তক্ষণ চেয়ে থেকে সে বলল আচ্ছা দাঁড়ান, আমি একবার জিজ্ঞেস করে আসছি। কিছুক্ষণ বাদেই রাকেশ এসে বলল ‘বাইরের সিঁড়িটি দিয়েই দোতলার ঘরে চলে আসুন। তবে পাঁচ মিনিটের বেশি সময় নেবেন না।’ আহ্‌! কি স্বস্তি যে পেলাম।

অতি সাধারণ অপরিসর এক ড্রয়িং রুম থেকে একটি কাঠের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে তিনতলায়। সিঁড়ির নিচে একপাশে একটি ছোটো আলমারি ভর্তি বই। দুয়েকটি ছোটো টেবিলেও বই ও পত্রপত্রিকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আলমারিটির উপরে একপাশে বাগ্‌দেবীর ছবি, পাথরের একটি বুদ্ধমূর্তি, তারপর ভগবান বালাজির ছবি, আর পিছনের দেওয়ালে পূর্ণিমা রাতে নৃত্যরত একটি লাল রঙের পাহাড়ি শিয়ালের অপূর্ব ছবি। আর আলমারির সামনে একটি সোফায় যিনি বসে আছেন তিনি ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের সম্রাট রাস্কিন বন্ড। অনেক পাঠকের কাছেই তিনি দেবতা স্বরূপ। তবে আমার মনে হল দেবতা নন যেন একটি দেবশিশু বসে আছেন। জামনগর এস্টেটের গৃহশিক্ষকের সেই চার-পাঁচ বছরের দুষ্টু, গোঁয়ার শিশু সন্তানটি যার মনে চারপাশের সম্বন্ধে শুধু প্রশ্ন আর প্রশ্ন ছিল সেই শিশুটিই বিগত ৭০ বছর ধরে একের পর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি করে গেছেন। বিস্ময় তাঁর গল্পের মধ্যে নয়, কাহিনির মধ্যে নয়, বিস্ময় তাঁর গল্প বলার ভাষায়, তার সহজতায়। আজ তাঁর মনে আর সেই জিজ্ঞাসা নেই তার মানে এই নয় যে ফুরিয়ে গেছে। ছোটো চঞ্চল একটি পাহাড়ি ঝরনা ৮৫ বছর ধরে নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বইতে বইতে যেন এক সাগরে এসে নিজেই সাগরে পরিণত হয়ে গেছে। সেই গভীরতা সেই তরঙ্গের ঘাত আমরা বাইরে থেকে বুঝতে পারব না। তাঁর সাহিত্যপাঠের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আমরা সেই ঘাত প্রতিঘাত অনুভব করি। একটি অতি তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর জীবনেরও যে সব মানবিক অনুভূতি- বেদনা, বাসনা, দ্বিধা,দ্বন্দ্ব,কিছু হারিয়ে ফেলবার ভয়, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা সব, সব এই মহাজীবনের হৃদয়ে, তাঁর দেখার মধ্যে, তাঁর লেখার মধ্যে সমাহিত হয়ে আছে। শুধু অনুভবি পাঠকই নন, অতি সাধারণ পাঠকও সেই অনুভূতির তরঙ্গকে তার গভীরতাকে ছুঁয়ে ফেলতে পারে। 

-ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

-আসলে সে সম্পর্কে আমি ভাবিনি কখনও। 

যে সারাজীবন ধরে ছোটো, বড়, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে শুধু মানুষের জীবনকে দেখে গেছে, তাদের হৃদয়ের কথাগুলি ভেবেছেন তাঁর আর ঈশ্বরের কথা ভাববার প্রয়োজন কী!

