Saturday, June 17, 2023

কবীর চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা

প্রশ্ন


হাতের উপর হাত রেখেছি, ঠোঁটের ফাঁকে বিষ, 

এইটুকুতেই প্রেমের কথা শেষ হলে কি চলে?

মন মেজাজের আবেশটুকু

তৃষ্ণা হয়ে ভিজতে ভিজতে 

শরীরজুড়ে নামলো এসে এক আষাঢ়ের জলে।

হাতের উপর হাতটি রাখা, আঙুলরা একজোট, 

এমন সময়ে শরীর কি তোর ছুটির কথা বলে?


ভাবিস না আর তার কথাটি, দেখবি ও সব খালি

মন-ভুলোনো ঘর-ফুরোনো প্রেম পিরিতির ধুলো, 

প্রতীক্ষাতেই থাকবি যদি

একলা বসে নিরবধি, 

কার দুয়ারে আস্তে আস্তে জমবে স্মৃতিগুলো?

হাতের উপর হাত রেখে দেখ, চোখের নীচে কালি, 

এই আকালে ঠোঁটদুটি তোর কার অন্ধকার ছুঁলো?


হাতের উপর হাত রেখেছি, ঠোঁটের ফাঁকে ঝড়,

দুটি জিভের এক সহবাস, স্বাদ কি পড়ে মনে?

আষাঢ় গেছে, শ্রাবণ গেছে

নিরুদ্দেশের অন্বেষণে,

এক ফালি মেঘ একরোখা তাও ফুঁসছে ঈশান কোণে।

হাতের উপর হাতের বসত, অনির্বাণ অধর, 

এমন সময়ে অপেক্ষাতে শরীর কি দিন গোনে?


নেটিভিটি


আজ ভোরের ট্রেনে ডেলি প্যাসেঞ্জারেরা

আর পাশের বাড়ি থেকে বৃদ্ধ কিশোরবাবু

এসেছেন

নবজাতক শিশুটিকে দেখতে। 


এখনও কথা ফোটেনি আধো-আধো বুলিতে, 

দীঘির মত স্বচ্ছ চোখে সে অবাক হয়ে দেখছে দুনিয়াটা।

ভাষা নেই, স্মৃতি নেই, শ্লেষ নেই, 

তবু তাকে দেখবে বলেই এসেছে 

ফড়িং আর মৌমাছি,

রুই কাতলা তেলাপিয়া আর

পাড়ার সবচেয়ে ডাকসাইটে হুলো বেড়ালটা। 


রাষ্ট্রপতি কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন,

তাঁর হেলিকপ্টার নামবে সামনের মাঠে

তাড়াহুড়ো করে বানানো জোড়াতালি হেলিপ্যাডে।

শতদল ক্লাবের চেয়ারম্যান দেবাশিসবাবু

আর বাবাই বলে যে ছেলেটা 

পাড়ায় সব্বার টিভি সারায়,

সবাই এসেছে নবজাতককে দেখতে। 


রিকশা থেকে হন্তদন্ত হয়ে নেমেছেন জ্যোতিষার্ণব, 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক সাহেব অবশ্য

ট্রামেই এসেছেন, 

বেসামাল ধুলোবালি উড়িয়ে এসেছে হেমন্তের হাওয়া,

আর আকাশে টিকিট না কেটেই ঢুকে পড়েছে

অকালের মেঘ।


হালকা বৃষ্টি এসেছে সকাল থেকেই, 

তার সঙ্গে মিষ্টির দোকানের মালিক অমিতদাও 

দুই মেয়ে আর স্কুলের বন্ধু রনিকে নিয়ে এসেছেন

নবজাতককে দেখবেন বলে।


এ নবজাতকের কথা লেখা আছে 

আদিম কবিতার খাতায়। 

পৃথিবীর কোনো এক অনির্দিষ্ট যুগে

সমুদ্রের গর্ভ থেকে উঠে আসবে এই শিশু, 

আকাশের বুক চিরে ছুটে যাবে আশ্চর্য উল্কা, 

আর পূবের দিগন্ত থেকে উপহার নিয়ে আসবে

তিনজন বেরসিক বুড়ো। 


আর ঠিক তখনই এই নবজাতক

দেয়ালা করতে করতে

রচনা করবে এক নতুন পৃথিবী।

তার এক পা থাকবে মহাকাশে, 

অন্য পা থাকবে আগ্নেয়গিরির অতলে,

আর সে দু’ হাত বাড়িয়ে খেলতে খেলতে

হয় পৃথিবীতে গড়ে তুলবে অতুলনীয় এক স্বর্গরাজ্য, 

নয় সবকিছু ধ্বংস করে

আবার নতুন করে ঘুঁটি সাজাতে বসবে। 


দাড়ির গল্প


পঞ্জিকাতে লগ্ন দেখে সেলুন দিলাম পাড়ি, 

বাড়ি এবং হাঁড়ির পরেই সবসে প্যায়ারা দাড়ি!

দাড়ি ব্রহ্মা, দাড়ি বিষ্ণু, দাড়ি মহেশ্বর, 

আল্লাতালা, গড, যীশু সব দাড়ির মাতব্বর। 


সেই দাড়িটিই কাটতে হবে, পাষাণ সমাজ বলে;

আধকামানো গাল নিয়ে কি আপিস যাওয়া চলে?

ক্ষুরটি হাতে যতই কাছে আসেন পরামানিক, 

বিষণ্ণতায় দাড়ির কথাই ভাবছি বসে খানিক। 


কারোর দাড়ি লম্বামাফিক, কারোর দাড়ি খাটো, 

কারোর দাড়ি ছাগল-সমান, থুতনি আঁটোসাঁটো।

এক একজনের দাড়ির ডগা পিছনপানে মোড়া, 

কারোর দাড়ি গোঁফের সঙ্গে এক্কেবারে জোড়া। 


হরেক রকম দাড়ির বাহার দেখতে যাবো কোথা? 

এই জগতের যতেক মহান মানুষ দাড়ির হোতা। 

মার্ক্স, ফ্রয়েড, শোপেনহাউয়ার, লেনিন এবং র্যালে, 

মাথায় যাঁদের বুদ্ধি, তাঁদের দাড়িও থাকে গালে।


আমার দাড়ি কামায় যে’জন, সে’জন সুজন বটে, 

থুতনি জুড়ে রাখছি দাড়ি, মগজ থাকুক ঘটে। 

টাকা কামাই সাধ্য কোথায়? দাড়িই কামাই ব্লেডে।

কমুক টাকা, বাড়ুক দাড়ি, দাড়িরই পে-গ্রেডে। 


ঢিল মারো


মৌমাছির চাকে ঢিল মারো,

ইচ্ছে করেই। 


বহু দিন, বহু যুগ, বহু মুহূর্ত ধরে

ভন ভন ভন ভন শব্দে 

বড় ব্যস্ত হয়ে পড়েছো ভায়া।

দিনের বেলা সমস্যা না হলে'ও,

রাত বিরেতে খাওয়ার পালা শেষ করে

শুতে গেলে

অন্ধকার নিঝুম নিস্তব্ধ রাত্তিরে

ঐ একটানা একঘেয়ে ভন ভন শব্দটা

তোমার বিরক্তিকর লাগে না?


হাতের কাছেই পাটকেল আছে, 

পাঁচটি মধ্যবিত্ত কলমপেষা আঙ্গুলে 

জীবনে প্রথমবার

কোনো কিছুকে শক্ত করে চেপে ধরো,

এক চোখ বন্ধ করে নিশানায় টিপ করে নাও, 

অর্জুনের সেই পাখির চোখের মত।

তারপর বেশী না ভেবে, 

ইচ্ছেটা কেটে পড়বার আগেই

ধাঁই করে ঢিলখানা ছুঁড়ে মারো 

চাকের গায়ে, 

যেখানে হাজার হাজার মৌমাছি, 

না কি ভীমরুল, না কি বোলতা, 

ভন ভন শব্দে যে যার নিজের বাচালতাটুকু, 

নিজের অন্ধ বিশ্বাসটুকু ক্রমাগত জাহির করে চলেছে, 

বিবাদ বিতর্কের তোয়াক্কা না করে। 


মতামতের চাকে ঢিল মারো, 

ইচ্ছে করেই। 

শত সহস্র হুলের খোঁচা সহ্য করো, 

সহ্য করো নির্বোধ গালিগালাজের বিষের জ্বালা,

সহ্য করো ধর্মের দংশন, 

সহ্য করো ভদ্রলোকের ক্লীব তিরষ্কার,

সহ্য করো শ্রেণীহিংসার যাতনা, 

সহ্য করো, সহ্য করো ভাই,

দাঁতে দাঁত চিপে, জিভ কামড়ে 

সব সহ্য করেই

মতামতের চাকে ঢিল মারো, 

দেখোই না,

মধু মেলে কি না মেলে।

Thursday, June 1, 2023

চাহনি | পর্ব ৫ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

‘সাদা নেগেটিভ’

যখন একটা কিছু বলার আগেই, শুরু হয়ে যায় গড়াগড়ি পেড়ে হাসি, তখনই বোঝা যায় যে আলোচনার বিষয়টা কী। গল্পের আভাসে জনা দুই হাসে, আর বাকিরা অবাক হয়ে দেখে। গল্পটা আর বলাই হয় না। বাড়ি, বা ইস্কুল বন্ধু, বা পাড়ার বন্ধুদের আড্ডা মানেই তাই। একসঙ্গে ঠাসাঠাসি করে বড় হওয়া মানেই, সময়ের সিন্দুকে জমে থাকা হাসির রসদ। আমাদের দু-বোনের চাল চলনে মিলের থেকে অমিলটাই বেশি। কিন্তু এই এক ব্যাপারে দুজনেই সেই “ঘাড় কেন কাত?/ আরে, আমরা যে এক জাত!” এখানেই অব্যর্থ দুজনের সেই দুষ্টুমি ভরা চাহনি, যা আজ এই বাষট্টি এবং পঁয়ষট্টি পার করেও একেবারে এক এবং অবিকল। 

এ বয়সে তো বেশিরভাগ জমায়েত মানেই শ্রাদ্ধ বা স্মরণ সভা; আর না হয়তো  বা দিন পনের, কী মাস খানেক কাটিয়ে ছেলে মেয়েরা বিদেশে ফিরে যাবার আগে, একবার গণ দেখা করে নেওয়া। ফলে মন খারাপের ভাগটাই উপচে থাকে। সেখানেও দেখলাম প্রৌঢ়ত্ব পার করে বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছেও দু-বোনের সেই ফক্কড়িও হেসে কুটিপাটি হওয়ায় কোনও ব্যতিক্রম হল না। কেউ হয়তো গমগমে গলায় গান ধরে, গেয়েই চলেছে; থামার নামটি নেই, বোন ওমনি আমার দিকে স্থির তাকিয়ে, টুক করে ভ্রূ নাচিয়ে দেবে, আর আমিও কুল কুল করে হাসতে শুরু করব। এই যে মস্করা চাহনি এর যেন শেষ নেই। সেটা যে কোন চরমে যেতে পারে তা সেদিন বুঝলাম। মাস দুয়েক আগে আমার একটা সার্জারি হয়েছে, আর বোন ছাড়া পেয়েছে সদ্য। আমার হাঁটু এবং ওর পেট সব নড়ে চড়ে গেছে; কাছের মানুষদের আতুপুতু এবং তয় তপ্পনের শেষ নেই। তার মধ্যে শুরু হল চমকদার ঈশারা এবং গড়াগড়ি পেড়ে হাসি। ভারি বয়স, ভারি শরীর সঙ্গে নানা রকমের মনভার; কোথায় কী! হেসেই চলেছি। আমাদের ছেলে মেয়েদুটোরও এ সব প্রসঙ্গ শুনে শুনে প্রায় মুখস্থ; ওদের তেমন হাসিও তাই পায় না। কিন্তু আমরা দুর্নিবার গতিতে এমন হাসছি, যেন কেউ কাতুকুতু দিয়েই চলেছে। 

আর এও তো আশ্চর্য যে, সেই এক ঘনত্বের হাসি এবং একইরকম ইশারা। সেদিন খুবই গুরুগম্ভীর এক স্মরণ সভায় দুজনে গিয়েছি। পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ। সকলেরই মন ভার এবং বিশিষ্ট সঙ্গে সকলেই মার্জিত আচরণে বদ্ধপরিকর। তো একজন দেরিতে ঢোকায়, দরজা খুলতেই তাঁকে দেখা গেল, পূর্ণ আলোয়। আপাদমস্তক সাদা পোশাক এবং কলপহীন সাদায় মুখ মুন্ডল ঘেরায় তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে, পরচুল মাথায় বিশেষ কোনও নাটকের চরিত্র যেন। ছায়াছন্ন অন্ধকারেও, পাশে বসে থাকা বোনের ঈশারাটি যেন কান দিয়েই দেখতে পালাম। দেখতে পেলাম, মুখে আঁচল চাপা দিয়ে তার হাসি চাপার চেষ্টা। সেই সংক্রমণে আমিও তখন ফুলে, ফেঁপে, দুলে একশা। ওই মানুষটিকে দেখে যত না হাসি পেয়েছিল, তার থেকে ঢের গুণ হাসি এল বোনের চোখ আর ভ্রূর ইশারায়; পাশাপাশি বসায়; কনুইয়ের গুঁতোগুঁতিতে। আমার কপট শাসন ওকে যেন আরও হাসাচ্ছে। এই যে দুজনের চাহনির ক্রশ কানেকশন– আসলে আমার কপট  শাসন যেন ওর অন্তহীন মস্করার প্রশ্রয়, এর কোনও ব্যখ্যা আছে! গপ্পোও কিছু নেই। গত পঞ্চাশ বছর ধরে দেখা মানুষটা আজ যখন হাসি উস্কে দিলেন, তখন  তাঁর সম্পর্কে যে ধারণা তাতে হাসি, তাঁকে আগেও যতবার দেখেছি তাতে হাসি; তাঁর এতদিনকার চলন, বলন, সাজ, গড়ন সব মুছে গিয়ে, ততক্ষনাৎ ফিস্ফিসিয়ে তাঁর  নতুন নামকরণ  হল– ‘এতো পুরো উল্টো নেগেটিভ রে– কালোর বদলে সবটাই সাদা’।

বুড়ো বয়সে অনেক কিছুর মতোই আর যা যা চেপে রাখা যায় না– তা হল চাহনি এবং কুলকুল করে বন্যার মতো হাসি।




আগের পর্ব

চাহনি | পর্ব ৪ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

Saturday, May 20, 2023

চাহনি | পর্ব ৪ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

উৎসার

শুধু যে শান্তিনিকেতন তাই নয়, কয়েক প্রজন্ম জুড়ে কোনও না কোনও ভাবে এঁরা সকলেই, বিশ্বভারতীতেই পড়াশোনা করেছেন বা চাকরি করেছেন। তাতেও অবশ্য সবাইকে যে খুব মনে ধরে তা নয়। কিন্তু এই পরিবারটি বড় অদ্ভুত রকমের স্বাধীন, আবার একই সঙ্গে, সর্বত ভাবেই রবীন্দ্রনাথেই স্থিত; কিন্তু সে তাঁদের নিজস্ব অভিধান ও নিয়মে; ফলে এ বাড়ির দুই বোনের সঙ্গে আলাপ হয়ে খুব তাড়াতাড়িই নিকট হয়ে গেলাম। ষাটের দশকে দেখা শান্তিনিকেতন যেন ফিরে এল নব্বইয়ের সীমানায়। ইতিমধ্যে বসন্ত উৎসবে এসে, অনুষ্ঠানের পর দুম করে আলাপ হল, এ বাড়ির বড় ছেলে, মানে ওই দুই বোনের দাদার সঙ্গে। মস্ত এক জোড়া গোঁফের সঙ্গে মানান সই পরিশিলীত ইংরেজি, হিন্দি এবং বাংলা উচ্চারণ ও শব্দ চয়ন। দোহারা দীর্ঘ চেহারায় যে নিপুণতায় ধুতি পাঞ্জাবি, সেই একই রকম অনায়াস স্বাচ্ছন্দে শর্ট স্লিভ ট্রাউজার, ফেডেড জিন্স এবং ঝকঝকে পালিশের বুট। স্মার্টনেসটা এতোটাই আটপৌরে! বেশি কথা বলেন না। তীক্ষ্ণ চোখে একভাবে চেয়ে থাকেন। আমার থেকে প্রায় পনের বছরের বড়, কিন্তু দৃষ্টিপাতে না কোনও কপট স্নেহ, না সঙ্কোচ। অথচ মানুষটি জড়সড়ো; কুন্ঠিত। স্ত্রী ধমক দিলেই শুধু মাথা নয়, গলা শুদ্ধু নিজের  মাথাখানি  নিজের বুকের কাছে ঝুলিয়ে, অপরাধী বালকের মতো বকুনি খান। সেই উজ্জ্বল হাসি মুহূর্তে বদলে যায় বিষাদে। তাঁর স্ত্রীও বিশ্বভারতী থেকেই পাশ দেওয়া এবং সুকন্ঠি। স্ত্রীর পছন্দেরই একের পর এক গান শোনাচ্ছেন দুজনে; কিন্তু আমার কানে কী যেন কম বাজছে। আগের সন্ধেতে যখন উনি একা কিছু গান শুনিয়েছিলেন, সেই গলার বলিষ্ঠ মাদকতা, যেন ওই দুজনে গাওয়া গানে নেই। আমি তো গান গাইতে জানি না, ফলে কারণটা ধরতে পারলাম না। কিন্তু মানুষটির অপরাধী ভঙ্গি আমার মনে কেন জানিনা গাঁথা হয়ে গেল। আসলে সংশয়ের একটা কাঁটা যেন বিঁধে রইল কোথাও; কোথায় বেমানান ইনি?

