Saturday, July 2, 2022

আমি চাই, সব সিনিয়র কবি জুনিয়র কবিদের দিকে নজর রাখুক: কে সচ্চিদানন্দন

কে সচ্চিদানন্দনের জন্ম ১৯৪৬ সালে। ভারতীয় কবিতার সুপরিচিত নাম। মালায়ালাম এবং ইংরেজি দুই ভাষায় কবিতা লেখেন তিনি। একই সঙ্গে সাহিত্য সমালোচক, নাট্যকার ও অনুবাদক। সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন কলকাতা পোয়েট্রি কনফ্লুয়েন্সে যোগ দিতে। The Missing Rib তাঁর কবিতা সংকলনের নাম। অধ্যাপনা করেছেন। সাহিত্য অকাদেমির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। দিল্লিতে বসবাসের পর এখন ফিরে গিয়েছেন কেরালায়, নিজের জন্মভূমিতে। সেখানে বসেই নিয়মিত কবিতাচর্চা করে চলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার গ্রহণ: অরুণাভ রাহারায়

প্র: আপনি আগে দিল্লিতে থাকতেন। এখন রাজধানীর থেকে দূরে থাকেন। কেরালায় আপনার জন্মভূমিতে চলে গিয়েছেন। আপনি কী মনে করেন, একজন তরুণ কবিকে কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকতে হবে? নাকি কেন্দ্র থেকে দূরে বসবাস করেও সে সারভাইভ করতে পারবে?

উ: আমার জন্ম কেরালায়। ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত কেরালাতেই ছিলাম। দিল্লিতে যাই ৪৫ বছর বয়সে। আমি একটা কলেজে পড়াতাম। সেখান থেকে স্বেচ্ছায় অবসরগ্রহণ করি। তারপর আমি সাহিত্য অকাদেমিতে যোগ দিই। প্রথমে ‘ইন্ডিয়ান লিটরেচার’-এর সম্পাদক হিসেবে, পরে অকাদেমির সেক্রেটারি হয়েছিলাম। তরুণ কবি হিসেবে আমি আমার নিজের গ্রামেই ছিলাম, যেখানে আমার জন্ম হয়েছিল। সেখানেই আমি কলেজে পড়াতাম। পরে এক জায়গায় যাই, সেটাও গ্রামের খুব কাছেই। যখন খুব ছোট ছিলাম, কবি হিসেবে নিজেকে গড়ছিলাম তখন নিজের জায়গাতেই ছিলাম। আমার ভাষাকে ঘিরে ছিলাম। আমার থেকে বড়, আমার থেকে ছোট এবং আমার সমবয়সি-- এই তিন প্রজন্মের কবির সঙ্গেই আমার বন্ধুত্ব ছিল। এমনকি এর পরের প্রজন্মের কবিরাও আমার বাড়িতে দেখা করতে আসত। আমরা একে অপরের সঙ্গে কবিতা নিয়ে আলোচনা করতাম। গঠনমূলক আলোচনা। তখন আমি কবি হয়ে উঠছিলাম। আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে। তখন আমার বয়স ২৬। তখন আমার সব বই কেরালা থেকেই প্রকাশিত হচ্ছিল। দিল্লিতে আসার পরেও আমার অনেক বই কেরালা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। দিল্লিতে আসার পরেও কেরালায় আমার যথেষ্ট উপস্থিতি ছিল। দু’টো কারণে। প্রথমত, আমার সব বই কেরালা থেকে প্রকাশ হত। সেখানে আমার অনেক পাঠক। যদিও গোটা বিশ্বেই আমার পাঠক রয়েছে। কারণ, কেরালার নাগরিক গোটা বিশ্বেই ছড়িয়ে আছে। তাই আমার কবিতার পাঠক গোটা বিশ্বেই ছড়িয়ে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রতি বছর আমি বহুবার কেরালায় যেতাম। বছরে অন্তত ৮ থেকে ১০ বার। বিভিন্ন বৈঠকে বা কবিতাপাঠের আসরে যোগ দিতে। আমি নতুন কবিদের সঙ্গে দেখা করতাম। তাদের সঙ্গে আড্ডা হত।

এরই মধ্যে বড় পরিবর্তন চলে আসে। কম্পিউটার আসে ঘরে, মোবাইল চলে আসে। অনেকেই লেখার জন্য সাইবার স্পেস ব্যবহার করতে শুরু করেন। তাঁদের নিজেদের ব্লগ তৈরি হয়। আমিই কিন্তু সর্বপ্রথম মালায়ালম ভাষায় কবিতার ব্লগ সম্পাদনা করি প্রায় ১০ বছর আগে। একটা বড় প্রকাশনা সংস্থা আমায় এই কাজটা করতে বলেছিল। সেই সংস্থা আমারও কবিতা বইও প্রকাশ করেছে। প্রকাশনা সংস্থাটি আমায় বলেছিল ব্লগ থেকে কবিতা নির্বাচন করতে। সেখানকার বহু কবির লেখা তখনও প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশকরা আমায় বলেছিল ব্লগ পড়ে কবিতা নির্বাচন করতে। সেটা আমি আমার ফেসবুকে প্রচার করি। তারপর থেকে আমার কাছে প্রচুর ব্লগের লিঙ্ক আসে। আমি প্রায় সবকটিই পড়ি। অন্ততপক্ষে ৬০ হাজার কবিতা পড়েছিলাম এই সংগ্রহটির জন্য। যার মধ্যে থেকে আমি মাত্র ৬০টা নির্বাচন করি। আমি ওই সংগ্রহটার নাম দিই ‘দি ফোর্থ স্পেস’। বিখ্যাত সমালোচক হোমি ভাবা বলেছিলেন, যে মানুষরা নিজেদের জায়গা ছেড়ে এসেছেন, তাঁরা থার্ড স্পেসে বসবাস করছেন। এখানেও নয়, ওখানেও নয়। তো আমার মনে হয়েছিল সাইবার স্পেস হল চতুর্থ স্পেস। যেখানে গোটা বিশ্বের মানুষ একত্রিত হতে পারেন, নিজেদের অভিজ্ঞতা ইত্যাদি একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। এখনও আমি ব্লগ, ফেসবুকে প্রকাশিত বিভিন্ন কবিতা নিয়মিত পড়ি, ভার্চুয়াল জগতে থাকি।

প্র: কেরালায় বসেই আপনি কি গোটা বিশ্বের সাহিত্যকে ছুঁতে পারছেন? 

উ: অবশ্যই। এখন তো বটেই, ছোটবেলাতেও ছুঁতে পেরেছিলাম। আমি গ্রামে জন্মেছি। আমাদের গ্রামে দু’টো গ্রন্থাগার ছিল। অনেকে জানেন কেরালায় একটা বড় গ্রন্থাগার আন্দোলন হয়েছিল। ফলস্বরূপ প্রতিটি গ্রামে অন্ততপক্ষে একটা গ্রন্থাগার ছিল। কোথাও কোথাও একের অধিকও ছিল। আমাদের গ্রামে দু’টো। যার মধ্যে একটা ছিল বিশ শতকের প্রথমদিকের বিখ্যাত কবি কুমারানাশানের নামে। ওই গ্রন্থাগারে খুব ভালো বইপত্র ছিল, বিশেষ করে অনুবাদগ্রন্থ। মালায়ালাম একটা অনুবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। আমরা নানা সাহিত্য অনুবাদ করতে থাকি। তাই যখন একজন মালায়ালম সাহিত্যিককে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সবথেকে জনপ্রিয় মালায়ালাম লেখক কে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। মার্কেজ এতোটাই জনপ্রিয় ছিলেন মালায়ালাম ভাষায়। 

প্র: আপনি অনেক কম বয়সে পাবলো নেরুদার নির্বাচিত কবিতা অনুবাদ করেছিলেন। আপনার কি মনে হয় কবিতার অনুবাদের মধ্যেও সৃজন থাকে?

উ: নিশ্চয়ই। আমি মনে করি, একটি অনুবাদ বইয়ে দু’জনের সৃজনশীলতা থাকে। অনুবাদে আমাকেও দেখা যাবে, নেরুদাকেও। অবশ্যই প্রথমে নেরুদাকে ও তারপর আমাকেও দেখতে পাবেন। আমি নেরুদার সৃষ্টিকে আমার ভাষায় অনুবাদ করেছি। আমার ভাষা বলতে মালায়ালাম নয়, আমার নিজস্ব ভাষা, ভঙ্গি বোঝাতে চেয়েছি। বহুদিন আগে সম্ভবত ১৯৪০ দশকের শেষে এবং ৫০ দশকের শুরুর দিকে নেরুদার কবিতা মালায়ালামে অনুবাদ করা হয়েছিল। আমার মনে হয়, ওই সময় মালায়ালাম ভাষা নেরুদার জন্য, নেরুদার সৃষ্টিকে ভালোভাবে অনুবাদের জন্য যথেষ্ট পরিপক্ক ছিল না। একজন গতানুগতিক মাপকাঠিতে অনুবাদ করেন। অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে না পেরে কিছু জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ওটা একটা অসম্পূর্ণ অনুবাদ ছিল। যার কথা বলছি, তিনি একজন কমরেড ছিলেন। তিনি হয়তো নেরুদা, মায়কোভস্কির অনুবাদ করাকে নিজের দায়িত্ব ভেবেছিলেন। সেটা করেওছিলেন। আমি অনুবাদ করি ৭০-এর দশকে। বইটা প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। ততদিনে মালায়ালাম কবিতা আধুনিক হয়ে উঠেছে। আমার সামনে একটা নতুন ধরন, দেখার নতুন আঙ্গিক এবং একটা সম্পূর্ণ নতুন ভাষা ছিল। তখন আমি নেরুদাকে ভালো করে অনুবাদ করতে পারি। নেরুদার মতো একজন কবি, যাকে আমি নিজে প্রচণ্ড অ্যাডমায়ার করি, তাঁর সৃষ্টিকে অনুবাদ করার সাহস দেখিয়েছিলাম।

প্র: সুবোধ সরকার তাঁর 'আমার কবিতা আমার জীবন' (প্রকাশ ২০১৫) বইয়ের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, তিনি গত পাঁচ বছরে বিদেশে যে কয়েকটি সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন, তাঁকে সুপারিশ করেছেন আপনি অথবা সীতাংশু যশচন্দ্র। কবিতার ক্ষেত্রে কি রেকমেন্ডেড হওয়া জরুরি?

উ: হ্যাঁ। আমি চাই, সব সিনিয়র কবি জুনিয়র কবিদের দিকে নজর রাখুক। নতুন কবিতা পড়ুন, সেগুলো সম্পর্কে লিখুন। আমি গোটা জীবন ধরে তা করে আসছি। তখন থেকে যখন আমি মালায়ালামে নন-পোয়েট ছিলাম। এমনকি দিল্লিত থাকার সময়ও নতুন মালায়ালাম কবিদের লেখা পড়তাম। তাঁরা আমাকে লেখা পাঠাতেন। তাদের বই কিনতাম বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে পড়তাম। আমি এইসব কবিদের সারা বিশ্বে কবিতা সম্মেলনের জন্য সুপারিশও করে থাকি। যেমনটা সুবোধ সরকারকে করেছিলাম। আমি যাদের কবিতা পড়ি তাদের ভারতে এবং মাঝেমধ্যে বিদেশেও বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলনে সুপারিশ করি। 

আমি তাঁদের কখনও কখনও কবিতা অনুবাদও করতে বলি। কারণ, কবিতা অনুবাদ হল একটা শেখার অভিজ্ঞতা। যখন আপনি কবিতা অনুবাদ করেন তখন যেন আপনি একজন মহান শিল্পীকে কাজ করতে দেখছেন। কীভাবে তাঁর হাত চলে, কীভাবে লাইন গঠন হয়, কীভাবে তিনি রঙের ব্যবহার করেন। যখন আপনি একজন কবিকে অনুবাদ করেন তখন আপনি বোঝার চেষ্টা করতে পারবেন আসল কবিতাটা লেখার সময় কবির ইমাজিনেশন কীভাবে কাজ করছিল। তিনি নির্দিষ্ট চিত্রকল্পে কীভাবে পৌঁছলেন বা লাইনটা কীভাবে জন্ম নিল। আপনি কিছু শিখতে পারবেন অনুবাদ করতে গিয়ে। তাই আমি সব তরুণ কবিদের বলে থাকি অনুবাদ করুন। আমি তাঁদের বলছি না, সব অনুবাদ প্রকাশ করতে হবে। হয়তো প্রকাশ করবেন না, তবু নিজের জন্য অনুবাদ করুন। অনুবাদ যে ভালো হবে তারও নিশ্চয়তা নেই। তবুও, অনুবাদ হল শেখার জন্য একটা অভিজ্ঞতা। 

আমি হাই স্কুলের ছাত্র থাকার সময় অনুবাদ করতে শুরু করি। ওমর খৈয়াম এবং কয়েকজন ব্রিটিশ রোম্যান্টিক কবির লেখা অনুবাদ করি। কারণ ওই বয়সকালে সেইসব কবিরাই বেশি টানত। সারাজীবনই আমার কবিতা এবং আমার অনুবাদ একসঙ্গে চলেছে। এখনও আমার একটা মান্থলি কলাম রয়েছে। সেখানে আমি ভারতের এমনকি ভারতের বাইরের কবিদের পরিচয় করাই তাঁদের কবিতা মালায়ালামে অনুবাদ করার মাধ্যমে। একটা ছোট্ট ভূমিকা লিখি, তারপর তাঁর কবিতা অনুবাদ করি। অনুবাদ ও সৃষ্টি দুটোই আমার সমান্তরাল ভাবে চলেছে। আমার অনুভব, এই অনুবাদগুলি আমার নিজের কবিতার জগতের একটা অংশ। কেউ যদি আমার সব কবিতাকে একসঙ্গে প্রকাশ করে তাহলে আমার মনে হয় তার একটা অংশে নিজের কবিতা থাকবে, আরেকটা অংশে আমার অনুবাদ করা কবিতাগুলো থাকবে। কারণ, আমার সৃজনশীলতা, আমার ইমাজিনেশন, আমার ভাষাগত দক্ষতা-- এই সবকিছু আলাদাভাবে হলেও আমার দু’ধরনের কাজের মধ্যেই রয়েছে। আমি সবসময় বলি, যখন একজন কবিকে মূল্যায়ন করছেন বা তাঁর অনুবাদকে দেখছেন, তখনই আপনি ওই কবিকে সম্পূর্ণভাবে জানতে পারবেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নিজের কবিতার অনুবাদ করেছিলেন। করীরও করেছিলেন। আমার মনে হয় না সেগুলো খুব ভালো অনুবাদ। কারণ পরে আমি আরও ভালো অনুবাদ দেখতে পেয়েছি। কিন্তু, তাঁরা যে অনুবাদ করতে চেয়েছিলেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। এখনও এই বয়সে আমি গোটা বিশ্বের কবিতা পড়ি এবং সেইসব লেখাকে মালায়ালি পাঠক সমাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। আমি এই কাজটা করি মূলত মালায়ালি যুব কবিদের জন্য। যাতে তাঁরা জানতে পারেন যে এরকম একজন কবি রয়েছেন, এই ধরনের কবিতার ভঙ্গি রয়েছে, এই কবি এই ধরনের ইমেজ ব্যবহার করেন বা অন্য একজন কবি আরেক ধরনের সিনটেক্স ব্যবহার করেন। তাঁরা অনুবাদের মাধ্যমে অনেক কিছু শিখতে পারেন। অনুবাদ একটা সৃজনশীল কাজ। কারণ, সেখানে তোমার ইমাজিনেশন কাজ করছে, তুমি তোমার সমস্ত ভাষাগত দক্ষতা কাজে লাগাচ্ছ। তাই আমার মতে, গোটা প্রক্রিয়াটা অত্যন্ত সৃজনশীল।

প্র: ক্রিস্টোফার মেরিলের সঙ্গে আপনার একটা ছবি দেখেছি। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাইটিং ওয়ার্কশপে ও সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন?

উ: আইওয়াতে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। কিন্তু, সেই সময় যেতে পারিনি। রটারডামে একটা ওয়ার্কশপে যোগ দিয়েছিলাম। তারপর ভেলসে শহরে একটা ওয়ার্কশপে গিয়েছিলাম। ভেলসের পর ম্যানচেস্টারে গিয়েছিলাম একটা ওয়ার্কশপে। সেখানেই সম্ভবত ক্রিস্টোফার মেরিলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। স্পেনে মাদ্রিদেও ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছি। প্রথম শুরু হয়েছিল ভোপালের ভারত ভবনে। তখন ডিরেক্টর ছিলেন অশোক বাজপেয়ী। সেখানে অনেক কবি আসতেন। কবি সম্মেলন হত। প্রায় সবগুলোতেই অংশগ্রহণ করতাম। মাঝেমাঝে কয়েকটা ওয়ার্কশপও হত। হিন্দিতে আমার অনুবাদের বই রয়েছে। একবার একটা ওয়ার্কশপে তিনজন ছিলাম। আমি, হিন্দি ভাষার একজন যুব কবি ছিলেন রাজেন্দ্র থোটাপকর, আর একজন ছিলেন, তিনি মালায়ালাম ও হিন্দি দুই ভাষাই জানতেন। কর্মশালাটা ১৫ দিন ধরে চলেছিল। শেষে আমার প্রথম হিন্দি বইটা প্রস্তুত হয়। তারপর দিল্লিতে রাজকমল প্রকাশ করেছিল। সেই শুরু। তারপর একে একে বহু ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করি দেশ ও দেশের বাইরে।

প্র: বাংলার অনেক পরিচিত কবি আপনার বন্ধু। ভারতীয় কবিতার মনচিত্রে কবিতা কবিতার অবস্থান ঠিক কোথায়?

উ: বাংলা কবিতা গতিশীল, জীবন্ত। বাংলায় অনেক লিটল ম্যাগাজিন আছে, কবিতা পত্রিকা রয়েছে। যদিও আমি সব ভাষার কবিতা পড়িনি। হয়তো কেউই পড়েননি। তবু, আমার মতে, মারাঠি, মালায়ালাম এবং বাংলা সব থেকে এগিয়ে রয়েছে ভারতীয় কবিতা মানচিত্রে। হয়তো হিন্দিও রয়েছে এই তালিকার ওপরের দিকে। মুশকিল হল, হিন্দি ভাষায় লেখা কবিতা কিছু পাঠকের ছোট বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মূলত, অ্যাকাডেমিশিয়ান, কলেজ পড়ুয়া, কলেজের অধ্যাপক, তাঁরাই প্রধান পাঠক হিন্দি কবিতার। মালায়ালামে তা হয় না। বাংলা বা মারাঠির ক্ষেত্রেও তা হয় বলে আমার মনে হয় না। নানা স্তরের মানুষ বাংলা কবিতা পড়েন। যখন আমি কেরালায় যাই তখন অটো-রিক্সা চালকও আমার কাছে আসেন, আমাকে চিনতে পারেন। একবার তো একজন অটো চালকের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয় কবিতা নিয়ে! আমি তাঁর মুখ দেখতে পাইনি কারণ তিনি সামনে বসেছিলেন। কিন্তু, তাঁর সঙ্গে আমার অনেক গভীর আলোচনা হয়, নিজের বর্তমান কবিতা ও আগের লেখা কবিতার পার্থক্য নিয়ে! এমন ঘটনা আমার সঙ্গে কয়েক বার হয়েছে। একটা গ্রামে একজন পান বিক্রেতা আমার নতুন কবিতা পড়েছেন শুনে বিস্মিত হয়েছি। সেটা আবার আমাকে মুখস্থ শুনিয়ে দিলেন! একটা রেস্তোরাঁয় এক বেয়ারার সঙ্গেও একই ধরনের ঘটনা। যদিও আমি খুব জনপ্রিয় কবি নই। সবার জন্য লিখি না। কিন্তু, তা সত্ত্বেও আমার কবিতা সাধারণ মানুষদের মধ্যে প্রশংসিত হয়েছে ভেবে ভালোই লাগে। এটা আমি কেরালায় টের পেয়েছি। আমার মনে হয় বাংলা কবিতার জন্যেও সাধারণ মানুষের এই ভালোবাসাটা রয়েছে। মারাঠির জন্য বড় মাপে রয়েছে। হিন্দিতে অনেক ভালো কবিতা রয়েছে। কিন্তু,  সেই তুলনায় পাঠক সংখ্যা খুবই কম। এটা আমি ভালো করে জানি। এই চার ভাষার কবিতাই অত্যন্ত গতিশীল।

প্র: ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল আপনার। শুনতে চাই সেই স্মৃতি...