লেখা প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা বলি। সেদিন আমার সাত বছরের কন্যা সৃজা পাশের আবাসনের তার সমবয়সি একটি বাচ্চার সঙ্গে ক্লে দিয়ে মূর্তি বানিয়ে খেলছিল। বাচ্চাটি একটি চারহাতওয়ালা গণেশের মূর্তি বানাতেই সৃজা প্রশ্ন করল চার হাত কেন ওঁর? বালিকাটি বলল গনেণেশজি ভগবান, তাই ওঁর চারটি হাত। উত্তরে সৃজা সন্তুষ্ট হতে পারল না। সে তার খেলার সঙ্গীটিকে বোঝানোর চেষ্টা করল। বলল যে-- ভেবে দেখ ভগবান নিজে যেমন হবে সে মানুষকেও তো ঠিক তেমনই বানাবে। তাহলে মানুষের দুটি হাত হলে ভগবানের চারটি হাত কেমন করে হতে পারে?

কথাটি ভীষণভাবে আমাকে ছুঁয়ে গেল। আর এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আজ রাস্কিনের সেই মতামতটির সারমর্ম আমি টের পাচ্ছি।

খুব সাধারণ কথাবার্তাও হয়েছিল আমাদের মধ্যে সেদিন। সাহিত্য নিয়ে। আমি যে বাঙালি ও বাংলা সাহিত্য নিয়ে একটু আধটু চর্চা করি সেটা জানতেই রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ এলো। নিজেই জানালেন তাঁর প্রিয় লেখকদের মধ্যে রবিঠাকুর অন্যতম। ইংরেজি অনুবাদে তিনি পড়েছেন রবীন্দ্র সাহিত্য। চাকুরীসূত্রে হরিদ্বারে থাকি জেনে হরিদ্বারের প্রসঙ্গও এলো। বিশেষ করে এখানকার ফরেস্ট ও লেপার্ডের কথা। তবে তিনি যে লেপার্ডের কথা বলেছিল সেগুলি নিশ্চয়ই একপ্রকার নিরীহ ও মানুষের প্রতি অহিংস ভাব পোষণ করতো। অনেকটা তাঁর গল্পের মতো। কিন্তু আমাদের এই সাক্ষাৎকারের ছয়মাস পরেই আমার সেই ভুল ভেঙে যাবে। আমাদের ভেলের আবাসিক এলাকার মধ্যেই যখন দু’দুটি মানুষ লেপার্ডের আক্রমণে শুধু ক্ষতবিক্ষতই হবে না, অভাবনীয় ভাবে তারা সেই লেপার্ডটির শিকারে পরিণত হবে। আর আবাসিকদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টিকারী সেই চিতাটি (একটি না হয়ে দুটি ঘটনায় দুটি ভিন্ন ভিন্ন চিতাও হতে পারে) উত্তরাখণ্ড সরকার দ্বারা মানুষখেকো উপাধিতে ভূষিত হবে এবং মাস চারেকের মধ্যেই বনবিভাগের দ্বারা ভাড়া করা শিকারির গুলিতে সেটির মৃত্যু হবে। যাইহোক এই বন ও বন্যজন্তুদের প্রতি তাঁর অকৃত্তিম সনহানুভুতির কথাও আমরা পড়েছি। 

আধুনিক উন্নয়নের ফাঁদে পড়ে হরিদ্বার-দেরাদুন-মুসৌরির কত কত বনাঞ্চল পাকাপাকি ভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে আমরা জানি। রাস্কিন কিন্তু সেই উন্নয়ন মেনে নিতে পারেননি। নতুন নতুন রাস্তাঘাট ও নানা পরিযোজনার জন্য যে লক্ষ লক্ষ গাছ কাটা গেছে, যেসব হাজার হাজার পাখি ও বন্যজন্তুরা গৃহহারা হয়েছে তাদের কান্না, হাহাকার রাস্কিনের লেখায় ফিরে ফিরে এসেছে। আজও তাঁর নিশ্চল (নাকি ছলছল) চোখদুটি মনে করে বুঝতে পারছি সে কতটা বেদনার্ত হয়ে পড়েছিল সেই হারিয়ে যাওয়া দৃশ্যগুলি মনে করে। যতই সে বলুক যে এই দীর্ঘ জীবনের প্রতি তাঁর কোনও অভিযোগ নেই তবুও আমার বারবার মনে হয় এই বন, এই পাহাড়, তার ঝরনা, এখানকার পশুপাখি, সঞ্চরণশীলমেঘ-বৃষ্টি-কুয়াশা-ছায়া-রোদ প্রকৃতির এইসব কিছুই এখানকার মানুষের মতই তাঁর জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আর এই অংশে যখন যখন লোভী সমাজ তার করাল হাত বাড়িয়েছে তখনই সে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কাটা পড়া গাছেদের কান্না, বাসাহীন পাখিদের ছটফটানি, গৃহহীন পশুদের ভয়ার্ত চাহনি, কুয়াশার চলমানহীনতা, রোদের পাগলামি, ছায়ার অন্ধকার আর বৃষ্টির প্রতিশোধ তার লেখার চরিত্র হয়ে উঠেছে। গোঁয়ার রাস্টিও যেন প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে এই নোংরা ও বদ উপায়ে প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী সমাজের প্রতি। 