কলকাতায় ফিরে হঠাৎই একদিন দেখি, আমার সামনে থেমে যাওয়া গাড়ির কাচ নামিয়ে, উনি আমাকে জলদি উঠে পড়তে বলছেন। ওঁর পাশের সিটে চড়ে বসতেই, সিগন্যাল ছেড়ে দিল। আর রাসবিহারী ক্রশিং, যেখানে আমার নেমে যাওয়ার কথা, সেখানে পৌঁছনোর আগেই শুরু হয়ে গেল ঝম ঝম বৃষ্টি। কোনও অনুরোধ ছাড়াই দুম করে শুরু করে দিলেন, ‘রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা...’। আমার হাতে ভাগ্যিস স্টিয়ারিং নেই; কী যে থানা পুলিশ হয়ে যেত কে জানে! মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন গেল নেমে যাওয়ার চেনা পথ। 

নেশাগ্রস্তের মতো চোখ খুলে পাশে তাকিয়ে দেখি, তার সপ্তকে গান ধরে, প্রবল আনন্দে মুগ্ধ তাকিয়ে আছেন সামনের দিকে; চোখের ওপর যেন আর কালো পিচ রাস্তা ও কংক্রিট জঙ্গলে ঘেরা শহর কলকাতা নয়; শান্তিনিকেতনের মাঠঘাট, গাছপালা আর রাঙামাটির পথ; বৃষ্টি আর তুফান দেখছেন। দেখছেন গানের সেই অবাধ মুক্তি, সঙ্গতে যখন নিজের গলায় মন্দ্র সপ্তকে বাজ আর বিদ্যুৎ। তাঁর ওই চেয়ে থাকায় দেখেছিলাম, গান; দেখেছিলাম মুক্তি। বুঝেছিলাম যে এই তাঁর নিজের স্কেল, দ্বৈত গানে যা সমঝোতা করে বামন হয়ে যায়। আজ তা নিজের গহন থেকে উৎসারিত এবং অবাধ।

তাঁর ওই দৃষ্টিতে তাই বৃষ্টির অবিশ্রাম ঝরে পড়া আর তীব্র আনন্দ। এক আকাশ থেকে আর আকাশে ছুটে বেড়ানো; এবং আমার সংশয়ের অবসানে অসামান্য উপহার ওই মুক্ত কন্ঠের গান।

দেখলাম, শূন্যে দৃষ্টি বিছিয়েও মানুষ কেমন উৎসারিত হয়ে আসে তার স্বমহিমায়।

ওই দৃষ্টির অর্থ কি তবে, 

‘যায় নিয়ে যায়, আমায় নিয়ে যায় আপন গানের টানে…ঘর ছাড়া কোন পথের পানে’।



আগের পর্ব

চাহনি | পর্ব ৩ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

Saturday, April 22, 2023

চাহনি | পর্ব ৩ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

 

সতর্ক

সাদার্ন আভেন্যুয়ের প্রায় পুরোটা জুড়েই রেলিং ঘেরা লেক। বিকেল পাঁচটা; এখনও তবু গণগণে রোদ্দুর; সঙ্গে দুর্জয় গরম। চৈত্র শেষ হতে চলেছে যে! লায়ন সাফারি পার্কের গেট দিয়ে ঢুকলে, হাঁটার স্ট্রেচটা বেশ ফাঁকাই থাকে। হকারদের ঝামেলাও নেই। উপরন্তু, ব্যাটারি চালিত একটা সাদা বেঁটে চারচাকায় পুলিশের ধীর টহলদারি। এরই মধ্যে, বড় গেট পেরিয়ে ঢুকেই যে রেলিং ঘেরি, সেটা বেশ নিরিবিলি। সিমেন্ট বাঁধানো উঁচু উঁচু বসার জায়গা; কোনওটা সোজা বেঞ্চি;  কোনওটা আবার অর্ধেক গোল। নিচেটা যদিও ঝাঁট দেওয়া সাফ সুতরো, তা হলেও বেঞ্চিগুলোয় পাখিদের সাদা এবং ধুসর হাগুর টাটকা বা বাসি ছোপ থাকবেই। যারা নিয়মিত আসে, তারা বেশ খবরের কাগজ বা টুকরো পিচবোর্ড নিয়েই আসে। অনেকে গামছা পেতে সটান লম্বা হয়ে, নাক ডাকিয়ে, বেঞ্চি জুড়ে ঘুমোয়। ভাল পোশাকের ডেলিভারি বয়রা হাত পা ছড়িয়ে টিফিন খায়; বাকিরা আসে জোড়ায় জোড়ায়, আদরে জুড়তে। হন্টন বিলাসীরাও এদিকে আসে না; আসেনা টহলদার পুলিশ; এ বেশ মাধবীকুঞ্জের মনোরম আবেশ। তবে, আমার মতো ঠায় বসে কোকিলের ডাক শুনতে, বা গাছের ওপর ধীরে ধীরে আলোর বদল দেখতে, কিম্বা পাখিদের স্নান দেখে মজা পেতে-- আর কেউ আসে বলে মনে হয় না। সকলেই আসে কিছু কিছু না কিছু কাজ সারতে; ঘুম, খাওয়া বা আদরের উদ্দেশে। এমন কি পাখিরাও তাই, কাজে আসে। আমিই বোধহয় একমাত্র সেই হঠকারি আলসে, যে শুধু বসতে আসে দু দণ্ড।

প্রথমদিকে, গাছের নিচে যুগলদের অবস্থান দেখে একটু অস্বস্তি যে হতো না তা নয়। পরে মনে হতো, একাই বসে আছি; কারণ সকলেরই তো সেই একই পোষ মানা আচরণ আর নিঃশব্দে টুক করে বেঞ্চি খালি করে চলে যাওয়া। আর এও আশ্চর্য যে আমার পছন্দের বেঞ্চিটা সব সময় খালি পাই, কারণ সেটি খুবই প্রকাশ্য। আজ ঢুকেই দেখি দুধ সাদা জলের ফোয়ারা ছুটছে; সঙ্গে ওয়াটার লাইটের বাহারি জ্বলা নেভা। ফলে পাখিরা সব পালিয়েছে, এমনকি কাকও। সেই আওয়াজে বাতাস বা পাতার শব্দও আর শোনা যাচ্ছে না। আর আমার বসার জায়গায় একজন পুরুষ জমকালো লুঙ্গি ও কালো গেঞ্জি পরে, নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে; রাস্তার বাঁদিকে খালি না পেয়ে ডান দিকে বসে দেখি, মাথার ওপর পাতার ছায়া আর ফাঁক ফোকর গলে, চড়া রোদের ‘পিঙ্ক ফ্লয়েড’ ঝিলিমিল। ফোয়ারার শোভায় পাখিদের হারিয়ে, এদিক ওদিক তাকাতেই ডানদিকে অল্প দূরেই দেখি, মিষ্টি মিষ্টি চেহারার মেয়েটি নিশিন্তে নিজেকে সঁপে দিয়েছে একজন তুলনায় বয়স্ক ছেলের হাতে। ছেলেটি একেবারেই প্রেমিকোচিত নয়। মনে হচ্ছে বাজারের থলেটা পাশে নামিয়ে রেখে, মেয়েটাকে আদর নামক প্রবোধ দিয়ে, আবার বাজার করে বাড়ি ফিরে বউকে বলবে, ‘তোমার হাতের সেই লেবু চা’! মেয়েটাকে দেখে কী যে ভাল লাগছিল; কী সরল, আর কী নির্ভরতা! অনভিজ্ঞতার আরাম আর আনন্দ ওর সবটুকু জুড়ে। বেশ কিছুক্ষণ পরে আবার ওদিকে চোখ বোলাতেই দেখি, মেয়েটিকে বেঞ্চিতে বসিয়ে, দুষ্টু কাকু গোছের ছেলেটি এবার উঠে দাঁড়াল, মুখোমুখি। লগ্ন মেয়েটি তাতেও মুখ গুঁজে, নিশিন্তে তাকে জড়িয়ে; আর ছেলেটি যেন স্নেহের স্পর্শ বোলাতেই এসেছে, অভিভাবক সুলভ এমন ভঙ্গিতে, মেয়েটির মাথা থেকে কাঁধ বেয়ে হাত নামাতে নামাতে, বাহুর নিচে স্পর্শ করেই, সন্তর্পণে আমার দিকে ঘুরে দেখতে লাগল। আমিও  স্থির দৃষ্টিতে দেখলাম যে, নিজের নাকে সে কখন যেন চশমা এঁটে নিয়েছে; মেয়েটার কোনও আড়ষ্টতা নেই; অথচ লোকটা (ছেলে নয় তো!) বাহু বন্ধনে মেয়েটিকে ধরে রেখেও, অপরাধীর চোখে আমাকেও দেখছে। ভাগ্যিস চোখ সরাইনি; না হলে তো দেখতেই পেতাম না, প্যান্টের বাঁ পকেট থেকে মোবাইল বের করে, সঙ্গোপনে তার সময় দেখা; হায় রে! উঠে দাঁড়ানো, নাকে চশমা আঁটা এবং মোবাইলে সময় দেখা-– এসবই হল মেয়েটিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ছেড়ে যাবার ছল। ধূর্তের অভিজ্ঞ প্রস্তুতি!

কোথায় ভাবছি ,

প্রহর শেষে আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস…

তা না, অতি লোলুপের, আরও এক কাঠি ওপরে গিয়ে, অতি সতর্ক চাহনি!



আগের পর্ব

চাহনি | পর্ব ২ | দোলনচাঁপা | মন্দার মুখোপাধ্যায়

Tuesday, April 4, 2023

চাহনি | পর্ব ২ | দোলনচাঁপা | মন্দার মুখোপাধ্যায়

বছর আঠারো বয়েস। ইস্কুলের শেষ ক্লাস। পুজোর ছুটিতে মায়ের সঙ্গে এবার মধুপুর। বাবার বন্ধু সুরম্য জেঠুর বাড়ি। জেঠু জেঠিমা ছাড়াও বাড়ি ভর্তি লোক। সাত ভাইবোন সমেত, বড় দাদার এক বউ এবং দুটি ছানা। বাবা চলে যাবার পর, বহু মাস পরে, মাকে আবার হাসতে দেখল মিলি। সকাল সন্ধে জমিয়ে আড্ডা, গান, কবিতা আর দফায় দফায় চা। তিনখানি ঘরের একটা আটপৌরে, একতলা বাড়ি। রান্নাঘর লাগোয়া উঠোনের ওপারে, পাঁচিলের গায়ের নিচে যেটুকু মাটি, সেখানেই সাদা রঙের রাশি রাশি দোলন চাঁপা ফুটে আছে। নরম পাপড়ির মাঝখানে যেন লুকোনো সুগন্ধির ঝাঁপি। ভেতর উঠোন তাই সৌরভে ম ম করে। কুঁড়িগুলো সরু সরু লম্বা। এই ফুল ও সুগন্ধ মিলির কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। জেঠু বললেন, এর নাম দোলনচাঁপা।

ষষ্ঠীর সকাল। মায়ের কেনা সেই ফলসা রঙা তাঁতের ডুরে শাড়িটা পরে, কী মনে হল, একগুচ্ছ দোলনচাঁপা তুলে, নিজের একবেণীর বাঁ পাশে, যত্ন করে, ক্লিপ দিয়ে লাগাল মিলি। বাকি সকলে, এখনও এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ঘরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে এসে, বারান্দায় দাঁড়াল মিলি। এখান থেকে গেট অবধি জমি; অনেকখানি এমনিই পড়ে আছে। ঘাস ভর্তি প্রজাপতি আর শালিখের ওড়াউড়ি। থামের গায়ে হেলান দিয়ে মিলি দেখছে, ঘাসের ওপর তার লম্বাটে ছায়া। সেই ছায়ার কাছে আরও একটি ছায়ার আভাস দেখা যেতেই, মিলি চোখ তুলে তাকাল। ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে এলে, জুতোর শব্দ হয় না; তাই সে টের পাইনি।

মিলি দেখল, একজন আত্মবিশ্বাসী যুবক তাকে দেখছে, অপার মুগ্ধতায়। আনত চোখে মিলি হাত ছোঁয়াল তার বেণিতে লাগানো, সেই দোলনচাঁপা গুচ্ছে। তার মনে হল, এটাই যেন দৃষ্টি টানছে ওই যুবকের। স্মার্ট বললেও কম বলা হয়। বলিষ্ঠ শরীরে যেন বিদেশ বাসের ছাপ। পায়ে ভারি জুতো। চোখে চোখ রেখে সে জানতে চাইল, ‘তুমি কে’? মিলি বলল, ‘বেড়াতে এসেছি; এটা আমার জেঠুর বাড়ি’। দু-পায়ে সবল দাঁড়িয়ে মিলিকে সে শুধু দেখছে তো দেখেছই। সেই সম্মোহনে মিলি স্থাণুবৎ। ভেতর থেকে কে যেন বেরিয়ে এসে, সহর্ষে ভেতরে ডেকে নিল তাকে। মিলি জানল যে, যুবকটি এ বাড়ির বউদির ভাই। আগের রাতেই অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরেছে। ওখানকার পড়া শেষ করে, এবার সে এখানে চাকরি করবে।

সন্ধেবেলা আবার সে এলো। সাদা পায়জামা পাঞ্জাবির ওপর, গলায় একটা প্রিন্টেড সিল্কের স্কার্ফ জড়িয়ে। মিলিকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যামেলিয়া লাগাওনি’? 

মিলি বলল, ‘দোলনচাঁপা’।

সদ্য বড় হয়ে ওঠা, সবে শাড়ি ধরা মিলি বুঝল যে, এ দেখাকেই বলে নিমেষ; বলে সম্মোহন। 

Saturday, March 4, 2023

দীপ্তি নাভালের কবিতা | অনুবাদ: দেবলীনা চক্রবর্তী

১৯৫৭ সালে পঞ্জাবের অমৃতসরে জন্মেছেন দীপ্তি নাভাল। পালামপুরে (হিমাচল) পড়াশোনা। পরে নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটি এবং ম্যানহাটনের কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জন। হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রতিভাবান অভিনেত্রী। বড়পর্দায় অনেক সফল চরিত্র উপহার দিয়েছেন। শ্যাম বেনেগালের ছবি 'জুনুন' দিয়ে বলিউডে পা রেখেছিলেন। এই যাত্রার আসল সূচনা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে 'এক বার ফির' ছবির মাধ্যমে। এই ছবির জন্য তিনি সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারও পান। তিনি একজন বহুমুখী ব্যক্তিত্ব। সংবেদনশীল কবি। তাঁর কবিতার বই 'লামহা-লামহা' খুবই জনপ্রিয়।

তিনি একজন প্রশংসনীয় অভিনেত্রীর পাশাপাশি একজন চিত্রকর এবং ফটোগ্রাফার। দীপ্তি নাভালের বাবা তাঁকে চিত্রশিল্পী বানাতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার মন চলে গিয়েছিল অভিনয় ও কবিতায়। যদিও, তিনি ছবি আঁকতেন এবং তাঁর শিল্পকলা প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি মাঝে মধ্যেই হিমাচল থেকে লাদাখের বিভিন্ন পাহাড় পর্বতে ট্রেকিং করতে ভালবাসেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজান। গানের প্রতিও রয়েছে তার গভীর অনুরাগ। মহিলা ও শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়ানোর উদ্দেশ্যে একটি চ্যারিটেবিল ট্রাস্ট গঠন করেছেন। 

গুলজার সাহেব দীপ্তি সম্বন্ধে বলেছেন 'দীপ্তি সেই পথ অনুসরণ করে যেখানে তাঁর সৌন্দর্য চেতনা তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং সে বাঁচে তাঁর আপন শর্তে। তাঁকে দেখে মনে হয় ভীষণ বাস্তবধর্মী, ভীষণ ব্যবহারিক কিন্তু সে একদমই তাঁর বিপরীত। তাঁর স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত হওয়ার লক্ষ্যে দৌড়চ্ছে আর তাঁর বাস্তব সেই স্বপ্নের পিছনে ধাওয়া করে চলেছে।'  

 

অজানা পথ 


অজানা পথে 

চলো আরও কিছুদূর হেঁটে যাই

কোন কথা না বলে 


নিজের নিজের নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গে নিয়ে

প্রশ্ন উত্তরের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে

রীতিনীতির কাঁটাতার পেরিয়ে

এসো আমরা পাশাপাশি চলি

কিছুই না বলে

হেঁটে যাই অনেকটা দূর


তুমি বিগত দিনের 

কোনও প্রসঙ্গ উত্থাপন করো না 

আমিও ভুলে যাওয়া 

কবিতার ছত্র না উচ্চারণ করে

কে তুমি

কে বা আমি 

এই সমস্ত কথা 

আর কিছুই না বলে ...