উ: হ্যাঁ সেবার দেখা হয়েছিল অলোকদার সঙ্গে। আমার কবিতার অনুবাদ হয়েছে অন্তত ৩০টি ভাষায়। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত আমার কবিতার জার্মান অনুবাদ-গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। কেরলের একজন মহিলা অ্যানা কুট্টি আমার কবিতার অনুবাদ করেছিলেন জার্মান ভাষায়। তাঁর স্বামী জার্মান। তিনি নিজেও জার্মান জানেন। বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্মান ভাষা পড়ান। তিনি জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মালায়ালমও পড়ান। অ্যানা কুট্টি একজন কবি এবং জার্মান ভাষাতেও লেখেন। তিনি আমার কবিতা মালায়ালাম থেকে সরাসরি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। বইটা যথেষ্ট বড় হয়েছিল। কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সেই বই প্রকাশ করেছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায়। আমি অলোকরঞ্জনের অনেক কবিতা পড়েছি। যেমন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখাও পড়েছি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমার সিনিয়র বন্ধুর মতো ছিলেন। ভোপালে ওয়ার্কশপে শক্তি এসেছিলেন। সেই সময় শক্তির কবিতাও অনুবাদ করা হচ্ছিল হিন্দিতে। করছিলেন কেদারনাথ সিং। সেই সময় বিভিন্ন ভাষার কবিদের দল একে অপরের লেখা অনুবাদ করেছিলেন।

প্র: আপনার কন্যা সবিতা সচ্চি কবিতা লেখেন। তাঁর বই প্রকাশ পেয়েছে। কীভাবে দেখেন বিষয়টা 

উ: হতে পারে ব্যাপারটা জেনেটিকসের জন্য। একথা বলব না যে সবিতা আমার থেকে কবিতা পেয়েছে। কবিতা পড়েই কবিতার প্রতি ঝোঁক এসেছে ওঁর। তাছাড়া, ছোটবেলায় আমাকে সবসময় লিখতে দেখত। আমি খুবই খুশি এবং গর্বিত ওঁর জন্য। ওঁর কবিতা চারদিকে ভালোভাবে গৃহীত হয়েছে, আলোচিত হয়েছে। কবিতার প্রতি ওঁর টান তৈরি হওয়ায় ভালোই হয়েছে। কারণ, ও এমন একটা বাড়িতে বড় হয়েছে যেখানে কবিতার বইয়ের ছড়াছড়ি। আমার তিনটে বড় তাক-ভর্তি সারা বিশ্বের কবিতার বই। আমার কবিতা ও ঘরে থাকা কবিতার বইগুলো পড়ে বড় হয়েছে সবিতা। ওঁর কবিতার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়ার পেছনে এই কারণগুলো থাকতেই পারে। আগ্রহটা নিজেরই ছিল। পরিবেশও হয়তো কিছুটা সাহায্য করেছে।

প্র: লকডাউনে আপনার সম্পাদনায় কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। লকডাউনের সময়টা কীভাবে কাটিয়েছিলেন? 

উ: লকডাউন আমার জন্য অত্যন্ত সৃজনশীল সময় হয়ে উঠেছিল। হ্যাঁ, একবার আমারও কোভিড হয়েছিল। তবে, ছোট আকারে। জ্বর ইত্যাদি হয়েছিল। সেটা বাদ দিয়ে আমি অনেকটা সময় পেয়েছি। অন্য সময় প্রচুর সভায় বক্তব্য রাখতে ডাকা হয় আমাকে। সেই সময়ও কয়েকটা অনলাইন মিটিং পড়েছিল। অংশ নিয়েছি এবং প্রায় ৬০টা অনলাইন লেকচার দিয়েছি! কিন্তু, ব্যাপারটা অনলাইনে হওয়ার কারণে আমায় কোথাও যেতে হয়নি। যা আমায় অনেক অবসর সময় দিয়েছিল। সেই সময় আমি প্রতি সপ্তাহে মালায়ালাম অনুবাদ কলামের কাজটা চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। আরেকটা কথা, আমি এই সময় ভক্তি এবং সুফি কবিতা অনুবাদের সিদ্ধান্ত নিই। সেটাই মূলত করেছিলাম লকডাউনে। তা থেকে পাঁচটা বইয়ের পাণ্ডুলিপি হয়ে উঠল। তার মধ্যে তিনটি প্রকাশ হয়ে গিয়েছে। বাকি দুটির কাজ চলছে। সঙ্গে শেক্সপিয়রের সব সোনেট অনুবাদের চেষ্টা। আমি আগেই একটা সংগ্রহের জন্য অনেকটা অংশ অনুবাদ করেছিলাম। এবার মোট ১৫৪ সনেটের সবকটিই অনুবাদ করেছি মেট্রিক্যালি। কারণ, সনেট মিটারে অনুবাদ করতে হয়। 

আমার কাছে একটা গোটা বই রয়েছে কবীরের। নাম 'কনভার্সেসন উইথ গড'। 'সুফি পোয়েমস বাই বুল্লেহ শাহ' নামে সুফি কবি বুল্লেহ শাহর একটা বই। তৃতীয় বইটি তুকারামের কবিতা নিয়ে। চতুর্থ বই কানাডার সাইবার পোয়েটস। আমার পঞ্চম বইটি একটি অ্যান্থলজি। তাতে আমি প্রায় ৫০ জন ভিন্ন ভাষার সুফি এবং ভক্তি কবিকে একসঙ্গে অনুবাদ করেছি। পাঁচটি বই ভক্তি এবং সুফি কবিতার ও একটা শেক্সপিয়রের সনেটের বই। সবকটিই লকডাউনের আড়াই বছরে অনুবাদ করা। সঙ্গে আমি নিজের কবিতাও লিখছিলাম। পরিস্থিতির বিচারে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছিলাম। আমি বেশ কিছু কবিতা সরাসরি লকডাউন নিয়ে না লিখলেও পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে লিখি। যেমন, একাকীত্ব, সামাজিক দূরত্ব, পরিযায়ী শ্রমিকদের মাইগ্রেশন ইত্যাদির ওপর। আমার লেখা একটা কবিতা রয়েছে 'ট্রেন' নামে। একজন শ্রমিক ট্রেন ধরতে পারেননি এবং তিনি মারা যান। তাঁর আত্মা ট্রেনে যাত্রা করে। এভাবেই আমি ইমাজিন করেছি। তিনি গ্রামে পৌঁছন। কিন্তু, তাঁকে সবাই আসল মানুষ হিসেবে দেখতে পান। তাঁর বাচ্চারা বেরিয়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে, গ্রামবাসীরা তাঁর নাম ধরে ডাকে। তিনি বাই-সাইকেলে ঘুরে বেড়ান। এভাবেই আমার‌ কল্পনা দিয়ে কবিতাটা লিখেছিলাম।

প্র: গত বছর আপনি কেন্দ্রীয় শাসকদলের বিরোধী একটি কার্টুন শেয়ার করেছিলেন বলে আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট একদিনের জন্য উধাও হয়ে গিয়েছিল

উ: আমি তো লিখেই চলেছি এইসবের বিরোধীতা করে। কারণ, বর্তমানে ভারতে ঘৃণার সংস্কৃতি চলছে। যা তৈরি করেছে নতুন সরকার। আমি তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দিয়ে থাকি। ফেসবুকে লিখে থাকি। শুধু লেখা নয়, নানা জায়গায় বলিও। দিল্লিতে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছি। এছাড়াও শাসক বিরোধী অনেক প্রতিবাদ সভায় অংশ নিয়েছি। কেরালাতেও আমি এইসব মানুষদের বিরুদ্ধে কথা বলে থাকি। ফেসবুকে কার্টুন বা সমালোচনামূলক মন্তব্য পোস্ট করতে থাকি। অশ্লীল কিছু নয়, শুধু কঠোর সমালোচনামূলক রাজনৈতিক মন্তব্য। কিন্তু, একদিন দেখতে পাই আমি আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছি না। বারবার পাসওয়ার্ড দিয়েও ঢুকতে পারছি না! দু'দিন এই অবস্থায় ছিল। তিনদিনের দিন আবার ঢুকতে পারি। আমি ফেসবুকের থেকে ওয়ার্নিংও পাই যে, আপনি আবার কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের বিরুদ্ধে গিয়েছেন। কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড শব্দটা ব্যবহার করেছিল ওঁরা। বলেছিল, আপনার পোস্ট আমাদের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের বিরুদ্ধে। তাই আমরা পোস্টটি সরাতে বাধ্য হয়েছি। আপনি আবার এ রকম করলে আমরা একই রকম ব্যবস্থা নেব। এ ঘটনার বিরুদ্ধে কেরালায় বড় বড় প্রতিবাদ হয়। স্কুল পড়ুয়ারা পর্যন্ত তাতে সামিল হয়েছিল।

কবিতায় ভস্মীভূত এক কবি: কে সচ্চিদানন্দনের কবিতা | অনুবাদ: অরিত্র সান্যাল

[কবিকে তাঁর মূল ভাষায় পড়তে না পারার দুঃখ একটি পবিত্র অনুভূতি। এতে পাঠকের বিবেক অটুট থাকে। এই অশ্রু-ঝলোমলো বিশ্বাস নিয়েই কবি কোইয়ামপারাম্বাথ সচ্চিদানন্দনকে অনুবাদ করে ফেলা। কবি লেখেন মালায়লম ভাষায়, পরে অনুবাদ নিজেই করেন ইংরেজিতে। সেই ইংরেজি থেকে বাংলায়, খঞ্জপদক্ষেপে, কবিতাগুলিকে বয়ে আনবার কাজটি অপরাধের হল কি না – তা আর কবেই বা কে জানতে পেরেছেন!

জুন মাসের অগ্নিদাপট চলছে বাইরে। অ্যান্টনিম পত্রিকার উদ্যোগে শহরে কলকাতা পোয়েট্রি কনফ্লুয়েন্সে যোগ দিতে এসে কবি এসে উঠেছেন পূর্ব কলকাতার একটি পান্থনিবাসে। তারই একটা ঘরে বসে আছি, অর্থাৎ, একটি ঘরে বসে দুই ভারতীয় পরস্পরের সঙ্গে ইংরেজিতে আড্ডা মারছে। এর মাঝে চা এল। কবি ও পাঠকের মধ্যে ভাষার দূরত্ব নিয়ে গভীর কথা পাড়তে যাব কি এমন সময় কবি ফুড়ুত হেসে হঠাৎ বলে উঠলেন – যখনই কোলকাতা আসি, আমি হতবাক হয়ে যাই। সারা পৃথিবী জুড়ে মালায়লি মানুষ ছড়িয়ে আছেন, কিন্তু এত বাঙালি একসঙ্গে কেরালা ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না।

অতঃপর, আমি প্রশ্নটি গিলে নিই। নিশ্চিন্ত হই-– আমরা সর্বত্র আছি।]   


আঙুলের ছাপ


প্রাচীন কেল্লার ফটকে

এই আঙুলের ছাপগুলো দেখো:

কয়েকটি ঝুলেকালিতে ছাপা হয়ে আছে,

কয়েকটি অশ্রুতে,

তার মধ্যে কিছু, যারা উঁকি দিয়েছিল সেই শিশুদের,

কিছু, এখানে ঢুকতে পারার আগেই

খিদের চোটে ধ্বসে পড়া বুড়োদের,

আর কিছু, সেই জোয়ান ছোঁড়াদের যারা

জোর করে ঢুকতে গিয়ে, অশেষ রাত্রিতে

সটান থুবড়ে পড়েছিল।


আমিও এই সিংহদরজায়

রেখে যাচ্ছি নিজের আঙুলের ছাপ, রক্তে:

যারা অনাগত তাদের প্রতি

একটি স্মারক আর একটি হুঁশিয়ারি:

আমার কবিতা। 


রচনাকাল: ১৯৮৮


কবিতায়


নিজের কবিতায় আমি পুড়ে ছাই হয়ে যাই,

ঠিক যেমন চিতায়।

কাঁচা কাঠের মতো শব্দের পর শব্দ

আমি লেখায় গুছিয়ে তুলেছি।


কলাপাতা থেকে যখন আমায় চড়ানো হল

চিতার ওপর, শব্দে দাউদাউ আগুন।

সেখান থেকে আমার হাড়ের ভেঙে ফাটার 

আওয়াজ পাবে তুমি, 

হৃৎপিণ্ড পুড়ে যাবার তেল ছ্যাঁকছ্যাঁক ধ্বনি,

গলা পুড়ে যাবার নিঃশব্দ গান।


আমার চারদিকে তুমি দাঁড়িয়ে থেকে দেখ

যে জীবন আমি নিজের চোখে দেখি

তাতে জ্বলন্ত কয়লা পড়তে থাকে,

আমার শিরা দিয়ে গলগল করে স্বপ্ন 

বেরিয়ে যায়, আমার হুহু বয়ে যাওয়া ঘিলু থেকে

স্মৃতি আলুথালু।


তুমি তেল ঢালছ, আর চাপাচ্ছ কাঠের ওপর কাঠ,

আমার অন্ত্রনাড়িভুঁড়িজাল নেড়ে দিচ্ছ কাঠি দিয়ে।

একটা ঘুমপাড়ানি গান আমার কানে পুড়ছে,

গিঁঠ থেকে গিঁঠ খুলে একে একে আমার আঙুলগুলো পড়ে যাচ্ছে,

যেটুকু দূরত্ব আমি হেঁটে এসেছি জ্বলে যাচ্ছে,

আমি ছাই হয়ে যাচ্ছি। 

সেই ছাইয়ে এক বেড়াল তার ছানাপোনা নিয়ে উষ্ণতার ওম খুঁজে নেয়,

সেই ছাইয়ে একটা বুনো দারুচিনি গাছ গজিয়ে ওঠে, ফুল ফোটায়। 

সেই ছাইয়ে কালো কালো বাচ্চারা লাফায় দাপায়, খেলা করে।

তুমি এ ছাই গঙ্গায় ঢেলো না, অনুরোধ করি।


[কেরালার আদি রীতি অনুসারে মৃতদেহকে প্রথমে কলাপাতায় শোওয়ানো হয়। তারপর চিতায়।] 

                       

রচনাকাল: ১৯৯২


যখন কবিতা পুড়ে যায়


যখন কবিতা পুড়ে যায়, তা থেকে

গ্যাস চেম্বারে দগ্ধ শিশুদের গন্ধ আসে।

এখানে মড়-মড় করে যে ভাঙার শব্দ 

তা যুদ্ধের ধোঁওয়ায় পুড়ে আংড়া হয়ে যাওয়া পাতার।

অনাথ, ল্যাংটা, সারা গায়ে পোড়া দাগ,

রাস্তায় রাস্তায় ছুটে বেড়ায় কবিতা।

যা-কিছু অতিক্রম করে সব ছাই:

স্টক এক্সচেঞ্জ, প্রমোদ-বিপণী,

অস্ত্রাগার, দেওয়াল, দেওয়াল।

কবিতার ছাই থেকে একটি তোতা উঠে আসে

তার খোঁড়া জিভের ওপর নির্বাসিতা সীতার

প্রতিশোধের গল্প নিয়ে। 


রচনাকাল: ১৯৯২


ঘর, একটি জন্তু


ঘর একটি জন্তু যার ফুসফুস থাকে শরীরের বাইরে। সে কারণে 

সামান্য রৌদ্র বা তুষার লাগলেই তার জ্বর হয়ে যায়। 

হাওয়া-বাতাস ঝড়-জল এমন চলতেই থাকলে ঘর একদিন মরে যাবে। 


রচনাকাল: ১৯৯৫


অমরত্ব


হাজার হাজার কবি লিখেও

আজ বিস্মৃত।

স্মরণে শুধু একজনই থেকে যান।

একা একা অমর হবার থেকে

আমি চাইব বরং বিস্মৃত হয়ে যেতে

হাজার হাজার কবির সঙ্গে


রচনাকাল: ১৯৯৬



ঢোল


কোথা থেকে শব্দ আসে – তা উৎসুক হয়ে

খুঁজতে গিয়ে আমি একবার

ঢোলের চামড়ায় ছ্যাঁদা করে ফেলি

তারপর ভিতরে উঁকি দিই


অরণ্য আছে ভিতরে,

ঝমঝম বৃষ্টিতে জন্তুজানোয়ার ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে,

বানে নদী ক্ষিপ্ত, বাতাস

ঘণীভূত আকাশের নিচে ক্ষেপে উঠেছে।

একটা জংলি দেবতা বাইসন চড়ে

শিঙায় ফুঁ মারছে।

আমি ভয়ে কেঁপে উঠি, পালিয়ে আসি।

তখন আমার বয়স চার বছর।


এখনও যখন ঢোলের আওয়াজ শুনি,

আমি অকাতরে বৃষ্টির মধ্যে একটা

অরণ্যে পৌঁছে যাই,

সমুদ্রের মাঝে একটা দ্বীপ,

আর আমি সেখানে অপেক্ষা করি, ঝড় থামবার,

রক পাখির চঞ্চু থেকে সূর্যের জ্যান্ত দেখা দেবার,

আর মূল ভূখণ্ড থেকে

আমার সহচরের

ফুল, আর কলম নিয়ে আসবার


রচনাকাল: ২০০০



ভয়


ছোটবেলায়

আমি খুব ভয় পেতাম পেঁচার ডাকে

আর মায়ের আড়ালে লুকিয়ে যেতাম।

এখন শীতের চাঁদ

মেঘ থেকে সেই ডাক ছাড়ে।

মা মৃত্যুর আড়ালে লুকিয়ে গেছে

শৈশব মেঘের ওপার থেকে উঁকি দেয়

চাঁদের চোখের প্রাপ্তবয়স্ক ঝিলিক

তার ওপর পড়ে।


আর আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। 


রচনাকাল: ২০০২  



শিলং যাবার পথে


শিলং যাবার পথে

উমিয়াম লেকের কালচে বাদামী ঘাটে

একটি নীল কৃষ্ণচূড়ার ঝালর,

তার তলায় আমি তাঁকে দেখিঃ বনলতা সেন।


আজ, এক দশক পার করে

আবার সে লেকের পাশ দিয়ে যাচ্ছি।

উনি এখনও সেখানেই দাঁড়িয়েঃ

উপচে পড়া নীল কৃষ্ণচূড়া

এক খণ্ড বেগুনি মেঘের তলে

আকাশে ধাবমান।


রচনাকাল: ২০০৩


বয়ঃসন্ধি


মাস্টারমশাই অঙ্ক মুছে দিয়ে চলে গিয়েছেন,

শুধু যোগচিহ্ন, বিয়োগচিহ্ন আর মোটে একটা শূন্য

পড়ে আছে ব্ল্যাকবোর্ডে।

যোসেফ যোগচিহ্ন নিয়ে নিল

আর আমিনা, বিয়োগচিহ্নটা।

আমি শূন্য পকেটে ভরে

চলেই আসছিলাম কি এমন সময়

একটা বিশাল কাক ডেকে উঠল,

একটা গাছ রাস্তা পেরিয়ে গেল,

পথে একটা তারা খসে পড়ে

ভেঙে খান খান।

মুষলধারা বৃষ্টিতে আমার

শূন্যটিও গলে যায়।


আমি ফিরে যাই আর

আয়নায় দেখি:

আমার গোঁফ গজিয়েছে। 


রচনাকাল: ২০০৪


দরজাওয়ালা একটা মানুষ


দরজা নিয়ে একটা মানুষ

শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে,

একটি লাগসই বাড়ি চাই।


সে মানুষ নিজের মানুষীর

স্বপ্ন দেখছে, বাচ্চাকাচ্চা, ইয়ারদোস্ত 

সবাই এই দরজা দিয়েই ঢুকে আসছে।

এখন সে দেখতে পায়

আস্ত দুনিয়াই ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে

তার না-হওয়া বাড়িতে:

কত লোক, গাড়ি-ঘোড়া, গাছপালা

পশু পাখি, সবকিছু।


আর দরজাটা, দরজার স্বপ্নটা

মাটির ওপর উঠে যাচ্ছে,

তার ইচ্ছে স্বর্গের স্বর্ণদুয়ার হয়ে ওঠার,

সে কল্পনা করছে মেঘ, রঙধনু,

দত্যিদানো, পরী আর সাধুসন্তেরা

তার মধ্যে দিয়ে চলাচল করছে।


কিন্তু দরজাটির জন্য যে প্রকৃত অপেক্ষা করে আছে

নরকের অধিপতি।

এখন দরজাটি চায়

গাছ হতে, ফুল পাতার সম্ভার

দুলে উঠবে হাওয়ায়,

গৃহহারা ফেরিওয়ালাকে

ছায়া দিতে।


দরজা নিয়ে একটি মানুষ হেঁটে যাচ্ছে

শহরের রাস্তায় রাস্তায়,

একটি তারা হেঁটে যাচ্ছে তার সঙ্গে। 


রচনাকাল: ২০০৬



ঋণস্বীকার:

কে সচ্চিদানন্দনের The Missing Rib (Collected Poems 1973-2015) নামক কাব্যসংকলনটি প্রকাশ করেছে Poetrywala। মূলত সেই সংকলন থেকেই কবিতাগুলো চয়ন করা।

Wednesday, June 1, 2022

সঞ্জু কুজুরের একগুচ্ছ কবিতা

এক বনরক্ষী


মানুষ যখন মগ্ন গভীর সুনিদ্রায় 

আমরা তখন হাতি তাড়াই 

ফসল ঘরবাড়ি মানুষকে অক্ষত রেখে 

হাতিকে আমরা লোকালয় থেকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে জঙ্গলে নিয়ে যাই


সেই যে কবে থেকে আমরা নিজ ঘর-বাড়ি ছাড়া!