সেই জন্যই কি ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ও বেস্টসেলার লেখক হয়েও টাইপরাইটার থেকে কম্পিউটারে, ল্যান্ডফোন থেকে মোবাইলে (স্মার্ট ফোনের তো কথাই নেই) আর হাত বাড়াননি তিনি? মাত্র সতেরো বছর বয়সে যে ছেলেটি ভাগ্য সন্ধানে বিলেতে গেল, উন্নত ভবিষ্যতের হাতছানি উপেক্ষা করে তিন বছর পরে সে একপ্রকার পালিয়ে এল নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসার টানে। তারপরে আবার মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সেই দিল্লির সম্পন্ন চাকরি ছেড়ে দিলেন পাকাপাকিভাবে। আশ্রয় নিলেন পাইন, ওক, স্প্রুস, ম্যাপল বনে ঘেরা মুসৌরির একটি নির্জন কটেজে (১৯৬৩ সাল নাগাদ যখন রাস্কিন পাকাপাকিভাবে মুসৌরিতে থাকতে এনেল তখন ম্যাপলউড কটেজের একটি রুমেই প্রথম ভাড়া থাকতেন)। এহেন রাস্কিন বন্ডকে ভারতের ভূমিপুত্র বলতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা কিংবা সংকোচ নেই। অথচ তাঁকেই ভিন্ন ধর্মের ও বিদেশি বিচার করে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, কোণার্কে বিদেশিদের জন্য ধার্য অতিরিক্ত প্রবেশ শুল্ক আদায় করে তবেই দর্শন করতে দেওয়া হয়। হায় রে আমার ভারতবর্ষ!