চলো আরও অনেকটা দূর 

অজানা পথে আমরা হেঁটে যাই 


একাকী রাত 


ঠান্ডা! একাকী রাত 

আর সে

হেঁটে যাচ্ছিল অনেকক্ষণ 

স্মৃতির চাদর গায়ে জড়িয়ে!


মিটি মিটি আলো 


কিছু মিটি মিটি আলো 

আর তুষার শৃঙ্গ থেকে গড়িয়ে আসা জোৎস্না 

সমস্ত চরাচরে যেন একটিই সুর প্রতিধ্বনিত


নীরবতার তো এমনি শব্দ 

হয় তাই না...

তুমিই তো বলেছিলে! 


এমনই প্রশান্তি যেন বাকি কোন কিছুই সত্যি নয়


এই রাত চুরি করেছি আমি 

আমার জীবন থেকে আমারই জন্য 


মসৃণ ঢালের ওপর  


মসৃণ ঢালে মেষপালকদের প্রাত্যহিক শোরগোল শেষ হয়েছে ইতিমধ্যে 

দিন যেন নিশ্চুপে পার হয়ে যাচ্ছে খুব পাশ ঘেঁষে

সাদা শিখরে দিগন্ত তার গোধূলি রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে

কোমল হাওয়ার গুনগুনানি ভেসে যাচ্ছে 

সমতলের মেঠো পথে আবার জলের ধারার মতো

সরু পথের আঁকা বাঁকা চলনে

খেলে বেড়ায় পড়ন্ত সূর্যের শেষ কিরণ এখনও পর্যন্ত

দেখে মনে হয় যেন গলানো কাঁচের চাদর বিছানো 


অনুরণিত হচ্ছে শোনো কোনও এক মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি 

আর সামনের ওই টিলা থেকে ভেসে আসছে গির্জার প্রার্থনা স্তব

আরো দূর থেকে কোন এক মসজিদের আজানের স্বর আন্দোলিত হচ্ছে 


এ এক সংযোগের সন্ধ্যা, আগে তো কখনও দেখিনি

হয়ত এমন এক সন্ধ্যার প্রতীক্ষাতেই ছিলাম 

স্থির হয়ে আছি চলতে চলতে 

প্রকৃতি ও ঈশ্বরের ঔদার্য এর আগে 

অবনত হই এই সান্ধ্যকালীন উপাসনার কাছে



আমি দেখেছি দিনকে রাত্রিতে বদলে যেতে  


আমি দেখেছি দূরে কোনও পর্বতের পায়ের কাছে

যখন সাঁঝ চুপিচুপি তার আস্তানা বানিয়ে নেয়

আর ভেড়ার দল তাড়িয়ে নিয়ে 

মেষপালকেরা সুরু কাঁচা পাকদন্ডি বেয়ে পাহাড়

থেকে নিচে নেমে যায়


আমি দেখেছি পাহাড়ের ঢালের ছায়া বাড়তে থাকে

তখন আরও নীচের ঘাঁটিতে 

সে এক একলা ছাতা ও চশমা

ছুঁয়ে নিতে চায় শেষবেলার সূর্যকে


হুঁ, দেখেছি এবং শুনেওছি

এই ঠান্ডা উপত্যকায় কখনও কোথাও 

প্রতিধ্বনিত হয় 

মোহন বাঁশির সুর ....


তখন 

এখানেই কোথাও কোনও না কোনও পাহাড়ের 

গায়ে হেলান দিয়ে থাকা দেবদারু গাছের নীচে

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি 

একটা আস্ত দিনকে দেখেছি রাত্রিতে বদলে যেতে। 


বেচারা মানুষগুলি 

 

সব মানুষ মাত্রই একই নজরে দেখে

নারী আর পুরুষের

সম্পর্ককে

কেননা তাদের যেন কোনও নাম দিতে পারে! 

ওই নামের ঘেরাটোপে আটকে থাকে

বেচারা মানুষগুলি! 


একটি কবিতা 


'এত গুমরে গুমরে থাকো..

সহজ কেন হও না তুমি!'

সহজ হতে গেলে কি জানো 

অনেকগুলি বছর পিছনে যেতে হবে

আর সেখান থেকেই শুরু করতে হবে

যেখানে কাঁধে ঝুলি নিয়ে

স্কুল যেতে শুরু করেছিলাম

এই মুহূর্ত মন বদল করে

যখন নতুন মন মেজাজ তৈরি করব 

আর তারপর যেদিন 

সহজ সরল হয়ে 

খিলখিলিয়ে

দমকে দমকে 

কোনো কথায় হেসে উঠব

তখন আমায় চিনতে পারবে তো?


আমার স্নায়ুর ভিতরে এক সুর আছে


আমার স্নায়ুর ভিতরে এক সুর আছে

এক মহাজাগতিক ছন্দ এখানে প্রবাহিত হচ্ছে


তুমিও শুনতে পাবে, যদি তুমি 

তোমার আঙুলের সুচাগ্র দিয়ে স্পর্শ করো 


তুমি কি তাকিয়েছ ওই তারাদের দিকে 

আর দেখেছো তাদের? দৃষ্টির বাহির হয়ে? 


এখানে যে শব্দ আছে, শুনতে পাও?

যখন স্পর্শ করো নুড়ি-- পাথর,

শুকনো পাতা বা বাতাস!


তুমি কি অনুভব করো এভাবেই

তোমার আত্মার আংশিক স্বচ্ছতাকে?


যখন তুমি হেঁটে যাও 

তখন ছুঁয়ে দেখো পৃথিবীকে?


সেভাবে জীবনকে ছুঁয়ে দেখো, যেভাবে বেচেঁ আছো


ছুঁয়েছ কি?

কখনও তুমি....

Friday, February 17, 2023

চাহনি | পর্ব ১ | মন্দার মুখোপাধ্যায়

মুহূর্ত মানেই কি পলকে দেখা! চোখের পাতা পড়লেই অন্য সময়ে ঢুকে পড়া! গড়িয়ে যেতে যেতে আবার অপেক্ষা- আরও এক নতুন মুহূর্তের জন্য, যখন আবার পলক পড়বে না; স্থির হয়ে দেখিয়ে দেবে হৃদয় কী চায়! মূক  বা বাকরহিতও তো চোখে কথা বলে। স্বচ্ছ দীঘির মধ্যে কালো ছিপ-নৌকার মতো দুরন্ত ঘুরে বেড়ায় সেই  চোখের মণি; হঠাৎ স্থির হয়ে গেলেই তৈরি হয় এক  বিশেষ উচ্ছ্বাস। কিছুটা আচেনা; হয়তো অজানাও। মনও তখন আঁকড়ে ধরে সেই দৃষ্টিটুকুই। ধরে রাখতে চায় সেই গোপন সঙ্কেত, না হারানো বিশ্বাসের মতোই। রোজকার কথা, হাঁটাচলা, মানুষে মানুষে যাতায়াত, গাছে জল দেওয়া, খাবার বানানো, বার চারেক তা খাওয়া, নিয়ম করে স্নান-– সব ভুলে যাই ক্রমে। ঘুমিয়ে থাকা কিছু অপলক দৃষ্টি, কত কী যে মনে করিয়ে দেয়! সব যেন থরে থরে সাজানোই থাকে। কোনওটা সাধারণ তাকে, কোনওটা বা মোহর জ্ঞানে নিভৃত লকারে। 

কমলা, এমনই চকিতে দেখেছিল, তার দ্বিতীয় বরের সেই দৃষ্টি। প্রথম বিয়ে ভেঙে দ্বিতীয়তেও সুখী হয়নি কমলা; আবার সে পা বাড়িয়েছিল, নতুন প্রেমিকের রোশনাই ইশারায়। আধিপত্যের জেরে কানাই তা আন্দাজ করতেই, জোর লড়ালড়ি। গালাগালির অল্প পরেই মার-– লাথি ও চুলের মুঠি ধরে দুরমুশ। বিয়ে ছেড়ে, ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছিল কমলা; তবু সে ভুলতে পারে না, সেই এক ছবি। বেদম মারের পর কানাইয়ের হাত দুখানা নিজের হাতে জড়ো করে সে বলছে,

-চলো খেয়ে নেবে; তোমার পছন্দের রুটি তড়কাই বানিয়েছি।

মিথ্যে চুম্বনের আশ্বাস জাগিয়ে বলছে,

- এমন মার কেউ মারে!

রাগ ভুলে কানাইও চেয়ে আছে অপলক, কমলার চোখে। জানে, যে কমলার চোখে যা কিছু, সবটুকু মিথ্যে আর ছল; বরের মার থেকে নিজেকে বাঁচাবার পথটুকু সে শুধু করুণা বিছিয়ে দিয়েছে; তবু নরম হয়ে আসে কানাইয়ের রাগ আর ক্ষোভ; কমলা অবাক তাকায়-– এত স্বচ্ছ! এত নরম! এত নির্ভরতা! লজ্জায় নিভে আসে দুর্বল কমলা।

চুম্বন বা সঙ্গম নয়; আজও তার মনে পড়ে, কানাইয়ের সেই দৃষ্টিটুকু।

বৃষ্টি শেষে ভেজা মাঠের মতো, ঝকঝকে সবুজ।

Sunday, October 9, 2022

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | পর্ব ৬ | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য


গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলতেন, ‘প্রত্যেকের তিনটি জীবন আছে: প্রকাশ্য, ব্যক্তিগত ও গোপন।’ তাঁর স্ত্রী প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যেকার সীমারেখা দৃঢ়ভাবে বজায় রাখার প্রয়াসী ছিলেন, ছেলেদের বারবার মনে করিয়ে দিতেন, ‘আমরা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নই।’ তবুও তাঁদের বড় ছেলে, চিত্রপরিচালক ও চিত্রনাট্যকার রোদ্রিগো গার্সিয়া বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কলম ধরেছেন। ‘গাবো ও মেরসেদেস: চিরবিদায়’-– এই বইয়ে তিনি তাঁর কিংবদন্তি বাবার জীবন-প্রান্তের সেই সময়টার কথা লিখেছেন, যে সময়ের কথা ডিমেন্সিয়ায় আক্রান্ত গাবো লিখে যেতে পারেননি। এই স্মৃতিকথায় তিনি ধরে রেখেছেন স্মৃতিভ্রষ্ট গাবোর অন্তিম লগ্নের অম্লমধুর কিছু মুহূর্ত আর তাঁর পাশে অর্ধ শতাব্দীরও অধিককালের জীবনসঙ্গী মেরসেদেসের প্রত্যয়ী উপস্থিতি। বইটির মূল ভাষা ইংরেজি, নাম: ‘A Farewell to Gabo and Mercedes’, প্রকাশকাল: ২৭ জুলাই, ২০২১। বইটির পাঠ প্রতিক্রিয়ায় সলমন রুশদি জানিয়েছেন: “This is a beautiful farewell to two extraordinary people. It enthralled and moved me, and it will move and enthral anyone who has ever entered the glorious literary world of Gabriel García Márquez.”

২০

দিনের বেলার নার্স ও সহকারিণী বাবাকে পরিষ্কার করে সাজিয়ে দিচ্ছিলেন শেষযাত্রার জন্য। নার্স মাকে জিজ্ঞাসা করলেন বাবাকে কোনো বিশেষ পোশাক পরিয়ে দিতে চান কিনা। মা বললেন, না। তখন নার্স একটি সাধারণ কাফন দেওয়ার কথা বললেন। মা নিয়ে এলেন এমব্রয়ডারি করা একটা পাতলা সাদা বিছানার চাদর আর সেটা নার্সের হাতে এমনভাবে দিলেন যেন সাধারণ একটা কিছু দিচ্ছেন।

একদিকে বাবাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে, অন্যদিকে একজন ডাক্তার মৃত্যুর শংসাপত্রের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র তৈরি করছেন। আমরা বুঝতে পারছিলাম যে গণমাধ্যমকে খবর দেওয়ার আগে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কারণ ঠিক সেই সময় বাবার খুব কাছের এক বন্ধু বিমানের মধ্যে রয়েছেন, কলোম্বিয়া থেকে আসছেন শেষ বিদায় জানাতে। মেহিকোর একজন বান্ধবী পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে ফিরতি বিমানে আসছেন, তিনিও রয়েছেন পথে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছিল আমার কিশোরী মেয়েদের নিয়ে। তারাও মাঝপথে। আমার স্ত্রীর সঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলস থেকে আসছে। আমি চাইছিলাম না যে বিমান থেকে নেমেই তারা ফোন খুলে জানতে পারুক তাদের দাদু চলে গেছেন। তাই যতক্ষণ না তাঁরা সবাই ধীরে সুস্থে বিমানবন্দরে পৌঁছন ও প্রথমে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে ফোন করছিলাম না। এই অবস্থা দেখলে বাবা নিশ্চয়ই খুব হাসতেন – ‘সবাই সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কোথাও যাওয়ার নেই’। 

ঘরের মধ্যে ফিরে তাকালাম। বাবার দেহ আপাদমস্তক ঢাকা। খাট নামিয়ে সোজা করে দেওয়া হয়েছে আর তিনি টানটান হয়ে শুয়ে আছেন, শুধুমাত্র মাথাটা একটু তোলা, সেখানে একটা পাতলা বালিশ দেওয়া। তাঁর মুখ একদম পরিষ্কার আর যে তোয়ালে দিয়ে চোয়ালটা বেঁধে রাখা হয়েছিল সেটাও খুলে নেওয়া হয়েছে। এখন চোয়াল ঠিকঠাক আছে, নকল দাঁতও রয়েছে স্বস্থানে। কিন্তু তাঁকে বিবর্ণ আর গম্ভীর লাগছে। তবে শান্তিতে শুয়ে আছেন। যে কটি পাকা চুল আছে তা তাঁর মাথায় অলস ভাবে লেগে রয়েছে। এই চুল আমায় মনে করিয়ে দিল এক অভিজাতের আবক্ষ মূর্তি। আমার ভাগ্নী তাঁর পেটের উপর কয়েকটা হলুদ গোলাপ রেখে দিল। এই হলুদ গোলাপ ছিল বাবার সবচেয়ে প্রিয় আর তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই ফুল সৌভাগ্য বয়ে আনে।

এরপর কয়েক ঘন্টা আমরা বসে রইলাম মায়ের সঙ্গে। প্রতিদিনের মতোই মা দূরদর্শনে বিভিন্ন খবর দেখছেন অন্যমনষ্ক থাকার জন্য। একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে ওক্তাবিয়ো পাসের জীবনের উপর। তিনি বাবা-মায়ের দূরের বন্ধু ছিলেন এবং কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। মা অনুষ্ঠানটি খানিকক্ষণ দেখলেন, কিন্তু তাঁর মুখের ভাব থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে তিনি সেই সব তথ্যচিত্রের কথা ভাবছেন যেগুলো আগত দিনগুলোয় দেখবেন।