সেই যে কবে থেকে আমাদের প্রিয়জন স্বজনদের মুখ দেখা নেই!

আমরা পাহারা দিই, আমরা জঙ্গল বাঁচাই, আমরা থেকেই যাই

রেঞ্জ থেকে বিট, বিট থেকে জঙ্গল আর জঙ্গলেই


বনের ভেতরে গাছ কাটা পড়ে থাকা দেখলে

শরীর আমাদের জ্বলে

বনের গাছেই যে আমাদের সঙ্গে একান্তে 

নীরবে নিভৃতে প্রেমের কথা বলে।


শেষের গাঁথা

এখন আর থেকে থেকে মোবাইলের রিংটোন বেজে ওঠে না 

এখন আর খোঁজ রাখার মতো প্রিয় মানুষটিও নেই 

এখন দিগন্তরা শুধু অস্পষ্ট কুয়াশার চাদরে মোড়া সকাল সন্ধ্যা 

নদীর এপার ওপারে জমে গেছে 

এখন শুধু সহস্র ব্যথার পুঞ্জীভূত স্তূপ 


এই তো সেদিন যখন খুশি ছুটে যেতাম, যখন খুশি ছুটে আসতো সে 

আজ আমাদের জীবন আবৃত চক্রবুহ্যের ঘেরাটোপে আবদ্ধ 

আজ শুধু দৃষ্টি ছোটে মন ছুটে চলে যায় বহুদূরে 

স্মৃতিবিজড়িত চিরপরিচিত সেই চা-বাগানে

আমার রাধিকা মথুরায়...

জানি এলোকেশে সকাল থেকে সাঁঝবেলায়

সে যে এখন বড়ই অসহায়


দোহাই ওকে আর কষ্ট দিও না...

দোয়া করে ওকে আমার কাছ থেকে 

কেড়ে নিয়ো না ...

ওকে ছাড়া সত্যিই আমি বাঁচবো না...


অরণ্যের সুন্দর একটি গাছ


একটি জীবন্ত গাছকে কত সুন্দর লাগে!

নদীর তীরে তার বেড়ে ওঠা 

অল্প একটু উঁচু, সুন্দর তার কাণ্ড, ডাল, পাতা...

কতো সুন্দর লাগে...!

কত ভালো লাগে...!

যুগ যুগ বেঁচে থেকো হে গাছ...


মন তো করে গাছ তোমায় অরণ্য থেকে তুলে আনি 

আর চোখের সামনে উঠোনে রোপন করি 

আর তোমায় প্রাণ ভরে

তোমার সৌন্দর্যকে দেখতে থাকি...

কিন্তু সে যে এখন আর সম্ভব নয়...

তুমি যে এখন অরণ্যের গাছ 


যুগ যুগ বেঁচে থেকো হে গাছ ...


নির্জন সমাধি


আজ বুকের ভেতর বেদনারা সহস্র পাড় ভেঙে অনন্তে বয়ে যায়

হয়তো আমার জন্মই ভুল ছিল এ ধরায় 

তাই হয়তো আমার সরল মনের কান্না আর কেউ দেখতে পেলো না...


গোপনে আমার বেঁচে থাকা কোন দিন যেন পূর্ণ হল

যে দেশে মৃত্যুর আগে সমাধি স্থল ঠিক করেই রাখতে হয় 

আমি অবশ্য সে দেশে জন্মাইনি...


তবুও স্বপ্ন দেখি নির্জন, একাকী একটি সমাধির

Tuesday, May 31, 2022

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | ৫ম পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

১৭

মঙ্গলবারের রাত কাটল এক অস্থির ঘুমের মধ্যে। সারাক্ষণ মনে হচ্ছিল এই বুঝি দরজায় কেউ টোকা দেবে আর বলবে বাবা চলে গেছেন। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভাঙতেই তাঁর ঘরে গেলাম। নার্স বললেন যে বাবা সারা রাত একবারও নড়াচড়া করেননি। কাল শেষবার তাঁকে যেভাবে শুয়ে থাকতে দেখেছিলাম, এখনও ঠিক সেভাবেই শুয়ে আছেন আর এত ধীরে শ্বাস নিচ্ছেন যে বোঝাই যাচ্ছে না। মনে মনে ভাবলাম, নার্সেরা কি এখনও পর্যন্ত ওঁর হাত-পা সঞ্চালন করিয়ে দেন, বেড সোর এড়াতে এপাশ-ওপাশ ঘুরিয়ে শোয়ান, না কি এখন এসবের অনেক উর্দ্ধে চলে গেছেন। স্নান ক’রে, পোশাক প’রে আবার তাঁর ঘরে গেলাম। ঘরের ভেতরে, ভোরের আলোয়, শুয়ে আছে যেন এক অন্য মানুষ, যেন তাঁর এক যমজ ভাই, যে অতি সাধারণ, কৃশ, গায়ের চামরা স্বচ্ছ, যাকে আমি ভালো করে চিনিনা পর্যন্ত। এই মানুষটার সঙ্গে যেন আমার অন্য কিছু সম্পর্ক, অনেক দূরের কেউ একজন। হতে পারে এটাই পরিবর্তনের ইশারা, এভাবেই বিচ্ছেদকে সহজ করে দেওয়া, ঠিক যেমনভাবে সদ্যজাত শিশুর দিকে একবার তাকালেই মুহূর্তের মধ্যে অন্তর স্নেহের সিঞ্চনে ভরে ওঠে।

রান্নাঘরে গিয়ে টেবিলে একা বসলাম। সেখানে ছিলেন আমাদের রাঁধুনি, বহু দিন ধরে মাঝে মাঝেই তিনি আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁর দৃঢ় চরিত্রের জন্য বাবার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তাঁকেও খুব বিষন্ন দেখাচ্ছিল। একবার আমার দিকে তাকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না। তারপর রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বাবাকে দেখতে গেলেন, যাওয়ার সময় আমাকে বললেন, ‘দেখি, যদি কিছু দরকার লাগে।’

জলখাবার খাওয়ার পর শুনতে পেলাম বাবার ঘর থেকে ভেসে আসা বাইয়েনাতোর[১] সুর। এটি তাঁর সবচেয়ে পছন্দের সঙ্গীত। চেম্বার মিউসিক বা ল্যাটিন ব্যালাডের সঙ্গে মাঝে মধ্যে কিছু সময় কাটালেও শেষ পর্যন্ত এই বাইয়েনাতোর কাছেই ফিরে ফিরে আসতেন। তাঁর স্মৃতিভ্রংশতা বেড়ে যাওয়ার পরেও স্পেনের স্বর্ণযুগের কোনো কবিতার প্রথম লাইনটা কেউ বলে দিলে বাকিটা আবৃত্তি করতে পারতেন। পরে যখন সেই ক্ষমতা চলে গেল, তখনও তাঁর প্রিয় গানগুলো গাইতে পারতেন। যেখানে তিনি জন্মেছিলেন সেখানকার একান্ত নিজস্ব সঙ্গীত এই বাইয়েনাতো। তাই, জীবনের একেবারে শেষের কয়েকটা মাসে, যখন নিতান্ত প্রয়োজনের জিনিষটাও আর মনে করতে পারতেন না, অ্যাকর্ডিয়ানের সুর শুনলেই আবেগে তাঁর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত। তাঁর সেক্রেটারি অনেকগুলো বাইয়েনাতোর সংকলন চালিয়ে দিতেন আর তিনি পড়ার ঘরে বসে মনের আনন্দে নিজেকে আবদ্ধ করে নিতেন সময়ের একটা সুরঙ্গের মধ্যে। তাই শেষ দু’দিন ধরে তাঁর ঘরের সমস্ত জানলা হাট করে খুলে দিয়ে নার্সরা খুব জোরে বাইয়েনাতো চালিয়ে রেখেছিলেন। সেই সুরে ভেসে যাচ্ছিল সারা বাড়ি। তার মধ্যে কয়েকটা বাইয়েনাতোর গীতিকার ও সুরকার তাঁর কোম্পাদ্রে[২] রাফায়েল এস্কালোনা। এই সময়ে ওই গানগুলো আমার স্মৃতিকে তোলপাড় করে দিচ্ছে। এই সঙ্গীত ছাড়া আর কোনো কিছুই আমাকে এতখানি স্মৃতিতাড়িত করতে পারত না। আমাকে বাবার জীবনের অতীতে নিয়ে যাচ্ছে, সেই জীবনের পথ বেয়ে আমি ভ্রমণ করছি আর তারপর ফিরে আসছি বর্তমানে, যেখানে বেজে চলেছে সর্বশেষ ঘুম পাড়ানি গান।

সঙ্গীত রচয়িতাদের বাবা যেমন শ্রদ্ধা করতেন, তেমন ঈর্ষাও করতেন; কত কম কথায় কত সুন্দর করে অনেক কথা বলার জন্য। ‘কলেরার সময়ে প্রেম’ উপন্যাস লেখার সময় তিনি নিয়ম করে একটানা শুনে যেতেন ব্যর্থ ও অনুচ্চারিত প্রেম নিয়ে স্প্যানিশ ভাষায় গীত পপ সঙ্গীত। আমাকে বলেছিলেন, উপন্যাসটি কোনোভাবেই ওই গানগুলোর মতো মেলোড্রামাটিক হবে না, কিন্তু হৃদয়ানুভূতি প্রকাশের কৌশলের ক্ষেত্রে তাদের থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। শৈল্পিক পছন্দের ক্ষেত্রে তিনি কখনো ভান করেননি এবং তাঁর ভালোলাগার পরিধি বেলা বার্তোক থেকে রিচার্ড ক্লেডারম্যান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। একদিন আমি টিভিতে এলটন জনের একটা প্রোগ্রাম দেখছি, শুধুমাত্র পিয়ানো সহযোগে তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ গানগুলো গাইছিলেন। বাবা তখন সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। এই গায়ক সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ কোনো ধারণা ছিল না বললেই চলে। কিন্তু সেই সুর তাঁর পথ রুদ্ধ করে দিল, তিনি বসে পড়লেন এবং পুরো অনুষ্ঠানটা শুনলেন। তারপর মুগ্ধ হয়ে বললেন, ‘আরিব্বাস, এ তো একজন অসাধারণ বোলেরো গায়ক।’ সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছুকে নিজের সংস্কৃতি দিয়ে বোঝানোটা ছিল তাঁর নিজস্ব ধরণ। কক্ষনো ইউরোপীয় উদাহরণ টেনে আনতেন না, যদিও সর্বত্র সেটাই ছিল সাধারণ রীতি। তিনি জানতেন যে প্রকৃত শিল্প সুদূর কিয়োটোর একটা ফ্ল্যাট বাড়ি থেকে মিসিসিপির একটা অখ্যাত গ্রাম সব জায়গাতেই রচিত হতে পারে আর গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে লাতিন আমেরিকা বা ক্যারিবীয় উপকূলের যে কোনো প্রান্তিক, অবক্ষয়িত জায়গাও মানব-অভিজ্ঞতার শক্তিশালী প্রতিভূ হয়ে উঠতে পারে।

বাবা সবকিছু গোগ্রাসে পাঠ করতেন – ‘ওলা’ পত্রিকা থেকে চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত লেখা, মহম্মদ আলির স্মৃতিকথা বা ফ্রেডরিক ফরসিথের থ্রিলার - যাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শকে তিনি একদম পছন্দ করতেন না। খুব বেশি বিখ্যাত নয়, কিন্তু তাঁর খুব পছন্দের এমন বইয়ের মধ্যে ছিল থ্রনটন ওয়াইল্ডারের ‘The Ides of March’। আমার অর্ধেক জীবন জুড়ে বইটি তাঁর টেবিলে পড়ে থাকতে দেখেছি। আরো ছিল বিভিন্ন অভিধান ও নানা ভাষার রেফারেন্স বই, যা সারাক্ষণ তাঁর কাজে লাগত। কোনো স্প্যানিশ শব্দের অর্থ তিনি জানেন না, এমনটা কখনো দেখিনি। এমনকি প্রয়োজনে প্রতিটা শব্দের বুৎপত্তি বলে দিতে পারতেন। একবার একটা শব্দ মনে করার চেষ্টা করছিলেন কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিলেন না। শব্দটার অর্থ একটি লেখার পূর্ণ সমালোচনা বা ব্যখ্যা। মুহূর্তের জন্য তিনি যেন অন্য মানুষ হয়ে গেলেন। হাতের সমস্ত কাজ সরিয়ে রেখে পাগলের মতো শব্দটকে খুঁজছেন। তারপর যখন তা স্মরণে এল, চিৎকার করে বলে উঠলেনঃ ‘এক্সেহেসিস’। তখন তাঁর আনন্দ দেখার মতো। শব্দটা যে অব্যবহৃত এমনটা নয়, কিন্তু তাঁর জগতের থেকে দূরে তার অবস্থান। তাঁর মতে, সেটি পন্ডিতদের ও বুদ্ধিজীবিদের শব্দ, যাঁদেরকে তিনি প্রখর সন্দেহের চোখে দেখতেন।

১৮

সেদিনই সকালে, বেশ কিছুক্ষণ পরে, বাড়ির মধ্যে একটা মরা পাখি দেখতে পাওয়া গেল। বাড়িতে বসা বা খাওয়ার জন্য বাগানের দিকে মুখ করে যে একটা খোলা জায়গা ছিল কয়েকবছর আগে সেখানটা ছাদ দিয়ে ঘিরে নেওয়া হয়। তার দেওয়ালগুলো ছিল কাচের, তাই বোধহয় পাখিটা উড়তে উড়তে এসে, দিগভ্রান্ত হয়ে, কাচের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে মরে পড়েছিল সোফার উপর, ঠিক যেখানটায় বাবা বসতেন। তাঁর সেক্রেটারি আমায় বললেন যে, বাড়ির কর্মচারীরা দু’দলে ভাগ হয়ে গেছেনঃ একদল মনে করছেন এটা একটা অশুভ লক্ষণ, তাই পাখিটাকে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হোক; কিন্তু আরেক দলের মতে এটা শুভ, তাই ফুলের বাগানে কবর দেওয়া হোক। যাঁরা ফেলে দেওয়ার পক্ষে তাঁরাই এগিয়ে আছেন, পাখিটা ইতিমধ্যে রান্নাঘরের বাইরে একটা মাটির পাত্রে রেখে দিয়েছেন। তারপর, আরো অনেক তর্ক-বিতর্কের পর, পাখিটাকে বাগানের এক কোনে রেখে দেওয়া হল যতক্ষণ না তার সম্বন্ধে শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ঠিক হল উঠোনে টিয়াপাখির পাশে তাকে কবর দেওয়া হবে। সেখানে একটা বাচ্চা কুকুরও শায়িত ছিল। পোষ্যদের এই কবরগুলোর কথা বাবাকে কখনো বলা হত না, যাতে তিনি অযথা আতঙ্কিত না হন।

১৯

দুপুরবেলা মা, ভাই ও ভায়ের পরিবার - যাঁরা ফ্রান্স থেকে আগের রাতে এসে পৌঁচেছেন, আমরা সবাই একসঙ্গে বসলাম। তাছাড়াও বোগোতা থেকে এসে পৌঁচেছে মায়ের তরফের এক তুতো বোন। তার ছোটবেলা কেটেছে আমাদের সঙ্গে, আমাদেরই বাড়িতে। বাবার কন্যাসম ছিল সে। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে সবাই মানসিকভাবে বেশ হালকাই ছিলাম। হতে পারে, জীবিত মানুষের জন্য কেউ শোকপালন করে না, তাই। তাছাড়া, অনেকদিন বাদে আমরা সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়েছি আর আমাদের মধ্যে বেশির ভাগেরই বয়স অল্প, সে কারণেও হতে পারে।

এই সময় কাচের দরজা দিয়ে দেখতে পেলাম বাবার সেক্রেটারি তাঁর অফিস থেকে বেরিয়ে বাগানের মধ্যে দিয়ে দ্রুত আমাদের দিকে আসছেন। আমাকে চেঁচিয়ে বললেন যে নার্স আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। আর কাউকে কিছু না জানানোর চেষ্টা করলেন তিনি, কিন্তু সবাই বুঝে গেল যে কিছু একটা হয়েছে। যতটা সম্ভব শান্তভাবে ঘর থেকে বেরোলাম, কিন্তু সহসা ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

বাবার ঘরের দিকে যাচ্ছি, তখন দিনের বেলার নার্সটিও ঘর থেকে বেরিয়ে এদিকে আসছেন। আমাকে দেখে শঙ্কিতভাবে বললেন, ‘ওনার নাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না।’ ঘরে ঢুকে বাবাকে দেখে প্রথমে মনে হল দশ মিনিট আগে যেমন দেখেছিলাম এখনো তো ঠিক তেমনই আছেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর বুঝতে পারলাম আমার ভুল। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা যেন তাঁকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়ে গেছে – একটা ট্রেন বা একটা বাস কিংবা একটা বজ্রাঘাত – একটা কিছু যা শুধুমাত্র তাঁর জীবন প্রদীপটাকে নিভিয়ে দিয়ে গেছে। আরো কাছে এগিয়ে গেলাম। মুখ দিয়ে একটা খারাপ কথা বেরিয়ে গেল, তবে চাপা স্বরে। ওদিকে স্টেথোস্কোপ দিয়ে নার্স সমানে তাঁর নাড়ি খোঁজার চেষ্টা করে চলেছেন। তারপর ডাক্তারকে ফোন করলেন। বলে রাখা সত্ত্বেও আমাকে আগে না ডাকার জন্য মুহূর্তের জন্য তাঁর উপর খুব রাগ হল, কিন্তু মুখে কিছু বললাম না, তখন আর সে নিয়ে ভাবার অবসর নেই।

বাবার কার্ডিয়োলজিস্টকে ফোনে পাওয়া গেল। তাঁকে নার্স বললেন যে প্রায় তিন মিনিট হয়ে গেল নাড়ি পাচ্ছেন না। ডাক্তার আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। প্রথমে আমাকে সমবেদনা জানালেন ও বাড়িতে আসতে চাইলেন। কিন্তু আমি জানি যে এটা একটা উৎসবের দিন। জানি যে বাবা চলে গেছেন অনেক, অনেক দূরে। তাই ডাক্তারকে বললাম, আর আসার প্রয়োজন নেই। আমাদের মধ্যে কথা হয়েছিল যে অন্তিম মুহূর্ত যখন উপস্থিত হবে তিনিই হাসপাতালের ডাক্তারকে জানাবেন যাতে বাড়ি এসে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলো করতে পারেন। একতলায় ফোন করলাম। মা ফোন ধরলেন। তাঁকে বললাম, ‘সব শেষ হয়ে গেছে।’ কথাটা বেশ কষ্ট করে বললাম, চেষ্টা করলাম যাতে স্বর অবিকৃত থাকে, কিন্তু মা পুরোটা শোনার আগেই ফোন রেখে দিলেন। আবার বাবার কাছে ফিরে এলাম। তাঁর মাথাটা একপাশে হেলে গেছে, মুখ ঈষৎ উন্মুক্ত আর তাঁকে এত দূর্বল লাগছে, যেন এর চেয়ে বেশি দূর্বল কেউ হতে পারে না। তাঁকে এইরকম ভাবে দেখা, একজন মানুষের এই পরিণতি দেখা, একইসঙ্গে ভয়ংকর আবার নিশ্চিন্তও করে।  