সেই জন্মদিনটিতে যে আবেশ নিয়ে ফিরেছিলাম তার সুগন্ধ সারাজীবন আমাকে সুবাসিত করে রাখবে। একটা স্বপ্ন থেকে ছবি,সেই ছবি থেকে বৃষ্টি! ঘর ভেসে যায়। ভেসে যাচ্ছে কাগজের নৌকা। আমি কি তুলে নেব? আমি কি ভেসে যাবো এতে আরোহণ করে আরও উপরের দিকে? নাকি এখান থেকেই নামতে শুরু করবো ঘরের দিকে! একটা সংক্ষিপ্ত অথচ মহাবিস্ফোরণকারী আলাপ থেকে আমি হাঁটা শুরু করি একলা নিঃসঙ্গ পথে। এর আগে তিন তিনটি সফরেও যে শহর আমার কাছে রুক্ষ হয়ে ছিল। আমার অতীত গল্পের কাছে ধূসর প্রতীতি হয়ে ছিলো সে শহরের এক গোপন সুড়ঙ্গ আমি খুঁজে পেয়েছি। যার মাধ্যমে সেই অতীতের সাথে যোগসূত্র গড়ে তুলতে পারি। এদিকে ঝরনার পাগলামি এসে ধুয়ে মুছে দিচ্ছে এর নাগরিক কোলাহল। আমি ট্রাফিক জ্যাম থেকে মুক্ত হয়ে প্রাচীন ঘণ্টাঘরের ধ্বনির কাছে ঋণী হতে যাব এবার। ফেলে আসা প্রিয়তমা আমায় বাঁধা দিও না। এক সূর্যোদয় থেকে আরেক উদয়ের দিকে যাচ্ছি আমি। আকাশ কি খানিকটা মেঘম্লান! হোক না। ভালোবাসার মেঘ জমলে তো ভালোই। ভালোবাসায় দূরত্বও অনির্বচনীয়। শৈশব থেকে আমার মণিমাণিক্য তুলে এনে তারুণ্যকে সাজিয়ে তুলতে পারবো। রাস্কিন বন্ড নামের এক নক্ষত্র থেকে যে কিরণ আমাকে স্পর্শ করে গেল তার শিহরণ আজীবন থেকে যাবে। আর যে পাহাড় এই নক্ষত্রের আলোতে উদ্ভাসিত সেই পাহাড় যেন নতুন বর্ণে, গন্ধে খুলে যাচ্ছে তার অগুনতি ভাঁজ নিয়ে। এইতো একটা ভাঁজ খুলতেই একটি পাইন বনের টিলা। নাম পরি টিব্বা! ওটাই কি এ অঞ্চলের খাণ্ডব বন? পরিত্যক্ত পোড়া একটি গৃহের অবয়ব দেখা যায়। ভিন্ন ভিন্ন জাতের একটি কিশর-কিশোরী সমাজে তাদের ভালোবাসার স্বীকৃতি না পেয়ে চলে গেছে অভিমানে সেই নির্জন টিলার দিকে নতুন সমাজ গড়বে বলে। ওইতো শোনা যাচ্ছে ওদের গোঙানি! এটা কি ওদের মিলনের শীৎকার নাকি দহনের চিৎকার ধ্বনি!

ওই তো আরেকটা ভাঁজ খুলতে খুলতে পথের দাবিতে কাটা পড়ে যাওয়া এপ্রিলের ওক সেজে উঠছে তার নতুন পাতা নিয়ে, ম্যাপলের পাতাগুলিতে সবুজ রং ধরেছে, মধুলোভী ভ্রমরেরা আবার গান গাইছে- রডোডেনড্রন, রডোডেনড্রন...! এ মুসৌরির ছবিতো আগে কখনও দেখিনি আমি। ঘন বন তার ফাঁকফোকরে ধরে রেখেছে ফালি ফালি পূর্ণিমা আলো। ম্যাজিক, ম্যাজিক বলতে একটি একলা হয়ে যাওয়া শেয়াল নেচে উঠল! নাচছে এখনও। আমি আড়াল থেকে দেখছি আর গাছেদের ছায়া হয়ে তাকে অনুকরণ করতে করতে নিচের রাস্তা ধরে একটি বাংলো মতন বাড়ির সামনে এসে পড়লাম। এটাই কি ম্যাপলউড কটেজ! তার একটি রুমের ভিতরে টাইপরাইটারটি কি আগে থেকেই সাজানো ছিল?

খটাখট খটাখট শব্দে এ শহরের যানবাহনের কর্কশ শব্দ, নাগরিক কোলাহল, সব মিলিয়ে যাচ্ছে শীতল বাতাসে। 

এবার ঠিক আমি সেই নিঃসঙ্গ শেয়ালের নাচের একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে পারব। 


গতরাতে ঘরের পথে হেঁটে যেতে যেতে 

দেখলাম, একটি শেয়াল একা 

নৃত্য করছে চাঁদের আলোয়।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম, বুঝলাম

এই রাত্রিটি একান্তই তার, তারপর  

চেনা নিচু রাস্তা ধরে নেমে গেলাম।

সকালের শিশিরের সঙ্গে যদি কখনো 

সঠিক তালে শব্দ বেজে ওঠে 

আমিও নেচে উঠি নিঃসঙ্গ শেয়ালের মতো!


(লেখকের অনুবাদে রাস্কিন বন্ডের কবিতা)

---------------------------------------------------------

রাস্কিন বন্ডের ছবি এঁকেছেন অতনু দেব