হঠাৎ মা বললেন, কাউকে উদ্দেশ্য না করে, বাবা বোধহয় আলবারোর সঙ্গে আছেন, ‘মদ খাচ্ছে আর বাজে বকছে’। বাবার বন্ধু আলবারো কয়েক মাস আগে মারা গেছেন।

এই সময় বাড়ির ফোন বেজে উঠল আর সচরাচর যা ঘটে না ঠিক সেটাই হল, মা ফোন তুললেন। বাবার এক বন্ধু ফোন করেছেন, তবে তাঁর সঙ্গে খুব ঘনঘন দেখা হয় না। তাই তিনি বাবার খবর নিতে ফোন করেছেন আর বললেন যে কিছু প্রয়োজন হলেই তিনি সর্বতোভাবে আমাদের সাহায্য করবেন। মা ধৈর্যের সঙ্গে তাঁর প্রতিটি কথা শুনলেন, তাঁকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানালেন আর তারপরেই বললেন যে বাবা নেই। ফোনের অপর প্রান্তে কী প্রতিক্রিয়া হল তা বোঝাই যায়, বিশেষ করে মায়ের ওই কাটা কাটা গলায় খবরটা শোনার পরে। মা একই রকম গলার স্বরে তাঁকে জানালেন এই কিছুক্ষণ আগে ঘটনাটা ঘটেছে, যেন মনে হল বাড়িতে খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে কথা বলছেন। আমার ভাগ্নে-ভাগ্নিরা খুবই শোকাচ্ছন্ন। কিন্তু তারা আমার মাকে ভালো করে চেনে আর তাই হাসি চাপার চেষ্টা করছে। শেষে যখন তাদের দিকে তাকিয়ে আমি চোখের ইশারা করলাম তারা আর হাসি চাপতে পারল না, দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

২১

বাবার কলোম্বিয়ার বন্ধু মেহিকো পৌঁছে গেছেন। সেকথা আমি জানতে পারলাম যখন দরজায় বেল বাজল। আমায় বলল যে তিনি একতলায় অপেক্ষা করছেন। নিচে নেমে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরের দিকে যেতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রায় ধাক্কা লেগে গেল আমার। কোনো সম্ভাষণ না করেই প্রথম যে কথাটা তাঁকে বললাম তা হল বাবা আর নেই। তিনি বাবার সবচেয়ে পুরোন বন্ধুদের একজন। তাঁকে আমি বাস্তবিক হতচকিত করে দিলাম। তিনি স্তম্ভিত হয়ে চুপ করে রইলেন। কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। চোখদুটোয় ছায়া ঘনিয়ে এল, বুঝি বা তাঁদের বন্ধুত্বের আদি থেকে অন্ত সমস্ত স্মৃতি এক মুহূর্তের মধ্যে তাঁর স্মৃতির সোপান ধরে ছুটে গেল। বুঝতে পারলাম এতটাই ক্লান্ত আর উদ্বিগ্ন হয়ে আছি যে এরকম বাজে ভাবে তাঁকে খবরটা দিয়ে ফেললাম। তখন জোর করে পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার চেষ্টা করতে লাগলাম।

যে বান্ধবী ছুটি কাটিয়ে ফিরছিলেন তিনিও যোগাযোগ করলেন। এবং তারপর যোগাযোগ করল আমার স্ত্রী। তাদের বিমান সবেমাত্র মাটি ছুঁয়েছে। বিমানের ভেতর থেকেই আমায় ফোন করল। তাঁকে সব বললাম। তাঁর দুঃখে আমার মন এতই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল যে মেয়েদের সঙ্গে আর কথা বলতে পারলাম না। অপেক্ষায় রইলাম দেখা হওয়া পর্যন্ত।

বেশ কিছু বন্ধুবান্ধবকে ফোন করলাম। প্রতিটি ফোনই ছিল আগেরটার চেয়ে বেশি কষ্টদায়ক। এঁরা প্রত্যেকেই যেহেতু ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন, তাই কেউই অবাক হলেন না। কিন্তু সকলেই চুপ করে গেলেন, কারুর মুখ দিয়ে কোনো শব্দ নির্গত হল না। এ যেন নিস্তব্ধতার চেয়েও বেশি শূণ্যতা। তাঁদের অধিকাংশই কোনো মন্তব্য না করে অন্যকে খবরটা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালনে রত হলেন। আর যিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে আমার বাবার সাহিত্যিক এজেন্ট ছিলেন, তিনি শুধু বললেন, ‘কী ভয়ংকর!’ আর কথাটা বললেন এমন করে যেন যে ঘটনাটা এতদিন অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছে সেটাই শেষ পর্যন্ত ঘটে গেল। আমি মনে মনে তাঁর মুখটা দেখতে পাচ্ছিলাম। চোখ বন্ধ করে গভীর চিন্তায় মগ্ন। নিজের মধ্যে আরো বেশি ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, যাতে অচিন্ত্যনীয় এই ঘটনা ধীরে ধীরে বাস্তবের রূপ পেতে থাকে। ‘কী ভয়ংকর!’ কথাটা আবার বললেন আর ফোন রেখে দিলেন। একই ধরণের প্রতিক্রিয়া পেলাম বাবার আজীবনের বন্ধুদের অনেকের কাছ থেকে। দুঃখের চেয়েও বেশি অবিশ্বাস। এমন একজন জীবনসাধক, চিরজায়মান, জীবনরসের রসিক, যাঁর অস্তিত্বের কত রঙ, কত রূপ, তিনি আজ নির্বাপিত, এ যেন অবিশ্বাস্য। 

এবার মনে হল সংবাদমাধ্যমের যাকে যাকে খবর দেওয়ার কথা তাদের ফোন করতে হবে। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে, কেননা সেটা ছিল সেমানা সান্তার [১] বৃহষ্পতিবার। একটি ক্যাথলিক দেশে সংবাদমাধ্যমের কর্তাদের পাওয়া তখন কার্যত অসম্ভব। বড়দিনের আগের দিনের মতো সেমানা সান্তার সময়েও বিশেষ কোনো খবর থাকে না। তাই তাঁরা সবাই বাইরে চলে গেছেন, সোমবারের আগে তাঁদের পাওয়া যাবে না। প্রায় দু’ ঘন্টা ধরে আমরা হাত জড়ো করে বসে রইলাম সেই খবরের মধ্যে বন্দী হয়ে যার জন্য সারা বিশ্ব অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু এখন আর তা শোনার কেউ নেই। শেষ পর্যন্ত বাবার সেই বান্ধবী, যিনি সবেমাত্র ছুটি কাটিয়ে ফিরেছেন, তাঁর শরণাপন্ন হলাম। তিনি রেডিয়োর একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তাঁর অনেক অনুগামীও আছে। তাঁকেই অনুরোধ করলাম খবরটা গণমাধ্যমে ঘোষণা করার জন্য। কয়েক মিনিটের মধ্যে সমস্ত জায়গায় ফোন ও মোবাইল বাজতে আরম্ভ করল আর সদর দরজার বাইরে শুরু হয়ে গেল সংবাদমাধ্যম, গুণগ্রাহী ও পুলিশের ক্রমবর্দ্ধমান ভিড়।

২২

বাবার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পরে বাবার সেক্রেটারি একটি ই-মেইল পেলেন। সেটি লিখেছেন বাবার এক বান্ধবী যাঁর সঙ্গে বহুদিন বাবার কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি জানতে চেয়েছেন আমাদের মনে আছে কিনা যে বাবার সৃষ্ট অন্যতম বিখ্যাত চরিত্র উরসুলা ইগুয়ারানও এমনই এক পবিত্র বৃহষ্পতিবারে মারা গিয়েছিল। চিঠিতে তিনি উপন্যাসের সেই অংশটি তুলে দিয়েছেন। সেটি পড়ে সেক্রেটারি আবিষ্কার করলেন যে উরসুলার মৃত্যুর ঠিক পরে কয়েকটি পাখি দিগভ্রান্ত হয়ে দেয়ালে ধাক্কা খায় ও মরে গিয়ে মেঝের উপর পড়ে থাকে। তিনি অংশটি জোরে জোরে পড়লেন ও ভাবতে লাগলেন সেই পাখিটার কথা যেটি সেদিনই একটু আগে মরে পড়েছিল। তারপর আমার দিকে তাকালেন। হয়তো আশা করছিলেন যে আমি বোকার মতো এই কাকতালীয় ঘটনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করার সাহস রাখব। আমি তখন শুধুই ভাবছি কতক্ষণে ঘটনাটা সবাইকে বলব।  

২৩

আমার স্ত্রী-সন্তান বাড়ি এসে পৌঁছল। আমাকে গভীর স্নেহে আলিঙ্গন করার পরই আমার মেয়েরা গেল তাদের ঠাকুমার কাছে। আমার মায়ের পাঁচ নাতি-নাতনি-ই তাঁকে খুব ভালোবাসে। মাকে দেখে মনে হচ্ছে শান্তই আছেন। সবার সঙ্গে কথা বলছেন। আমার মেয়েদের দেখেও ঠিক যেমন সব সময় করেন, তেমনই তাদের খোঁজ খবর নিলেন। ওরাও পরিস্থিতিকে বেশ সহজভাবে গ্রহণ করল। আসলে ঠাকুমার কাছ থেকে অভাবনীয় প্রতিক্রিয়া পেতে তারা অভ্যস্ত। ওরা মনে করে ওদের ঠাকুমা পৃথিবীতে অদ্বিতীয়াঃ মাটির কাছাকাছি থাকা এক অন্য গোত্রের মানুষ। আবার খুবই নিয়মনিষ্ঠ ও রাগী। তথাকথিত সামাজিক নিয়মকে প্রায়শই চ্যালেঞ্জ করেন। তাই ওরা মাকে খুব শ্রদ্ধা করে। আবার মা ওদের খুব হাসায়। নাতি-নাতনিদের কাছে ভালোবাসা পাওয়ার সেটাও একটা কারণ।

কলোম্বিয়া থেকে আগত বন্ধু মায়ের কাছে অনুমতি চাইলেন বাবাকে একবার দেখার জন্য। অবশ্যই মা রাজি হলেন। আমি তখন আমার মেয়েদের একই কথা বললাম। এক মেয়ে যেতে চাইল না। কিন্তু অন্যটি দূর থেকে দাদুকে একবার দেখল। কিছুই বলল না মুখে কিন্তু তার অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছিল কৌতূহল ও দুঃখের ভিতরের এক টানাপোড়েন। ঠিক তখনি দূরদর্শনে খবরটা সম্প্রসারিত হল। বিভিন্ন চ্যানেলে দেখানো হতে লাগল বাবার জীবনী, সংক্ষিপ্ত ও দীর্ঘ, বা তাঁর জীবনের টুকরো টুকরো অংশ। মা একবার এই চ্যানেল দেখছেন, তারপর অন্য চ্যানেল, তবে কোনো মন্তব্য করছেন না। মগ্ন হয়ে আছেন নিজের মধ্যে। আমরা তাঁর চারপাশে ঘিরে বসে আছি আর সেই মানুষটার জীবন ও সাফল্যের ধারাবিবরণী দেখছি যিনি শুয়ে আছেন, ঠিক পাশের ঘরে, মৃত।


টীকা

সেমানা সান্তাঃ বা পবিত্র সপ্তাহ। ইস্টারের আগের সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ক্যাথলিক ধর্মের একটি অনুষ্ঠান। সারা সপ্তাহ ধরে এটি পালন করা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে যীশু খ্রীস্টের জীবনী ও বাণী পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে মধ্যযুগে স্পেনে এই উৎসবের সূচনা হয়।  




আগের পর্ব

গাবো ও মের্সেদেস: চিরবিদায় | ৫ম পর্ব | ভাষান্তর: অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

Thursday, September 22, 2022

ভারতে মহাভারতে: আগামী দিনের বিদ্যাচর্চার পথ প্রদর্শক একটি গ্রন্থ

বিজলীরাজ পাত্র

মাঝে মাঝে ইতিহাসে এমন কিছু গ্রন্থ লেখা হয় যা বিদ্যাচর্চার ধারাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ভিন্ন ধারার, ভিন্ন পথের, এমনই একটি পুস্তক হল, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘ভারতে মহাভারতে’।এই বইকে আলাদা ভাবে সাহিত্য সমালোচনা, সংস্কৃতিবিদ্যা, ইতিহাস বা দর্শনের বই ভাবলে মস্ত ভুল করব আমরা। বরং এই বই আমাদের চেতনার সেই জিজ্ঞাসু কোনে প্রশ্ন তোলে, যেখানে অভিষ্ট প্রতর্কটি ঠিক খুঁজে পাবেন আপনি। এই গ্রন্থের কেন্দ্রবস্তু হিসেবে শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা এবং মহাভারত বারেবারে ঘুরে ফিরে এসেছে। কেন্দ্রের শক্তিকথায় পরে আসছি। কিন্তু পরিধি অঞ্চলেও শিবাজীবাবু যে সব অতি দরকারি এবং নতুন জ্ঞানচর্চার সংকেত দিয়েছেন, তার জন্য শত প্রশংসাও কম পড়বে। এমনই একটি পরিধিকথা দিয়ে এই লেখার সূচনা করা যাক।

‘আধুনিক’ কথাটি শুনলেই আমাদের মনে সাহেব মুলুকের কথা আসবেই আসবে। কেউ হয়ত স্মরণ করবেন, উনিশ শতকের দুঁদে ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারের কথা। আবার কেউ ভাবতে পারেন বরেণ্য কবি টি এস এলিয়ট এবং তার পথপ্রদর্শক কাব্যগ্রন্থ ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর (১৯২২) কথা। আর বাঙালি জীবনের প্রেক্ষিতে ‘আধুনিক’-এর কথা উঠলে যার নাম এবং কথা এক বাক্যে উচ্চারিতহয়, তিনি হলেনবুদ্ধদেব বসু। ‘রবীন্দ্রনাথ ও উত্তর সাধক’ (১৯৫২) প্রবন্ধটি লিখে বুদ্ধদেব বাঙালিকে, আধুনিক, আধুনিকতা ইত্যাদি বিষয়ে বেশ চৌখোশ করে তুলেছিলেন। আমাদের বিদ্যাচর্চামহল ‘আধুনিক’ বিষয়ে  মোটের ওপর এই বিশ্বাসে স্থির যে, এর সমস্ত কৃতিত্ব এবং জ্ঞান বিলেত থেকেই আগত। 

আসলে সাহেবদের ‘Modern’-এর অনুবাদ বাংলাতে ‘আধুনিক’ করতে গিয়েই আমরা যত ওলট পালট কাণ্ড বাধিয়ে বসে আছি। খুব সম্ভবত আমরা, বাঙালি সংস্কৃতির নানান অলি গলিতে কেমন ভাবে বা কী কারণে ‘আধুনিক’ শব্দটির ব্যবহার হত, সেই নিয়ে খুব বেশি কিছু ভেবে দেখিনি। আরও সহজ করে বললে, ‘Modern’ এবং ‘আধুনিক’-কে গুলিয়ে আমরা এই পোড়া বঙ্গদেশে, ভাবতেই পারিনি যে, ‘আধুনিক’ শব্দটির একটি ‘দেশীয়’ উত্তরাধিকার থাকলেও থাকতে পারে। আর আমাদের সেই না ভাবার কাজটাই করেছেন, জ্ঞানচর্চার অন্যতম কাণ্ডারি শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়।

‘আধুনিক’-এর পথ ঘাট খুঁজতে শিবাজী পাড়ি দিয়েছেন প্রাগাধুনিক বাংলা কাব্যের জগতে। সুখময় মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষ্য মানলে, ১৬১২ সাধারণাব্দে রচনা সমাপ্ত হয়, কৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখিত, ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ গ্রন্থের। আর গ্রন্থের আদি লীলা, সপ্তদশ পরিচ্ছেদে শিবাজীবাবু পেয়েছেন তার জিজ্ঞাসার খোঁজ। চৈতন্য এবং কাজির মধ্যে চলছে তর্কাতর্কি, আর সেই হুলিস্থুলে, চৈতন্য কাজির থেকে জানতে চান, ‘পিতা মাতা মারি খাও এই কোন ধর্ম’। এই ‘পিতা মাতা মেরে খাওয়া’ অর্থে চৈতন্য গোবধের কথা বলছেন। অবশ্য কাজিও কম যান না। তিনিও রীতিমত আট ঘাঁট বেঁধে পথে নেমেছেন। কাজি চৈতন্যকে বলেন, ‘তোমার বেদেতে আছে গোবধের বাণী’। কাজির এমন বার্তায় চৈতন্য বলেন, “জীয়াইতে পারে যদি তবে মারে প্রাণী।/ বেদ পুরাণে আছে হেন আজ্ঞা বাণী।।”