দেখলাম মা সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছেন। পিছনে আমার ভাই ও তার পরিবার। সাধারণত মা-ই সবার চেয়ে ধীরে, সবার পেছনে হাঁটেন। এখন সবাই জায়গা ছেড়ে দিয়েছে যাতে মা সবার আগে যেতে পারেন। শেষ দিনগুলোয় মা সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে আমার আর ভায়ের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করেছেন। কিন্তু যে মুহূর্তে তিনি ঘরে ঢুকলেন ও বাবাকে দেখলেন, আমি বিস্মিত হয়ে দেখলাম, দশকের পর দশক দীর্ঘায়িত ওঁদের যুথবদ্ধ জীবন কেমনভাবে তাঁকে এই মুহূর্তটির সম্মুখীন হওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা দান করেছে। এই দুজন মানুষ যে অতীতে কখনো কখনো একে অন্যকে বুঝতে পারেননি, তা ভাবতেও অবাক লাগে। মা ছিলেন বাবার প্রতিবেশী, এভাবেই তাঁদের চেনাজানা। বাবার যখন ১৪ বছর বয়স আর মায়ের ১০, বাবা মাকে মজা করে বলেছিলেন যে তাঁকে বিয়ে করবেন আর মা তাই শুনে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। ওঁদের বিয়ের দিনে, এই মুহূর্ত থেকে ৫৭ বছর ২৮ দিন আগে, কিন্তু ঠিক একই সময়ে, যতক্ষণ না মা জানতে পেরেছেন যে বাবা গীর্জার বাইরে এসে পৌঁচেছেন ততক্ষণ পর্যন্ত বিয়ের পোশাক পরেননি, যাতে গীর্জার মধ্যে তাঁকে কনে বউয়ের সাজে বসিয়ে রেখে চলে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকে।

দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকেই মা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। নার্স এবং তাঁর সহকারিণী তখন মুখটা বন্ধ করার জন্য বাবার মাথাটা তুলে সযত্নে একটা তোয়ালে দিয়ে মাথা থেকে থুতনির নিচ দিয়ে ঘুরিয়ে বেঁধে দিচ্ছিলেন। খাটের দিকে যেতে যেতে মা বেশ উঁচু স্বরে বললেন, ‘আরো জোরে বাঁধুন।’ তারপর বাবাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত নির্বিকারভাবে জরিপ করে বললেন, ‘হ্যাঁ, এইবার ঠিক আছে’, যেন বাবা তাঁর একজন রুগী মাত্র। চাদরটা বুক অবধি টেনে হাত দিয়ে সমান করে দিলেন। তারপর বাবার হাতের উপর রাখলেন নিজের একটা হাত। ভালো করে দেখলেন মুখটা, হাত বুলিয়ে দিলেন কপালে। একটা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর একবার কেঁপে উঠলেন এবং কান্নায় ভেঙে পড়লেন, ‘বেচারা, সত্যি সত্যি ও চলে গেছে?’ নিজের অন্তরে বেদনা উপলব্ধিরও আগে তিনি বাবার জন্য প্রগাঢ় করুণা অনুভব করলেন। আমার সারা জীবনে মাকে তিনবার মাত্র কাঁদতে দেখেছি। শেষবারের এই কান্নাটা স্থায়ী হয়েছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড, কিন্তু সেই ক্রন্দনের ক্ষমতা ছিল একটা মেশিনগানের সমান।

পরের মুহূর্তগুলো ছিল একটু বিভ্রান্তিকর। মা ঘরের বাইরে বারান্দায় গিয়ে বসলেন এবং বেশ কয়েক মাসের মধ্যে এই প্রথম সত্যিকারের সিগারেট ধরালেন, ইলেকট্রনিক সিগারেট নয়। নার্সকে অনুরোধ করলেন চোয়াল শক্ত হয়ে যাওয়ার আগে বাবাকে নকল দাঁত পরিয়ে দিতে। বাবার মুখটা অনেক ভালো দেখতে লাগছে। আমার ভাই ও তার পরিবার বাবাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে আর খুব কাঁদছে। স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়ার আগে ওর ছেলে ও মেয়ের সঙ্গে বাবার খুব ভাব ছিল, ওরা তখন খুব ছোট। তারাও খুব কাঁদছে। খবরটা ইতিমধ্যে বাড়িময় ছড়িয়ে পড়েছে আর একে একে, কার পরে কে এখন আর মনে নেই, তবে বাড়ির সব কর্মচারীরা দরজার ধারে বা বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালেন আর অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইলেন। অন্যরা সামনে রয়েছে বলে তখন আর কেউ গ্রাহ্য করছে্ন না, যে যার মতো শোকপ্রকাশ করছেন। আর কোনো বাধা নেই যেন। প্রত্যেকে নিজের মতো করে এই মৃত্যুর সামনে নিজেকে উন্মোচিত করে দিচ্ছেন, যেন বা এ মৃত্যু তাঁদের সকলের সম্মিলিত শোক। মৃত্যু তো অপরিহার্য, কেউই তাকে এড়িয়ে যেতে পারবে না। কিন্তু শুধু কারুর অনুপস্থিতি নয়, মৃত্যু যেন তার চেয়ে অনেক বেশি শূণ্যতা সৃষ্টি করে। এমনকি ওই ঘরে থাকা নার্সদেরও এই মৃত্যু ছুঁয়ে গেছে। তাঁরা কাজ করে চলেছেন ঠিকই, কিন্তু কেমন যেন আত্মনিমগ্ন, মুখে দুঃখের স্পষ্ট ছাপ। আসলে মৃত্যু এমন একটা ঘটনা, যাতে কেউই অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে না।

টীকা:

১। বাইয়েনা: কলোম্বিয়ার একটি লোক-সঙ্গীত। এটি বিশেষ করে ক্যারিবীয় অঞ্চলের গান। বাইয়েনাতো শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘উপত্যকায় জাত’। এক্ষেত্রে সান্তা মার্তার সিয়েররা নেভাদা ও উত্তর-পূর্ব কলোম্বিয়ার সেররানিয়া দে পেরিখা পর্বতমালার উপত্যকার কথা বলা হচ্ছে। আবার যে অঞ্চলে এই গানের উৎপত্তি, সেই ‘বাইয়েদুপুর’ নামেরও প্রভাব রয়েছে।

২। কোম্পাদ্রে: খ্রীষ্টধর্মের নিয়ম অনুযায়ী একটি শিশুর ওই ধর্মে দীক্ষাদানের সময়ে বাবা-মায়ের আত্মীয় বা পরিচিত কোনো ব্যক্তি সেই কাজটি করেন। তখন ওই ব্যক্তিটি শিশুটির বাবার ‘কোম্পাদ্রে’ হন। ঘনিষ্ঠ বন্ধু অর্থেও এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। 


আগের পর্ব

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | চতুর্থ পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য


Sunday, February 6, 2022

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | চতুর্থ পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

১৪

আবার আমি কয়েক দিনের জন্য লস এঞ্জেলসে ফিরে গেলাম এডিটিংয়ের কাজে। দ্বিতীয় দিনে একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আলো নিভিয়ে দিতেই একটা প্রচণ্ড ভয় আমায় চেপে ধরল, এই বুঝি মাঝরাতে ফোন বেজে উঠবে। আর ঠিক সেটাই ঘটল। ফোনের অপর প্রান্তে ভায়ের গলা শুনতে পেলাম, সচেতনভাবে শান্ত থাকার চেষ্টা রয়েছে সেই স্বরে।

-হ্যালো, বাবার খুব জ্বর। ডাক্তার বলছেন তোমার এখুনি ফিরে আসাই ভালো।

ফোন রেখে ফোনেই পরের দিন ভোরের একটা টিকিট বুক করলাম। তারপর সেই অন্ধকারের মধ্যে সারারাত জেগে শুয়ে আছি। বুকের মধ্যে এক প্রবল কষ্টের অনুভূতি, ভায়ের জন্য, মায়ের জন্য এবং নিজের জন্যও। আমরা মানে আমি আর আমার ভাই যখন ছোট ছিলাম, মেহিকো আর স্পেনে বড় হয়ে উঠছি আর বাবা-মা দুজনের পরিবারের অন্যান্য সবাই থাকতেন কলোম্বিয়ায়, তখন আমরা যেন ছিলাম একটা ছোট্ট দল, একটা ক্লাবের মতো। সেই ক্লাবের প্রথম সদস্য এখন চলে যাওয়ার পথে। সেটা মেনে নিতে পারছিলাম না।

পরের দিন প্লেনের মধ্যে বসে মুহূর্তের জন্য আমি মনে করতে পারছিলাম না আমি ঠিক কোথায় যাচ্ছি, মেহিকোর দিকে যাচ্ছি নাকি মেহিকো থেকে ফিরছি। এমনই ছিল শেষের সেই দিনগুলোর বিভ্রান্তি। বিমানবন্দরে নেমে ইমিগ্রেশনের কাজ ও মালপত্র সংগ্রহের মধ্যে এক ফাঁকে ভাইকে ফোন করলাম।

-আমাদের হাতে আর ২৪ ঘণ্টা সময়ও নেই, সে বলল।

“আর মাস দুয়েক” থেকে “বড় জোর কয়েক সপ্তাহ”, সেখান থেকে “মাত্র ২৪ ঘণ্টা”-য় কিভাবে চলে এলাম আমরা? অসংখ্য নার্স, শল্যচিকিৎসক, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, ফুসফুস বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের প্রধান ও বার্ধক্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অগণিত কথোপকথনের পর, যাঁরা এতদিন কোনও কিছুই লুকিয়ে যাননি, তাঁদের এই নতুন ঘোষণার দৃঢ়তা যে কী নিষ্ঠুর! বাবার হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অবশ্য সমস্ত কিছু নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে দিয়েছিলেন, কি কি করা সম্ভব আর সম্ভাবনাই বা কী। এবার আমরা একটা নিশ্চিত জায়গায় এসে পৌঁছলাম। তবুও, যে নিশ্চয়তার সঙ্গে তাঁরা বলছেন যে আর একটা মাত্র দিন মাত্র বাকি, তা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল, কিন্তু এ ছাড়া আর কোনও হিসাবও তো সামনে নেই। দুটো কিডনিই কাজ করছে না, রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে, তা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া একসময় বন্ধ করে দেবে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাপ্তি যেভাবে ঘটেছে, বাবা তাদেরই অনুসরণ করছেন। এই যে জীবন, সেই কোন প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বয়ে চলেছে, আজও তা একই রকমভাবে অনিশ্চিত রয়ে গেছে। শুধু মৃত্যু যখন শিয়রে এসে দাঁড়ায়, সে কাউকে নিরাশ করে না। 

মালপত্রের বেল্টের দিকে যেতে যেতে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, নিজেকে মনে হল ছ’ ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা ও ১০৯ কেজি ওজনের স্কুলে পড়া ছোট্ট একটি লাজুক বালক। 

১৫

দিনের বেলার নার্সকে বললাম, বাবার মধ্যে সামান্যতম কোনও পরিবর্তন বা সেরকম কোনও লক্ষণ দেখলে, যা শেষের সেই ক্ষণের ইঙ্গিত বলে মনে হবে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে যেন আমাকে ডাকেন। তার সঙ্গে অবশ্য এও বললাম যে এটা কোনও নির্দেশ নয়, যদি কিছু লক্ষ্য করেন, তাহলে আমাকে জানালে আমি বাধিত হব। আমার ভায়ের স্ত্রী ও তার ছেলেমেয়েরা প্যারিস থেকে রওনা দিয়েছে আর আমার স্ত্রী ও মেয়েরা পরের দিন সকালের প্লেনে আসবে।

সেদিন দুপুরে, মা খাবার খেয়ে একটু ঘুমচ্ছেন, আমি বাবার পড়ার ঘরে বসে খুটখাট কাজ করছিলাম, বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি, মনে হল সব কিছু কী অদ্ভুত শান্ত! বাগানে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। অবাক হয়ে দেখলাম এই বাড়িরই উপরের একটা ঘরে একজন মানুষের জীবন নিভে আসছে, কিন্তু তার জন্য কোথাও বিন্দুমাত্র কোনও বিচলন নেই।

এই বাড়িটি যে লোকালয়ে অবস্থিত তা তৈরি করেছিলেন স্থপতি লুইস বারাগান, চার-পাঁচের দশকে। প্রাথমিকভাবে বাড়িগুলো ছিল মর্ডানিস্ট স্টাইলের, কিন্তু পরবর্তীতে, সাত-আটের দশকে, যে বিরাট বড় বড় বাড়ি তৈরি হয় তার স্থাপত্যশৈলীর যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে। বাবা কোনোদিনই এই জায়গাটার ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন না। কিন্তু একটা বাড়ি খুঁজে পেলেন, ব্যতিক্রমী স্থপতি মানুয়েল পাররার তৈরি। তিনি নিজস্ব একটা স্টাইল উদ্ভাবন করেছিলেন: ঔপনিবেশিক মেহিকো, স্পেনীয় এবং মূর স্টাইলের একটি সংমিশ্রণ। পুরোন বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে দরজা, জানলার ফ্রেম ও পাথরের কাজ সংগ্রহ করে নতুন বাড়ির অঙ্গীভূত করতেন। ফলে অন্যান্য যা উপাদানই ব্যবহার করা হোক না কেন বাড়ির একটা নিজস্বতা তৈরি হত, তাতে সঞ্চারিত হত মানবিক উত্তাপ। বাবা সবসময় তাঁর প্রশংসা করতেন এবং প্রতিবেশী আধুনিকমনস্ক বুদ্ধিজীবী ও শ্বেত পাথরের বিরাট বিরাট সব প্রাসাদের মাঝখানে এই বাড়িতে বাস করাটা বেশ উপভোগ করতেন।

মনে আছে ছোটবেলায় বাগানে ঘাসের উপর চিত হয়ে শুয়ে আকাশ দেখতাম। এই বাগানটাকে তখন কী ভালোই না লাগত! (এমনকি সেই বয়সেও বুঝতে পারতাম যে বাচ্চাদের ভালো লাগার জায়গাগুলো সবসময় যে বাস্তবে খুব আকর্ষণীয় হবে এমনটা নয়।) এই জায়গাটা থেকে সন্ধ্যা নেমে আসা দেখার অনুভূতিটা ছিল অসাধারণ। মেহিকোর রাজধানীতে যাঁরা বাস করেন তাঁরা জানেন যে প্রায়শই এখানে অভূতপূর্ব সন্ধ্যা নামে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কখনো কখনো, বৃষ্টির পর, বাতাস হয়ে ওঠে সজীবস্বচ্ছ আর তাতে থাকে অপূর্ব এক সুবাস। দূরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে আহুস্কো আগ্নেয়গিরি আর হঠাৎই গোটা শহরের উপর নেমে আসে শান্তির আস্তরণ। তখন আর মনে হবে না যে একটা দূষণে ভরা, হট্টগোলে আকীর্ণ এক বৃহৎ নগরে আমরা বাস করছি, বরং অনেক আগে যেমন ছিল, সেই মায়াময় এক সুন্দরী উপত্যকায় থাকার অনুভূতি ঘন হয়ে আসবে মনে এবং মুহূর্তের জন্য নস্টালজিয়ার পাশাপাশি এক গভীর আশার সঞ্চার ঘটবে। আমার ভাইয়ের বিয়ে হয়েছিল এই বাগানে, এক সূর্যকরোজ্জ্বল দিনে। অনুষ্ঠান শুরুর ঘণ্টা খানেক পরে প্রচণ্ড ঝড় ও শিলাবৃষ্টি আছড়ে পড়ে। কিন্তু আমার বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। কারণ তাঁর বিশ্বাস, সেটা ছিল শুভ লক্ষণ। এটাও ঠিক যে ওরা তিরিশ বছর ধরে সুখী বিবাহিত জীবন যাপন করে আসছে।

এই বাগানেই বাবার ৭০ বছরের জন্মদিনের উৎসব হয়েছিল। তিনি ঠিক করেছিলেন শুধু তাঁর সমবয়সী মানুষদের নিমন্ত্রণ করবেন। তাঁর চেয়ে ছোট কিছু বন্ধু-বান্ধব খুবই ক্ষুব্ধ হন এতে, সেকথা তাঁর গোচরেও আনেন। কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইলেন; তাঁর মতে এই দীর্ঘ জীবনের সমস্ত পরিচিত বা কাছের মানুষদের এই বাড়িতে ধরানো সম্ভব নয়, তাই শুধুমাত্র তাঁর বয়সী মানুষদেরই ডাকা হবে। তবে মনে মনে দুঃখ পেয়েছিলেন, অন্যদের অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার জন্য।

বাড়ির একতলাতে ছিলাম আমি। দুপুরের খাওয়ার পর রান্নাঘর পরিষ্কার করলাম। বসার ঘরটা ঠিক যেমন ছিল তেমনই আছে। তবে একেবারে নিশ্চিত করে সেকথা বলা যায় না, কারণ ঘরের আসবাবপত্র, সংগৃহীত প্রতিটি শিল্পকর্ম ও অগণিত ছোটখাটো জিনিষ সেখানে জড়ো হয়েছে দশকের পর দশক ধরে আর সেগুলো একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে এক অনির্দিষ্ট নতুনত্ব, আবার তার সঙ্গে রয়েছে প্রাচীনত্বের আভাসও। ওদের মধ্যে কিছু জিনিষ কবে যে আনা হয়েছিল তা সঠিকভাবে বলা অসম্ভব। বেশ পুরোন ছোট্ট একটা পাথরের তৈরি জিনিষ আছে, অনেকটা ফুলের মতো দেখতে, যার পাপড়িগুলো ছুরির মতো ধারালো। এটা আছে আটের দশকের গোড়া থেকে। রাফায়েল আলবের্তির হাতে লেখা একটা কবিতা আছে সাতের দশক থেকে - ৪০ বছর নির্বাসনে থাকার পর যখন তিনি মাদ্রিদে ফিরে যান তার পর। আরও আছে আলেখান্দ্রো ওব্রেগোনের একটি আত্মপ্রতিকৃতি, যার মধ্যে গুলির গর্ত হয়ে আছে (এক রাতে মদ্যপ অবস্থায় প্রচণ্ড রেগে গিয়ে শিল্পী রিভলভার দিয়ে নিজের ছবির চোখে গুলি করেন, কারণ তাঁর পরিণত বয়স্ক ছেলেরা ওই ছবির দখলদারি নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছিল) এবং লার্তিগের একটি ফটোগ্রাফির বই, যেটা সেই বারো বছর বয়স থেকে দেখে আসছি।

প্রায় ২৫ বছর যাবত বাড়িতে একটা টিয়াপাখি ছিল। বিকেলবেলায়, যখন কোনও একটা দরজা বন্ধ করা হত বা টেলিফোন বাজত, কখনো কখনো সে অদৃশ্য এক সুন্দরী তরুণীর উদ্দেশ্যে শিস দিত। তারপর, এই কাজটা করতে গিয়ে এত পরিশ্রম হয়ে যেত যে বাকি দিনটা নিঃশব্দে বিশ্রাম করত। আমরা সবাই যে তার প্রতি খুব মনোযোগী ছিলাম, এমনটা নয়; কিন্তু তার মৃত্যুর পর সকলেই খুব কাতর হয়ে পড়েছিলাম।

১৬

সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাবার ঘরের কাছে গেলাম। ভেতরে দেখলাম দিনের বেলার নার্সটি কিছু লিখছেন আর তাঁর সাহায্যকারিণী একটা পত্রিকা পড়ছেন। বাবা একদম শান্ত হয়ে শুয়ে আছেন, দেখে মনে হবে বুঝি ঘুমচ্ছেন। কিন্তু বাড়ির মধ্যে এই ঘরটাকে মনে হচ্ছে যেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আশপাশের সবকিছু ধীর, অচঞ্চল হলেও সময় সেখানে ঘোড়ায় জিন দিয়ে ছুটে চলেছে, এই মুহূর্ত থেকে পরের মুহূর্তে পৌঁছতে তার সে কী ভীষণ ব্যস্ততা! সে যেন আর নিয়মের অধীন নয়।

খাটের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বাবাকে দেখছিলাম। কী চেহারা হয়ে গেছে! মনে হল আমি শুধু তাঁর ছেলে নই, সেই ছোট্ট খোকাটি শুধু নই আর, একই সঙ্গে তাঁর পিতাও। বেশ ভালো করেই জানি যে তাঁর দীর্ঘ সাতাশি বছরের বিস্তৃত জীবনের কথা আমি বলছি। তার সূচনা, মধ্যগতি এবং সমাপ্তি – এখন আমার সামনে এবং তা থেকে বাচ্চাদের অ্যাকর্ডিয়ান বইয়ের মতো একটার পর একটা পাতা খুলে যাচ্ছে।

একজন মানুষের অন্তিম পরিণতি জেনে গেলে উৎকণ্ঠায় ভরে ওঠে মন। আমার জন্মের আগের যেসব কাহিনী, তা অবশ্যই ছিল বাবা, মা, কাকাদের বলা গল্প বা আত্মীয়, বন্ধু, সাংবাদিক, জীবনীকারদের পুনরাবৃত্তির এক মিশ্রণ এবং আমার কল্পনাশক্তি তাকে আরও নানা রঙে রঙিন করে তুলেছিল। বাবার বয়স যখন মেরেকেটে ছয়, একটা ফুটবল দলে গোলরক্ষক হিসেবে খেলতেন। তাঁর ধারণা ছিল যে তিনি বেশ ভালোই খেলতেন, সাধারণের চেয়েও ভালো এবং খুব গর্ববোধ করতেন তাই নিয়ে। এর দু’-এক বছর পরে উপযুক্ত চশমা ছাড়া সূর্যগ্রহণ দেখেছিলেন বলে তাঁর বাঁ চোখের মাঝখানের দৃষ্টি চলে যায়। একদিন তাঁর দাদুর বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন কয়েকজন মানুষ একটা লোকের মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর ওই মৃত ব্যক্তির স্ত্রী পেছন পেছন হাঁটছে, সে একহাতে একটা বাচ্চাকে ধরে আছে ও অন্য হাতে মৃত স্বামীর ঝুলে থাকা মাথাটা। তিনি নিজের ভাগের জেলির মধ্যে থুতু ফেলে এবং জুতোর মধ্যে কলাভাজা রেখে খেতেন যাতে ছোট ছোট অসংখ্য ভাইবোন তাঁর সেই খাবার কেড়ে খেতে না পারে। কৈশোরকালে মাগদালেনা নদী দিয়ে যাওয়ার সময় একবার প্রবল একাকীত্ব অনুভব করেছিলেন। প্যারিসে থাকার সময় একদিন দুপুরে এক মহিলার সঙ্গে দেখা করতে যান এবং কথা বলতে বলতে অকারণ দেরি করতে থাকেন যাতে ওই মহিলা তাঁকে খেয়ে যেতে বলেন, কারণ ওনার কাছে তখন একটা পয়সাও ছিল না আর কয়েকদিন ধরে খেতে পাননি কিছুই। কিন্তু এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সেখান থেকে বেরিয়ে ওই মহিলার বাড়িরই রাখা জঞ্জাল ঘেঁটে যা পেয়েছিলেন, তাই খেয়েছিলেন। (আমার যখন পনের বছর বয়স বাবা এই গল্পটা আমার সামনেই অন্যদের বলছিলেন আর কী লজ্জা যে করছিল আমার।) প্যারিসে সেই সময় ছিলেন চিলের এক নিঃসঙ্গ তরুণী বিয়োলেতা পাররা। সেখানে থাকা দেশছাড়া লাতিন আমেরিকার মানুষদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝেই তাঁর সঙ্গে দেখা হত বাবার। তিনি লেখালেখি করতেন এবং অসাধারণ হৃদয়স্পর্শী গান গাইতেন। অনেক বছর পরে তিনি আত্মহত্যা করেন। ১৯৬৬ সালের এক বিকেলে, মেহিকোর এই রাজধানী শহরে, বাড়ির দোতলায় উঠে মা যেখানে খাটের উপর শুয়ে ছিলেন, সেখানে গিয়ে বললেন, কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মৃত্যুর কথা লেখা শেষ হল।

-কর্নেলকে মেরে ফেললাম, তিনি বললেন, তিনি তখন সান্ত্বনার অতীত।

মা বুঝতেন বাবার কাছে এর অর্থ কতখানি। দুজনে দীর্ঘক্ষণ, একসঙ্গে, নিঃশব্দে বসে রইলেন।

একথা ঠিক যে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সাহিত্যিক জনপ্রিয়তার শিখরে অবস্থান করেছিলেন, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও সামাজিক প্রতিপত্তিও অর্জন করেছিলেন যথেষ্ট, কিন্তু তারই পাশাপাশি কিছু দিন গেছে বড় বেদনার। একদিকে যেমন ৪৬ বছর বয়সে আলবারো সেপেদার মৃত্যু, ড্রাগ-মাফিয়াদের দ্বারা ৬১ বছরের সাংবাদিক গিয়েরমো কানোর হত্যা ও তাঁর সবচেয়ে ছোট দুই ভাইয়ের মৃত্যু, অন্যদিকে তেমন খ্যাতির একাকীত্ব, স্মৃতিভ্রংশ ও তার ফলে লিখতে না পারা। একেবারে শেষের দিকে, তাঁর নিজের লেখা বই প্রকাশিত হওয়ার পর সেই প্রথম পড়তে শুরু করলেন এবং যেন প্রথমবার গল্পটা পড়ছেন এমনভাবে আমাকে একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, “কোন চুলো থেকে এসব বেরিয়েছে?” বইগুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে গেলেন, এক একবার মনে হচ্ছিল প্রচ্ছদটা যেন তাঁর চেনা, কিন্তু বিষয়বস্তু বিশেষ বুঝতে পারছিলেন না। কখনো কখনো বইটা বন্ধ করার পর পিছনের পাতায় নিজের ছবি দেখে এমন চমকে উঠতেন যে আবার বইটা ফিরে পড়ার চেষ্টা করতেন।

সেখানে দাঁড়িয়ে আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হল যে ডিমেন্সিয়া সত্ত্বেও (এবং সম্ভবত মরফিনের প্রভাব সত্ত্বেও) এখনো পর্যন্ত তাঁর মস্তিষ্ক ঠিক তেমনই সৃজনশীলতায় পরিপূর্ণ, যেমনটা ছিল সারাজীবন। হয়তো খানিক ক্ষত তৈরি হয়েছে, তাই পুরোন চিন্তাভাবনায় ফিরতে পারছেন না বা যুক্তির শৃঙ্খলা বজায় থাকছে না, কিন্তু এখনো সক্রিয় আছে। সর্বদাই তাঁর কল্পনাশক্তিতে ছিল প্রতিভার অভূতপূর্ব স্ফুরণ। বুয়েন্দিয়া পরিবারের ছয় প্রজন্ম নিয়ে তৈরি হয়েছিল ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’। অবশ্য আরও দুই প্রজন্মের সমস্ত উপাদান তাঁর কাছে সঞ্চিত ছিল। কিন্তু উপন্যাসটি অনেক বেশি বড় ও ক্লান্তিকর হয়ে যাবে এই ভয়ে তা বাদ দেন। বাবা মনে করতেন কঠোর নিয়মানুবর্তিতা হল একটি উপন্যাস লেখার প্রধান স্তম্ভগুলির একটি, বিশেষ করে গল্পের কাঠামো ও তার সীমানা প্রস্তুত করার জন্য। যাঁরা মনে করতেন যে উপন্যাসের গঠনশৈলী নির্মাণের ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীনতা পাওয়া যায় এবং সেই কারণে সিনেমার চিত্রনাট্য বা একটি গল্প লেখার থেকে উপন্যাস লেখা অনেক বেশি সহজ, তিনি তাঁদের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তিনি বলতেন যে একজন ঔপন্যাসিককে অবশ্যই তার যাত্রাপথ নির্দিষ্ট করে নিতে হবে, যাতে ‘উপন্যাসের চোরাবালিতে’ হারিয়ে না যান।

১৯২৭ সালে আরাকাতাকা থেকে ২০১৪ সালে মেহিকো শহরে আজকের এই দিন – এক দীর্ঘ ও ব্যতিক্রমী যাত্রা, সমাধি প্রস্তরের উপর শুধু ওই তারিখদুটো দিয়ে যাকে আয়ত্ত করার চেষ্টা নিতান্তই বৃথা। আমার মতে, লাতিন আমেরিকার প্রায় কোনও মানুষই এরকম বিশেষত্ব ও সৌভাগ্যপূর্ণ জীবন যাপন করেননি। যাঁরা একথা মেনে নিতে পারেন বলে আমার মনে হয়, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে যিনি থাকতেন, তিনি আমার বাবা। 


আগের পর্ব


গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | তৃতীয় পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

Saturday, December 25, 2021

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | তৃতীয় পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি প্রতিদিন দুপুরবেলায় বাবা-মা ঘুমতেন। প্রায় কখনোই তার ব্যত্যয় ঘটেনি। মাঝে মধ্যে বাবা আমাদের বলতেন যদি সময় মতো ঘুম না ভাঙে তাহলে তাঁকে ডেকে দিতে। কিন্তু আমি আর আমার ভাই দুজনে সেই ছোটবেলাতেই বুঝে গিয়েছিলাম যে কাজটা খুবই ঝুঁকির। জাগানোর সময় যদি কেউ তাঁর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকত বা তাঁর গায়ে হাত দিয়ে ডাকত, সঙ্গে সঙ্গে এমন চিৎকার করে লাফিয়ে উঠতেন যেন প্রচণ্ড ভয় পেয়েছেন আর এমনভাবে হাত নাড়াতেন যেন কারুর থেকে বা কোনও কিছুর থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চাইছেন। তখন খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাসও নিতেন। জাগ্রত বিশ্বে নিজেকে খুঁজে নিতে তাঁর কয়েক লহমা সময় লাগত। তাই আমরা একটা কৌশল আবিষ্কার করেছিলাম: শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে খুব আস্তে আস্তে নরম স্বরে তাঁর নাম ধরে একটানা ডেকে যেতাম। তা সত্ত্বেও কখনও কখনও লাফ দিয়ে জেগে উঠতেন, তবে সাধারণত তা করতেন না। আর যেই তিনি ভয় পেয়ে জেগে উঠতেন আমরা এক ছুটে বারান্দায় পালিয়ে যেতাম।

তারপর ভালো করে ঘুম কেটে গেলে এমন করে দু’হাত মুখে বোলাতেন যেন মনে হত ধীরে ধীরে মুখ ধুচ্ছেন। তারপর তাঁর সেই প্রিয় নাম ধরে আমাদের ডাকতেন: ‘পেররো বুররো’১। হাতছানি দিয়ে আমাদের কাছে ডাকতেন ও তাঁকে চুমু খেতে বলতেন। জিজ্ঞাসা করতেন: “নতুন কি খবর আছে? কেমন চলছে সব?” রাতেও প্রায়শই শুনতে পেতাম ঘুমের মধ্যে গোঁ গোঁ শব্দ করছেন আর জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন। মা তখন কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বাবাকে ডেকে তুলতেন। একদিন ওইরকম অশান্ত ভাবে সিয়েস্তা২ থেকে ওঠার পর তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কি স্বপ্ন দেখছিলেন। তিনি চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করলেন।

-একটা খুব সুন্দর দিন আর আমি একটা ছোট ডিঙি নৌকায় বসে আছি, কিন্তু সঙ্গে কোনও দাঁড় নেই। একটা তিরতিরে শান্ত নদীর উপর দিয়ে নিঃশব্দে, খুব ধীরে ধীরে ভেসে চলেছি।

-এখানে দুঃস্বপ্নটা কোথায়? জিজ্ঞাসা করলাম।

-আমি জানি না।

কিন্তু আমার ধারণা যে তিনি জানতেন। কারণ তাঁর লেখায় সাংকেতিক কিছু আছে এ কথা তিনি সমানে অস্বীকার করলেও এবং কেতাবি ও বিদ্বজ্জনের সব তত্ত্ব যা তার গল্পের মধ্যে রূপকের সন্ধান করে তার থেকে সব সময় নিজেকে দূরে রাখলেও তিনি জানতেন যে আর সকলের মতো তিনিও অজ্ঞান মনের দাস। জানতেন যে একটা জিনিষ অন্য জিনিষের ভাবার্থ বহন করতে পারে। এবং অন্য অনেক লেখকের মতোই ধ্বংস এবং তার সর্বোচ্চ প্রকাশ মৃত্যু সম্পর্কে উদ্বিগ্ন ছিলেন। মৃত্যু– শৃঙ্খলাপূর্ণ ও শৃঙ্খলাহীন, যৌক্তিক ও যুক্তিহীন, অবধারিত ও অগ্রহণীয়।   

বাবার বয়স যখন সবে সত্তরের কোঠায়, বেশ কয়েকবার কেমোথেরাপির সময়ে এবং পরে, তিনি তাঁর স্মৃতিকথা লিখেছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন কয়েক খণ্ডে তা প্রকাশ করবেন। প্রথম খণ্ড শুরু হয়েছিল বহু পুরনো স্মৃতির হাত ধরে আর শেষ হল তাঁর সাতাশ বছর বয়সে, যখন সাংবাদিক হিসাবে প্যারিসে গিয়েছেন। কিন্তু তারপর আর কিছু লিখলেন না, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল সাফল্যের সময়গুলোর কথাই শুধু লিখলে আর সব বিখ্যাত আত্মজীবনীর মতো খ্যাতনামা ব্যক্তিদের সঙ্গে যাপনের মহিমা কীর্তন করা হবে। যেমন, অমুক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এক রাত কি তমুক চিত্রকরের চিত্রশালা দর্শন বা রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র কি এক প্রতিভাধর বিপ্লবীর সঙ্গে জলযোগ।

-আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডটাই আমার ভালো লাগে, বাবা বলেছিলেন, কারণ ওর মধ্যেই আছে আমার লেখক হয়ে ওঠার সময়টার কথা।

একবার একটা অন্য প্রসঙ্গে বলেছিলেন:

-আট বছর বয়সের পর আর আমার জীবনে আকর্ষণীয় কিছু ঘটেনি।

ওই বয়সেই তিনি দাদু-দিদিমার বাড়ি ছেড়ে, আরাকাতাকা ছেড়ে চলে এসেছিলেন। ছেড়ে এসেছিলেন সেই জগৎ যা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল তাঁর প্রথম দিকের সৃষ্টিকে। তিনি স্বীকারও করেছিলেন যে প্রথম জীবনের লেখাগুলোই ছিল ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’-র জন্য হাত পাকানোর আসর।

স্মৃতিকথা লেখার জন্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে বাবা তাঁর প্রাইমারি স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকের সঙ্গেই সেই শৈশবের পর আর দেখা হয়নি বা কোনোরকম কোনও যোগাযোগ ছিল না। কয়েকজনের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ে বা স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলেন, কারণ বন্ধুটি মারা গিয়েছিলেন। জীবনের এই দীর্ঘ পথ পারি দিতে গিয়ে যে কিছু বন্ধুকে ইতিমধ্যেই হারিয়ে ফেলেছেন, এ আশঙ্কা তাঁর ছিল। কিন্তু কয়েকজনের ক্ষেত্রে যখন শুনলেন যে কিছু সময় মাত্র আগে তাঁরা মারা গেছেন তখন খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। তাঁরা সফল জীবন যাপন করেছেন, মোটামুটি সুখী ও সৃষ্টিশীল জীবন ছিল তাঁদের এবং সত্তরের কোঠায় পৌঁছে মারা গিয়েছেন, যা ছিল মৃত্যুর গড় বয়স। তাই ওই সব বন্ধুদের মৃত্যু কোনও ট্র্যাজিক ঘটনা নয়, বরং জীবনচক্রের স্বাভাবিক পরিণতিই বলা যায়। এই সময়টার পর তিনি বলতে থাকেন ‘আগে মারা যাননি এরকম অনেক মানুষ এখন মারা যাচ্ছেন’ এবং নিজের রসিকতায় নিজেই হাসতেন।

১০

যদিও স্বভাবগতভাবে তিনি মিশুকে ছিলেন এবং আপাতভাবে মনে হত যে বাইরের জগতের সঙ্গে তিনি ভালোই খাপ খাইয়ে নিয়েছেন, কিন্তু আমার বাবা আসলে খুবই মুখচোরা মানুষ, তাঁকে অন্তর্মুখী বললেও ভুল বলা হবে না। তাই বলে খ্যাতি উপভোগ করতে পারতেন না, তা নয় বা দীর্ঘ সময় ধরে খ্যাতির শীর্ষে থাকার ফলে নার্সিসিজম থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন, এমনটাও বলা যায় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সমস্ত সময় খ্যাতি ও সাহিত্যিক সাফল্যকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। আমাদেরকে (এবং নিজেকেও) বারবার মনে করিয়ে দিতেন যে তলস্তয়, প্রুস্ত আর বোর্হেস নোবেল পাননি। যেমন পাননি তাঁর প্রিয় লেখক ভার্জিনিয়া উলফ, হুয়ান রুলফো ও গ্রাহাম গ্রিন। মাঝে মাঝে তাঁর মনে হত যে এই সাফল্য তিনি অর্জন করেননি, তাঁর জীবনে ঘটে গেছে মাত্র। কখনও নিজের প্রকাশিত বই ফিরে পড়তেন না (অবশ্য শেষ বয়সে যখন তাঁর স্মৃতি ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল তখন এই কাজটা অনেকবার করেছেন)এই ভয়ে যে অসম্পূর্ণতা খুঁজে পেতে পারেন আর সেটা তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে ব্যহত করবে।

১১

দু’দিনের জন্য আমাকে লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিরতে হল। সেখানে একটা চলচ্চিত্রের এডিটিংয়ের কাজ করছিলাম। গল্পটা হল বাবা আর ছেলের। যে দৃশ্যটা নিয়ে তখন কাজ করছিলাম, একটা দীর্ঘ ক্লাইম্যাক্সের দৃশ্য, সেখানে একটার পর একটা ঘটনার মধ্যে দিয়ে বাবা ধীরে ধীরে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে এবং তার জন্য সম্ভবত ছেলেটিও খানিকটা দায়ী। দৃশ্যটি খুবই করুণ, একটা দুর্ঘটনার পর সংঘর্ষ হল, তারপর মৃতদেহ বহন করে আনা হল, তাকে ধোয়া হল, তারপর শেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মৃতদেহটি ধ্বংস হয়ে গেল আর এই পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে গেল বাবা। যখন নিজের বাবার জীবনের শেষ কয়েকটা মাত্র দিন কি কয়েকটা সপ্তাহ বাকি, তখন এরকম একটা বিষয় নিয়ে কাজ করতে গেলে যে ভয়ংকর অনুভূতির সম্মুখীন হতে হবে তা কারুর পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবুও ঈশ্বরের পরিহাস হিসাবেই তাকে মেনে নিলাম। কিন্তু সময় যত এগোতে থাকল এই দৃশ্যগুলো নিয়ে আর অনায়াসে কাজ করে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। আমি শ্রান্ত, বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছিলাম। এই রকম একটা গল্প লেখার জন্য তখন নিজের উপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তখন প্রচুর চকোলেট খেতাম আর ভাবতাম যে গল্প আমাদের হাসায় সেটা লেখাই বোধহয় সবথেকে ভালো। আমি নিশ্চিত, পরের বার তাই-ই করব। অথবা হয়তো তা করব না।  

চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবে কাজ শুরু করার প্রথম দিকে অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন কোন কোন শিল্পীর কাজ আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। আমি বেশ সতর্কতার সঙ্গে নামের একটা তালিকা বলতাম। মোটামুটি একটা নিজস্বতা বজায় রাখার চেষ্টা করতাম, তবে অনেক নামই ছিল অবধারিত। কিন্তু একটা পর্যায়ে পৌঁছে বুঝতে পারলাম যে আসলে আমি সত্যকথন থেকে বিরত থেকেছি। কোনও পরিচালক, লেখক, কবি, এমনকি কোনও ছবি বা গান আমাকে যা প্রভাবিত করেছে তার থেকে ঢের ঢের বেশি প্রভাবিত হয়েছি আমার বাবা-মায়ের দ্বারা, আমার ভাই, আমার স্ত্রী আর আমার মেয়েদের দ্বারা। জীবনের সমস্ত মূল্যবান শিক্ষা মানুষ মূলত বাড়ি থেকেই  শেখে।

১২

এক সপ্তাহের একটু বেশি হল বাবা হাসপাতাল থেকে বাড়ি এসেছেন, কিন্তু মেহিকো থেকে ফিরে আসার পর মাকে এর মধ্যেই খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আমার কি মনে হয় যে সত্যি সত্যিই আরও কয়েকটা মাস বাকি। এমনভাবে প্রশ্নটা করলেন যে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম এই সময়কে ধারণ করার ক্ষমতা তাঁর নেই। বাবার জন্য বাড়িতে অত্যন্ত সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাঁকে রাখা হয়েছিল প্রধান শোবার ঘরগুলোর থেকে একটু দূরে, দিনে-রাতে সর্বক্ষণ দেখাশোনার লোক ছিল এবং সর্বোপরি তিনি বেশ শান্তই ছিলেন। বাড়ির বাকি অংশে মনেও হত না যে সেখানে অস্বাভাবিক কিছু ঘটে চলেছে। কিন্তু আমার মায়ের কাছে বাবার ওই ঘরটার ঘড়ির টিকটিক শব্দটাকেও মনে হত বড় দীর্ঘ আর গির্জার ঘণ্টাধ্বনির মতো উচ্চকিত।

মাকে বললাম, অত দিন বোধহয় পাব না। তবে সেকথা বলেছিলাম শুধুমাত্র মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য। পরের দিন সকালে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এলেন এবং বেশ কিছুক্ষণ ধরে বাবাকে পরীক্ষা করার পর মত বদলালেন: মনে হয় না আরও কয়েক মাস, বড় জোর আর কয়েক সপ্তাহ। মা চুপচাপ কথাটা শুনলেন সিগারেট খেতে খেতে, সম্ভবত একই সঙ্গে স্বস্তি ও বেদনার বোধ তাঁকে ঘিরে ধরল।

বেশ কিছুক্ষণ পরে বছর চল্লিশের একজন বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ এসে মাকে বোঝাতে লাগলেন শেষের সেই সময়ে কিভাবে যত্ন নিতে হবে। তখনও পর্যন্ত যতজন চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে তাঁদের মধ্যে ইনিই সর্বকনিষ্ঠ। ব্যাপারটা বেশ অপ্রত্যাশিতই ছিল, কেননা এরকম একজন যুবক বার্ধক্যের সমস্যা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হবেন তা আর কে আশা করে। মা তো তাঁকে প্রায় জেরা করলেন, যেমন সবাইকে করেন। চিকিৎসক আমাদেরকে বললেন যে বাবার একটা লিম্ফ নোড ক্যান্সার হয়েছে যা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তখন তাঁকে একেবারে অন্যরকম মনে হল, যেন খুবই বিষণ্ণ হয়ে পড়েছেন। তাঁর নিজের থেকে বয়সে অনেক বড় রোগীর মুমূর্ষু অবস্থার সামনে তিনি নিশ্চয়ই অস্থির হয়ে পড়েছেন। বললেন যে সেই মুহূর্তটি যখন আসবে, আমরা চাইলে স্যালাইন খুলে দিয়ে সময়কে ত্বরান্বিত করতে পারি। আমাদের ব্যাখ্যা করে বললেন যে কিছু দেশের নিয়ম অনুযায়ী কোনও অবস্থাতেই রোগীর স্যালাইন খুলে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না, যেহেতু সেখানে জলের প্রয়োজনকে মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে গণ্য করা হয়। কিন্তু মেহিকোর আইন ভিন্ন আর তাই মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে পরিবারের লোকজন স্যালাইন খুলে দেওয়ার অনুমতি দেয় আর এটা খুব একটা বিরল ঘটনা নয়। তাছাড়া রোগী তখন ওষুধের প্রভাবে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে, ফলে কষ্ট পায় না। নিঃশব্দে তাঁর সমস্ত কথা শুনলাম, যেন কোনও একটি লেখার এক অদ্ভুত স্বগতোক্তি আমরা শুনছি। কথাগুলো নির্দয় এবং অদ্ভুত। বাস্তববাদী, সহানুভূতিপূর্ণ, হননোদ্যত।

১৩

মা আর আমি একসঙ্গে বসে টিভিতে খবর দেখছি, হঠাৎ আমাকে বললেন: “আমাদের তৈরি থাকতে হবে কেননা একটা সার্কাস হতে চলেছে।” বাবার মৃত্যুর মুহূর্তে গোটা পৃথিবীর সংবাদ মাধ্যম, পাঠক ও বন্ধুদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়ার সূচনা হবে মা তার কথাই বলছিলেন। বাবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই অসংখ্য মানুষ ফোন করতে ও চিঠি লিখতে শুরু করেছিলেন। তারপর কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ঘোষণা করল যে তিনি বাড়ি ফিরে গিয়েছেন, জীবনের অন্তিম সময়টুকু যাপনের জন্য। তাঁর ৮৭ বছর বয়স, সুতরাং যে কোনও সময়ে কিছু একটা ঘটে যেতে পারে।

ভায়ের সঙ্গে আলোচনা করে স্থির করলাম বাবা মারা যাওয়ার পরেই কয়েকজন সাংবাদিক, যাঁদের সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ আছে, তাঁদের ফোন করতে হবে। তবে সেটা খুব বেশি নয়: কলোম্বিয়ার দুজন, একজন সে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রের আর অন্যজন, বছর কুড়ি বয়সে বাবা যে সংবাদপত্রে প্রথম কাজ শুরু করেন, সেখানকার। আর মেহিকোতে দেশের প্রধান সাংবাদিকদের মধ্যে অন্যতম এক মহিলা সাংবাদিক, যিনি রেডিও ও টিভির সংবাদের সঙ্গে যুক্ত। তাছাড়া কয়েকজন নিকট বন্ধুদের জানাতে হবে, যাঁরা তাঁদের সুবিধামতো খবরটি প্রচার করবেন। এঁদের মধ্যে অবশ্যই ছিলেন বাবার এজেন্ট ও বান্ধবী, বার্সেলোনার এক দম্পতি এবং এক ভাই, যিনি কলোম্বিয়ায় তাঁর পরিবারের অন্যতম মূল স্তম্ভ। যদিও এঁরা সকলেই এই অন্তিম পরিস্থিতি সম্বন্ধে অবগত ছিলেন।

টীকা:

১। পেররো বুররো: পেররো অর্থাৎ কুকুর আর বুররো অর্থাৎ গাধা।

২। সিয়েস্তা: ভাতঘুম


আগের পর্ব

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | দ্বিতীয় পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

Tuesday, November 16, 2021

দাক্ষিণ্য | অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

ফিরে এসে দেখি আমাদের ছাউনির

মাঝখান দিয়ে রেললাইন ছাড়াই

ট্রান্সআটলান্টিক এক্সপ্রেস 

ছুটে গেছে, আর সমস্ত সুনশান


যাবার মুখে বিলিয়ে গেছে তার 

করুণাঘন একটি ইশতেহার:

"যারা মৃত তাদের জন্য আর 

ভিসা লাগবে না নায়েগ্রা দেখবার।।"



কবির পাণ্ডুলিপি সৌজন্যে: এলিজাবেথ গ্যুন্টার

Poems of Alokeranjan Dasgupta | Translated by Elisabeth Gunther

I HAVE REMAINED AN EXAMINEE

Alokeranjan Dasgupta


Still I have remained a mere examinee, the bearers, 

having laid me down on the cremation ground 

and taken their reward, began investigating whether 

my singing voice was still intact. A portly priest 

pocketed his fee and wanted to see my bio-data; 

his holy thread was dirty enough, but penetratingly 

he assessed how pure I had been in manner of life. 

Were I to give him a false reply, that scoundrel 

wouldn't give me a chance to enter errata, but simply 

lay me out on the pyre. Even if I were to provide 

the right response, he would sell my body to the flames.

Autumn and winter are watching me now, almost algebraically. 

 

I AM THE BLISS

Alokeranjan Dasgupta

  

I am the bliss you render

     into a lonely night 

so that no-one can decipher

     your identity ever. 

               

I am the juvenile

     élan vital that you

transmute into an abysmal smile          

     so that no-one may find a clue 

to your innermost blessedness 

     beyond pleasure and grief

where you and I each other embrace

     lying on a lotus leaf.


Photo Courtesy: Elisabeth Gunther, Germany

প্রহরশেষের অলোকরঞ্জন | রজতকান্তি সিংহচৌধুরী

'সভামিছিল এবং শায়াশেমিজের পিছনে ছোটাই সকল কালের সব যুবকের স্বধর্ম হতে পারে না।' পঞ্চাশের সেই শুরুর দিনগুলোতে লিখেছিলেন নানা অর্থেই অগ্রজ কবি অরুণকুমার সরকার। সেদিন পঞ্চাশের তরুণ কবিদের মুখপত্র 'শতভিষা'র (অষ্টাদশ সংকলন, ১৩৬৩) পাতায় 'বাংলা কবিতার একটি স্বতন্ত্র ধারা' নামের এক নির্ণায়ক নিবন্ধে। কী ছিল এ লেখার পটভূমি? পঞ্চাশের সূচনার দিনে একদিকে ছিল 'জনগণের কবিতা চাই', 'বিপ্লবী কবিতা লেখো' ধরনের ফতোয়া। অন্যদিকে ছিল যৌন কবিতার দাবি, 'সকল কবি এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কামুক হয়ে উঠতে পারেননি' ধরনের আক্ষেপ। তার মধ্যেই 'শতভিষা'র (১৯৫১) অঙ্গীকার ছিল, আমরা কবিতাকে আবার কবিতার কাছে ফিরিয়ে আনব।' অনেকটা ডব্লিউ বি ইয়েটসের ধরনে উচ্চারণ, 'যা-কিছু কবিতা নয়, তাকে কবিতা থেকে বাদ দিতে হবে একেবারে।' কবিতার অন্তর্মুখীনতা এবং শুদ্ধতার কাছে ফিরে আসাটাই ছিল 'শতভিষা'র শপথ। বছর দুয়েকের ভেতরে বেরুল ‘কৃত্তিবাস' (১৯৫৩)। 'শতভিষা'র ঝোঁক যদি ছিল 'ব্যক্তিত্বচিহ্নিত' কবিতার দিকে, ‘কৃত্তিবাস’-এর প্রবণতা 'স্বীকারোক্তিমূলক' কবিতায়। 

বাংলা কবিতার মৌলিক লিরিক্যাল স্বর, যা পঞ্চাশের অব্যবহিত আগে কিছুটা হলেও ব্যাহত হয়েছিল, তা ফিরে এল ‘শতভিষা’য়, ‘কৃত্তিবাস’-এ, পঞ্চাশের নতুন কবিতায়। গত শতকের পাঁচের দশকটি ছিল পুনরধিকারের, পুনরাবিষ্কারের, পুনর্জন্মের, পুনরুজ্জীবনের প্রাচুর্যে, প্রত্যয়ে, সামর্থ্যে স্পন্দমান। পঞ্চাশের কবিদের মেধায়, অনায়াস শব্দছন্দদক্ষতায়। এঁদের জন্ম বিশ্বব্যাপী মন্দার ভেতরে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদ্যোগপর্বে, বয়ঃসন্ধি স্বাধীনতালগ্ন দেশদ্বিখণ্ডনের ছিন্নভিন্নতার মধ্যে। তবু এঁদের লেখালেখিতে টি এস এলিয়ট-কথিত 'পোড়ো জমি' পেরিয়ে দিকপ্রান্তে ক্ষীণ নীলাঞ্জনরেখার অনুসন্ধান দুর্নিরীক্ষ্য নয়। রবীন্দ্রকবিতা থেকে স্বরের স্বাতন্ত্র্য খুঁজে পেতে তিরিশের কবিতা যেমন মনীষিতা আর শিল্পিতাকে আশ্রয় করেছিল, চল্লিশের কবিতার একটি অংশ আশ্রয় নিয়েছিল জনসংহতির লড়াকুপনায়, পঞ্চাশের কবিদের ফিরে যাওয়া ছিল কবিতার বিশুদ্ধতায়, সহজ শুশ্রূষায়। আলোক সরকারের কবিতায় বাংলা কবিতার বিশুদ্ধতম রূপ আমরা খুঁজে পাই। (সেই শুদ্ধস্বরের উত্তরাধিকার এই শতকে গত দুই দশকে যেসব তরুণ লিখতে এসেছেন, তাঁদের কবিতায় প্রগাঢ় আর এটাই হয়তো তাঁদের ভেতরে আলোক সরকারের কবিতার প্রতি ভালোবাসার কারণ।) অলোকরঞ্জনও বিশুদ্ধতারই কবি, তবে অসংখ্য বাঁকবদল আর স্পন্দিত আঙ্গিকে ওঠানামা তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য। ছেচল্লিশটি কবিতার বই নিয়ে তাঁর কাব্যপ্রবাহে শাশ্বত হতে চাওয়া কবিতার পাশাপাশি সমকালের রক্তক্লেদে লগ্ন কবিতাও দেখতে পাব। পঞ্চাশের সেই সূচনার দিনগুলি শঙ্খ ঘোষ, আলোক সরকার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, বিনয় মজুমদার, উৎপলকুমার বসু সহ অতজন প্রধান প্রধান কবির ভেতরেও তিনি ছিলেন নিজভূমে স্বরাট। ১৯৫৪ সালের জানুয়ারি মাসের ২৮ ও ২৯ তারিখে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হলের সেই ঐতিহাসিক কবিসম্মেলনে জীবনানন্দ থেকে তরুণতম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অবধি বাহাত্তর জন কবির ভেতরেও কুড়ি বছরের তরুণ অলোকরঞ্জনের 'আমার ঠাকুমা' কবিতাটি কীভাবে সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, তা লিখেছেন কবিবন্ধু শঙ্খ ঘোষ, 'একটি নতুন আবিষ্কার ওই সন্ধ্যার যাবতীয় যাদুস্পর্শ ছাপিয়ে গিয়েছিল: অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সে সময়ে যাঁর বয়স মাত্র কুড়ি বছর, একটি কবিতাপাঠের মাধ্যমে শ্রোতাদের মন আপ্লুত করে দিয়েছিলেন, কবিতাটি ছিল “আমার ঠাকুমা”।' ('আধুনিক কলকাতার সাহিত্যলোক : ১৯৪১ থেকে ১৯৮০', শঙ্খ ঘোষ)। এই কবিতাটি দিয়েই 'শতভিষা'য় অলোকরঞ্জনের আত্মপ্রকাশ, পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশের আগে অন্যতম সম্পাদক দীপঙ্কর দাশগুপ্ত কবিতা চেয়ে চিঠি দেন অলোকরঞ্জনকে। পরে ‘যৌবনবাউল’-এ অন্তর্ভুক্ত এ কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন অরুণকুমার সরকার, এ লেখার গোড়ায় উদ্ধৃত সেই নিবন্ধটিতে। আর তাঁর কবিতা সম্পর্কে অনেক পরে  কবিবন্ধু আলোক সরকারের নিরীক্ষা, 'রূপদক্ষ, ভাষাভূষণপ্রিয় কবি অলোকরঞ্জন। শব্দ তাঁর হাতে পালিত সারমেয়ের মতো ওঠে বসে।' 

অলোকরঞ্জন তাঁর কবিতাযাত্রায় প্রসন্নতার সম্বুদ্ধ স্বরূপ থেকে সরে এসেছেন রক্তক্ষরণের মরপৃথিবীতে। তাঁর চলতে থাকার চালচিত্তিরে 'যুদ্ধ' তাঁর কাছে দুই সিলেবলের অশ্লীলতম শব্দ হয়ে উঠেছে। তাঁর দেশজ দোতারাতে বেজেছে ভুবনতল্লাটের সুর। বাংলা ভাষাই হয়ে উঠেছে দীর্ঘ  প্রবাসে তাঁর অনন্য আবাসন। তাঁর কবিতায় বারেবারেই এসেছে বাঁকবদল। বারেবারে হারানোর মধ্যে ফুটেছে নতুন করে পাবার আকুতি। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতাযাত্রায় তত-আলোচিত-নয় যে-শেষ দশকটি সেখানে আমরা দেখব, তাঁর কবিতা নব নব উন্মেষশালিনী কল্পনামনীষার দৌলতে নতুন নতুন দিগন্তের অভিসারী। বাংলা কবিতার প্রথানুগ সীমান্তরেখাকে অতিক্রম করে গেছে অনায়াস শৈলীতেই। 

আমাদের এই মিতকথনে, আমরা তাঁর শেষ পাঁচ বছরের অসামান্য কবিকৃতি থেকে কয়েকটি কণিকা মাত্র দেখবার চেষ্টা করি?

দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি

প্রথম বই ‘যৌবনবাউল’ (১৯৫৯) থেকে দ্বিতীয় বই 'নিষিদ্ধ কোজাগরী'র (১৯৬৭) আট বছরের ব্যবধান ছিল। পরে পরপর প্রকাশিত দুটি বইয়ের ভেতরে ব্যবধান কমে আসে। আর ২০১৬ থেকে ২০২০ তাঁর জীবনের এই শেষ পাঁচ বছরে প্রতি বছর একটি করে কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে অলোকরঞ্জনের। অশীতিপর বয়সে এই সৃষ্টিশীলতা বিস্ময়কর। 

২০১৩ সালে কবি আশি বছর পেরিয়েছেন। চলে গেছেন জীবনসঙ্গিনী শ্রীমতী ট্রুডবার্টা দাশগুপ্ত (২০০৫)। বিধ্বংসী শোক পেরিয়ে কবি উপনীত হলেন উত্তরপর্বে। রবীন্দ্রনাথ এক অর্থে তাঁর জীবনদেবতা। তাঁর অন্ত্য পর্বের সৃজনশীলতা শেষ দশকের রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ায়।

দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি'। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের উত্তরপর্বের কবিতায় এক উজ্জ্বল মাইলফলক। সদ্যপ্রয়াত কবির ছ'দশক জোড়া  দীর্ঘ কবিতাযাত্রার শিখরে 'দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি'(২০১৬), 'তোমরা কি চাও, শিউলি না টিউলিপ' (২০১৭), 'শুকতারার আলোয় পড়ি বিপর্যয়ের চিঠি' (২০১৮), 'ঝাউ-শিরীষের শীর্ষসম্মেলনে (২০১৯), 'বাস্তুহারার পাহাড়তলি' (২০২০) নিয়ে শেষ পঞ্চকের সূচনা এই অন্তময়তার রেশ মাখানো কবিতার বইটি দিয়েই। লক্ষ করবেন, তাঁর অধিকাংশ কবিতার বইয়ের নামও ছন্দোময়, তাঁর কবিতার মতোই। মালার্মের মতো তিনি বিশ্বাস করেন, সরকার আসবে যাবে, কিন্তু ছন্দ থেকে যাবে। এ বইটির নামে এসে গেছে একেবারে লোকায়ত, প্রায়  সবার জানা এক ছেলেভুলানো ছড়ার চরণ এবং ছন্দ, শ্বাসাঘাতপ্রধান স্বরবৃত্তে। বইয়ের নামকরণে এবং অনেক কবিতায় বেলাশেষের বা বিদায়ের ছবি, কিন্তু সে বিদায়সুর কোনো নিরাশায় তলিয়ে যায় না। সে-সুর মধুর, কৃতজ্ঞতার,মুগ্ধতার। এই আলো এই সৌন্দর্যে ভরা পৃথিবীর মাঝখানে তিনি  হয়ত থাকবেন না, কিন্তু কীই বা আসে যায় তাতে!  এইখানে তাঁর জীবনদেবতা রবীন্দ্রনাথের সুরে সুরে গেয়ে উঠতেই পারেন সুধাকণ্ঠ  অলোকরঞ্জন 'নাই যদি রোস নাই রবি'। 'অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে সকল অঙ্গ' ভরিয়ে তোলবার নেশায়, হলই বা সেটা সায়ন্তনের 'ক্লান্ত' ফুলের গন্ধ।

মূলত 'যৌবনবাউল' এবং অংশত তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের কবিতা নিয়েই তাঁর কবিতার অনেক আলোচনা শেষ হয়, 'মরমী করাত' (১৯৯০) বা 'রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ'(১৯৯৩) অবধি যার শেষ সীমা। এর একটা কারণ হয়তো, ছোট ছোট প্রকাশন থেকে বের হওয়া তাঁর অনেক বইয়ের অলভ্যতা, দে'জ-কৃত কবিতা সংগ্রহের এ তাবৎ তিনটি খণ্ডই প্রকাশিত। 

'শ্রেষ্ঠ কবিতা' নিঃশেষিত। এইসব কারণে এরপর থেকেই বুঝি শুরু হয়ে যায় পূর্বজ আর এক দাশগুপ্ত কবির মতো পাঠক হারানোর বৃত্তান্ত। উত্তরপর্বের জীবনানন্দ বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর অনাগ্রহ কি একই ধাঁচের নয়? 