অগত্যা কাজির নরক থেকে আর নিস্তার নেই। চৈতন্যের অমোঘ বাণী, “গো অঙ্গে যত লোম তত সহস্র বৎসর।/গোবধী রৌরব মধ্যে পচে নিরন্তর।।’’। এরপর কাজি আর খুব বেশি উত্তর প্রত্যুত্তর চালাতে পারেননি। বরং চৈতন্যের উদ্দেশ্যে কাজি বলেন-‘আধুনিক শাস্ত্র মোর বিচারস্থ নয়’। কৃষ্ণদাস কবিরাজের লেখনী অনুযায়ী, কাজির শাস্ত্র ‘আধুনিক’। এই ‘আধুনিক’ অর্থে কাজির শাস্ত্রকে শুধুমাত্র নবীন বলা হচ্ছে না। এর মধ্যে একটা উচ্চ নীচের গল্পও আছে। আছে একটা জয় পরাজয়ের আখ্যান। বাংলা প্রাগাধুনিক কালে, ‘আধুনিক’ শব্দটির সঙ্গে তাই একটা রাজনৈতিক ইতিহাস জুড়ে আছে। ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ গ্রন্থিটিতে আমরা যেমন ‘হিন্দু’ শব্দের ব্যবহার পাই, তেমনই মুসলমান অর্থে, ‘যবন’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। চৈতন্য এবং কাজির বিরোধ, নিপাট ‘হিন্দু’ এবং ‘যবন’-এর বিরোধ নয়। এর মধ্যে একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক গ্রহণ বর্জনের ইতিহাসও আছে। যে জ্ঞানতত্ত্ব, ‘যবন’-এর জ্ঞানকে গ্রহণ করতে চায়নি। স্পষ্টস্বরে চৈতন্য বলেছেন, “তোমার যে শাস্ত্র কর্তা সেহো ভ্রান্ত হৈল।/ না জানি শাস্ত্রের মর্ম হেন আজ্ঞা দিল।।”

শিবাজীবাবু তাঁর বইতে ‘আধুনিক’ বিষয়ে পথপ্রদর্শক একটি উদাহরণই পেশ করেছেন। কিন্তু কেউ যদি শিবাজীবাবুর পথে হেঁটে ‘আধুনিক’- প্রতর্কের আরও গভীরে প্রবেশ করতে চান তাহলে নানান চমকদার গল্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটবে আমাদের। ত্রিবেণীর জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের কথাই বলা যাক না হয়। জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের মৃত্যুহয়েছিল ১৮০৭ সাধারণাব্দে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বেশ ভালোরকম যোগাযোগ ছিল তর্কপঞ্চাননের। সেই জগন্নাথ বিষয়ে, পরিষদে রক্ষিত রামগোপাল মুখোপাধ্যায়ের কুলগ্রন্থের পুঁথিতে লেখা হয়েছে-‘ত্রিবেণী জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননস্য কন্যাবিবাহঃ, স তু আধুনিক পালধি’। প্রথিতযশা গবেষক দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য্যের সংগ্রহে থাকা একটি ‘কারিকা’-তে আরও  লেখা হয়েছে-“ ‘আধুনিক’ জগন্নাথতর্কপঞ্চানন।/ তার সুতা লইয়াছিলেন গোপাল ভাজন।।”

স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, পণ্ডিত তর্কপঞ্চাননের কন্যার বিবাহ নিয়ে বড় সমস্যার কারনে, নিন্দা অর্থে জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের পরিচিতির সঙ্গে ‘আধুনিক’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ‘দেশীয়’ পরিসরে আধুনিকের গতিবিধি খোঁজার আশু প্রয়োজন রয়েছে, নাহলে ‘আধুনিক’ নিয়ে কোনও প্রতর্কের বিচারেই  বিলাতের বাইরে পা ফেলতে পারবনা আমরা। ‘ভারতে মহাভারতে’-র পরিধি খুঁজলে এমন আরও অনেক প্রতর্কের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটবে আমাদের। সেই পরিধির খোঁজ না হয়, পাঠকের জন্য তুলে রেখে বইটির গভীরে প্রবেশ করা যাক খানিক।

মোট চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত শিবাজীবাবুর এই মহাগ্রন্থ। প্রথম অধ্যায়ের নাম, ‘অথ মা ফলেষু কদাচন’। দ্বিতীয়- ‘পিতাপুত্রদ্বৈরথ’। তৃতীয়টি হল, ‘মহাভারতঃ রণ, রক্ত, বিফলতা’। আর সর্বশেষ অধ্যায়-‘ধর্ম, আছ তুমি কোথায়?’। আর এই অধ্যায়ের পূর্বে পাঠক স্বাদ নিতে পারেন, রণবীর চক্রবর্তী লিখিত সুস্বাদু ‘কথামুখ’ অংশটির। ঐতিহাসিক মহাশয়, আরও নানা কিছুর সঙ্গে শিবাজীবাবুর মেধাজীবী হয়ে ওঠার আখ্যানও বর্ণনা করেছেন এই অংশে।

আজকাল বিদ্যাচর্চার পরিসরে জ্ঞানের বিভাজন অত্যন্ত তীব্র গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। যারা উনিশ শতক চর্চা করেন, তারা প্রাগাধুনিক যুগকে বাদ রাখতে চান। যারা মুদ্রণ সংস্কৃতি এবং ছাপা বই-এর ইতিহাস চর্চা করেন তারা আবার পুঁথির জগতকে ছুঁয়ে দেখতে চাননা। এই ধরণের জ্ঞানকাণ্ডের নিশ্চয়ই প্রয়োজন আছে। কিন্তু পাশাপাশি এমন বিদ্যাপরিক্রমার দরকার আছে যেখানে, প্রাগাধুনিক যুগ এবং উনিশ শতকের সংযোগরেখা তৈরি হবে। এই সংযোগের একটি বড় ইতিহাস রয়েছে, ‘অথ মা ফলেষু কদাচন’ অংশটির মধ্যে। মুখ্যত গীতার ২/৪৭ কে ঘিরেই এই অংশের তর্কাতর্কি। আর এই তর্কের পথে শংকর (৭৮৮-৮২০) থেকে শুরু করে অভিনবগুপ্ত (৯৪০-১০১৪), জ্ঞানদেব (১২৭৫-১২৯৬), জয়তীর্থ (১৪শতক), মধুসূদন সরস্বতী (১৬ শতক) হয়ে বিশ শতক পর্যন্ত প্রসারিত। আর এই বিশ শতকের পথপরিক্রমায়, দুঁদে রাজনৈতিক নেতা মোরারজি দেশাই-এর মতো দুঁদে রাজনৈতিক নেতার  গীতা চিন্তাও বিশ্লেষণ করেছেন শিবাজী বাবু। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গীতার প্রভাব প্রতিপত্তির ইতিহাসকে আমরা যেমন ভাবে দেখে থাকে, সেখানে শিবাজীবাবু এক নতুন প্রতর্কের আগমন ঘটিয়েছেন। তবে সেই নতুন প্রতর্কটি কী তা জানতে হলে, বইটি পড়ে দেখতে হবে পাঠককে। 

গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘পিতাপুত্রদ্বৈরথ’ আমাদের চেনা পৃথিবীর অনুভূতির ইতিহাসে কিছু নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়ে যায়। কাকে সম্পর্ক বলে? সেই সম্পর্কের পরিণতি কোন কোন পথে যেতে পারে, তার নানান টীকা ভাষ্য রয়েছে এই প্রবন্ধের মধ্যে। বেদ, উপনিষদ্‌, স্মৃতি, বৌদ্ধগ্রন্থ আরও নানান সূত্রের ভেতর দিয়ে লেখক পৌঁছে যান কখনও ব্রাহ্মণ-শ্রমণের ‘শাশ্বত বিরোধ’ থেকে ‘হিন্দু’-র ঠিকুজি নির্মাণে। তবে পিতাপুত্রের লড়াইতে নতুন মাত্রা যোগ করে, ব্রহ্মচারী, গৃহস্থ, বানপ্রস্থী বা সন্ন্যাসী-র ইতিহাস। 

খুব অল্পতে শেষ হওয়া সম্ভব নয়, এমন মহাগ্রন্থের গতিধারা। পরবর্তী দুটি অধ্যায়, ‘মহাভারত: রণ, রক্ত, বিফলতা’ এবং ‘ধর্ম, আছ তুমি কোথায়?’অধ্যায় দুটিতে যেমন মহাভরতের মান্য সংস্করণ গড়ে ওঠার গল্প পাই, তেমনি ধৃতরাষ্ট্রের সহচর, সঞ্জয়কে ঘিরে রহস্যের অন্ত নেই। আর এই সব কিছুর সঙ্গে মিলে যায়, বাংলা উপন্যাসের অন্যতমা কথাকার, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা। আর ‘ধর্ম’-র ঘাত প্রতিঘাত বুঝতে চণ্ডাল-বিশ্বামিত্র সংবাদের জুড়ি মেলা ভার। যে অখ্যানের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ‘নতুন বামুন’ বিশ্বামিত্রের এক ‘চণ্ডাল’-এর ডেরায়, ক্ষিদের জ্বালায় কুকুরের মাংস খেতে চাওয়ার অদম্য তাগিদ। 

‘ভারতে মহাভারতে’ গ্রন্থের আলোচনা এর ভাষার প্রসঙ্গ বাদ রেখে করা চলে না। ভুলে গেলে চলবে না, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার বা গল্পকার পরিচয়ের কথা। আজকের নগর পরিসরের, অভিজাত বা অনভিজাত মহলের, বাংলা ভাষা ভুলে যাওয়ার লীলাখেলায় নিশ্চিত ভাবেই পাঠক এক দণ্ডের শান্তি পাবেন এই বই পড়লে। বাংলা ভাষার ‘শান্ত’, ‘বাৎসল্য’ ‘সখ্য’ এবং ‘মধুর’রূপটি ফুটে উঠেছে শিবাজীবাবুর লেখনীর মধ্যে। হয়ত কবি বলেই তিনি, ভাষাকে নিজের মতো ভেঙে গড়ে নিতে পারেন। শিবাজীবাবুর এই বই কার্যত পাঠককে গোয়েন্দা আখ্যান পাঠের আনন্দ দেবে। আমাদের ভারতীয় দর্শন, ইতিহাস এবং সাহিত্যের একের পর এক রহস্য পরত ছাড়িয়েছেন শিবাজীবাবু ‘ভারতে মহাভারতে’ গ্রন্থের মধ্যে। এই বই-র ‘গ্রন্থনির্মাণশিল্পী’ সোমনাথ ঘোষ, চার্বাক প্রকাশনা এবং হরপ্পার সৈকত মুখার্জি অসংখ্য ধন্যবাদের প্রপাপক এতও সুন্দর এবং নান্দনিক একটি পুস্তক নির্মাণের জন্য। এই গ্রন্থ অবশ্যপাঠ্য।

Thursday, August 18, 2022

অশোক বাজপেয়ীর কবিতা | অনুবাদ: দেবলীনা চক্রবর্তী

আত্মাই শরীরের অনন্ত স্বপ্ন


বৃক্ষ হল সেই প্রাণ যা পৃথিবীর শরীর থেকে বেড়ে ওঠা এক অটুট বন্ধন


ফুল ততক্ষণই ফুল থাকে যতক্ষণ সে গাছের অংশ হয়ে ফুটে থাকে 

আর পাতা ততক্ষণ সজীব থাকে যতক্ষণ সে গাছের শরীরের সঙ্গে গেঁথে থাকে


শরীর সাধনায় লিপ্ত থাকাকালীনই একমাত্র শরীর ও আত্মার অভিন্নতাকে অনুভব করা সম্ভব


কারণ আত্মাই শরীরের অনন্ত স্বপ্ন দেখে।


উপাসনা এবং চিৎকারের মধ্যবর্তীতে


যেভাবে তুমি ছিলে 

তোমার তরঙ্গায়িত দেহ বিভঙ্গ নিয়ে

মহাশূন্যে থেকে ভালোবাসার মতো

সীমিত আধারে সঞ্চারিত হয়ে 

সেইখানে কি আমি স্থাপন করতে পারি কিছু শব্দবন্ধ

যার সংযোজনে কাব্য গঠন হতে পারে?


তোমার উন্মুক্ত একাকী আলোকিত 

আকাশ আছে যাকে আমার কোনও 

ইচ্ছে বাসনা, কোনও চিৎকার ছুঁতে পারে না

সেখানে অতীত হল এক কিরণ 

আর ভবিষৎ এক অপ্রত্যাশিত ফুল:


শাখা পল্লবিত হয় মুদ্রায় 

আর মুদ্রা এক নীরব প্রার্থনা

সংগীত হল নিঃসঙ্গতা 

চট্ট্যান যেমন ফুল তেমনি ফুলও সেই চট্ট্যান

শরীর তো সমুদ্র 

আবার সমুদ্র হল এক আকাশ 

এবং আকাশই একমাত্র চিৎকার

সেই চিৎকার হল উপাসনা


আমি দেখি 

ক্রমশ কাছে আসা অন্তকে

নদী একাকার হয় সাগরে 

আর অবাঞ্ছিত জল ফিরে আসে 

সময় এবং কামনায়,

আমি প্রথমবার চিনতে পারি 

শব্দকে অবসাদগ্রস্থ হতে 

উপাসনা এবং চিৎকারের মধ্যবর্তীতে অপেক্ষারত 

কবিতা 

যা কোথাও স্থাপন করা সম্ভব নয়।


পাত্র


হটাৎ জানা গেল যে এমন কোনও 

কানা উঁচু পাত্র নেই যেখানে কিছু

দুঃখ আর হরিয়ালি সব্জি রাখা হত

এখন আর নেই..

দুঃখ রাখার জায়গা

ধীরে ধীরে কমে আসছে।


সে আমাতে 


আমার মধ্যে যে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে তাকে নিয়ে আমি ভাবি না

আমার দেহের হাড় মজ্জা নিয়েও আমার ভ্রুক্ষেপ নেই 

যে আত্মা আমারই তাকেও আমি স্মরণ করি না 

যে আমার মনের ভিতর আছে, তবে তাকে কেন ভুলতে পারি না!


তাকে প্রশ্ন করো


হাওয়াকে নয়, তাকে প্রশ্ন করো

সে শব্দ থেকে এখনও অদৃশ্য কেন?

শব্দকে নয় বরং তার কাছে জানো 

সে শব্দের ধরা ছোঁয়ার বাইরে কেন? 

মৌনতাকে নয়, তার কাছে জানতে চাও

ঠিকানা তার ধ্বনি থেকে দূরে...

কিন্তু কত দূর আর কোথায়?


প্রেমের জন্য


সে তার প্রেমের জন্য স্থান সংরক্ষণ করল

সূর্য চন্দ্রকে একপাশে রেখে

আলাদা করে রাখলো তারাদের

বনলতাদের সরিয়ে দিল

ঝেড়ে ঝুরে নিল পৃথিবী

তারপর আকাশের গায়ের

ভাঁজ পরিপাটি করে

সে তার প্রেমের জন্য স্থান সংরক্ষণ করল


গড়া


কিছু প্রেম

কিছু প্রতীক্ষা 

কিছু কামনা দিয়ে 

রচিত হয়েছিল সে

--রক্ত মাংস দিয়ে 

গড়া তো ছিল বহু আগেই


শুধু শব্দ দিয়ে নয়


শুধুমাত্র শব্দ দিয়ে নয়

তাকে স্পর্শ না করেও ছুঁয়ে

চুম্বন না করেও সিক্ত হয়ে

বন্ধনে না জড়িয়েও দু'বাহুর আলিঙ্গনে 

বহুদূর থেকে তার প্রস্ফুটিত রূপ

চোখে না দেখেও দৃষ্ট হওয়া 

তাকে আমি বললাম।


শেষ 


সব কিছুর পরেও

বেচেঁ থাকবে শুধু প্রেম 

সঙ্গমের পরে সজ্জায় লেগে থাকা ভাঁজ যেমন

আমৃত্যু বিষয় ভাবনা,

অশ্বারোহীর দ্বারা পদদলিত হওয়া সত্ত্বেও

হরিৎ চাদর জড়িয়ে ধরিত্রীর পড়ে থাকা, 

গ্রীষ্মের শীর্ণ শুষ্ক ঝরনার কঠিন বুকে 

লেগে থাকা নোনা জলের ধারার মতো

অব্যাহত থাকবে 

শেষ পর্যন্ত

প্রেম



-------------------------------------------------------------------------

ভারতীয় কবি, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সমালোচক অশোক বাজপেয়ী। সরকারি কর্মচারি ছিলেন। তিনি ললিত কলা আকাদেমি, ভারতের জাতীয় শিল্প আলাদেমি, সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৯৪ সালে তাঁর কবিতা সংগ্রহ 'কহি নেহি ওহি' জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ-- শহর আব ভি সম্ভবনা হ্যায় (১৯৬৬), তৎপুরুষ (১৯৮৬), বাহুড়ি আকেলা (১৯৯২)। দায়াবতি মোদী কবি শেখর সম্মান ও কবীর সম্মাননা পেয়েছেন। ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের সরকারি সম্মানেও ভূষিত হয়েছেন।

Tuesday, August 9, 2022

পাঁচটি কবিতা | ইকারো ভালদেররামা | স্প্যানিশ থেকে বাংলা অনুবাদ: জয়া চৌধুরী

মূলের যত কাঁপন (Tremores del origen)


অব্যর্থ সত্য।

অব্যর্থ সত্যি কি?