এক নদীতে দুবার স্নান করা যায় না। ছোটোবেলায় ঠাকুর্দার মুখে শোনা  গ্রিক দার্শনিক হিরাক্লিটাসের এই বীক্ষা মেনে  কবিতা থেকে কবিতার সঞ্চারপথে পুনরুক্তিপ্রবণতা খারিজ করে চলা অলোকরঞ্জনের নানা পর্যায়ের কবিতার ধরতাই এখনও অনেক কবিতাপ্রেমী পাঠকের অধরা।

এ শতকে তাঁর  লেখালেখি নিয়ে আলোচনা নজরে পড়ে কম। শুধুমাত্র শেষ পাঁচটি কবিতার বইয়ের ঋদ্ধিঋণ বাংলাভাষাভাষী হিসেবে  বর্তমান বিনীত প্রতিবেদককে কৃতজ্ঞ করে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গাল্ফ যুদ্ধ ‘যৌবনবাউল’ -এর এই প্রতীতির জায়গাটাকে আরোই দীর্ণ করে দিল, লেখা হল 'আয়না যখন নিঃশ্বাস নেয়' (১৯৯২), 'রক্তমেঘের স্কন্দপুরাণ' (১৯৯৩)-এর মতো বই, যুধ্যমান বিশ্বে কবির বিমূঢ়তা, বিবমিষা। 'যুদ্ধ' হয়ে ওঠে তাঁর কাছে দুই সিলেবলের অশ্লীলতম শব্দ। মানুষের মুখ উৎকীর্ণ হয়, এমন কবিতার প্রতি অকুণ্ঠ আসক্তি প্রকাশ করছেন তাঁর বয়ানে। অবশ্য সেই  মানুষের মাঝখানে 'আলোকতোয়া' নদী আর 'জ্যোতিগৃহ সম্পন্ন' করবার স্বপ্ন ও প্রস্তুতি তাঁকে ছেড়ে যায়নি।  

নতুন শতকে  দ্বিতীয় যন্ত্রবিপ্লব সাধিত হল। মোবাইল, কম্প্যুটার, ইন্টারনেট, আই ফোন, সোশ্যাল  মিডিয়া -শাসিত বিশ্বে কবি অনুসন্ধান করতে লাগলেন প্রাথমিক মানবিক সম্পর্কগুলোকে। পারস্যের কবি হাফিজের অনুরণনে লেখা জার্মান মহাকবি গ্যোয়েটের 'ডিভান' কাব্যের বঙ্গানুবাদ করতে গিয়ে বাউল-সুফি-মরমিয়া-দরবেশদের ভাবলোককে পুনরাবিষ্কার করলেন ‘যৌবনবাউল’। মোবাইলে মুখ-গোঁজা, শপিং মলে কথাহারা ইঙ্গিতে বাজার-করা ভাষাহীনতার যান্ত্রিক পৃথিবীতে আমরা দেখব ‘যৌবনবাউল’ ক্রমশ তাঁর অনাহত প্রতীতির বিদীর্ণ জায়গাটার শুশ্রূষায় নিবিষ্ট। ভোগবাদের মহামারীর বিপরীতে বহিরঙ্গ ছেড়ে চিদঘন অন্তর্লোকের অনুসন্ধানী অলোকরঞ্জন। ‘দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি' (২০১৬) তাঁর এই পর্বের উল্লেখ্য ফসল।

পার্থপ্রতিম দাসের অসামান্য প্রচ্ছদে শোভিত পাঁচ ফর্মা-ছাপানো এই 'দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি' বইয়ের বিভাব কবিতায় কবি লিখছেন,

মনের ভেতর গুমরে ওঠে 

ধাই-মার সেই দাবি

'মাছের কাঁটা পায়ে বিঁধলে

দোলায় চেপে যাবি


দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি 

    গুনতে গুনতে যাবি'... 

প্রথম কবিতার নাম '২০২'।  বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিবিজড়িত ২০২ রাসবিহারী এভিনিউ ঘিরে  "আমাদের তারুণ্যের শেষ তীর্থ 'কবিতা ভবন'।" শ্মশানের অন্য নাম 'পিতৃবন'। এ বইয়ের 'পিতৃবন' কবিতায় তাই পেয়ে যাই তাঁর স্নেহাপ্লুত বাবা বিভূতিরঞ্জন দাশগুপ্তকে, শ্রীমান অলোকরঞ্জনকেই যেন  তিনি চেয়ে চেয়ে দেখছেন তাঁর 'ক্ষমাহীন দুর্বলতায়'। দূরান্বয়ে স্মরণে আসে, কবি শ্রীমধুসূদনের 'মেঘনাদবধকাব্যে'র 'প্রেতপুরী' নামধেয় অষ্টম সর্গে লক্ষ্মণের শক্তিশেলের প্রতিকারকামনায় সশরীরে স্বর্গলোকগামী রামের দর্শন পেয়ে ঊর্ধ্বলোকবাসী পুত্রশোকে লোকান্তরিত দশরথের স্নেহাকুল মুখচ্ছবি, যিনি রামকে দেখে বলে উঠছেন, 'আইলি কি রে এ দুর্গম দেশে / এতদিনে, প্রাণাধিক, দেবের প্রসাদে,/ জুড়াতে এ চক্ষুর্দ্বয়?'।  'পিতৃবন' কবিতায় অলোকরঞ্জন দেখেন, তাঁর পিতার পিছনেই দাঁড়িয়ে পিতামহ দক্ষিণারঞ্জন, 'যৌবনবাউল'-এর সুখ্যাত 'আমার ঠাকুমা' কবিতার সেই 'শহরবিদ্বেষী' মানুষটি,  যিনি সাঁওতাল পরগনার রিখিয়ায় ভিটেপত্তন করে  তাঁর বড়ো নাতি অলোকরঞ্জনের বয়স যখন 'বড়োজোর পনেরো', তখনই সেই জ্যেষ্ঠ পৌত্রের হাতে 'তবু আমায় পারিবারিক দুর্গাপূজার ভার তুলে দিয়েছিলেন'। এভাবেই পরিজনেরা ঘুরে ঘুরে আসেন অলোকরঞ্জনের কবিতায়, যেমন অনুধাবন করেছেন  শঙ্খ ঘোষ ('আমার বন্ধু অলোকরঞ্জন')। আর সেই পরিজনদের সীমা বিস্তারিত হতে হতে চলে দুনিয়াভর, রক্তসম্পর্কহীন  দীনতম বৃদ্ধ মানুষটিও কবির আত্মীয়। 

আর, এ বইতেই টানা গদ্যে লেখা 'অনাবাসী যদি অনুবাদ করে' কবিতায় লিখলেন, 'তুলসীতলার আজলকাজল মায়ামদির নিরাপত্তার ঘেরাটোপ থেকে একবার বেরিয়ে পড়লে ইহমানুষের কপাল থেকে বাস্তুদেবতার আশীর্বাদ চিরতরে অবলুপ্ত হয়ে যায়, তার বরাতে তখন চলতে থাকার চালচিত্তির ছাড়া অন্যতর কোনো বিধিলিপি অবশিষ্ট থাকে না। তখন থেকেই সম্ভবত ভাষাই হয়ে ওঠে মানুষের একমাত্র আবাসন।' হাইডেগার-অনুরণিত এই আভাষণ অলোকরঞ্জনেরই সিলমোহর হয়ে ওঠে আজকের  ভুবনজোড়া শরণার্থীর মেলায়।

অলোকরঞ্জনের কবিতা-বইয়ে শতেক যুগের কবিদলের আনাগোনা, শতেক যুগের গীতিকা হাতে। এ বইয়ের 'স্বরশয্যায়' কবিতায় স্বভাবসম্মিত সৌজন্যেই উপস্থিত শিল্পাচার্য শিলার ও শিষ্য নোভালিস।

'দাহ' কবিতার শেষ দুই চরণ এক মুগ্ধ বিস্ময়ের সামনে আমাদের উপনীত করে: 

      অর্থাৎ কিনা আমার মৃত্যু হয়নি সুচারুভাবে, 

      অর্থাৎ কিনা আমাকে নিয়েই তোমরা দিন কাটাবে..


তাই হোক, তবে তাই হোক, অলোকদা!

'দোলায় আছে ছ'পণ কড়ি' বইয়ের উপান্ত্য কবিতা 'পালকি করে যারা আমায় নিয়ে চলেছে'তে পাই, তাঁর পালকির বাহকেরাই কখন নিজেদের অজান্তেই তাঁর শববাহক হয়ে উঠেছে। 'আমার হাতে অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি', একটি বাহক, যার নাম হয়ত নিখিল, সে চায়, শেষ বইটির 'অপূর্ণতা পূরণ' করে ছাপতে দিতে, পুঁথি বিষয়ে গবেষণায় যার নাকি ডি. ফিল.'..

আহা, সত্যিই আজ যদি আমরা এমন 'অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি' খুঁজে পেতাম। 'কবিসম্মেলন', 'কবিতা আশ্রম'-সমেত নানা পত্রপত্রিকায় তাঁর  সাম্প্রত শারদ অঞ্জলি এখনও তো গ্রন্থভুক্ত হতে বাকি। দৈববাণীর মতো দূরভাষে ভেসে আসা কিছু কবিতার শ্রুতিলিপিকর তো এই প্রতিবেদকও। 

এ বইয়ের উপান্ত্য কবিতা 'পালকি করে যারা আমায় নিয়ে চলেছে' পড়ে যেই না পাঠক সজলচক্ষু হতে যাবেন, অমনি আসে অলৌকিক শৈলীতে অমোঘ আশ্বাস, বইটির সবশেষ কবিতায়:

আমার জন্য  হা-হুতাশন কোরো না, অরুণাভ,

উত্তরাধিকার সূত্রে পুণ্য পারমিতার 

ছ'পণ কড়ি সঞ্চয়িত আছে আমার দোলায়, 

বাকিটা পথ গুনতে গুনতে যাব!

এ বই কবি উৎসর্গ করেছেন কবি নাসের হোসেন আর বর্তমান প্রতিবেদককে। এ তাঁর উদার কবিচারিত্র‍্যেরই এক মুদ্রা।

৩      

'তোমরা কী চাও, শিউলি না টিউলিপ?' (২০১৭) পরবর্তী বই। উৎসর্গ করা হয়েছে অমিয় দেব এবং সৌরীন ভট্টাচার্যকে। কবির প্রথম পর্বের কবিতা ছিল দেশজ নিসর্গকে নিয়ে, লোকজীবন, আস্তিক্যবোধকে জড়িয়ে। তাকে তিনি শিউলি বলে অভিহিত করছেন। আর উত্তরপর্বের আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া লাগা কবিতা তাঁর টিউলিপ ফুল। পাঠকের কাছে প্রশ্নময় শিরোনাম তাই, 'তোমরা কী চাও, শিউলি না টিউলিপ?' আমরা অবশ্য দুটোই চ্চাই। এক সভায় এমন কথাই জানিয়েছিল এই প্রতিবেদক।

কবির ঠাকুর্দা দিনাজপুরের দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রধান শিক্ষক দক্ষিণারঞ্জন দাশগুপ্ত অবসর গ্রহণের পর সাঁওতাল পরগনার রিখিয়া গ্রামে নতুন করে ভিটে পত্তন করে  বাস করতে শুরু করেন। পশ্চিমের নিসর্গনন্দিত রিখিয়ায় তিনি যৌথ পরিবারের বসবাসোপযোগী একটি মনোরম পরিসরও নির্মাণ করেন। বড়ো নাতি অলোকের জন্মের পর তিনি সেখানে দুর্গাপূজার প্রচলন করেন, অলোকরঞ্জনের ওপর এই পুজোর ভারও দিয়ে যান তিনি। পুজো উপলক্ষ্যে বৃহৎ যৌথ পরিবারের সবাই সেখানে জড়ো হত। অলোকরঞ্জনের শৈশব-কৈশোরের অনেক স্মৃতি রিখিয়ার সঙ্গে যুক্ত, ‘যৌবনবাউল’-এর বহু কবিতায় রিখিয়া, বাবুডি, আমরুয়া, চানন নদী,  হিরনা টিলা, ত্রিকূট পাহাড় সহ এখানকার নিসর্গ ও লোকজীবনের ছবি। প্রায় চল্লিশ বছর চলেছিল এই বসতবাড়ির পুজো। বইটির বিভাব কবিতাতেই আমরা তাই দেখব,  'বসত বাড়ির শেষ বারকার পুজোয়/ শেফালিকার শুভ্র আগুনটাকে/ চয়ন করে বেরিয়ে পড়লাম/ প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে'। এই বেরিয়ে পড়া থামল এক ভিনদেশের গাঁয়ে, 'সেখানে দেখি অজস্র টিউলিপ/ যা শুধু লাগে নশ্বরের কাজে'। শিউলি পূজার উপচার, অন্যদিকে টিউলিপের তেমন কোনো আধ্যাত্মিক গরিমা নেই, নশ্বরের কাজেই তার ব্যবহার। মরমী কবির প্রথম পর্বের কবিতা যদি অতীন্দ্রিয়তায় লগ্ন, পরবর্তীতে তাঁর কবিতায় নৈমিত্তিকের নশ্বর সৌন্দর্য ও কদর্যতার অভিক্ষেপ। 

উত্তরপর্বে তাঁর কবিতায় আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া লাগলেও কবি স্বদেশের সঙ্গে নিরন্তর সংলাপরত। বাংলা ভাষাই হয়ে ওঠে তাঁর আবাসন। দেশজ আচার, পার্বণ আরো নতুন তাৎপর্য পায় তাঁর কবিতায়। 

'ভাইফোঁটার দেয়ালটা' কবিতায় বিচ্ছিন্ন পৃথিবীতে প্রয়াত মেজদির জন্য প্রবাসী ভাইদের বেদনা এক চিত্রপ্রদর্শনী হয়ে ওঠে কবির অননুকরণীয় শৈলীতে: 'মেজদি মারা গেলে আমরা ছ-ভাই যথারীতি প্রথানুগত সম্ভ্রমে টালিগঞ্জের/ পোড়ো সেই বাড়িটায় জড়ো হয়েছিলাম। বাপুয়া এসেছিল ব্রেজিল থেকে/ বিবদমান দুই শিবিরের মধ্যে সাময়িক মোকাবিলা/ স্থগিত রেখে ৷ লিবিয়ায় ভ্রাতযুদ্ধে শামিল হয়ে ডানচক্ষু/ জখম হওয়া সত্ত্বেও স্বয়ং পিন্টু এসে হাজির, তাকে আগলিয়ে/ ধরে ধরে এনেছিল বাদল আর বুলবুল ৷ গোরা আজকাল কানে/ শুনতেই পায় না, তবু একে-ওকে জিগ্‌গেস করে শেষ মুহূর্তে কী করে জানি হাজিরা দিল।/ পাশের বাড়ির মালি তালা খুলে আমাদের নিয়ে গেল চোরাগোপ্তা/ একটি কুঠুরিতে যার একটাই মাত্র দেয়াল । যে সব ভাই ভাইফোঁটার দিন/ আসতে পারেনি সেই দেয়াল জুড়ে তাদের জন্য মেজদির দেওয়া চন্দনের ফোঁটা থরে থরে বিকীর্ণ রয়েছে!/প্রথমে অনপনেয় যুদ্ধাপরাধীর মতো নিজেকে মনে হলেও পরক্ষণে মনে হল/এ আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্রপ্রদর্শনী'। 

লিটল ম্যাগাজিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বরাবরই আশাবাদী অলোকরঞ্জন। শেষ দিকে মূলত লিটল ম্যাগাজিনেই লিখেছেন। 'অমৃতলোক' পত্রিকার প্রয়াত সম্পাদক সমীরণ মজুমদারকে নিয়ে একটি কবিতা আছে এ বইতে।  শেষ দু-লাইন, 

'পরবর্তী বিশেষ সংখ্যার জন্য অভিমন্যুতার     অভিমানে

সে যেন আমৃত্যু লেখে লিটল ম্যাগাজিনের      টানে।'

                                                             ('সমীরণ মজুমদার')

অভিমন্যুর পুরাণপ্রতিমা শেষ দশকে তাঁর খুব প্রিয় হয়ে উঠেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, জয়-পরাজয় বলে কিছু হয় না, নিজের সত্যের কাছে সত্যবান থাকাটাই জয়। অভিমন্যুর মতো তিনি নিজেকে দ্বিতীয় বিজয়ী বলে দেখতে চান। শেষ দিকে তাঁর ভয়, কলকাতায় এলে আমি বাংলা ভুলে যাব।…আমি যদি কলকাতা থেকে দূরে কোথাও প্রয়াত হই, আমার স্মৃতির কলকাতা বুকে নিয়ে সানন্দে মরে যাব।' ('সন্ধিক্ষণের সাক্ষাৎকার', নাচের আড়ালে লুকিয়ে কে ছায়ানট?, ২০১৬)

এ বইয়ের শেষ কবিতা সদ্যপ্রয়াত কবিবন্ধু আলোক সরকারের স্মৃতিতে অনুস্যূত:

না-দেখা সে-ও আরেক দেখা

আসন্ন বই মেলার মুখে 

শরৎমেঘের সিংহদুয়ার 

তীর্ণ হয়ে চলে গেলেন আলোক সরকার;


লিটল ম্যাগাজিনের মুখে 

আজ নিদারুণ উত্তেজনা: 

এই তো সময় বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করবার


বস্টনের দিক থেকে 

যেই নায়েগ্রা দেখছিল আলোক 

কানাডা থেকে একই প্রপাত দেখতে গিয়ে পুষ্পস্তবক


বন্ধুকে দিই কৃতাঞ্জলি-

ক্ষীণ সাহসে তাই তো বলি:

না-দেখা সে-ও আরেক দেখা, আমার এ শোক হোক-না শোলোক!

এ কবিতা আমাদের অনিবার্যত মনে পড়ায় অনেক আগে লেখা ‘আলোক সরকার' নামের কবিতাকে। নায়েগ্রা জলপ্রপাতের  নিসর্গ দেখে উচ্ছ্বসিত আলোক সরকার বন্ধু অলোকরঞ্জনকে ফোন করেন, তারই পটভূমিতে লেখা হয়েছিল কবিতাটি।

'শুকতারার আলোয় পড়ি বিপর্যয়ের চিঠি' (২০১৮) তাঁর পরবর্তী বই। 'গিলোটিনে আলপনা' বা 'মরমী করাতে'র মতো এ বইয়ের নামকরণেও বিরোধাভাস ।  আত্মপ্রতিবাদের ঐক্যই যার মূলসূত্র। এই বিপর্যাসের টানে আশাবাদও ধূসরিম হয়ে ওঠে তাঁর কবিতায় :

কারুক্কে বলিনি তা:

আমার ভিতরে

এক ধরনের ধূসরিম আশাবাদ 

তৈরি হতে চলেছে


ধূর্ত অতনু আকাশে-বাতাসে 

এই খবরটা রটিয়ে দেওয়ার আগে 

স্বর্ণিল আশাবাদের ওপর লিখে চলি আমি 

কবিতা কবিতা কবিতা              ('বিপর্যাস')

তাঁর শিকড়চেতনা সংলগ্ন হয় বিশ্বজোড়া শরণার্থীচেতনার সঙ্গে।  সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা শরণার্থী-সংকটে তিনি স্মরণ করেন  আরাকান রাজসভায় মধ্যযুগের বাঙালি কবি সৈয়দ আলাওলের কথা, 'যেমন কিনা সৈয়দ আলাওল/ পেরিয়েছিলেন পথের ডামাডোল' ('রোহিঙ্গা! রোহিঙ্গা!')

তবু বিশ্বসংকট ও বিপর্যয়েও তিনি শুদ্ধ কবিতার শুকতারার আলোকে ভুলতে পারেন না। প্রাচীন গ্রিসের মাউন্ট হেলিকনের আবহমান ধারায় অভিস্নাত হোমার, স্যাফো, সোফোক্লেসের অনুগামী কবি :

    আবহমান

    কোথায় কবে শুনেছিলাম মাউন্ট হেলিকন

     রয়েছে গ্রিসে, তারি হৃদয় থেকে 

     ঝরনা হয়ে কবিতা নামে যার শ্রুতিলিখন


            করে গেছেন হোমার, স্যাফো, সোফোক্লেস; 

            আরও আমার অনেক শতেক পূর্বসূরি,

             আমার যতেক পদ্য লেখা তাঁদের কাছেই চুরি।


              হেলিকনের মুক্তধারা একটু আগেই আমায় 

               বিসর্পিল বলল এঁকেবেঁকে :

           ‘একটি নতুন কবিতা চাই তোমার হাত থেকে।'

গ্রিসের মিথসঞ্জাত হেলিকন অনায়াসেই মিশে যায় কবির নিজস্ব রাবীন্দ্রিক মুক্তধারার মুক্তিস্রোতে।

'নিজেকে খুঁজতে গিয়ে' কবিতায় পাচ্ছি পূর্বসূরি গ্যোয়েটেকে, মিকেলেঞ্জেলো বা রাফায়েল নয়, 'নিছক রক্তের টানে'ই তাঁর গ্যোয়েটের সন্ধান রোমে। প্রসঙ্গত, হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল 'গ্যোয়েটে ও রবীন্দ্রনাথ', জার্মানির সর্বোচ্চ গ্যোয়েটে পুরস্কারেও তিনি বৃত। হাইনে, রিলকে, হ্যোল্ডারলিনের মতো গ্যোয়েটের কবিকৃতির তিনি মূল জার্মান থেকে বঙ্গানুবাদ করেছেন।

ঝাউ-শিরীষের শীর্ষ সম্মেলনে (২০১৯) অলোকরঞ্জনের উপান্ত্য বই। অনুজ কবি হিন্দোল ভট্টাচার্য এবং পার্থপ্রিয় বসুকে উৎসর্গ করা। 'বিভাব কবিতা' বিষয়টি বাংলা কবিতায় তাঁরই সংযোজন। অনুজ অনেক প্রধান কবি তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তাঁদের বইয়ে বিভাব কবিতা যোগ করেছেন। এ বইয়ের বিভাব কবিতায় আমরা দেখব, পরিবেশ-সচেতন অলোকরঞ্জনকে, যিনি ঝাউ-শিরীষের শীর্ষ সম্মেলনে গিয়ে দেখছেন একটিও গাছ নেই!  আমরা জানি, ইতিমধ্যেই তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছেন পরিবেশবাদী জার্মান কবি সারা কীর্শের কবিতা।  আর ‘যৌবনবাউল’-এর দিন থেকেই তাঁর দর্শনে, 'বৃক্ষের বিষাদনেত্রে আয়ত পত্রের অশ্রু ঝরে।' উল্লিখিত এই বিভাব কবিতার শেষে দেখছি অবশ্য, 

             এক হাজার কবিতার স্পন্দনে 

             আচম্বিতে লক্ষ করা গেল 

             চোখের সামনে অমূর্ত গোলাপ

              আত্মসমালোচনার ঢঙে কবিদের নার্সিসাসবৃত্তিকেও দায়বিদ্ধ হতে হয়,

                     আর নার্সিসাস আমরা এখনও পদ্যের চর্চা করি, 

                     তবে কিনা প্রত্যেকেই পড়ি শুধু নিজের কবিতা!

এ বইয়ের শেষে অনুস্যূত হয়েছে রাজেশ্বরী দত্তের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে একটি অসামান্য দীর্ঘ কবিতা 'রাজেশ্বরী : একটি শোকগাথা'। কবি উপনীত এমন এক দুনিয়ায়, যেখানে হোয়াটসঅ্যাপ, ইউ-টিউব, স্মার্ট ফোনের তড়িঘড়ি সংযোগময়তার দৌলতে বসুন্ধরা থেকে 'নির্বাসিত নিভৃত পৃথিবী' :

            তখন তো হোয়াট্স-অ্যাপ ইউ-টিউব কিংবা স্মার্ট ফোন 

            ইত্যাদি ছিল না, আজ ঘরে ঘরে এসেছে ডিভিডি, 

           কারুরই দরকার নেই, ধরিত্রীর সঙ্গে সরাসরি 

           বনিবনা ঘটে যায় মুহূর্তেই আর যার ফলে 

           বসুন্ধরা থেকে আজ নির্বাসিত নিভৃত পৃথিবী।       


     এ কবিতা শেষ হচ্ছে, 

              আমার গহন কুলুঙ্গিতে রাত্রিদিন কয়েকটি মোম জ্বলে 


উদযাপনের উল্লাসে নয়, নিছক বেঁচে থাকার কৌতূহলে।

দ্বিতীয় পাঠে এই শেষ দু লাইনের প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্যও চোখে পড়তে বাধ্য। দুটি চরণেই ১০+১২ বাইশ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দ । উদ্ধৃত প্রথম লাইনে ৩+৩+৪ এবং ৪+৪+২+২ এর সরল, প্রথানুগত বিন্যাস। কিন্তু দ্বিতীয় লাইনে তা ভেঙে যাচ্ছে ৫+৩+২ আর ৩+২+৩+৪ এর বিপ্লবে।

সেই কারণেই হয়তো অপ্রেম আর সংকটের পৃথিবীতে বসেও এ বইয়ে বলেন, 'অপ্রেমে ধরণী/ ক্লিন্ন হয়ে যাবে, তবু ছন্দ লিখতে হবে।' অবশ্য এই অন্ত্য পর্বে গদ্যে লেখা কবিতাও তাঁর কম নয়। কবির কাজ গোষ্ঠীর ভাষাকে অমলিন রাখা। গত ষাট-সত্তর বছরে যে-স্বল্পসংখ্যক গুণিজন বাংলাভাষার শ্রীবৃদ্ধি সাধনে ব্রতী, অলোকরঞ্জন তাঁদের অন্যতম। নতুন নতুন সমাসবদ্ধ পদ বা প্রতিশব্দ নির্মাণই শুধু নয়, কবি ব্যবহার করেন মান্য বাংলায় অধুনা-অপ্রচলিত মধ্যযুগীয় শব্দ অথবা লোকভাষার শব্দ। এ বইতে যেমন এসেছে মাস্তুল শব্দের প্রতিশব্দ 'মালুমকাঠ' ( 'প্রতিশব্দেরা')। বাংলাভাষার মালুমকাঠগুলিকে এইভাবে চিনে নেন কবি। 'ভিসা ও ভবিষ্যৎ' কবিতায় এক অবিস্মরণীয় চিত্রকল্পে দেখি, তাঁর লুপ্ত ভিটের লাইব্রেরিতে রেখে যাওয়া দ্বিজ মাধবের পুঁথি এক কামিনী ফুলের ঝাড় হয়ে ফুটে আছে। 

বাস্তুহারার পাহাড়তলি (২০২০) আপাতত তাঁর শেষ বই। ইতিমধ্যে অভূতপূর্ব এক অতিমারির কবলে পৃথিবী কম্পমান। সংবেদনশীল কবির অনুভূতিকে তা স্পর্শ করে স্বভাবতই। তার ছাপ এ বইয়ে।

আজীবন ভারতীয় নাগরিকতা এবং পাশপোর্ট বজায় রাখা কবি শেষ ক’বছরে দেশে ফিরতেন বছরের শেষে ডিসেম্বরে, আর জার্মানির হির্শবার্গে তাঁর আবাসনে ফিরে যেতেন পরের বছরের শুরুতে, কলকাতা বইমেলার পরে। শেষ ফিরে যাওয়া ২০১৯ এর গোড়ায়। ২০১৯ এর শেষে মেরুদণ্ডের অপারেশনের কারণে তাঁর আসা নিষেধ ছিল। ২০২০ তে তো বিশ্ব পড়ল অতিমারির কবলে। তার মাঝখানেই ১৭ নভেম্বর, ২০২০ তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ। মাসখানিক আগে ৬ অক্টোবর তিনি অষ্টআশি বছরে পা দিয়েছিলেন। যদিও লেখালেখি বা চল্যাবলায় তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ  সৃজনশীল ও সুস্থ। জন্মদিনের ঠিক আগে চলে গেলেন তাঁর আদরের ছোট বোন ছন্দা ( ৫ অক্টোবর, ২০২০ )।  একটি বৃহৎ পরিবারের 'বড়দা' অলোকরঞ্জন হয়তো তাঁর সবচেয়ে ছোটো বোন ছন্দার মৃত্যুশোক সামলাতে পারেননি। শেষবার ফোন করেছিলেন বোনের চলে যাওয়ার সংবাদ দিয়েই।

এই বই উৎসর্গ করা হয়েছে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে নব্য ভারততত্ত্ব বিভাগে তাঁর উত্তরসুরি এবং প্রিয়শিষ্য হান্স হার্ডার এবং তাঁর স্ত্রী আন্দ্রেয়াকে। 

অলোকরঞ্জনের পারিবারিক শিকড় ঢাকা বিক্রমপুরের তেলিরবাগে। আমরা আগেই দেখেছি, তাঁর ঠাকুর্দা দক্ষিণারঞ্জন দাশগুপ্ত পশ্চিমের সাঁওতাল পরগনার রিখিয়ায় নতুন করে ভিটেপত্তন করেন। অলোকরঞ্জনের জন্ম অবশ্য কলকাতায়, যদিও রিখিয়া-শান্তিনিকেতনে তাঁর শৈশব-কৈশোরের অনেকটা কেটেছে। তাঁর শিকড়চেতনা ক্রমশ মিশেছে বিশ্বজোড়া বাস্তুহারা মানুষের শরণার্থীচেতনায়।

গদ্যে লেখা এ বইয়ের বিভাব কবিতায় দেখব, 'এতদিন ধরে অন্তরঙ্গ যে সমস্ত আশ্রয়প্রার্থীদের নিয়ে পথ চলছিলাম একে একে তাদের নিজস্ব জন্মভিটেয় নামিয়ে দিয়ে ভ্যানুইবের সৈকত ঘেঁষে বাসটা আমায় পৌছিয়ে দিল অস্তাচলে বাভারিয়া জঙ্গলের মনঃপূত একটি পরিসরে। পাহাড়তলির পর পাহাড়তলি দিয়ে গাঁথা এই জায়গাটা যেন আমার জন্যেই নির্বাচিত হয়েছিল।' প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রগবেষক অলোকরঞ্জন আগে দেখিয়েছেন, এই বাভারিয়ার জঙ্গলেই ১৯২৬ সালে 'ছোটো কথার ঝাঁকে' আক্রান্ত জার্মানপ্রবাসী রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন আত্ম-উদ্বোধনের সেই আলোকিত গানটি, 'আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে'। 

বিভাব কবিতায় আমরা আরো দেখব, তাঁর যত্ন-আত্তির একবিন্দু বিরাম নেই। ক্ষণে ক্ষণে শরীরের তাপমাত্রা মেপে দেখা হচ্ছে । দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আগত এক নার্স বৌদ্ধ হবে বলে কবির কাছে  শিখছে পালি ভাষা। কবি বলছেন, 'না, এখন থেকে প্রকাশ্য কোনো আলোচনাচক্রে যোগ দিতে আমি যাব না আর। মাত্র ন-দশটি পুথি-পত্তরসুদ্ধু একটিমাত্র নৌকো নোঙরে বেঁধে রেখে দিয়েছি, এইমাত্র। ধরিত্রী আমার ভঙ্গুর ভ্রূযুগ সন্ধিক্ষণে তার বরণডালা ছুইয়ে দিয়ে এক লহমা তাকাতেই আমার শিরা-উপশিরায় বেজে উঠল আমার সমগ্র বাঁচার সজল পিছুটান।' এমনতরো প্রসন্ন বিশ্রাম বা বিদায়ের প্রস্তাবনা দিয়েই সূচিত হয় বইটি। 

সংগীতের মতো শিল্পস্থাপত্যকলারও তিনি ভিতরমহলের বাসিন্দা কবি। তাঁর কাব্যপ্রবাহে যেমন সংগীতের নানা রাগরাগিণী, বিভিন্ন রবীন্দ্রগানের অজস্র উল্লেখ, তেমনি আছে রোমের ধ্রুপদী স্থাপত্য, সিস্টিন চ্যাপেল বা মিকেলেঞ্জেলোর নানা শিল্পসুকৃতির কথা। রবীন্দ্রনাথ এবং অমিয় চক্রবর্তীর পরে তাঁকেই আমাদের সর্বশেষ আন্তর্জাতিক কবি হিসেবে বর্ণনা করেছেন কেউ কেউ। তাঁর কবিতায় হিন্দু মিথোলজির পাশাপাশি ইসলামীয় বা খ্রিস্টীয় মিথ এসেছে অনায়াসে। 

২০১৯ এর ১৫ এপ্রিল এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপকভাবে  ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্যারিসের শিল্পসুষমামণ্ডিত নতরে দাম (Notre Dam) গির্জা। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের উদ্যোগে জোরকদমে চলছে সংস্কারের প্রকল্প। এ বইয়ের প্রথম কবিতা ‘ধ্বংস ও প্রজাপতি'তে দেখছি আমাদের আশাবাদী কবিকে। তিনি প্যারিসে এসে দেখছেন ঝলসে যাওয়া নতরে দাম চার্চ। তার সামনে অবশ্য কিশোর চারণ কবির দল গান গাইছে ধ্বংস থেকে পুনরুজ্জীবনের আশায়। ধ্বস্ত চার্চের মতো প্রবীণ কবির নিজেকেও মনে হচ্ছে এক ধ্বংসাবশেষ। তবু কিশোরদের যৌথ সংগীতের লহরীতে কবি আত্মশক্তিতে ভর দিয়ে দাঁড়ান,

           'তবুও যদি শেষ কবিতা প্রলয়কালের মেঘে 

           লিখে উঠতে না পারি তবে কী হবে বেঁচে থেকে?'

আর তক্ষুনি উঠে আসছে অমোঘ এই মৃত্যুঞ্জয়ী উচ্চারণ, কবিতার শেষ দুই চরণে :

           'আমার ডান কনুই ঘেষে মৃত্যুপরোয়ানা

           খারিজ করে কাঁপতে থাকে প্রজাপতির ডানা…'

তাঁর প্রিয় জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের কথা এ বইতেও স্বভাবতই উঠে এসেছে, “কবিদের সর্বাগ্রণী দার্শনিক তুমি, তুমিই তো/ শিখিয়েছ 'মানুষের অস্তিত্বের আবাসন ভাষা'--। প্রসঙ্গত 'মার্টিন হাইডেগার' শীর্ষক এ কবিতার প্রথম পাঠক এই প্রতিবেদক, যাঁর কাছে দূরভাষে এ কবিতাটি ভেসে এসেছিল। বস্তুত হাইডেগারের এই সদুক্তি আমাদের কবির কাছে প্রায় বীজমন্ত্রের মতো। ‘দোলায় আছে ছ’পণ কড়ি' (২০২৬) বইয়ের টানা গদ্যে লেখা 'অনাবাসী যদি অনুবাদ করে' কবিতাতেও এই কথাটি উঠে এসেছে। অলোকরঞ্জনের দীর্ঘ প্রবাসজীবনে মাতৃভাষার সাধনাই তাঁর আশ্রয়স্থল। বাংলাভাষায় নতুন পরিভাষা বা শব্দনির্মাণ, নতুন ধরনের বাক্যগঠন তাঁর সারাজীবনের ব্রত। 'টেলি-অপারেটর' কবিতায় অপারেটরের যান্ত্রিক হিন্দিঘেঁষা বাংলা শুনে তিনি লেখেন, 'তাঁকে বললাম আমি কিন্তু/ নতুন রকম এই বাংলায়/ অনভ্যস্ত। বিভিন্ন কবিতায় এসেছে শিলার, কাফকা থেকে দীর্ঘজীবী জার্মান কবি এনৎসেনবার্গারের কথা। এসেছে মেহগনির টেবিলে যোজনজোড়া প্রাতরাশের মধ্যেও কবির 'মহামারীর থিমটা' নিয়েই লিখে চলার কথাও। এভাবেই শাশ্বত আর নৈমিত্তিক একাকার হয়ে আসে অলোকরঞ্জনের উত্তরপর্বের কবিতায়। 

তাই বুঝি 'ধ্রুব সংশয়', 'বিষণ্ণ কৌতুক' বা 'সুভদ্র প্রতিশোধ'-এর মতো অক্সিমোরনগুলো এ বইতেও উঠে আসে আমাদের এই ক্ষুভিত সময়কে ঘিরে উদ্যত বিরোধাভাসের দ্যোতনা নিয়ে। 

এ বইয়ের উপান্ত্য কবিতার নাম তাৎপর্যপূর্ণভাবে 'বয়েসের নিকুচি'। শ্রীমতী ট্রুডবার্টা দাশগুপ্তের প্রয়াণের পর অশীতিপর অলোকরঞ্জন হির্শবার্গে তাঁর বাড়িতে একাই থাকতেন। বিদ্যাচর্চা, ছাত্রদের পঠনপাঠন আর গোটা ইয়োরোপ জুড়ে নানা সেমিনারে যোগ দিয়ে।  দোতলায় তাঁর লাইব্রেরি। সিঁড়ি ভেঙে এই লাইব্রেরিতে উঠতে গিয়ে মেরুদণ্ডে চোট পান কবি, ২০১৯ এর ডিসেম্বরে তাঁর কলকাতায় ফেরা স্থগিত হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গটি এ কবিতায় এসেছে, 'সিঁড়ি আমায় ভাঙতে পারে এই ভেবে আর সিঁড়ি ভাঙি না--'।  

কবি 'feedback’ কথাটার এক মজাদার প্রতিশব্দ করেছিলে, 'প্রত্যাহার' (প্রতি+আহার)। তাঁর নিজস্ব বাকশৈলীতে। আজীবন পাঠকদের এই ফিডব্যাক বা পাঠ-প্রতিক্রিয়ার জন্যে উন্মুখ থাকতেন প্রবাসী  অলোকরঞ্জন। এ কবিতার শেষে তাই দেখতে পাচ্ছি, 

'লিখছি হাজার সংলাপিকা, তোরা যখন বোবা রইলি/… জিইয়ে রেখে দিয়েছি আমি নিজস্ব এক বাকশৈলী।'

এক বছর হল অলোকরঞ্জন লোকান্তরিত। রয়ে গেল তাঁর বাকশৈলী, সোনার তরী ভরা তাঁর মহনীয় কাব্যসম্ভার। আমাদের দৃকপাতের প্রতীক্ষায়। পুলিনবিহারী সেনের প্রয়াণে অলোকরঞ্জন লিখেছিলেন 'সন্ন্যাসীর মৃত্যু হলে কাকে যাব সান্ত্বনা জানাতে?' (বইয়ের নাম 'রিখিয়া থেকে অনেক দূরে') শীর্ষক এক অনবদ্য গদ্য। সেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, পুলিনবিহারীর মৃত্যুশোকে ভেঙে পড়া আরব্ধ কাজগুলোকে এড়িয়ে যাবার খঞ্জ অছিলা ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারে। একইরকম ভাবে, এখন সময় হা-হুতাশের নয়, অলোকরঞ্জনের কবিতাকে নিবিড়ভাবে পাঠের, বাংলা কবিতার এই অর্হণীয় উত্তরাধিকারকে অন্তরের অন্তঃস্থলে অভিষিক্ত করবার।