            (কোরান ৬৯, ১) 


একটি অস্তিত্বহীন বইও দৃঢ়ভাবে বলে থাকে

যিনি বুদ্ধের পথে হাঁটেন

তাঁকে শান্ত হতে শিখতে হয়।

“আলোকিত কন্ঠ-- অস্তিত্বহীন বইটি বলে থাকে--

হল জলের নীচে থাকা পদ্ম যেন”।

এই ভাবনা (নিগূঢ় মৃগ যেন)

সেই মহান অতীন্দ্রিয় কবি আল তুরাইয়েকের 

সাঙ্গীতিক বুনন-– যিনি রাঙিয়ে 

তোলেন, আরবী জীবনীকারদের মতে

তিনি কখনও অস্তিত্ববান ছিলেন না--

“শব্দের খোলবিশেষ

                আকাশের নিচে থাকা প্রাণীরা

ওদের আগলে রাখি মূলের যত কাঁপন থেকে।


এখানে-- আমার গভীরতম জলে--

কবিতারা পুষ্পিত হয়”।



শব্দের বিশুদ্ধ দুধ (Leche pura del sonido)


তিনি চলমান এবং একই সঙ্গে অচল

                  (শ্রীভগবদ্গীতা ত্রয়োদশ অধ্যায়, ১৫)


শব্দের বিশুদ্ধ দুধ

তোমার পায়ের মাঝে খোলা আকাশ,

নরকের ওইপারে

যেখানে সব কিছুর জন্ম। 


শীর্ষসুখ, আলোর তীর ঘেঁষে

মহাজাগতিক পশু 

এসো প্রার্থনা করি--


যিশুখ্রিস্টের নাভিকুণ্ডলী, 

স্বর্গীয় কোষের খাদ্য,

নারীর গর্ভপুষ্পে স্বর্গের মূল।

স্তন্যপায়ী কুমারী, স্তন্যপায়ী ঈশ্বর,

স্তন্যপায়ী রহস্য--

এসো নগ্ন হই।


স্তন্যপায়ী কুমারী, স্তন্যপায়ী ঈশ্বর,

স্তন্যপায়ী রহস্য--

এসো স্তন্যপান করি। 


তোমার ক্রিয়ায় যদি সারস গর্ভবতী হয় 

যার উষ্ণতা নেমে আসে আমাদের উপর--

শতাব্দী জুড়ে শতাব্দী থেকে আসা কলম ও সঙ্গীত, 

বাগানের বিষাক্ত দাতুরা গাছে থাকা কলম ও সঙ্গীত।



অন্য পাখিটি (Otro pájaro)


যে স্বপ্ন আমি দেখেছি আপনারা তা শুনুন

                (জেনেসিস ৩৫, ৬)


পাখিটির গভীর অন্দরে

গায় গান

যে ঘুমায় অন্য পাখিতে,


আমার স্বপ্নের কম্পনশীল 

রামধনু জঙ্গলে। 



কেরুবিন, ঈশ্বরে মহিমা রক্ষক দেবদূত (Querubín)


দেবদূতেদের দেখবে তুমি

          (কোরান ৩৯, ৭২)


জাগুয়ারের বেদীর উপর

একজন দেবদূত আমাকে তাঁর দেহ নিবেদন করেছিলেন,

তাঁর ছায়াহীন পশুমাংস।

তাঁকে বলেছি-- “তুমি ধূলিকণা, হবে সূর্য

এবং নাড়িভুঁড়ি, যারা আমার উপর রাজত্ব করে 

তারা তোমায় গ্রহণ করে। তুমি প্রবেশ করো, আমার অন্দরে,

                                      প্রগাঢ় অদ্ভূত জীব, আনন্দ কর”!


সেসময়, এমনই ছিল-

রাত্রি উন্মোচিত হয়েছিল তার হলুদ চোয়ালে,

এবং একটি পাখি ঘোষণা করেছিল তার অনুষ্ঠান-- 

কাইউহ, কাইউহ,

কাইউহ, কাইউহ।


(আকাশ-নীল অণু চর্বণ করতে করতে)

তখনই আমার দাঁতেরা জয় করেছিল,

অ্যানাকোন্ডার, চামান পশুর, ভেড়ার, তেলাপোকার, অশ্বের,

হাতি, সীগাল, গ্রহদের,

জাগুয়ারের বেদীর উপরে থাকা এক রহস্য,

স্বর্গের দেবদূতেরা পুষ্টি গ্রহণ করেন,

জঙ্গলে জন্মেছিল যে সব জীবন্ত প্রাণ 

আলোর সর্বভুক বিচ্ছুরণ থেকে।


চলো প্রার্থনা করি--

পুতুমাইয়ো নদীতীরের ইন্ডিয়ান দেবদূত,

ব্যাঘ্রদেবতা যিনি গ্রাস করেন মহাবিশ্ব,


প্রবেশ করো আমার ভেতরে,

                  আনন্দ কর! 



ছাগনন্দিনী (Niña cabra)


সকলেই আমার ভিতর

          (শ্রীভগবদ্গীতা নবম অধ্যায়, ৪)


তুমি, ছাগ নন্দিনী,

নামহীন, রাজনন্দিনী, 

বিচরণরত, 

সাদা পশম, অরণ্যের নিস্তব্ধতা,

আলোর ধ্বংসাবশেষ,

এসো              আমার দৃষ্টির ভিতর নিয়ে এসো--

নিদ্রামগ্ন বাদুড় ভরা বাগানে--

বিস্ময়কর শিং যত,

তীক্ষ্ণ হীরকেরা

যারা আহত করেছিল বন্য পশুদের

হলুদ ফুসফুস।


ছাগনন্দিনী,

আমার কুয়াশার কুয়াশা

নক্ষত্রমাতা এবং ইউনিকর্নের আতংক,

ফিরিয়ে দাও আমার শরীরে 

                       তার পাশব প্রশ্বাস।




-------------------------------------------------------------------------

কলম্বিয়ান কবি ইকারো ভালদেররামা। স্প্যানিশ ভাষায় লেখেন। একই সঙ্গে তিনি গায়ক ও প্রযোজক। সারা পৃথিবী ঘুরে বেরিয়েছেন। সাইবেরিয়া ও মঙ্গোলিয়ার সংস্কৃতি তাঁর বিশেষ ঝোঁক। কিছুদিন আগে কলকাতা পোয়েট্রি কনফ্লুয়েন্সে তিনি থ্রোট সিঙ্গিং পরিবেশন করেন।

Saturday, July 2, 2022

আমি চাই, সব সিনিয়র কবি জুনিয়র কবিদের দিকে নজর রাখুক: কে সচ্চিদানন্দন

কে সচ্চিদানন্দনের জন্ম ১৯৪৬ সালে। ভারতীয় কবিতার সুপরিচিত নাম। মালায়ালাম এবং ইংরেজি দুই ভাষায় কবিতা লেখেন তিনি। একই সঙ্গে সাহিত্য সমালোচক, নাট্যকার ও অনুবাদক। সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন কলকাতা পোয়েট্রি কনফ্লুয়েন্সে যোগ দিতে। The Missing Rib তাঁর কবিতা সংকলনের নাম। অধ্যাপনা করেছেন। সাহিত্য অকাদেমির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। দিল্লিতে বসবাসের পর এখন ফিরে গিয়েছেন কেরালায়, নিজের জন্মভূমিতে। সেখানে বসেই নিয়মিত কবিতাচর্চা করে চলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার গ্রহণ: অরুণাভ রাহারায়

প্র: আপনি আগে দিল্লিতে থাকতেন। এখন রাজধানীর থেকে দূরে থাকেন। কেরালায় আপনার জন্মভূমিতে চলে গিয়েছেন। আপনি কী মনে করেন, একজন তরুণ কবিকে কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকতে হবে? নাকি কেন্দ্র থেকে দূরে বসবাস করেও সে সারভাইভ করতে পারবে?

উ: আমার জন্ম কেরালায়। ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত কেরালাতেই ছিলাম। দিল্লিতে যাই ৪৫ বছর বয়সে। আমি একটা কলেজে পড়াতাম। সেখান থেকে স্বেচ্ছায় অবসরগ্রহণ করি। তারপর আমি সাহিত্য অকাদেমিতে যোগ দিই। প্রথমে ‘ইন্ডিয়ান লিটরেচার’-এর সম্পাদক হিসেবে, পরে অকাদেমির সেক্রেটারি হয়েছিলাম। তরুণ কবি হিসেবে আমি আমার নিজের গ্রামেই ছিলাম, যেখানে আমার জন্ম হয়েছিল। সেখানেই আমি কলেজে পড়াতাম। পরে এক জায়গায় যাই, সেটাও গ্রামের খুব কাছেই। যখন খুব ছোট ছিলাম, কবি হিসেবে নিজেকে গড়ছিলাম তখন নিজের জায়গাতেই ছিলাম। আমার ভাষাকে ঘিরে ছিলাম। আমার থেকে বড়, আমার থেকে ছোট এবং আমার সমবয়সি-- এই তিন প্রজন্মের কবির সঙ্গেই আমার বন্ধুত্ব ছিল। এমনকি এর পরের প্রজন্মের কবিরাও আমার বাড়িতে দেখা করতে আসত। আমরা একে অপরের সঙ্গে কবিতা নিয়ে আলোচনা করতাম। গঠনমূলক আলোচনা। তখন আমি কবি হয়ে উঠছিলাম। আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে। তখন আমার বয়স ২৬। তখন আমার সব বই কেরালা থেকেই প্রকাশিত হচ্ছিল। দিল্লিতে আসার পরেও আমার অনেক বই কেরালা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। দিল্লিতে আসার পরেও কেরালায় আমার যথেষ্ট উপস্থিতি ছিল। দু’টো কারণে। প্রথমত, আমার সব বই কেরালা থেকে প্রকাশ হত। সেখানে আমার অনেক পাঠক। যদিও গোটা বিশ্বেই আমার পাঠক রয়েছে। কারণ, কেরালার নাগরিক গোটা বিশ্বেই ছড়িয়ে আছে। তাই আমার কবিতার পাঠক গোটা বিশ্বেই ছড়িয়ে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রতি বছর আমি বহুবার কেরালায় যেতাম। বছরে অন্তত ৮ থেকে ১০ বার। বিভিন্ন বৈঠকে বা কবিতাপাঠের আসরে যোগ দিতে। আমি নতুন কবিদের সঙ্গে দেখা করতাম। তাদের সঙ্গে আড্ডা হত।

এরই মধ্যে বড় পরিবর্তন চলে আসে। কম্পিউটার আসে ঘরে, মোবাইল চলে আসে। অনেকেই লেখার জন্য সাইবার স্পেস ব্যবহার করতে শুরু করেন। তাঁদের নিজেদের ব্লগ তৈরি হয়। আমিই কিন্তু সর্বপ্রথম মালায়ালম ভাষায় কবিতার ব্লগ সম্পাদনা করি প্রায় ১০ বছর আগে। একটা বড় প্রকাশনা সংস্থা আমায় এই কাজটা করতে বলেছিল। সেই সংস্থা আমারও কবিতা বইও প্রকাশ করেছে। প্রকাশনা সংস্থাটি আমায় বলেছিল ব্লগ থেকে কবিতা নির্বাচন করতে। সেখানকার বহু কবির লেখা তখনও প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশকরা আমায় বলেছিল ব্লগ পড়ে কবিতা নির্বাচন করতে। সেটা আমি আমার ফেসবুকে প্রচার করি। তারপর থেকে আমার কাছে প্রচুর ব্লগের লিঙ্ক আসে। আমি প্রায় সবকটিই পড়ি। অন্ততপক্ষে ৬০ হাজার কবিতা পড়েছিলাম এই সংগ্রহটির জন্য। যার মধ্যে থেকে আমি মাত্র ৬০টা নির্বাচন করি। আমি ওই সংগ্রহটার নাম দিই ‘দি ফোর্থ স্পেস’। বিখ্যাত সমালোচক হোমি ভাবা বলেছিলেন, যে মানুষরা নিজেদের জায়গা ছেড়ে এসেছেন, তাঁরা থার্ড স্পেসে বসবাস করছেন। এখানেও নয়, ওখানেও নয়। তো আমার মনে হয়েছিল সাইবার স্পেস হল চতুর্থ স্পেস। যেখানে গোটা বিশ্বের মানুষ একত্রিত হতে পারেন, নিজেদের অভিজ্ঞতা ইত্যাদি একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। এখনও আমি ব্লগ, ফেসবুকে প্রকাশিত বিভিন্ন কবিতা নিয়মিত পড়ি, ভার্চুয়াল জগতে থাকি।

প্র: কেরালায় বসেই আপনি কি গোটা বিশ্বের সাহিত্যকে ছুঁতে পারছেন? 

উ: অবশ্যই। এখন তো বটেই, ছোটবেলাতেও ছুঁতে পেরেছিলাম। আমি গ্রামে জন্মেছি। আমাদের গ্রামে দু’টো গ্রন্থাগার ছিল। অনেকে জানেন কেরালায় একটা বড় গ্রন্থাগার আন্দোলন হয়েছিল। ফলস্বরূপ প্রতিটি গ্রামে অন্ততপক্ষে একটা গ্রন্থাগার ছিল। কোথাও কোথাও একের অধিকও ছিল। আমাদের গ্রামে দু’টো। যার মধ্যে একটা ছিল বিশ শতকের প্রথমদিকের বিখ্যাত কবি কুমারানাশানের নামে। ওই গ্রন্থাগারে খুব ভালো বইপত্র ছিল, বিশেষ করে অনুবাদগ্রন্থ। মালায়ালাম একটা অনুবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। আমরা নানা সাহিত্য অনুবাদ করতে থাকি। তাই যখন একজন মালায়ালম সাহিত্যিককে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সবথেকে জনপ্রিয় মালায়ালাম লেখক কে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। মার্কেজ এতোটাই জনপ্রিয় ছিলেন মালায়ালাম ভাষায়। 

প্র: আপনি অনেক কম বয়সে পাবলো নেরুদার নির্বাচিত কবিতা অনুবাদ করেছিলেন। আপনার কি মনে হয় কবিতার অনুবাদের মধ্যেও সৃজন থাকে?

উ: নিশ্চয়ই। আমি মনে করি, একটি অনুবাদ বইয়ে দু’জনের সৃজনশীলতা থাকে। অনুবাদে আমাকেও দেখা যাবে, নেরুদাকেও। অবশ্যই প্রথমে নেরুদাকে ও তারপর আমাকেও দেখতে পাবেন। আমি নেরুদার সৃষ্টিকে আমার ভাষায় অনুবাদ করেছি। আমার ভাষা বলতে মালায়ালাম নয়, আমার নিজস্ব ভাষা, ভঙ্গি বোঝাতে চেয়েছি। বহুদিন আগে সম্ভবত ১৯৪০ দশকের শেষে এবং ৫০ দশকের শুরুর দিকে নেরুদার কবিতা মালায়ালামে অনুবাদ করা হয়েছিল। আমার মনে হয়, ওই সময় মালায়ালাম ভাষা নেরুদার জন্য, নেরুদার সৃষ্টিকে ভালোভাবে অনুবাদের জন্য যথেষ্ট পরিপক্ক ছিল না। একজন গতানুগতিক মাপকাঠিতে অনুবাদ করেন। অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে না পেরে কিছু জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ওটা একটা অসম্পূর্ণ অনুবাদ ছিল। যার কথা বলছি, তিনি একজন কমরেড ছিলেন। তিনি হয়তো নেরুদা, মায়কোভস্কির অনুবাদ করাকে নিজের দায়িত্ব ভেবেছিলেন। সেটা করেওছিলেন। আমি অনুবাদ করি ৭০-এর দশকে। বইটা প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। ততদিনে মালায়ালাম কবিতা আধুনিক হয়ে উঠেছে। আমার সামনে একটা নতুন ধরন, দেখার নতুন আঙ্গিক এবং একটা সম্পূর্ণ নতুন ভাষা ছিল। তখন আমি নেরুদাকে ভালো করে অনুবাদ করতে পারি। নেরুদার মতো একজন কবি, যাকে আমি নিজে প্রচণ্ড অ্যাডমায়ার করি, তাঁর সৃষ্টিকে অনুবাদ করার সাহস দেখিয়েছিলাম।

প্র: সুবোধ সরকার তাঁর 'আমার কবিতা আমার জীবন' (প্রকাশ ২০১৫) বইয়ের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, তিনি গত পাঁচ বছরে বিদেশে যে কয়েকটি সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন, তাঁকে সুপারিশ করেছেন আপনি অথবা সীতাংশু যশচন্দ্র। কবিতার ক্ষেত্রে কি রেকমেন্ডেড হওয়া জরুরি?

উ: হ্যাঁ। আমি চাই, সব সিনিয়র কবি জুনিয়র কবিদের দিকে নজর রাখুক। নতুন কবিতা পড়ুন, সেগুলো সম্পর্কে লিখুন। আমি গোটা জীবন ধরে তা করে আসছি। তখন থেকে যখন আমি মালায়ালামে নন-পোয়েট ছিলাম। এমনকি দিল্লিত থাকার সময়ও নতুন মালায়ালাম কবিদের লেখা পড়তাম। তাঁরা আমাকে লেখা পাঠাতেন। তাদের বই কিনতাম বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে পড়তাম। আমি এইসব কবিদের সারা বিশ্বে কবিতা সম্মেলনের জন্য সুপারিশও করে থাকি। যেমনটা সুবোধ সরকারকে করেছিলাম। আমি যাদের কবিতা পড়ি তাদের ভারতে এবং মাঝেমধ্যে বিদেশেও বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলনে সুপারিশ করি। 

আমি তাঁদের কখনও কখনও কবিতা অনুবাদও করতে বলি। কারণ, কবিতা অনুবাদ হল একটা শেখার অভিজ্ঞতা। যখন আপনি কবিতা অনুবাদ করেন তখন যেন আপনি একজন মহান শিল্পীকে কাজ করতে দেখছেন। কীভাবে তাঁর হাত চলে, কীভাবে লাইন গঠন হয়, কীভাবে তিনি রঙের ব্যবহার করেন। যখন আপনি একজন কবিকে অনুবাদ করেন তখন আপনি বোঝার চেষ্টা করতে পারবেন আসল কবিতাটা লেখার সময় কবির ইমাজিনেশন কীভাবে কাজ করছিল। তিনি নির্দিষ্ট চিত্রকল্পে কীভাবে পৌঁছলেন বা লাইনটা কীভাবে জন্ম নিল। আপনি কিছু শিখতে পারবেন অনুবাদ করতে গিয়ে। তাই আমি সব তরুণ কবিদের বলে থাকি অনুবাদ করুন। আমি তাঁদের বলছি না, সব অনুবাদ প্রকাশ করতে হবে। হয়তো প্রকাশ করবেন না, তবু নিজের জন্য অনুবাদ করুন। অনুবাদ যে ভালো হবে তারও নিশ্চয়তা নেই। তবুও, অনুবাদ হল শেখার জন্য একটা অভিজ্ঞতা। 

আমি হাই স্কুলের ছাত্র থাকার সময় অনুবাদ করতে শুরু করি। ওমর খৈয়াম এবং কয়েকজন ব্রিটিশ রোম্যান্টিক কবির লেখা অনুবাদ করি। কারণ ওই বয়সকালে সেইসব কবিরাই বেশি টানত। সারাজীবনই আমার কবিতা এবং আমার অনুবাদ একসঙ্গে চলেছে। এখনও আমার একটা মান্থলি কলাম রয়েছে। সেখানে আমি ভারতের এমনকি ভারতের বাইরের কবিদের পরিচয় করাই তাঁদের কবিতা মালায়ালামে অনুবাদ করার মাধ্যমে। একটা ছোট্ট ভূমিকা লিখি, তারপর তাঁর কবিতা অনুবাদ করি। অনুবাদ ও সৃষ্টি দুটোই আমার সমান্তরাল ভাবে চলেছে। আমার অনুভব, এই অনুবাদগুলি আমার নিজের কবিতার জগতের একটা অংশ। কেউ যদি আমার সব কবিতাকে একসঙ্গে প্রকাশ করে তাহলে আমার মনে হয় তার একটা অংশে নিজের কবিতা থাকবে, আরেকটা অংশে আমার অনুবাদ করা কবিতাগুলো থাকবে। কারণ, আমার সৃজনশীলতা, আমার ইমাজিনেশন, আমার ভাষাগত দক্ষতা-- এই সবকিছু আলাদাভাবে হলেও আমার দু’ধরনের কাজের মধ্যেই রয়েছে। আমি সবসময় বলি, যখন একজন কবিকে মূল্যায়ন করছেন বা তাঁর অনুবাদকে দেখছেন, তখনই আপনি ওই কবিকে সম্পূর্ণভাবে জানতে পারবেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নিজের কবিতার অনুবাদ করেছিলেন। করীরও করেছিলেন। আমার মনে হয় না সেগুলো খুব ভালো অনুবাদ। কারণ পরে আমি আরও ভালো অনুবাদ দেখতে পেয়েছি। কিন্তু, তাঁরা যে অনুবাদ করতে চেয়েছিলেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। এখনও এই বয়সে আমি গোটা বিশ্বের কবিতা পড়ি এবং সেইসব লেখাকে মালায়ালি পাঠক সমাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। আমি এই কাজটা করি মূলত মালায়ালি যুব কবিদের জন্য। যাতে তাঁরা জানতে পারেন যে এরকম একজন কবি রয়েছেন, এই ধরনের কবিতার ভঙ্গি রয়েছে, এই কবি এই ধরনের ইমেজ ব্যবহার করেন বা অন্য একজন কবি আরেক ধরনের সিনটেক্স ব্যবহার করেন। তাঁরা অনুবাদের মাধ্যমে অনেক কিছু শিখতে পারেন। অনুবাদ একটা সৃজনশীল কাজ। কারণ, সেখানে তোমার ইমাজিনেশন কাজ করছে, তুমি তোমার সমস্ত ভাষাগত দক্ষতা কাজে লাগাচ্ছ। তাই আমার মতে, গোটা প্রক্রিয়াটা অত্যন্ত সৃজনশীল।

প্র: ক্রিস্টোফার মেরিলের সঙ্গে আপনার একটা ছবি দেখেছি। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাইটিং ওয়ার্কশপে ও সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন?

উ: আইওয়াতে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। কিন্তু, সেই সময় যেতে পারিনি। রটারডামে একটা ওয়ার্কশপে যোগ দিয়েছিলাম। তারপর ভেলসে শহরে একটা ওয়ার্কশপে গিয়েছিলাম। ভেলসের পর ম্যানচেস্টারে গিয়েছিলাম একটা ওয়ার্কশপে। সেখানেই সম্ভবত ক্রিস্টোফার মেরিলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। স্পেনে মাদ্রিদেও ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছি। প্রথম শুরু হয়েছিল ভোপালের ভারত ভবনে। তখন ডিরেক্টর ছিলেন অশোক বাজপেয়ী। সেখানে অনেক কবি আসতেন। কবি সম্মেলন হত। প্রায় সবগুলোতেই অংশগ্রহণ করতাম। মাঝেমাঝে কয়েকটা ওয়ার্কশপও হত। হিন্দিতে আমার অনুবাদের বই রয়েছে। একবার একটা ওয়ার্কশপে তিনজন ছিলাম। আমি, হিন্দি ভাষার একজন যুব কবি ছিলেন রাজেন্দ্র থোটাপকর, আর একজন ছিলেন, তিনি মালায়ালাম ও হিন্দি দুই ভাষাই জানতেন। কর্মশালাটা ১৫ দিন ধরে চলেছিল। শেষে আমার প্রথম হিন্দি বইটা প্রস্তুত হয়। তারপর দিল্লিতে রাজকমল প্রকাশ করেছিল। সেই শুরু। তারপর একে একে বহু ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করি দেশ ও দেশের বাইরে।

প্র: বাংলার অনেক পরিচিত কবি আপনার বন্ধু। ভারতীয় কবিতার মনচিত্রে কবিতা কবিতার অবস্থান ঠিক কোথায়?

উ: বাংলা কবিতা গতিশীল, জীবন্ত। বাংলায় অনেক লিটল ম্যাগাজিন আছে, কবিতা পত্রিকা রয়েছে। যদিও আমি সব ভাষার কবিতা পড়িনি। হয়তো কেউই পড়েননি। তবু, আমার মতে, মারাঠি, মালায়ালাম এবং বাংলা সব থেকে এগিয়ে রয়েছে ভারতীয় কবিতা মানচিত্রে। হয়তো হিন্দিও রয়েছে এই তালিকার ওপরের দিকে। মুশকিল হল, হিন্দি ভাষায় লেখা কবিতা কিছু পাঠকের ছোট বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মূলত, অ্যাকাডেমিশিয়ান, কলেজ পড়ুয়া, কলেজের অধ্যাপক, তাঁরাই প্রধান পাঠক হিন্দি কবিতার। মালায়ালামে তা হয় না। বাংলা বা মারাঠির ক্ষেত্রেও তা হয় বলে আমার মনে হয় না। নানা স্তরের মানুষ বাংলা কবিতা পড়েন। যখন আমি কেরালায় যাই তখন অটো-রিক্সা চালকও আমার কাছে আসেন, আমাকে চিনতে পারেন। একবার তো একজন অটো চালকের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয় কবিতা নিয়ে! আমি তাঁর মুখ দেখতে পাইনি কারণ তিনি সামনে বসেছিলেন। কিন্তু, তাঁর সঙ্গে আমার অনেক গভীর আলোচনা হয়, নিজের বর্তমান কবিতা ও আগের লেখা কবিতার পার্থক্য নিয়ে! এমন ঘটনা আমার সঙ্গে কয়েক বার হয়েছে। একটা গ্রামে একজন পান বিক্রেতা আমার নতুন কবিতা পড়েছেন শুনে বিস্মিত হয়েছি। সেটা আবার আমাকে মুখস্থ শুনিয়ে দিলেন! একটা রেস্তোরাঁয় এক বেয়ারার সঙ্গেও একই ধরনের ঘটনা। যদিও আমি খুব জনপ্রিয় কবি নই। সবার জন্য লিখি না। কিন্তু, তা সত্ত্বেও আমার কবিতা সাধারণ মানুষদের মধ্যে প্রশংসিত হয়েছে ভেবে ভালোই লাগে। এটা আমি কেরালায় টের পেয়েছি। আমার মনে হয় বাংলা কবিতার জন্যেও সাধারণ মানুষের এই ভালোবাসাটা রয়েছে। মারাঠির জন্য বড় মাপে রয়েছে। হিন্দিতে অনেক ভালো কবিতা রয়েছে। কিন্তু,  সেই তুলনায় পাঠক সংখ্যা খুবই কম। এটা আমি ভালো করে জানি। এই চার ভাষার কবিতাই অত্যন্ত গতিশীল।

প্র: ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল আপনার। শুনতে চাই সেই স্মৃতি...

উ: হ্যাঁ সেবার দেখা হয়েছিল অলোকদার সঙ্গে। আমার কবিতার অনুবাদ হয়েছে অন্তত ৩০টি ভাষায়। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত আমার কবিতার জার্মান অনুবাদ-গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। কেরলের একজন মহিলা অ্যানা কুট্টি আমার কবিতার অনুবাদ করেছিলেন জার্মান ভাষায়। তাঁর স্বামী জার্মান। তিনি নিজেও জার্মান জানেন। বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্মান ভাষা পড়ান। তিনি জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মালায়ালমও পড়ান। অ্যানা কুট্টি একজন কবি এবং জার্মান ভাষাতেও লেখেন। তিনি আমার কবিতা মালায়ালাম থেকে সরাসরি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। বইটা যথেষ্ট বড় হয়েছিল। কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সেই বই প্রকাশ করেছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায়। আমি অলোকরঞ্জনের অনেক কবিতা পড়েছি। যেমন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখাও পড়েছি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমার সিনিয়র বন্ধুর মতো ছিলেন। ভোপালে ওয়ার্কশপে শক্তি এসেছিলেন। সেই সময় শক্তির কবিতাও অনুবাদ করা হচ্ছিল হিন্দিতে। করছিলেন কেদারনাথ সিং। সেই সময় বিভিন্ন ভাষার কবিদের দল একে অপরের লেখা অনুবাদ করেছিলেন।

প্র: আপনার কন্যা সবিতা সচ্চি কবিতা লেখেন। তাঁর বই প্রকাশ পেয়েছে। কীভাবে দেখেন বিষয়টা 

উ: হতে পারে ব্যাপারটা জেনেটিকসের জন্য। একথা বলব না যে সবিতা আমার থেকে কবিতা পেয়েছে। কবিতা পড়েই কবিতার প্রতি ঝোঁক এসেছে ওঁর। তাছাড়া, ছোটবেলায় আমাকে সবসময় লিখতে দেখত। আমি খুবই খুশি এবং গর্বিত ওঁর জন্য। ওঁর কবিতা চারদিকে ভালোভাবে গৃহীত হয়েছে, আলোচিত হয়েছে। কবিতার প্রতি ওঁর টান তৈরি হওয়ায় ভালোই হয়েছে। কারণ, ও এমন একটা বাড়িতে বড় হয়েছে যেখানে কবিতার বইয়ের ছড়াছড়ি। আমার তিনটে বড় তাক-ভর্তি সারা বিশ্বের কবিতার বই। আমার কবিতা ও ঘরে থাকা কবিতার বইগুলো পড়ে বড় হয়েছে সবিতা। ওঁর কবিতার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়ার পেছনে এই কারণগুলো থাকতেই পারে। আগ্রহটা নিজেরই ছিল। পরিবেশও হয়তো কিছুটা সাহায্য করেছে।

প্র: লকডাউনে আপনার সম্পাদনায় কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। লকডাউনের সময়টা কীভাবে কাটিয়েছিলেন? 

উ: লকডাউন আমার জন্য অত্যন্ত সৃজনশীল সময় হয়ে উঠেছিল। হ্যাঁ, একবার আমারও কোভিড হয়েছিল। তবে, ছোট আকারে। জ্বর ইত্যাদি হয়েছিল। সেটা বাদ দিয়ে আমি অনেকটা সময় পেয়েছি। অন্য সময় প্রচুর সভায় বক্তব্য রাখতে ডাকা হয় আমাকে। সেই সময়ও কয়েকটা অনলাইন মিটিং পড়েছিল। অংশ নিয়েছি এবং প্রায় ৬০টা অনলাইন লেকচার দিয়েছি! কিন্তু, ব্যাপারটা অনলাইনে হওয়ার কারণে আমায় কোথাও যেতে হয়নি। যা আমায় অনেক অবসর সময় দিয়েছিল। সেই সময় আমি প্রতি সপ্তাহে মালায়ালাম অনুবাদ কলামের কাজটা চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। আরেকটা কথা, আমি এই সময় ভক্তি এবং সুফি কবিতা অনুবাদের সিদ্ধান্ত নিই। সেটাই মূলত করেছিলাম লকডাউনে। তা থেকে পাঁচটা বইয়ের পাণ্ডুলিপি হয়ে উঠল। তার মধ্যে তিনটি প্রকাশ হয়ে গিয়েছে। বাকি দুটির কাজ চলছে। সঙ্গে শেক্সপিয়রের সব সোনেট অনুবাদের চেষ্টা। আমি আগেই একটা সংগ্রহের জন্য অনেকটা অংশ অনুবাদ করেছিলাম। এবার মোট ১৫৪ সনেটের সবকটিই অনুবাদ করেছি মেট্রিক্যালি। কারণ, সনেট মিটারে অনুবাদ করতে হয়। 

আমার কাছে একটা গোটা বই রয়েছে কবীরের। নাম 'কনভার্সেসন উইথ গড'। 'সুফি পোয়েমস বাই বুল্লেহ শাহ' নামে সুফি কবি বুল্লেহ শাহর একটা বই। তৃতীয় বইটি তুকারামের কবিতা নিয়ে। চতুর্থ বই কানাডার সাইবার পোয়েটস। আমার পঞ্চম বইটি একটি অ্যান্থলজি। তাতে আমি প্রায় ৫০ জন ভিন্ন ভাষার সুফি এবং ভক্তি কবিকে একসঙ্গে অনুবাদ করেছি। পাঁচটি বই ভক্তি এবং সুফি কবিতার ও একটা শেক্সপিয়রের সনেটের বই। সবকটিই লকডাউনের আড়াই বছরে অনুবাদ করা। সঙ্গে আমি নিজের কবিতাও লিখছিলাম। পরিস্থিতির বিচারে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছিলাম। আমি বেশ কিছু কবিতা সরাসরি লকডাউন নিয়ে না লিখলেও পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে লিখি। যেমন, একাকীত্ব, সামাজিক দূরত্ব, পরিযায়ী শ্রমিকদের মাইগ্রেশন ইত্যাদির ওপর। আমার লেখা একটা কবিতা রয়েছে 'ট্রেন' নামে। একজন শ্রমিক ট্রেন ধরতে পারেননি এবং তিনি মারা যান। তাঁর আত্মা ট্রেনে যাত্রা করে। এভাবেই আমি ইমাজিন করেছি। তিনি গ্রামে পৌঁছন। কিন্তু, তাঁকে সবাই আসল মানুষ হিসেবে দেখতে পান। তাঁর বাচ্চারা বেরিয়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে, গ্রামবাসীরা তাঁর নাম ধরে ডাকে। তিনি বাই-সাইকেলে ঘুরে বেড়ান। এভাবেই আমার‌ কল্পনা দিয়ে কবিতাটা লিখেছিলাম।

প্র: গত বছর আপনি কেন্দ্রীয় শাসকদলের বিরোধী একটি কার্টুন শেয়ার করেছিলেন বলে আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট একদিনের জন্য উধাও হয়ে গিয়েছিল

উ: আমি তো লিখেই চলেছি এইসবের বিরোধীতা করে। কারণ, বর্তমানে ভারতে ঘৃণার সংস্কৃতি চলছে। যা তৈরি করেছে নতুন সরকার। আমি তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দিয়ে থাকি। ফেসবুকে লিখে থাকি। শুধু লেখা নয়, নানা জায়গায় বলিও। দিল্লিতে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছি। এছাড়াও শাসক বিরোধী অনেক প্রতিবাদ সভায় অংশ নিয়েছি। কেরালাতেও আমি এইসব মানুষদের বিরুদ্ধে কথা বলে থাকি। ফেসবুকে কার্টুন বা সমালোচনামূলক মন্তব্য পোস্ট করতে থাকি। অশ্লীল কিছু নয়, শুধু কঠোর সমালোচনামূলক রাজনৈতিক মন্তব্য। কিন্তু, একদিন দেখতে পাই আমি আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছি না। বারবার পাসওয়ার্ড দিয়েও ঢুকতে পারছি না! দু'দিন এই অবস্থায় ছিল। তিনদিনের দিন আবার ঢুকতে পারি। আমি ফেসবুকের থেকে ওয়ার্নিংও পাই যে, আপনি আবার কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের বিরুদ্ধে গিয়েছেন। কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড শব্দটা ব্যবহার করেছিল ওঁরা। বলেছিল, আপনার পোস্ট আমাদের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের বিরুদ্ধে। তাই আমরা পোস্টটি সরাতে বাধ্য হয়েছি। আপনি আবার এ রকম করলে আমরা একই রকম ব্যবস্থা নেব। এ ঘটনার বিরুদ্ধে কেরালায় বড় বড় প্রতিবাদ হয়। স্কুল পড়ুয়ারা পর্যন্ত তাতে সামিল হয়েছিল।

কবিতায় ভস্মীভূত এক কবি: কে সচ্চিদানন্দনের কবিতা | অনুবাদ: অরিত্র সান্যাল

[কবিকে তাঁর মূল ভাষায় পড়তে না পারার দুঃখ একটি পবিত্র অনুভূতি। এতে পাঠকের বিবেক অটুট থাকে। এই অশ্রু-ঝলোমলো বিশ্বাস নিয়েই কবি কোইয়ামপারাম্বাথ সচ্চিদানন্দনকে অনুবাদ করে ফেলা। কবি লেখেন মালায়লম ভাষায়, পরে অনুবাদ নিজেই করেন ইংরেজিতে। সেই ইংরেজি থেকে বাংলায়, খঞ্জপদক্ষেপে, কবিতাগুলিকে বয়ে আনবার কাজটি অপরাধের হল কি না – তা আর কবেই বা কে জানতে পেরেছেন!

জুন মাসের অগ্নিদাপট চলছে বাইরে। অ্যান্টনিম পত্রিকার উদ্যোগে শহরে কলকাতা পোয়েট্রি কনফ্লুয়েন্সে যোগ দিতে এসে কবি এসে উঠেছেন পূর্ব কলকাতার একটি পান্থনিবাসে। তারই একটা ঘরে বসে আছি, অর্থাৎ, একটি ঘরে বসে দুই ভারতীয় পরস্পরের সঙ্গে ইংরেজিতে আড্ডা মারছে। এর মাঝে চা এল। কবি ও পাঠকের মধ্যে ভাষার দূরত্ব নিয়ে গভীর কথা পাড়তে যাব কি এমন সময় কবি ফুড়ুত হেসে হঠাৎ বলে উঠলেন – যখনই কোলকাতা আসি, আমি হতবাক হয়ে যাই। সারা পৃথিবী জুড়ে মালায়লি মানুষ ছড়িয়ে আছেন, কিন্তু এত বাঙালি একসঙ্গে কেরালা ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না।

অতঃপর, আমি প্রশ্নটি গিলে নিই। নিশ্চিন্ত হই-– আমরা সর্বত্র আছি।]   


আঙুলের ছাপ


প্রাচীন কেল্লার ফটকে

এই আঙুলের ছাপগুলো দেখো:

কয়েকটি ঝুলেকালিতে ছাপা হয়ে আছে,

কয়েকটি অশ্রুতে,

তার মধ্যে কিছু, যারা উঁকি দিয়েছিল সেই শিশুদের,

কিছু, এখানে ঢুকতে পারার আগেই

খিদের চোটে ধ্বসে পড়া বুড়োদের,

আর কিছু, সেই জোয়ান ছোঁড়াদের যারা

জোর করে ঢুকতে গিয়ে, অশেষ রাত্রিতে

সটান থুবড়ে পড়েছিল।


আমিও এই সিংহদরজায়

রেখে যাচ্ছি নিজের আঙুলের ছাপ, রক্তে:

যারা অনাগত তাদের প্রতি

একটি স্মারক আর একটি হুঁশিয়ারি:

আমার কবিতা। 


রচনাকাল: ১৯৮৮


কবিতায়


নিজের কবিতায় আমি পুড়ে ছাই হয়ে যাই,

ঠিক যেমন চিতায়।

কাঁচা কাঠের মতো শব্দের পর শব্দ

আমি লেখায় গুছিয়ে তুলেছি।


কলাপাতা থেকে যখন আমায় চড়ানো হল

চিতার ওপর, শব্দে দাউদাউ আগুন।

সেখান থেকে আমার হাড়ের ভেঙে ফাটার 

আওয়াজ পাবে তুমি, 

হৃৎপিণ্ড পুড়ে যাবার তেল ছ্যাঁকছ্যাঁক ধ্বনি,

গলা পুড়ে যাবার নিঃশব্দ গান।


আমার চারদিকে তুমি দাঁড়িয়ে থেকে দেখ

যে জীবন আমি নিজের চোখে দেখি

তাতে জ্বলন্ত কয়লা পড়তে থাকে,

আমার শিরা দিয়ে গলগল করে স্বপ্ন 

বেরিয়ে যায়, আমার হুহু বয়ে যাওয়া ঘিলু থেকে

স্মৃতি আলুথালু।


তুমি তেল ঢালছ, আর চাপাচ্ছ কাঠের ওপর কাঠ,

আমার অন্ত্রনাড়িভুঁড়িজাল নেড়ে দিচ্ছ কাঠি দিয়ে।

একটা ঘুমপাড়ানি গান আমার কানে পুড়ছে,

গিঁঠ থেকে গিঁঠ খুলে একে একে আমার আঙুলগুলো পড়ে যাচ্ছে,

যেটুকু দূরত্ব আমি হেঁটে এসেছি জ্বলে যাচ্ছে,

আমি ছাই হয়ে যাচ্ছি। 

সেই ছাইয়ে এক বেড়াল তার ছানাপোনা নিয়ে উষ্ণতার ওম খুঁজে নেয়,

সেই ছাইয়ে একটা বুনো দারুচিনি গাছ গজিয়ে ওঠে, ফুল ফোটায়। 

সেই ছাইয়ে কালো কালো বাচ্চারা লাফায় দাপায়, খেলা করে।

তুমি এ ছাই গঙ্গায় ঢেলো না, অনুরোধ করি।


[কেরালার আদি রীতি অনুসারে মৃতদেহকে প্রথমে কলাপাতায় শোওয়ানো হয়। তারপর চিতায়।] 

                       

রচনাকাল: ১৯৯২


যখন কবিতা পুড়ে যায়


যখন কবিতা পুড়ে যায়, তা থেকে

গ্যাস চেম্বারে দগ্ধ শিশুদের গন্ধ আসে।

এখানে মড়-মড় করে যে ভাঙার শব্দ 

তা যুদ্ধের ধোঁওয়ায় পুড়ে আংড়া হয়ে যাওয়া পাতার।

অনাথ, ল্যাংটা, সারা গায়ে পোড়া দাগ,

রাস্তায় রাস্তায় ছুটে বেড়ায় কবিতা।

যা-কিছু অতিক্রম করে সব ছাই:

স্টক এক্সচেঞ্জ, প্রমোদ-বিপণী,

অস্ত্রাগার, দেওয়াল, দেওয়াল।

কবিতার ছাই থেকে একটি তোতা উঠে আসে

তার খোঁড়া জিভের ওপর নির্বাসিতা সীতার

প্রতিশোধের গল্প নিয়ে। 


রচনাকাল: ১৯৯২


ঘর, একটি জন্তু


ঘর একটি জন্তু যার ফুসফুস থাকে শরীরের বাইরে। সে কারণে 

সামান্য রৌদ্র বা তুষার লাগলেই তার জ্বর হয়ে যায়। 

হাওয়া-বাতাস ঝড়-জল এমন চলতেই থাকলে ঘর একদিন মরে যাবে। 


রচনাকাল: ১৯৯৫


অমরত্ব


হাজার হাজার কবি লিখেও

আজ বিস্মৃত।

স্মরণে শুধু একজনই থেকে যান।

একা একা অমর হবার থেকে

আমি চাইব বরং বিস্মৃত হয়ে যেতে

হাজার হাজার কবির সঙ্গে


রচনাকাল: ১৯৯৬



ঢোল


কোথা থেকে শব্দ আসে – তা উৎসুক হয়ে

খুঁজতে গিয়ে আমি একবার

ঢোলের চামড়ায় ছ্যাঁদা করে ফেলি

তারপর ভিতরে উঁকি দিই


অরণ্য আছে ভিতরে,

ঝমঝম বৃষ্টিতে জন্তুজানোয়ার ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে,

বানে নদী ক্ষিপ্ত, বাতাস

ঘণীভূত আকাশের নিচে ক্ষেপে উঠেছে।

একটা জংলি দেবতা বাইসন চড়ে

শিঙায় ফুঁ মারছে।

আমি ভয়ে কেঁপে উঠি, পালিয়ে আসি।

তখন আমার বয়স চার বছর।


এখনও যখন ঢোলের আওয়াজ শুনি,

আমি অকাতরে বৃষ্টির মধ্যে একটা

অরণ্যে পৌঁছে যাই,

সমুদ্রের মাঝে একটা দ্বীপ,

আর আমি সেখানে অপেক্ষা করি, ঝড় থামবার,

রক পাখির চঞ্চু থেকে সূর্যের জ্যান্ত দেখা দেবার,

আর মূল ভূখণ্ড থেকে

আমার সহচরের

ফুল, আর কলম নিয়ে আসবার


রচনাকাল: ২০০০



ভয়


ছোটবেলায়

আমি খুব ভয় পেতাম পেঁচার ডাকে

আর মায়ের আড়ালে লুকিয়ে যেতাম।

এখন শীতের চাঁদ

মেঘ থেকে সেই ডাক ছাড়ে।

মা মৃত্যুর আড়ালে লুকিয়ে গেছে

শৈশব মেঘের ওপার থেকে উঁকি দেয়

চাঁদের চোখের প্রাপ্তবয়স্ক ঝিলিক

তার ওপর পড়ে।


আর আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। 


রচনাকাল: ২০০২  



শিলং যাবার পথে


শিলং যাবার পথে

উমিয়াম লেকের কালচে বাদামী ঘাটে

একটি নীল কৃষ্ণচূড়ার ঝালর,

তার তলায় আমি তাঁকে দেখিঃ বনলতা সেন।


আজ, এক দশক পার করে

আবার সে লেকের পাশ দিয়ে যাচ্ছি।

উনি এখনও সেখানেই দাঁড়িয়েঃ

উপচে পড়া নীল কৃষ্ণচূড়া

এক খণ্ড বেগুনি মেঘের তলে

আকাশে ধাবমান।


রচনাকাল: ২০০৩


বয়ঃসন্ধি


মাস্টারমশাই অঙ্ক মুছে দিয়ে চলে গিয়েছেন,

শুধু যোগচিহ্ন, বিয়োগচিহ্ন আর মোটে একটা শূন্য

পড়ে আছে ব্ল্যাকবোর্ডে।

যোসেফ যোগচিহ্ন নিয়ে নিল

আর আমিনা, বিয়োগচিহ্নটা।

আমি শূন্য পকেটে ভরে

চলেই আসছিলাম কি এমন সময়

একটা বিশাল কাক ডেকে উঠল,

একটা গাছ রাস্তা পেরিয়ে গেল,

পথে একটা তারা খসে পড়ে

ভেঙে খান খান।

মুষলধারা বৃষ্টিতে আমার

শূন্যটিও গলে যায়।


আমি ফিরে যাই আর

আয়নায় দেখি:

আমার গোঁফ গজিয়েছে। 


রচনাকাল: ২০০৪


দরজাওয়ালা একটা মানুষ


দরজা নিয়ে একটা মানুষ

শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে,

একটি লাগসই বাড়ি চাই।


সে মানুষ নিজের মানুষীর

স্বপ্ন দেখছে, বাচ্চাকাচ্চা, ইয়ারদোস্ত 

সবাই এই দরজা দিয়েই ঢুকে আসছে।

এখন সে দেখতে পায়

আস্ত দুনিয়াই ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে

তার না-হওয়া বাড়িতে:

কত লোক, গাড়ি-ঘোড়া, গাছপালা

পশু পাখি, সবকিছু।


আর দরজাটা, দরজার স্বপ্নটা

মাটির ওপর উঠে যাচ্ছে,

তার ইচ্ছে স্বর্গের স্বর্ণদুয়ার হয়ে ওঠার,

সে কল্পনা করছে মেঘ, রঙধনু,

দত্যিদানো, পরী আর সাধুসন্তেরা

তার মধ্যে দিয়ে চলাচল করছে।


কিন্তু দরজাটির জন্য যে প্রকৃত অপেক্ষা করে আছে

নরকের অধিপতি।

এখন দরজাটি চায়

গাছ হতে, ফুল পাতার সম্ভার

দুলে উঠবে হাওয়ায়,

গৃহহারা ফেরিওয়ালাকে

ছায়া দিতে।


দরজা নিয়ে একটি মানুষ হেঁটে যাচ্ছে

শহরের রাস্তায় রাস্তায়,

একটি তারা হেঁটে যাচ্ছে তার সঙ্গে। 


রচনাকাল: ২০০৬



ঋণস্বীকার:

কে সচ্চিদানন্দনের The Missing Rib (Collected Poems 1973-2015) নামক কাব্যসংকলনটি প্রকাশ করেছে Poetrywala। মূলত সেই সংকলন থেকেই কবিতাগুলো চয়ন করা।